স্পষ্টভাষায় ইসলামের বাণী প্রচার - জুমুআর খুতবা । Conveying The True Teachings of Islam - Friday Sermon

স্পষ্টভাষায় ইসলামের বাণী প্রচার

রোজ শুক্রবার, ২১শে এপ্রিল, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২১শে এপ্রিল, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার জার্মানীর ফ্রাঙ্কফোর্টে “স্পষ্টভাষায় ইসলামের বাণী প্রচার”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

আমাদের উপর আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহ যে আমরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মেনে তাঁর হাতে বয়আত করার সৌভাগ্য লাভ করেছি; এর ফলে একদিকে যেমন আমাদের ঈমানে সমৃদ্ধ হওয়া উচিত, অন্যদিকে কোন রকম হীনম্মন্যতা বা ভীরুতার শিকার না হয়ে সাহসের সাথে স্পষ্টভাষায় ইসলামের বাণী প্রচার করা উচিত। যদিও তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই তবলীগ-লিফলেট বিতরণ ইত্যাদিতে অনেক সক্রিয়, কিন্তু কখনো কখনো তাদের কারো কারো মাঝে এই মনোভাব লক্ষ্য করা যায় যে যেহেতু মুসলমানদের মাঝে অনেক নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা রয়েছে এবং এখানকার সমাজও এটিকে খুব নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে, তাই তাদের কাছে ইসলাম নিয়ে খুব আলোচনা না করাই ভাল। এরা হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে তবলীগ থেকে বিরত থাকে বা আচার-আচরণে ইসলাম প্রকাশ করতে চায় না। অথচ এসব নামধারী ওলামাদের এহেন কর্মকান্ডে তাদের মধ্যে তো আরও বেশি সৎসাহস সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল যে তারা জগতের সামনে এটি তুলে ধরে বলত- মহানবী (সা.) এই ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন যে মুসলমানদের এরূপ দুরাবস্থাই হবে, আর সেই যুগেই প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মাহদী আগমন করবেন ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরবেন; আর আমরা সেই প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মাহদীরই মান্যকারী।

হুযুর (আই.) বলেন, পাশ্চাত্যে এসে অনেকেই জাগতিকতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছে, ধর্মকে পার্থিবতার উপর প্রাধান্য দেয়ার মৌখিক দাবী করলেও তাদের কাজকর্ম এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়। এখানকার মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে তো উন্নত নৈতিক চরিত্র প্রদর্শনে যদিও আহমদীরা এগিয়ে আছে, কিন্তু ইবাদতের যে মানে একজন আহমদীর অধিষ্ঠিত থাকার কথা তার থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। আবার পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত মান অর্জনে ঘাটতি রয়েছে। অথচ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যে উদ্দেশ্যে জামা’ত প্রতিষ্ঠা করেছেন তা কেবল বিশ্বাসগত দিক থেকে সংশোধনের জন্য নয়, বরং সব পর্যায়ে ও সবদিক থেকে ব্যবহারিক সংশোধনপ্রাপ্ত জামা’ত গঠন করার জন্য তা তিনি করেছেন। তাই আমাদের প্রত্যেকের এদিক থেকে নিজেদের আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত যে আমরা এই অর্জনের জন্য চেষ্টা করছি কি-না। তাছাড়া জামা’ত যেভাবে পরিচিতি লাভ করছে তার ফলে মানুষের শ্যেণদৃষ্টিও আমাদের উপর বৃদ্ধি পাচ্ছে যে আমাদের ব্যবহারিক অবস্থা কেমন। তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজ ব্যবহারিক অবস্থাকে সংশোধন করা এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়আত করার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে পূর্ণ করা আবশ্যক।

এরপর হুযুর (আই.) সম্প্রতি জার্মানিতে বিভিন্ন মসজিদ উদ্বোধন বা মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বরাতে উপস্থিত অতিথিদের ব্যক্ত করা অনুভূতির কথা উল্লেখ করেন এবং এর প্রেক্ষিতে এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, আল্লাহ্‌র ফযলে এখানকার স্থানীয়রা আহমদীদের সম্বন্ধে অত্যন্ত সুধারণা রাখেন; কিন্তু এটিও সত্য যে তাদের নিকট প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা যেভাবে ছড়িয়ে দেয়া উচিত ছিল, সেভাবে তা ছড়ানো হয়নি। হুযুর (আই.) কিছু উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, অনেক অতিথি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে যদিও আমাদের অনুষ্ঠানে এসেছেন, কিন্তু তারা জামা’ত সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন। আর যখন তাদের কাছে জামা’তের প্রকৃত পরিচয় ও খাঁটি ইসলামী শিক্ষা তুলে ধরা হয় তখন তারা এই মন্তব্য করেছে যে, তারা এমনটি প্রথমবার শুনছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী দর্শন বিষয়ের অধ্যাপককে হুযুর (আই.) প্রশ্ন করে জানতে পারেন, তিনি মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ‘ইসলামী নীতিদর্শন’ বইটি সম্পর্কে জানেন না, অথচ এই অধ্যাপক জামা’তের ন্যাশনাল সেক্রেটারী ইশায়াতের আমন্ত্রণে এসেছিলেন।

হুযুর (আই.) বলেন, এসকল অতিথিদের সাথে অবশ্যই যোগাযোগের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে এবং তাদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছেন, সেসব সম্পর্কে অবগত করতে হবে। শিক্ষিত লোকদের সাথে যখনই পরিচয় হয়, তাদেরকে ‘ইসলামী নীতিদর্শন’ বইটি অবশ্যই পড়তে দেয়া উচিত। অন্য মুসলমানদের সাথে আমাদের পার্থক্যটি এখানেই যে আমরা যুগের মসীহ্‌কে মান্য করার কারণে তাঁর কাছে থেকে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা ও এর দর্শন শিখতে পেরেছি, যা অন্য মুসলমানরা লাভ করেনি। আর এই কারণেই বাহ্যত তাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার মানুষ আমাদের ব্যাপারে সুধারণা রাখে। তাই ইসলামের এই সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও ইতিবাচক শিক্ষা তাদের সামনে উপস্থাপন করা আমাদের আবশ্যক দায়িত্ব। এই কাজে কোন হীনম্মন্যতায় ভোগার সুযোগ নেই।

হুযুর (আই.) বলেন, অনেকের মাথায় এই পোকা থাকে যে উম্মতের বিগত আলেম ও বুযুর্গদের বই-পুস্তক পড়লেই জ্ঞানী হওয়া যায় বা সেগুলো পড়াই যথেষ্ট; এমন চিন্তাধারার ব্যক্তিদেরকে মাথা থেকে এই পোকা ঝেড়ে ফেলতে হবে। হুযুর (আই.) বলেন, মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে মসীহ্ মওউদ (আ.) এই যুগের জন্য হাকাম ও আদাল, অর্থাৎ ন্যায়বিচারক ও মীমাংসাকারী। তাই, এখন তিনিই কেবল সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, তাঁর বই থেকে লাভ করা জ্ঞানের ভিত্তিতে লেখা তাফসীরই প্রকৃত তাফসীর। অতএব, এখন মসীহ্ মওউদের বই না পড়ে কেউ আলেম হতে পারবে না। আর তাঁকে হাকাম ও আদাল মানার পর তাঁর (আ.) সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মনে কোনরূপ সন্দেহ-সংশয় পোষণ করা মহা পাপের কারণ হবে। হুযুর (আই.) বলেন, আমাদের নিজেদেরও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বই থেকে জ্ঞান বৃদ্ধি করা উচিত, আর অন্যদেরকেও তা পড়তে দেয়া উচিত যেন প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার প্রচার হয়। আর একথা ভেবে হীনম্মন্যতায় ভোগা উচিত নয় যে, হয়তো অনেক কথার উত্তর নেই; আসলে ইসলামে সব প্রশ্নেরই উত্তর আছে, কিন্তু তা জানার জন্য বই-পুস্তক পাঠ করতে হবে।

খুতবার শেষদিকে হুযুর (আই.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতির আলোকে আমাদের কেমন হওয়া উচিত এবং বয়আতের সুবাদে আমাদের উপর কী দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তা তুলে ধরেন। এ প্রেক্ষিতে অনেকগুলো বিষয় হুযুর (আই.) সংক্ষেপে তুলে ধরেন। শেষে হুযুর (আই.) দোয়া করেন যে আল্লাহ্ তা’লা যেন এসব নির্দেশনা পালন করতে পারি এবং প্রকৃতপক্ষে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়আত করার দায়িত্ব পালন করতে পারি। আমীন।

Top