In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্‌-ওলী’ (অভিভাবক ও সাহায্যকারী) - তৃতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৬ই নভেম্বর, ২০০৯ইং

তাহরীকে জাদীদের ৭৬তম নববর্ষের ঘোষণা এবং আহমদীদের দায়-দায়িত্বের প্রতি জোড়ালো আহবান

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ‌ؕ وَلَوْ اٰمَنَ اَهْلُ الْكِتٰبِ لَڪَانَ خَيْرًا لَّهُمْ‌ؕ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ وَاَكْثَرُهُمُ الْفٰسِقُوْنَ‏

অর্থ: ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাকে মানব জাতির কল্যাণের জন্য উত্থিত করা হয়েছে; তোমরা ন্যায় সঙ্গত কাজের আদেশ দাও এবং অসঙ্গত কাজ হতে বারণ করে থাক, এবং আল্লাহ্‌তে ঈমান রাখো। এবং যদি আহলে কিতাব ঈমান আনতো তাহলে নিশ্চয় এটি তাদের জন্য উত্তম হতো। বস্তুত: তাদের মধ্যে কতক মু’মিন এবং তাদের অধিকাংশই দুস্কৃতিপরায়ণ।’

(সূরা আল্ ইমরান: ১১১)

হুযূর বলেন, আজ আমি উক্ত আয়াতের প্রথমাংশ অর্থাৎ,

كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ‌ؕ وَلَوْ اٰمَنَ اَهْلُ الْكِتٰبِ لَڪَانَ خَيْرًا لَّهُمْ‌ؕ

- সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করবো।

এ অংশে মুসলমান হবার গুরুত্ব ও উদ্দেশ্যাবলীর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে। মুসলমান হওয়া একটি অনেক বড় বিষয়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। একজন মুসলমান মহানবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনার পর ঐ সর্বশেষ শরিয়তের উপর ঈমান আনে যা পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। আর পবিত্র কুরআন আকারে সেই শরিয়ত গ্রন্থ নাযিল করে খোদা তা’লা এ ঘোষণা দিয়েছেন: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ অর্থাৎ, নিশ্চয় আমরা এই যিক্‌র অর্থাৎ কুরআনকে নাযিল করেছি, আর আমরাই এর সংরক্ষণ করবো।

অতএব, খোদার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আজ পর্যন্ত কুরআনরূপী এই শরিয়ত অপরিবর্তিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। আর আজ পর্যন্ত আমরা খোদা তা’লার প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ হতে দেখছি। এ অনন্য গৌরব আজ ধর্মীয় জগতে শুধুমাত্র ইসলামেরই এবং শেষ দিন পর্যন্ত এই গৌরব ইসলামের হাতেই থাকবে।

আল্লাহ্ তা’লা যখন মুসলমানদেরকে ‘খায়রে উম্মত’ বলেছেন - তখন একজন মুসলমান বা দলবদ্ধভাবে উম্মতে মুসলিমা ‘খায়রে উম্মত’ হবার ক্ষেত্রে কি ভূমিকা রেখেছে? তা আমাদের চিন্তা করতে হবে। আল্লাহ্ তা’লা একজন মু’মিনের কাছ থেকে এটিই প্রত্যাশা করেন যে, ঈমান আনার পর সে সৎকর্মশীল হবে এবং সৎকর্মের আদেশ দিবে। উক্ত আয়াতটি একজন মুসলমানের উপর কতক দায়িত্বও অর্পণ করে, আর সে দায়িত্বের কথাই এ আয়াতের অপরাংশে আল্লাহ্ তা’লা বর্ণনা করেছেন। আর বলেছেন, এই দায়িত্বাবলী পালন করার কারণেই তোমরা ‘খায়রে উম্মত’ হয়েছো। যতদিন তোমরা এই দায়িত্বাবলী পালন করতে থাকবে, ততদিন তোমরা ‘খায়রে উম্মত’ বলে বিবেচিত হবে।

এরপর বলা হয়েছে, ‘উখরিজাত লিন্নাস’ অর্থাৎ, তোমাদেরকে কোন বিশেষ জাতি বা মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় হলো - ‘তা’মুরুনা বিল মা’রুফ’ অর্থাৎ তোমরা ভাল ও পুণ্যকর্মের আদেশ দাও, এটি গোটা উম্মতের দায়িত্ব। এরপর খোদা তা’লা বলেন, ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকার অর্থাৎ তোমরা ‘খায়রে উম্মত’ এজন্য তোমরা মন্দ থেকে মানুষকে বিরত রাখো এবং তোমরা আল্লাহ্‌র প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখো।

হুযূর বলেন, ইতিহাস এ বিষয়ের সাক্ষী; ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা ‘খায়রে উম্মত’ হবার বিষয়টি পৃথিবীতে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। রাজ্য চালাতে গিয়ে ধর্মকে বিশেষায়িত না করে একদিকে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর পাশাপাশি জ্ঞানের আলোয় জগতকে উদ্ভাসিত করেছে। একদিকে ইসলামের অনুপম শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে জগতকে এর আওতায় নিয়ে এসেছে, অপরদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন পথও উন্মোচন করেছে। মোটকথা মানবকল্যাণে যা কিছু তাদের সামর্থ্যে ছিল, তা তারা করেছে। পরবর্তিতে কিছু লোক নিজেদের লোভ-লালসা এবং ব্যক্তি-স্বার্থকে চরিতার্থ করতে গিয়ে, নিজেদেরকে ‘খায়রে উম্মত’ হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। কিন্তু খোদা তা’লা যখন পবিত্র কুরআনের শিক্ষাকে সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তখন এ কিতাবে বর্ণিত শিক্ষাকে কল্প-কাহিনীর আকারে সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন নি, বরং এমন জামাত বা দল সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন যারা কুরআনের শিক্ষার উপর নিরবধি আমল করবে। যেন উম্মতে মুসলিমাহ্ পুনরায় ‘খায়রে উম্মত’ (সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত) হবার গৌরবে গৌরবাহ্নিত হয়ে জগতে পুনঃ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পুণ্য কর্মের উপদেশ দান করতে থাকবে, ইসলামের বাণী পৃথিবীর প্রান্তে-প্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। মন্দকে ঘৃণার সাথে পরিহার করবে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার সেবায় আত্মনিবেদিত থাকবে।

হুযূর বলেন, এই মহৎ কর্ম সম্পাদনের জন্য আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মহানবী (সা.)-এর নিষ্ঠাবান প্রেমিককে পৃথিবীতে প্রেরণ করছেন যেন সুরাইয়া নক্ষত্র থেকে পুনরায় ঈমানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনেন, আবার ইসলামের শান ও শওকত এই ধরার বুকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। আর সর্বোত্তম ধর্ম - ইসলাম এবং মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হবার মহিমা ও গৌরবকে পুনরায় বিশ্বের দরবারে সূর্যের আলোর ন্যায় উদ্ভাসিত করেন। অতএব আজ একমাত্র হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাত-ই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হবার সম্মান ও গৌরব অর্জন করেছে।

হুযূর বলেন, সম্প্রতী আমি একটি ইসলামিক টিভি চ্যানেলে দেখেছি, একজন শিয়া আলেম এবং একজন সুন্নী আলেম খতমে নবুয়ত সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন। কিন্তু শিয়া আলেম নিজের মতবাদের ভিত্তিতে কোন কথা বললে সুন্নী আলেম তা প্রতিহত করে বলছিলেন, এটা এভাবে নয় বরং এভাবে হবে। আবার সুন্নী আলেম নিজের মতবাদের আলোকে কথা বললে শিয়া আলেম তা খন্ডন করছিলেন, এভাবে নয় বরং ওভাবে হওয়া উচিত। মূলতঃ তারা উভয়ই আমাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে এবং তাদের মতে মুসলিম উম্মাকে ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য এসেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই পরস্পরের মধ্যে ফিতনার সৃষ্টি করছিলেন।

মহানবী (সা.)-এ সমস্যার যে সমাধান দিয়েছেন তার উপর যদি আমল করা হয় তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। হুযুর (সা.) বলেছেন, তোমরা যখন বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে যাবে তখন খোদা তা’লা প্রতিশ্রুত মসীহ্‌কে প্রেরণ করবেন। তোমরা তাঁর হাতে বয়’আত করো এবং তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দিও; বরফের পাহাড়ের উপর হামাগুড়ি দিয়ে যদি যেতে হয় তবুও যাবে এবং তাঁকে আমার সালাম পৌঁছাবে এবং তাঁর জামাতে শামিল হয়ে যাবে। তিনিই হাকাম ও আদ্‌ল (ন্যায় বিচারক) হবেন, তিনিই প্রকৃত মিমাংসা করবেন। তিনিই তোমাদের সঠিক ব্যাখ্যা দিবেন। তিনিই সকল ধর্মের উপর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবেন। তিনিই ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন।

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা যখন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে ইলহামের মাধ্যমে নির্দেশ দিলেন যে, পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল মুসলমানকে এক ধর্মের ছায়াতলে সমবেত করো। তাই, আজ এটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মুসলমানরা প্রথমেই সর্বশেষ শরিয়ত কুরআনের উপর ঈমান রাখে, আখেরী নবী হযরত খাতামুল আম্বিয়া মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর উপর ঈমান রাখে। নতুন আর কোন ধর্ম আসবে না এবং এটিই এমন এক ধর্ম যা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। অতএব সবাইকে এক ধর্মের ছায়াতলে সমবেত করার অর্থ কি? এটি মূলতঃ ইসলাম ধর্ম। যেখানে প্রত্যেক ফিকাহ্বিদ, প্রত্যেক ইমাম নিজ-নিজ অনুসারীকে ভিন্ন-ভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত করেছে। আর যুগ ইমাম যিনি মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয়ে প্রেরিত হয়েছেন, এবং যাঁকে ন্যায় বিচারক বানিয়ে আল্লাহ্ তা’লা প্রেরণ করেছেন। তিনিই হচ্ছেন ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের সঠিক তফসীর কারক। বিগত তের শতাব্দীতে জন্ম গ্রহণকারী যত আলেম, ফিকাহ্বিদ, মুজাদ্দিদ এবং তফসীরকারক আছেন, তারা নিজেদের সামর্থ ও জ্ঞানানুসারে (উদ্ভুত সমস্যার) যে সমাধান দিয়েছেন এবং তফসীর লিখেছেন, সেগুলো হতে আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে প্রেরিত এই ‘খাতামুল খুলাফা’ ও ন্যায় বিচারক যা সত্যায়ন করবেন তাই সঠিক তফসীর এবং প্রকৃত বলে বিবেচিত হবে।

অতএব এসব পুণ্যকর্মের বিস্তার এবং মন্দকে প্রতিহত করার জন্য জামাতবদ্ধভাবে কুরবানীর প্রেরণা থাকতে হবে। নিজেদের কাজ ও কথাকে নির্দিষ্ট মানদন্ডে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং নিজেদের সম্পদকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লা এ সম্পর্কে বলেন:

الَّذِيْنَ اِنْ مَّكَّنّٰهُمْ فِىْ الْاَرْضِ اَقَامُوْا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَاَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ‌ؕ وَلِلّٰهِ عَاقِبَةُ الْاُمُوْرِ‏

অর্থ: যাদেরকে আমরা ভূপৃষ্ঠে ক্ষমতা দিয়েছি তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয়, পুণ্য কাজের নির্দেশ দেয়। মন্দ জিনিষ থেকে বিরত রাখে। বস্তুতঃ প্রত্যেক কর্মের পরিণাম খোদা তা’লার ইচ্ছাধীন।

(সূরা আল্ হাজ্জ্: ৪২)

এ আয়াতটিকে যদি আয়াতে ইস্তেখলাফ এর সাথে মিলিয়ে পর্যালোচনা করা হয় যেখানে খোদা তা’লা খিলাফতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে আল্লাহ্ তা’লা ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীলদেরকে খিলাফতের পুরস্কারের পাশপাশি শক্তি যোগানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

অতএব, যখন একজন মানুষ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর হাতে বয়’আত করে তার জন্য প্রথম সুসংবাদ হচ্ছে, সে খাতামুল খলীফার (সর্বশ্রেষ্ঠ খলীফা) হাতে বয়’আত করে এরং পরবর্তীতে নিযামে খিলাফতের প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর আনুগত্যের কারণে সে শক্তি লাভ করে। আর এটি-ই পরে তাকে সর্বোর্ত্তম উম্মতে পরিণত করে। এখন এই দায়িত্ব পালনের জন্য নামায প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। আর্থিক কুরবানী করে নিজ ধন-সম্পদকে পবিত্র করা প্রয়োজন। এছাড়া পুণ্যকর্মের নির্দেশ দেয়ারও আদেশ রয়েছে।

হুযূর বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্যই সর্বদা ঐশী জামাত আর্থিক কুরবানী করে, আর যারা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে জামাতের কাজে সময় দিতে পারেন না তারা আর্থিক কুরবানীর মাধ্যমে এ মহৎ কর্মে অংশ নেয়। মহানবী (সা.)-এর যুগেও প্রয়োজনানুসারে আর্থিক কুরবানীর নির্দেশ ছিলো। এ জন্য পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ইবাদতের পাশাপাশি আর্থিক কুরবানীর উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মহানবী (সা.)-এর খলীফাগণ, যাদেরকে খুলাফায়ে রাশেদীন বলা হয়, তাঁরাও আর্থিক কুরবানীর জন্য উম্মতের মাঝে তাহরীক (আহ্বান) করেছেন।

আবার হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আ.)-এর যুগেও এ কুরবানীর ধারা প্রবহমান ছিলো, তাঁর পরে প্রত্যেক খিলাফতের যুগে আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় জামাত আর্থিক কুরবানীতে অংশগ্রহণ করছে। জামাতের ধন-সম্পদ ও শক্তি-সামর্থ্য যত বৃদ্ধিই পাক না কেনো, ইনশাআল্লাহ্ এ ধারা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে; কেননা আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে আত্মশুদ্ধির জন্য আর্থিক কুরবানীকে আবশ্যকীয় আখ্যা দিয়েছেন।

যেভাবে আমি বলেছি জামাতে আর্থিক কুরবানীর ব্যবস্থা হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর যুগ থেকেই চলে আসছে। চাঁদা আম, সালানা জলসা, ওসীয়্যত ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন তাহরীক রয়েছে। এর মাঝে একটা চিরস্থায়ী তাহরীক হলো তাহরীকে জাদীদ। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) এটি প্রবর্তন করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ভারতের বাহিরে বহিঃর্বিশ্বে ইসলামের প্রচার ও প্রসার করা। আজ আল্লাহ তা’লার অপার কৃপায় পৃথিবীর ১৯৩টি দেশে আহমদীয়া জামাত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

হুযূর বলেন, আজ থেকে কয়েক বৎসর পূর্বেও শুধুমাত্র রাবওয়ার জামেয়া আহমদীয়াতে মুরব্বীরা শিক্ষা গ্রহণ করতেন। আর প্রতি বছর জীবনোৎসর্গ করে মাত্র ৩০-৩৫ জন ছাত্র এতে ভর্তি হতো। যখন থেকে ওয়াক্‌ফে নও সন্তানরা বড় হতে শুরু করেছে, গত প্রায় তিন বছর থেকে জামেয়া আহমদীয়া রাবওয়ায় প্রতি বছর দু’শতাধিক ছাত্র ভর্তি হচ্ছে। এত্থেকে পরিস্কার বুঝা যায়, এ ব্যবস্থাপনার জন্য খরচের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে পাকিস্তানের জামাত নিজেই তাদের খরচ বহন করছে। এভাবে এখন যুক্তরাজ্য, জার্মানী, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশেও জামেয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এ দেশগুলো স্বয়ং জামেয়ার পুরো ব্যয়ভার বহন করছে।

কিন্তু বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানাসহ আরও কয়েকটি দেশের জামেয়া আহমদীয়ার ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্র থেকে সাহায্য করতে হয়। এছাড়াও আরও কিছু ব্যয় রয়েছে, যেমন বই পুস্তক ছাপানো। দরিদ্র দেশসমূহে মসজিদ ও মিশন হাউস নির্মাণ ব্যয়। মুবাল্লেগ প্রেরণ ও তাদের ভাতা প্রদান এবং আরও বিভিন্ন কাজের ব্যয়ভার কেন্দ্রকেই বহন করতে হয়, যাতে ‘তাহরীকে জাদীদ’ এর চাঁদার বড় ভূমিকা রয়েছে। অতএব, এ চাঁদায় অংশ গ্রহণের মাধ্যমে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, মোটকথা সকল শ্রেণীর আহমদী এ গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহযোগী হয়ে যায় আর তারা নির্দিধায় বলতে পারে, আমরা সেই উম্মত যারা পুণ্য কাজে উৎসাহ দানকারী ও মন্দ কাজে বাঁধা প্রদানকারী। একজন আহমদী, তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, ফ্রান্স বা ইউরোপের কোন দেশে অথবা পৃথিবীর যে দেশে থেকেই কুরবানী করুক না কেন তা হয়তো আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন পুণ্যাত্মা ব্যক্তির তরবিয়তে ব্যবহৃত হচ্ছে, মন্দ ও অনিষ্ট রোধ কল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হুযূর বলেন, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, প্রত্যেক জাতিতে এমন কিছু লোক থাকতে হবে, যারা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে মানুষকে আল্লাহ্‌র দিকে আহবান করবে। আর্থিক কুরবানীকারী আহমদীগণ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনকারী এসব লোকদের ব্যয় নির্বাহে অংশগ্রহণ করে তাদেরকে সেই পুণ্যের অংশীদার করছে, যা মানুষকে ধর্মের প্রতি আহবানকারীরা লাভ করে থাকেন। অতএব একজন আহমদীর এসব কুরবানী ‘তা’মুরুনা বিল মা’রুফে ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকারে’ অর্থাৎ, তোমরা পূণ্য কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজে বাধা দাও - এর বাস্তবায়নের পরিধি বিস্তৃত করতে থাকে।

এরপর হুযূর বিস্তারিতভাবে তাহরীকে জাদীদের ৭৫তম বছর সমাপনান্তে এবং রীতি অনুযায়ী নভেম্বরের প্রথম জুমুআয় তাহরীকে জাদীদের ৭৬তম বর্ষের ঘোষণা করেন। বিগত অর্থ বছরে আর্থিক দিক থেকে আল্লাহ্ তা’লা জামাতের প্রতি যে আশিস বর্ষণ করেছেন তা দেখে একজন মু’মিনের উচিত আল্লাহ্ তা’লার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। গত বছর অর্থনৈতিক ভাবে বিশ্বে চরম মন্দাবস্থা বিরাজ করেছে। স্বাভাবিক ভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর এর মন্দ প্রভাব পড়েছিল। চাকুরী থেকেও বহু লোককে ছাটাই করা হয়েছে। দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাংসারিক খরচও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চাঁদার উপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক ছিলো বলেই মনে হয়। কিন্তু মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই প্রিয় জামাত সর্বোত্তম উম্মত হবার এমন দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে যে, হৃদয় আল্লাহ্ তা’লার প্রসংশায় ভরে যায়।

রিপোর্ট অনুযায়ী আল্লাহ্ তা’লার ফযলে এ বছর বিশ্বব্যাপী আহমদীয়া জামাত সমূহ তাহরীকে জাদীদ খাতে উনপঞ্চাশ লক্ষ তিপ্পান্ন হাজার আটশত পাউন্ড আর্থিক কুরবানী করেছে, আলহামদুলিল্লাহ্।এখাদার অপার কৃপায় গত বছরের তুলনায় এ বছর আট লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড বেশি আদায় হয়েছে। আদায়ের দিক থেকে প্রথম সারির দশটি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের নাম সর্বাগ্রে রয়েছে। দারিদ্রতা সত্ত্বেও তারা তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আমেরিকা, তৃতীয় স্থানে জার্মানী, চতুর্থ ইংল্যান্ড এরপর যথাক্রমে কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, ইন্ডিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড।

গত বছর আমি নতুন মুজাহিদদের তাহরীকে জাদীদের চাঁদায় অংশগ্রহণ করানোর জন্য জামাতের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলাম, শিশু সন্তানদের অংশ গ্রহণ আরো বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম এছাড়া কেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রত্যেক দেশের জন্য লক্ষ্যও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিলো। জামাত সে লক্ষ্য পূরণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে, আর আল্লাহ্ তা’লার ফযলে গত বছর পর্যন্ত যারা শামিল হয়েছিলেন তারা ছাড়াও এবছর আরো নব্বই হাজার নতুন চাঁদা দাতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এখন সব মিলিয়ে এ খাতে মোট চাঁদা দাতার সংখ্যা পাঁচ লক্ষ তিরানব্বই হাজার।

হুযূর বলেন, একজন সাধারণ কুরবানীকারী দরিদ্র ব্যক্তি আর এক শিশু যে সামান্য পরিমাণ অর্থ নিজের পকেট খরচ থেকে দান করে, সে এই কুরবানীর কারণে - ইসলাম প্রচার, বিভিন্ন দেশে মসজিদ নির্মাণ, পুণ্য কর্মের বিস্তার এবং মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখার মত মহৎকর্মে অংশীদার হতে থাকবে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের এবং আমাদের বংশধরদের মাঝে কুরবানীর স্পৃহা সর্বদা জারী রাখুন। আর আমরা যেন আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করে তাঁর নিয়ামত সমূহের অংশীদার হতে থাকি, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে