In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আন্-নূর’ (জ্যোতি) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৪ঠা ডিসেম্বর, ২০০৯ ইং

‘আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘নূর’ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনএবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

اللّٰهُ وَلِىُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَى النُّوْرِ‌ ؕ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْۤا اَوْلِيٰٓــُٔهُمُ الطَّاغُوْتُ يُخْرِجُوْنَهُمْ مِّنَ النُّوْرِ اِلَى الظُّلُمٰتِ‌ؕ اُولٰٓٮِٕكَ اَصْحٰبُ النَّارِ‌‌ۚ هُمْ فِيْهَا خٰلِدُوْنَ

(সূরা আল্ বাকারা: ২৫৮)

এরপর হুযূর বলেন, আমি যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ্ তা’লা বলছেন, আল্লাহ্ তা’লা তাদের ওলী বা অভিভাবক যারা ঈমান আনে। আর আল্লাহ্ তা’লা তাঁর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করে তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনেন।

হুযূর বলেন, আজ আমি আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘নূর’ বা ‘নূর’ শব্দের বরাতে আলোচনা করবো। অভিধানে লেখা রয়েছে ‘নূর’ হলো আল্লাহ্ তা’লার সুন্দরতম গুণবাচক নামসমূহের মধ্য থেকে একটি গুণবাচক নাম। ইবনে আসীরের মতে নূর সেই সত্তা যাঁর নূরের মাধ্যমে (আক্ষরিক অর্থে) অন্ধ ব্যক্তি দেখতে পায় এবং পথভ্রষ্ট ব্যক্তি তাঁর দেয়া জ্ঞানের মাধ্যমে হেদায়াত পায়। অভিধান গ্রন্থ লিসানুল আরবে এ অর্থগুলো লিখা হয়েছে; একইভাবে লিসানে আরো লিখা হয়েছে, কারো কারো মতে নূর অর্থ সেই সত্তা, যিনি স্বয়ং প্রকাশিত এবং যাঁর মাধ্যমে বস্তু (জগতের) সব কিছু প্রকাশিত হয় এবং কারো কারো মতে নূরের অর্থ সেই অস্তিত্ব যিনি নিজ সত্তায় প্রকাশিত এবং অন্যদের জন্য সব কিছু প্রকাশ করেন। এরপর লিসানে লিখা হয়েছে, আবু মানসুর বলেন نُورَ নূর হলো, আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং বলেন, اللّٰهُ نُوْرُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেকেই লিখেছেন, আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীদের একমাত্র আল্লাহ্-ই হেদায়াত দান করেন।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা নিজের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, একমাত্র আল্লাহ্ তা’লাই আকাশ ও পৃথিবীর নূর। এই নূর মানুষের উপর পতিত হয়ে মানুষকে কীভাবে আলোকিত করে? এটি সূরা নূর-এর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

اللّٰهُ نُوْرُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ‌ؕ مَثَلُ نُوْرِهٖ كَمِشْكٰوةٍ فِيْهَا مِصْبَاحٌ‌ؕ الْمِصْبَاحُ فِىْ زُجَاجَةٍ‌ؕ اَلزُّجَاجَةُ كَاَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّىٌّ يُّوْقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُّبٰرَكَةٍ زَيْتُوْنَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَّلَا غَرْبِيَّةٍۙ يَّـكَادُ زَيْتُهَا يُضِىْٓءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ‌ؕ نُّوْرٌ عَلٰى نُوْرٍ‌ؕ يَهْدِىْ اللّٰهُ لِنُوْرِهٖ مَنْ يَّشَآءُ‌ؕ وَ يَضْرِبُ اللّٰهُ الْاَمْثَالَ لِلنَّاسِ‌ؕ وَاللّٰهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيْمٌۙ

অর্থ: ‘আল্লাহ্ আকাশ ও পৃথিবীর নূর। তাঁর নূরের উপমা একটি তাক সদৃশ যার মাঝে একটি প্রদীপ রাখা আছে, সেই প্রদীপটি (আবার) কাঁচের চিমনির মাঝে; সে কাঁচ উজ্জল তারকার মতো, সেই প্রদীপটি কল্যাণমন্ডিত যায়তুনের এমন বৃক্ষ দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে যা পূর্বেরও নয় আর পশ্চিমেরও নয়। এ বৃক্ষের তেল এমন, যেন আগুনের সংস্পর্শ ছাড়াই নিজে থেকে জ্বলে উঠবে। এটি নূরের উপর নূর। আল্লাহ্ যাকে চান তাকে তাঁর নূরের পানে পরিচালিত করেন। আল্লাহ্ মানুষের জন্য উপমা দিয়ে থাকেন এবং আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কেই সার্বিক জ্ঞান রাখেন।’

(সূরা আন্ নূর: ৩৬)

হুযূর বলেন, আমি কয়েক মাস পূর্বে অন্য আরেকটি বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এ আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তফসীরের আলোকে আলোচনা করেছিলাম। আজ আমি আর এর বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না, কেবল সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়টিকে মহানবী (সা.)-এর সাহাবা এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবাদের বরাতে বর্ণনা করবো। এখানে নূরের যে উদাহরণ দেয়া হয়েছে তা কি কেবল মহানবী (সা.)-এর সত্তা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, নাকি এর পরিধি আরো বিস্তৃত? ইতোপূর্বে আমি যে তফসীর বর্ণনা করেছিলাম তা থেকে হয়তো কারো কারো মনে হতে পারে, মহানবী (সা.) পর্যন্ত-ই তা সীমিত। এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা সর্বপ্রথম যে ঘোষণা দিচ্ছেন তা হলো, اللّٰهُ نُوْرُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ অর্থ: আল্লাহ্ তা’লা আকাশ ও পৃথিবীর নূর। এজন্য সবকিছু তাঁর নূর থেকেই কল্যাণ পায় এবং পেতে পারে। তিনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে ব্যক্তিগত চতুরতা, জ্ঞান বা বুদ্ধির জোরে - তাঁর নূর বা আলো লাভ করতে পারে। তিনি চাইলে এটা দান করে থাকেন, এটিই তাঁর পদ্ধতি। উদাহরণ স্বরূপ আল্লাহ্ তা’লা এক স্থানে বলেন, اللّٰهُ الَّذِىْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ অর্থ: ‘তিনিই আল্লাহ্ যিনি আকাশ ও পৃথিবীকে এবং এতে বিদ্যমান সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা ইউনুস: ৪) এরপর তিনি এগুলোকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।

অতএব প্রকৃত নূর আল্লাহ্ তা’লারই; দেখার মতো চোখ থাকলেই তাঁকে সব জায়গায়, সকল বস্তুতে এবং সর্ব ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিন্তু এক ব্যক্তি যার আধ্যাত্মিক চোখ অন্ধ, এ নূর তার দৃষ্টিগোচর হয় না। এই নূরের সঠিক পরিচয় তুলে ধরার জন্য খোদা তা’লা নবী এবং প্রত্যাদিষ্টদের প্রেরণ করে থাকেন। তারা আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে নূর পান যা আকাশ থেকে তাদের উপর নাযিল হয়। পরে তারা একে ধরাপৃষ্ঠে সম্প্রসারিত করেন।

খোদার এই নূরকে মহানবী (সা.) পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিয়েছেন। কেবল তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এই নূরের বিস্তার করেছেন তাই নয় বরং মহানবী (সা.)-এর পরও এই নূরের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে এবং এটা বিস্তৃত হতে থাকবে। মানুষকে বুঝানোর জন্য এর উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, এর উপমা একটি তাক সদৃশ, এমন এক উঁচু জায়াগার মতো যেখানে আলো রাখা হয়, আর এই তাক হলো মহানবী (সা.)-এর বক্ষ। এই তাকের মধ্যে একটি প্রদীপ রয়েছে। এই প্রদীপটি হলো আল্লাহ্ তা’লার ওহী যা মহানবী (সা.)-এর প্রতি নাযিল হয়েছে। এই বাতি একটি চিমনির মধ্যে অর্থাৎ কাঁচের চিমনির মধ্যে, আর এই চিমনিটি হলো মহানবী (সা.)-এর হৃদয়। যা নিতান্তই পরিস্কার এবং সব ধরনের কলুষতা থেকে মুক্ত। এই চিমনি দীপ্তিময় উজ্জ্বল তারকার ন্যায়, খুব উজ্জ্বল এবং দ্যুতিময়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, এর অর্থ মহানবী (সা.)-এর হৃদয়, যার ভেতর বাহির সবই আলো; যাতে পানির ন্যায় আলো প্রবাহিত হতে দেখা যায়।

পুনরায় এখানে বরকতপূর্ণ প্রদীপ ও বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো - মহানবী (সা.)-এর সত্তা যা সকল পূর্ণতা এবং কল্যাণের সমষ্টি আর তা কিয়ামত পর্যন্ত বহমান থাকবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, ‘এই আলো পূর্বেরও নয় আর পশ্চিমেরও নয়’ এর অর্থ হলো, ইসলামের শিক্ষা, যার মধ্যে কোনরূপ কম-বেশি আ অসামঞ্জস্যতা নেই। এতে ভারসাম্যের ও সাম্যের শিক্ষা নিহিত আছে।

এই উদাহরণে আরো বলা হয়েছে, খুব সম্ভব শিঘ্রই তেল নিজ থেকে জ্বলে উঠবে আর সকলকে আলোকিত করবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, এর অর্থ হলো মহানবী (সা.) ছিলেন, স্বয়ং আলোকিত এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।

এখন প্রকৃত নূর শুধুমাত্র মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ শরিয়ত ও তাঁর সর্বোত্তম জীবনাদর্শের মাঝেই রয়েছে। সকল পুরাতন শরিয়ত এই পূর্ণতম মহা মানব যিনি نُّوْرٌ عَلٰى نُوْرٍ ছিলেন তাঁর আগমনের পর সমাপ্ত হয়ে গেছে। এখন এটিই একমাত্র শিক্ষা আর নূর, যা আল্লাহ্ তা’লার নূরে কল্যাণ মন্ডিত।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) মহানবী (সা.)-এর এই মর্যাদাকে, যা পূর্ণতম মানব হবার পদমর্যাদা, তা একস্থলে এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন:

‘ঐ উচ্চ স্তরের নূর যা মানুষকে দেয়া হয়েছে অর্থাৎ পরিপূর্ণ মানুষকে। এটি ফিরিশ্তাদের মাঝে ছিলো না, নক্ষত্রের মাঝে ছিলো না, চন্দ্রে ছিলো না, সূর্যে ছিলো না, এটি পৃথিবীর সমুদ্র ও নদীসমূহে ছিলো না, এটি হিরা, মণি-মানিক্য ও মতিতেও ছিলো না। বস্তুতঃ এ জিনিস আকাশ ও পৃথিবীর কোন বস্তুর মাঝে ছিলো না। শুধু মানবের মাঝে ছিলো অর্থাৎ পরিপূর্ণ মানবের মাঝে। যার পূর্ণতা, পরিপূর্ণতা, সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক সম্মানিত সত্তা আমাদের সাইয়্যেদ ও মওলা, সাইয়্যেদুল আম্বীয়া, সাইয়্যেদুল আহ্‌হিয়া, মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) ছিলেন। অতএব এ নূর মানুষকে দেয়া হয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী এটি ঐসব লোককে দেয়া হয়েছে যারা তাঁর অনুরূপ এবং তাঁর রঙ্গে রঙ্গিন। আমানত (কর্তব্য পরায়ন) অর্থ পূর্ণ মানবের ঐসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ, বুদ্ধিমত্তা, ইলম, হৃদয়, প্রাণ, ইন্দ্রীয়, ভয়, ভালবাসা, সম্মান, মর্যাদা, সব আধ্যাত্মিক ও জাগতিক পুরস্কারসমূহ, যা আল্লাহ্ তা’লা পূর্ণ মানবকে দান করেছেন।’

(রূহানী খাযায়েন-৫ম খন্ড, আয়নায়ে কামালতে ইসলাম-পৃ:১৬১-১৬২)

হুযূর বলেন, এরপর اَنْ تُؤَدُّوْا الْاَمٰنٰتِ اِلٰٓى اَهْلِهَاۙ (সূরা আন্ নিসা: ৫৯) আয়াত অনুসারে এই সমস্ত আমানত মহানবী (সা.)-কে প্রদান করেন। অর্থাৎ তিনি (সা.) আল্লাহ্‌র মাঝে বিলীন হয়ে তাঁর পথে আত্মহারা হয়ে যান। এই উচ্চ পদমর্যাদা - পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গীনভাবে আমাদের মনিব, নেতা, পথপ্রর্দশক, উম্মী, সত্যবাদী, সত্যায়নকারী ও সত্যায়িত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাঝে পাওয়া যায়। কাজেই এ মর্যাদা মহানবী (সা.) আল্লাহ্‌র নূর থেকে লাভ করেছেন। তিনি তা তাঁর সাহাবীদের মাঝে প্রতিস্থাপিত করে তাঁদেরকে উচ্চাঙ্গীন চারিত্রিক গুণাবলীর উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মর্যাদা সম্পর্কে এ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘এঁদের যাঁর পিছনেই তুমি চলো না কেনো তুমি আলো পাবে।’ খোদা তা’লা পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তা পাবে। আরবের এ নিরক্ষর লোক যারা মহানবী (সা.)-কে অনুসরণ করেছেন তাঁরা তাঁর (সা.) পদাঙ্ক অনুসরণের কারণে আল্লাহ্ তা’লার সাথে সর্ম্পক স্থাপন ও উত্তম চারিত্রিক গুণাবলীর দৃষ্টান্ত হয়ে গেছেন। আল্লাহ্ তা’লার নুর থেকে এমনভাবে অংশ লাভ করেছেন- ফলে আল্লাহ্ তা’লা رَضِىَ اللّٰهُ عَنْهُ’ এর স্মারক তাদের বক্ষে লাগিয়ে দিয়েছেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এই সাহাবীদের সম্পর্কে বলেন:

‘তাঁরা মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যে আত্মনিবেদিত ছিলেন। যে নূর মহানবী (সা.)-এর মাঝে ছিলো তা এ আনুগত্যের ধারায় প্রবাহিত হয়ে সাহাবীদের হৃদয়ে প্রোথিত হয়, আর আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের সকল চিন্তাধারাকে মিটিয়ে দেয়। অন্ধকারের পরিবর্তে তাদের হৃদয় নূরে পরিপূর্ণ ছিলো।’

হাদীসে এসেছে- মহানবী (সা.) বলেছেন:

‘আল্লাহ্, আল্লাহ্ ফি আসহাবী’। অর্থাৎ আমার সাহাবীদের হৃদয়ে শুধু আল্লাহ্ আর আল্লাহ্ই বিরাজমান।’

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা যিনি আকাশ ও পৃথিবীর নূর। তিনি তাঁর নূরের ধারা মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের পর বন্ধ করে দেন নি। বরং খোদা প্রদত্ত মহানবী (সা.)-এর এ ‘নূর’ চিরকালের জন্য প্রবহমান এক ঝর্ণাধারা। ইসলামী শরিয়তই হলো - একমাত্র শরিয়ত যা কিয়ামতকাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত থাকবে; আর আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালবাসা ও প্রেমে বিলীন হবার কারণে আকাশ থেকে অবতীর্ণ এই ‘নূর’ সহ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে প্রেরণ করেছেন।

তিনি (আ.) বলেন,

‘ঘটনাচক্রে একবার একজন পবিত্র চেহারার বয়স্ক বুযুর্গের সাথে স্বপ্নে দেখা হয়। তিনি বলেন, আসমানী জ্যোতি বা নূর পেতে হলে কিছুকাল রোযা রাখা নবীদের রীতি। (এর মাধ্যমে) তিনি এ দিকে ইঙ্গিত করলেন, যেন আমি নবী-পরিবারের এই রীতি অনুসরণ করি। তাই আমি একটি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত রোযা রাখা সমীচিন মনে করলাম।’

এ স্বপ্ন দেখার পর তিনি (আ.) রোযা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তা একান্ত সংগোপনে রাখবেন বলে মনস্থ করলেন। এজন্য তিনি তাঁর ঘরের বাইরে যে কক্ষ ছিলো, তাতে অবস্থান গ্রহণ করলেন। সেখানেই খাবার আনাতেন আর তা থেকে অধিকাংশ খাবারই এতীম শিশুদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। নিজে রুটির সামান্য অংশ খেয়ে দিন পার করতেন। এসব রোযা রাখা কালে তিনি যেসব অভিজ্ঞতা লাভ করেন, তা সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি (আ.) বলেন,

‘এসব রোযার বিস্ময়কর যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তাহলো সেসব সূক্ষ্ম দিব্যদর্শন, সে যুগে যা আমার সামনে উম্মোচিত হয়েছে। পূর্ববর্তী কয়েকজন নবী এবং এই উম্মতের প্রথম সারির অতীত আওলীয়াদের সাথেও সাক্ষাত হয়েছে। একবার একান্ত জাগ্রত অবস্থায় রসুলুল্লাহ্ (সা.)-কে হাসান-হোসেন (রা.), হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর সাথে দর্শন করলাম। এছাড়াও আধ্যাত্মিক জ্যোতি রূপকভাবে এমন চিত্তাকর্ষক ও মনোহরি রঙ্গে সবুজ ও লাল রংয়ের স্তম্ভের আকারে পরিদৃষ্ট হয়, যার সৌন্দর্য বর্ণনা করা সাধ্যাতীত। ঐসব নূরানী স্তম্ভ, যেগুলো সোজা আকাশের উচ্চতায় গিয়েছিল, তার কতক উজ্জল সাদা, কতক সবুজ এবং কতক লাল রংয়ের ছিলো। সেগুলোর সাথে হৃদয়ের এমন নিবিড় সম্পর্ক ছিলো যে, তা দেখে হৃদয় একান্ত পরিতৃপ্ত হতো। সেগুলো দর্শনে হৃদয় ও মনে এমন প্রশান্তি হতো যেমনটি পার্থিব অন্য কিছু দর্শনে লাভ হওয়া কখনো সম্ভব নয়। আমার এ সম্বন্ধে ধারণা ছিলো, আলোর এই স্তম্ভগুলো আল্লাহ্ ও বান্দার ভালবাসার মিশ্রণে রূপকভাবে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ একটি নূর হৃদয় থেকে নির্গত হয়ে উপরে উঠছিল আর আরেকটি নূর আকাশ থেকে অবতীর্ণ হচ্ছিল। উভয়ের সম্মিলনে এক নূরের স্তম্ভ সৃষ্টি হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের ফলেই আল্লাহ্ তা’লার নিকট থেকে এ পদমর্যাদা লাভ হয়েছে এবং নূর অবতীর্ণ হয়েছে।’

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) অন্যত্র বলেন,

একবার আমার নিকট ইলহাম হয়, ‘মালায়ে আলা (ফিরিশতাগণ) পরস্পর আকাশে বিতন্ডায় লিপ্ত’। এটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আরো পরিস্কার করে বলেন, ধর্মকে সঞ্জীবিত করার জন্য আল্লাহ্ তা’লার ইচ্ছা প্রবল হলো। কিন্তু তখনো আকাশে ঐ সঞ্জীবনকারী ব্যক্তি চিহ্নিত হয়নি। এ কারণে তারা এ ব্যাপারে মতবিরোধ করছিলো। ইতিমধ্যে তিনি (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, লোকেরা এক সঞ্জীবনকারী ব্যক্তির সন্ধানে ছিলো। তখন এক ব্যক্তি এ অধমের কাছে এসে ইঙ্গিত করে বললো, ‘হাযা রাজুলুন ইউহিব্বু রসূলাল্লাহ্’ অর্থাৎ এই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র রসূলকে ভালবাসে। তার এ কথা দ্বারা সুস্পষ্ট হয়, এ পদমর্যাদার জন্য রসূলপ্রেম অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। অতএব এ ব্যক্তির মধ্যে সে যোগ্যতা আছে।

তাই যে নুর আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন, এ যুগে আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় নুর তাঁকে (আ.) প্রদান করে তা সমগ্র পৃথিবীতে বিস্তার করার জন্য দাঁড় করিয়েছেন।

হুযূর বলেন, খোদা তা’লা যখন কারো প্রতি স্বীয় নূর অবতীর্ণ করবেন বলে সিদ্ধান্ত করেন, তখন তিনি স্বয়ং তাঁকে পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি দান করেন, যাতে সে ব্যক্তি খোদা তা’লার নূর প্রসারের কারণ হতে পারে।

আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে ইলহামের মাধ্যমে অবগত করলেন,

‘তুমি তাঁর মধ্য থেকে উৎসারিত হয়েছো। সমগ্র বিশ্ববাসীর মধ্য থেকে তিনি তোমাকে নির্বাচিত করেছেন। তুমি সমগ্র বিশ্বের আলো। তুমি খোদার মর্যাদা প্রকাশকারী। অতএব, তিনি তোমায় পরিত্যাগ করবেন না। হে লোক সকল! তোমাদের নিকট খোদার জ্যোতি এসেছে। কাজেই তোমরা তার অস্বিকারকারী হয়ো না।’

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) অন্যত্র বলেন,

‘তিনি (আল্লাহ্ তা’লা) আমার প্রতি সন্তুষ্ট - এটিই আমার জন্য যথেষ্ট ছিলো। আমার কখনো মসীহ্ মওউদ বলে আখ্যায়িত হবার অথবা মসীহ্ ইবনে মরিয়মের চাইতে নিজেকে উত্তম আখ্যায়িত করার আদৌ কোন আকাংখা ছিলো না। আমি একান্ত নিভৃতে ছিলাম, কেউ আমাকে চিনতো না। আমার এ সাধও ছিলো না যে, কেউ আমাকে শনাক্ত করুক। তিনি নির্ভৃত কোন থেকে আমাকে বের হতে বাধ্য করেন। আমি একান্ত নিভৃতে থাকতে চেয়েছিলাম, এবং গোপনে মৃত্যু বরণের সাধ ছিলো। কিন্তু তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে বিশ্বে সম্মানজনক সুখ্যাতি প্রদান করবো।’

হুযূর বলেন, এই সম্মান অর্জন করার জন্য খোদা তা’লার প্রিয় বন্ধুর আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করা আবশ্যক। ইবাদতে, চরিত্রে, আদব ও শিষ্ঠাচারে যখন আগ্রহের সাথে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করা হবে এবং আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর পরিপূর্ণ অনুসরণ করা হবে তখনই সেই জ্যোতি লাভ হবে। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন:

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِىْ يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ

অর্থ, ‘তুমি বলে দাও! যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে ভালবাস তবে আমার অনুবর্তিতা করো, আল্লাহ্ তা’লাও তোমাদেরকে ভালবাসবেন।’

(সূরা আল্ ইমরান: ৩২)

অতএব এই সেই ভালবাসা - যা সাহাবারা রসূল (সা.)-এর সাথে রাখতেন, ফলে তারাও আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতিতে আলোকিত হয়েছিলেন। সেই একই ভালবাসায় বিলীন হয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ করেছেন আর এরই বদৌলতে আল্লাহ্ তা’লার প্রেমিক হয়ে এ যুগে নূর বিস্তৃত করার সম্মান লাভ করেছেন।

হুযূল বলেন, আজ যদি কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের সাথে ভালবাসার দাবী করে তবে, তার জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা আবশ্যক। এটি আল্লাহ্ তা’লার একটি অন্যতম নির্দেশ। আর এটি মহানবী (সা.)-এর নির্দেশেরও অন্তর্ভূক্ত। কেননা তিনিই মহানবী (সা.)-এর এই বাণীকে পূর্ণতা দান করেছেন। জগতকে প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও সমঝোতার দিকে আহ্বান করে এবং তা প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়ে খোদা তা’লার অধিকার প্রদান করতঃ আল্লাহ্ তা’লার নূরে আলোকিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন।

মহানবী (সা.)-এর এই বাণী, ‘মসীহ্ মওউদ (আ.) যুদ্ধ রহিত করবেন’। এই যুদ্ধ রহিত হবার কারণে বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তা ছড়াবে।

খুতবার শেষাংশে হুযুর বলেন, কয়েক দিন পূর্বে সুইজারল্যান্ডে মসজিদের মিনার নির্মাণের বিরুদ্ধে সংসদে বিল পাশ হয়েছে। মিনারের কারণে তাদের কি কষ্ট তা খোদা তা’লাই ভালো জানেন, তাদের চার্চেও তো মিনার থাকে, মিনার ভাঙলে উগ্রপন্থীদের উগ্রতা কি শেষ হয়ে যাবে? যাহোক, যে বিরোধিতা সৃষ্টি হয়েছে তা এ শত্রুদের শত্রুতারই একটা অংশ, এর পিছনে গভীর কোন ষড়যন্ত্র আছে বলে মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে আরও অন্যান্য দাবি উত্থাপিত হবে। আল্লাহ্ তা’লা ফযল করুন এবং তাদের সকল দূরভীসন্ধি থেকে সকলকে রক্ষা করুন এবং ইসলামকেও। আমাদের দোয়া করা আবশ্যক, খোদা তা’লা ইসলামের শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে