In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

মসজিদ নির্মাণ এবং তা আবাদ রাখার গুরুত্ব

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

মসজিদ নূর, ফ্রাঙ্কফোর্ট, জার্মানী

১৮ই ডিসেম্বর, ২০০৯ইং

‘নূর মসজিদের পঞ্চাশ বছরপুর্তি উপলক্ষ্যে আহমদীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, আর মসজিদ নির্মাণ এবং তা আবাদ রাখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

قُلْ اَمَرَ رَبِّىْ بِالْقِسْطِ‌ وَاَقِيْمُوْا وُجُوْهَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَّادْعُوْهُ مُخْلِصِيْنَ لَـهُ الدِّيْنَ ‌ؕ كَمَا بَدَاَكُمْ تَعُوْدُوْنَؕ

(সূরা আল্ আ’রাফ: ৩০)

التَّاۤٮِٕبُوْنَ الْعٰبِدُوْنَ الْحَـامِدُوْنَ السّاۤٮِٕحُوْنَ الرّٰكِعُوْنَ السّٰجِدُوْنَ الْاٰمِرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّاهُوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحٰــفِظُوْنَ لِحُدُوْدِ اللّٰه ِ‌ؕ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِيْنَ

(সূরা আত্ তওবা: ১১২)

এরপর হুযূর বলেন, আজ আমি ফ্র্যাঙ্কফোর্টস্থ নূর মসজিদ হতে প্রথমবারের মত খুতবা দিচ্ছি। এ বছর এ মসজিদ প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। পঞ্চাশ বছর পূর্বে এ মসজিদ তখনকার জামাতী প্রয়োজন ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি জার্মানীতে জামাতে আহমদীয়া কর্তৃক নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। প্রথমটি ছিলো হ্যামবার্গে, যার পঞ্চাশ বছরপূর্তি হয়েছিলো ২০০৭ সালে। সে সময় আমি কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেই নি কিন্তু ফ্র্যাঙ্কফোর্টের এ মসজিদটির পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রন জানানো হবে, তাই তাদেরকে সম্বোধন করে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলার সুযোগ নেয়ার উদ্দেশ্যেই এখানে আসা।

আহমদীয়া মুসলিম জামাত মসজিদ নির্মাণ করে থাকে এবং আহমদীয়া জামাত কর্তৃক নির্মিত অনেক পুরনো মসজিদ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে; যেগুলোর কোন কোনটি নির্মাণের পঞ্চাশ, পঁচাত্তর বা শতবছর পূর্ণ হয়েছে। মসজিদের গুরুত্ব এর পঞ্চাশ বা শতবর্ষ পূর্তির উপর নির্ভর করে না। মসজিদের গুরুত্ব ও এর সৌন্দর্য নির্ভর করে ইবাদতের উদ্দেশ্যে এতে আগত নামাযীদের উপর। যারা আল্লাহ্ তা’লার তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং পাঁচ বেলা মসজিদে এসে এর সৌন্দর্যকে বর্ধন করে। মসজিদের মর্যাদা ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস হতে আমরা অনেক দিক নির্দেশনা পেয়ে থাকি। একজন আহমদীকে সর্বদা মসজিদের এ মর্যাদা ও সম্মানকে দৃষ্টিপটে রাখা উচিত।

হুযূর বলেন, মসজিদের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলার পূর্বে এ মসজিদের বরাত দিয়েও কিছু কথা বলবো। এই মসজিদের নাম ‘নূর মসজিদ’। ঘটনাক্রমে সম্প্রতী আমি খোদা তা’লার গুণবাচক নাম ‘নূর’ এর আলোকে বিশদ আলোচনা করেছি। কাজেই আল্লাহ্ তা’লার সেই নূর বা জ্যোতিকে নিজেদের হৃদয়ে স্থান দিতে হবে আর একে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদের নাম যাই রাখা হোক না কেন এর উদ্দেশ্য কিন্তু একই। আল্লাহ্ তা’লা তার নূর বা জ্যোতি মুহাম্মদ (সা.) ও পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন আর এ যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে এর প্রকৃত প্রতিচ্ছবি বানিয়েছেন যেন এ নূর সর্বত্র বিস্তৃত হতে থাকে।

হুযূর বলেন, কাকতালীয়ভাবে মাত্র কয়েকদিন পূর্বেই সুইস সরকার একটি রেফারেন্ডাম পাশ করেছে। আমি বলবো, এটা সুইস সরকারের দুর্ভাগ্য যে, সেখানে ইসলাম বিরোধী একটি পার্টির কথামতো একটি রেফারেন্ডাম (জনমত জরিপ) হয়। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এতে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ মানুষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ভবিষ্যতে সুইজারল্যান্ডে যেসব মসজিদ নির্মাণ করা হবে সেগুলোতে মিনার বানানো যাবে না। কিন্তু তথ্য অনুসারে সর্বমোট ৩২ শতাংশ মানুষ মিনার বানানোর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। অধিকাংশরা এ ব্যাপারে উদাসীন ছিলো অথবা তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিলো গর্হিত একটি পদক্ষেপ।

বর্তমান যুগে এটিও মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক জামাতের কাজ, যেখানে সব মুসলমান দল ঘুমন্ত ছিলো বরং কতককে স্মরণ করানোর পরও বলেছে মিনার-এর ইস্যূতে বাড়াবাড়ির কি দরকার, অনর্থক কেনো আমরা তাদের শত্রুতাকে আমন্ত্রন জানাবো? সেখানে কেবল আহমদীয়া জামাতই জনসভা এবং রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে পূর্বেও এই অযৌক্তিক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে আর এখনো করছে। বরং কতক রাজনৈতিক দল আমাদের কাছে এ ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে এবং বলেছে যে, এটি আমাদের কাজ নয় এবং আমরা এমন অযৌক্তিক আইনের ঘোর বিরোধী। এছাড়া জুরিখ, যেখানে আমাদের মসজিদ অবস্থিত, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আমাদের পক্ষে, মসজিদের মিনারের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছে, মিছিল বের করেছে, পথে নেমেছে এবং তারা বলেছে, অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কাজ। একটি রাজনৈতিক দলের জাতীয় নেতা জনপ্রিয়তার লোভে এই শ্লোগানও দিচ্ছে যে, এখন আইন করে বোরকাও নিষিদ্ধ করা উচিত বরং অন্যান্য বিধি-নিষেধ আরোপের কথাও ভাবা যায়। কিন্তু সেই একই দলের জুরিখ শাখার প্রধান এবং অন্যান্য নেতারা তাদের এই জাতীয় নেতার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা এমন জোরালো প্রতিবাদ এবং কড়া চিঠি লিখেছে যে, সেই জাতীয় নেতাকে টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে হয়েছে। এরপর সেই আঞ্চলিক নেতা সুইজারল্যান্ডে আমাদের আমীর সাহেবকে চিঠি লিখেছেন, আমাদের এই নেতা লাইনচ্যুত হয়ে পড়েছিলো এখন আমরা তাকে মূল অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছি। আমরা যেকোন মূল্যে এদেশে মুসলমানদের অধিকার সংরক্ষণ করবো।

সব জায়গায় ভদ্র মানুষ আছে, যারা সত্যের পক্ষে কথা বলে। অতএব, আজ ইসলামের সম্মান রক্ষার্থে সর্বত্র আহমদীয়া জামাত এই কাজ করছে। শুধু সুইজারল্যান্ডেই নয় বরং স্পেনের অনেক বড় একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল এই সংবাদ প্রচার করেছে। খবরের পাশাপাশি পেড্রোবাদের মসজিদ বাশারাতের ছবিও প্রচার করেছে। স্থানীয় জনতা সাক্ষাতকারে বলেছে, আমাদের এলাকায় মুসলমানদের মসজিদ আছে। এখান থেকে শুধু শান্তি এবং প্রেম-প্রীতির বাণী-ই উচ্চারিত হয়। বরং একজন এও বলেছেন, তোমরা এদের সম্পর্কে সন্ত্রাসবাদের কথা বলছো! অথবা কোন প্রকার ঘৃণার কথা বলছো? আমি বলবো, এরাই হলো প্রকৃত শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমাদেরও উচিত এদের মতো হওয়া।

মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কাছ থেকে শিক্ষা পেয়ে তাঁর জামাতের সদস্যরা জগতে এই নিরব বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।

কাজেই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মসজিদের মিনার নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা চরম নির্বুদ্ধিতার কাজ। সকল মুসলমান যদি সন্ত্রাসীও হয়, প্রশ্ন হলো - মিনার নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারীর ফলশ্রুতিতে কি সন্ত্রাস বন্ধ হয়ে যাবে? এটি একটি শিশু সুলভ চিন্তা বৈ অন্য কিছু নয়। ‘মিনার’ শব্দটি নূর থেকে উদ্ভুত। এর উদ্দেশ্য হলো, উঁচুস্থান থেকে আযানের মাধ্যমে এক খোদার ইবাদতকারীদেরকে ইবাদতের জন্য আহবান করা। অতীতে যখন বিদ্যুত এবং মাইক ছিলো না তখন মিনারের উপর দাঁড়িয়েই আযান দেয়া হতো।

আযান কি? আযান শব্দ দ্বারা খোদা তা’লার মাহাত্ব প্রকাশ করা হয়। তাঁর একত্ববাদ প্রচার করা হয়। মহানবী (সা.)-এর রসূল হবার ঘোষণা করা হয়। ইবাদতের জন্য আহ্বান করা হয় - কেননা, এটিই মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। এতেই মানবের সফলতা নিহিত। এজন্য সাফল্যের দিকে আসো। সেই সফলতা অর্জন করো, যাতে তোমাদের ধর্ম রক্ষা হয় আর ইহকাল ও পরকালও রক্ষা হয়। কতইনা সুন্দর এবং শক্তিশালী বাণী যা এই মিনার থেকে প্রতিধ্বনিত হয়।

আমরা চার্চ সম্পর্কে আপত্তি করতে পারি, কিন্তু আমরা আপত্তি করিনি আর করবোও না। কারণ কোন ধর্মের অনুসারীদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। প্রত্যেক জাতির ইবাদত গৃহ, গির্জা বা মন্দিরের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। কারণ, পবিত্র কুরআন শুধুমাত্র ইবাদতের স্থানকেই সম্মান করতে বলেনি বরং এর সংরক্ষণের দায়িত্বও মুসলমানদের প্রতি অর্পণ করেছে; যেন প্রেম-প্রীতি এবং ভালবাসার দৃষ্টান্ত বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফ্রাঙ্কফোর্টে নূর মসজিদের উদ্বোধনের সময় আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে এই মসজিদের মিনার সম্পর্কে সংবাদপত্রে যা লিখা হয়েছে তা সেসব সাংবাদিকের উদারতা এবং সাধুতার পরিচয় বহন করে। সেই সময় জার্মানীর সত্তরটির অধিক সংবাদপত্রে মসজিদ উদ্বোধণের সংবাদ প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ একটি পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফোর্টার রইনশো’ (যদি আমি সঠিক উচ্চারন করে থাকি) ১৯৫৯ইং সালের ১৪ই সেপ্টেম্বরের সংখ্যায় লিখেছে, ‘ফ্রাঙ্কফোর্টে সুউচ্চ এবং চিত্তাকর্ষক মিনারসহ একটি শ্বেতশুভ্র মসজিদ নির্মিত হয়েছে।’

একইভাবে ‘আরবান পোষ্ট’ লিখেছে, ‘ফ্রাঙ্কফোর্টে আল্লাহ্র ঘর স্থাপিত হয়েছে’‘মানহাম অরগান’ ইসলাম ইউরোপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে শিরোনামে বিস্তারিত লিখেছে, ‘মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীরা ইতিপূর্বে তরবারী এবং বর্শা নিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত এসেছিলো। বর্তমান যুগে এ কাজ আধ্যাত্মিক অস্ত্রের মাধ্যমে হচ্ছে। অনেক মুসলমান ইউরোপে আসে আর ইসলাম প্রচারেরও চেষ্টা করে। অনুরূপভাবে বিভিন্ন তবলীগি ফিরকা যেগুলোর মধ্য হতে একটি - ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ নির্মাণ করেছে। সেই ফিরকা মির্যা গোলাম আহ্মদ কাদিয়ানী (আ.)-এর ফিরকা।’

মসজিদের মিনার যেভাবে সে যুগে মানুষের হৃদয় জয় করেছে আজও সেভাবে হৃদয় জয় করবে। কিন্তু আজ পশ্চিমা বিশ্বে মানুষের ন্যায়-নিষ্ঠার মানদন্ড পাল্টে গেছে। ফলে গুটিকতক উগ্রপন্থীর অপরাধের জন্য গোটা মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা হয়।

হুযূর বলেন, আহমদীরা নিজেদের দায়িত্বকে বুঝুন। মসজিদ এবং এর মিনারের মাধ্যমে ইসলামের নূর ও আল্লাহ্ তা’লার নূরকে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের সকল দেশে, প্রত্যেক অধিবাসীর কাছে পৌঁছে দিন। আর এই জ্যোতি বিস্তারের জন্য কোমর বেঁধে লেগে যান। আর এটি তখনই হবে যখন মসজিদের সাথে একাত্ব হয়ে আল্লাহ্র তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাঁর সাহায্য যাচনা করতঃ দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবেন। মসজিদের মর্যাদা ও গুরুত্বকে সর্বদা দৃষ্টিপটে রাখবেন।

খুতবার শুরুতে আমি যে আয়াতদ্বয় পাঠ করেছি- তাতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রথম আয়াতটির অনুবাদ হলো,

‘তুমি বলো, আমার প্রভু ন্যায় বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। আর তোমরা, প্রত্যেক মসজিদে উপস্থিতির সময় নিজের দৃষ্টিকে আল্লাহ্র প্রতি নিবদ্ধ রাখো। এবং দ্বীনকে তাঁর জন্য পরিশুদ্ধ করে কেবল তাঁকেই ডাকো। যেভাবে তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন সেভাবেই মৃত্যুর পর তোমরা তার পানে ফিরে যাবে।’

(সূরা আল্ আ’রাফ: ৩০)

কতো সুন্দর শিক্ষা! তারা আপত্তি করে, মসজিদ নাকি সন্ত্রাসবাদের আড্ডাখানা। অথচ উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’লা প্রথম নির্দেশ যে দিয়েছেন তা হলো, ন্যায় বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হও; তবেই মসজিদের আদব রক্ষার জন্য আল্লাহ্ তা’লার পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার প্রতি তোমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হবে। আর আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশসমূহ পালনের জন্য নিজের হৃদয়কে সব ধরনের অন্যায় থেকে পবিত্র করতে হবে।

আর যে মসজিদ ফিৎনা-ফাসাদ ও মন্দকর্মের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল তা ধ্বংস করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তা’লাই নির্দেশ দিয়েছিলেন। কাজেই মসজিদ হলো সেই স্থান যেখানে তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে, ন্যায় বিচারের দাবী পূরণ করতঃ আল্লাহ্ তা’লার সামনে বিনত হয়ে তাঁর কৃপা লাভের জন্য আসা হয়।

মসজিদ শব্দ সেজদা থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো বিনয়, নম্রতা ও বিশ্বস্ততার সাথে সমর্পিত হওয়া। অতএব, মসজিদ হলো এসব উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টি করার স্থান। আর এ আয়াতে এটিই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যখন নামাযের সময় হয় তখন মসজিদে একত্রিত হয়ে আল্লাহ্ তা’লার সমীপে বিনত হয়ে স্বীয় সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে তাঁকে ডাকো। হে আল্লাহ্! তুমিই সেই সত্তা, যে আমাদেরকে সোজা সরল পথে পরিচালিত করবে। তুমি আমাদেরকে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করো আর খোদা ও বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের সামর্থ্য দান করো।

অতএব, ইসলামের প্রকৃত অর্থ কি আর মসজিদের আসল উদ্দেশ্য কি? তা আজ বিশ্বকে অবহিত করা আহমদীদের কর্তব্য। কেননা, পৃথিবীর নিরাপত্তা এর-ই সাথে সম্পৃক্ত। তারা যেন খোদাকে মেনে আল্লাহ্ তা’লার নূর বা জ্যোতি অন্বেষণ করে।

দ্বিতীয় যে আয়াত পাঠ করেছি তার অর্থ হচ্ছে,

‘যারা তওবাকারী, ইবাদতকারী, (আল্লাহ্র) প্রশংসাকারী, খোদার পথে ভ্রমনকারী, রুকুকারী, সিজদাকারী, পুণ্যকাজের আদেশ দানকারী, মন্দকাজে বাঁধা দানকারী, আল্লাহ্ তা’লার বিধি-নিষেধ মান্যকারীগণ হচ্ছে প্রকৃত মু’মিন, আর তুমি মু’মিনদের সুসংবাদ দাও।’

(সূরা আত্ তাওবা: ১১২)

অতএব, এগুলো হচ্ছে একজন প্রকৃত মু’মিনের বৈশিষ্ট্য। যারা তাক্বওয়া অবলম্বনের মাধ্যমে খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে, তাদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য থাকা একান্ত আবশ্যক। এ আয়াতে প্রথমে তওবার উল্লেখ এসেছে। তওবা কি? তওবার অর্থ পাপের সাথে সম্পূর্নরূপে সম্পর্কচ্ছেদ করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একস্থানে বলেন,

‘যদি কোন মানুষ তওবা করে, তবে তা যেন বিশুদ্ধ চিত্তে করে। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্র দিকে প্রত্যাবর্তনকে তওবা বলা হয়।’

এরপর হুযূর উক্ত আয়াতের আলোকে মু’মিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেন আর প্রত্যেক আহমদীকে খোদার দরবারে বিনত থেকে তাঁর ইবাদত করার প্রতি আহবান জানান।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা একজন মুসলমানকে যে সম্মান বা পদমর্যাদা দিয়েছেন তা হলো,

كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ

অর্থ: ‘তোমরাই সেই সকল লোক যাদেরকে মানবতার কল্যাণের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।’

(সূরা আল্ ইমরান: ১১১)

কেবলমাত্র নিজের কল্যাণের জন্য নয় বরং অন্যদের কল্যাণের জন্য মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কল্যাণ কামনা হলো তোমাদের দায়িত্ব। তোমরা সৎকর্মের নির্দেশ প্রদান করো আর মন্দ কাজ হতে বারণ করো বলেই তোমাদেরকে এত বড় সম্মান প্রদান করা হয়েছে।

আল্লাহ্ তা’লা এ যুগে আপনাকে যুগ-ইমামকে চেনার এবং মানার সৌভাগ্য দান করেছেন। আর এর ফলে যখন আপনাদের জীবন দুর্বিসহ করে তোলা হয়েছে, আপনাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে, তখন আল্লাহ্ তা’লা আপনাদেরকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিয়েছেন। কাজেই এর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আল্লাহ্ তা’লার ইবাদতের প্রতি অনেক বেশী দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন। পৃথিবীবাসীকে দেখিয়ে দিন যে, এসো এবং দেখো মসজিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি, আমরা তোমাদেরকে বলছি মিনারের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি, এসো আমরা তোমাদেরকে অবহিত করবো যে, উত্তম চরিত্র কাকে বলে, আর পুণ্য কীভাবে বিস্তার করতে হয় এবং মন্দ কি করে দূরিভূত করতে হয়। এসো, আমরা তোমাদেরকে জানাবো যে, কীভাবে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করা যায়।

এটি অনেক বড় একটি দায়িত্ব আর তা পালনের জন্য প্রত্যেক আহমদী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে স্বীয় প্রাণ, ধন-সম্পদ, সময় এবং সম্মান উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করুন। যদি আমরা অন্য মুসলমান থেকে উন্নত না হই তাহলে আমরা কোন অবস্থাতেই ইসলামের প্রতিরক্ষা করতে পারব না।

এক স্থলে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘আমি বারংবার এবং কয়েকবার বলেছি, বাহ্যিকভাবে আমাদের জামাত এবং অন্যান্য মুসলমানদের ভেতর কোন পার্থক্য নেই। তোমরাও মুসলমান তারাও নিজেদেরকে মুসলমান বলে, তোমরাও কলেমাধারী তারাও কলেমা পাঠকারী। তোমরাও কুরআন অনুসরণের দাবী করে থাকো আর তারাও কুরআন করীম মানার দাবী করে। মোটকথা, দাবীর বেলায় তোমরা এবং তারা উভয়ই সমান কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা কেবল মৌখীক দাবীতেই সন্তুষ্ট হন না। যতক্ষণ প্রকৃত বিষয়ের উপর আমল করা না হবে আর দাবীর স্বপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ কোন ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত না থাকবে এবং অবস্থা পরিবর্তন না হবে ততক্ষণ আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হন না।’

অতএব শ্রেষ্ঠ উম্মত হবার জন্য, প্রকৃত শিক্ষা উপস্থাপন করার জন্য আমাদেরকে ব্যবহারিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। নিজেদের ইবাদতের মান উন্নত করতে হবে। নিজেদের উত্তম চরিত্রের মান আরও উন্নততর করতে হবে। পরষ্পরের মাঝে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। এরপর তা সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর উপর আমল করার সৌভাগ্য দান করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে