In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

লাহোরের শহীদদের বিবরণ: ২

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৮ই জুন, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, শহীদদের বিষয়ে আলোচনা চলছে, এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমি আরো কয়েকজন শহীদের বিবরণ তুলে ধরছি।

শহীদ মোকাররম আব্দুর রশিদ মালেক সাহেব, পিতা মোকাররম আব্দুর হামিদ মালেক সাহেব। শহীদ মরহুম লালা মূসার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা হযরত মৌলভী মেহের দ্বীন সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ৩১৩ জন সাহাবার একজন ছিলেন। শাহাদাতকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন; মজলিস আনসারুল্লাহ্‌র একজন কর্মঠ সদস্য ছিলেন এবং সেক্রেটারী ওসীয়্যত ও সেক্রেটারী তালীমুল কুরআন হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি মসজিদ ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন। জুমুআর নামাযে যাবার পূর্বে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, “হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেছেন, কখনো কখনো বড় মসজিদে জুমুআর নামায পড়া উচিত, তাই আজ আমি ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ যাচ্ছি”। তিনি মসজিদের মূল অংশে চেয়ারে বসেছিলেন। আক্রমনের পর বাসায় ফোন করে বলেন, আমার পায়ে গুলি লেগেছে। তাঁর স্ত্রী বলেন, উনার সাথে কথা বলার সময়ও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। শহীদের স্ত্রী আরো বলেন, ‘আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টিতেই আমি সন্তুষ্ট’। তিনি খুবই দৃঢ় মনোবলের অধিকারীনী। তিনি নিজেও লাজনা ইমাইল্লাহ্‌র একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি বলেন, পিতা হিসেবে আমার স্বামী একান্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। আমাদের তিনটি কন্যা সন্তান কিন্তু আক্ষেপ করেও তিনি কখনো এ কথা বলেন নি যে, আমার কোন ছেলে নেই। মেয়েদের প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন এবং তাদেরকে তিনি জাগতিক ও ধর্মীয় পড়াশোনায় শিক্ষিতা করে গড়ে তুলেছেন আর তিন সন্তানের সাথেই সমব্যবহার করেছেন। একটি মেয়ে আমাদের বাসায় কাজ করত, তাকে তবলীগ করে বয়’আত করান এবং সুন্দরভাবে লালন-পালন করে বিয়ে দেন। তিনি সবাইকে খুব ভালবাসতেন এছাড়া দোয়া প্রেমী, সহজ-সরল, খোদাভীরু, মিশুক এবং অনুগত মানুষ ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লার তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন।

শহীদ মোকাররম রশীদ হাশমী সাহেব, পিতা মোকাররম মুনির শাহ্ হাশমী সাহেব। মরহুদ শহীদ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী মোকাররম শাহ্ দ্বীন হাশমী (রা.) সাহেবের প্রপৌত্র ছিলেন। তাঁর পিতা এবোটাবাদের জেনারেল পোষ্ট-মাস্টার ছিলেন। ১৯৭৪ সালের গন্ডগোলের সময় বিরুদ্ধবাদীরা তার বাড়ি-ঘর জালিয়ে দেয়। শহীদ রেডিও পাকিস্তান এর পেশওয়ার ষ্টুডিওতে সংবাদ পাঠকের চাকরী করতেন; ‘নওয়ায়ে ওয়াক্ত’ পত্রিকায় কলামও লিখতেন। শাহাদাত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি মজলিস আনসারুল্লাহ্‌র একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। ১৬ বছর যাবত তিনি হালকা প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে মুসী ছিলেন। ইনিও ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শরীরে ৩টি গুলি লেগেছিল। আহমদী, অ-আহমদী সকলেই তাঁকে খুব সম্মান করত। তিনি সর্বদা কুরআন তিলাওয়াত ও নযম পাঠ করতেন। খিলাফতের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল, তাই প্রতিটি তাহরিকে তিনি সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করতেন।

শহীদ মোকাররম মুজাফ্‌ফর আহমদ সাহেব, পিতা দরবেশ মোকাররম মৌলানা ইব্রাহীম কাদিয়ানী সাহেব। শহীদের শ্বশুর হযরত মিয়া ইলম দ্বীন সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর পিতা কাদিয়ানের সাবেক নাযের ইসলাহ্ ও ইরশাদ এবং ইশায়াত ছিলেন। তিনি হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর সন্তানদের শিক্ষক হওয়ারও মর্যাদা লাভ করেন। মরহুম শহীদ নিজ হালকার ইমামুস সালাত ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবত তিনি ধরমপুর মজলিসের সেক্রেটারী মাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনিও ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদত বরণ করেন আর সেসময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর শরীরে পাঁচটি গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনার সময় তাঁর আশেপাশে যারা ছিলেন তারা বলেছেন, আহত অবস্থায় তিনি নিজেও দরূদ শরীফ পড়ছিলেন এবং অন্যদেরকেও দরূদ পড়ার জন্য তাগিদ করছিলেন। তাঁর সহধর্মীনি বলেন, মুজাফ্‌ফর সাহেব বাল্যকাল থেকেই তাহাজ্জুদ নামাযে অভ্যস্ত ছিলেন। সন্তানদেরকেও তিনি এ ব্যাপারে তাগিদ দিতেন। উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পরই কুরআন পাঠ করতেন। কয়েক দিন পর পরই নফল রোযা রাখতেন। সবাইকে বলতেন, “আমার জন্য দোয়া কর, আমার শেষ পরিণতি যেন শুভ হয়”। তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলতেন না আর মিথ্যা বলা সহ্যও করতে পারতেন না। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেছেন। তাঁর বড় মেয়ে বলেছে, “রাবওয়াতে আমার মামাতো বোনের বিয়ে হয়েছে। আব্বাজান তাদের বাড়ি গিয়েছিলেন, সেখানে এম.টি.এ.-তে খিলাফত জুবলীর অঙ্গীকার দু’বার পুনঃপ্রচার হয়েছিল আর তিনি দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে এমনভাবে সেই অঙ্গীকার পাঠ করেন, যেন তিনি ছাড়া কামরায় আর কেউ নেই, আর কেবল তাঁকেই অঙ্গীকার করতে বলা হচ্ছে”। ১৯৮০ সালে তিনি হজ্জ্বব্রত পালন করারও সৌভাগ্য লাভ করেন।

শহীদ মোকাররম মিয়া মুবাশ্বের আহমদ সাহেব, পিতা মোকাররম মিয়া বরকত আলী সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতা ১৯২৮ সালে বয়’আত করেছিলেন। তিনি তাহরিক জাদীদের পাঁচ হাজার মুজাহিদের একজন ছিলেন। শহীদ মরহুম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী হযরত মিয়া নূরুদ্দীন সাহেব (রা.)-এর বংশধর। তারা গুজরাত জেলার খাঁড়িয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন পরবর্তীতে ২০০৮ সালে লাহোরে স্থানান্তরিত হন। শুরুতে তিনি উজিরাবাদে থাকতেন। তিনি কোকা-কোলার পরিবেশক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা তাঁর সব মালাপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়ায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় একবার তিনি অফিসিয়াল চিঠিপত্র জামাতের কেন্দ্রে জমা দিয়ে রাবওয়া থেকে উজিরাবাদ ফিরে যাচ্ছিলেন, চিনিউট পৌঁছার পর তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধরের চেষ্টা করা হয়; কিন্তু ড্রাইভারের সাহসিকতার কারণে সে যাত্রা তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তবে, গুজরাঁওয়ালা যাবার পর মিছিলের লোকজন আবার তাঁর উপর আক্রমন করে বসে আর কোন মতে প্রাণ বাঁচিয়ে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরেন।

হুযূর বলেন, তখন পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ ছিল। সে সময় যারা কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে আসতেন তাঁরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেই আসতেন। মরহুম শহীদ সর্বদা কুরবানীর জন্য প্রস্তুত থাকতেন। ১৯৯৮ সালে পুনরায় তিনি কোকা-কোলার পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা আরম্ভ করেন। বিভিন্ন প্রকার লোভ-লালসা দেখানো সত্ত্বেও তিনি সততা এবং নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করেন। তিনি উজিরাবাদ জামাতের আমীর ছিলেন। তাঁর এক ছেলে কমর আহমদ সাহেব, মুরব্বী সিলসিলাহ্ হিসেবে বেনিনে কর্মরত আছেন। তিনি একজন মুসী ছিলেন আর দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তাঁর স্ত্রী বলেছেন, “তাঁর সাথে আমার ৩৯ বছরের সংসার। তিনি কখনো উফ্ শব্দটিও করেন নি এবং সন্তানদেরকে কখনো কিছু বলেন নি। আমি যদি কিছু বলতাম তবে তিনি বলতেন, দোয়া কর, আমিও তাদের জন্য দোয়া করছি”। বাড়িতে কোন ধরনের পরচর্চা করা পছন্দ করতেন না বরং এরূপ করতে নিষেধ করতেন। গুজরাঁওয়ালাতে একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। সেই বাড়ির অ-আহমদী মালিক শহীদ মরহুম সম্পর্কে বলেতেন, “আমার সৌভাগ্য যে, মিয়া মুবাশ্বের সাহেব আমার ভাড়াটিয়া; আমি দোয়া করি - আল্লাহ্ তা’লা যেন আমার সন্তাদেরকেও তাঁর মত ভাল মানুষ বানায়”। মরহুম শহীদ অধিকাংশ সময় বলতেন, “আমি একজন অযোগ্য মানুষ, আল্লাহ্ তা’লা যেন আমাকে ৩৩ নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে দেন”। তাঁর দোয়া কবুল করতঃ আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে শতভাগ নম্বর দিয়ে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেছেন।

শহীদ ফিদা হোসেন সাহেব, পিতা মোকাররম বাহাদুর খাঁন সাহেব। তিনি গুজরাত জেলার খাঁড়িয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। চার বছর বয়সে তিনি পিতা-মাতাকে হারান। ইনি মিয়া মুবাশ্বের সাহেবের কাজিন। পিতামাতাকে হারানোর ফলে তিনি ছোট বেলা থেকেই মিয়া মুবাশ্বের সাহেবের অভিভাবকত্বে প্রতিপালিত হন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন আর মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। ইনি ‘দারুয্ যিক্‌র’এ শাহাদাত লাভ করেন। সন্ত্রাসীদের ছোড়া ৩৫টি গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

শহীদ খাওয়ার আইয়ূব সাহেব, পিতা মুহাম্মদ আইয়ুব খাঁন সাহেব। শহীদ মরহুমের জন্ম সারগোদা জেলার ভেড়াতে হলেও তাঁর পরিবার গিলগিতের অধিবাসী ছিল। ১৯৭৮ সালে তিনি ওয়াপদায় একাউন্টস ও বাজেট অফিসার হিসেবে চাকুরী জীবন আরম্ভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বয়’আত করে আহমদী হন। শহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি একজন মুসী ছিলেন। সেক্রেটারী ওয়াকফে নও এবং হিসাব রক্ষক হিসেবে জামাতের খিদমত করছিলেন। মজলিস আনসারুল্লাহ্‌র সাবেক কায়েদ ছিলেন। তিনিও দারুয্ যিক্‌র’এ শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন; বা-জামাত নামায পড়তেন। তাঁর সম্পর্কে অন্যান্য মানুষের মতামতও একই যে, তিনি একজন ভাল মানুষ ছিলেন এবং তাঁর মধ্যে ব্যবস্থাপনার খুব ভাল যোগ্যতা ছিল। খুব ভালভাবে ছেলেমেয়েদের তরবিয়ত করেছেন।

মোকাররম শেখ মুহাম্মদ ইউনুস সাহেব শহীদ, পিতা মোকাররম শেখ জামিল আহমদ সাহেব। মরহুম শেখ ইউনুস সাহেব ১৯৪৭ সালে “ভারতের আমরোওয়াহ্’তে” জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে কাদিয়ান এবং ১৯৫৫ সালে রাবওয়াতে আসেন। তাঁর পিতা শেখ জামিল আহমদ সাহেব হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর খিলাফতকালে বয়’আত করে আহমদী হন। তিনি কাদিয়ানের একজন দরবেশ ছিলেন। শহীদ মরহুম রাবওয়াতে মেট্রিক পাস করেন। তিনি সদর আঞ্জুমানে আহমদীয়ার একজন নিয়মিত কর্মী ছিলেন। ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি লাহোরে তাঁর ছেলের কাছে চলে যান। তিনি সেখানে সেক্রেটারী ইসলাহ্ ও ইরশাদ এবং দাওয়াতে ইলাল্লাহ্‌র কাজ করছিলেন। বায়তুন্ নূর মডেল টাউন মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন। তাঁর মাথা ও বুকে গুলি লেগেছে। গ্রেনেড বিষ্ফোরণে তাঁর পাজর ক্ষত-বিক্ষত হওয়ায় তিনি শহীদ হন। শেখ সাহেব স্বপ্নে দেখেছিলেন, ‘রাবওয়াতে একটি খুব সুন্দর রাস্তা অথবা খুব সুন্দর গালিচা বিছানো আছে। সেখানে বড় বড় চেয়ারে খলীফাগণ বসে আছেন এবং সবচেয়ে উঁচু চেয়ারে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বসেছেন এবং তিনিও সেখানে হাটু গেড়ে বসে আছেন।’ তাঁর স্ত্রী বলেন, তিনি খিলাফতের প্রতি খুবই অনুরাগী ছিলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তেন। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও প্রচন্ড গরমে এবং কনকনে শীতের সময়ও তিনি মসজিদে গিয়ে বাজামাত নামায পড়তেন। খোদা তা’লার প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল। তিনি বলতেন, বাহ্যত অসম্ভব কাজও খোদা তা’লার ফযলে সম্ভবে পরিণত হয়। তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ গুযার ছিলেন। অভাবীদের প্রতি খেয়াল রাখতেন। সহজ-সরল এবং অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে এর উত্তম প্রতিদান দিন।

শহীদ মোকাররম মাসুদ আহমদ ভাট্টি সাহেব, পিতা মোকাররম আহমদ দ্বীন সাহেব ভাট্টি। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ ‘কসুর’ জেলার ‘খাড়িপাড়’ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা মোকাররম জামাল দ্বীন সাহেব ১৯১১-১২ সালে বয়’আত করেন। ১৯৭৫ সালে এই পরিবার লাহোরে চলে আসেন। তিনি ৩৩ বছর বয়সে ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে জুমুআর পূর্বে সুন্নত নামায পড়ছিলেন এমন সময় গোলাগুলি শুরু হয়। সালাম ফিরানোর পর নিজের জামা ও গেঞ্জি খুলে একটি ছেলের ক্ষত স্থানে বাঁধেন এবং আহত ব্যক্তিদের সান্ত্বনা দিতে থাকেন। তারপর চরম বীরত্ব প্রদর্শন করতঃ এক সন্ত্রাসীকে ধরাশায়ী করে ফেলেন কিন্তু সেই সময় অন্য আর এক সন্ত্রাসীর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণে তিনি শহীদ হন।

শহীদ মোকাররম হাজী মুহাম্মদ আকরাম বেগ সাহেব, পিতা মোকাররম চৌধুরী আল্লাহ্ দিত্তা ভিরক সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ ‘শেখুপুরা’ জেলার ‘কাযী মরাল’ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন আর তাঁরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে বয়’আত করেছেন। তিনি ওয়াকফ্ বোর্ড-এ চাকুরী করতেন আর ১৯৬৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন তিনি আনসারুল্লাহ্‌র যয়ীম ছিলেন; সেক্রেটারী তালীম এবং সহকারী হালকা প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ৭৪ বছর বয়সে ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন।

শহীদ মোকাররম মিয়াঁ লাইক আহমদ সাহেব, পিতা মোকাররম মিয়াঁ শফিক আহমদ সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ ‘আম্বালার’ অধিবাসী ছিলেন। দেশ বিভাগের পর এই পরিবার লাহোরে হিজরত করেন। শাহাদাত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর আর তিনিও ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদত বরণ করেন। ‘কিনালপার্ক’ হালকায় তিনি সেক্রেটারী ইশায়াতের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণের সময় তিনি গুরুতর আহত হন। এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় তিনি পথিমধ্যেই শহীদ হন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন।

শহীদ মির্যা শাবেল মুনীর সাহেব, পিতা মোকাররম মির্যা মুহাম্মদ মুনীর সাহেব। শহীদ মরহুম সাহেবের পরদাদা হযরত আহমদ দ্বীন সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। শহীদ মরহুম বি.কম পাশ করার পর বি.বি.এ করছিলেন। শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স ১৯ বছর ছিল। তিনি খোদ্দামুল আহমদীয়ার একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। প্রত্যেক কাজে তিনি লাব্বায়েক বলতেন। তিনি ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর একজন বন্ধু লিখেন, “শাবেল মুনীর সাহেবকে আমি স্বপ্নে দেখেছি; স্বপ্নে তিনি বলেন, ‘আমি যখন তাঁকে বলি তুমি কোথায়? তখন তিনি আমাকে উত্তর দেয়, ভাই আমিতো এখানে, তুমি কোথায়? সাথে সাথেই তিনি আমাকে বলেন, ভাই আমি এখানে খুবই খুশি। তুমিও আস। আমি তখন নিজেও আনন্দিত হই।’ তারপর এ দৃশ্য শেষ হয়ে যায়”। আল্লাহ্ তা’লা এ যুবককেও উচ্চ মর্যাদা দান করুন। এরা সেই যুবক যারা পরবর্তী প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তারা স্বীয় অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। ‘আল্লাহ্ তা’লার রাস্তায় আমরা নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছি, তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না’।

মোকাররম মালেক মাকসুদ আহমদ সাহেব শহীদ, পিতা মোকাররম আহসান মাহমুদ সাহেব। শহীদ মরহুমের দাদা বাটালার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতা মোকাররম আহসান মাহমুদ সহেব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সাহেবের উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর নানা হযরত মালেক আলী বখ্‌শ সাহেব (রা.) হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) {তাঁর মায়ের} বাল্যকালে তাঁর মায়ের মাথায় ভালবাসা পূর্ণ হাত বুলিয়েছেন। শহীদ মরহুমের নানা, দাদা এবং মাতা সাহাবী ছিলেন। মরহুম শহীদ তাঁর নানি মুখতার বিবি সাহেবার নিকট কাদিয়ানে লালিত-পালিত হয়েছেন। তা’লীমুল ইসলাম কলেজে তিনি পড়ালেখা করতেন। ‘দারুয্ যিক্‌র’-এ শাহাদাত বরণ করেন আর সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন। তিনি নিজ হালকার সেক্রেটারী তা’লীম, সেক্রেটারী তা’লীমুল কুরআন, আমিন এবং অডিটর হিসাবে খিদমতের সুযোগ পেয়েছেন। শহীদ মরহুম লাহোর জেলার বর্তমান আমীর মালেক তাহের সাহেবের ভগ্নিপতি। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও তাহাজ্জুদের নামাযে অভ্যস্থ ছিলেন। নিয়মিত চাঁদা দিতেন। তবলীগ করার খুবই আগ্রহ ছিল। নিয়মিত জামাতী পুস্তক পড়তেন এবং যুগ খলীফার খুতবা শুনতেন।

শহীদ মোকাররম চৌধুরী মুহাম্মদ আহমদ সাহেব, পিতা শহীদ মোকাররম ডাঃ নূর আহমদ সাহেব। শহীদের পিতা এবং দাদা মোকাররম চৌধুরী ফযল আতা সাহেব ১৯২১-২২ সালে বয়’আত করে আহমদী হন। পিতৃপুরুষের আবাসস্থল ছিল ফয়সালাবাদ জেলার খেওয়া গ্রামে। শহীদের পিতা জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে হযরত মীর মুহাম্মদ ইসমাঈল সাহেবের সাথে কাজ করেছেন। ১৯২৮ সালে খেওয়াতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন আর মেট্রিক পর্যন্ত ফয়সালাবাদে পড়াশুনা করেন। মেট্রিকের পর এয়ারফোর্সে যোগ দেন। দু’বছর প্রশিক্ষণ শেষে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেন। চাকুরী কালীন সময় ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মডেল টাউনে শাহাদাত বরণ করেন আর সেসময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন। আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বীরত্বের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছেন।

শহীদ ইলিয়াস আহমদ আসলাম কুরাইশী সাহেব, পিতা মোকাররম মাস্টার মোহাম্মদ শফী আসলাম সাহেব। শহীদের পরিবারের পৈতৃক নিবাস ছিলো কাদিয়ান। তাঁর পিতা মুরুব্বী সিলসিলাহ্ ছিলেন। গ্রাজুয়েশনের পর তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকে যোগদান করেন। তিনি বাইতুন নূর মসজিদে শাহাদাত বরণ করেন আর সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি মুসী ছিলেন। তিনি যাওহার টাউনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জামাতের খিদমত করছিলেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, মরহুম শহীদ খুবই সাদাসিধে, পুণ্যবান ও সর্বাবস্থায় কৃতজ্ঞ, ধৈর্যশীল ও আল্লাহ্‌র উপর ভরসাকারী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর এক সন্তান বলে, “তিনি একান্ত মমতাশীল পিতা ও দয়ালু মানুষ ছিলেন। কখনও আমরা তাকে নামায কাযা করতে দেখে নি”।

শহীদ মোকাররম তাহের মাহমুদ সাহেব, পিতা মোকাররম সাঈদ আহমদ সাহেব। তিনি মোজাফ্‌ফর গড় জেলার কোর্ট আদ্দু গ্রামের অধিবাসী। ১৯৫৩ সালে তাঁর পিতা তাদের বংশে প্রথম আহমদী হন। মরহুম শহীদ কোর্ট আদ্দু থেকে মেট্রিক পাশ করেন। পরে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরীতে যোগ দেন। পরে তিনি মালয়েশিয়া চলে যান। মসজিদ বায়তুন্ নূর মডেল টাউনে তিনি শহীদ হন আর সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তাঁর বুকে দু’টি আর মাথায় একটি গুলি লাগে। সাহসী মানুষ ছিলেন। সবসময় বলতেন, “আমি গুলিকে ভয় করি না। আমি শহীদই হবো”। পুরো এলাকায় ভাল মানুষ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। নিষ্ঠাবান ও আবেগ প্রবণ আহমদী ছিলেন। রাস্তায় চলার সময় তিনি আপন-পর সবাইকে আস্‌সালামু আলাইকুম বলতেন।

শহীদ সৈয়দ আরশাদ আলী সাহেব, পিতা মোকাররম সৈয়দ সামিউল্লাহ্ সাহেব। শহীদ শিয়ালকোটের কুঁচা মীর হিসামুদ্দীন এর অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা হলেন হযরত সৈয়দ খাসলাত আলী শাহ্ সাহেব (রা) আর নানা ছিলেন হযরত সৈয়দ মীর হামেদ শাহ্ সাহেব (রা.) শিয়ালকোটি। শিয়ালকোটে অবস্থানের সময় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর বাড়ীতে অবস্থান করেছেন। মরহুম শহীদের পিতা জামেয়া আহমদীয়া চিনিউট এবং রাবওয়ার প্রিন্সিপাল ছিলেন। গার্ডেন টাউন হালকার সেক্রেটারী মাল হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন। ‘মসজিদ বায়তুন নুর’-এ তিনি শহীদ হন আর শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর শরীরে তিনটি গুলি লেগেছিল। শহীদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, কয়েক বছর পূর্বে তিনি বলেছিলেন: তিনি আওয়াজ শুনেছেন - ‘ইন্নি রাফিউকা ওয়া মুতাওয়াফ্‌ফিকা’। হুযূর বলেন, হতে পারে তিনি ইন্নি মুতাওয়াফফিকা ওয়া রাফিউকা শুনেছেন কিন্তু হয়তো শ্রোতা ভুল লিখেছেন। যাহোক, শহীদ বলতেন, আমি শব্দ শুনেছি কিন্তু আমি বুঝতে পারি নি এর অর্থ কি? শাহাদাতের ১৫/২০ দিন পূর্বে বলেন, আমি আরেকটি আওয়াজ শুনেছি আর তাহলো, “We recieve you with open arms with red carpet”

শহীদ মোকাররম নূরুল আমীন সাহেব, পিতা মোকাররম নাযীর নাসিম সাহেব। শহীদ রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম গ্রহণ করেন। সেখান থেকে মেট্রিক পাশ করেন। তার দাদা অটকের অধিবাসী হযরত পীর ফয়েয সাহেব (রা.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। তাঁর বড় নানা হায়দ্রাবাদ জেলার সাবেক আমীর মোকাররম আব্দুল গাফ্‌ফার সাহেবও আল্লাহ্‌র রাস্তায় শহীদ হবার গৌরব অর্জন করেন। শহীদ মরহুম মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়ার একজন দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মী ছিলেন। মডেল টাউন হালকার মুন্তাযেম উমুমীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ‘দারুয্ যিক্‌র’ মসজিদে শাহাদত বরণ করেন আর সেসময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৯ বছর। শহীদের স্ত্রী বলেন, তিনি বিভিন্ন গুণের অধিকারী ছিলেন। জুমুআর দিন দুপুর দু’টার সময় ফোনে জানান যে, তিনি ভাল আছেন। আমি বললাম, “আপনি মসজিদ থেকে বের হয়ে আসুন”। জবাবে তিনি বললেন, “এখানে অনেক লোক আটকে আছে, আমি তাদের ছেড়ে চলে আসতে পারি না”। তিনি জামাতী দায়িত্ব পালনে সর্বদা যত্নবান ছিলেন।

শহীদ চৌধুরী মুহাম্মদ মালেক সাহেব চাদ্ধার, পিতা-মোকাররম চৌধুরী ফাতাহ্ মুহাম্মদ সাহেব। শহীদ মরহুমের পূর্বপুরুষ গাখ্‌খারমন্ডির অধিবাসী ছিলেন। সেখান থেকে গুজরাঁওয়ালা, অতঃপর লাহোর স্থানান্তরিত হন। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহারা হন। মেট্রিক পড়ার সময় তাঁর মা হাতের সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে বলেন, “যাও এটি বিক্রি করে পড়ালেখা কর”। কৃষি কাজ করতেন আর সেই আয় দিয়েই সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেন। ‘বাইতুন্ নূর’ মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর এবং তিনিও মুসী ছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলেন, বার্ধক্যের কারণে তিনি প্রায়ই ভুলে যেতেন। এ কারণে প্রায় সাত-আট জুমুআয় তিনি যেতে পারেন নি। ২৮ মে জুমুআর নামাযে যাবার জন্য জিদ ধরেছিলেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, বাইরে আবহাওয়া ভাল নয়, তীব্র ঝড় বইছে। এজন্য আপনার জুমুআয় না যাওয়াই উত্তম। সন্তানদের ইচ্ছাও তদ্রুপই ছিল কিন্তু তিনি জুমুআর নামায পড়ার জন্য তৈরী হয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যান। পূর্বের ন্যায় ঘটনার দিনও তিনি মসজিদ প্রাঙ্গনে চেয়ারে বসেছিলেন এবং আক্রমনের শুরুতেই গুলির আঘাতে শাহাদত বরণ করেন। অত্যন্ত আগ্রহের সাথে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বই পড়তেন এবং পরিবারের লোকদেরও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। তাঁর পুত্র দাউদ আহমদ বলেন, “আমি অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করে পিতার কাছে চাকুরী করার অনুমতি চাইলে জবাবে তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি আমার চাকুরী কর’। আমি বললাম, ‘সেটা কিভাবে?’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার ন্যায় তৈরী হয়ে সকাল নয়টায় আমার কাছে আসবে, মাঝে বিরতিও পাবে এবং বিকাল পাঁচটায় ছুটিও হয়ে যাবে। এখানে টেবিলে বসে বসে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বই পড়বে। চাকুরী করে তুমি যত বেতন পাবার আশা কর, আমি তোমাকে সেই বেতনই দেব’। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সবগুলো বই পাঠ করানোর পর এ চাকুরী থেকে ছেলেকে অব্যাহতি দেন”।

শহীদ শেখ সাজেদ নঈম সাহেব, পিতা-মোকাররম শেখ আমীর আহমদ সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ ভেরার অধিবাসী ছিলেন। তিনি লাহোর থেকে বি.এ পাশ করেন। রাওয়ালপিন্ডিতে এম.সি.বি ব্যাংকে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ২০০৩ সালে ম্যানেজার পদে কর্মরত অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। শহীদ মরহুম মজলিস আনসারুল্লাহ্‌র একজন দায়িত্বশীল কর্মী ছিলেন এবং নায়েব মুন্তাযেম তা’লীমুল কুরআন হিসেবে খিদমত করছিলেন। ‘মসজিদ বাইতুন্ নূর’-এ শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। ওসীয়্যতের জন্য দরখাস্ত জমা দিয়েছিলেন। মিসাল নম্বর পেয়েছিলেন। ঘটনার সময় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মসজিদের মূল দরজা বন্ধ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন যাতে অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন। এ সময় হানাদাররা মসজিদের দরজা ভাঙ্গার জন্য এলোপাতাড়ি গুলি চালালে তিনি সেখানেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। স্ত্রী সন্তানদের অধিকার প্রদানের প্রতিও তিনি একান্ত যত্নবান ছিলেন। নম্র প্রকৃতির অনুগত মানুষ ছিলেন। খিলাফতের প্রতি অগাধ ভালবাসা ছিল। তাঁর ছেলে বলেছে, মহল্লার অ-আহমদী দোকানদার ঐ ঘটনার পর রবিবার স্বপ্নে দেখেছে, ‘শেখ সাহেব তাকে বলছেন, জানি না এখানে কিভাবে পৌঁছেছি। কিন্তু খুব সুখে আছি, আনন্দে আছি।’

শহীদ মোকাররম সৈয়দ লায়েক আহমদ সাহেব, পিতা-মোকাররম সৈয়দ মুহিউদ্দিন আহমদ সাহেব। শহীদের পিতা ভারতের বিহার রাজ্যের রাঁচি জেলার অধিবাসী ছিলেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় একজন আহমদী ছাত্রের সাথে মুহিউদ্দীন সাহেবের পরিচয় হয়। সে তাকে বলে, হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যু বরণ করেছেন এবং হযরত ইমাম মাহদী (আ.) এসে গেছেন। তখন মুহিউদ্দীন সাহেব রাগান্বিত হয়ে ঐ আহমদী ছাত্রের মাথা ফাটিয়ে দেন। এজন্য অবশ্য পরে লজ্জিতও হন। অতঃপর বিভিন্ন বই-পুস্তক পড়ার পর মৌলভী সানাউল্লাহ্ অমৃতসরীর সাথে যোগাযোগ করলে সে তাকে গালিগালাজপূর্ণ একটি বই পাঠান। এটি দেখে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, “আমি তার কাছে ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন করেছি আর তিনি আমাকে গালি শিখাচ্ছেন”। এভাবে তিনি আহমদীয়াতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বয়’আত করার সৌভাগ্য লাভ করেন।

হুযূর বলেন, মোল্লাদের চিরাচরিত এ অভ্যাস এখনো বিদ্যমান আছে। প্রশ্নের উত্তরে তারা এখনও গালমন্দে ভরা পুস্তকাদি পাঠায়, টিভিতে বসে জামাতের বিরুদ্ধে মুখে যা আসে তাই বলতে থাকে এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিরুদ্ধে দুর্নাম করে। যাহোক, এরফলে সত্যের প্রতি মানুষের মনোযোগও আকৃষ্ট হয় এবং এভাবেই অনেকে আহমদীয়াত সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হয়।

শহীদ লায়েক আহমদ সাহেব জন্মগত আহমদী ছিলেন। তাঁর পিতা উকিল ছিলেন, আবার আঞ্জুমানের সদস্যও ছিলেন। তিনি রাঁচিতে ফার্ষ্ট ডিভিসনে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অতঃপর পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম.এ পাশ করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি লাহোর চলে আসেন এবং ১৯৬৯ সনে এম.সি.বি ব্যাংকে যোগদান করেন। ১৯৯৭ সনে ব্যাংক ম্যানেজার হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মুসী ছিলেন আর শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। মসজিদে তাঁর পাশে বসা বুযূর্গ মোকাররম মোবারক আহমদ সাহেবের মাথায় গুলি লাগলে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। তখনই সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি আহত হন। মেরুদন্ডের হাড়ে গুলি লেগেছিল তাই ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। খুবই ধীর-স্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তবে, জামাত বা জামাতের সম্মানিত বুযূর্র্গদের সম্বন্ধে কেউ কটুক্তি করলে তিনি তা কিছুতেই সহ্য করতেন না। স্বল্পভাষী ছিলেন কিন্তু কেউ যদি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বা খলীফাদের ব্যাপারে কটুক্তি করতো, তবে ঘন্টার পর ঘন্টা তার সাথে বাকযুদ্ধ করতেন। কষ্ট করে হলেও সব সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছেন। সন্তানদের একজন ডাক্তার হয়েছে। আরেকজনকে তথ্য প্রযুক্তিতে পড়িয়েছেন। এক মেয়েকে ফ্রেঞ্চ ভাষায় এম.এ পাশ করিয়েছেন। মরহুম শহীদ সম্বন্ধে তাঁর স্ত্রী লিখেছেন, জুমুআর নামায আদায়ের ব্যাপারে তিনি খুবই যত্নবান ছিলেন। এজন্যই তাঁর সন্তানদের মধ্যে নামাযের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নেকী কবুল করুন এবং জান্নাতে উচ্চস্থান দিন।

শহীদ মোহাম্মদ আশরাফ বুলার সাহেব, পিতা- মোকাররম মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ সাহেব। শহীদ মরহুমের পিতৃপুরুষ লাহোর জেলার রাখ শেখ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর দাদা মোকাররম চৌধুরী সিকান্দার আহমদ সাহেব আহমদীয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পৈতৃক সূত্রে অনেক জমির মালিক হয়েছিলেন। কৃষি কাজ করতেন, পরবর্তীতে রায়উন্ডে ইটের ভাটা তৈরী করেন। মডেল টাউন মসজিদে শাহাদতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। ঘরের একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ‘মসজিদ বায়তুন নুর’-এ নিয়মিত জুমুআর নামায পড়তেন। ঘটনার দিনও তিনি মসজিদের মূল কক্ষে ছিলেন। হলের ছোট দরজা বন্ধ করে দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে যান যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। সন্ত্রাসীরা বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু তিনি তাদের দরজা খুলতে দেন নি। তখন সন্ত্রাসীরা বাইরে থেকেই গুলি বর্ষণ করে। এতে তাঁর কোমর ঝাঁজরা হয়ে যায় এবং সেখানেই শাহাদতের সুপেয় সুধা পান করেন।

হুযূর বলেন, নিজ এলাকায় ভদ্রতা ও ঈমানদারীর জন্য শহীদ মোহাম্মদ আশরাফ বুলার সাহেবের সুখ্যাতি ছিল। এজন্য কতক অ-আহমদীও তাঁর জানাযায় অংশ নেয় আর ৩০ মে, ২০১০ ‘নওয়ায়ে ওয়াক্ত’ পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। অ-আহমদী মৌলভীরা ঘোষণা দিয়েছে যে, যারাই তাঁর জানাযা পড়েছে তাদের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। এসব মৌলভীরা জানাযা পড়া তো দূরের কথা যারা শোক প্রকাশ করেছে বা সমবেদনা জানিয়েছে তাদেরও বিয়ে ভেঙ্গে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

মরহুম শহীদের স্ত্রী বলেন, ওমরা আদায়ের পর থেকে তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন। প্রতিদিন কুরআন পাঠের প্রতিও সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেন। সন্তানদের বলতেন, “দৈনিক এক লাইন হলেও কুরআন পড়, অতঃপর অনুবাদ পড়, কেননা এছাড়া কোন লাভ হবে না”।

শহীদ মোকাররম মোবারক আহমদ তাহের সাহেব, পিতা-মোকাররম আব্দুল মজীদ সাহেব। শহীদ লাহোরের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতা হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর খিলাফতকালে বয়’আত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একটি ব্যাংকে টাইপিষ্ট হিসেবে চাকরী জীবন আরম্ভ করেন এরপর ক্রমান্বয়ে বি.এ এবং এম.এ পাশ করেন। এ ছাড়া ব্যাংকের বিভিন্ন কোর্সও সম্পন্ন করেন। পদন্নোতি পেয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আর সিনিয়র প্রেসিডেন্ট হবার কথা ছিল। ‘বেষ্ট এমপ্লয়ী’র পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি আহমদীয়াতের ইতিহাসবিদ দোস্ত মোহাম্মদ শাহেদ সাহেবের জামাতা ছিলেন। শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। দারুয্ যিক্‌র হালকার নায়েব কায়েদ এবং নাযেম তা’লীমের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আল্লাহ্‌র ফযলে মুসী ছিলেন। ঘটনার দিন জুমুআর নামায আদায়ের জন্য দুই ছেলেকে নিয়ে ‘মসজিদ বায়তুন নুর’-এ গিয়েছিলেন। সন্ত্রাসীরা যখন আক্রমন চালায় তখন মুরব্বী সাহেব সবাইকে দোয়া করতে বলেন, তিনি হাত উঠিয়ে দোয়া করতে আরম্ভ করেন। দোয়ার মাঝেই একটি গুলি তাঁর বাম বাহুতে এবং অপরটি তাঁর হৃদপিন্ডের পাশে বিদ্ধ হয়। ফলে ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত লাভ করেন। তিনি খুবই দয়ালু ছিলেন। ব্যাঙ্কের উচ্চ পদস্থ অফিসারের সাথে তার এতটা সখ্যতাও ছিল না যতটা সখ্যতা ছিল তার নিম্ন পদস্থ কর্মচারীদের সাথে। তাঁর ছেলে বলেন, জামাতের কাজ থেকে ফেরত আসতে যদি রাত তিনটাও বেজে যেত তবু তিনি আমাদেরকে কিছুই বলতেন না। কিন্তু অন্য কোন কাজ থেকে ফিরতে যদি এশার সময় পার হতো তবে তিনি তিরষ্কার করতেন। জামাতের মুরব্বীদের সেবা করতেন এবং তাদের আতিথেয়তা করতেন। যেখানেই বাসা নিয়েছেন সেখানে নিজের ঘরকে হালকার কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা করতেন। অনেক বেশি আত্মত্যাগী ছিলেন।

মুকাররাম আনিস আহমদ সাহেব শহীদ, সুবেদার মুনীর আহমদ সাহেবের পুত্র। শহীদ মরহুমের পরিবার ফয়সালাবাদ থেকে লাহোরে চলে আসেন। শহীদ মেট্রিক পাশ করে কম্পিউটারের হার্ডওয়ারের কাজ করতেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। তিনি একজন মুসী ছিলেন। খিদমতে খালকের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ছিল। একবার একজন আহমদী এক্সিডেন্ট করলে রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়, তৎক্ষণাৎ কোথাও রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না বলে তিনি স্বয়ং সেই আহমদীকে রক্ত দান করেন। এরপর চিকিৎসার জন্য টাকা ধার দেন কিন্তু সে অর্থ আর ফেরত নেন নি। নিজ সন্তানকে নিয়মিত কুরআন ক্লাসে পাঠাতেন এবং জামাতি কাজে বেশি বেশি অংশগ্রহণ করতেন। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মুকাররাম মুনাওয়ার আহমদ সাহেবও শহীদ হন।

মুকাররাম মুনাওয়ার আহমদ সাহেব শহীদ, সুবেদার মুনীর আহমদ সাহেবের পুত্র। তিনিও তার ভাইয়ের ন্যায় প্রথমে ফয়সালাবাদে থাকতেন। তিনি জন্মগত আহমদী ছিলেন। তিনি জামাতের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অনেক তবলীগ করেছেন এবং অনেককে বয়’আতও করিয়েছেন। বড় বড় মৌলভীদেরকে তিনি বাকরুদ্ধ করে দিতেন। দারুয্ যিক্‌র মসজিদে শাহাদাতের সময় এই মুসীর বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। নায়েব নাযেম ইসলাহ্ ও ইরশাদ হিসেবে তিনি খিদমতের সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি সন্ত্রাসীদেরকে কাবু করার জন্য সুযোগ খুঁজছিলেন, এরপর বীরত্বের সাথে এক সন্ত্রাসীকে ধরে ফেললে তার আত্মঘাতি বোমার বিষ্ফোরণে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদত বরণ করেন। নাযেম ইসলাহ্ ও ইরশাদ- জিলা বলেন, শাহাদাতের দেড় মাস পূর্বে একটি স্বপ্নের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বপ্নে সে তাঁর মৃত মাকে দেখেছে, তাঁর মা বলছিল, আমি তোমার জন্য কামরা প্রস্তুত করে রেখেছি। পরে তোমাকে ডাকব।’ শহীদ তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে আগেই বলে দিয়েছিলেন। বরং এক বছর আগে বিয়ে করার সময় তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, “আমি শহীদ হয়ে যাব, আমার শহীদ হবার পর তুমি কোনরূপ আহাজারি বা আক্ষেপ করবে না”।

সবশেষে হুযূর বলেন, শহীদ মোকাররম সাঈদ আহমদ সাহেব ছিলেন মোকাররম সুফী মুনীর আহমদ সাহেবের পুত্র। আমি আজ তাঁর গায়েবানা জানাযার নামায পড়াব। শহীদ মরহুমের পূর্বপুরুষ ভারতের কারনাল জেলার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর বড়দাদা হযরত রমযান আলী সাহেব (রা.) ছিলেন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর একজন সাহাবী। ‘মসজিদ বায়তুন নুর’-এ শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৭ বছর। মসজিদে পৌঁছানোর পূর্বেই সেখানে গোলাগুলি শুরু হয়ে গিয়েছিল। দু’জন সন্ত্রাসী মোটর সাইকেলে করে মডেল টাউনে আসে আর গুলি ছুড়তে ছুড়তে ভেতরে প্রবেশ করে। কয়েক সেকেন্ড পর তাদের ফেলে যাওয়া মোটর সাইকেল বিষ্ফোরিত হয়। তিনি তখন এর পাশেই ছিলেন। বিষ্ফোরণের ফলে তাঁর শরীরে আগুন লেগে যায় এবং পুরো শরীর ঝলসে যায়। আটদিন তিনি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ৫ জুন, ২০১০ শাহাদাতের সুপেয় সুধা পান করেন إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ

মরহুমের বিধবা স্ত্রী কয়েকটি ডায়রী দেখিয়েছেন যার কয়েক স্থানে তিনি লিখেছিলেন, “শাহাদাত আমার আকাঙ্খা” ইনশাআল্লাহ্ । ডায়রির অপর এক জায়গায় লেখা আছে, “হে খোদা আমাকে শাহাদাত লাভের সৌভাগ্য দান কর। এ ঘাড় তোমার পথেই যেন কর্তিত হয়। আমার শরীরের প্রত্যেকটি টুকরো যেন তোমার পথে উৎসর্গ হয়। প্রিয় রসূলের সদকায় হে আমার মওলা আমার এ দোয়া কবুল কর, আমীন’’। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর এ দোয়া কবুল করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উন্নীত করুন। সকল শহীদের মর্যাদা উন্নীত করুন। এসব শহীদ বিভিন্ন ধরনের গুণের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁদের দোয়া সমূহ এবং সকল প্রকার নেক আকাঙ্খা কবুল করুন এবং সবাইকে ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে এ আঘাত সহ্য করার সৌভাগ্য দিন।

এরপর হুযূর বলেন, এ ছাড়া আরও একটি গায়েবানা জানাযার নামায আমি পড়াব। এটি ওয়াকেফে যিন্দেগী মোকাররম ড. মোহাম্মদ আরেফ সাহেবের জানাযা। তিনি কাদিয়ানের দরবেশ মোকাররম মোহাম্মদ সাদেক সাহেব নানগালীর পুত্র ছিলেন। নিজেও দরবেশ ছিলেন, অর্থাৎ কাদিয়ানেই ছিলেন। ১৩ জুন ২০১০ তারিখে ৫৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ । ৩০ বছর ধরে জামাতের বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। প্রথমে ওয়াকফে জাদীদের নায়েব নাযেম ছিলেন। পরে নায়েব নাযেম বায়তুল মাল আমদ, নায়েব নাযের নাশর ও ইশায়াত ছিলেন। ১৯৯৫ সালে নাযের বায়তুল মাল খরচ হিসেবে নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্বে-ই নিয়োজিত ছিলেন। এ ছাড়া ৮ বছর নাযের তালিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৬ বছর মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া, ভারতের সদর, এরপর নায়েব সদর আনসারুল্লাহ্ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে কাদিয়ানের অফিসার জলসা সালানা নির্বাচিত হন। নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে এ কাজ সম্পাদন করেন। তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। সাহেবযাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেবের সময় এবং তাঁর পরেও কয়েকবার তিনি ভারপ্রাপ্ত ‘নাযের আলা’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য লাভ করেন। মিয়াঁ সাহেবের তিরোধাণের পর তাকে নায়েব আমীর মোকামী নিযুক্ত করা হয়। উর্দূতে এম.এ পাশ করার পর তিনি গুরুনানক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিয়মিত নামাজ পড়তেন, তাহাজ্জুদ পড়তেন। খিলাফতের সাথে অকৃত্রিম ভালবাসা রাখতেন। প্রায়ই সত্য স্বপ্ন দেখতেন। পূর্বেও বলেছি যে, আমি সর্বদা তাকে হাস্যবদনে দেখেছি। ১৯৯১ সালে কাদিয়ানের সালানা জলসায় একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমি তার সাথে ডিউটি দিয়েছি। তখনও আমি দেখেছি এবং আমার খিলাফত কালেও আমি তার চেহারায় খিলাফতের প্রতি ভালবাসার বৃষ্টি বর্ষণ হতে দেখেছি। আল্লাহ্ তা’লা তার নিঃস্বার্থ খিদমত কবুল করুন জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে