বরকত মন্ডিত সালানা জলসা যুক্তরাজ্য ২০১৭ - জুমুআর খুতবা । Blessings of Jalsa Salana UK 2017 - Friday Sermon

বয়আতের অঙ্গীকার সঠিকভাবে অনুধাবন ও এর শর্তানুসারে উন্নত চরিত্র অর্জন

রোজ শুক্রবার, ১১ই আগস্ট, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১১ই আগস্ট, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদ থেকে “বয়আতের অঙ্গীকার অনুধাবন ও তদানুসারে উন্নত চরিত্র অর্জন”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর,

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, প্রত্যেক আহমদী হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়আতের মাধ্যমে নিজেকে আধ্যাত্মিক, চারিত্রিক, জ্ঞানগত ও বিশ্বাসগতভাবে উন্নত করার এক অঙ্গীকার করে। আর এই যুগে আল্লাহ্ তা’লা এমটিএ-র যে নেয়ামত আমাদের দান করেছেন, তার কল্যাণে জামাতি অনুষ্ঠানাদি, জলসা, খুতবা এবং বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক বয়আতের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কারণে প্রত্যেক আহমদী, তা সে জন্মগত আহমদীই হোক বা বয়আতকারী আহমদীই হোক. তার জন্য একথা বলার কোন সুযোগ নেই যে ‘আমি বয়আতের অঙ্গীকার সম্পর্কে জানি না’। তাই এক্ষেত্রে দরকার হল আমরা বয়আত করার পর যেন এর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই এবং বয়আতের অঙ্গীকারকে দৃষ্টির সামনে রাখি। যদি আমরা বয়আতের শর্তাবলীর কেবল চরিত্র সংক্রান্ত অংশকেও দৃষ্টিপটে রাখি, তাহলেও চারিত্রিক মান, সামাজিক সম্পর্কাদি, ব্যবসায়িক কর্মকান্ড, দৈনন্দিন লেন-দেন বা গৃহস্থালি বিষয়াদি- এই সকল ক্ষেত্রে এক অসাধারণ উন্নতি সাধিত হতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই সেই মান থেকে, যা হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আ.) আমাদের কাছে দেখতে চান, তা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। হুযুর (আই.) এ প্রসঙ্গে বয়আতের শর্তাবলীতে যেসব বিষয়ের প্রতি মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তার মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ করেন যেমন মিথ্যা না বলা, অত্যাচার না করা, খেয়ানত থেকে বেঁচে থাকা, প্রবৃত্তির উত্তেজনার শিকারে পরিণত না হওয়া, সকল সৃষ্ট জীবকে ও বিশেষভাবে কোন মুসলমানকে নিজের হাত বা জিহ্বা দ্বারা কোন প্রকার কষ্ট না দেয়া, অহংকার না করা ও বিনয় প্রদর্শন করা, সর্বদা সদাচরণের সাথে জীবন যাপন করা, মানবজাতির যথাসম্ভব উপকার করার চেষ্টা করা ইত্যাদি। হুযুর (আই.) বলেন, যদি আমরা এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দেই তবে আমরা উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে পারি। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এগুলোর প্রতি সচেতন নয়। অনেকেই মুখে মুখে তো এই কথা বলে যে ‘আমাদের অবশ্যই এই উন্নত আদর্শ দেখাতে হবে’, কিন্তু যখন নিজের সাথে এমন কোন ঘটনা ঘটে যেখানে এসব আদর্শ দেখানোর প্রয়োজন পড়ে তখন এর বিপরীত আচরণ করে বসে। কখনো তো ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে সত্যকে বিসর্জন দেয়া হয়, কখনো নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্যের উপর অত্যাচার করে বসে বা খেয়ানত করে বসে, কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য উপস্থাপন করে বসে, কখনো হয়তো হাত দিয়ে কষ্ট না দিলেও মুখের কথা দ্বারা অন্যকে কষ্ট দিয়ে বসে, কখনো বা বিনয় প্রদর্শনের পরিবর্তে অহংকার প্রদর্শন করে বসে। হুযুর (আই.) বলেন, আমি দেখেছি যে কাযা বোর্ডের কোন কোন মামলার ক্ষেত্রে এমন সব মিথ্যার ঘটনা ঘটে যে আশ্চর্য হতে হয়। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সত্যপরায়ণতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত অর্জনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে উকিলরা নিজেদের যোগ্যতা প্রদর্শন করতে গিয়ে এমন সব কথা বলে বসে যা মিথ্যার পর্যায়ে পড়ে, আর এভাবে তাদের কারণে মামলা দীর্ঘায়িত হতে থাকে। হুযুর আহমদী উকিলদের ও বিবদমান পক্ষদের এই নির্দেশনা প্রদান করেন যে তারা যেন বয়আতের অঙ্গীকার ও খোদাভীতিকে নিজেদের ব্যক্তিগত লাভের উপর প্রাধান্য প্রদান করে।

হুযুর (আই.) বলেন, যদিও কাযা বোর্ড রয়েছে যেন সমস্যাদি সমাধান করা যায়, কিন্তু চেষ্টা করা উচিত যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি দৃষ্টি রেখে নিজের পক্ষ থেকে ছাড় দিয়ে হলেও মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে চলা। এর পরিবর্তে যদি মামলার ক্ষেত্রে অযথা জেদ ধরা হয় এবং অপর পক্ষকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেয়ার মন-মানসিকতা থাকে, তাহলে কাযা বোর্ডই হোক বা অন্য কোন আদালতই হোক, কখনোই কোন সমাধান হবে না। অনেক সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার খাতিরে নিজের ন্যায্য অধিকারও ছেড়ে দিতে হয়। হুযুর (আই.) সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াত উদ্ধৃত করে তার ব্যাখ্যা প্রদান করে বলেন যে এরূপ জেদ করার বদলে ভাবা উচিত যে আমরাও তো এমন পরিস্থিতির শিকার হতে পারি, আল্লাহ্ যদি আমাদের ধৃত করেন তবে তো আমাদের নিস্তার পাওয়া অসম্ভব, তাই আমাদের নমনীয় হওয়া উচিত। হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে যে যারা পৃথিবীতে দয়ার্দ্র ও ক্ষমাশীল, পরকালে আল্লাহ্ তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও ক্ষমাশীল হবেন। ঋণের ব্যাপারেও হাদীসে আছে যে ঋণদাতা যদি নির্দিষ্ট সময়ের পরও ঋণ আদায়ের জন্য সময় দেয় তবে প্রতিটি দিন তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।

হুযুর (আই.) বলেন, অনেক সময় কাযা বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরও বিবদমান পক্ষদ্বয়ের কোন পক্ষ জেদ ধরে ও আমাকে লিখে বসে যে বিচার সুষ্ঠু হয় নি, আপনি বিষয়টি দেখে সুবিচার করুন। এমনকি হুযুর (আই.) দেখেও যখন সিদ্ধান্ত প্রদান করে দেন তার পরও চরম হঠকারিতা দেখিয়ে কোন এক পক্ষ এর তিন-চার মাস পরই আবারও লিখে বসে যে আমরাই সত্যের উপর রয়েছি, রায় পুনর্বিবেচনা করুন। হুযুর (আই.) বলেন, আমি একথা বলছি না যে কাযা বোর্ডের সিদ্ধান্ত শতভাগই ঠিক হয়, কিন্তু শতকরা আশি-পঁচাশি ভাগ ক্ষেত্রেই তা সঠিক হয়ে থাকে, আর তারা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মিমাংসা প্রদান করে থাকেন। কিন্তু যদি ভুল করেও থাকে, তবে তা অসদুদ্দেশ্যে নয়; এক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই সৎ হয়ে থাকে। তাই তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা ঠিক নয় যে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এরূপ করেছেন।

হুযুর (আই.) বলেন, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কাযা বোর্ডে আসা মোকদ্দমাগুলো আর্থিক লেন-দেন সংক্রান্তই হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সর্বদা সহজসাধ্যতা সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। হুযুর (আই.) হাদীস থেকে হযরত আবু কাতাদার একটি ঘটনা উল্লেখ করেন যে এক ব্যক্তি তার কাছে থেকে ঋণ নেয়, কিন্তু চরম আর্থিক দুরাবস্থার কারণে ঋণ আদায়ে অপারগ ছিল। যখন আবু কাতাদা জানতে পারেন যে ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে ফাঁকি দিচ্ছে না বরং প্রকৃতই অপারগতা রয়েছে, তখন তিনি তার সব ঋণ মওকুফ করে দেন। মহানবী (সা.)-ও বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের জন্য সহজসাধ্যতা সৃষ্টি করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার জন্য সহজসাধ্যতা সৃষ্টি করবেন। কিন্তু ইসলাম কেবল এক পক্ষকেই সদাচরণ শেখায় না, বরং উভয় পক্ষকেই সদাচরণ শেখায়। ঋণগ্রহীতার জন্যও ইসলামে এই শিক্ষা রয়েছে যে যদি ঋণগ্রহীতা স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও ঋণ আদায় না করে তবে জোরপূর্বক তার থেকে তা আদায় করতে হবে, নতুবা সে এরূপ অন্যায়ে ধৃষ্ট হয়ে উঠবে এবং সমাজে অন্যায় ছড়িয়ে পড়বে। মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, যদি কেউ এই উদ্দেশ্যে ঋণ নেয় যে সে তা ফেরত দিবে না, তবে আল্লাহ্ তার সেই সম্পদ ধ্বংস করে দেন। মহানবী (সা.) ঋণী ব্যক্তির জানাযা পড়াতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ঋণ আদায় বা মওকুফ করা না হতো। তিনি (সা.) এই দোয়াও করতেন যে ‘হে আল্লাহ্! আমি পাপ ও ঋণ থেকে তোমার আশ্রয় চাই’। তিনি (সা.) ঋণ ও কুফরকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। হুযুর (আই.)-ও বলেন যে কাযা বোর্ডের এই অধিকার নেই যে ঋণগ্রহীতাকে ছেড়ে দেয়, বরং ঋণ আদায়ের ব্যাপারেই ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসাথে হুযুর (আই.) এটিও বলেন, যারা ব্যবসার জন্য ঋণ দেন তাদেরও ঋণ প্রদানের আগে ভেবে-চিন্তে দেয়া উচিত যে সঠিক স্থান-পাত্র অনুসারে ঋণ দিচ্ছেন কি-না।

খুতবার শেষদিকে হুযুর (আই.) দোয়া করেন যে আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে নিজ জীবনে প্রকৃত মুমিনসুলভ অবস্থা সৃষ্টির তৌফিক দিন, এক শান্তিপূর্ণ সমাজ যেন আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, আর সেই উন্নত চরিত্র যা মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের কাছ থেকে আশা করেন, যার উল্লেখ কুরআন শরীফেও রয়েছে ও মহানবী (সা.)-ও যেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তা যেন আমরা অর্জন করতে পারি। আমীন, সুম্মা আমীন

Top