শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ - নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীগণ: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

রোজ শুক্রবার, ৭ই মে, ২০২১ইং

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

এই জুমু’আর খুতবার সারাংশটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তার দায়ভার আহ্‌মদীয়া বাংলা টীম গ্রহণ করছে।

আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্‌ হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) গত ৭ই মে, ২০২১ইং ইসলামাবাদের মসজিদে মুবারকে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় পূর্বের ধারা অনুসরণে নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীদের বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। এ খুতবায় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)’র স্মৃতিচারণ করেন এবং বিগত খুতবার মত আজও দোয়ার গুরুত্বের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন।

তাশাহহুদ, তাআ’ব্বুয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর (আই.) বলেন, হযরত উমর (রা.)’র স্মৃতিচারণ করা হচ্ছিল এবং তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিল। হযরত উমর (রা.)’র ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)’র একটি বর্ণনা হুযূর (আই.) উদ্ধৃত করেন। তিনি লিখেন, হযরত উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগ পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে ইসলামের শত্রুতা করে যাচ্ছিলেন। একদিন তার মনে এই ধারণার উদ্রেক হয় যে, এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে শেষ করে দিলেই তো সমস্যা মিটে যায়। এই ভেবে তিনি নগ্ন তরবারি হাতে মহানবী (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। পথিমধ্যে কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে স্বীয় অভিপ্রায়ের কথা জানান। সেই ব্যক্তি তাকে প্রথমে নিজের বাড়ির খোঁজ নিতে বলেন, অর্থাৎ তার বোন ও ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে খোঁজ নিতে বলেন। উমর (রা.) তখন বোনের বাড়ি যান। গিয়ে দেখেন, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ এবং ভেতরে কেউ কুরআন পড়ছে। উমর (রা.)’র শব্দ পেয়ে যে সাহাবী কুরআন শেখাতে এসেছিলেন তিনি লুকিয়ে পড়েন এবং কুরআনের পৃষ্ঠাগুলোও লুকিয়ে ফেলা হয়। উমর (রা.) দরজা খুলতে দেরি হবার কারণ জিজ্ঞেস করেন ও নিজের সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ভগ্নিপতিকে আঘাত করার জন্য উদ্যত হন; ইতোমধ্যে তার বোন স্বামীকে বাঁচানোর জন্য মাঝখানে চলে আসায় আঘাত তার গায়ে লাগে এবং তার নাক ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। এটি দেখে উমর (রা.) খুব লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন; অনুতাপ থেকেই প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য তিনি কুরআনের পৃষ্ঠাগুলো দেখতে চান। বোন তাকে গোসল করে পবিত্র হয়ে আসতে বলেন; তিনি তা-ই করেন। যখন তিনি (রা.) আল্লাহ্‌র বাণী পড়েন, তখন তার হৃদয় বিগলিত হয় এবং তার মুখ থেকে অবলীলায় কলেমা উচ্চারিত হয়। অতঃপর তিনি মহানবী (সা.)-এর খোঁজে দ্বারে আরকামে যান। উমর (রা.) সেখানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলে অন্য সাহাবীরা বিপদের আশংকায় তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিতে সম্মত হচ্ছিলেন না; কিন্তু হযরত হামযাহ্ (রা.) দরজা খুলে দিতে বলেন এবং বলেন, উমর কোন সমস্যা করতে চাইলে তিনি সামলাবেন। উমর (রা.) ভেতরে প্রবেশ করলে মহানবী (সা.) তাকে বলেন, ‘উমর, তুমি আর কত বিরোধিতা করবে?’ হযরত উমর (রা.) তখন বলেন, ‘হে আল্লাহ্‌র রসূল! আমি তো বিরোধিতা করতে আসি নি, আপনার দাস হতে এসেছি!’ যে উমর খানিক আগেও ইসলামের চরম বিরোধী ছিলেন এবং মহানবী (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, এক নিমেষেই তিনি এক উন্নত মু’মিনে পরিণত হন! মুসলেহ্ মওউদ (রা.) এ-ও লিখেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে দু’জন ব্যক্তি শুধু মুসলমানদের মধ্যে ছিলেন, যাদেরকে অত্যন্ত বীর ও দুঃসাহসী গণ্য করা হতো; একজন হলেন হযরত উমর (রা.) আর অপরজন হযরত আমীর হামযাহ্ (রা.)। এরা দু’জন মুসলমান হওয়ার পর মহানবী (সা.)-এর কাছে আবেদন করেন যেন মুসলমানরা প্রকাশ্যে কা’বা চত্বরে গিয়ে নামায পড়েন; তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) সাহাবীদের নিয়ে কা’বা চত্বরে প্রকাশ্যে নামায পড়েন। যাওয়ার সময় মহানবী (সা.)-এর দু’পাশে তারা দু’জন উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে এগিয়েছিলেন।

হযরত উমর (রা.)’র ইসলাম গ্রহণের সংবাদ কুরাইশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে। হযরত উমর (রা.) বাইরে এলে সেখানে লোকজনের জটলা সৃষ্টি হয়, কুরাইশদের কেউ কেউ তাঁর ওপর আক্রমণ করতেও উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু হযরত উমর (রা.)ও তাদের সামনে বুক চিতিয়ে পাল্টা জবাব দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় সেখানে মক্কার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত নেতা আ’স বিন উওয়ায়েল উপস্থিত হয় ও জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে?’ সবাই বলে যে উমর ‘সাবী’ হয়ে গিয়েছে অর্থাৎ পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগ করেছে। আ’স পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বলে, ‘তাতে কী হয়েছে? আমি তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি।’ আরবের প্রথা অনুসারে তখন সবাই রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়। এ ঘটনার পর কয়েকদিন পর্যন্ত হযরত উমর (রা.) নির্বিঘ্নেই থাকেন, কারণ আ’সকে মক্কার সবাই মান্য করতো। কিন্তু ইসলামের জন্য হযরত উমর (রা.)’র আত্মাভিমান এটি সহ্য করতে পারছিল না যে, অন্য মুসলমানরা মার খাবে আর তিনি নিরাপদে থাকবেন, তিনি আ’সের কাছে গিয়ে তার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেন। এরপর হযরত উমর (রা.) নিয়মিত মক্কার অলিতে-গলিতে মার খেতে থাকেন ও পাল্টা জবাব দিতে থাকেন; কিন্তু তিনি কখনও শত্রুদের সামনে মাথা নিচু করেন নি। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) এই ঘটনা থেকে মহানবী (সা.)-এর পবিত্রকরণ শক্তির প্রতিও ইঙ্গিত করেন যে, যারা মহানবী (সা.)-এর চরম শত্রু ছিল, ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের মাঝে রাতারাতি কীরূপ আশ্চর্য পরিবর্তন সৃষ্টি হয়েছিল যে তাদেরকে চেনাও দুষ্কর হয়ে পড়ে। যে উমর ইসলাম ও মুসলমানদের বিনাশ করার চিন্তায় মগ্ন থাকতেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি-ই ধর্মের খাতিরে নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে ভয় পান নি, আর দিন-রাত ইসলামের সেবায় মগ্ন হয়ে পড়েন।

হযরত উমর (রা.)’র ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তিনটি উদ্ধৃতি হুযূর (আই.) খুতবায় উপস্থাপন করেন; তিনটি বর্ণনা প্রায় একই ধাঁচের। একটি উদ্ধৃতি ১৯০১ সালের জানুয়ারি মাসের, একটি ১৯০২ সালের আগস্ট মাসের ও আরেকটি ১৯০৭ সালের জুন মাসের। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যা বলেন তার সারমর্ম হল, হযরত উমর (রা.)-কে দেখলে বুঝা যায় যে, ইসলাম গ্রহণের ফলে কী লাভ হয়। এমন এক যুগ ছিল যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নি এবং ঈমান আনতে তাঁর চার বছর বিলম্ব হয়ে যায়। এর অন্তর্নিহিত রহস্য আল্লাহ্ তা’লা খুব ভালো জানতেন। আবু জাহল এমন কাউকে খুঁজছিল যে মহানবী (সা.)-কে হত্যা করবে। উমর (রা.) যেহেতু তখন খুব দুঃসাহসী গণ্য হতেন, তাই তাঁর প্রতি এই দায়িত্ব ন্যস্ত হয় এবং হযরত উমর ও আবু জাহলের মধ্যে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। আল্লাহ্ তা’লার কী লীলা! যেই উমর (রা.) একদা মহানবী (সা.)-কে হত্যার সংকল্প নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, পরবর্তীতে তিনি-ই ইসলামের জন্য নিজের প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি!

হযরত উমর (রা.) উপযুক্ত সুযোগের সন্ধানে রাতের বেলা ঘুরে বেড়াতেন যাতে মহানবী (সা.)-কে একা পেলেই হত্যা করতে পারেন। যখন তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, মহানবী (সা.) মাঝরাতের পর কা’বা চত্বরে গিয়ে নামায পড়েন, তখন তিনি খুশি হয়ে তাঁকে (সা.) হত্যার উদ্দেশ্যে রাতের বেলা কা’বার কাছে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন। খানিক পরেই মহানবী (সা.) উপস্থিত হন। উমর ঠিক করেছিলেন, যখন মহানবী (সা.) সিজদারত থাকবেন, তখন তিনি তরবারি দিয়ে তাঁর (সা.) শিরোচ্ছেদ করবেন। কিন্তু সিজদায় গিয়ে তিনি (সা.) এত প্রবল ক্রন্দন ও আহাজারির সাথে দোয়া করতে থাকেন যে, উমর কেঁপে ওঠেন। ‘সাজাদা লাকা রূহী ওয়া জানানী’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রভু, আমার আত্মা, আমার হৃদয় সবই তোমার দরবারে প্রণত!’- মহানবী (সা.)-এর এই দোয়া শুনে হযরত উমরের বুক যেন ফেটে যাচ্ছিল, তার হাত থেকে তরবারি পড়ে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, মহানবী (সা.) সত্য রসূল। কিন্তু মহানবী (সা.) যখন নামায শেষে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন পুনরায় ‘নাফসে আম্মারা’ বা কুপ্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে উমর তাঁকে অনুসরণ শুরু করেন। পায়ের শব্দ শুনে মহানবী (সা.) তার অস্তিত্ব টের পান এবং বলেন, ‘হে উমর, তুমি দিন-রাত আমার পেছনে লেগে থাক!’ উমর ভয় পেয়ে যান এই ভেবে যে, মহানবী (সা.) তার বিরুদ্ধে হয়তো দোয়া করতে পারেন, তাই তিনি মহানবী (সা.)-কে বদদোয়া না করতে অনুরোধ করেন। সেসময় প্রথম হযরত উমর (রা.)’র হৃদয়ে ইসলামের সত্যতা আসন গেড়েছিল, অবশেষে তিনি ইসলাম গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। হুযূর (আই.) অপর দু’টি উদ্ধৃতিও উপস্থাপন করেন এবং বলেন, তিনটি বর্ণনাতেই রাতের বেলা কা’বা চত্বরে আক্রমণ-চেষ্টার উল্লেখ রয়েছে। খুব সম্ভব এই ঘটনার পর দিনের বেলা আবার হযরত উমর (রা.) শয়তানি কুমন্ত্রণার কারণে ইসলাম গ্রহণে বিরত থাকেন, অবশেষে সেদিন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন যেদিন তাঁর বোনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। হযরত উমর (রা.) মূলতঃ আবু জাহলের উস্কানিতেই মহানবী (সা.)-কে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, আবু জাহলকে ফেরাউন বলা হয়, কিন্তু তাঁর (আ.) মতে সে আসলে ফেরাউনের চেয়েও জঘন্য ছিল; ফেরাউন তো শেষ মুহূর্তে ঈমান এনেছিল বলে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু আবু জাহল অন্তিম মুহূর্তেও ঈমান আনে নি। হযরত উমর (রা.) ও তার নাম একই ছিল, দু’জনই মক্কার বাসিন্দা ছিল, কিন্তু ঐশী প্রজ্ঞা এক উমরকে ইসলামের দিকে টেনে আনে আর অপরজন দুর্ভাগাই থেকে যায়। একজন তার হঠকারিতা থেকে বিরত না হওয়ায় জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়, অন্যজন হঠকারিতা পরিত্যাগের ফলে বাদশায় পরিণত হন।

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন মহানবী (সা.) তার জন্য একটি দোয়া করে তিনবার তার বুকে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। মহানবী (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ্, তার হৃদয়ে যে বিদ্বেষই রয়েছে, তা দূর করে দাও এবং তা ঈমান দিয়ে বদলে দাও।’ ইসলাম গ্রহণের পর উমর (রা.) আবু জাহলসহ সবার কাছে এই সংবাদ পৌঁছে দেন বা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। হুযূর (আই.) ইসলাম গ্রহণের পর হযরত উমর (রা.)-কে মক্কাবাসীদের যেসব অত্যাচার সইতে হয়েছিল, সে সংক্রান্ত কিছু বর্ণনাও উদ্ধৃত করেন।

হযরত উমর (রা.) একবার মহানবী (সা.)-কে বলেছিলেন, তিনি নিজের প্রাণের পরই সবচেয়ে বেশি রসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে ভালোবাসেন; একথা শুনে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মহানবী (সা.) তার নিজের প্রাণের চেয়েও তার কাছে অধিক প্রিয় না হবেন, ততক্ষণ তার ঈমান পূর্ণ হবে না। হযরত উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ নিবেদন করেন, ‘আল্লাহ্‌র কসম! এখন তো আপনি আমার কাছে আমার নিজের প্রাণের চাইতেও বেশি প্রিয়!’ হুযূর (আই.) বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা।

হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস হযরত আলী (রা.)’র বরাতে বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) একমাত্র ব্যক্তি, যিনি তাঁর মদীনায় হিজরতের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন। হুযূর (আই.) এ সংক্রান্ত বর্ণনা উপস্থাপন করে বলেন, হযরত উমর (রা.)’র প্রকাশ্যে হিজরতের বিষয়ে হযরত আলী (রা.)’র এই একটি বর্ণনাই রয়েছে। কিন্তু জীবনীকাররা এটি নিয়ে বিতর্ক করেছেন, কারণ মহানবী (সা.) গোপনে হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, হযরত উমর (রা.) সেই নির্দেশ অমান্য করবেন বলে মনে হয় না। তাছাড়া ইবনে সা’দ ও ইবনে হিশাম সংকলিত ইতিহাসগ্রন্থে লিখিত আছে, হযরত উমর (রা.) গোপনে হিজরত করেছিলেন। হুযূর (আই.) বর্ণনাগুলোর মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্যও বিধান করেন যে, হতে পারে প্রথমে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু তখন হিজরত করেন নি, আর পরবর্তীতে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুযায়ী গোপনেই হিজরত করেছিলেন।

হযরত বারা বিন আযেব (রা.)’র বর্ণনামতে মদীনায় প্রথম মুহাজির ছিলেন হযরত মুসআব বিন উমায়ের (রা.), দ্বিতীয় হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.); এরপর হযরত উমর (রা.) বিশজন সাহাবীসহ আসেন। এই দলটির পরই মহানবী (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) আসেন। হযরত উমর (রা.) হিজরতের সময় কুবায় হযরত রিফা বিন আব্দুল মুনযের-এর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। হযরত উমর (রা.)’র ধর্মভাই সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। এক বর্ণনামতে মক্কায় মহানবী (সা.) তার ও হযরত আবু বকর (রা.)’র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন; হিজরতের পর মদীনায় তার সাথে হযরত উওয়ায়েম বিন সায়েদার ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন, অপর কতক বর্ণনায় হযরত ইতবান বিন মালেক ও মুআয বিন আফরার নামও এসেছে। সাহেবযাদা মির্যা বশীর আহমদ সাহেব (রা.)’র মতে তার ভ্রাতৃত্ব হযরত ইতবান বিন মালেক (রা.)’র সাথে হয়েছিল।

আযানের প্রচলনের ঘটনাতেও হযরত উমর (রা.)’র বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন যায়েদকে স্বপ্নে একজন ফিরিশ্তা আযানের বাক্যগুলো শিখিয়েছিলেন এবং মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে তিনি হযরত বেলাল (রা.)-কে তা শিখিয়ে দেন। হযরত বেলাল (রা.) যখন সেই অনুযায়ী আযান দেন, তখন হযরত উমর (রা.) তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসেন এবং আল্লাহ্‌র কসম খেয়ে বলেন, তিনিও অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছেন। হযরত উমর (রা.)’র স্মৃতিচারণ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে হুযূর (আই.) জানান।

খুতবার শেষদিকে হুযূর (আই.) সংক্ষেপে এই বিষয়ের প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন যে, আজ রমযানের শেষ জুমুআ; এটিকে যেন আমরা শুধু রমযানের শেষ জুমুআ হিসেবেই গণ্য না করি, বরং তা যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক হয়। রমযানে যেসব বিষয়ের প্রতি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ হয়েছে এবং যেসব পুণ্যের চর্চা করতে আমরা সক্ষম হয়েছি, রমযানের পরও আমাদেরকে সেগুলো অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে হবে, বরং তাতে আরও উন্নতি সাধন করতে হবে। যদি আমরা পুণ্য ও পবিত্র পরিবর্তনকে ধরে না রাখি এবং এতে উন্নতি না করি, তাহলে আমাদের রমযান অতিবাহিত করা অর্থহীন। বিগত খুতবায় উল্লিখিত দরূদ ও ইস্তেগফারের বিষয়ে হুযূর বলেন, এগুলো যেন কেবল রমযানেই সীমাবদ্ধ না থাকে, রমযানের পরও যেন এর ধারা অব্যাহত থাকে। বর্তমান যুগে দাজ্জালের চাতুর্য নতুন নতুন পন্থা ব্যবহার করছে, পার্থিব চাকচিক্য অধিকাংশ মানুষকে গ্রাস করে রেখেছে। আমাদের যুবক ও শিশুরাও মাঝে মাঝে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় এর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নিজেদের জন্যও দোয়া করা প্রয়োজন, সেইসাথে নিজেদের সন্তানদেরকেও নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করে, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রচনা করে তাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার অস্তিত্ব ও ইসলামের অনিন্দ্য-সুন্দর শিক্ষামালা সম্পর্কে অবগত করা প্রয়োজন। আর তাদের হৃদয়ে পূর্ণ বিশ্বাস সৃষ্টি করিয়ে আল্লাহ্ তা’লার সাথে তাদের এমন দৃঢ় বন্ধন রচনা করাতে হবে যেন তাদের কোন কথা, কাজ বা চিন্তা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি পরিপন্থী না হয়। পার্থিব প্রতিটি বিশৃঙ্খলার জবাব যেন তাদের জানা থাকে; এমনটি যেন না হয় যে তারা কোন কোন বিষয়ের উত্তর না পেয়ে অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এটিই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার এবং বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা থেকে তাদের রক্ষার উপায় ও সঠিক পন্থা। কিন্তু এটি ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ আমরা নিজেরা ঈমান ও বিশ্বাসের উন্নত মার্গে উপনীত না হব। এটি তখন সম্ভব হবে, যখন আল্লাহ্ তা’লার সাথে আমাদের সম্পর্ক নিবিড় হবে; আমাদের নামায ও ইবাদত আদর্শস্থানীয় হবে, যখন আমরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মান্য করার ফলে আমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব অনুধাবন করতে পারব। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যা আমাদের স্কন্ধে ন্যস্ত হয়েছে- অর্থাৎ নিজেদের ঈমানকে দৃঢ় করে, নিজেদের কর্মের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রেখে- নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। বর্তমানে অশ্লীলতা যতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা আর কোন যুগে ছিল কি-না সন্দেহ। প্রতিটি বাড়িতেই টিভি, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে অশ্লীলতার উপকরণ পৌঁছে গিয়েছে; বাচ্চারা চুপচাপ বসে কী করছে বা দেখছে তা বুঝাও যায় না। তাই আমাদের অনেক বেশি সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। যদি আমরা ধর্মকে পার্থিবতার ওপর প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের অবস্থার প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখি, কেবল তবেই আমরা নিজেদেরকেও নিরাপদ রাখতে পারব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও নিরাপদ রাখতে পারব। অন্যথায় অনেক বড় বুযুর্গের বংশধররাও এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে না যে, বুযুর্গদের পুণ্যকর্মের কারণে তারাও আল্লাহ্‌র কৃপাবারি লাভ করতে থাকবে বা আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রত্যেকের নিজের কর্ম প্রয়োজন। সন্তানদের পার্থিব উন্নতির জন্য তো আমরা অনেক দোয়া করি; পার্থিবতার চেয়ে ধার্মিকতার ক্ষেত্রে তাদের উন্নতির জন্য আরও অনেক বেশি দোয়া করা প্রয়োজন।

হুযূর (আই.) বলেন, রমযানের অবশিষ্ট এই দিনগুলোতে অনেক বেশি দোয়া করুন, আল্লাহ্ তা’লা আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধর্মকে যেন নিরাপদ রাখেন, আমাদের যেন আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে, রমযানের পরও আমাদের ইবাদতের মান উন্নত থেকে উন্নততর হয়, খোদা তা’লার সাথে আমাদের দৃঢ় বন্ধন রচিত হয়, দাজ্জালের প্রতারণা থেকে আমরা নিরাপদ থাকি, কেবল পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্য যেন আমাদের জীবনের লক্ষ্য না হয়, বরং আল্লাহ্ যেন আমাদের সেসব পার্থিব ও ধর্মীয় কল্যাণরাজি দান করেন যা আমাদেরকে তাঁর কৃতজ্ঞ, একনিষ্ঠ ও তাঁর প্রতি বিনত বান্দায় পরিণত করে। হুযূর (আই.) করোনা মহামারী থেকে বিশ্ববাসীর মুক্তিলাভের জন্য এবং যেসব দেশে আহমদীরা কষ্টের সম্মুখীন, তাদের কষ্ট দূরীভূত হওয়ার জন্যও দোয়া করার আহ্বান জানান। হুযূর (আই.) ‘রাব্বি কুল্লু শাইয়্যিন খাদিমুকা- রাব্বি ফাহ্ফাযনী ওয়ানসুরনী ওয়ারহামনী’ এবং ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফি নুহূরিহিম ওয়া নাঊযুবিকা মিন শুরুরিহিম’ দোয়া দু’টি পড়ার প্রতিও সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন; সেইসাথে এ-ও বলেন, যদি আমরা আমাদের নামায সুন্দরভাবে ও মনোযোগের সাথে না পড়ি তাহলে কেবল মৌখিক দোয়া কোন উপকারে আসবে না। হুযূর (আই.) একটি বিশেষ নীতিও মনে করিয়ে দেন যে, আমরা আমাদের দোয়ার গণ্ডি যত বিস্তৃত করব, ততই আমরা আল্লাহ্ তা’লার কৃপাবারি লাভ করব। এজন্য প্রত্যেক আহমদীরই অন্য আহমদীদের বিপদাপদ দূর হওয়ার জন্য দোয়া করা উচিত; এর মাধ্যমে নিজেদের অজান্তেই পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। হুযূর (আই.) সামগ্রিকভাবে মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্যও এবং সমগ্র মানবজাতির জন্যও দোয়া করার আহ্বান জানান; আমাদের কাজই হল দোয়া করা- রমযান মাসেও এবং এর পরেও, আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে এর তৌফিক দান করুন। (আমীন)

Top