In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

বিশ্বের চলমান প্রেক্ষাপটে যুগ খলীফার গুরুত্বপূর্ণ নসীহত

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৮শে মে, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ্ পাঠ করেন:

إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِن طِينٍ

فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ

فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ

إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ

অর্থ: ‘যখন তোমার প্রভু-প্রতিপালক ফিরিশ্তাদের বলেছিলেন, অবশ্যই আমি কাদামাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। অতঃপর আমি যখন তাকে পূর্ণতা দান করবো এবং তার মাঝে আমার রূহ ফুঁকে দিব তখন আনুগত্যের সাথে তোমরা তার সামনে বিনত হয়ো। তখন ফিরিশ্তারা সবাই আনুগত্য করলো। কিন্তু ইবলীস করলো না; সে অহংকার করলো এবং সে ছিলই অস্বীকারকারীদের একজন।’

(সূরা সাদ: ৭২-৭৫)

হুযূর বলেন, সৃষ্টির আদি থেকেই শয়তান ও মানুষের মাঝে যুদ্ধ চলে আসছে। ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, হযরত আদম (আ.)-এর প্রতি আল্লাহ্ তা’লা যখন স্নেহদৃষ্টি দেন তখন থেকেই তাঁর ও মানুষের বিরুদ্ধে শয়তান যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এরপর যত নবী-রসূল এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের যুগেই এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এবং ঘটছে। নবীগণ যখন আসেন তখন তাঁরা মানুষকে আল্লাহ্ তা’লার পানে পরিচালিত করেন, কিন্তু শয়তান এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করে থাকে। সে বিভিন্ন পদ্ধতি, ছল-চাতুরী, লোভ-লালসা এবং ভয়-ভীতির মাধ্যমে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানে শয়তানের উল্লেখ করার মাধ্যমে মানব জাতিকে এর আক্রমন সম্পর্কে সাবধান করেছেন এবং এর খপ্পর থেকে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছেন। আর দোয়া শিখিয়েছেন,

‘হে আল্লাহ্! তুমি আমাদেরকে অভিশপ্ত শয়তানের আক্রমন থেকে রক্ষা কর এবং আমাদেরকে সর্বদা তোমার আশ্রয়ে রাখ।’

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র বিশ্বজগত এবং বিশ্বের সকল সৃষ্টিকে তার সেবায় নিয়োজিত করেছেন। একজন মানুষ যখন আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য লাভ করে এবং নবুয়তের পদে আসীন হন তখন তিনি যুগের আদম হয়ে যান, সে সময় তাঁর প্রতি আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য ও সমর্থন এমনভাবে প্রকাশ পায় যা মানবীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে। আমরা দেখতে পাই, মহানবী (সা.) ও মু’মিনদের উপর যখন চরম যুলুম-অত্যাচার হচ্ছিল এবং কাফিররা মুসলমানদের ধ্বংস করতে মদিনা আক্রমনের লক্ষ্যে বদরের প্রান্তরে সেনা সমাবেশ ঘটায় তখন আল্লাহ্ তা’লা ফিরিশ্তার মাধ্যমে মুসলমানদের পক্ষে কীভাবে যুদ্ধের ফলাফল পাল্টে দিয়েছিলেন। হুনায়েনের যুদ্ধেও আমরা একই দৃশ্য দেখেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’লা ফিরিশ্তাদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) ও মু’মিনদের সহায়তা দান করেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মুসলমানদেরকে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং তাদের ধন-সম্পদেরও ক্ষতি সাধিত হয়েছে কিন্তু ইবলীসের দল কখনোই তাদের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করতে পারেনি। সাধারণত নবীর প্রতি ঈমান আনয়নকারীরা সমাজের নিচু শ্রেণীর মানুষ হয়ে থাকে অপরদিকে সত্যের বিরোধীদের দাবী হলো, আমরা হচ্ছি সমাজের সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত শ্রেণী, তাই ধর্মীয় জ্ঞানও আমাদের বেশি। আমরা কোনক্রমেই এই দরিদ্র ও অনাথদের দলে যোগ দিতে পারি না। এটি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের ফলে তাদের মাঝে সৃষ্ট অহংকারের বহিঃপ্রকাশ বৈ অন্য কিছু নয়।

হুযূর বলেন, আজও যারা যুগ ইমামকে মানছে না, মূলতঃ অহংকারের কারণেই তারা ঈমান থেকে বঞ্চিত। অতএব আল্লাহ্ তা’লা যখন ফিরিশ্তাদেরকে বললেন, আমি মানব সৃষ্টি করেছি; তোমরা তাকে সিজ্‌দা কর। এটি কোন বাহ্যিক সিজ্‌দা ছিল না। কেননা বাহ্যিক সিজ্‌দা শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা’লাকেই করা হয়ে থাকে। এ সিজ্‌দার অর্থ হলো, জগতে ধমের্র প্রচার এবং প্রসারের জন্য আমি যে মহাপুরুষ প্রেরণ করেছি তোমরা তাঁর পূর্ণ আনুগত্য কর। তাঁর মিশনকে সফল করার লক্ষ্যে তাঁকে সহযোগিতা কর এবং শয়তানের ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দিও না। তাহলেই মানুষ নিজেদের মাঝে সত্য রূহ ফুৎকারের দৃশ্য অবলোকন করবে। খোদা তা’লার স্নেহের বহিঃপ্রকাশ দেখবে। আর নিজ নিজ ইহ ও পরকাল গুছিয়ে অবশ্যই স্থায়ী জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবে। তারা নবীর বাণীকে বিশ্বব্যাপী প্রচারের জন্য মানুষকে নবীর সাহায্যকারী হবার আহবান জানাবে, ফলে সাধু প্রকৃতির মানুষের হৃদয়ে একটি আলোড়ন সৃষ্টি হবে।

মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে আল্লাহ্ তা’লা এ যুগের আদম বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি (আ.) বলেন:

‘খোদার প্রেরিতদেরকে অপমান করো না। কেননা খোদার প্রেরিতদের অপমান করা খোদার অপমান। তোমরা চাইলে গাল-মন্দ করতে পার এটা তোমাদের ইচছা। কেননা ঐশী রাজত্বকে তোমরা তুচ্ছ বিষয় বলে মনে কর।’

কাজেই আজ যারা লড়ছে তারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং তাঁর জামাতের বিরুদ্ধে লড়ছে না বরং খোদা তা’লার সাথে লড়ছে।

পরবর্তীতে এর বিস্তারিত বর্ণনায় তিনি (আ.) বলেন:

‘প্রকৃত খিলাফত আমারই আর আমি আল্লাহ্ তা’লার খলীফা।’

এরপরে তিনি (আ.) নিজের একটি ইলহামের উল্লেখ করেন।

‘আ’রাদতু আন আসতাখলিফা ফাখালাকতু আদামা খলীফাতুল্লাহিস্ সুলতান’

অর্থ: ‘আমি খলীফা মনোনীত করতে চাইলাম আর এ উদ্দেশে আদমকে সৃষ্টি করলাম। সে সর্বাধিপতি খোদার খলীফা।’

তিনি (আ.) বলেন: আমাদের খিলাফত কোন জাগতিক খিলাফত নয় বরং এটি হলো আধ্যাত্মিক ও ঐশী ব্যবস্থাপনা। অতএব আদম হওয়ার এই মর্যাদা খোদা তা’লা আমাকে মহানবী (সা.)-এর দাসত্বের কল্যাণে দান করেছেন। খোদা তা’লা আমাকে যখন এ সম্মান দিয়েছেন তখন তিনি তাঁর বিধান অনুযায়ী ফিরিশ্তাদেরকে আদমকে সিজ্‌দা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ বিশেষ মানুষকে সিজ্‌দা করো যাকে আমি আমার ধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য মনোনীত করেছি। তার সাথে ঐশী সাহায্যের এক অব্যাহত ধারা কার্যকর রয়েছে। তিনি এক ব্যক্তি ছিলেন অগণিত হয়ে গেলেন। তাঁকে ইলহামে আশ্বস্ত করা হয়েছে, আমি তোমার সাথে আছি এবং আমার ফিরিশ্তারাও তোমার সাথে আছে।

আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে ইলহামের মাধ্যমে জানিয়েছেন,

‘ইন্নি মা’আর রাসূলে ওয়া ইয়ানসুরুহুল্ মালাইকাতু’

অর্থ: ‘আমি আমার রসূলের সাথে আছি আর ফিরিশ্তারা তাঁকে সাহায্য করবে।’

হুযূর বলেন, খোদা তা’লার সাহায্য সমর্থনের প্রমাণ আজ পর্যন্ত আমরা পেয়ে আসছি। শয়তানও তাঁর কাজ করে যাচ্ছে আর ফিরিশ্তারাও তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে। কোন একটি স্থানে জামাতকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র হলে আল্লাহ্ তা’লা অন্যান্য স্থানে জামাতের জন্য উন্নতির দ্বার খুলে দেন। কয়েকদিন হল আমি আল্ ফযলে একটি ঘটনা পড়ছিলাম। যেখানে নাদিম সাহেব আরবদের সম্পর্কে একটি কলাম লিখেন, সেখানে হিলমী শাফি সাহেবের আহমদীয়াত গ্রহণের ঘটনার বিবরণ ছিল। হিলমী শাফী সাহেব এবং মোস্তফা সাবেত উভয়ে সিনা মরুভূমিতে একসাথে কাজ করতেন। শাফী সাহেব বলেন, আমি তখন দেখতাম একজন যুবক অন্যদের থেকে সতন্ত্র, নিয়মিত একাকী নামায পড়ে এবং খুব ধীরে-সুস্থে নামায পড়ে। তাঁর অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। পরে আমি তাঁর সাথে ব্যক্তিগত সর্ম্পক গড়ে তুলি। ঐ যুবক ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতো এবং এর স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতো। আর এগুলো এমনই ছিল যার কোন উত্তর আমার কাছে ছিল না। উলামাদের নিকট উত্তর চাইতাম কিন্তু প্রশান্তি পেতাম না। একপর্যায়ে আমাকে সেখান থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হয়। আসার সময় তিনি তাঁর পুস্তকের বাক্স আমাকে দিয়ে দিলেন। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে - আমি এ বইগুলো পড়ব। সে সময় আমি পবিত্র কুরআনের পাঁচ খন্ড তফসীর, ইসলামী নীতি দর্শন ও অন্যান্য আরো অনেক বই পড়লাম। অন্যান্য অ-আহমদী আলেম ও শিক্ষিত মানুষের মত আমিও আপত্তি খুঁজে বের করার লক্ষ্যে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বই-পুস্তক পড়লাম। আমি আপত্তি খুঁজে বের করতাম এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য আলেমদের কাছে যেতাম। কিন্তু তাদের কথায় তুষ্ট হতে পারতাম না। এরপর আমি ইসলামী নীতি দর্শন পুস্তক পড়লাম। এটি আমার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করল। আমি আমার পিতাকেও এটি পড়ে শুনালাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, এমন পুস্তকের রচয়িতা কে হতে পারে? তিনি বললেন, এ বইয়ের রচয়িতা নিশ্চয়ই কোন ওলীউল্লাহ্ হবেন। আমি বললাম, এ বইয়ের রচয়িতা যদি মসীহ্ মওউদ হবার দাবীদার হয়, তবে আপনি কি বলেন, তখন তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন, ঠিক আছে, আমি এতে আপত্তি করার ক্ষমতা রাখি না। কেননা এমন উঁচু মানের বই কেবল আল্লাহ্ তা’লার একান্ত নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিই লিখতে পারেন। কিন্তু আমিতো বৃদ্ধ হয়ে গেছি, তাই তাঁকে গ্রহণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। অবশেষে হিলমী শাফী সাহেবের হৃদয় ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে এবং তিনি বয়’আত গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন।

হুযূর বলেন, এমন অগণিত ঘটনা রয়েছে, বর্তমানেও এমন ঘটছে। অনেককে আল্লাহ্ তা’লা স্বপ্নের মাধ্যমে সত্যকে গ্রহণ করার সৌভাগ্য দিয়েছেন। ফিরিশ্তাদের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রেরিত ব্যক্তির সাহায্য-সমর্থনের এসব নিদর্শন প্রকাশ করেন এবং তা বিশ্বব্যাপী ঘটছে। আর এভাবেই সৎ প্রকৃতির মানুষরা সত্যের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। অপরদিকে শয়তানের অনুসারীরা সত্যের বিরোধিতায় রত থাকে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘অহংকার এমন এক পরীক্ষা যা মানুষের পিছু ছাড়ে না। স্মরণ রাখ, অহংকার শয়তান থেকে আসে এবং অহংকারীকে শয়তানে পরিণত করে। মানুষ এ পথ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ দূরে সরে না আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত সত্য গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার আশিস লাভ করা সম্ভব নয়। এ অহংকার তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অতএব কোন ধরনের অহংকারই করা উচিত নয়। না জ্ঞানের, না ধন-সম্পদের, না ইজ্জত-সম্মানের, না বংশ মর্যাদা ও আভিজাত্যের। কেননা, প্রধাণতঃ এসব বিষয় থেকেই অহংকার সৃষ্টি হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এই আত্মম্ভরিতা থেকে মুক্ত হয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মহা প্রতাপশালী আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় বান্দা ও তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হতে পারে না এবং সেই ঐশী তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে পারবে না যা প্রবৃত্তির উত্তেজনার বিষকে জ্বালিয়ে দেয়। অহংকার যেহেতু শয়তানেরই অংশ, তাই আল্লাহ্ তা’লা এটি পছন্দ করেন না। শয়তান এ অহংকারই করেছিল এবং নিজেকে হযরত আদম (আ.)-এর চেয়ে বড় মনে করেছিল। বলেছিল, أَنَاْ خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَّ خَلَقْتَهُ مِن طِينٍ অর্থ: আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ আর তাকে মাটি থেকে। এর ফলে সে আল্লাহ্ তা’লার সান্নিধ্য থেকে বিতাড়িত হল। তাই সবাইকে এ সম্পর্কে সাবধান থাকা উচিত। মানুষ পূর্ণ ঐশী তত্ত্বজ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত পদস্খলিত হতে থাকে এবং এ বিষয়ে সচেতন থাকে না। আর যে ঐশী তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে, সে পদস্খলিত হলেও খোদা তা’লার নিরাপত্তায় থাকে। যেমন হযরত আদম (আ.) পদস্খলিত হবার পর স্বীয় দুর্বলতা স্বীকার করেন। তিনি জানতেন, আল্লাহ্ তা’লার কৃপা ছাড়া কোন কিছুই হতে পারে না। তাই এ দোয়া করে আদম (আ.) আল্লাহ্ তা’লার আশিসের উত্তরাধিকারী হন - رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ অর্থ: হে আমার প্রভু! আমি আমার প্রাণের উপর অন্যায় করেছি। তুমি যদি আমায় ক্ষমা না কর ও আমার প্রতি দয়া না কর তবে নিশ্চয়ই আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হব।’

(জলসা সালানার বক্তৃতা- ডিসেম্বর-১৯০৪, পৃষ্ঠা: ১৯-২০)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বারংবার বলেছেন, এটি যদি খোদা তা’লার জামাত না হত তাহলে কবেই ধ্বংস হয়ে যেত। তাই আহমদীয়া জামাতের বিরোধিতার পরিবর্তে হযরত আদম (আ.)-এর দোয়ার সম্পর্কে চিন্তা করুন। আজও সংবাদ এসেছে, টিভি চ্যানেলসমূহে সংবাদ প্রচার হচ্ছে, লাহোরস্থ আমাদের দু’টি মসজিদ মডেল টাউন ও দারুয্ যিক্‌র’এ নৃশংস আক্রমন চালানো হয়েছে। এভাবে মৌলভীদের অনুকরণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিরোধিতা হচ্ছে। বিরোধিতা কি পূর্বেও আহমদীয়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছে? নিশ্চিতভাবে পারেনি এবং কখনো পারবেও না। তবে, অবশ্যই এরূপ ঘৃণ্য কাজ তাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার শাস্তির লক্ষ্যে পরিণত করবে।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আ.) আমাদেরকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, দোয়া এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, শয়তানের সাথে যখন আদমের যুদ্ধ হয়েছে তখন দোয়া ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধাস্ত্র তাঁর কাজে আসেনি। অবশেষে আদম (আ.) দোয়ার মাধ্যমেই শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, যেভাবে দোয়ার মাধ্যমে আদম (আ.) শয়তানকে পদানত করেছেন তেমনিভাবে বর্তমান যুগেও তরবারির মাধ্যমে নয় বরং দোয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা’লা নিরাপত্তা বিধান করবেন; কেননা দোয়ার মাধ্যমেই প্রথম আদম শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল।

দ্বিতীয় আদমও {অর্থাৎ মসীহ মওউদ (আ.)-কে ও আল্লাহ্ তা’লা দ্বিতীয় আদম বলেছেন} শেষ যুগে শয়তানের সাথে শেষ যুদ্ধে দোয়ার মাধ্যমে চুড়ান্ত বিজয় লাভ করবেন।

অতএব আজ যেহেতু উত্তোরত্তর বিরোধিতা বেড়েই চলেছে এবং কয়েকটি স্থানে এ বিরোধিতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে আর এর বিস্তার ঘটছে তখন দোয়ার প্রতি আমাদের অনেক বেশী মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বিরোধিতা, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং শয়তান প্রত্যেক পথে বসে থাকা সত্ত্বেও জামাত উন্নতি করে চলেছে - এটি আল্লাহ্ তালার অনুগ্রহ বৈ কিছুই নয়। সত্যমনা লোকদের কারণে ফিরিশ্তারাও কাজ করে যাচ্ছেন ফলে মানুষ এ জামাতে অন্তর্ভূক্ত হচ্ছেন।

হুযূর (আই.) বলেন, মনে রাখবেন, শয়তানের চাটুকারদের দ্বারা আল্লাহ্ তা’লা জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করবেন বলে উল্লেখ করেছেন। আমি পূর্বেও বলেছি, বিরোধিতার ঝড় প্রবল রূপ ধারণ করছে। লাহোরের মসজিদে যে আক্রমন করা হয়েছে এর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এখনও জানা যায় নি। তবে অনেক আহমদী শহীদ হয়েছেন এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। এদের অনেকের অবস্থা আশংকাজনক। ‘দারুয্ যিক্‌র’-এর পরিস্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। অনেক লোক জুমুআর নামায পড়তে এসেছিলেন তাই এখনো বলা যাচ্ছে না যে, কতজন শহীদ হয়েছেন।

যাহোক, পরবর্তীতে অবস্থা জানা যাবে; তবে এটি নিশ্চিত যে, অনেক আহমদী শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা সব শহীদের মর্যাদা উন্নীত করুন। আহতদের জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ্ তা’লা যেন তাদেরকে আরোগ্য দান করেন; মোটের উপর অবস্থা গুরুতর।

বিরোধীরা ব্যপক ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করেছে, তবে আল্লাহ্ তা’লা নিশ্চয় এর প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম। তিনি কীভাবে তাঁর শক্তির বিকাশ ঘটাবেন, আর কীভাবে তিনি এ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে এবং অত্যাচারকারীদেরকে ধরবেন তা তিনিই ভাল জানেন। কিন্তু এসব লোক যারা খোদা তা’লার আত্মাভিমানকে বারংবার চ্যালেঞ্জ করছে এবং অত্যাচারে সীমালঙ্ঘন করছে, আল্লাহ্ তা’লা যেন তাদেরকে শিক্ষণীয় শাস্তি প্রদান করেন। আর ইনশাআল্লাহ্ তা’লা এটি হবে-ই।

হুযূর বলেন, আমি আহমদীদেরকে বিগলিত চিত্তে দোয়া করতে বলেছি। আল্লাহ্ তা’লা এদের অহংকার, গর্ব, তাদের শক্তি ও যুলুম-নির্যাতনকে স্বীয় প্রবল শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতঃ ধুলোয় মিশিয়ে দিন। আল্লাহ্ তা’লা আহমদীদের ঈমান ও বিশ্বাসে দৃঢ়তা দান করুন। পৃথিবীর সব আহমদী পাকিস্তানের আহমদীদের জন্য এখন খুব বেশী দোয়া করুন কেননা, তাদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। একইভাবে মিশরের আহমদীদের জন্যও দোয়া করা প্রয়োজন। আল্লাহ্ তা’লা দ্রুত তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করুন। ভারতের কেরালাতে দুই-তিন জন আহমদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তাদের জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদেরকেও দোয়াতে স্মরণ রাখবেন। আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব বন্দী, আহত এবং শহীদদের কুরবানী কখনো বৃথা যাবে না, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। শয়তান এবং তার চাটুকাররা কখনো সফল হবে না। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবার প্রতি করুণা করুন এবং বিপদাপদ থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে