In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্-নূর’ (জ্যোতি) - চতুর্থ অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৫ই জানুয়ারি, ২০১০ইং

‘সামাজিক কদাচার এবং কুপ্রথা পরিহার করে খোদার জ্যোতিতে জ্যোতির্মন্ডিত হবার ঔদ্বাত্ত আহবান’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর আনোয়ার (আই.) নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেন:

فَاٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِهٖ وَالنُّوْرِ الَّذِىْۤ اَنْزَلْنَا‌ؕ وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ‏

অর্থ: অতএব তোমরা আল্লাহ্, তাঁর রসূল এবং সেই জ্যোতির উপর ঈমান আনো যা আমরা নাযিল করেছি, এবং তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত আছেন।’

(সূরা আত্ তাগাবুন: ৯)

এরপর হুযূর বলেন, বান্দার প্রতি এটি আল্লাহ্ তা’লার একটি মহান অনুগ্রহ যে, তিনি মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বানিয়ে এমন জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন; যা কাজে লাগিয়ে তারা অন্যান্য সৃষ্ট জীব ও অন্য সব বস্তুকে কেবল নিজেদের অধিনস্থই করে না বরং সেগুলোকে উত্তমরূপে কাজে লাগায়। মানুষের জ্ঞান বুদ্ধির যোগ্যতা বলে প্রত্যহ নিত্য নতূন আবিষ্কারাদী আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আজ থেকে দশ বা বিশ বছর পূর্বে যা ছিলো কল্পনাতীত এখন তা বাস্তব সত্য। কিন্তু এ পার্থিব উন্নতি-ই কি মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য?

পার্থিবতার পূজারী মানুষ এমনটি-ই মনে করে। সে ভাবে যে, আমার এই উন্নতি, ক্ষমতা, আমার প্রভাব প্রতিপত্তি, পার্থিব ভোগ বিলাসে মত্ত হওয়া, ছোট ও দূর্বলদের সামনে সম্পদের বড়াই করা, সম্পদকে ভোগের কারণ হিসেবে নেয়া এবং নিজের ক্ষমতা বলে অন্যদেরকে পদানত করাই সৃষ্টির উদ্দেশ্য। বরং বর্তমান যুগের যুব সমাজ; ধর্মের প্রতি যাদের কোন আকর্ষণ নেই, যারা পার্থিব ভোগ বিলাসের মোহে আচ্ছন্ন, তারা মনে করে অধুনা যেসব আবিষ্কারাদী রয়েছে তাই সবকিছু। তারা আরো মনে করে, টেলিভিশন, ইন্টারনেট এগুলোই আমাদের উন্নতির একমাত্র কারণ; কিন্তু এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। জাগতিক উন্নতি বা জাগতিকতার ক্ষেত্রে উন্নত হবার অলীক ধারণার ফলেই অনেক বড় বড় অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর সমাজপতির জন্ম হয়েছে। এমন ধারণা যুগে যুগে ফেরাউনের জন্ম দিয়েছে। সমগ্র বিশ্বের প্রভু-প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তা’লা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এমন ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা যেসব বিষয়কে তোমাদের নিজেদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য মনে করো তা তোমাদের জীবনে মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

‘আমি জিন্ন ও ইনসানকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘মানব সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, প্রতিপালক-প্রভুকে চেনা এবং তাঁর আনুগত্য করা। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ‏

অর্থ: ‘আমি জিন্ন ও ইনসানকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।

(সূরা আয্ যারিয়াত: ৫৭)

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ প্রাপ্ত বয়স্ক হতেই নিজের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব এবং তার জন্মের মূল উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণের পরিবর্তে আল্লাহ্ তা’লাকে পরিত্যাগ করে - পার্থিব সম্পদ ও সম্মানের প্রতি এমনভাবে আসক্ত হয় যে, তার মাঝে আল্লাহ্‌র অংশ খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে আর অনেকের ভেতর থাকেই না। তারা পার্থিব বিষয়ে মত্ত ও নিমগ্ন হয়ে যায়, একথাই ভূলে যায় যে, একজন আল্লাহ্ রয়েছেন।’

মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য অর্জন এবং ইবাদতের রীতি-নীতি শিক্ষা দেয়ার জন্য যুগে যুগে আল্লাহ্ তা’লা নবী-রসূল প্রেরণ করেছেন। যারা স্বজাতিকে ইবাদতের পদ্ধতি ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য লাভের পথ বাতলে দিয়েছেন। এরপর মানুষ যখন সব ধরনের বাণী বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে, জ্ঞানের উৎকর্ষতায় পৌঁছলো, যখন সে ইবাদতের উচ্চ মানকেও বুঝতে সক্ষম হলো এবং পার্থিব জ্ঞান বুদ্ধির দিক থেকেও উন্নতির নিত্য নতুন মাধ্যম আবিষ্কার করা শুরু করলো, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও সামাজিকতার গন্ডি বিস্তৃত হলো তখন আল্লাহ্ তা’লা পরিপূর্ণ মানব ও খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-কে শেষ শরিয়তসহ প্রেরণ করলেন। তিনি (সা.) আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে এ ঘোষণা করলেন,

اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَـكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِىْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا

অর্থ: ‘তোমাদের কল্যাণের জন্য আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, আমার নিয়ামত (পুরস্কারসমূহ) ও অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ধর্ম হিসাবে ইসলামকে মনোনীত করলাম।’

(সূরা আল্ মায়েদা: ৪)

আল্লাহ্ তা’লা শেষ শরিয়ত গ্রন্থ কুরআনেই তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। ইবাদতের উচ্চ মান অর্জনের পদ্ধতি, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করার রীতি, এমনকি শত্রুর সাথে কেমন আচরণ করতে হবে সে পদ্ধতিও শিখিয়েছেন। সমাজের দুর্বল বা নিচু শ্রেণীর অধিকার প্রদান, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, ভবিষ্যতের আবিষ্কারাদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু রয়েছে তা প্রণিধান করার জ্ঞান দিয়েছেন। মোটকথা, সকল জ্ঞানের মূর্তিমান রূপ হচ্ছে পবিত্র কুরআন। এতে এমন সব বিষয় বর্ণিত হয়েছে, যা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বের মানুষ কিছুই বুঝতো না আর এর আগের মানুষের জন্য তা কোনভাবেই বুঝা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে মানুষের বুদ্ধির দৌড় সে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন এ সব বিষয় সাধারণ মুসলমানরা না বুঝলেও মহামানব ও খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দূরদর্শিতার জ্যোতিতে এসব বিষয় বুঝতেন। অতএব তিনি এমন এক পরিপূর্ণ নূর ছিলেন, যিনি আল্লাহ্‌র নূরে আলোকিত ছিলেন এবং তিনি তাঁর সাহাবাদের মাঝে তাঁদের যোগ্যতানুসারে সেই জ্যোতি সৃষ্টি করেছিলেন। তাদেরকে ইবাদতের পদ্ধতি শিখিয়েছেন, তাদেরকে ইবাদতের উচ্চ মান অর্জনের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করেছেন, সৃষ্টির উদ্দেশ্য অনুধাবনের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে সেই জ্যোতি পেয়ে সাহাবাগণ (রা.) তাঁদের স্ব স্ব যোগ্যতা অনুযায়ী তা অন্যদের মাঝে বিস্তৃত করেছেন। এক প্রদীপ থেকে আরেক প্রদীপ প্রজ্জলিত হয়েছে এবং এভাবে চতুর্দিক আলোকিত হয়েছে।

এখন এ পূর্ণাঙ্গীন কিতাবের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত প্রদীপ আলোকিত হতে থাকবে। ভবিষ্যতের মু’মিনরা আল্লাহ্ তা’লার এ অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করবে। একজন বস্তুবাদী মানুষ এ বিষয়টিকে পার্থিব দৃষ্টিতে দেখলেও একজন সত্যিকার মু’মিন এ বিষয়কে খোদা তা’লার ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা হিসেবে দেখে থাকে। মু’মিনদের দৃষ্টি কেবল এসব জাগতিক কল্যাণ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তারা সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে অনুধাবন করে সেই প্রকৃত জ্যোতি থেকে কল্যাণমন্ডিত হবার চেষ্টা করবে, যা আল্লাহ্ তা’লার সবচেয়ে প্রিয় নবী এবং আফযালুর রসূল, মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) নিয়ে এসেছিলেন। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে অন্ধকার ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত মানুষ এই নবীর জ্যোতিতে আলোকিত হয়েছিলেন এবং সকল ক্ষেত্রে উৎকর্ষে উপনীত হয়েছিলো। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কিয়ামত পর্যন্ত এই মহান রসূল ও এই শরিয়ত অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে সে অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হতে থাকবে। ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ্ তা’লার জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবে।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বালাকের ১২ নাম্বার আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলেছেন,

رَّسُوْلاً يَّتْلُوْا عَلَيْكُمْ اٰيٰتِ اللّٰهِ مُبَيِّنٰتٍ لِّيُخْرِجَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصّٰلِحٰتِ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَى النُّوْرِ‌ؕ وَمَنْ يُّؤْمِنْۢ بِاللّٰهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًـا يُّدْخِلْهُ جَنّٰتٍ تَجْرِىْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَاۤ اَبَدًا‌ؕ قَدْ اَحْسَنَ اللّٰهُ لَهٗ رِزْقًا

অর্থ: ‘এক রসূল হিসেবে যিনি তোমাদের নিকট আল্লাহ্ তা’লার সমুজ্জল আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনান যাতে ঐ লোকদেরকে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। যে আল্লাহ্ তালার প্রতি ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাকে এমন জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন যার ভেতর নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। আর সে সেখানে চিরকাল থাকবে। প্রত্যেক এমন ব্যক্তি যে সৎকর্ম সম্পাদন করে তার জন্য আল্লাহ্ তা’লা অনেক উত্তম রিয্ক নির্ধারণ করে রেখেছেন।’

(সূরা ত্বালাক: ১২)

হুযূর বলেন, অতএব যদি আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয় তাহলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ এবং তাঁর উপর অবতীর্ণ শরিয়ত ও শিক্ষার উপর আমল করা একান্ত আবশ্যক।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা ভালো ভাবেই জানেন, মানুষ কোন কাজ তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করে। রসূলের আদর্শ এবং শিক্ষার উপর কতটুকু আমল করার চেষ্টা করেছে। কাজেই, মানুষের প্রতি এটি আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহ, তিনি এমন এক রসূল পাঠিয়েছেন যার শিক্ষা শিরোধার্য করার মাঝেই ইহকাল ও পরকালে মানুষের মুক্তি নিহিত।

পুনরায় আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহ দেখুন! ‘আখারীনা মিনহুম’-এর সংবাদ দিয়ে এই আশ্বাসবাণীও প্রদান করেছেন যে, মহানবী (সা.) এবং কুরআনী জ্যোতির কল্যাণ ধারা অব্যাহত রয়েছে। এক দীর্ঘ অমানিশার পর মহানবী (সা.)-এর নিষ্ঠাবান প্রেমিক ও তাঁর জ্যোতিতে সবচেয়ে বেশি আলোকিত যে-ই মসীহ্ ও মাহদীর আগমনের কথা ছিলো, তাঁর মাধ্যমে আবার অন্ধকার থেকে আলোর পানে মানুষ পথ নির্দেশনা পাবে। আগমনকারী প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও ইমাম মাহদী পুনরায় উম্মতে মুসলিমাকে বরং সমগ্র জগতকে ধর্ম-বিশ্বাস এবং কর্মের অন্ধকার থেকে মুক্ত করবেন। যে তাঁর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবে, যে তাঁকে গ্রহণ করবে, যে তাঁর সাথে সত্যিকার সম্পর্ক স্থাপন করবে, যে পৃথিবীর বৃথা কর্ম থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার পালন করবে, সে-ই ঐশী কৃপা আকৃষ্ট করে জান্নাতের সুসংবাদ শুনবে।

অতএব যেখানে এ কথা দ্বারা একজন আহমদীর হৃদয়ে প্রশান্তি মিলে সেখানে এটি চিন্তারও বিষয় বটে। আমাদের সর্বদা আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনটি সৎকর্ম আর কোনটি অ-সৎকর্ম তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সুখ আর দুঃখ এ দু’টি মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আনন্দ-উল্লাস এবং শোক প্রকাশের ক্ষেত্রেও কিছু সীমারেখা বা বাধ্যবাধকতা আছে। আজ মুসলমানদের মাঝে খুশির উপলক্ষ্যগুলোতে সমাজের প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের বি’দাত ও কুপ্রথা অনুপবেশ করেছে। আর শোক প্রকাশের বেলায়ও বিভিন্ন প্রকার বি’দাত এবং কুপ্রথা স্থান করে নিয়েছে।

আমি যে খুশি ও আনন্দের উল্লেখ করেছি এর মাঝে যাকে সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় মনে করা হয় - তা হলো বিয়ে-শাদীর আনন্দ। আর বিয়ে একটি আবশ্যকী দায়িত্ব। কোন কোন সাহাবী বলেছিলেন,

খোদা তা’লার ইবাদতের জন্য আমরা চিরকুমার থাকবো, বিয়ে করবো না।

মহানবী (সা.) এটি অপছন্দ করেছেন। আর বলেছেন,

পুণ্য তা-ই যা আমার সুন্নতের অনুকরণে আমার শিক্ষা অনুযায়ী করা হয়। আর আমি বিয়েও করেছি রোযাও রাখি আবার বিভিন্ন ইবাদতও করি।

এরপর হুযূর বিয়ে-শাদীর নামে আজকাল যেসব কুপ্রথা সমাজে ছড়াচ্ছে তা বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং বলেন, সমাজের দেখাদেখি আজ কোন কোন আহমদীও এসব কদাচার এবং কুপ্রথায় লিপ্ত হচ্ছে। গায়ে হলুদকে বিয়ের অবশ্য পালনীয় অনুষ্ঠান মনে করে তাতে লিপ্ত হয়।

হুযূর সারা বিশ্বের আহমদীদের এসব কুপ্রথা এবং অধার্মিকতা পরিহারের আহবান জানান। তিনি বলেন, আজ বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে সত্যিকার ইসলামের বাণী পৌঁছানো হচ্ছে আহমদীদের অন্যতম দায়িত্ব আর আমরাই যদি ইসলামী শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে সামাজিকতা রক্ষার নামে এসব কুপ্রথায় জড়িয়ে পড়ি তাহলে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে কৃত বয়’আতের অঙ্গীকার কি করে রক্ষা হবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একবার বলেন,

‘আমাদের জাতির মাঝে এটি একটি কুসংস্কার যে, অনর্থক বিয়েতে শতশত টাকা খরচ করা হয়।’

হুযূর বলেন, আজ থেকে শত বছর পূর্বের শত রূপী খরচ করার অর্থ হলো, অনেক বড় অপব্যয়। কিন্তু আজকাল শত শত নয় বরং লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়, নিজের সামর্থের বাহিরে খরচ হয়। হয়তো এটি ঐ যুগের শত শত রূপীর চেয়েও অনেক বেশি হয়ে গেছে। বরং এটাও বলেছেন- আতশ বাজি ইত্যাদিও হারাম। আজকাল বিয়ে উপলক্ষ্যে লোকেরা ঘরে আলোকসজ্জা করে। একদিকে পাকিস্তানে সবাই বিদ্যুতের ঘাটতির অভিযোগ করে আর পত্রিকাতেও এ সংবাদ ছাপা হয়। প্রত্যহ কয়েক ঘন্টা লোড শেডিং হয়, অপর দিকে মানুষের এ ধরনের অপব্যয় বড় অদ্ভুত বিষয়। দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধগতি মানুষের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে। অপর দিকে অনেকে প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করে, অপচয় করে শুধু নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেনা বরং দেশেরও ক্ষতি করছে। এজন্য পাকিস্তানে বসবাসকারী আহমদীদের এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যাতে বাহুল্য কোন খরচ না হয়। আর রাবওয়াতে বিশেষভাবে এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখা সদর উমুমীর দায়িত্ব। এ বিষয়ে নিগরানী করুন। অর্থের গরিমা দেখাতে গিয়ে বিয়েতে যেন কোনরূপ বৃথা খরচ না করা হয়।

দুঃখ-বেদনা বা শোক প্রকাশের যে রীতিনীতি অ-আহমদীদের মাঝে প্রচলিত তা থেকে সাধারণত আহমদীরা নিরাপদ রয়েছে।

হুযূর বলেন, বিয়ের আবশ্যকীয় দায়িত্বের মাঝে ওলীমা বা বউ-ভাত করার নির্দেশ রয়েছে। বিয়ের পর নিকটাত্মীয় এবং বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ইসলামে বিয়ে উপলক্ষ্যে এটিই একমাত্র পালনীয় নির্দেশ। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আবশ্যক নয় যে, বড় ঘটা করে তা পালন করতে হবে বরং প্রত্যেকের সাধ্যানুসারে তা করা উচিত।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যেসব সৎকর্ম করা হয় তা সবই ইবাদত বলে গণ্য হবে। যদি এ বিষয়টি সর্বদা আমাদের দৃষ্টিতে থাকে, তাহলে এতেই আমাদের মুক্তি নিহিত।

কাজেই যদি অন্ধকার থেকে মুক্ত হতে চাও, নূর লাভ করতে চাও, যুগ ইমামের হাতে বয়’আতের অঙ্গীকার রক্ষা করতে চাইলে পার্থিবতা থেকে মুক্ত হতে হবে। নিজের ভেতর পবিত্র পরিবর্তন সৃষ্টি করতে হবে। উন্নত গুণাবলী এবং চরিত্র গঠন করার জন্য অনেক চেষ্টা সাধনা করতে হবে। লজ্জা এমন জিনিষ যা ইমানের অংশ। টি.ভি, ইন্টারনেট প্রভৃতি অধুনা যুগের আবিষ্কারাদি লজ্জা ও শালীনতার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। অশ্লীলতা প্রদর্শনের পরও এরা বলছে এগুলো কোন অশ্লীলতা নয়। কাজেই টি.ভি বা ইন্টারনেটে প্রদর্শিত নোংরামী - একজন আহমদীর শালীনতার পরিপন্থী। যুগের উন্নতির বাহানায় এমন সব আচরণ করা হয়, যা কোন ভদ্র মানুষ দেখতেও অপছন্দ করবে। এমন কতক আচরণ রয়েছে যা অন্যের সামনে প্রকাশ করা হলে তা শুধু অবৈধই হবে না বরং পাপ বলে গণ্য হবে, এমনকি তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হলেও।

অতএব সম্ভ্রান্ত আহমদী পরিবারগুলো যদি নিজেদেরকে এসব নির্লজ্জতা থেকে মুক্ত না রাখে, তবে তারা বয়’আতের অঙ্গীকারও পূর্ণ করে না বরং নিজেদের ইমান-ই হারিয়ে বসলো।

রসূলুল্লাহ্ (সা.) পরিষ্কার করে বলেছেন,

‘আল হায়াও শো’বাতুম মিনাল ইমান’

অর্থ: লজ্জাও ইমানের একটি অংশ।

কাজেই তরুণ প্রজন্মের আহমদীদের বিশেষভাবে এ বিষয়টি দৃষ্টিতে রাখতে হবে, মিডিয়াতে বর্তমান যুগের নোংরামী দর্শন করে তারা যেন এর ফাঁদে না পড়ে নতুবা তারা ইমান হারিয়ে বসবে। এসব নোংরামীর প্রভাবেই কখনো কখনো জামাতের কিছু লোক ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, আর এ কারণে কাউকে কাউকে জামাত থেকে বহিষ্কার করার ব্যবস্থাও করতে হয়। সর্বদা এ বিষয়টি যেন মাথায় থাকে যে, আমার সব কাজ আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করতে হবে।

একটি হাদীসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘নির্লজ্জতা - নির্লজ্জ ব্যক্তিকে কুশ্রী বানিয়ে দেয়, আর লজ্জাবোধ - লজ্জাশীল ব্যক্তিকে সৌন্দর্য্যমন্ডিত করে। আর এ সৌন্দর্য্য মানুষের ভেতর পুণ্যের প্রতি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।’

আল্লাহ্‌কে পাবার জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একটি দোয়া করেছেন,

‘হে আমার শক্তিশালী খোদা! হে আমার প্রিয় পথ প্রদর্শক! তুমি আমাদেরকে সেই পথ দেখাও যেখানে পবিত্রচেতা লোকেরা তোমাকে লাভ করে। এবং আমাদেরকে এমন পথ থেকে দূরে রাখ যে পথ কামনা-বাসনার অনুসরণ ও হিংসা-বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছু নয়।’

অতএব আমাদের চেষ্টা করা উচিৎ, আমরা যেন বয়’আতের অঙ্গীকার পালন করে, বয়’আতের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করে, প্রকৃত ঈমান আনয়নকারীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।

সর্বদা স্মরণ রাখা প্রয়োজন, আমরা সেই নবীর মান্যকারী যিনি আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। আমাদেরকে ভাল-মন্দের পার্থক্য শিখিয়েছেন।

হুযূর বলেন, আজ মুসলমানদের দুর্ভাগ্য, তারা হেদায়াত লাভ করা সত্ত্বেও তাদের ঘাড়ে অনেক ধরনের বেড়ি রয়েছে। কিন্তু আমরা আহমদীরা মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আতের অঙ্গীকার করার পর এ সত্যকে দ্বিতীয়বার অনুধাবন করেছি। অর্থাৎ এ বেড়ি নিজেদের ঘাড় থেকে কীভাবে অপসারণ করতে হবে তা আমরা শিখেছি। আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহ যে, আমরা কবরের উপর সেজদা করা থেকে রক্ষা পেয়েছি। পীর পূজা থেকে আমরা মুক্ত। আর সাধারণভাবে বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার থেকেও আমরা মুক্ত আছি। অতএব আমাদেরকে সর্বদা আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত। মহানবী (সা.) স্বয়ং নূর ছিলেন, আর আকাশ থেকে পরিপূর্ণ নূর তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিলো। তিনি (সা.) এ দোয়া করতেন,

‘হে আল্লাহ্! তুমি আমার হৃদয় এবং আমার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আলো বর্ষণ করো।’

এ দোয়া প্রকৃত পক্ষে আমাদেরকে শিখানো হয়েছে। সর্বদা নিজেদের অবস্থার প্রতি বিশ্লেষণাত্বক দৃষ্টি রাখবেন এবং নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহ্ তা’লার শিক্ষা অনুযায়ী ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন এবং এর জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে শক্তি দিন যেন আমরা আমাদের ঈমানে দৃঢ়তা সৃষ্টি করতে পারি। আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের নির্দেশের উপর আমরা যেন শতভাগ আমল করতে পারি, সামাজিক কদাচার এবং কুপ্রথা থেকে যেন বেঁচে থাকতে পারি। জাগতিক লোভ-লালসা এবং অন্যায় থেকেও যেন দূরে থাকতে পারি। আর আল্লাহ্ তা’লার নূর থেকে আমরা যেন সর্বদা অংশ লাভ করতে পারি। দুর্ভাগ্য যেন আমাদেরকে কখনো এ নূর থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে