In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

জলসা সালানা জার্মানী ২০১০ এবং লাহোরের শহীদদের বিবরণ: ৩

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

Mannheim, জার্মানী

২৫শে জুন, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় আজ জুমুআর খুতবার মাধ্যমে আহমদীয়া মুসলিম জামাত, জার্মানির বার্ষিক জলসা আরম্ভ হচ্ছে। এই জলসা সবার জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে আনুক। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যে উদ্দেশ্যে জলসার প্রবর্তন করেছেন তা সর্বদা আপনাদের দৃষ্টিপটে রাখুন। জলসার মূল উদ্দেশ্য হল, বয়’আতের প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করে ঈমান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উন্নতি করা, পার্থিব সবকিছুর উপর আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সা.)-কে প্রাধান্য দেয়া, পুণ্যকর্মে উত্তরোত্তর উন্নতি করা; জ্ঞানগর্ভ, সংশোধনমূলক এবং আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ বক্তৃতা শুনে জ্ঞান ও তত্ত্বজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া, পারস্পারিক ভালবাসা, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, আর বিগত দিনে যে সব ভাই-বোন আমাদেরকে ছেড়ে গেছেন তাদের জন্য দোয়া করা।

অতএব, এ তিনটি দিন আপনারা এ উদ্দেশ্যগুলোকে নিজেদের দৃষ্টিপটে রাখুন। বিশ্বাসগত অবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট হোন আর বেশি বেশি দোয়া করুন। নিজের জন্য দোয়ার পাশাপাশি এ দোয়াও করুন, আল্লাহ্ তা’লা যেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী প্রত্যেক আহমদীকে তাঁর নিরাপত্তার চাদরে আবৃত রাখেন। বিশেষ করে পাকিস্তানী আহমদীদের জন্য অনেক বেশি দোয়া করুন; আল্লাহ্ তা’লা যেন তাদের ঈমানকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করেন এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন আর তাদের আত্মত্যাগ কবুল করতঃ সেখানে অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করেন।

হুযূর বলেন, আজকের খুতবার মূল বিষয়ে যাবার পূর্বে আমি জলসার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। জলসার পুরো কর্মকান্ড বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে এবং প্রতিটি বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মীরা অতিথিদের সেবার জন্য নিয়োজিত থাকেন। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় সাধারণত সবাই নিঃস্বার্থ ভাবে কেবল খোদার ভালবাসা লাভের উদ্দেশ্যেই অতিথিদের সেবা করে থাকেন, যাদের মাঝে নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ এবং বালক-বালিকাও রয়েছে। কাজেই যারা এ জলসায় উপস্থিত হয়েছেন, তারা এ সব কর্মীর সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করুন।

জলসার কর্মকান্ড সুচারুভাবে সমাধার জন্য বিভিন্ন নিয়ম-কানুন করা হয়েছে। যদি কোন কর্মী এর প্রতি কোন অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তবে তিনি তা মেনে চলার চেষ্টা করবেন। স্ব স্ব দায়িত্ব উত্তমরূপে পালনের জন্য কর্মীদেরকে আমি পূর্বেই বলেছি। অতিথিদের উদ্দেশ্যে আমি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলতে চাই তা হল, আপনারা নিজেদের চার পাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। নিরাপত্তা বিধানে পূর্ণ সহযোগিতা করুন। দশবারও যদি আপনার তল্লাশি নেয়া হয়, তবে দশবারই তাল্লাশি করতে দিন। আল্লাহ্ তা’লা আপনাদের সবাইকে তাঁর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে স্থান দিন এবং জলসা থেকে যতটুকু সম্ভব লাভবান হবার তৌফিক দান করুন।

এরপর হুযূর বলেন, এবার আমি খুতবার মূল বিষয়বস্তু শুরু করছি। আজকের খুতবাতেও সেসব শহীদের স্মৃতিচারণ করবো যাঁরা আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের জন্য চিন্তার নতুন পথ উন্মুক্ত করে গেছেন।

আজ আমার সামনের তালিকায় সর্ব প্রথম যে নামটি রয়েছে তিনি হলেন, শহীদ মোকাররম খলীল আহমদ সুলাঙ্গী সাহেব, পিতা মোকাররম নাসীর আহমদ সুলাঙ্গী সাহেব। শহীদের পিতৃপুরুষ কাদিয়ানের পার্শ্ববর্তী গ্রাম খাড়া’র অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা হযরত মাস্টার মুহাম্মদ বখ্‌শ সুলাঙ্গী (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তারা গুজরাঁওয়ালাতে স্থানান্তরিত হন। শহীদ মরহুম লাহোর সরকারী কলেজ থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ওয়াপ্দাতে পাঁচ বছর চাকুরী করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে লাহোর চলে আসেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করতে থাকেন। এক বছর পূর্বে তিনি আমেরিকাতে পোষাক রপ্তানীর ব্যবসা শুরু করেন এবং আমেরিকাতেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে জামাতের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। একমাস পূর্বে শহীদ ব্যবসার কাজে পাকিস্তান আসেন। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় তিনি মুসী ছিলেন আর দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫১ বছর। তাঁর বুকের ডান পাশে গুলি লাগে, আহত অবস্থায় অনেকক্ষণ যাবত তিনি সিঁড়ির নিচে পড়ে ছিলেন। তাঁর ভাগ্যে শাহাদত নির্ধারিত ছিল, তাই তিনি মসজিদেই শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। মসজিদে আক্রমনের পর তিনি তাঁর বড় ছেলে শোয়েব সুলাঙ্গীকে ফোন করে বলেন, সন্ত্রাসীরা আক্রমন করেছে, দোয়া কর যেন আল্লাহ্ তা’লা সবাইকে রক্ষা করেন এবং বাড়ির সবাইকে দোয়া করতে বল। তিনি পরম নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সাথে জামাতের সেবা করেছেন ও আর্থিক কুরবানীর ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন। ভগোয়ানপুরে একটি মসজিদ নির্মাণ করে জামাতকে দিয়েছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমী ও একজন পুণ্যবান মানুষ ছিলেন। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন। যে কোন কাজ শুরু করার পূর্বে তিনি যুগ খলীফার অনুমতি ও দিক-নির্দেশনা নিতেন। খলীফার আনুগত্যের ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, পারিবারিক জীবনেও তিনি আমাদের জন্য অনেক বড় আদর্শ ছিলেন। তিনি একজন আদর্শ পিতা ও স্বামী ছিলেন। তাঁর দ্বার থেকে কোন অভাবী কখনোই খালি হাতে ফিরে যেত না। তাঁকে কোন কষ্টসাধ্য কাজের দায়িত্ব দেয়া হলেও তিনি তা হাসিমুখে গ্রহণ করতেন এবং বলতেন ان شاء الله হয়ে যাবে। অন্যদেরকে দিয়ে কাজ করানোর দক্ষতা রাখতেন। একই সাথে মিষ্টভাষী ও উন্নত চরিত্রেরও অধিকারী ছিলেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.) যখন বাইতুল ফতুহ্ মসজিদের তাহরীক করেন, তাৎক্ষণিক ভাবে তিনি ফ্যাক্সের মাধ্যমে ওয়াদা লিখান এবং দ্রুত তা আদায় করেন।

হুযূর বলেন, আমার সাথেও তাঁর সম্পর্ক অনেক পুরোনো, খোদ্দামুল আহমদীয়ার যুগ থেকে আমরা পরস্পরকে চিনি-জানি। কেন্দ্রের নির্দেশাবলী মানা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। এবারও পাকিস্তান যাবার সময় লন্ডনে আমার সাথে সাক্ষাত করে গেছেন, পরিস্থিতি সাপেক্ষে আমি তাঁকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছিলাম। গুজরাঁওয়ালার সাবেক আমীর সাহেব লিখেছেন, সুলাঙ্গী সাহেব বলতেন, ‘খিলাফতের বিপরীতে বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার কোন মানে হয় না’। ১৯৭৪ সালে চরম বিরোধিতার সময় সুলাঙ্গী সাহেবের পরিবারের কোন কোন সদস্য দুর্বলতা দেখায়, কিন্তু তিনি তখন বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে জামাতের আমীর, আব্দুর রহমান সাহেবের বাড়িতে গিয়ে উঠেন। আমীর সাহেব লিখেন, তিনি মুক্ত হস্তে আল্লাহ্‌র রাস্তায় দান করতেন। একবার জামাতের জন্য পঞ্চাশ লক্ষ রুপী দিয়ে একটি প্লট কেনার কথা ছিল, যার মূল্য তিনি দিতে চেয়েছিলেন। কোন কারণে সেটি কেনা যায় নি, কিন্তু পরবর্তীতে চুয়াল্লিশ লক্ষ রূপী মূল্যের আরেকটি বাড়ি কিনে জামাতকে দিয়েছেন। এরপূর্বে মসজিদের জন্যও বেশ বড় অংকের অর্থ দিয়েছিলেন। খিলাফত জুবিলীর সময় কাদিয়ানে লাহোরের পক্ষ থেকে গেস্ট হাউজ নির্মাণের জন্যও তিনি দশ লক্ষ রূপী দিয়েছেন। রাবওয়াতে খোদ্দামুল আহমদীয়ার গেস্ট হাউজ সংস্কারের জন্যও বড় অংকের চাঁদা দিয়েছেন। মোটকথা অর্থ ও সময়ের কোরবানী এবং আনুগত্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। ওয়াকফে যিন্দেগী ও জামাতের কর্মীদেরকে তিনি খুবই সম্মান করতেন। সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাঝে কোন অহংকার ছিল না। সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে আমি তাঁকে আরো বিনয়ী হতে দেখেছি। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে জান্নাতের উচ্চমার্গে সমাসীন করুন।

দ্বিতীয় শহীদ হচ্ছেন, মোকাররম চৌধুরী এজাজ নাসরুল্লাহ্ খাঁন সাহেব, পিতা মোকাররম চৌধুরী আসাদুল্লাহ্ খাঁন সাহেব। ইনি হযরত চৌধুরী মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খাঁন সাহেবের ভাতিজা এবং লাহোর জেলার সাবেক আমীর - চৌধুরী হামীদ নাসরুল্লাহ্ সাহেবের চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনি বিভিন্নভাবে জামাতের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন এবং আহমদীয়াতের চারজন খলীফার সাথে কাজ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তিনি কাদিয়ানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং মেট্রিক ও বি.এ করেন লাহোরে। তিনি লন্ডনের ল’ইয়ার্জ ইন কলেজ থেকে ব্যারিষ্টারি পাস করে কিছুদিন সেখানেই প্রাক্টিস করেন। পিতার অসুস্থতার কারণে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) নির্দেশে তিনি পাকিস্তান ফিরে আসেন এবং ইসলামাবাদে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯৮৪ সালে অবসর গ্রহণের পর আর কোন জাগতিক কাজ করেন নি, শুধু ধর্মের কাজই করেছেন। বিভিন্ন পদে থেকে তিনি জামাতের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি ইসলামাবাদ জামাতের প্রাক্তন আমীর, লাহোর জেলার নায়েব আমীর, কাযা বোর্ড এবং ফিকাহ্ কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন। ‘দারুয যিক্‌র’-এ শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ঘটনার সময় শহীদ মরহুম মেহরাবের কাছে প্রথম সারির চেয়ারে বসে ছিলেন। এলোপাতাড়ি গোলাগুলি শুরু হলে তাঁর পেটে গুলি লাগে। আমীর সাহেব তাঁকে বলেন, চৌধুরী সাহেব আপনি বাইরে চলে যান। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি তো শাহাদাতের জন্য দোয়া করেছি’। আমীর সাহেব এবং তাঁর মৃতদেহ একই স্থানে পরে ছিল। তিনি রাতে ইশার নামায পড়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। রাত ১টার সময় উঠে তাহাজ্জুদ নামায ও দোয়ায় মগ্ন হতেন। প্রত্যেকের কাছে শুভ পরিণামের জন্য দোয়া চাইতেন। খিলাফতের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অপরিসীম।

চাকুরী জীবনে তিনি ইসলামাবাদে মনোপলী কন্ট্রোল অথরিটিতে রেজিষ্ট্রার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় তাঁর নিকট প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর সুপারিশসহ একটি ফাইল আসে। ফাইলে চৌধুরী সাহেব কিছু অনিয়ম দেখতে পান ফলে নামঞ্জুর করে পাঠিয়ে দেন। পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে ফাইল আসলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টিতে আইনগত ত্রুটি আছে যা সঠিক নয়। এটাকে আমি অনুমোদন দিতে পারি না। এটা অন্যায়’। তখন প্রধানমন্ত্রী খুবই রাগান্বিত হন এবং একই সাথে নোট লিখে পাঠান; হয় তুমি কাজ করো নতুবা তোমার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। চৌধুরী সাহেব নিজের আহমদী হওয়াটা কখনোই গোপন করেননি। সুযোগ পেলেই তবলীগ করতেন। আর প্রধানমন্ত্রীও তা জানতেন। যাহোক, বিষয়টি তিনি হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.)-কে অবহিত করেন। হুযূর দোয়া করে বললেন, ‘ঠিক আছে, বীরত্ব প্রদর্শন করো আর ভয় পেলে চাকরি থেকে অব্যাহতি নাও’। যখন চৌধুরী সাহেব খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.)-এর এই সংবাদ পেলেন তখন অব্যাহতি না নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখেন। বলেন ‘আমি যদি অব্যাহতি দেই তাহলে আপনি হয়তো মনে করতে পারেন - আমি কিছু লুকাতে চাচ্ছি। আমি কিছু লুকাচ্ছি না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ইস্তফা দেবো না। ফলে কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই তাঁকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি আবার খলীফাতুল মসীহ্ সালেহ (রাহে.)-এর খিদমতে বিষয়টি উপস্থাপন করে দোয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘পরের দিন ফজরের নামাযের জন্য বাহিরে বের হয়েছি। তখন জামাতের আমীর, মোহতরম আব্দুল হক ভিরক সাহেবের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন- আমি আপনার জন্য দোয়া করছিলাম, ‘আমি শব্দ শুনতে পেলাম, ছুটি কর, আরাম-আয়েশ কর।’ এরপর ভুট্টো সাহেব ক্ষমতাচ্যুত হলে মার্শাল ল’র কর্মকর্তারা সমস্ত সরকারী নথিপত্র খুঁজতে থাকেন, তখন তাঁর ফাইলও সামনে আসে। ঘটনার পুরো তদন্ত হয়। পরে যাদেরকে অকারণে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছিল তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্বের পদে বহাল করা হয়। একই সাথে শুপারিশ করা হয় যে, বরখাস্তকৃত সময় ছুটি বলে বিবেচিত হবে। এভাবে ঐ স্বপ্ন যা আল্লাহ তা’লা অন্য এক আহমদী ভাইকে দেখিয়েছিলেন তা পূর্ণ হয়েছে। আর এটিও আল্লাহ্ তা’লার এক অদ্ভুত কাজ, এক আহমদী বিরোধী তাঁকে চাকরীচ্যুত করেছিল অন্য আরেকজন আহমদী বিরোধী জিয়াউল হক-ই আবার তাঁকে চাকুরীতে বহাল করেছে।

পরবর্তী শহীদ মোকাররম চৌধুরী হাফেজ আহমদ কাহ্‌লুন সাহেব এডভোকেট, পিতা চৌধুরী নাজির আহমদ সাহেব শিয়ালকোটী। এল.এল.বি পাশ করে তিনি সুপ্রীম কোর্টে এডভোকেট হিসাবে উকালতি করতেন। মডেল টাউনের বাইতুন্ নূর মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। জুমুআর নামাযের জন্য তিনি মসজিদের মূল কক্ষে বসে ছিলেন। হামলার সময় বুকে গুলি লেগে তিনি আহত হন। শ্বাস-প্রঃশ্বাস চালু করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি সেখানেই শহীদ হন। তিনি অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। বাসায় কাজের লোকের সাথেও স্নেহসুলভ ব্যবহার করতেন। নিয়মিত নামায পড়তেন আর অধিকাংশ সময় নামাযের জন্য হেটেই মসজিদে যেতেন। তাঁর এক ছেলে নাসের আহমদ কাহ্‌লুন অষ্ট্রেলিয়ার নায়েব আমীর। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

তাঁর সম্পর্কে একজন আমাকে লিখেছেন, তিনি গরীবদের মামলা-মোকদ্দমা বিনাপয়সায় পরিচালনা করতেন। এমনকি লোকদেরকে আর্থিক সাহায্যও করতেন। তাঁর মৃত্যুতে অনেক অ-আহমদী বন্ধু সমবেদনা প্রকাশ করেন। তাঁর দপ্তর ও কোর্টের কেরানী বলেছে, ‘একজন জজ সাহেবও ফোন করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কেরানী জজ সাহেবকে বলেন, আপনি তাঁর আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করুন। জজ সাহেব উত্তরে বলেন, সমবেদনা জানাতে পারবো ঠিকই কিন্তু মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে পারবো না’। দেখুন শিক্ষিত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এরা কেমন ধর্মান্ধ?

মরহুম শহীদ দৃষ্টি শক্তি দূর্বল হওয়া সত্ত্বেও মাগরিবের নামাযে নিয়মিত পায়ে হেটে মহল্লার মসজিদে চলে যেতেন। তিনি প্রত্যহ ঘন্টাখানেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। শহীদের ছোট নাতিকে যখন তাঁর শাহাদাতের ঘটনা, অর্থাৎ তিনি আকাশে চলে গেছেন বলে জানানো হয় তখন সে বললো, তিনি হয়তো সেখানে বসেও কুরআন পড়বেন। সব সময় বাচ্চারা তাঁকে কুরআন পাঠ করতে দেখতো, তাই তাদের উপর এর প্রভাব ছিল। ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে এভাবে আমাদের প্রত্যেক আহমদী শিশুর তরবিয়ত করতে হবে।

শহীদ মোকাররম চৌধুরী ইমতিয়ায আহমদ সাহেব, পিতা মোকাররম চৌধুরী নেসার আহমদ সাহেব। শহীদের দাদা গুরুদাসপুর জেলার মোকাররম চৌধুরী মোহাম্মদ ভুট্রা সাহেব ১৯৩৫ সালে বয়’আত করেন। তিনি একা আহমদী হয়েছিলেন বলে পুরো গ্রাম তাঁর বিরোধী ছিল। তাঁর মৃত্যুও মৌলভীদের ষড়যন্ত্রের কারণেই হয়েছে। দেশ বিভাগের পর এই পরিবার শাহীঁওয়ালে চলে আসে আর ১৯৭২ সালে তাঁর পিতা লাহোরে স্থানান্তরিত হন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মূসী ছিলেন আর ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাতের সময় শহীদ ইমতিয়ায আহমদ সাহেবের বয়স ৩৪ বছর ছিল। মু’আবিন জেলা কায়েদ, জেলা নাযেম তরবিয়ত নও মোবাঈন, সাবেক নাযেম আতফাল, সেক্রেটারী ইশায়াত ছাড়াও তিনি নিরাপত্তা বিভাগে খিদমতের সুযোগ পেয়েছেন। ঘটনার সময় মসজিদের মূল ফটকের ডান দিকে তাঁর ডিউটি ছিল। আক্রমনের সময় তিনি সন্ত্রাসীদের ধরার জন্য ছুটে যান। ঐ সময় তাঁর মাথা ও বুকে গুলি বিদ্ধ হয় ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদত বরণ করেন।

শহীদের স্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে শহীদ ব্যবসা করতেন তবে, জামাতের সেবায় তিনি অগ্রগামী ছিলেন। কেন্দ্রীয় শূরার প্রতিনিধি ছিলেন। শৈশব থেকেই আতফালের কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। নিরাপত্তার দায়িত্ব খুব ভালোভাবে পালন করতেন। নিয়মিত নামায পড়তেন। দুই সন্তানকে ওয়াকফে নও-এর বরকতময় তাহরীকের অন্তর্ভূক্ত করেন। জামাতের কর্মকর্তাদের খুবই সম্মান করতেন। তাঁর মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল। ওয়াক্ফ করার প্রবল বাসনা ছিল। তাঁর ডাইরির প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা আছে, ‘নির্বোধ বার বার মরে, আর বীর শুধুমাত্র একবারই মরে’। তাঁর এক বোন আমেরিকাতে থাকেন। তিনি কিছুদিন পুর্বে পাকিস্তানে এসেছেন। তিনি বলেন, আমার ডাইরিতে কিছু লিখে দাও। শহীদ এতে লিখেন - ‘আমার মাঝে এই প্রেম ও বিশ্বস্ততা এক মসীহ্‌র দোয়ার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে’।

শহীদের স্ত্রী বলেন, শাহাদাতের পূর্বে স্বপ্নে দেখেছি, ‘তিনি এসেছেন আর বলছেন আমার হাতে সময় খুব কম’। আমাকে বলতেন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো। নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন। পিতার সাথে সবসময় নামায সেন্টারে গিয়ে বাজামাত ফজরের নামায পড়তেন। একদিন আমি বল্লাম রাত সাড়ে বারটায় দারুয্ যিক্‌র থেকে এসেছো এখন আবার সাড়ে তিনটার সময় উঠে যাচ্ছো। আজ কিছুটা আরাম করে নাও। উত্তরে বললেন - ‘পার্থিব জগতের আরামের প্রতি মোটেও আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। পরকালের আরামের ব্যাপারেই আমি চিন্তা করি।’

শহীদ মোকাররম এজাযুল হক সাহেব, পিতা মোকাররম রহমত হক সাহেব। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী হযরত এলাহী বখ্‌শ সাহেব (রা.)-এর সাথে শহীদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। পিতৃনিবাস অমৃতসর জেলার পাটিয়ালা গ্রামে। তাঁর পিতা রেলওয়েতে চাকুরী করতেন বলে তাঁরা লাহোরেই বসবাস করেন। হল রোডে ইলেকট্রনিক্স রিপিয়ারিং এর কাজ করতেন। এছাড়া লাহোরের একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে স্যাটেলাইট টেকনিশিয়ান হিসাবেও কাজ করতেন। মসজিদ ‘দারুয যিক্‌র’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর। ঘটনার দিন এম.টি.এ’তে খিলাফতের প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষার অঙ্গীকার প্রচার করা হচ্ছিল। তখন তিনি মাথার উপর তোয়ালে রেখে অঙ্গীকার আওড়াতে লাগলেন। দারুয যিক্‌র মসজিদেই নিয়মিত নামায পড়তেন। ঘটনার দিনও জুমুআর নামায পড়ার জন্য কর্মস্থল থেকে সোজা মসজিদে গিয়েছিলেন। নামাযের জন্য বাইরে সিঁড়ির নিচে বসা ছিলেন। সন্ত্রাসীদের আক্রমনের পর ঘরে ফোন করেন আর সাথে সাথে নিজের কর্মক্ষেত্র টিভি চ্যানেলেও ফোন করে রিপোর্টিং করে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় গুলির আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তার পরিবার জানায়, দয়ালু ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সবার সাথে সদ্ব্যবহার করতেন। আর প্রত্যেক আর্থিক তাহরীকে উৎসাহের সাথে অংশ নিতেন। নাযেম আতফাল সাহেব বলেন, আমি যখনই তাঁর সন্তানদেরকে ওয়াকারে আমল এর জন্য বা জামাতের ডিউটি দেয়ার জন্য নিয়ে আসতাম এবং ফেরত দিয়ে আসতাম তিনি এই বলে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন, ‘আপনি আমাদেরকে এ সেবার সুযোগ দিয়েছেন’।

শহীদ মোকাররম শেখ নাদিম আহমদ তারেক সাহেব, পিতা মোকাররম শেখ মোহাম্মদ মানশা সাহেব। শহীদের পিতৃপুরুষ চিনিউটের অধিবাসী ছিলেন। তারা ব্যবসায়িক কারণে প্রথমে কলকাতায় এবং পরে ১৯৪৭ সালের পর তাঁর পিতা কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। পরবতীতে ১৯৭১ সালে স্থায়ীভাবে লাহোরে স্থানান্তরিত হন। শহীদের স্ত্রীর দাদা মোকাররম শেঠ মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেব বানী। তিনি কলকাতার মোকাররম সিদ্দিক বানী সাহেবের ছোট ভাই। শহীদ উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর স্পেয়ার পার্টস এর ব্যবসা শুরু করেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন আর ‘দারুয্ যিকর’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। নিয়মিত জুমুআর নামায পড়তেন আর সন্ধায় এম.টি.এ’তে প্রচারিত আমার জুমুআর খুতবা শুনে মসজিদ থেকে বাসায় যেতেন। ঘটনার সময় তাঁর ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হয় আর প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনি শহীদ হন। খুবই শান্তিপ্রিয়, ভদ্র ও নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কাজে থাকলেও ঘরে ফোন করে সন্তানদের নামায পড়ার খবর নিতেন। প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে গিয়ে বাজামাত নামায পড়তেন। তাহাজ্জুদ নামাযের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। জামাতী প্রয়োজনের জন্য কখনও তাঁর নিকট মোটর সাইকেল চাওয়া হলে তিনি তা দিয়ে দিতেন আর নিজে বেবি টেক্সিতে করে মসজিদে আসতেন। হাসিমুখে সৃষ্টির সেবা করতেন।

শহীদ মোকাররম আমের লতিফ প্রাচাহ্ সাহেব, পিতা আব্দুল লতিফ প্রাচাহ্ সাহেব। শহীদের পিতা সারগোধার অধিবাসী এবং জেলা আমেলার সক্রিয় কর্মী ছিলেন আর হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.)-এর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। হুযূর যখনই তাদের এলাকায় যেতেন, তখন অধিকাংশ সময় শহীদের পিতা মোকাররম ডাঃ আব্দুল লতিফ সাহেবের ঘরেই থাকতেন। শহীদের পিতার নানা মোকাররম বাবু মোহাম্মদ আমীন সাহেব হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর হাতে বয়’আত গ্রহণ করেছিলেন। শহীদ লাহোর থেকে এম.বি.এ করেছিলেন। নিয়মিত জামাতী চাঁদা ও সদকা দিতেন। বুযুর্গদের সেবা করতেন। সারগোধা জেলার সাবেক আমীর, মির্যা আব্দুল হক সাহেবের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। আক্রমনের সময় ভাইকে ফোনে বলেন, ‘আমার চারপাশে শহীদদের লাশ পড়ে আছে’। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তাঁর কাছে এসে দেখা যায় তাঁর চেহারায় বন্দুকের বাটের আঘাতের চিহ্ন, যেন কোন সন্ত্রাসীর সাথে হাতাহাতি হয়েছে এবং সে তাঁকে আঘাত করেছে। এছাড়া তাঁর হাতে গ্রেনেডের আঘাতেরও একটি চিহ্ন ছিল। ঘটনার সময় বাইরে সিঁড়ির নীচে তিনি বসে ছিলেন আর সেখানেই শহীদ হয়েছেন। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, খুবই নিষ্ঠাবান ও বিশ্বস্ত লোক ছিলেন। কখনো কারো কাছে আহমদী হবার বিষয়টি লুকাতেন না। তাঁর পিতা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পিতার অনেক সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। তেমনিভাবে মায়েরও সেবা-যত্ন করতেন। চাঁদা ও আর্থিক কুরবানীর তাহরীক সমূহে বেশী বেশী অংশ গ্রহণ করতেন। সাধারণত গোপনে সদকা ও খয়রাত করতেন। সারগোধার অনেক গরীব ও দুস্থ রোগীকে লাহোরে এনে বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতেন। নিয়মিত নামায পড়তেন ও কুরআন পাঠ করতেন। তাঁর পরিবারের লোকজন জানিয়েছে, তারা রাত আড়াইটা-তিনটার সময় তাঁকে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে ও কুরআন পাঠ করতে দেখেছেন। শহীদের মা জানিয়েছেন, শহীদের মরহুম পিতাকে আমি ক্রমাগত কিছুদিন যাবত স্বপ্নে দেখছিলাম। শাহাদতের ক’দিন আগে তিনি তাঁর মায়ের জন্য চার জোড়া নতুন কাপড় নিয়ে আসেন। তাঁর মা বলেন, আমার কাছে অনেক কাপড় আছে। তখন তিনি বলেন, ‘মা! ক’দিন বাঁচব তার ঠিক নেই। আপনি আমার দেয়া কাপড়গুলো পড়বেন’।

শহীদ মোকাররম মির্যা জাফর আহমদ সাহেব, পিতা-মোকাররম মির্যা সফদর জঙ্গ হুমায়ুন সাহেব। শহীদ মরহুম ১৯৫৪ সালের অক্টোবরে মান্ডি বাহাউদ্দিনে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর খিলাফতকালে তাঁর দাদা মোকাররম মির্যা নযীর আহমদ সাহেবের মাধ্যমে তার বংশে আহমদীয়াত প্রবেশ করে। শহীদ করাচী থেকে মেকানিক্সে তিন বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে, পরে আরো এক বছরের কোর্স করেন। দক্ষতা অনুসারে করাচীতে একটি চাকুরীতে যোগদান করেন। এরপর জাপান চলে যান। ১৯৮১ সাল থেকে সৌর-শক্তি প্রকৌশলী হিসেবে একুশ বছর জাপানে কাজ করেন। জাপানের মিশন হাউস বন্ধ হয়ে যাবার পর তাঁর বসবাসের ঘরটি মিশন হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হত। তিনি ১৯৮৩ সালে কোরিয়াতে ওয়াক্ফে আরযী করেন এবং ১৯৮৫ সালে জাপানের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাজ্যের জলসায় যোগদানের সৌভাগ্য লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের সদর খোদ্দামুল আহমদীয়া হিসেবে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন এবং সেখানে আযান দেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। ১৯৯৯ সনে বাইতুল ফুতুহ্’র ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের সময় তিনি ও তাঁর স্ত্রী জাপান জামাতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। জাপানে - টোকিও জামাতের প্রেসিডেন্ট এবং সেক্রেটারী মাল হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাপানের নায়েব আমীর হিসেবে জামাতের সেবা করার সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.) একবার শহীদ মরহুমের অনুগত্য ও তাক্বওয়া প্রদর্শনের দৃষ্টান্তে সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, ‘জাপান জামাত যেন তাঁর অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের উপর চলার সৌভাগ্য পায়’। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন আর ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তাঁর মাথার পিছন দিকে গুলি লাগে এবং গ্রেনেডের আঘাতে তাঁর ডান হাতও ক্ষতবিক্ষত হয়, ফলে ঘটনাস্থলেই শাহাদত বরণ করেন। মরহুম শহীদের স্ত্রী বলেন, তিনি খিলাফতের প্রতি গভীর ভালবাসা রাখতেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবাই তাঁকে সম্মান করত, সবার বন্ধু ছিলেন তিনি। আমানত রক্ষাকারী, অঙ্গীকার পালনকারী ও উচ্চমানের কুরবানীকারী ছিলেন। সব বিষয়ে তিনি সাধুতা অবলম্বন করতেন। একজন আদর্শ স্বামী ছিলেন। আমার ছোট-খাট বিষয়ের প্রতিও লক্ষ্য রাখতেন। আমি কখনো ক্লান্ত থাকলে খাবারও তৈরী করে দিতেন। কারো গলগ্রহ হতেন না। নামাযে মনোযোগ সহকারে দোয়া করতেন এবং তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। একান্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতো।

শহীদ মির্যা মাহমুদ আহমদ সাহেব, পিতা-মোকাররম আকবর আলী সাহেব। শহীদ মরহুম নারোয়ালের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা এনায়েতুল্লাহ্ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। টেলিফোন বিভাগে চাকুরি করতেন এবং ২০০৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মডেল টাউনের বাইতুন্ নূর মসজিদে শাহাদত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। ঘটনার দিন মসজিদের পিছনের হলে বসে ছিলেন। সে অবস্থায় একটি গুলি তাঁর মাথায় লাগে আর তাতেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলেন, জামাতের সেবায় সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন। অনেকবার ওয়াক্ফে আরযীর সুযোগ পেয়েছেন। অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের, সাধু প্রকৃতির পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। শাহাদতের চার দিন পূর্বে তাঁর স্ত্রী স্বপ্নে দেখেন, ‘একটি খুব সুন্দর বাগান, যেখানে ঠান্ডা বাতাস ও জলধারা বইছিল। অতি সুন্দর মহল বানানো আছে। মাহমুদ সাহেব আমাকে বলেন, তোমাদের জন্য আমি ঘর বানিয়ে দিয়েছি আর এটি আমার মহল। এখন থেকে আমি এখানেই থাকব। পুরো মহল সুরভিত ছিল।’ আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে সুমহান মর্যাদায় উন্নীত করুন।

শহীদ মোকাররম শেখ মোহাম্মদ আকরাম আতহার সাহেব, পিতা-মোকাররম শেখ শামসুদ্দীন সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতা সারগোধার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর সেবা করার সৌভাগ্য পান। শহীদ হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর খিলাফত কালে বয়’আত করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। শহীদ মরহুমের শ্বশুর মোকাররম খাজা মোহাম্মদ শরীফ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর পিতা মোহতরম শেখ শামসুদ্দীন আহমদ সাহেবের তবলীগে মরহুম হযরত মির্যা আব্দুল হক সাহেবের বংশে আহমদীয়াত বিস্তার লাভ করে। মৌলভী আতাউল্লাহ খাঁন সাহেব, দরবেশ কাদিয়ান তাঁর ভাই ছিলেন এবং পোল্যান্ডে কর্মরত জামাতের মুরব্বী মোকাররম মুনীর আহমদ মুনাওয়ার সাহেব সম্পর্কে তাঁর ভাতিজা হন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। সন্ত্রাসীদের গুলি তাঁর মাথা ও বুকে বিদ্ধ হয় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদত বরণ করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলেছে, শহীদ মরহুম দু-তিন মাস যাবৎ বলছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে’। তাঁর স্ত্রী স্বপ্নে ‘রাবওয়ায় আনসারুল্লাহ্‌র হল দেখেছিলেন যা পূর্বে কখনো তিনি দেখেন নি’। তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম সেখান থেকে আমি তিনটি তোহ্ফা পেয়েছি এবং তা নিয়ে আমি লাহোর রওয়ানা হচ্ছি’। শহীদদের জানাযাও আনসারুল্লাহ্‌র হলেই হয়েছিল। শহীদ মরহুমের তবলীগের প্রতি খুবই আগ্রহ ছিল। নিকটবর্তী গ্রাম্য এলাকায় মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তবলীগ করতেন। নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। বেতন পাবার সাথে সাথে সেক্রেটারী মাল সাহেবের ঘরে গিয়ে চাঁদা আদায় করতেন। খিলাফত জুবিলীর সময় প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রবন্ধ লিখেন এবং তাতে এ গ্রেড অর্জন করেন।

শহীদ মোকাররম মির্যা মনসুর বেগ সাহেব, পিতা-মরহুম মোকাররম মির্যা সারোয়ার বেগ সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ অমৃতসরের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর চাচা মির্যা মুনাওয়ার বেগ সাহেব ১৯৫৩ সনের পূর্বে বয়’আত গ্রহণ করেছিলেন আর ১৯৮৫ সালে আহমদীয়াতের এক শত্রু তাঁকে শহীদ করে। আল্লাহ্‌র ফযলে তিনি মুসী ছিলেন এবং মডেল টাউনের বাইতুন্ নূর মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ২৯ বছর। সেক্রেটারী ইশায়াত, নাযেম তাহরীকে জাদীদ এবং উমুমীর ডিউটি স্কোয়াডে তিনি খিদমতের সুযোগ পাচ্ছিলেন। জুমুআর দিন সকালে কায়েদ সাহেব তাঁকে ডিউটিতে যেতে বলেন; তিনি জবাব দেন, ‘কায়েদ সাহেব! চিন্তা করবেন না। প্রয়োজনে প্রথম গুলি আমি বুক পেতে নিব’। মডেল টাউনের বাইতুন্ নূরে চেকিংয়ের দায়িত্ব পালনের সময় সন্ত্রাসীরা এসেই তাঁর উপর গুলি বর্ষণ আরম্ভ করে এবং সর্বপ্রথম তাঁকেই গুলি করে। তাঁর শরীরে কয়েকটি গুলিবিদ্ধ হবার কারণে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়ে যান। শহীদ মরহুম দুর্ঘটনার পূর্বে সকাল বেলা পরিবারে সদস্যদেরকে তাঁর একটি স্বপ্ন শুনান যে, ‘আমাকে কেউ মারছে এবং আমার পেছনে কালো কুকুর লেগে আছে’। শহীদ মরহুম জামাতের সেবাকারী এবং আনুগত্যের প্রেরণায় সমৃদ্ধ ছিলেন। কোমল প্রকৃতির, হাস্যোজ্জ্বল ও পাঁচওয়াক্ত নামাযী ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর বয়স ২৬ বছর। তাদের সবেমাত্র বিয়ে হয়েছিল এবং তিনি এখন সন্তান সম্ভবা। আল্লাহ্ তা’লা তাকে পুণ্যবান, সৎ, স্বাস্থ্যবান এবং দীর্ঘজীবি সন্তান দান করুন। তাঁর মা ও বিধবা স্ত্রী আনন্দের দিন দেখার সৌভাগ্য লাভ করুন।

শহীদ মিয়া মোহাম্মদ মুনীর আহমদ সাহেব, পিতা-মোকাররম মৌলভী আব্দুস সালাম সাহেব। শহীদ মরহুম হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর নাতি ছিলেন। তিনি ১১ অক্টোবর ১৯৪০ সালে দক্ষিণ হায়দ্রাবাদে তাঁর নানা হযরত মৌলভী মীর মোহাম্মদ সাঈদ সাহেব (রা.)-এর বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নানাকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বয়’আত নেয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমে দক্ষিণ হায়দ্রাবাদে অনেক মানুষ আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। তিনি বি.এ পর্যন্ত শিক্ষালাভ করেন এবং ১৯৬২ সালে লাহোরে স্থানান্তরিত হন। মডেল টাউনের বাইতুন্ নূর মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ঘটনার দিন তিনি মসজিদের আঙ্গিনায় জেনারেল নাসের সাহেবের সাথে চেয়ারে বসে ছিলেন। সন্ত্রাসীদের প্রথম গুলি তাঁর মাথায় লাগে, ফলে সেখানেই তিনি শহীদ হয়ে যান। প্রায় দশ বছর পূর্বে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, ‘হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর কবরের পাশে একটি কবর তৈরি করা হয়েছে, জিজ্ঞেস করে জবাব পেলেন যে, এটি তাঁরই কবর।’ শাহাদতের পর স্বপ্নের ব্যাখ্যা বোঝা গেল যে, প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁরই কবর কেননা, তিনি হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশের ছিলেন এবং দু’জনের শাহাদতও সামঞ্জস্যপূর্ণ। শাহাদতের পর শহীদের মেয়ে স্বপ্নে দেখেন যে, ‘তার পিতা এসে বলছেন, আমার কামরাটি গুছিয়ে দাও। তখন গৃহপরিচারক তা গুছিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর ক’জন মেহমান আসে এবং তারা ইচ্ছা প্রকাশ করে যে, আমরা কামরাটি দেখব।’

শহীদ মোকাররম ডাক্তার তারেক বশীর সাহেব ছিলেন চৌধুরী ইউসুফ খাঁন সাহেবের সুযোগ্য পুত্র। শহীদ মরহুমের পিতা শাক্কর গাড়হ্-এর অধিবাসী ছিলেন। শহীদের পিতা বয়’আত করে আহমদী হন। শহীদ মরহুম করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর লাহোর চলে যান এবং সেখানে এম.বি.বি.এস ছাড়াও মেডিকেলের অন্যান্য ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৫ বছর কসূরের সরকারী হাসপাতালে মানবসেবা করেন এবং শাহাদাতের সময় মিউ হাসপাতাল লাহোরে এ.এম.এস হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দারুয যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। বাইরে আক্রমনের পর সন্ত্রাসীরা মসজিদের ভেতরে প্রথম যে গ্রেনেডের বিষ্ফোরণ ঘটায় এতেই তিনি গুরুতর আহত হন শাহাদতের অমিয় সুধা পান করেন। শহীদ মরহুমের বিবি শাহাদাতের কয়েক দিন পূর্বে স্বপ্নে দেখেন যে, ‘আকাশে একটি সুন্দর ঘর - যেটি বাতাসে ভাসমান এবং তিনি এর মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছেন।’ দ্বিতীয় স্বপ্নে দেখেন, ‘প্রচন্ড ভূমিকম্প এবং ঝড় এসেছে আর আমি দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছি কিন্তু তাঁকে খুঁজে পাচ্ছি না।’ শহীদ মরহুম অত্যন্ত রুচিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। কখনো কারো সাথে রুক্ষ্ম আচরণ করেন নি। বাচ্চাদেরকে বিশেষ করে মেয়েদেরকে খুবই ভালবাসতেন। অ-আহমদী বাড়ীওয়ালা মরহুমের শাহাদাতের খবর শুনে এত কষ্ট পেয়েছেন যে, আবেগে চিৎকার করে উঠেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পুস্তকাদী অতি যত্নসহকারে পড়তেন। নিয়মিত চাঁদা দিতেন। স্ত্রী’কে বলে রেখে ছিলেন, প্রতিদিনের আয় থেকে একটি অংশ গবিদের জন্য পৃথক করে রাখবে। হুযূর বলেন, মরহুম শহীদ আমার খুতবা নিয়মিত শুনতেন এবং বার বার শুনতেন। তাঁর এক পুত্রও এ ঘটনায় আহত হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা শহীদের আহত পুত্রকে এবং অন্যান্য আহতদেরকে পূর্ণ আরোগ্য দান করুন।

শহীদ মোকাররাম এরশাদ আহমদ বাট সাহেব হচ্ছেন মোকাররম মাহমুদ আহমদ বাট সাহেবের সুপুত্র। শহীদ মরহুমের প্রপিতামহ মোকাররম আব্দুল্লাহ্ বাট সাহেব বয়’আত করে আহমদী হন। তিনি শিয়ালকোটের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর প্রমাতামহ হযরত জান মোহাম্মদ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। শহীদ মরহুম লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। বায়তুন নূর মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। নিজ হালকার নায়েব যয়ীম আনসারুল্লাহ্ এবং সেক্রেটারী তাহরীকে জাদীদ হিসেবে খিদমত করার সৌভাগ্য পেয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি মসজিদের প্রথম কাতারে বসে ছিলেন। আক্রমনের শুরুতেই তাঁর শরীরে তিন-চারটি গুলি লাগে, ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়ে যান। তার স্ত্রী বলেন, শহীদ মরহুম বিনা ব্যতিক্রমে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তেন এবং প্রতিদিন উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। খিলাফতের প্রতি গভীর ভালবাসার সম্পর্ক রাখতেন। নিজ সাধ্যের অতিরিক্ত চাঁদা দিতেন। সিলসিলাহ্‌র অনেক পুস্তকাদি তিনি অধ্যায়ন করেছেন। অনেক বেশি দোয়া করতেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন।

মোকাররম মোহাম্মদ হোসেইন মালহী সাহেব শহীদ, পিতা-মোকাররম মোহাম্মদ ইব্রাহীম সাহেব। শহীদ মরহুম শিয়ালকোটের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর সম্মানিত পিতা বয়’আত করে জামাতের অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। ৩৪ বছর বয়স থেকে তিনি লাহোরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মডেল টাউনের বায়তুন নূর মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তাঁকে লাহোরের হান্ডুগুজ্জারে সমাহিত করা হয়েছে। সন্ত্রাসীর গুলি তাঁর হাতে এবং পেটে বিদ্ধ হলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। আহত অবস্থায় তাঁকে মিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অপারেশন থিয়েটারে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শহীদ মরহুম বিনা ব্যতিক্রমে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতেন। নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। সব ধরনের পুণ্য কাজে অংশগ্রহণ করতেন। পেশায় তিনি একজন ইলেকট্রিশিয়ান ছিলেন। গরীব এবং অভাবীদের কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করতেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন।

মোকাররম মির্যা মোহাম্মদ আমীন সাহেব, মোকাররম হাজী আব্দুল করিম সাহেবের সুপুত্র। শহীদ মরহুমের পিতা জম্মু কাশ্মীরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে বয়’আত করে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গুলি বর্ষণ ও গ্রেনেড হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩১ মে হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘটনার আগের দিন রাতে শুয়ে ছিলেন, হঠাৎ হাত উঠিয়ে আল্লাহু আকবর বলে উঠে বসলেন। উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং মিশুক ছিলেন। জামাতী কাজে বেশি বেশি অংশগ্রহণ করতেন। জামাতী বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগীতায় তিনি পুরষ্কারাদিও পেয়েছেন।

শহীদ মোকাররম মালেক যুবায়ের আহমদ সাহেব, মোকাররম মালেক আব্দুর রশিদ সাহেবের পুত্র। শহীদ মরহুম ফয়সালাবাদের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা মালেক আব্দুল মজীদ খাঁন সাহেব হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগেই বয়’আত করেন কিন্তু তাঁর (আ.) সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয় নি। শহীদ মরহুম ফয়সালাবাদে ওয়াপ্দাতে চাকুরি করতেন। অবসর গ্রহণের পর ঘটনার এক মাস পূর্বে লাহোরে এসেছিলেন। মসজিদ বায়তুন নূরে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। ঘটনার সময় তাঁর ছেলে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে পিতাকে খুঁজছিল তা দেখে মরহুম শহীদ বললেন, ‘দৌড়াদৌড়ি করছ কেন! যদি কিছু হয় তবে এখানে আমাদের ভাইদের সাথে আমরাও শহীদ হয়ে যাব’। ঠিক সে সময় তাঁর হৃদপিন্ডে একটি গুলি বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি শহীদ হয়ে যান। তিনি নামাযী ছিলেন এবং তাহাজ্জুদ নামাযের বেলায় কখনো অলসতা প্রদর্শন করেন নি। অধিকাংশ সময় তিনি এম.টি.এ দেখতেন। শহীদ মরহুম বলতেন, ‘যদি ক্লান্তির কারণে কখনো ঘুম না ভাঙ্গতো তখন মনে হতো কেউ আমাকে জোর করে উঠিয়ে দিয়েছে’। ছেলে গাড়ি ক্রয় করলে তাকে নসীহত করে বলেন, ‘দেখ! এতে কখনো রেডিও, টেপ রেকর্ডার বা টিভি লাগাবে না। এর পরিবর্তে সুবহানাল্লাহ্ এবং দরুদ শরীফ পড়বে’ এবং নিজেও এর উপর আমল করতেন।

চৌধুরী মোহাম্মদ নেওয়াজ সাহেব শহীদ ছিলেন মোকাররম চৌধুরী গোলাম রসূল সাহেব জাজ্জাহ্’র পুত্র। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ শিয়ালকোটের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর ফুপা হযরত চৌধুরী গোলাম আহমদ মুহার সাহেব (রা.) এবং তাঁর বাবা হযরত চৌধুরী শাহ্ মোহাম্মদ মুহার সাহেব (রা.) নারওয়ালের অধিবাসী; হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর পিতা এবং বড় ভাই হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-এর খিলাফতকালে বয়’আত করেন। বি.এ.বি.এড পাশ করার পর মরহুম শহীদ শিক্ষা বিভাগে চাকুরি নেন। ১৯৯১ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাশ্মীরের সরকারী স্কুল থেকে অবসর গ্রহণ করেন। নিজ হালকায় মোহাসেব হিসেবে সেবা করার সৌভাগ্য লাভ করেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ঘটনার দিন তিনি নতুন কাপড় ও জুতা পরেছিলেন। সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত গ্রেনেড বিষ্ফোরণে তিনি শহীদ হয়ে যান। কয়েক মাস পূর্বে তাঁর স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছিলেন, مبارک ہو آپکے خاوند زندہ ہیں (অর্থাৎ সুসংবাদ, আপনার স্বামী অমর)। তাঁর স্ত্রী আরও বলেন, তিনি সত্যভাষী ছিলেন। স্বাস্থ্যবান এবং কর্মঠ ছিলেন। তাঁকে বয়সের তুলনায় ২০ বছরের ছোট বলে মনে হত। তা’লীমুল ইসলাম কলেজে স্কাউট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। বিভিন্ন ভাষার দক্ষতা ছিল। জামাতি বই-পুস্তক ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের বই-পুস্তকও চর্চা করতেন।

সবশেষে হুযূর মোকাররম শেখ মোবাশ্বের আহমদ সাহেব শহীদের উল্লেখ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন, মোকাররম শেখ হামিদ আহমদ সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ কাদিয়ানের অধিবাসী ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি রাবওয়া চলে আসেন। তাঁর দাদা মোকাররম শেখ আব্দুর রহমান সাহেব দ্বিতীয় খলীফার যুগে বয়’আত করার সৌভাগ্য লাভ করেন। মরহুমের নানী হযরত মেহের বিবি সাহেবা (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবা ছিলেন। মসজিদ ‘বায়তুন নূর’-এ শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। সন্ত্রাসীদের বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মসজিদের দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেন কিন্তু একটি গুলি তাঁর পেটের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বের হয়ে যায়। এছাড়া গ্রেনেড বিষ্ফোরণেও তিনি গুরুতর আহত হন এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এতকিছু সত্ত্বেও তিনি দুই-তিন ঘন্টা জীবিত ছিলেন। হাত দিয়ে পেট চেঁপে ধরে নিজেই হেটে হেটে এ্যাম্বুলেন্সের কাছে যান কিন্তু হাসপাতালে যাবার পথিমধ্যেই তিনি শাহাদাত লাভ করেন। তাঁর সম্মানিতা স্ত্রী বলেন, তিনি একজন আদর্শ স্বামী ছিলেন। প্রায় বিশ বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আমরা যৌথ পরিবারে বসবাস করতাম। আমার স্বামী সবার প্রতি খেয়াল রেখেছেন এবং কখনো কাউকে অভিযোগ করার সুযোগ দেন নি। শহীদের একজন নিকটাত্মীয় শাহাদাতের পূর্বে স্বপ্নে দেখেছেন, ‘মোবাশ্বের ভাই সাদা রঙ-এর গাড়িতে বসে আছে যা আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে’। মৃত্যুর দুই দিন পর তাঁর কন্যা মারিয়া মোবাশ্বের স্বপ্নে দেখেছেন, ‘আব্বু দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি জীবিত! তিনি বল্লেন, আমি ভাল আছি এবং তোমাদের সাথে আছি’। শহীদ মরহুম নিতান্তই সহজ-সরল মনের মানুষ ছিলেন। গরীবদেরকে সাহায্য করতেন এবং ভালবাসতেন। ছোট-বড় সবাইকে সম্মান করতেন।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা সকল শহীদের পদমর্যাদা উন্নীত করুন। তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের হাফেজ ও নাসের হোন। যেসব শহীদের পিতা-মাতা এখনও জীবিত আছেন তাদেরকে এ বেদনা সহ্য করার শক্তি দিন। তাঁদের বংশধরদের ঈমানকে দৃঢ় করুন। সকল পরিস্থিতিতে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার শক্তি অর্জন করুক। আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা তাদেরকে নিজ করুণা এবং সুরক্ষার বেষ্টনীতে স্থান দিন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে