In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্-ওলী’ (অভিভাবক ও সাহায্যকারী) - চতুর্থ অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৩ই নভেম্বর, ২০০৯ইং

আল্লাহ্ তা’লার ‘ওলী’ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِيَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَۖ

الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَؕ‏

لَهُمُ الْبُشْرٰى فِىْ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَفِىْ الْاٰخِرَةِ‌ؕ لَا تَبْدِيْلَ لِـكَلِمٰتِ اللّٰهِ‌ؕ ذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُؕ‏

এ আয়াতসমূহের অনুবাদ হলো, ‘জেনে রাখো! যারা আল্লাহ্‌র বন্ধু তাদের কোন ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান আনে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য পার্থিব জীবনেও সুসংবাদ রয়েছে এবং পরকালেও। আল্লাহ্‌র কথা অটল, এটি-ই মহান সফলতা।’

(সূরা ইউনুস: ৬৩ - ৬৫)

এ আয়াতগুলোর বিষয়বস্তু হতে বুঝা যায়, এতে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর ওলীদের অবস্থা ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ্ তা’লা তাঁর ওলী, বন্ধু ও প্রকৃত মু’মিনদেরকে যা দান করে থাকেন তা একটি নিয়ামত বা পুরস্কারের অব্যাহত ধারা। আল্লাহ্ তা’লার সাথে সুসম্পর্কের কারণে, একজন প্রকৃত মু’মিনের হৃদয়ে এ প্রশান্তি থাকে যে, কোন প্রকার বিপদাপদ ও পরীক্ষার মুখে তাকে বড় কোন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। ভয়-ভীতি দেখা দিতে পারে, পরীক্ষার মাঝে দিনাতিপাত করতে হতে পারে কিন্তু এরপরও একজন প্রকৃত মু’মিনের হৃদয়ে এ প্রশান্তি থাকে যে, এ পৃথিবীতে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হলেও আল্লাহ্ তা’লা আপন করুণায় তা পূর্ণ করবেন এবং প্রাণের ক্ষতি হলে পরকালে তাঁর অঙ্গীকার অনুযায়ী মহা পুরস্কারে ভূষিত করবেন, তা এমন পুরস্কার - যা হবে কল্পনাতীত। কিন্তু এর জন্য আল্লাহ্ তা’লা সর্বপ্রথম যে শর্তটি আরোপ করেছেন তা হলো, আল্লাহ্ তা’লার সাথে বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। জাগতিক বন্ধুত্বের জন্য তো অনেক সময় আমরা অনেক বড় বড় ত্যাগ স্বীকার করে থাকি। তাই শুধু আল্লাহ্ তা’লার বন্ধু আখ্যায়িত হওয়া এবং তাঁর বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষাই নয় বরং তাঁর ভালবাসার প্রেরণায় সমৃদ্ধ হয়ে তাঁর প্রতিটি আদেশ মানতে হবে। এমনটি করে বলেই আল্লাহ্ তা’লার ওলীরা সমস্ত ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থাকেন।

হুযূর বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্‌র ওলীদের পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা’লা একস্থানে বলেন:

تَتَجَافٰى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَّطَمَعًا وَّمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ

অর্থাৎ, ‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা হতে পৃথক হয়ে যায় (অর্থাৎ রাতে নফল নামায পড়ার জন্য তারা তাদের বিছানা ত্যাগ করে-অনুবাদক) এবং তারা একদিকে আল্লাহ্ তা’লার ভয় এবং অপরদিকে আশা নিয়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করে এবং তিনি তাদেরকে যা কিছু রিয্ক দান করেছেন তাত্থেকে তারা খরচ করে।’

(সূরা আস্ সাজদা: ১৭)

অতএব আল্লাহ্ তা’লা তাঁর ওলীদের ভয়-ভীতি দূর করেন কেননা, তারা কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লাকেই ভয় করে। পার্থিব ভয়-ভীতি তাদের নিকট এক কানাকড়িরও মূল্য রাখে না। এ পার্থিব জীবন তাদের লক্ষ্য নয় বরং আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি-ই তাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্য, তাই অনাগত ভবিষ্যতের কোন ভয় তাদের নেই। শুধু এতোটুকুই নয় বরং বলা হয়েছে وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ অর্থাৎ, তারা বিগত কোন বিষয়ের জন্যও চিন্তাগ্রস্ত হবে না। মোটকথা, আল্লাহ্ তা’লা যখন কারো ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করতঃ তাকে নিজের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন তখন তাকে তার অতীত ভুল-ভ্রান্তির কুফল থেকে নিরাপদ রাখেন। কাজেই একমাত্র আল্লাহ্ তা’লাই এমন সত্তা; যিনি একবার কাউকে বন্ধু বলে গ্রহণ করার পর বান্দা যদি বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করে তাহলে আল্লাহ্ তা’লা যেখানে তার ভবিষ্যত কল্যাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেন সেখানে অতীতের পাপ-পঙ্কিলতার বোঝা হতেও মুক্তি দেয়ার নিশ্চয়তা দেন। পৃথিবীর কোন শক্তিই এরূপ মহান নিশ্চয়তা দেয়ার অধিকার রাখে না বরং ক্ষমতাও রাখে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়! পৃথিবীর একটি বিশাল জনগোষ্টি খোদা তা’লার দ্বার ছেড়ে অন্যের দ্বারস্থ। শুধুমাত্র যে অন্যের দ্বারস্থ হয়েছে তাই নয় বরং খোদাদ্রোহীতার ক্ষেত্রেও সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আর এরই ফলশ্রুতিতে মানুষ দ্রুত জাহান্নামের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:

‘খোদা তা’লা তাকে (মানুষকে) নিজের ওলী বা বন্ধু বলেছেন অথচ তিনি পরবিমুখ, তাঁর কারও প্রয়োজন নেই। তাই তাঁর বন্ধুত্ব একটি শর্ত সাপেক্ষে আর তাহলো وَلَمْ يَكُنْ لَّهٗ وَلِىٌّ مِّنَ الذُّلِّ‌ (সূরা বনী ইসরাঈল: ১১২) এটি একেবারেই সত্য কথা যে, খোদা তা’লা কাউকে যোগ্যতার বলে তাঁর বন্ধু বানান না বরং শুধুমাত্র তাঁর কৃপা এবং দয়াই কাউকে তাঁর নৈকট্য প্রদান করে। কাউকে তাঁর কোন প্রয়োজন নেই। এই বন্ধুত্ব এবং নৈকট্যের ফলে মানুষই লাভবান হয়। স্মরণ রেখো! অন্তর্নিহিত যোগ্যতার কারণেই আল্লাহ্ তা’লা কাউকে মনোনীত করেন এবং বেছে নেন। খুব সম্ভব অতীত জীবনে সে কোন ছোট-খাটো অথবা বড়-বড় গুনাহ্ করে থাকবে। কিন্তু যখন আল্লাহ্ তা’লার সাথে তার আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে তখন তিনি সেসব পাপ ক্ষমা করে দেন। আর ইহ ও পরকালে কখনোই তাকে লজ্জিত করেন না। এটি আল্লাহ্ তা’লার কতবড় অনুগ্রহ, একবার ক্ষমা করলে সেটিকে আর কখনো উল্লেখ-ই করেন না। তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন। কিন্তু (তাঁর) এরূপ অনুগ্রহ ও দয়া সত্ত্বেও যদি মানুষ কপটতাপূর্ণ জীবন যাপন, করে তাহলে এটি চরম দুর্ভাগ্য ও লজ্জার কারণ।’

তিনি (আ.) আরো বলেন, ‘কল্যাণ এবং ঐশী কৃপা লাভের জন্য হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতাও একান্ত আবশ্যক। যতক্ষণ পর্যন্ত হৃদয় পরিস্কার না হবে ততক্ষণ কিছুই হবে না। যেহেতু আল্লাহ্ তা’লা হৃদয় দেখেন তাই এর কোন অংশে বা কোনে কপটতার কোন নামগন্ধও যেন অবশিষ্ট না থাকে। অবস্থা যদি এরূপ হয় তাহলে ঐশী কৃপা দৃষ্টির ফলে ঐশী রহমতের বিকাশ ঘটবে আর বিষয়াদি পরিস্কার হয়ে যাবে। এজন্য এমন বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হওয়া উচিত, যেভাবে ইব্রাহীম (আ.) নিজের সত্যতা প্রদর্শন করেছেন অথবা মহানবী (সা.)-এর ন্যায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। মানুষ যদি এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাহলে পার্থিব জীবনে কোনভাবে লাঞ্চিত হয় না আর না-ই অসচ্ছলতার দরুণ কষ্টে নিপতিত হয়। বরং তার জন্য খোদা তা’লার কৃপা ও অনুগ্রহের দ্বার উম্মুক্ত হয় এবং তার দোয়া গৃহীত হয়। খোদা তা’লা তাকে অভিশপ্ত জীবন দ্বারা ধ্বংস করেন না বরং তার পরিণাম শুভ হয়। সার কথা হলো, খোদা তা’লার সাথে যে আন্তরিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে খোদা তা’লা তার সকল আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ করেন, তাকে নিরাশ করেন না।’

(আল্ হাকাম-৮ম খন্ড-নাম্বার: ৮-১০ মার্চ, ১৯০৪-পৃ: ৫)

এরপর হুযূর বলেন, একটি হাদীসে এসেছে মহানবী (সা.) বলেন,

‘যখন কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’লার ওলীদেরকে তাঁর সামনে উপস্থিত করা হবে। তাদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হবে। প্রথম শ্রেণীর লোকদের নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ্ তা’লা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, “হে আমার বান্দা! তোমার সৎকর্মের পিছনে উদ্দেশ্য কি?” সে বলবে, “হে আমার প্রতিপালক-প্রভু! আপনি আপনার আনুগত্যকারীদের জন্য জান্নাত সৃষ্টি করেছেন এবং তার বৃক্ষ ও ফল ফলাদি তৈরি করেছেন, ঝর্ণাসমূহ সৃষ্টি করেছেন, এর হুর এবং পুরস্কারসমূহ তৈরি করেছেন। কাজেই আমি এসব কিছু পাওয়ার জন্য রাতে উঠে নফল আদায় করেছি এবং দিনের বেলা রোযা রেখেছি”। এতে খোদা তা’লা বলবেন, “হে আমার বান্দা! তুমি শুধু জান্নাত লাভের জন্য কর্ম করেছো। সুতরাং এই হলো জান্নাত, এর মধ্যে প্রবেশ করো আর এটি আমার অনুকম্পা, আমি তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলাম। এটিও আমার দয়া, আমি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো”। সুতরাং সে এবং তার সঙ্গী-সাথীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এরপর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের মধ্য থেকে একজনকে ডেকে নেয়া হবে। তাকে আল্লাহ তা’লা জিজ্ঞেস করবেন – “হে আমার বান্দা! তুমি কেন পুণ্যকর্ম করেছো?” সে উত্তর দিবে – “হে আমার প্রভু! তুমি জাহান্নাম সৃষ্টি করেছো। এর বেড়ি, উত্তপ্ত লেলিহান অগ্নি শিখা, এর গরম বাতাস, ফুটন্ত পানি, যা কিছু তুমি তোমার অবাধ্য ও শত্রুদের জন্য সৃষ্টি করেছো, আমি এসবের ভয়ে রাত্রে উঠে নফল পড়েছি আর দিনের বেলা রোযা রেখেছি”। এতে খোদা তা’লা বলবেন – “হে আমার বান্দা! তুমি এ কাজ আমার আগুনের ভয়ে করেছো। সুতরাং আমি তোমাকে আগুন থেকে মুক্তি দিলাম। আমার দয়ায় তোমাকে আমার জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো”। সুতরাং সে তার সঙ্গী-সাথীসহ জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এরপর তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের মধ্যে থেকে একজনকে নেয়া হবে। তাকে আল্লাহ্ তা’লা জিজ্ঞেস করবেন – “হে আমার বান্দা! তুমি কেনো পুণ্যকর্ম করেছো?” সে বলবে – “হে আমার প্রভু-প্রতিপালক! তোমার ভালবাসার নিমিত্তে। আমি শুধুমাত্র তোমার ভালবাসা ও সাক্ষাতের প্রত্যাশী। তোমার সাক্ষাতের জন্য আমি রাত জেগেছি, দিনে রোযা রেখেছি। আমি শুধুমাত্র তোমার সাক্ষাত লাভ ও তোমার ভালবাসার কারণেই এমনটি করেছি”। সুতরাং অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাবান খোদা তা’লা তাকে বলবেন, “হে আমার বান্দা! তুমি সব কাজ আমার ভালবাসা ও সাক্ষাতের আকাঙ্খায় করেছো সুতরাং এর প্রতিদান নাও”। মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ তাঁর জন্য স্বীয় প্রতাপের জ্যোতির্বিকাশ ঘটাবেন, নিজের চেহারা থেকে সব আবরণ উম্মোচিত করে তার সামনে এসে যাবেন। আল্লাহ্ বলবেন – “হে আমার বান্দা! এই আমি উপস্থিত আছি। আমার দিকে তাকাও”। পরে বলবেন – “আমি আমার দয়ায় তোমাকে আগুন থেকে মুক্তি দিয়েছি এবং জান্নাত তোমার জন্য অবধারিত করছি। ফিরিশ্তাদেরকে তোমার নিকট পাঠাবো এবং আমি স্বয়ং তোমাকে সালাম বলবো”। অতএব সেও তার সঙ্গী-সাথীসহ জান্নাতে প্রবেশ করবে।’

(তফসীর ফতহুল বয়ান)

মোটকথা, আল্লাহ্‌র ওলীদের বিভিন্ন শ্রেণী রয়েছে। কিন্তু মৌলিক বিষয় হচ্ছে, ঈমান ও তাক্বওয়াতে উন্নতি লাভ করা। নবীরা আল্লাহ্ তা’লার সেরূপ আওলিয়া যাদের ঈমান আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহে পরিপূর্ণ হয়ে থাকে এবং তারা তাক্বওয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেন। এর সর্বোত্তম উদাহরণ হচ্ছে মহানবী (সা.)-এর সত্তা। কে বা কারা আল্লাহ্ তা’লার ওলী হবার সবচেয়ে যোগ্য হন এবং কিভাবে এ পদমর্যাদা অর্জন করা যায় সে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

হযরত আমর বিন আল্ জমুহ্ (রা.) বর্ণনা করেন:

আ‏মি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত খাঁটি ঈমানের অধিকারী হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে কেবল আল্লাহ্‌র জন্য কারো প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আর আল্লাহ্‌র জন্যই কাউকে ভালবাসে। যতক্ষণ সে আল্লাহ্ তা’লার জন্য কাউকে ভালবাসে এবং আল্লাহ তা’লার জন্যই কারো সাথে বৈরিতা রাখে, তখন সে আল্লাহ্‌র সাথে বন্ধুত্ব রাখার যোগ্য হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, আমার বান্দাদের মাঝে আমার আওলীয়া (বন্ধু) এবং সৃষ্টির মাঝে আমার প্রেমাস্পদ তারা যারা আমাকে স্মরণ রাখে আর আমিও তাদের স্মরণ রাখি।’

(মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল)

অতএব, উক্ত হাদীসে বিশুদ্ধ ও খাঁটি ঈমানের এই চিহ্ন বর্ণনা করা হয়েছে - অর্থাৎ বান্দার প্রতিটি কর্ম এমন কি পারস্পরিক ভালবাসা ও ঘৃণা সবই খোদা তা’লার ভালবাসা ও সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে।

আরেকটি হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন:

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ্‌ তা’লা তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় পছন্দ করেছেন এবং তিনটি বিষয়কে অপছন্দ করেছেন। তিনি তোমাদের পক্ষ থেকে যা পছন্দ করেছেন তা হলো, তোমরা তাঁর ইবাদত করো, কোন জিনিসকে তাঁর সাথে শরীক করবে না এবং যাকে আল্লাহ্ তা’লা তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছেন তার শুভাকাঙ্খী হও। তোমরা সবাই আল্লাহ্‌র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, দলাদলি করো না। তিনি তোমাদের বৃথা কথাবার্তা বলা, অধিক প্রশ্ন করা এবং সম্পদের অপব্যয় অপছন্দ করেছেন।’

(মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল)

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লার ইবাদত করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। এর মধ্যে ফরয (আবশ্যক) ও নফল (ঐচ্ছিক) উভয়-ই ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর পছন্দনীয় বিষয়াবলীর মধ্য থেকে তৃতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তা হলো, তোমাদের উপর যাকে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়, তার হিতাকাঙ্খী ও মঙ্গলকামী হও।

নিযামে জামাতের পক্ষ থেকে যাদেরকে কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়, তারা সত্যিকার মু’মিনদের তত্ত্ববধায়ক। সে-ই প্রকৃত মু’মিন যে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় ও তাঁর প্রকৃত বন্ধু হতে চায়। প্রতিটি মু’মিনের দায়িত্ব হচ্ছে, তাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্য করা ও তাদের সত্যিকার হিতাকাঙ্খী হওয়া। যেখানে এ বিষয়টির প্রতি সাধারণ মু’মিনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এবং সব ধরনের অশান্তি এড়িয়ে চলার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে, সেখানে কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদেরও চিন্তা করা উচিত। তাদেরও ভয় করা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমার মঙ্গল কামনা করছে, সেখানে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তোমাদেরও ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন এবং তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করা আবশ্যক। শুধু একপক্ষ হিতাকাঙ্খী হবে অপরপক্ষ কিছুই করবে না তা সমীচিন নয়।

অতঃপর আরেকটি হাদীসে আল্লাহ্ তা’লার বান্দাদের মর্যাদার একটি চমৎকার চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেছেন,

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ্ তা’লার কতিপয় এমন বান্দা রয়েছেন যারা নবীও নয়, শহীদও নয় তা সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন নবী ও শহীদগণ আল্লাহ্ তা’লার নিকট তাদের মর্যাদার কারণে তাদেরকে ইর্ষা করবেন। (এ কথা শুনে) সাহাবাগণ নিবেদন করলেন, “হে আল্লাহ্‌র রসূল! আপনি কি আমাদেরকে অবগত করবেন - তারা কারা”, মহানবী (সা.) বললেন, “শুধু আল্লাহ্ তা’লার রহমতের কারণে যখন কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সাথে ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপন করে, আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে নয় আর এমন সম্পদের কারণেও নয় যা তারা একে অপরকে দিয়ে থাকে। আল্লাহর কসম! তাদের চেহারা হবে জ্যোতির্ময় এবং অবশ্যই তারা জ্যোতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। মানুষ যখন ভীতস্ত্রস্ত থাকবে তখন তাদের কোন ভয় থাকবে না, যখন মানুষ দুঃচিন্তাগ্রস্ত থাকবে তখন তাদের কোন চিন্তা অবশিষ্ট থাকবে না”। অতঃপর মহানবী (সা.) এ আয়াত পাঠ করেন, اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِيَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ

(সূনান আবু দাউদ)

মোটকথা, তারা আল্লাহ্‌র ওলী যাদের উঠা-বসা, চলা-ফিরা সবকিছুই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে। খোদা তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তারা যখন সব ধরনের পুণ্যকাজ সম্পাদন করে, তখন নিশ্চয় এমন লোকদের ব্যাপারে নবীরাও ইর্ষা বোধ করেন। এই ঈর্ষা এজন্য যে, আল্লাহ্ তা’লা তাঁদের আনুগত্যকারীদের মধ্যে এমন লোক সৃষ্টি করেছেন যারা পুণ্যের পরম মার্গে উপনীত হয়েছে।

আরেকটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন, لَهُمُ الْبُشْرٰى فِىْ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَفِىْ الْاٰخِرَةِ‌ এখানে الْبُشْرَى দ্বারা সত্যস্বপ্ন বোঝানো হয়েছে। অনেক সময় এমন স্বপ্ন মু’মিন নিজের ব্যাপারে নিজেই দেখে থাকে অথবা তার ব্যাপারে অন্য কেউ দেখে। এভাবে একটি বর্ণনায় আছে, যখন মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, পরকালের সুসংবাদ হল জান্নাত বা স্বর্গ, এ জগতের সুসংবাদ কি? মহানবী (সা.) বলেন, সত্য স্বপ্ন; যা বান্দা দেখে থাকে, অথবা তার ব্যাপারে অন্যদেরকে দেখানো হয়। এ সব সত্য স্বপ্নে পুরষ্কারের সুসংবাদ প্রদান করা হয়ে থাকে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘অর্থাৎ বিশ্বাসীরা পার্থিব জীবনে এবং পরকালেও সুসংবাদের নিদর্শন পেতে থাকবে। যার মাধ্যমে তারা ইহ ও পরকালে তত্ত্বজ্ঞান এবং ভালবাসার ক্ষেত্রে সীমাহীন উন্নতি করবে। এগুলো খোদার কথা, যা কখনো বৃথা যাবে না। সুসংবাদের নিদর্শন লাভ করাই মহা সফলতা অর্থাৎ, এটি এমন এক বিষয় যা ভালবাসা এবং তত্ত্বজ্ঞানের সুউচ্চ মার্গে পৌঁছে দেয়।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তৃতীয় খন্ড - পৃ: ৬৭৮)

খোদা তা’লা আমাদেরকে এ সূক্ষ্ম বিষয়টি অনুধাবন করার তৌফীক দান করুন এবং আমরা যেন ঈমান এবং তাক্বওয়ার সেই মানে উন্নীত হই যেখানে খোদা সম্পর্কে তত্ত্বজ্ঞান এবং ভালবাসায় আরো অগ্রসর হওয়া যায়। আমরা যেন খোদার সন্তুষ্টির স্বর্গ অর্জন করতে সক্ষম হই। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সব ভয়-ভীতিকে নিরপত্তায় পরিবর্তন করে দিন এবং আমাদের পাপ ও ভুল-ভ্রান্তিকে স্বীয় রহমতের চাদরে ঢেকে দিয়ে আমাদেরকে দুঃচিন্তামুক্ত করুন। (আমীন)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে