In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য ঘোষণার গুরুত্ব

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৪ই মে, ২০১০ইং

তাশাহ্‌হুদ, তাউয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর সূরা আল্ আ’লার প্রথম তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করেন:

سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى* الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّى* وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى*

এরপর হুযূর বলেন, আমাদের মাঝে সচরাচর জুমুআ ও দুই ঈদের নামাযের প্রথম রাকাতে এ সুরাটি তিলাওয়াত করার প্রচলন রয়েছে। হাদীস সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) জুমুআ ও দুই ঈদের নামাযের প্রথম রাকাতে এ সূরাটি পাঠ করতেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঠ করতেন সূরাতুল্ গাশিয়া। এছাড়াও বেতের নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা পাঠ করতেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন আর তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পাঠেরও উল্লেখ রয়েছে এবং কোন কোন বর্ণনায় শেষের তিনটি সূরা অর্থাৎ শেষের দুই কুল ও সূরা ইখলাস পাঠেরও উল্লেখ রয়েছে।

একবার হযরত আয়শা (রা.) কে মহানবী (সা.)-এর রুকূ, সিজদা, ক্বিয়াম এবং নামাযের প্রতিটি রীতি-নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি (রা.) বলেন, “তোমরা এর সৌন্দর্য্য এবং ব্যাপ্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না” - অর্থাৎ এর সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। সিজদার ব্যাপ্তিকাল সম্বন্ধে এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা.) বলেন,

মহানবী (সা.) একদিন মসজিদে এলেন এবং ক্বিবলামুখী হয়ে সিজদা করেন, দীর্ঘ সময় যাবত সিজদাবনত থাকেন। এত সুদীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমি তাঁকে দেখে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হলাম আর আমি এতটা চিন্তিত হলাম যে, আমার মনে হল - হয়তো আল্লাহ্ তা’লা তাঁর রূহ কবজ করে নিয়েছেন। উৎকন্ঠিত অবস্থায় যখন আমি মহানবী (সা.)- এর কাছে গেলাম তখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন। নবী করীম (সা.) বললেন, কে? আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রসুল! আমি, আব্দুর রহমান। এরপর আমি বললাম, আপনার সিজদা এতো দীর্ঘ ছিল যে, আমার আশংকা হলো কোথাও আপনার রূহ কবজ হয়ে যায় নি তো? মহানবী (সা.) বললেন, ‘আমার কাছে জিব্রাঈল এসেছিল এবং এ সুসংবাদ দিল যে, আল্লাহ্ তা’লা বলেন, যে ব্যক্তি আপনার প্রতি দরূদ প্রেরণ করবে তার প্রতি আমি রহমত বর্ষণ করবো এবং যে ব্যক্তি সালাম বা শান্তির জন্য দোয়া করবে তার প্রতি আমি শান্তি বর্ষণ করবো। এ অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমি সিজদাবনত ছিলাম এবং আল্লাহ্ তা’লার পবিত্রতার গান গাইছিলাম ও গুণকীর্তণ করছিলাম। কাজেই প্রত্যেক মু’মিনের উচিত খোদার তসবীহ্ ও গুণকীর্তণে রত থাকা।

হুযুর বলেন, প্রত্যেক ভালোর সাথে মন্দও থাকে। আল্লাহ্ তা’লার নিকট সব ধরনের মন্দ থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করাও আবশ্যক। আর প্রকৃত প্রশংসাকারীদের অবশ্যই আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিরাপত্তার বেষ্টনিতে স্থান দেন। পবিত্র কুরআনে যেখানে তসবীহ্’র উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে সাথে সাথে নামাযেরও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নামাযও এক প্রকার তসবীহ্ - যা করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক আর তাহলেই سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى মোতাবেক খোদার তসবীহ্’র সঠিক মূল্যায়ণ হবে। যেভাবে আমি বর্ণনা করেছি এর একটি অর্থ হলো, নিজের প্রভুর নামকে জগতে সমুন্নত কর।

মানুষ আল্লাহ্ তা’লার গুণাবলীর প্রতিচ্ছবি হতে পারে। আর এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত আমাদের প্রিয় রসূলুল্লাহ্ (সা.) যার প্রতি আল্লাহ্ তা’লা তাঁর পরিপূর্ণ বাণী অবতীর্ণ করেছেন। আর এ বাণী আল্লাহ্ তা’লা মানুষের প্রকৃতি অনুসারে অবতীর্ণ করেছেন। মানুষের বৃত্তি ও শক্তি নিচয়ের বিকাশ প্রথম যুগেও হয়েছিল আর ভবিষ্যতে কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে। মানব প্রকৃতিতে আল্লাহ্ তা’লা যথাযথ প্রয়োজনেই নম্রতা ও ক্রোধ রেখেছেন। মানুষ কখনও নম্রতা প্রদর্শন করে আবার কখনও ক্রোধ। তাই মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ গ্রন্থ পবিত্র কুরআন আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে স্থান-কাল ভেদে নম্রতা ও ক্রোধ প্রদর্শন কর, তবেই মানুষ বলে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, সংশোধন করার ক্ষেত্রে দেখতে হবে - ক্ষমা করলে সংশোধন হবে নাকি শাস্তি দিলে। অবিবেচকের ন্যায় যদি শুধু ক্ষমাই করা হয় তাহলে সমাজে যারা বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের দ্বারা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ক্রমশ বিনষ্ট হতে থাকবে। অতএব একজন বুদ্ধিমান এবং খোদাভীরু মানুষ সর্বদা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে আর এ কারণেই আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, আমি তাকে (মানুষকে) যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছি, সে সব দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র। একজন বুদ্ধিমান মানুষের প্রতিটি কাজ ও কর্ম স্থান-কাল ও পরিবেশ মোতাবেক হয়ে থাকে।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় রবুবিয়্যত বা প্রতিপালন বৈশিষ্ট্যের অধীনে মানুষের ক্ষমতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে থাকেন। তিনি যখন তাদের দোষ-ত্রুটি দেখেন তা নিরাময়ের ব্যবস্থাও করেন এবং নিরাময়ের উপায় সম্পর্কেও তাদের অবগত করেন। আল্লাহ তা’লা যেখানে শারীরিক রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থা করেন তদ্রুপে যুগে-যুগে নবী-রসূলগণকে আধ্যাত্মিক ব্যাধি নিরাময় কল্পে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁরা সমসাময়িক যুগের রোগ-ব্যাধি নিরাময় করেন। পূর্বের সব যুগের আধ্যাত্মিক রোগ-ব্যাধি যখন একসাথে প্রকাশ পেল তখন আল্লাহ্ তা’লা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁর যুগের সকল ব্যাধির চিকিৎসা করেন কিন্তু দীর্ঘকালের ব্যবধানে যখন পুনরায় অন্ধকার নেমে আসে। মুসলমানরা পারস্পরিক শত্রুতায় লিপ্ত হয় আর তাদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পায়, তারা আত্মঘাতী হামলার আশ্রয় নেয়, হত্যা ও হানাহানিতে লিপ্ত হয়। এগুলো কি ইসলামের শিক্ষা? আল্লাহ্‌র নামে এবং ধর্মের নামে যে যুলুম ও নির্যাতন করা হচ্ছে এটি কি ইসলামের শিক্ষা? না, কখনোই এটি ইসলামী শিক্ষা হতে পারে না।

এরপর হুযূর বলেন, এমন পরিস্থিতি নিরসন কল্পে আর বিপন্ন মানবতাকে ধ্বংস হতে রক্ষার জন্য আজ খোদা তা’লা পুনরায় যুগ ইমামকে প্রেরণ করেছেন। তাঁকে মানতে ও গ্রহণ করতে হবে। তিনি পুনরায় জগদ্বাসীকে এক খোদার প্রতি আহ্বান করছেন। মহানবী (সা.)-এর প্রতি আল্লাহ্ তা’লা যে শিক্ষা অবতীর্ণ করেছেন সেই শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তিনি মানুষের প্রতি ঔদ্বাত্ত আহ্বান জানান। আর এটিই প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা।

হুযূর বলেন, এ যুগে যখন একদিকে বিভিন্ন ফিরকার পক্ষ থেকে উদ্বিগ্ন চিত্তে ঘোষণা করা হচ্ছিল যে, কোন একজন সংশোধনকারীর প্রয়োজন, খিলাফতের প্রয়োজন। আর আল্লাহ্ তা’লা যখন সবার প্রাণের দাবী অনুসারে অভাব মোচনের ব্যবস্থা করলেন তখন আবার তাঁকে গ্রহণ করতে নারাজ। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى অর্থাৎ তিনি সেই সত্তা যিনি সঠিক চাহিদা কি তা নির্ণয় করেছেন আর তদনুসারে হেদায়াত দিয়েছেন। যেহেতু মানুষের মাঝে উন্নতির উপকরণ বিদ্যমান রয়েছে আর তাকে পূর্ণ শক্তি দেয়া হয়েছে। তাই আল্লাহ্ তা’লা তার এ শক্তি পরিমাপ করে সে অনুযায়ী উন্নতি করার উপাদান সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ প্রথমে সৃষ্টিকে দীক্ষা ও সামর্থ দান করেছেন এবং এরপর শিক্ষা প্রেরণ করেছেন। প্রধাণতঃ মানুষের বৃত্তিগত ও শারীরিক প্রয়োজন মোতাবেক আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াতের উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। আর দ্বিতীয়তঃ মানুষ যখনই স্খলন বা বিপথগামীতার সম্মুখিন হয়েছে তখনই আল্লাহ্ তা’লা তাকে রক্ষার জন্য হেদায়েত প্রেরণ করেছেন।

এরপর হুযূর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কেবলমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে আহমদীদের উপর যে যুলুম ও নির্যাতন হচ্ছে সে প্রেক্ষাপটে বলেন, আমি মিশরের আহমদীদের জন্য বিশেষভাবে দোয়ার আবেদন করছি, সেখানে গত কয়েক সপ্তাহ থেকে জামাতের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। আমাদের প্রায় ১২/১৩ জন আহমদী কারাবন্দি আছেন। এখনও বুঝা যাচ্ছে না যে, কি হবে? তাই বিশেষভাবে তাদের জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ্ তা’লা তাদের আশু মুক্তির ব্যবস্থা করুন। প্রশাসন হয়ত ধারণা করছে যে, এভাবে নির্যাতন চালিয়ে আহমদীদেরকে ঈমান থেকে বিচ্যুত করতে পারবে। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আহমদীর ঈমান অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত, তা সে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন। মিশরীয় আহমদীরাও এর ব্যতিক্রম নন। আমাকে তারা এ পয়গামই পাঠিয়েছে যে, আপনি চিন্তা করবেন না। আমাদের ঈমানে কোন ধরনের দুর্বলতা ও দোদুল্যমানতা সৃষ্টি হবে না, ইনশাআল্লাহ্। কয়েক দিন পূর্বে সেখানে একজন আহমদী মহিলাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল।

এরপর হুযূর বলেন, আপনারা পাকিস্তানে বসবাসকারী আহমদীদের জন্যও দোয়া করুন। সেখানকার অবস্থা ক্রমশঃ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লা পৃথিবীবাসীকে মুহাম্মদী মসীহ্ (আ.)-এর বাণী শোনার, বোঝার এবং মানার সৌভাগ্য দান করুন, যেন পৃথিবী থেকে সকল পঙ্কিলতা ও অশান্তি দূরিভূত হয়। আমি পূর্বেও বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা হিদায়াতের উপকরণ সৃষ্টি করে থাকেন আর মানুষকে তা গ্রহণ করা উচিত; নতুবা আল্লাহ্ই ভাল জানেন যে, কীভাবে তিনি মানুষকে ঠিক করবেন। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেককে সকল প্রকার বিপদাপদ থেকে রক্ষা করুন। এবং তাঁর বিনয়ী ও একনিষ্ঠ বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করুন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে