In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

সত্যের বিরোধিতা এক চিরন্তন রীতি

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২১শে মে, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর সূরা আল্ ফুরকানের ৩২ নাম্বার আয়াত পাঠ করেন:

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ وَكَفَى بِرَبِّكَ هَادِيًا وَنَصِيرًا

অর্থ: ‘আর এভাবে অপরাধীদের মাঝ থেকে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু বানিয়ে থাকি এবং তোমার প্রভু-প্রতিপালক হেদায়াতদানকারী ও সাহায্যকারী হিসেবে যথেষ্ট।’

এরপর হুযূর বলেন, পৃথিবীতে যখনই কোন নবীর আগমন ঘটে মানুষ তাঁর এবং তাঁর জামাতের বিরোধিতা করে আর হাসি ঠাট্টামূলক আচরণ করে থাকে। আমি যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেছি তাতে পবিত্র কুরআন এ বিষয়েরই চিত্র অঙ্কন করেছে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, ‘যেভাবে আবর্জনা ও সার, যা পচাঁগলা বস্তুই হয়ে থাকে, তা ফসলের বেড়ে উঠার জন্য উপকারী। একইভাবে ঐশী জামাতের জন্য এ সব জঘন্য বিরোধিতাও সারের মত কাজ করে এবং এই বিরোধিতাও অনেক লোকের হেদায়াতের কারণ হয়ে যায়।’ অপরাধীরা খোদার প্রিয়পাত্রের বিরোধিতা করেই থাকে, এটিই চিরন্তন নিয়ম; তাই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগেও রীতি অনুযায়ী তাঁর বিরোধিতা হওয়ার কথা ছিল এবং হয়েছেও। তাঁর বিরোধিতা করা হয়েছে, তাঁর সাথে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করা হয়েছে, তাঁর অনুসারীদেরকেও বিভিন্ন সময় দুঃখ-কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং এখনও দেয়া হচ্ছে। নামধারী আলেমদের অনুকরণে মুসলমানরা আহমদীদের দুঃখ-কষ্ট দেয়াকে ইসলামের সেবা মনে করে।

হুযূর বলেন, খুতবার শুরুতে আমি যে আয়াত পাঠ করেছি তার পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَ قَالَ الْرَّسُوْلُ يَارَبِّ اَنَّ قَوْمِیْ اتَّخَذُوْا هَذَا الْقُرْانَ مَهْجُوْرًا

অর্থ: ‘এবং (এ) রসূল বলল, হে আমার প্রভু-প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার জাতি এ কুরআনের সাথে পরিত্যক্ত বস্তুর ন্যায় আচরণ করেছে।’

(সূরা আল্ ফুরকান: ৩১)

এ আয়াতে একদিকে মক্কার কাফিরদের কুরআন করীম না মানার কথা বলা হয়েছে, অপরদিকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। একই সাথে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কর্তৃক পবিত্র কুরআনের প্রকৃত শিক্ষার প্রতি আহ্বান করা ও কুরআনের শিক্ষা শিরোধার্য করার দিকে আহ্বান করার কথাও বুঝানো হয়েছে। যুগ ইমাম যখন তাদেরকে এ বলে আহ্বান করে, আমার কাছে আস! আমি তোমাদেরকে কুরআনের শিক্ষার নিগূঢ় তত্ত্বাবলী শিখাবো, যাতে করে তোমরা এই অনন্য সুন্দর শিক্ষাকে নিজেদের উপর প্রয়োগ করতে পার এবং ইসলামের বাণীকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে পার; তখন এর বিরোধিতা করা হয়।

অতঃপর হুযুর (আই.) আরো বলেন, আল্লাহ্ তা’লা যদি রহমান বা পরম দয়ালু না হতেন তাহলে তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই আজও আমরা আমাদের বিরুদ্ধবাদীদের এবং ঐসব লোকদের যারা আহমদীদের কষ্ট দেয়াকে পুণ্যের কাজ মনে করে তাদের বলবো, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর শিক্ষার প্রতি প্রণিধান করুন, যা তিনি তাঁর নেতা ও মনিব, মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর কাছ থেকে পেয়েছেন। তোমাদের চরম শোচনীয় অবস্থা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলে যে, এতদূর চলে যেও না যেখান থেকে আর ফিরে আসার কোন উপায় থাকবেনা।

আহমদীরা পবিত্র কুরআনের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখে। ইসলামের সবক’টি স্তম্ভ এবং ঈমানের আনুষঙ্গিক বিষয়াদির প্রতি বিশ্বাস রাখে। তারা শুধু মুসলমানই নয় বরং তারা প্রকৃত মু’মিনও। কেননা আজ একমাত্র আহমদীরাই আঁ-হযরত (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতাকল্পে যুগ ইমামের কাছে মহানবীর সালাম পৌঁছিয়েছে এবং তাঁর জামাতভুক্ত হয়েছে।

হুযুর এরপর পাকিস্তানে আহমদীদের বিরোধিতার কথা প্রসঙ্গে বলেন, আহমদীদের বিরোধিতায় তারা আহমদীয়া মসজিদ থেকে কলেমাও মুছে ফেলে। এই কলেমা মুছে ফেলার ঘটনা শুধু যে কোন একটি গ্রামেই ঘটেছে তা নয় বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সারগোধার একটি গ্রামে পুলিশ আহমদীয়া মসজিদ থেকে কলেমা মুছতে গেলে জামাতের প্রেসিডেন্ট সাহেব তাদেরকে বলেন, স্বয়ং উর্দি পরিহিত পুলিশ যদি আসে তাহলে আসুক নতুবা অন্য কেউই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করতে পারবে না। একথা বলে মসজিদের দরজা বন্ধ করে তিনি ভেতরে বসে যান। তিনি বললেন, কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে আমার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে। মসজিদে অবস্থানের পুরো সময় তিনি কলেমা পাঠে রত থাকেন, উনার নাম হলো ‘মালেক আতা মুহাম্মদ সাহেব আর তিনি ছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত একজন বয়স্ক মানুষ। তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখে পুলিশ মসজিদ থেকে কলেমা না মুছেই চলে যায়। প্রেসিডেন্ট সাহেব সম্পর্কে জেলার আমীর সাহেব লিখিতভাবে জানিয়েছেন, হৃদরোগী হবার কারণে তার হৃদকম্পন বেড়ে যায় এবং বাসায় যাবার পর তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। আর কলেমা পাঠরত অবস্থায়ই তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ। আল্লাহ্ তা’লা তার পদমর্যাদা উন্নীত করুন। পাকিস্তানের আহমদীদের জন্য অন্যান্য দেশের আহমদীরা বিশেষভাবে দোয়া জারী রাখুন।

এরপর হুযূর বলেন, দু’দিন পূর্বে করাচিতে আবারও একটি শাহাদতের ঘটনা ঘটেছে। ৪৮ বছর বয়স্ক জনাব হাফেয আহমদ শাকের সাহেব, করাচীর গুলশান ইকবাল এলাকায় বসবাস করতেন। তার একটি ঔষধের দোকান ছিল, ঐদিন রাত বারটার সময় তিনি দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন তখন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কানের পাশে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে তাকে শহীদ করা হয়, إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ। তিনি খোদ্দামুল আহমদীয়া এবং আনসারুল্লাহ্‌র একজন বলিষ্ঠ কর্মি ছিলেন। বিশেষভাবে কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল। অত্যন্ত উৎসাহের সাথে জামাতের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন, একান্ত ভদ্র ও নিবেদিত প্রাণ আহমদী ছিলেন। তিনি মৃত্যুকালে বিধবা স্ত্রী, মা এবং দু’জন কন্যা রেখে গেছেন। মহান আল্লাহ্ তা’লা শহীদের মা, স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে ধৈর্যশক্তি দান করুন। আর তার মর্যাদাকে উন্নীত করতে থাকুন। মূলতঃ এসব নির্যাতন, শহীদ করা, কষ্ট দেয়া, হত্যা করা, কলেমা মুছে ফেলা, এসব জঘন্য কাজ মৌলভীদের অনবরত উস্কানীর ফলেই হচ্ছে। মুসলমান আর মু’মিনের যে পরিচয় আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সা.) দিয়েছেন, তা আমি পূর্বেই বর্ণনা করেছি। এখন শুনুন এই হত্যাকারীদের বিষয়ে পবিত্র কুরআন কি বলেছে?

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

অর্থ: ‘আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু’মিনকে হত্যা করলে এর প্রতিফল হবে জাহান্নাম। সেখানে সে দীর্ঘকাল থাকবে। আর আল্লাহ্ তার উপর ক্রোধান্বিত হবেন আর তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবেন। এবং তার জন্য এক মহা শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন।’

(সূরা আন্ নিসা: ৯৪)

অতএব, শহীদদের জন্য তো পারলৌকিক নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে কিন্তু বিরোধীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,

وَ تَجْعَلُوْنَ رِزْقَكُمْ انَّكُمْ تُكَذِّبُوْنَ

অর্থ: ‘আর তোমরা কি এর অস্বীকার করাকে নিজেদের জীবিকা (অর্জনের মাধ্যম) বানিয়ে নিয়েছ?

(সূরা আল্ ওয়াকে’আ: ৮৩)

হুযূর বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করার আর সত্যের বিরোধিতা করার মাধ্যমেই হে মৌলভীরা! তোমাদের ও রাজনীতিবীদদের রুটি-রুজি অর্থাৎ রিয্‌ক জুটে থাকে। মোটকথা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করাটাই তাদের জীবিকা উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। তারা তাদের প্রকৃত রিয্‌কদাতা আল্লাহ্ তা’লাকে ভুলে গেছে। সূরা নিসার যে আয়াতটি পাঠ করেছি তাতে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ও হত্যা করার শাস্তি ঘোষণা করেছেন। অতএব, এটি এক ভীতিকর অবস্থা। এদের কিছুটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়া উচিত। জামাতের উন্নতির সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী বিরোধিতার প্রচন্ড ঝড় বইছে। প্রত্যেক নবীর বিরোধিতা হয়েছে এবং হয়ে থাকে। তাই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এরও বিরোধিতা হচ্ছে এবং যেখানে যেখানে আহমদীয়াত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেখানে তাঁর অনুসারীদেরও চরম বিরোধিতা হচ্ছে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে এসব মৌলভীদের চিত্র যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এসব নাম সর্বস্ব আলেমদের স্বভাব ও আচরণে কোন পরিবর্তন আসেনি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘ঐসব লোক যারা বলে-আমরা ইসলামের আলেম এবং নবীর ধর্মের বিচক্ষণ ও জ্ঞানী অনুসারী। অল্প সংখ্যক আল্লাহ্ তা’লার বিশেষ বান্দা ব্যতীত আমরা তাদেরকে নিতান্তই অলস ও চতুস্পদ জন্তুদের ন্যায় পানাহার করতে দেখি। তারা তাদের কথা ও লেখনীর মাধ্যমে সত্যের সামান্যতমও সহায়তা করে না। আর তাদের অধিকাংশকেই তুমি সত্যানুসারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী দেখতে পাবে। সত্যের আহ্বান শুনে তারা বিরোধিতা ও হৈ-চৈ করেনি, এমনটি কখনো হয়নি। কোনটি ন্যায় ও পুণ্যের পথ তারা তা জানে না। তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত হয় না এবং সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ করে, যাতে করে এসবের সমালোচনা করার মাধ্যমে অজ্ঞদের প্রতারিত করতে পারে। যাকে খোদা তা’লা মানুষের সংশোধনের জন্য দন্ডায়মান করেছেন, সেই ব্যক্তিকে তারা খান্নাস (কু-প্ররোচনা সৃষ্টিকারী) মনে করে আর মু’মিনদেরকে কাফির আখ্যা দেয়। কেবল মিথ্যার উপরই তাদের পদচারণা। আর কাফির আখ্যা দেয়া ছাড়া কোন ভাল কথা তাদের মুখ থেকে বের হয় না। ধর্মের সেবা কাকে বলে তারা তা জানেই না। তারা সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ করেছে আর জেনেশুনে আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটিয়েছে। অতএব রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ধর্মের জন্য এটি একটি বড় সংকটময় মুহূর্ত যে, এ যুগের অধিকাংশ আলেম সততা ও বিশ্বস্ততাকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। এবং তারা ধর্মের শত্রুদের ন্যায় আচরণ করছে আর সত্যের আক্রমন থেকে বাঁচাবার জন্য মিথ্যাকে আগলে রেখেছে। তারা মহা প্রতাপান্বিত খোদা তা’লার কোন পরোয়া করে না এবং শত্রুভাবাপন্নদের ন্যায় কাফিরদের সাহায্য করে আসছে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হলো, কেবল তারাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত অথচ তারা নির্ঘাত ধ্বংসের পথ অনুসরণ করে। তারা নিছক কামনা-বাসনার পিছনে ছুটে, সত্যের নিগূঢ় তত্ত্ব সন্ধান করে না এবং চিন্তা-ভাবনাও করে না। সত্য শোনার পর তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, যেন তাদের মৃত্যুর দিকে আহ্বান করা হচ্ছে। তারা জানে যে, এ পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী আর এ সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে, তবুও তারা প্রেমাসক্তের ন্যায় পৃথিবীর প্রতি ঝুঁকে থাকে। তারা ঘরে এক ধরনের কাজ করে আর মানুষের সামনে অন্য ধরনের কাজ করে। অতএব প্রদর্শনকারীদের জন্য পরিতাপ! তারা ভালভাবে জানে, কাফিরদের বিশৃঙ্খলা কত বেশী ছড়িয়ে পড়েছে। আর তারা এটিও ভালভাবে জানে যে, ধর্ম কাফিরদের আক্রমনের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। আর সত্য পাপাচারীদের পদতলে পিষ্ট হয়েছে। তবুও তারা উদাসীনের ন্যায় ঘুমিয়ে থাকে আর ধর্মের সাহায্যকল্পে কোনরূপ পদক্ষেপ নেয় না। তারা প্রতিটি কষ্টদায়ক কথা শোনা সত্ত্বেও কাফির এবং পাপাচারীদের কথাকে কোন গুরুত্বই দেয় না। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তির ন্যায় রুখে দাঁড়ায় না। বরং অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ন্যায় ভারী হয়ে যায় অথচ তারা অন্তঃসত্ত্বা নয়। আর সৎকাজ করার বেলায় আলস্য ও ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে। পরিশ্রমীর কোন চিহ্ন তুমি তাদের মাঝে দেখতে পাবে না। আর কোন আমোদ-প্রমোদের বিষয় দেখলে তুমি তাদেরকে সেদিকে দৌড়াতে বরং ছুটে যেতে দেখবে। এই হলো, আমাদের (তথাকথিত) বুযুর্গ আলেমদের স্বরূপ। কিন্তু কাফিররা ইসলামের ধ্বংস সাধনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এ উদ্দেশ্য সাধন কল্পেই তারা সকল ষড়যন্ত্র করছে আর তারা বিরত হয় না।’

(মিনানুর রহমান-রূহানী খাযায়েন, নবম খন্ড-পৃষ্ঠা: ১৭৭-১৭৯)

হুযূর বলেন, এক দিকে ইসলামের উপর আক্রমনের পরিধি এত বিশাল ছিল যে, ইসলামের শত্রু গোটা খ্রিষ্টীয়জগত ইসলামের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানের প্রদীপকে তাদের অগ্রযাত্রার অন্তরায় মনে করে তা নিভিয়ে দিতে প্রয়াসী ছিল। তাদের মেধা ও সম্পদের প্রচন্ড শক্তি এ আক্রমনে গতি সঞ্চারের জন্য নিয়োজিত ছিল। আর অন্য দিকে তাদেরকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কামানের বিপরীতে মুসলমানদের কাছে তীর পর্যন্তও ছিল না। খ্রিষ্টানরা কামান অর্থাৎ তাদের সম্পদ, কিতাব, এবং দলিল-প্রমাণ দ্বারা সুসজ্জিত হয়ে আগমন করে।

কেউ কেউ লিখেছে, খ্রিষ্টানদের এহেন আক্রমন প্রতিহত করার একাংশের কৃতিত্ব মির্যা সাহেবের। হুযূর বলেন, একটি অংশ কেন বরং পুরো কাজই মির্যা সাহেব করেছেন। সম্পূর্ণ কৃতিত্ব হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর। যারা সত্য প্রিয় মুসলমান ছিলেন কেবল তারাই প্রশংসা করেন নি বরং অমুসলিমরা তাঁর (আ.)-এর কাজের সফলতা দেখে ভীত ছিল। তিনি (আ.) ইসলামের এক মহান জেনারেল ছিলেন। তাঁর শিক্ষা প্রচারের প্রেক্ষিতে খ্রিষ্টানদের উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং খ্রিষ্টানরাও এটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, জামাতে আহমদীয়া ইসলামের বাণী পৌঁছানোর যে রীতি অবলম্বন করেছে সে কারণে কেবল হিন্দুস্থানেই নয় বরং আফ্রিকাতেও তাদের উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এ পর্যায়ে হুযূর (আই.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ইসলাম-সেবা সম্পর্কে কয়েকজনের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের লেখা হতে নমুনা স্বরূপ গুটিকতক উদ্ধৃতি পাঠ করেন।

খুতবার এ পর্যায়ে হুযুর বলেন, আমি আজ জুমুআর নামাযের পর একজন শহীদের গায়েবানা জানাযা পড়াবো। মালেক আতা মোহাম্মদ সাহেবকেও জানাযার নামাযে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। মিশরের একজন আহমদী, আহমদ মুহাম্মদ হাতেম হিলমী শাফী ২০ মে কিডনি অকার্যকর হবার কারণে যুবক বয়সেই ইন্তেকাল করেছেন। إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ। তার বয়স ছিল ২০ থেকে ২২ বছর। সে ডা: মোহাম্মদ হাতেম সাহেবের জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং মরহুম হিলমী শাফী সাহেবের পৌত্র ছিল। হিলমী শাফী সাহেবকে সকলেই জানেন। লেকা’ মা’আল আরব নামে খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.)-এর সাথে তার অনেক অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়েছে। মরহুম শৈশব থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিল এবং হুইল চেয়ারে বসে চলাফেরা করতো। তথাপি ধৈর্য্যরে সাথে নিজের এ রোগাক্রান্ত জীবন কাটিয়েছে। তার মাকে সে বলতো, আমি ধৈর্য্যের সাথে সব কিছু সহ্য করি এবং কখনো বিচলিত হই না। তার মা বলেন, আমি তার ধৈর্য্য দেখে অবাক হতাম। তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তাকে যখন সান্ত্বনা দেয়া হতো তখন উল্টো সে নিজেই তার মা ও আত্মীয়-স্বজনকে সান্ত্বনা দিত। তার মা বলেন, এই ছেলে তার অন্যান্য ভাই-বোনের তুলনায় পিতা-মাতার অত্যাধিক অনুগত ও বাধ্যগত ছিল। মিশরে অনেক আহমদী কারাবন্দী আছেন তাদের মাঝে তার পিতা ডা: হাতেম শাফী সাহেবও একজন। হাতেম সাহেব সেখানকার জামাতের প্রেসিডেন্ট। তার জেলে থাকা অবস্থায়ই ছেলে মারা গেছে। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসা শিক্ষায় স্নাতক পাশ করেছে। পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং কম্পিউটারের উপরও কোর্স করেছিল। মরহুম দাদার ন্যায় সে জামাতের বই-পুস্তক রচনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা পালনের ইচ্ছা পোষণ করত। খিলাফতের সাথে তার গভীর ভালবাসার সম্পর্ক ছিল। আমার খিলাফত কালে দু’বার এখানকার সালানা জলসায় অংশগ্রহণ করেছে। তার মাতা বলেন, মৃত্যুর সময় সে বলছিল, إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ এবং “লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক”। কিডনি অকার্যকর হওয়ায় কিছুদিন যাবত ডায়ালাইসিস করা হচ্ছিল। তার পিতা যেহেতু জেলে ছিলেন এবং এখনও আছেন তাই জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি। আল্লাহ্ তা’লা তারও মর্যাদা উন্নীত করুন এবং তার পিতা-মাতাকে ধৈর্য্য ধারণের সৌভাগ্য দিন। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক আহমদীকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে রক্ষা করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে