In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্-ওলী’ (অভিভাবক ও সাহায্যকারী) - পঞ্চম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২০শে নভেম্বর, ২০০৯ইং

আল্লাহ্ তা’লার ‘ওলী’ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

مَثَلُ الَّذِيْنَ اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَوْلِيَآءَ كَمَثَلِ الْعَنْكَبُوْتِ ‌ۖۚ اتَّخَذَتْ بَيْتًا‌ؕ وَ اِنَّ اَوْهَنَ الْبُيُوْتِ لَبَيْتُ الْعَنْكَبُوْتِ‌ۘ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ‏

অর্থ: ‘যারা আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে অন্যকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের উপমা মাকড়সার অনুরূপ যে নিজের জন্য একটি ঘর বানায় বটে; কিন্তু সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সর্বাধিক দূর্বল হয়ে থাকে; হায়! যদি তারা এটি জানতো।’

(সূরা আল্ আনকাবূত: ৪২)

হুযূর বলেন, এ আয়াতের বিষয়বস্তু হতে বুঝা যায়, আল্লাহ্ তা’লা এ আয়াতটিতে সে সব হতভাগার কথা উল্লেখ করেছেন যারা আল্লাহ্ তা’লার দ্বার ছেড়ে অন্যের দ্বারে ধর্ণা দেয়, আল্লাহ্ তা’লার বন্ধুত্ব পরিত্যাগ করে অন্যকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে। বাহ্যিক ও সাময়িক সুবিধা দেখে শাশ্বত ও চিরস্থায়ী কল্যাণকে উপেক্ষা করে; পার্থিব চাকচিক্যের মোহে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি সন্ধানের কথা ভুলে যায়। মানুষের সন্তুষ্টির খাতিরে তারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টির কথা ভুলে যায়। আল্লাহ্ তা’লাকে অভিভাবক হিসেবে অবলম্বনের পরিবর্তে তারা অন্য কাউকে অভিভাবক বানানোর চেষ্টা করে। আল্লাহ্ তা’লার সুরক্ষিত দূর্গে আশ্রয় নেয়ার পরিবর্তে মাকড়সার দুর্বল জালকে আশ্রয়স্থল মনে করে।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে আদ ও সামুদ জাতির উল্লেখ করেছেন। এরপর কারূন, ফেরাউন ও হামানের উল্লেখ করেছেন, বরং আরো কয়েক আয়াত পিছনে গেলে লূত জাতিরও উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশেষে এদের সবার মন্দ পরিণামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ, তারা আল্লাহ্‌কে ভুলে গিয়েছিলো আর পার্থিব ভোগ-বিলাসই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিলো। আল্লাহ্ তা’লার সিদ্ধান্তের সম্মুখে কোন জাতি, সম্পদ, সুউচ্চ প্রাসাদ এবং পাহাড়ের শৃঙ্গে নির্মিত নিরাপদ আবাসস্থলও এদের কোনই কাজে আসেনি।

আজও পৃথিবীর মানুষ সম্পদশালীর সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকে আর আক্ষেপ করে বলে, হায়! আমার কাছেও যদি এমন অর্থকড়ি থাকতো এবং আমিও যদি এদের মতো সম্পদশালী হতে পারতাম। দরিদ্্র রাষ্ট্রগুলো ধনাঢ্য ব্যক্তি বা সম্পদশালী রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাবার আশায় এবং তাদের ক্ষমতার ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার জন্য তাদের তোষামোদ করে থাকে। তারা মনে করে, এদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপরই তাদের রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। স্বার্থপর নেতারা প্রয়োজনে তাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। বর্তমানে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁস হবার কারণে এসব বিষয় বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমনকি কয়েকটি মুসলমান দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাদের দেশকে বন্ধক রেখেছে। কিন্তু এর কোন প্রয়োজনই ছিলো না কেননা, তাদের কাছে যথেষ্ট ধন-সম্পদ রয়েছে। যেহেতু আল্লাহ্ তা’লার প্রতি তাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস নেই, এ জন্য তারা তাদের রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভরসাস্থল খুঁজতে থাকে।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে কারূনের কাহিনী বর্ণনার পর তার পরিণাম সম্পর্কে বলেন,

فَخَسَفْنَا بِهٖ وَبِدَارِهِ الْاَرْضَ فَمَا كَانَ لَهٗ مِنْ فِئَةٍ يَّـنْصُرُوْنَهٗ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِيْنَ‏

অর্থ: ‘অতঃপর আমরা তাকে এবং তার ঘরকে ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিয়েছি আর আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে তার পক্ষ নিয়ে দাঁড়ানোর মতো কোন দল ছিল না। এবং সে কোন কৌশল করেই বাঁচতে পারে নি।’

(সূরা আল্ কাসাস্: ৮২)

কাজেই, আল্লাহ্ তা’লার শক্তির মোকাবিলায় সম্পদ ও গোষ্ঠীর বড়াই তার কোন কাজে আসেনি, আর কখনোই এগুলো কোন কাজে আসে না। গত বছর আল্লাহ্ তা’লা সম্পদশালী রাষ্ট্র সমূহকে, বরং বলা উচিত গোটা পৃথিবীকেই, অর্থনৈতিক সংকটের মাধ্যমে ছোট্ট একটি ঝাঁকুনি দিয়েছেন। এর থাবা হতে পৃথিবী এখনও মুক্ত হতে পারেনি এবং আজ পর্যন্ত সর্বত্র এর মন্দ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

হুযূর বলেন, পবিত্র কুরআন পার্থিব ক্ষমতার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে ফেরাউনের উদাহরণ দিয়েছে। সে প্রভু হবার দাবি করেছিলো, কিন্তু যখন তার নিজের পরিণামের সময় এলো তখন তার রাজত্ব তো দূরের কথা, সেই (প্রভু হবার) ঘোষণাও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। তার ঘোষণা ও দাবি ছিলো,

فَاجْعَل لِّىْ صَرْحًا لَّعَلِّىْۤ اَطَّلِعُ اِلٰٓى اِلٰهِ مُوْسٰىۙ وَاِنِّىْ لَاَظُنُّهٗ مِنَ الْـكٰذِبِيْنَ‏

অর্থ: ‘অতঃপর আমার জন্য একটি সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করো, যেন আমি (তাতে চড়ে) মূসার মা’বুদকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। কারণ, আমি মনে করি, সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্গত।’

(সূরা আল্ কাসাস্: ৩৯)

কিন্তু যখন সে আল্লাহ্ তা’লার শাস্তিতে নিপতিত হলো তখন বনী ইসরাঈলের খোদার প্রতি ঈমান আনার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। এ সম্পর্কে কুরআন বলে:

اِذَاۤ اَدْرَكَهُ الْغَرَقُۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا الَّذِىْۤ اٰمَنَتْ بِهٖ بَنُوْۤا اِسْرآءِيْلَ وَ اَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ

অর্থ: ‘যখন ডুবে মরার উপক্রম হলো, তখন সে বললো, আমি ঈমান আনলাম তাঁর প্রতি যিনি ছাড়া আর কোন মা’বুদ বা উপাস্য নেই। যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে, এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভূক্ত হলাম।’

(সূরা ইউনুস: ৯১)

‘আমি সুউচ্চ প্রাসাদে চড়ে মূসার খোদাকে খুঁজে দেখবো’, কোথায় এ দাবি? আর কোথায় নিমগ্ন হবার সময় মৃত্যুকে সামনে দেখে এ স্বীকারোক্তি, ‘আমি বনী ইসরাঈলের খোদার প্রতি ঈমান এনেছি’। সেই জাতি যারা ফেরাউনের দৃষ্টিতে তুচ্ছ ছিল, সাধারণ শ্রমিকের ন্যায় কাজ করতো, তাদের খোদার বরাত দিয়ে কথা বলছে। আল্লাহ্ তা’লা তার মুখ দিয়ে মূসার খোদার কথা বলান নি কেননা, মূসা (আ.) তার গৃহে লালিত-পালিত হয়েছিলেন এবং এ দিক থেকে তিনি (আ.) সম্মানিত ছিলেন। খোদা তা’লা সেই সময় তার মুখ দিয়ে এমন কথা বের করিয়েছেন যা তার চরম লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত হবার সাক্ষ্য বহন করে। মোটকথা, আল্লাহ্ তা’লা এখানে পার্থিব আশ্রয়স্থলের চিত্র তুলে ধরেছেন।

অতএব, হৃদয়ে খোদার ভয় এবং ঈমান আনার দাবী শুধু খোদার নাম নিলেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। যারা শক্তি থাকা সত্ত্বেও খোদাকে ভয় করে এবং ন্যায় বিচারের সকল শর্ত মোতাবেক চলে তাদের সম্পর্কে বলা যায় যে, এরা খোদাকে ভয় করে। তা নাহলে এটা তো শুধু মুখের কথামাত্র, ‘আমি খোদাকে ভয় করি’। কতিপয় ব্যক্তি যারা একদিকে খোদার নাম নেয় অপরদিকে অত্যাচারেও সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাদের মূলতঃ খোদা তা’লার শক্তির উপর ঈমানই নেই। সমাজে লোক দেখানোর জন্য শুধুমাত্র খোদার নাম উচ্চারণ করে, এমন ব্যক্তি সেসব ঘরে থাকে যা মাকড়াসার ঘরতুল্য, যাকে বাতাস এক ঝাপটায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। এসব ব্যক্তির প্রকৃত বিশ্বাস (ঈমান) নিজের অর্থ, সম্পর্ক, শক্তি, পার্টি, জনসমর্থন ও বড় বড় রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের উপর হয়ে থাকে। অথচ তারা এটি জানে না যে, বড় বড় শক্তি বা মহাশক্তি নিজেদের স্বার্থ পূর্ণ হয়ে যাবার পর শত্র“তাই করবে। একমাত্র আল্লাহ্ তা’লা ছাড়া কেউ বিশ্বস্ততা রক্ষা করে না।

অতএব, আল্লাহ্ তা’লা মুসলমানদেরকে বিশেষ করে বার বার এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, আল্লাহ্ তা’লার তাক্বওয়া অবলম্বন করো, আল্লাহ্ তা’লাকে ঢাল হিসেবে অবলম্বন করো। সব সময় স্মরণ রাখো যে, শুধুমাত্র খোদা তা’লাই অবিনশ্বর এবং সকল শক্তির আধার। এজন্য তাঁকেই নিজের নিরাপত্তার সর্বশেষ উপায় মনে করো। নিঃসন্দেহে উপকরণকে বা সম্পর্ককে কাজে লাগানো বৈধ এবং আবশ্যকও বটে; কেননা, আল্লাহ্ তা’লাই উপকরণের স্রষ্টা। সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য পারস্পরিক-সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করা, রক্ষা করা, সাহায্য নেয়া এবং সাহায্য করা এবং আল্লাহ্ তা’লার বানানো নিয়ম অনুযায়ী জীবনযাপন করা বৈধ। কিন্তু এ ধারণা মু’মিনদের কখনোই আসা উচিত নয় যে, উপকরণ এবং সম্পর্কই সবকিছু।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা কুরআন করীমের প্রথম সূরাতেই মু’মিনদেরকে তাদের নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং উন্নতির পথ প্রাপ্তির জন্য একটি দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি বলেন, দোয়া কর: اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ (সূরা ফাতেহা: ৫) খোদা তা’লার কাছেই আমরা ইবাদত করি ও করতে চাই এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি, তিনিই আমাদেরকে ইবাদতের সামর্থ্য দান করুন এবং আমাদের অভাব মোচন করুন। এ দোয়ার গুরুত্ব এতো বেশি যে, পাঁচ বেলার নামায এবং নফলের প্রতিটি রাকাতেই এটি পাঠ করা আবশ্যক আখ্যা দেয়া হয়েছে, এ নির্দেশের প্রতি যত্নবান থাকা উচিত। খোদা তা’লার কাছে হৃদয়ের গভীর থেকে ইবাদত করা উচিত এবং পরিশুদ্ধ হৃদয়ে খোদা তা’লার নিকট সাহায্য কামনা করা উচিত।

হুযূর বলেন, প্রত্যেক প্রয়োজনে, প্রত্যেক ইচ্ছা-আকাঙ্খায়, প্রত্যেক চেষ্টায় - সফলতা লাভের জন্য সর্বপ্রথম খোদার প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত। এরপর উপায় উপকরণের সাথে সাথে এ নীতিকেও আঁকড়ে থাকা উচিত যে, খোদা তা’লাই দেয়ার মালিক।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বিশেষভাবে মু’মিনদেরকে বলেছেন - আল্লাহ্‌র দিকে অগ্রসর হও, সে কাজ সম্পাদনের চেষ্টা করো যা খোদা তা’লা একজন মু’মিনের জন্য আবশ্যক করে দিয়েছেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘খোদা তা’লা আমাকে এজন্য জগতে প্রেরণ করেছেন যেন আমি ধৈর্য্য, সহনশীলতা, উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী ও উদার ব্যবহার দ্বারা পথহারা লোকদেরকে খোদা ও তাঁর পবিত্র পথের দিকে নিয়ে আসি এবং সেই নূর (জ্যোতি) যা আমাকে দেয়া হয়েছে এর আলো দ্বারা যেন আমি লোকদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করি।’

তিনি (আ.) আরো বলেন:

‘আমাকে ঈমানকে দৃঢ় করা এবং খোদা তা’লার সত্তাকে জগতে পরিচিত করে দেখানোর জন্য জন্য পাঠানো হয়েছে। কেননা প্রত্যেক জাতির ঈমানী অবস্থা খুবই দূর্বল হয়ে গেছে এবং তারা শেষ বিচার দিবসকে কিচ্ছা-কাহিনী সর্বস্ব মনে করে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার ব্যবহারিক অবস্থার মাধ্যমে বলছে, তারা যেভাবে জগত ও জাগতিক বস্তুর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে এবং যেভাবে জাগতিক উপকরণের প্রতি তাদের আস্থা, তদ্রুপে খোদা তা’লা ও পরকালের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আস্থা নেই। মুখেমুখে অনেক কিছু আছে কিন্তু হৃদয় খোদার ভালবাসা হতে শূন্য। সুতরাং আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে, যেন সত্যবাদীতা ও ঈমানের যুগ আবার ফিরে আসে। হৃদয়ে খোদা ভীতি সৃষ্টি হয়। যদিও কুরআনের আসল শিক্ষা আজও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান তথাপি হৃদয় এর প্রভাব শূন্য।

হুযূর বলেন, আজ থেকে পনের’শ বছর পূর্বে মহানবী (সা.)-এর পবিত্রকরণ শক্তি যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলো, সেই সুন্দরতম সমাজের চিত্র এমন ছিলো, যেখানে বিশেষভাবে খোদা তা’লাকেই ঢাল হিসেবে অবলম্বন করা হতো আর শুধুমাত্র খোদার সন্তুষ্টি লাভই ছিলো তাদের জীবনের পরম ও মূখ্য উদ্দেশ্য। সেই সমাজে একজন মু’মিন সাহাবী নিজের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করলে অপর মু’মিন সাহাবী বলতেন- তুমি দাম কম বলছো? বর্তমানে শহরে এই জিনিষের মূল্য অনেক বেশি। বিক্রেতা বলতো, আমি গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছি, সেখানে এর দাম এমনই। আমি এ দামেই বিক্রি করবো, আমি বেশি দাম নিয়ে খোদা তা’লার দ্বারকে নিজের জন্য বন্ধ করতে চাই না। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলতো, আমিও তোমাকে কম দাম দিয়ে নিজের উপর খোদার কৃপা-দ্বারকে রুদ্ধ করতে চাই না। তাদের মাঝে সে কথা চলতে থাকতো, এক পর্যায়ে তা কথা কাটাকাটি ও ঝগড়ায় রূপ নিতো। কিন্তু ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই এটি মানতে প্রস্তুত হতো না। তাদের বক্তব্য হতো, সাময়িক লাভের জন্য আমি আল্লাহ্ তা’লার ফযল থেকে কেন বঞ্চিত হবো।

অতএব এই হলো, সেই সমাজ যা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ ধরায় এসেছেন। এখন আহমদীদের আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত, আমরা এরূপ সমাজ গঠনের জন্য ভূমিকা রাখছি কি? আমরা কি আল্লাহ্ তা’লাকে বন্ধু বানানোর ইচ্ছা রাখি? না-কি পার্থিব ধন-সম্পদ, সর্ম্পক, প্রতিপত্তি এবং ঐশ্বর্য্য ইত্যাদিকে নিজের বন্ধু বানাচ্ছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি কাজ খোদার সন্তুষ্টির জন্য না হবে ততক্ষণ আমরা প্রকৃত মু’মিন হতে পারবো না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর জামাতকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ওলী হও, কিন্তু ওলী পূজারী হয়ো না।’

কাজেই, কারো মুখাপেক্ষী হবার পরিবর্তে একজন মু’মিনকে স্বয়ং খোদা তা’লার সাথে এমন সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন, যেন সে তাঁর (আল্লাহ্ তা’লার) ওলী হয়ে যেতে পারে। সে প্রকৃত ওলী যার মধ্যে বিনয় ও নম্রতা রয়েছে। জামাতে আহমদীয়ার প্রত্যেক সদস্যের স্মরণ রাখতে হবে, সত্যিকার ওলী তারাই, যাদের খিলাফতের সাথেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জামাতের মধ্যে অনেক বড় বড় দোয়াকারী ও আল্লাহ্ তা’লার সাথে সুসম্পর্ক রাখে এমন বুযূর্গ গত হয়েছেন। হযরত মওলানা গোলাম রসূল রাজেকী সাহেব (রা.) যিনি স্বয়ং তাঁর আত্মজীবনী লিখে গেছেন, আল্লাহ্ তা’লার সাথে বিশেষ সম্পর্ক থাকায় তাঁর দোয়া গৃহীত হবার অগণিত ঘটনা রয়েছে। তবুও সর্বদা তিনি দোয়া প্রার্থীদের বলতেন, ‘খলীফায়ে ওয়াক্তের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করো, তাঁকে দোয়ার জন্য বলো আর স্বয়ং নিজের জন্য দোয়া করো’। এটি হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার সত্যিকার নৈকট্য যা মানুষের মাঝে বিনয় বৃদ্ধি করে।

দোয়ার জন্য কারো কাছে আবেদন করা নিষেধ নয়। মু’মিনদের পরস্পরের জন্য যেমন দোয়া করা প্রয়োজন, তেমনি দোয়ার আবেদন জানানোও আবশ্যক। কিন্তু, একই সাথে নিজেরও দোয়ার প্রতি মনোযোগী থাকা প্রয়োজন। তবে, আমি যেভাবে বলেছি, শুধু বিপদের সময়ই নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থাতেও আল্লাহ্ তা’লার সাথে এমন সম্পর্ক রাখতে হবে যেন আল্লাহ্ তা’লার ওলী বা বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা হয়।

খোদা তা’লার আশ্রয়ের অন্বেষী হতে হবে কেন, আর কেনই-বা অন্যান্য বস্তুর আশ্রয়কে খোদা তা’লার আশ্রয়ের বিপরীতে তুচ্ছ জ্ঞান করতে হবে, এ সম্পর্কে খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনের এক স্থানে বলেছেন,

قُلْ اَغَيْرَ اللّٰهِ اَتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ‌ؕ قُلْ اِنِّىْۤ اُمِرْتُ اَنْ اَكُوْنَ اَوَّلَ مَنْ اَسْلَمَ‌ وَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ

অর্থ: তুমি বলো, আমি কি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌কে ছেড়ে অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবো, তিনি সকলকে আহার করান আর তাঁকে আহার করানো হয় না। তুমি বলো, নিশ্চয় আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি আনুগত্যকারীদের মধ্যে প্রথম থাকি এবং তুমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না।’

(সূরা আল্ আন্’আম: ১৫)

হুযূর বলেন, পৃথিবী ও আকাশ সমূহের সত্ত্বাধিকারী হচ্ছেন খোদা তা’লা। এ খোদার পূর্ণ আনুগত্য ছাড়া মুক্তির অন্য কোন পথ খোলা নেই। আনুগত্যকারীরাই সত্যিকারভাবে আল্লাহ্ তা’লার বন্ধু হয়ে থাকেন। এই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহ্ তা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য হযরত ইউসুফ (আ.)-এর মাধ্যমে আমাদের এ দোয়া শিখিয়েছেন,

فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ اَنْتَ وَلِىّٖ فِىْ الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ‌ؕ تَوَفَّنِىْ مُسْلِمًا وَّاَلْحِقْنِىْ بِالصّٰلِحِيْنَ

অর্থ: ‘হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমি ইহ ও পরকালে আমার বন্ধু, আমাকে পূর্ণ আনুগত্যকারী অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং সৎ কর্মপরায়ণদের দলে অন্তর্ভূক্ত করো।’

(সূরা ইউসূফ: ১০২)

খোদা তা’লার ওলীগণ অবস্থা স্বচ্ছল হোক বা অস্বচ্ছল কোন অবস্থায় খোদা তা’লাকে ভুলে যান না। তারা সর্বাবস্থায় খোদা তা’লাকে স্মরণ রাখেন। জেনে রেখো! খোদা তা’লার সাথে সম্পর্কের মাঝেই তোমাদের সফলতা নিহিত। এ সম্পর্কে খোদা তা’লা বলেন,

وَاْمُرْ اَهْلَكَ بِالصَّلٰوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا‌ؕ لَا نَسْـَٔلُكَ رِزْقًا‌ؕ نَّحْنُ نَرْزُقُكَ‌ؕ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوٰى

অর্থ: ‘এবং তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের জন্য তাগিদ করতে থাকো আর তুমি স্বয়ং এর উপর সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকো। আমরা তোমার কাছে কোন রিয্ক চাই না, বরং আমরাই তোমাকে রিয্ক দিয়ে থাকি। বস্তুতঃ উত্তম পরিণাম তাক্বওয়ার-ই হয়ে থাকে।’

(সূরা তাহা: ১৩৩)

এরপর হুযূর বলেন, নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য খোদা তা’লার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নামাযের প্রতি মনোযোগী হও আর পরিবার-পরিজনেরও এর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করো। নামাযের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদানই তোমাদেরকে তাক্বওয়ায় সজ্জিত করবে। জেনে রেখো! আল্লাহ্ তা’লা মুত্তাকীর প্রতিটি বিষয়ের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। তাকে এমন স্থান হতে রিয্ক সরবরাহ করেন যা সে চিন্তাও করতে পারে না। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এবং আমাদের সন্তান-সন্তুতিকে তাঁর সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলার সৌভাগ্য দান করুন। এই উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে মহানবী (সা.) একটি দোয়াও শিখিয়েছেন। একটি বর্ণনায় এসেছে:

হযরত হাসান বিন আলী (রা.) বর্ণনা করেন যে, মহানবী (সা.) আমাকে কতক দোয়া শিখিয়েছেন। যেন আমি এগুলো বেতেরের নামাযে পাঠ করি। দোয়াগুলো হচ্ছে, ‘হে আল্লাহ্! আমাকে ঐ সকল লোকের অন্তর্ভূক্ত করো যাদেরকে তুমি হেদায়েত দিয়েছো, আমাকে ঐ লোকদের সাথে শামিল করে নিরাপত্তা দান করো, যাদেরকে তুমি নিরাপত্তা দিয়েছো, আমাকে ঐ লোকদের সাথে শামিল করে আমার অভিভাবক হয়ে যাও যাদের অভিভাবকত্ব স্বয়ং তুমি গ্রহণ করেছা। যা কিছু তুমি আমাকে দান করেছো এর মাঝে তুমি আমার জন্য কল্যাণ রেখে দাও। যা কিছু তুমি আমার ভাগ্যে নির্ধারণ করে রেখেছো তার মন্দ দিকগুলো থেকে আমায় রক্ষা করো। নিশ্চয় তুমিই মিমাংসাকারী আর তোমার বিরুদ্ধে মিমাংসা করা যায় না। তুমি যার বন্ধু হয়ে যাও সে কখনো লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয় না। হে আমাদের খোদা! তুমি বড়ই কল্যাণমন্ডিত এবং মহা মর্যাদাবান।’

(সুনান তিরমিযি, কিতাবুস সালাত)

অতএব, এ দোয়া আমাদের সর্বদা যাচনা করতে থাকা উচিৎ।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘আমি অনেক দোয়া করি, আমার পুরো জামাত ঐসব লোকদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত হোক যারা খোদা তা’লাকে ভয় করে আর নামাযের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাতে উঠে ভূলুন্ঠিত হয় (সিজদা করে) আর ক্রন্দন করে এবং খোদা তা’লার ফরজ সমূহ নষ্ট করে না। তারা কৃপণ, অলস এবং জগতের কীট নয়।’

তিনি (আ.) আরও বলেন,

‘খোদা এ জামাতকে এমন এক জাতিতে পরিণত করতে চান যাদের দেখে মানুষ খোদাকে স্মরণ করবে। যারা তাক্বওয়া এবং পবিত্রতার প্রথম স্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে ধর্মকে পার্থিব বিষয়াদির উপর প্রাধান্য দান করবে।’

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের শিক্ষার প্রতি আমল করার সৌভাগ্য দান করুন। আমরা যেন সর্বদা খোদা তা’লার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারি, আর জাগতিক লোভ-লালসা হতে দূরে থাকতে পারি; অপরের প্রাপ্য অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রেও যেন প্রথম সারিতে থাকতে পারি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সকল দোয়ার উত্তরাধিকারী হতে পারি আর আল্লাহ্ তা’লার ওলী হবার লক্ষ্যে আমাদের অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে । (আমিন)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে