In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

খোদার পথে প্রাণ দানকারীরা অমর

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৪ঠা জুন, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ্ পাঠ করেন:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ

نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ

نُزُلاً مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, ‘আল্লাহ্ আমাদের প্রভু-প্রতিপালক, এরপর তারা (এতে) অবিচল থাকে, তাদের নিকট অজস্র ধারায় ফিরিশ্তা অবতীর্ণ হয়। (তারা বলে) ভয় করো না, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ো না। তোমাদের সাথে যে জান্নাতের অঙ্গীকার করা হতো এর প্রাপ্তিতে তোমরা আনন্দিত হও। আমরা ইহকালেও তোমাদের সাথে রয়েছি আর পরকালেও তোমাদের সাথে থাকবো। সেখানে তোমাদের জন্য সেসব কিছু থাকবে যা তোমাদের মন চাইবে। আর সেখানে তোমাদের জন্য সেসব কিছু থাকবে যা তোমরা চাইবে। এ সব কিছুই হবে অতি ক্ষমাশীল ও বার বার কৃপাকারী আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে আতিথেয়তা স্বরূপ।’

(সূরা হা মীম্ আস্ সাজদা: ৩১-৩৩)

এরপর হুযূর (আই.) বলেন, প্রতি সপ্তাহেই আমার কাছে হাজার হাজার চিঠি-পত্র আসে। মানুষ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের জন্য দোয়া চেয়ে চিঠি লিখে থাকেন। কিন্তু গত সপ্তাহে আমি যেই হাজার হাজার চিঠি পেয়েছি, সবগুলো চিঠির বিষয়বস্তু ছিল এক ও অভিন্ন। এগুলোতে লাহোরের শহীদদের মহান শাহাদাত সম্পর্কে আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করা হয়েছে। এসব চিঠি-পত্রে দুঃখ-কষ্ট ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী বাক্যেই সেই ক্রোধ, ধৈর্য ও দোয়ায় রূপ নেয়। সবাই ব্যক্তিগত সমস্যাদির কথা ভুলে গেছেন। এ সব চিঠি-পত্র পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, দ্বীপপূঞ্জ, ইউরোপ, আমেরিকা এবং আফ্রিকা থেকেও এসেছে। এ চিঠিগুলোতে কেবল পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত আহমদী বা বহিঃর্বিশ্বে যেসব আহমদী বসবাস করছেন তাদের আত্মীয়-স্বজন বা স্বজাতি অত্যাচারিত হচ্ছে বলেই যে তাদের আবেগ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা নয়, বরং প্রতিটি দেশের আহমদী, যাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা মুহাম্মদী মসীহ্‌কে মানার সৌভাগ্য দিয়েছেন তারা এতোটা অস্থিরতার সাথে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেন কোন রক্ত সম্পর্কের নিকটাত্মীয় এই নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। অপর দিকে যাদের নিকটাত্মীয়রা শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন, তারা তাদের চিঠিতে আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তারা তাদের প্রিয়জন, ছেলে, পিতা, ভাই এবং স্বামীর শাহাদাতের ঘটনায় ধৈর্য ও দৃঢ়তার এক অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমি প্রায় সব বাড়িতেই ফোন করে সমবেদনা জানানোর চেষ্টা করেছি; তখন শহীদদের সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী, ভাই, মা এবং বাবা সবাইকে বিনাব্যতিক্রমে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট পেয়েছি।

হুযূর বলেন, চিঠির মাধ্যমেও তারা স্বীয় আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করছেন। কিন্তু, ফোনে তাদের দৃঢ়তা পূর্ণ কণ্ঠস্বরে এ বার্তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল যে, আল্লাহ্ তা’লা প্রদত্ত শিক্ষা অনুসারে সব ধরনের কৃত্রিমতার ঊর্ধ্বে থেকে আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি, আর তা হলো: إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহ্ তা’লার এবং তাঁর-ই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন।’

তারা স্বজ্ঞানে এবং আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের আশায় বলেছেন,

“আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টিতেই আমাদের সন্তুষ্টি। দু’একটা কুরবানী কেনো? আমরা তো আমাদের সব কিছু এমনকি আমাদের শরীরের প্রতিটি রক্ত বিন্দুও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রয়েছি। আমাদের রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই পৃথিবীতে হযরত মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল ও খাতামান্নবীঈন হওয়ার বিষয়টি ঘোষিত হবে। ইসলামের প্রথম যুগের দৃষ্টান্ত এ পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবো”।

এসব চিঠি পড়ে আর তাদের কথা শুনে নিজের ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে এমন এক প্রেমিক জামাত দান করেছেন যারা উচ্চ আধ্যাত্মিক মার্গ অর্জনে বদ্ধপরিকর। আর মানুষকে এ উচ্চ মার্গে পৌঁছানোর লক্ষ্যেই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আগমন করেছেন। তারা সবাই ধৈর্য ও দৃঢ়তার মহান প্রতীক। তাদের বিদায়ীরা অর্থাৎ, শহীদগণ দৃঢ়তার সুমহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আল্লাহ্ তা’লার কাছে চলে গেছেন। আর তাঁরা আল্লাহ্ তা’লার কথা - وَلاَ تَقُولُواْ لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبيلِ اللّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاء وَلَكِن لاَّ تَشْعُرُونَ (সূরা আল্ বাকারা: ১৫৫) অর্থ: ‘আর যাদেরকে আল্লাহ্‌র পথে হত্যা করা হয় তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত; কিন্তু তারা বুঝে না।’ - এর সত্যায়নকারী হিসেবে গণ্য হয়েছেন।

হুযূর বলেন, এসব শহীদদের রক্ত কোনক্রমেই বৃথা যাবে না বরং তাঁদের রক্তের এক একটি বিন্দু থেকে হাজার হাজার ফল ও বৃক্ষ জন্ম নিবে। ফিরিশ্তারা তাঁদেরকে আপন কোলে স্থান দিয়েছেন। ধৈর্য ও সহ্যের মূর্তিমান প্রতীক এসব ব্যক্তি, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের বাসনায় ধর্মের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। প্রায় কয়েক ঘন্টা ধরে তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরতে দেখেছেন কিন্তু অভিযোগের পরিবর্তে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় পুরো সময় দোয়া ও দরূদের ভেতর কাটিয়ে দিয়েছেন। ব্যথার কারণে কেউ হায় বা উফ্ করলে পাশের আহত ব্যক্তি তাকে সাহস ও মনোবল প্রদর্শনের পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেন, মানুষ তো উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে জীবন নষ্ট করে, আর তুমি তো তোমার জীবন একটি মহান উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে যাচ্ছ। অতঃপর সেই ব্যক্তি যে উফ্ করেছিল সে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দরূদ শরীফ পাঠে রত থাকেন।

হুযূর বলেন, আমি একটি হৃদয় বিদারক ভিডিও দেখেছি, যেটি কোন একজন আহত ব্যক্তি তার মোবাইলে রেকর্ড করেছিলেন। এটা দেখে মনের মাঝে এক অদ্ভুত আলোড়নের সৃষ্টি হয়। লাহোরের একটি ছেলে আমাকে বলেছে, “আমার ১৯ বছরের ভাইয়ের শরীরে চার পাঁচটি গুলি লেগেছে কিন্তু আহত অবস্থায় ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে ছিল। নিজের জায়গা থেকে একটুও সরেনি বরং অনবরত দোয়া করতে থাকে”। পুলিশ যদি সময়মত এসে যেতো, তাহলে অনেক মূল্যবান প্রাণ রক্ষা পেতো। কিন্তু যেখানে পুরো ব্যবস্থাপনাই দুর্নীতিগ্রস্ত সেখানে এসব লোকদের কাছে আর কি-ই বা আশা করা যেতে পারে। একজন যুবক, অন্যদেরকে বাঁচানো উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসীদের নিক্ষেপ করা একটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিজের হাতে ধরে ফেলে। কিন্তু ঐ সময় গ্রেনেডটির বিষ্ফোরণ ঘটে, আর এভাবে সে নিজের প্রাণ দিয়ে অন্যদের জীবন রক্ষা করে। একজন ষাটোর্ধ্ব বুযুর্গ নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে যুবক ও শিশুদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

হুযূর বলেন, সন্ত্রাসীরা অল্প বয়স্ক যুবক ছিল। এসব হতভাগারা হলো গরীবের সন্তান। তাই দারিদ্রের কারণে শৈশবে তারা এসব পেশাদার উগ্রপন্থীদের খপ্পরে পড়ে। তারা তাদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম শিখায়। আর এরপর তাদের মগজ এভাবে ধোলাই করে যে, তারা মনে করে জান্নাত লাভের একমাত্র পথ হলো আত্মঘাতি হামলা। যদিও এসব সন্ত্রাসীদের নাটের গুরুকে কেউ কখনও দৃশ্যপটে দেখে না, আর তারা নিজেদের সন্তানদেরকে ভুলেও একাজের জন্য উৎসাহিত করে না। এই হলো ইসলামের নামধারী বা স্বঘোষিত নেতাদের অবস্থা।

হুযূর বলেন, কেমন অদ্ভুত মানুষ আল্লাহ্ তালা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কে দান করেছেন, যারা প্রত্যেকে إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ এর মূর্তিমান প্রতীক। অর্থ: ‘আমি আমার সমস্ত বিচলতা ও দুঃখ আল্লাহ্ তা’লার সমীপে নিবেদন করছি।’ (সূরা ইউসুফ: ৮৭) আর এটিই মু’মিনের বিশেষত্ব। মু’মিনদেরকে দুঃখ-কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণের উপদেশ আল্লাহ্ তা’লাই দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوااسْتَعِينُو بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

অর্থ: ‘হে যারা ঈমান এনেছ! ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার কাছে সাহায্য যাচনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্য প্রদর্শনকারীদের সাথে আছেন।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৫৪)

কাজেই, খোদা তা’লার প্রকৃত বান্দা খোদার সমীপে তাঁর সব কিছু সমর্পণ করে।

সত্যের কারণে যেসব ভয়-ভীতি আসবে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা মু’মিনদেরকে উদ্দেশ্য করে পবিত্র কুরআনে বলেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

অর্থ: ‘এবং আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়ভীতি, ক্ষুধা এবং কিছু ধন-সম্পদ, প্রাণের ও ফলফলাদীর ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা নিব। অতএব তুমি ধৈর্যশীলগণকে সুসংবাদ দাও।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৫৬)

অতএব, ধৈর্য ও প্রার্থনাকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা’লা আনন্দের সংবাদ দিয়েছেন। তাঁর সন্তুষ্টির জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবার সংবাদ শুনিয়েছেন। আল্লাহ্‌র রাস্তায় যারা শহীদ হয় তাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে দৃঢ়তা হলো এর প্রধান শর্ত। এক্ষেত্রে লাহোরের আহমদীরা সৌভাগ্যবান। যারা চলে গেছেন তাঁরাও আর যারা পিছনে রয়ে গেছেন তারাও এরূপ দৃঢ়তাই প্রদর্শন করেছেন। অতএব আল্লাহ্ তা’লা যিনি অঙ্গীকার রক্ষাকারী - তিনি স্বীয় অঙ্গীকার রক্ষা করবেন।

এ সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

যারা বলেছে আমাদের প্রভু আল্লাহ্, আর মিথ্যা খোদা থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে, আর দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে অর্থাৎ বারবার পরীক্ষা ও বিপদাবলীর সময় দৃঢ়তার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকেছে, তাদের উপর ফিরিশ্তা অবতীর্ণ হয়। (আর বলে) তোমরা ভয় করো না, তোমরা চিন্তিতও হয়ো না। তোমরা আনন্দিত হও, আনন্দে উদ্বেলিত হও যে, তোমরা ঐ আনন্দের উত্তরাধিকারী হয়েছো যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হয়েছে। আমরা ইহ ও পরকালে তোমাদের বন্ধু। এখানে এই বাক্যাবলীতে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, দৃঢ়তার মাধ্যমে সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। এটা সত্য বিষয়, অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করার চাইতেও বড় বিষয় হলো, অবিচলতা ও ধৈর্য। চতুর্দিকে বিপদ-আপদ পরিবেষ্টিত দেখবে, আর খোদার রাস্তায় প্রাণ, সম্মান, সম্ভ্রমকে হুমকিগ্রস্ত অবস্থায় দেখবে। সান্ত্বনা দেয়ার মতো কোন বিষয় থাকবে না, এমন কি খোদা তা’লা যদি পরীক্ষাস্বরূপ সান্ত্বনা প্রদানকারী কাশ্‌ফ, স্বপ্ন বা ইলহাম অবতীর্ণ করা বন্ধ করে দেন আর ভয়ানক অবস্থার মধ্যে নিপতিত করেন, তবুও কোন নৈরাশ্য দেখাবে না আর ভীরুদের মত পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবেনা। বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোন দুর্বলতা প্রদর্শন করবে না। সত্যবাদীতা ও দৃঢ়তায় কোন কমতি দেখাবে না। লাঞ্ছনা ও গঞ্জনায় প্রফুল্ল হবে, মৃত্যুতে সন্তুষ্ট হবে। আর দৃঢ় পদক্ষেপের জন্য কোন বন্ধুর সাহায্যের অথবা খোদা তা’লার সুসংবাদ লাভের অপেক্ষা করবে না। সময়টা খুবই নাজুক হবে। তবুও একান্ত অসহায় ও দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এবং কোন সান্ত্বনা না পাওয়া সত্ত্বেও সোজা দাঁড়িয়ে যাবে এবং নির্ভীকভাবে ঘাড় বাড়িয়ে দিবে। আর কখনও অস্থিরতা ও অধৈর্য প্রর্দশন করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পরীক্ষা শেষ হয়।

হুযূর বলেন, এরই নাম ধৈর্য; যার মাধ্যমে খোদাকে পাওয়া যায়। এটি সেই জিনিস যার সৌরভ রসূলগণ, নবীগণ, সিদ্দিকগণ ও শহীদদের মাটি থেকে এখন পর্যন্ত আসছে। নিশ্চিত, আমাদের শহীদদের মাটি থেকেও সৌরভ আসছে, যা আমাদের মন-মস্তিষ্ককে সুরভিত করছে। তাদের ধৈর্য আমাদেরকে চিৎকার করে বলছে, যে অবিচলতা ও ধৈর্যের আচল তোমরা ধরেছ একে কখনও ছেড়ে দিও না। নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করবেন। পরীক্ষা দীর্ঘ হওয়া যেন তোমাদেরকে অবিচলতা ও দৃঢ়তা থেকে বিচ্যুত না করে। এই শহীদদের ব্যাপারে অনেকে ভাল ভাল স্বপ্নও দেখেছে যে, তারা মহানন্দে জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনারা ঐ সব লোক যাদের সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর প্রতি ইলহাম হয়েছে। আর তা হলো,

‘লাহোরে আমাদের পবিত্র সদস্যরা আছেন। লাহোরের প্রতি আমাদের পবিত্র ভালবাসা আছে।’

হুযূর বলেন, আমার দৃষ্টিতে শুধুমাত্র প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই শত্রুরা এই আক্রমন করেনি বরং তাদের দুরভিসন্ধি ছিল গভীর। প্রথমতঃ ত্রাস সৃষ্টি করে তাদের দৃষ্টিতে দুর্বল আহমদীদেরকে আহমদীয়াত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। যুবকদের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। কিন্তু তারা জানে না, এরা ঐ মায়ের সন্তান, যাদের রক্তে, প্রাণ, সম্পদ, সময় ও সম্মান কুরবাণী করার অঙ্গীকার সুপ্ত রয়েছে। যাদের ভেতরে অঙ্গীকার পূর্ণ করার অনুপ্রেরণা রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ শত্রুরা ভেবে থাকবে যে, এতো বড় কুরবানী, একসাথে এতগুলো তরতাজা প্রাণ হারানোর বেদনা আহমদীরা সহ্য করতে পারবে না, তারা রাস্তায় বেরিয়ে আসবে। ভাংচুর করবে, মিছিল বের করা হবে। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও প্রশাসন নিজেদের মর্জিমত আহমদীদের সাথে ব্যবহার করবে। পরবর্তিতে এসব প্রতিক্রিয়া বহিঃর্বিশ্বে প্রচার করে আহমদীদের দুর্নাম করা হবে। কিন্তু তারা জানে না, আহমদীরা খোদা প্রদত্ত ধৈর্য ও দোয়ার সাহায্যে আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য যাচনাকারী এবং তাঁর আশ্রয়ে এবং খিলাফতের পতাকাতলে একত্রিত। বিরুদ্ধবাদীরা তাদের প্রত্যাশা মোতাবেক প্রতিক্রিয়া দেখার সুযোগ পায়নি ঠিকই, তবে বহিঃবিশ্ব এহেন ঘৃণ্য অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় আর প্রচার মাধ্যমও তাদের মুখোশ খুলে দেয়, তখন প্রশাসনের টনক নড়ে। তারা বুঝলো, এখন নিজেদের অপকর্ম ঢাকার জন্য হলেও তাদের প্রতি সহানুভূতি জানানো আবশ্যক। তখন তারা বিভিন্ন বার্তা পাঠাতে শুরু করে। সহমর্মিতার বাণী আসতে শুরু হয়। দুঃখ এই যে, এখন পর্যন্ত এরা বুঝলো না যে, আহমদীরা কিরূপ? আহমদীয়াতের বিগত ১২০ বছরের ইতিহাসের প্রতিটি সেকেন্ডের কর্মকান্ডও এদের চোখ খুলতে সক্ষম হয়নি। এরা এক ইমামের আহবানে উঠে ও বসে। তারা ঐ প্রতিশ্রুত মসীহ্‌র মান্যকারী, যিনি তাঁর নেতা ও পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষাকে জগতময় প্রসার করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি পশুতুল্য মানুষকে মানুষ এবং মানুষকে খোদাপ্রাপ্ত মানুষ বানানোর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তিনিই আমাদের নেতা, যিনি মানবতার প্রতি অনুগ্রহকারী, আর কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর মত কোন মানবদরদী সৃষ্টি হবে না। তোমরা ঐ মানবদরদীকে এবং আমাদের পবিত্র রসূলকে দুর্নাম করার ব্যর্থ চেষ্টা করছো। নিশ্চিত কিয়ামতের দিন ‘লা-ইলাহা’ কলেমা তোমাদের প্রত্যেককে এক এক করে ধরে তোমাদের মন্দ পরিণামে নিয়ে যাবে। আমাদের দায়িত্ব ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে কাজ করা। এই ধৈর্য দেখে জগদ্বাসী বিস্মিত হয়েছে। যুলুম ও নির্মম নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আহমদীদের প্রতিক্রিয়ার এই অনুপম দৃষ্টান্ত দেখে অন্যরা শুধুমাত্র সহমর্মিতাই প্রকাশ করেনি বরং আহমদীয়াতের প্রতিও আকৃষ্ট হচ্ছে। অনেকে বয়’আত করারও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কাজেই এই যুলুম যা তোমরা আমাদের সাথে অব্যাহত রেখেছো এর দরুন এই জগতেই আমরা এর পুরস্কার পেতে শুরু করেছি।

হুযূর বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল কিছু ঘটনা বর্ণনা করবো। কিন্তু কিছু এমন মর্মান্তিক ঘটনা রয়েছে যে কারণে আমি ভয় পাচ্ছি যে আবার আবেগাপ্লুত হয়ে না পড়ি। এজন্য আমি সবগুলো বর্ণনা করতে পারবো না। দুই একটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

নায়েব নাযের ইসলাহ্ ও ইরশাদ সাহেব লিখেছেন, জানাযায় আগত একজন নামাযী অপর একজনকে সম্বোধন করে বললেন, “আমি শহীদ পিতার সন্তান হবার সৌভাগ্য অর্জন করে আরো একটি পুরস্কার পেলাম”। তিনি আমাকে বললেন, “এ ঘটনায় আমার সংকল্প ও উদ্দ্যম আরো বৃদ্ধি পেয়েছে”।

মডেল টাউনে মোকাররম এজায সাহেবের ভাই শাহাদত বরণ করেন আর তিনি মসজিদেই এ সংবাদ পান। তাকে বলা হলো, “আপনি ওমুক হাসপাতালে চলে যান - সেখানে আপনার ভাইয়ের লাশ রাখা আছে”। তিনি জবাব দিলেন, “শহীদ খোদা তা’লার কাছে পৌঁছে গেছেন। এখন কোন আহমদী ভাইয়ের হয়তো আমার রক্ত প্রয়োজন হতে পারে। তাই আমি এখানেই থাকব”।

একজন মা বললেন, “আমার কোল খালি করে আমার একমাত্র উঠতি যুবক সন্তানকে খোদা তা’লার কোলে দিয়ে দিয়েছি। যার আমানত ছিল তাঁর কাছেই ফিরিয়ে দিয়েছি”।

আমাদের মুরব্বী সিলসিলাহ্ মাহমুদ আহমদ শাদ সাহেব মডেল টাউনে উত্তমরূপে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি খুতবারত অবস্থায় সবাইকে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার ও দরূদ পাঠ করার আর ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে থাকেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত আবৃত্তি করতে থাকেন, দোয়া করতে থাকেন, উচ্চস্বরে দরূদ শরীফ পাঠ করতে থাকেন এবং নারায়ে তকবীর ধ্বনিও উচ্চকিত করতে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি শাহাদত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন।

হুযূল বলেন, আমি পূর্বেও বলেছি, আমাদের কান্না, আমাদের দুঃখ আমরা কেবল খোদা তা’লার সমীপেই নিবেদন করি। এদের কাছে আমাদের কোন চাওয়া নেই। প্রত্যেক পরীক্ষার পর আল্লাহ্ তালার উদ্দেশ্যে কুরবানী এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্খা আমাদের আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। বান্দা না আমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে আর না-ই আমাদেরকে কিছু দিতে পারবে। নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে এখন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনেক বেড়ে গেছে আর পাকিস্তানে তা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আহমদীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করার পেছনে সরকারী সহায়তা রয়েছে। তাই তাদের মনে যা চায় তাই তারা করে। অতএব, পাকিস্তান সরকারের কাছে আহমদীরা ভাল কোন কিছু আশা করতে পারে না এবং করেও না। আমাদের প্রভু, আমাদের আল্লাহ্ - তিনিই আমাদের একমাত্র ভরসা। তিনিই আমাদের একমাত্র সাহায্যকারী, এবং ইনশাল্লাহ্ তা’লা তিনি সর্বদা আমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবেন এবং স্বীয় নিরাপত্তার চাদরে আবৃত রাখবেন। তবে, আহমদীদের সাবধানে থাকা উচিত এবং অনেক বেশি দোয়া করা প্রয়োজন।

“আল্লাহুম্মা ইন্না নাযআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউযুবিকা মিন শুরুরিহিম” এবং “রাব্বি কুল্লু শাইয়িন খাদিমুকা রাব্বি ফাহ্ ফাযনি ওয়ানসুরনি ওয়ার হামনি”- উক্ত দোয়াগুলো বেশি বেশি পাঠ করুন।

অনেক বেশী দোয়া করুন। নিজেদের দৃঢ়তার জন্য দোয়া করুন। দুষ্কৃতকারীদের মন্দ পরিণামের জন্য খোদার কাছে আহাজারি করুন, কান্নাকাটি করুন। আমাদের এ দু’টি মসজিদে যারা গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের পূর্ণ সুস্থতার জন্যও দোয়া করুন। ঐ আহতদের মধ্য থেকে একজন ছিলেন ডা: ইমরান সাহেব, তিনি আজ মৃত্যু বরণ করেছেন। إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ । আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক আহমদীকে সকল প্রকার বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখুন। অনেক দোয়া করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে