In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

লাহোরের শহীদদের বিবরণ: ৪

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২রা জুলাই, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আজও ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের নির্দয় আক্রমনে লাহোরস্থ আহমদীয়া মসজিদে নির্মমভাবে নিহত শহীদদের স্মৃতিচারণ করবো। আজকের তালিকায় সর্বপ্রথম হলেন, শহীদ জনাব আব্দুর রহমান সাহেব-এর নাম। তাঁর পিতার নাম জনাব জাভেদ আসলাম সাহেব। শহীদ মরহুম ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে তাঁর মা, খালা ও বোনের সাথে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। কৌশলগত কারণে পরিবারের অন্যদের কাছে আহমদীয়াত গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করেন নি। M.B.B.S. পাশ করার পর সবাইকে অবহিত করার ইচ্ছা রাখতেন। মাতৃকূলে নানা ব্যতীত অন্য সবাই আহমদী ছিলেন। তাঁর নানী মরহুমা সৈয়্যদা সাহেবা অত্যন্ত নিষ্ঠাবান আহমদী ছিলেন। তিনি বেহেশতী মকবেরায় সমাহিত আছেন। চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আহমদীয়াতের সাথে বিশ্বস্ততাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদতের সময় শহীদ মরহুমের বয়স হয়েছিল ২১ বছর। দুর্ঘটনার দিন তিনি কলেজ থেকে সরাসরি জুমুআর নামায পড়তে মসজিদে এসেছিলেন। আক্রমনের পর তিনি তাঁর মাকে ফোন করে বলেন, প্রচন্ড গোলাগুলি হচ্ছে, আপনি দুঃচিন্তা করবেন না। এরপর খালাতো ভাইকে ফোন করে বলেছেন, আমি শহীদ হলে আমাকে রাবওয়ায় কবর দিও। তাঁর ধারণা ছিল, আত্মীয়- স্বজনরা তাঁর লাশ রাবওয়ায় নিয়ে যেতে দিবে না। শহীদ মরহুমের শরীরে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়েছিল ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছেন।

এ দুর্ঘটনায় তাঁর পরিবারের আরো কয়েকজন সদ্যস্যও শহীদ হয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন, মালেক আব্দুর রশীদ সাহেব, মালেক আনসারুল হক সাহেব এবং মালেক যুবায়ের আহমদ সাহেব। দুর্ঘটনার পর তাঁর আহমদীয়াত গ্রহণের বিষয়টি জানাজানি হলে চরম বিরোধিতা শুরু হয়। তাঁর খালু, খালাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। জানাযা নিয়ে অনেক হৈচৈ হয়েছে। পরিবারের লোকজন শহীদের লাশ রাবওয়াহ্ নিতে বাঁধা দিলে তাঁর খালা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে বলেন, ‘মারা যাবার আগে সে ফোন করে বলেছিল, আমার মরদেহ রাবওয়া নিয়ে যেও; তাঁর ইচ্ছার প্রতি সম্মানার্থে আমরা জানাযা রাবওয়াতেই নিয়ে যাব’। শহীদ মরহুমের পিতা এখনো বয়’আত করেন নি। পূর্বে তাঁর আচরণ খুবই কঠোর ছিল কিন্তু এখন তুলনামূলক ভাবে কিছুটা নমনীয় হয়ে এসেছে।

হুযূর বলেন, শহীদ মরহুমের মা ছেলের শাহাদাতের পূর্বে স্বপ্নে দেখেন, ‘আমি (খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস) তাদের বাড়ি গিয়েছি’। তাঁর খালাতো ভাই স্বপ্নে দেখেছেন, ‘পাঁচজন খলীফার ছবি টাঙ্গানো আছে এবং একটি রাস্তা তৈরী হয়েছে যাতে লিখা রয়েছে, This is the right way (অর্থাৎ এটিই সঠিক পথ)’।

পড়াশুনা ও ধর্মের সেবার প্রতি শহীদ মরহুমের খুবই আগ্রহ ছিল। পড়াশুনা শেষ করার পর আর্ত মানবতার সেবায় নানীর নামে একটি ‘বৃদ্ধাশ্রম’ বানানোর ইচ্ছা ছিল। তাঁর মা দোয়ার আবেদন করে বলেছেন, বিরোধিতার মুখে আল্লাহ্ তা’লা যেন আমাদেরকে দৃঢ়তা দান করেন এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। চরম বিরোধিতার কারণে সমবেদনা জানানোর জন্য জামাতের প্রতিনিধি দল শহীদের বাড়ী পর্যন্ত যেতে পারে নি। শহীদ মরহুম নুতন আহমদী হওয়া সত্ত্বেও সত্যের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

শহীদ জনাব নিসার আহমদ সাহেব, পিতা - জনাব গোলাম রসূল সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ নারওয়াল জেলার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা হযরত মৌলভী মুহাম্মদ সাহেব হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন আর ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর। জনাব আশরাফ বিলাল সাহেবকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। সাধারণত তিনি ছেলে-মেয়েদের সাথে নিয়ে ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ জুমুআর নামায আদায় করেতেন। দুর্ঘটনার দিনও ছেলে-মেয়েদের সাথে এনেছিলেন। জুমুআর পূর্বে তিনি নিয়মিত সদকা দিতেন, সেদিনও সদকা দিয়েছেন। শাহাদাতের দশ দিন পূর্বে স্বপ্নে মরহুম পিতামাতার সাথে শহীদের সাক্ষাত হয়। তারা বলেন, ‘হে আমাদের সন্তান! তুমি আমাদের কাছে এসে বসো’। তাঁর স্ত্রী বলেন, তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নামায পড়তেন। ২৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি কখনো কঠোর ভাষায় কথা বলেন নি। দু’সন্তানকেই ওয়াক্‌ফে নও-এর বরকতময় তাহরীকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। শহীদ তাঁর পিতামাতার অনেক সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। মানবসেবার প্রেরণায় তিনি সমৃদ্ধ ছিলেন। জামাতের ব্যাপারে গভীর আত্মাভিমান রাখতেন। পিতৃকূলে তাঁরাই একমাত্র আহমদী পরিবার ছিল। একবার তাদের গ্রামে রাতের বেলা বিরোধীরা সভা করে এবং মাইক লাগিয়ে জামাতকে চরমভাবে গালমন্দ করতে থাকে। তিনি চুপিসারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সভাস্থলে যান এবং তাদেরকে কঠোর ভাবে বলেন, ‘বাজে কথা এবং হট্টোগোল বন্ধ কর। যদি কোন কথা বলতে হয় তবে আমাদের সাথে বসে কথা বল’। তাঁর বীরত্ব দেখে বিরোধীরা মাইক বন্ধ করে দেয়। বাড়ি ফেরার পর তাঁর স্ত্রী বলেন, ‘এতোগুলো বিরোধীর সামনে আপনি একাই চলে গেলেন! তারা যদি আপনাকে মারতো তাহলে কী হতো?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘বেশি হলে শহীদ হয়ে যেতাম। এর চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে? আমার পক্ষে মসীহ্ মওউদ (আ.) ও খলীফাদের সম্পর্কে মন্দ কথা সহ্য হচ্ছিল না’।

শহীদ জনাব ডাক্তার আসগর ইয়াকুব খাঁন সাহেব, পিতা - জনাব ডাক্তার মুহাম্মদ ইয়াকুব খাঁন সাহেব। তাঁর দাদা হযরত শেখ আব্দুর রশীদ খাঁন সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর নানা হযরত ডাক্তার মাহমুদ ইব্রাহীম সাহেব হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে সেবা করার সৌভাগ্য পেয়েছেন। শহীদ মরহুম ১৯৪৯ সালের ২৫ আগস্ট লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বায়োকেমেষ্ট্রিতে M.S.C করার পর M.B.B.S ডিগ্রী অর্জন করেন। ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। সাধারণত তিনি ‘কড়ক হাউজ’-এ জুমুআর নামায পড়তেন কিন্তু ঘটনার দিন দারুয্ যিক্‌র মসজিদে নামায পড়তে আসেন আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গেটের কাছে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে আরম্ভ করে। তাঁর বুকে ও পায়ে গুলি লাগে। বেশ কিছুক্ষণ তাঁর সংজ্ঞাও ছিল, কিন্তু হাসপাতাল নেয়ার সময় পথিমধ্যে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সহধর্মিণী বলেছেন, তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন সৃষ্টির সেবক ছিলেন। ধনী গরীবের মাঝে কখনো কোন পার্থক্য করতেন না, সবার সাথে একই ধরনের সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ করতেন। রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কোন সময় ছিল না, যখনই রোগী আসতো তিনি তার সেবা করতেন। আল্লাহ্ তাঁলা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন।

শহীদ জনাব মিয়া মুহাম্মদ সাঈদ র্দাদ সাহেব, পিতা - জনাব মিয়া মুহাম্মদ ইউসুফ সাহেব (রা.)। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ গুজরাতের অধিবাসী ছিলেন পরে কাদিয়ান স্থানান্তরিত হন। তাঁর পিতা ও দাদা হযরত হেদায়াতুল্লাহ্ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর পিতা দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। এছাড়া তিনি লাহোর জেলার নায়েব আমীরও ছিলেন। শহীদ মরহুম ১৯৩০ সালে গুজরাতে জন্মগ্রহণ করেন। মৌলভী ফাযেল করার পর তিনি B.A পাশ করেন, পরবর্তীতে ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকুরীতে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই ১৯৭০ সালে ম্যানেজার পদে থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। মরহুম শহীদ জীবনে ছয় বার হজ্জ্বব্রত পালন করেন এছাড়া বেশ কয়েকবার উমরাহ্ করারও সৌভাগ্য হয়েছে। বায়তুন্ নূর মসজিদে শাহাদত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। মসজিদে তিনি জেনারেল নাসের সাহেবের সাথে হুইল চেয়ারে বসেছিলেন। তাঁর শরীরে দু’টি গুলি বিদ্ধ হয় আর গুরুতর আহতাবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আড়াই ঘন্টা ধরে অস্ত্রোপচার হয়েছে, কিন্তু প্রাণ রক্ষা হয়নি। তাঁর স্ত্রী বলেন, তিনি অনেক বেশি দোয়া করতেন। কখনো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন নি। সর্বদা ধৈর্যধারণ করতেন, খুবই অতিথি পরায়ণ ছিলেন। সন্তানদের উপদেশ দিতেন, ‘নিজেদের দস্তরখান প্রত্যেকের জন্য বিছিয়ে রাখবে’। বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সবগুলো রোযা রাখতেন। ১৯৬৯ সাল থেকে প্রতি বছর নিয়মিত এতেকাফে বসতেন। বায়তুন্ নূর মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর রাখার সময় হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর সাথে শহীদ মরহুমের পিতাও ভিত্তিপ্রস্তর রাখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। অধিকাংশ সময়ই বসে বসে কাঁদতেন আর বলতেন, ‘আমি আল্লাহ্ তা’লার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি, কেননা তিনি আমাকে অনেক পুরস্কার দিয়েছেন’। যতদিন দৃষ্টিশক্তি ভাল ছিল ততদিন শিশুদেরকে কুরআন শরীফ পড়িয়েছেন। শাহাদাতের পর তাঁর টেবিলের উপর ‘দোয়াইয়্যা খাযায়েন’ বইটি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাঁর স্ত্রী বলেন, আগে কখনো এমনটি হয়নি। যে পৃষ্ঠাটি খোলা ছিল তাতে বিদায়ের দোয়া এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির দোয়া লেখা ছিল। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে আধ্যাত্মিক জগতে উন্নতি দান করুন।

শহীদ জনাব মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া খাঁন সাহেব, পিতা - জনাব মালেক আব্দুল্লাহ্ সাহেব (রা.)। শহীদ মরহুমের পিতা এবং দাদা হযরত বরকত আলী সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। শহীদ মরহুম ১৯৩৩ সালে কাদিয়ানে জন্মগ্রহণ করেন। বড় ভাইয়ের সাথে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল ১৮ বছর। কারণ মাঝখানে তাঁর সকল ভাই-বোন ৪/৫ বছর বয়স হতেই মারা যায়। পরিশেষে শহীদের ‘মা’ তাঁকে হযরত আম্মাজান (রা.)-এর কাছে নিয়ে যান। হযরত আম্মাজান (রা.) তাঁকে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর কাছে নিয়ে যান। শহীদের মা হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর কাছে নিবেদন করেন, ‘হুযূর এও চলে যাচ্ছে’। তখন হুযূর তাঁকে কোলে তুলে নেন এবং তাঁর নাম শরীফ আহমদ থেকে পরিবর্তন করে মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া রাখেন। হুযুর (রা.)-এর দোয়ার কল্যাণে তিনি যে শুধু দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন তা-ই নয় বরং শহীদ হয়ে স্থায়ী জীবন লাভ করেছেন।

হুযূর বলেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর তিনি বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। ১৯৮১-১৯৮২ সালে চাকুরীর উদ্দেশ্যে ইরাক যান এবং সেখানে জামাত প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পান। বায়তুন্ নূর মসজিদে শাহাদত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। ঘটনার সময় মসজিদের প্রথম সারিতে চেয়ারে বসেছিলেন। হঠাৎ গুলি বর্ষণ শুরু হয় এরপর সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে তাঁর মাথার পিছনের অংশ ক্ষতবিক্ষত হয় ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তাঁর দুই ছেলে, পিতার শহীদ হবার খবর পাওয়া সত্ত্বেও ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ ডিউটিতে ছিলেন এবং তারা রাত ১২টা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ করেছেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, তিনি পরম সহিষ্ণু ছিলেন। তাঁকে কখনোই রাগান্বিত হতে দেখি নি। জামাতের প্রতি গভীর ভালবাসা রাখতেন। সন্তানরা জামাতী কাজ এবং নামাযের বেলায় অলসতা দেখালে তিনি ক্ষমা করতেন না। দীর্ঘদিন সেক্রেটারী তা’লীমুল কুরআন ছিলেন। মানুষের ঘরে-ঘরে গিয়ে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর শাহাদতের কথা শুনে সবাই অঝোরে কাঁদতে থাকেন এবং বলেন, ‘তাঁর অনুগ্রহ আমাদের বংশধররা কখনোই ভুলতে পারবে না’। তিনি যা পেনশন পেতেন তার পুরোটাই গরীবদের জন্য খরচ করতেন। তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। জামাতা এবং ছেলের মধ্যে কোন পার্থক্য করেন নি, ছেলের বউকে নিজের মেয়ের মত মনে করতেন। কিছুদিন আগে তাঁর মেয়ে স্বপ্নে দেখেছিল, ‘কোন একটি বিল্ডিং এর বেসমেন্টে মানুষকে পদক দেয়া হচ্ছিলো আর আমার পিতাও তাদের মধ্যে ছিলেন। স্বপ্নেই কেউ একজন বলছে, এ পদক তাদের দেয়া হচ্ছে যারা কোন বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।’ বই পড়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে হাজার হাজার বই আছে। তাঁর ছেলে জনাব খালেদ মাহমুদ একজন ওয়াক্‌ফে যিন্দেগী। আল্লাহ্ তা’লা শহীদ মরহুমের মর্যাদা উন্নীত করুন।

জনাব উমর আহমদ সাহেব শহীদ, পিতা - জনাব ডাক্তার আব্দুশ্ শুকুর মিয়া সাহেব। শহীদের দাদা চৌধুরী আব্দুস সাত্তার সাহেব ১৯২১-২২ সালে বয়’আত করেছিলেন। শহীদ ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। মাইক্রোবায়োলোজি’তে এম.এসসি. করার পর সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। তিনি একজন মুসী ছিলেন আর শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩১ বছর। ঘটনার দিন তিনি কর্মস্থল থেকে সরাসরি জুমুআর নামাযের জন্য ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ এসেছিলেন। সন্ত্রাসীদের আক্রমনে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তাঁর দেহে চারটি অস্ত্রোপচার করা হয়। বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়, ৭০ ব্যাগ রক্ত দেয়া সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ৪ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। শহীদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, শহীদ স্বল্পভাষী ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কখনও কেউ তাঁর ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেনি। নিয়মিত নামায পড়তেন। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার মসজিদের ওয়াকারে আমলে অংশ গ্রহণ করতেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

শহীদ জনাব লাল খাঁন সাহেব নাসের, পিতা - জনাব হাজী আহমদ সাহেব। শহীদ সারগোধার অধিবাসী ছিলেন। তাঁদের বংশে সর্বপ্রথম তাঁর দাদা বয়’আত করেছিলেন। শৈশবেই শহীদ পিতৃহারা হন আর মাতা ১৯৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বি.এ পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করেন। চাকুরীর সময় মুলতান এবং বিহাড় জামাতের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া মোজাফ্ফরগড়ে প্রথম জেলা কায়েদ, এবং মোজাফ্ফরগড় জেলার আমীর হিসেবেও জামাতের সেবা করেছেন। আল্লাহ্‌র ফযলে তিনি মুসী ছিলেন আর মডেল টাউনের বাইতুন্ নূর মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫২ বছর। সন্ত্রাসী হামলার সময় তিনি ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করেন। আর জামাতের সদস্যদের বলেন, আপনারা আস্তে আস্তে নিরাপদ স্থানে চলে যান। ঐ সময় সন্ত্রাসীরা বন্দুকের নল দরজার ভেতর ঢুকিয়ে গুলি বর্ষণ করে আর সেই গুলি তাঁর বুকে বিদ্ধ হয় ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদতের অমিয় সুধা পান করেন। তাঁর সহধর্মিণী বলেন, ঘটনার একদিন পূর্বে শহীদ কোন দুঃস্বপ্ন দেখে হঠাৎ জেগে উঠেন। আমি বললাম, কি হয়েছে? কোন ভীতিকর স্বপ্ন দেখেছো? তিনি নিরব থাকলেন। তাঁর ছেলে বলে, আমি স্বপ্নে দেখেছি, ‘একটা কালো স্ক্রীন যার উপর সাদা রঙ এ লেখা বাক্য ভাসছিল। আর সাথে সাথে আব্বুর কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল, সবাইকে ignor কর’। তাঁর এক আত্মীয় শাহাদতের পর স্বপ্নে দেখেছেন ‘শহীদ এক সবুজ-শ্যামল মাঠে পায়চারী করছেন, এক হাতে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পুস্তক আর অপর হাত দিয়ে আপেল খাচ্ছিলেন।’ শুক্রবারে শহীদ নামায সেন্টারে গিয়ে বাজামাত তাহাজ্জুদ পড়িয়েছেন আর কেঁদে কেঁদে আল্লাহ্ তা’লার সমীপে দোয়া করেছেন। এরপর নামায ফজর পড়িয়েছেন এবং শেষ সিজদাটি অনেক দীর্ঘ করেছেন। তাঁর বাসায় একজন খ্রিষ্টান গৃহপরিচারিকা ছিল। তার পড়াশুনার পুরো ব্যয়ভার বহন করেছেন পরে তাকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়েছেন। তাকে অলংকারাদী বানিয়ে দিয়েছেন। শহীদের স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামী একজন ফিরিশ্তা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। জামাতের খিদমত করাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান’। তিনি নিজ হালকা আনসারুল্লাহ্‌র যয়ীম, সেক্রেটারী তরবিয়ত নওমোবাঈন এবং সেক্রেটারী রিশ্‌তানাতা ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ওয়াক্ফে আরযী করার খুব শখ ছিল। সানন্দে ওয়াক্ফে নও শিশুদের ক্লাস নিতেন। শাহাদতের ১৫ দিন পূর্বে তিনি জীবনের শেষ ওয়াক্‌ফে আরযী সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি প্রত্যহ আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ওয়াপদা টাউন এর বাচ্চাদের কুরআন নাযেরা, অর্থসহ নামায এবং ওয়াক্‌ফে নও-এর পাঠ্যসূচী পড়াতেন। আর মাগরিব নামাযের পর পার্ক সোসাইটিতে যেতেন। ইশার নামায পর্যন্ত সেখানকার বাচ্চাদের পড়াতেন। বাচ্চাদের হৃদয়ে জামাতের প্রতি ভালবাসা, যুগ খলীফার প্রতি অনুরাগ ও আনুগত্যের প্রেরণা সৃষ্টিকারী ঘটনাবলী শুনাতেন। মুরব্বী সাহেব তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা লিখেছেন। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মুজাফ্‌ফরগড় জেলার আমীর ছিলেন। জামাতের সদস্যদের পারিবারিক দ্বন্দের অবসান ও তাদের মাঝে সমঝোতা সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। একবার আমি একটি পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। তিনি দু’পক্ষের কাছ থেকেই বিস্তারিত বিবরণ শুনেন। আর অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে তার সত্যাসত্য যাচাই করেন। আর অশ্রুসজল নয়নে দুই পরিবারকে বুঝান এবং তাদেরকে বার বার এই উপদেশ দেন, ‘আপনারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের সদস্য। আপনারা নিজেদের মনোমালিন্য দূর করে সমঝোতা সৃষ্টির চেষ্টা করুন’। মরহুম শহীদের মাঝে বিনয় ও আন্তরিকতা ছিল পূর্ণ মাত্রায়। কোন বিষয় সামনে আসলে মজলিসে আমেলার সভায় তুলে ধরতেন এবং সবার মতামত নিতেন। তাঁর মধ্যে অপরের দোষত্রুটি ঢেকে রাখার মস্তবড় গুণ ছিল। যতদিন জেলার আমীর ছিলেন ততদিন তিনি জামাতের জন্য এক মমতাশীল পিতার দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সম্মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করুন।

শহীদ জনাব জাফর ইকবাল সাহেব, পিতা - জনাব মোহাম্মদ সাদেক সাহেব। শহীদ আরিফ ওয়ালা জেলার অধিবাসী। বি.এ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব চলে যান। সেখানে অবস্থানকালে পাঁচবার হজ্জ্বব্রত পালন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। পাকিস্তান ফিরে এসে পরিবহন ব্যবসা আরম্ভ করেন আর শাহাদতের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এর সাথেই জড়িত ছিলেন। এক বছর পূর্বে পরিবারসহ বয়’আত করে জামাতের অন্তর্ভূক্ত হন। ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন। সন্ত্রাসীদের একটি গুলি তাঁর কাঁধে বিদ্ধ হয়ে হৃৎপিন্ডের দিকে চলে যায়। এরপর যখন তাঁকে এ্যাম্বুলেন্সে উঠানো হচ্ছিল তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। চিকিৎসা প্রদানের সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু প্রাণ রক্ষা হয়নি। শহীদের স্ত্রী বলেন, ‘আমি আমার উপলব্ধি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। কিন্তু নিয়্যতের প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তা’লাই ভাল জানেন। তবে এ ঘটনায় আমার ঈমান খুবই দৃঢ় হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা তার বান্দার জন্য যা কিছু করেন, তা আমাদের চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি হয়ে থাকে। খোদা তা’লা আমার স্বামীকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেছেন। মানুষ হিসেবে তিনি এর যোগ্য ছিলেন। এতে আমার গর্ববোধ হচ্ছে, আমার সকল সন্তানও যদি আহমদীয়াতের জন্য উৎসর্গীত হয়ে যায় তবুও আমার সামান্য পরিমাণ দুঃখ হবে না। বরং আমি খোদা তা’লার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো’। শহীদের ছেলে বলেন, আমার পিতার শাহাদাতের কয়েকদিন পূর্বে আমার মামা তাহের মাহমুদ সাহেব তাঁর একটি স্বপ্ন শুনান। ‘স্বপ্ন আমার পুরোপুরি মনে নেই তবে, একটা বাক্য মনে আছে। ‘পাহাড়ের পিছনে রেখে আস’। আমরা যখন শহীদ পিতাকে চিরবিদায় জানানোর জন্য পাহাড় ঘেরা উপত্যকা রাবওয়াতে নিয়ে গেলাম, তখন এটা দেখে তিনি তাঁর স্বপ্নের বর্ণনা দেন। এই প্রথমবার আব্বাজান রাবওয়া যান আর চিরনিদ্রায় সেখানেই শায়িত হন। ছেলে আরো বলেন, আব্বা শুরুতে জামাতের ঘোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু পরে খোদা তা’লার অপার কৃপায় আন্তরিকভাবে আহমদীয়াত গ্রহণ করে নিষ্ঠা, তাক্বওয়া ও ঈমানে এতোটাই উন্নতি করেছিলেন যে, বয়’আতের এক বছর যেতে না যেতেই শাহাদতের সুমহান মর্যাদা লাভ করেছেন। ডিশ এন্টিনা লাগিয়ে সাগ্রহে এম.টি.এ দেখতেন। অল্পদিনের মধ্যেই খিলাফতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মে। জামাতের সকল কাজে অংশ নিতেন। ঘরের কাছে মসজিদ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ গিয়ে জুমুআর নামায আদায় করতেন। বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে জান্নাতের উচ্চস্থানে সমাসীন করুন।

শহীদ জনাব মনসুর আহমদ সাহেব, পিতা - জনাব আব্দুল হামীদ জাভেদ সাহেব। শহীদ মরহুমের পরিবার লাহোরের অধিবাসী। তাঁর প্রপিতামহ জনাব গোলাম আহমদ সাহেব পেশায় শিক্ষক ছিলেন। সম্ভবত হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়ালের খিলাফতকালে তিনি বয়’আত গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে বিরুদ্ধবাদীরা তার বসতবাড়িটি আগুন জ্বালিয়ে পুড়ে ফেলে। এরপর তিনি রাবওয়ায় স্থানান্তরিত হন। তাঁর পিতা ১৯৭০ সালে করাচি চলে যান। ১৯৭৪ সালে করাচিতে তাঁর পিতার দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এরপর তিনি লাহোরে স্থানান্তরিত হন। শহীদ মরহুম একটি আমদানি-রপ্তানি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতেন। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় তিনি মুসী ছিলেন আর মসজিদ ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৬ বছর। শহীদ মরহুমের অফিসের সহকর্মীরা তাঁর অনেক প্রশংসা করেছেন। তাঁর সাথে সেখানে আরেকজন আহমদী বন্ধুও কাজ করতেন। প্রত্যেক জুমুআতে তিনি তাকে সাথে নিয়ে যেতেন। দুর্ঘটনার দিন তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক জুমুআতে আপনার কারণে আমার দেরী হয়ে যায়। আজ কিছুতেই যেন দেরী না হয়’। রীতিমত জোর করে, তর্ক করে তিনি তার বন্ধুকে তাড়াতাড়ি জুমুআর নামাযে নিয়ে যান। মসজিদে পৌঁছে প্রথম সারিতে সুন্নত আদায় করেন। হামলা চলাকালে নিজের অফিসে ফোন করে বলেন, ‘আমি গুরুতর আহত হয়েছি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আমাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন’। ঘর থেকে তাঁর স্ত্রী ফোন করলে তাকেও বললেন, ‘কাউকে পাঠাও যাতে আমাদেরকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারে’। কথাবার্তার সময় তাঁর স্ত্রীও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। এরপরই তাঁর কন্ঠরুদ্ধ হয়ে যায়। শহীদ মরহুমের স্ত্রী বলেন, তিনি খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন। শাহাদতের এক সপ্তাহ পূর্বে আমাকে বলেন, ‘তুমি বাচ্চাদের খুব যত্ন নেবে। আমি হয়ত তাদের সময় দিতে পারব না। বাচ্চাদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি কর যাতে তারা আমার শুন্যতা অনুভব না করে’। শাহাদতের দিন সকালে তিনি তাঁর স্বাস্থ্যবান ও সুন্দর ছেলে শানজীব মোহসেনকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তার বয়স যখন তিন বছর হবে তখন তাকে আমি রাবওয়া পাঠাব এবং জামাতের সেবায় উৎসর্গ করব। জামাত তাকে যেভাবে চাইবে সেভাবেই গড়ে তুলবে’। শহীদ মরহুম সাধু প্রকৃতির এবং অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন আর নিযামে খিলাফতের প্রতি বিশ্বস্ততা ও অনুরাগের সম্পর্ক রাখতেন। তাঁর সম্বন্ধে একজন মুরুব্বী সাহেব লিখেছেন, শহীদ তাঁর ওয়াক্‌ফে নও বাচ্চাদের নিয়মিত ক্লাসে নিয়ে আসতেন। খিলাফতের প্রতি ভালবাসা ও ভক্তিমূলক বড় বড় নযম তাঁর বাচ্চাদের মুখস্ত ছিল। খাকসার একবার ক্লাসের ফাঁকে শহীদকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ছোট শিশুদেরকে এত বড় বড় নযম আপনি কিভাবে মুখস্ত করিয়েছেন?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘এসব নযম আমি মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে রেখেছি। বাচ্চারা সব সময় এগুলো শুনতে থাকে’। হুযূর বলেন, যারা মোবাইলে গান এবং অন্যান্য বেহুদা জিনিষ রেকর্ড করে রাখে তাদের জন্য এতে চিন্তার খোরাক আছে।

শহীদ জনাব মোবারক আলী আওয়ান সাহেব, পিতা - মোকাররম আব্‌দুর রায্‌যাক সাহেব। শহীদ মরহুম কসুরের অধিবাসী ছিলেন। পরিবারের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর দাদা জনাব নিযাম দ্বীন সাহেব ও তাঁর প্রতিতামহ বয়’আত করেছিলেন। মরহুমের নানা মৌলানা মোহাম্মদ ইসহাক সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। শহীদ মরহুম বি.এ.বি.এড পাশ করার পর শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন এবং লাহোরে কর্মরত ছিলেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। চাকুরীর জন্য তাঁকে প্রতিদিন কসুর থেকে লাহোর আসতে হত তাই জুমুআর নামায তিনি দারুয্ যিক্‌র মসজিদেই পড়তেন। দুর্ঘটনার দিন সন্ত্রাসী আক্রমনের সময় কসুর জেলার আমীর সাহেবকে ফোনে জানান যে, ‘দারুয্ যিক্‌র মসজিদে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। আমার শরীরে গুলি লেগেছে, আমি গুরুতর আহত হয়েছি’। পরে ছেলের সাথেও তাঁর কথা হয়। ছেলেকে পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত করেন এবং দোয়া করতে বলেন। এরপর আরেক বন্ধু তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি শুধু আল্লাহ্ আল্লাহ্ ধ্বনি শুনতে পান। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনি শাহাদত বরণ করেন। তাঁর পরিবারের লোকেরা জানান, শহীদ মরহুম একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তাঁর সচ্চরিত্রের কারণে মহল্লার কেউ কখনো প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার সাহস পায়নি। জামাতের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী এবং অতিথি-পরায়ণ ছিলেন। অভাবীদের মুক্তহস্তে দান করতেন। তাঁর শাহাদতের পর একজন অ-আহমদী মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘উনার অবর্তমানে আমার এবং আমার বৃদ্ধ স্বামীর কে সহায় হবে?’ নিয়মিত বাজামাত নামায এবং তাহাজ্জুদ পড়তেন। নিজ উদ্যোগে জামাতী অনুষ্ঠানাদীর ব্যবস্থা করতেন। শহীদ মরহুম কিছুদিন পূর্বে স্বপ্নে দেখেছিলেন, ‘তিনি খুব সুন্দর কোন একটি জায়গায় যাচ্ছেন’। এরপর হাসতে হাসতে স্ত্রী’কে বলেন, ‘মন চায় এখনই জান্নাতে চলে যাই’। মুরুব্বী সাহেব লিখেছেন, খাকসার চার বছর কসুরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। শহীদ জনাব মোবারক আলী আওয়ান সাহেবকে আহমদীয়াতের সম্মান এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব অথবা আহমদীয়া জামাতের উপর কোন প্রকার আপত্তির জবাবে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী পেয়েছি। তিনি যেহেতু শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন, তাই অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে জামাতী বিষয়াবলী নিয়ে বিতর্ক হত। কোন আপত্তি বা প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব না পাওয়া পর্যন্ত শহীদ মরহুম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন না। তিনি তাঁর নিকটাত্মীয়দের প্রতি একান্ত সহমর্মী ছিলেন। অন্যের ভুল-ত্রুটি হলেও নিজে গিয়ে ক্ষমা চাইতেন এবং তার প্রতি পূর্বাপেক্ষা বেশী দয়ার্দ্র আচরণ করতেন।

শহীদ জনাব আতিকুর রহমান সাহেব, জনাব শফি সাহেবের সুপুত্র। শহীদ মরহুম শিয়ালকোটের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ১৯৮৮ সালে বয়’আত গ্রহণ করে আহমদীয়া জামাতের অন্তর্ভূক্ত হন। এর এক বছর পর শহীদের স্ত্রী’ও বয়’আত গ্রহণ করেন। তিনি দুবাই-তে ছিলেন ২০০৯ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান ফিরে আসেন। গত ছয় মাস যাবত তিনি লাহোর জেলার আমীর সাহেবের ব্যক্তিগত ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দারুয যিক্‌র মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। ঘটনার সময় তাঁর পাশেই একটি গ্রেনেড বিষ্ফোরিত হয়, তিনি স্ত্রীকে ফোনে হামলার সংবাদ দিচ্ছিলেন তখন একটি গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হলে হাত থেকে ফোন পড়ে যায় এবং তিনি সেখানেই শাহাদত বরণ করেন। শহীদ মরহুমের অ-আহমদী ভাইদের দাবি ছিল, তাঁকে যেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয় কিন্তু তাঁর স্ত্রী বলেন, যেহেতু তিনি আহমদী এবং স্থায়ীভাবে রাবওয়াতে বসবাসের ইচ্ছা রাখতেন তাই তাঁকে রাবওয়াতেই দাফন করা হোক। ভাইদের সম্মতিতেই তাঁকে রাবওয়ায় সমাহিত করা হয়। বয়’আত গ্রহণের পূর্বে শহীদ মরহুমের মেয়ে স্বপ্নে দেখেছিল যে, ‘খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.) তাদের ঘরে এসেছেন এবং গোলাপের চারা রোপণ করছেন। পরবর্তীতে আমি এবং আমার আব্বু সে চারাগুলোর যত্ন নিচ্ছি এবং পানি দিচ্ছি’। এর কিছুদিন পরই এই পরিবারটি আহমদী হয়। বয়’আতের পর তাঁর পিতা-মাতা তাকে ত্যাজ্য করে ঘর থেকে বের করে দেয়। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন এবং মহল্লাবাসীও তাদেরকে গালাগাল করতো, পাথর নিক্ষেপ করতো। অবশেষে তিনি একটি আহমদী বাড়ীতে আশ্রয় নেন। হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা স্বপ্নের মাধ্যমেও বেদনাহত পরিবারকে প্রশান্তি দান করে থাকেন। শহীদের কন্যা বলেন, ঘটনার একদিন পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ‘ঘরে এবং বাইরে অনেক লোকের ভিড়’। দ্বিতীয় মেয়ে মরিয়ম স্বপ্নে দেখে যে, ‘হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) এসেছেন এবং আমাদের মাথায় হাত রেখে আমাদেরকে আদর করছেন’। তৃতীয় কন্যাও স্বপ্নে দেখে যে, ‘একটি গহীন জঙ্গল যেখানে ভয়ংকর মোষ এবং অন্যান্য হিংস্র জীব-জন্তু রয়েছে, আমি ভয়ে দৌঁড়াচ্ছি এমন সময় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে দেখতে পেয়ে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলাম’। মরহুমের স্ত্রী বলেন, তিনি সর্বদা অযু করা অবস্থায় থাকতেন আর দরূদ শরীফ পড়তেন। কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। তাহাজ্জুদ নামায পড়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতেন। অনেক রাতে বাড়ী ফিরতেন। যখন জিজ্ঞেস করা হতো যে, ‘আপনি ক্লান্ত হন না’? তিনি বলতেন, ‘আমি সর্বদা দরূদ শরীফ পড়তে থাকি তাই ক্লান্ত হই না’। কখনো তবলীগের সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। দুবাই-তে দু’টি পরিবারকে বয়’আত করিয়েছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে জান্নাতের উচ্চস্থানে সমাসীন করুন।

শহীদ জনাব মাহমুদ আহমদ সাহেব, জনাব মজীদ আহমদ সাহেবের সুপুত্র। শহীদ মরহুমের দাদা জনাব উমর উদ্দীন সাহেব (রা.) এবং বড় দাদা হযরত করীম বখ্‌শ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁরা কাদিয়ানের পার্শ্ববর্তী লেনিয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন আর ১৯০০ সালে বয়’আত গ্রহণ করার তৌফিক পান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শহীদের পরিবার হিজরত করে শিয়ালকোট চলে আসেন। শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। ১৫ বছর ধরে তিনি দারুয্ যিক্‌র মসজিদে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আর সেখানেই তিনি শাহাদতের সম্মান লাভ করেন। ঘটনার সময় তিনি মসজিদের প্রধান ফটকে দায়িত্বরত ছিলেন। এ সময় তিনি একজন সন্ত্রাসীকে ধরার চেষ্টা করেন। তখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে গুলি করা হয়। দু’টি গুলি তাঁর বুকে এবং একটি তলপেটে বিদ্ধ হয়। এছাড়া তাঁর পায়েও কয়েকটি গুলি লাগে। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তাঁর স্ত্রী বলেন, শহীদ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। কখনো কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ করেন নি। সহজ-সরল এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। শহীদের একজন বন্ধু বলেন, একদিন তিনি ইউনিফর্ম পরে খুব গর্বের সাথে হাটছিলেন। বন্ধু জিজ্ঞেস করলো, ‘এভাবে কেন হাঁটছ?’ উত্তরে বলেন, ‘যদি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ আসে তাহলে তাকে আমার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে’। তাঁর স্ত্রী বলেন, জুমুআর দিন ব্যস্ততার কারণে কখনো ঘরে ফোন করতেন না। অথচ শাহাদতের বিশ মিনিট পূর্বে তাঁর সাথে আমি ফোনে কথা বলেছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি আজ জুমুআর দিন ফোন করেছেন কেন?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘এমনিতেই মন চাইছিল তাই ফোন করলাম’।

হুযুর বলেন, আজ শহীদদের স্মৃতিচারণ এ পর্যন্তই রাখছি বাকী আগামী খুতবায় বর্ণনা করবো। তবে, এখন আমি আর এক জনের নাম উল্লেখ করতে চাই। তিনি হলেন, মরহুম জনাব মওলানা আব্দুল মালেক খাঁন সাহেবের সহধর্মিণী মোকাররমা সারওয়ার সুলতানা সাহেবা। তিনি গত ২২ জুন ২০১০ তারিখে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। انا للہ و انا الیہ راجعون। তিনি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী হযরত মওলানা যুলফিকার আলী খাঁন সাহেবের পুত্রবধু ছিলেন। তিনি ওয়াক্‌ফে যিন্দেগী স্বামীকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাকেও ধর্মের খিদমত করার সৌভাগ্য দিয়েছেন। করাচি ও রাবওয়ায় লাজনার হালকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৪৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ওয়াক্‌ফে যিন্দেগী মেয়ে ডাক্তার নুসরত জাহান সাহেবা ফযলে উমর হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য খিদমতের সুযোগ পাচ্ছেন। মরহুমা নিজের সন্তান ছাড়াও অগণিত বাচ্চাকে কুরআন পড়িয়েছেন। খুব সুন্দর করে ধর্মীয় শিক্ষা দান করতেন। নিজে কষ্ট করেও অন্যের সেবার প্রতি খেয়াল রাখতেন। স্বামী জামাতের মোবাল্লেগ বিধায় তাঁকে অনেক সম্মান করতেন। নিয়মিত নামায পড়ার পাশাপাশি নফল নামাযও আদায় করতেন। নিজেও খোদা তা’লার উপর ভরসা করতেন এবং সন্তানদের হৃদয়েও এ শিক্ষা প্রোথিত করেছিলেন। সুকোমল চরিত্রের অধিকারিনী, মিশুক, নম্র, অতিথি পরায়ণ ও সর্বজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। খিলাফতের সাথে প্রগাঢ় বিশ্বস্ততার সম্পর্ক ছিল। আল্লাহ্ তালার ফযলে তিনি একজন মুসী ছিলেন। তাঁর স্বামী আল্লামা আব্দুল মালেক খাঁন সাহেব জামাতের একজন অতি উচ্চ পর্যায়ের আলেম ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে সন্তানরা সবাই শিক্ষিত এবং তাঁর এক ছেলে উমর খাঁন সাহেব আমেরিকাতে আছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন। জুমুআর নামাযের পর আমি তাঁর গায়েবানা জানাযার নামায পড়াব, ইনশাল্লাহ্ তা’লা।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে