In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্-ওলী’ (অভিভাবক ও সাহায্যকারী) – দ্বিতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৩০শে অক্টোবর, ২০০৯ইং

আল্লাহ্ তা’লার ‘ওলী’ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আভিধানিকগণ আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘ওলী’-র বরাতে যে সব আয়াতের উল্লেখ করেছেন, গত খুতবায় আমি তার কয়েকটি উল্লেখ করেছিলাম। আজও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তফসীরের আলোকে এমন কয়েকটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো যেখানে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর গুণবাচক নাম ‘ওলী’-র উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা মু’মিন ও অ-মু’মিন, উভয় প্রকার লোকদেরকেই শুধু তাঁর গুণবাচক নামের বরাতে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নি, বরং কাফিরদেরকেও সতর্ক করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

لَهٗ مُعَقِّبٰتٌ مِّنْۢ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهٖ يَحْفَظُوْنَهٗ مِنْ اَمْرِ اللّٰهِ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّٰى يُغَيِّرُوْا مَا بِاَنْفُسِهِمْ‌ؕ وَاِذَاۤ اَرَادَ اللّٰهُ بِقَوْمٍ سُوْۤءًا فَلَا مَرَدَّ لَهٗ‌ۚ وَمَا لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ مِنْ وَّالٍ‏

অর্থ: ‘তার জন্য তার সামনে ও পিছনে সার্বক্ষনিক রক্ষী নিযুক্ত আছে, যারা আল্লাহর আদেশে তাকে রক্ষা করে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’লা কোন জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অন্তরের অবস্থার পরিবর্তন করে। আল্লাহ্ যখন কোন জাতির জন্য মন্দ পরিণামের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, কোনক্রমেই তা রহিত করা হয় না; এবং তাদের জন্য তিনি ছাড়া অন্য কোন সাহায্যকারী নেই।’

(সূরা আর্ রা’দ: ১২)

হুযূর বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা চারটি বিষয় বর্ণনা করেছেন। প্রথমতঃ আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেককে নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি নিজের হাতে রেখেছেন। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্ তা’লা কোন জাতির অবস্থা সম্পর্কে তাদের কর্মের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তৃতীয়তঃ আল্লাহ্ তা’লা যখন কোন ব্যক্তিকে শাস্তিযোগ্য বলে সাব্যস্ত করেন, তখন তা প্রতিহত করা যায় না। চতুর্থতঃ আল্লাহ্ তা’লা-ই প্রকৃত অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষাকর্তা এবং সাহায্যকারী। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ আয়াতাংশ, لَهٗ مُعَقِّبٰتٌ مِّنْۢ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهٖ يَحْفَظُوْنَهٗ مِنْ اَمْرِ اللّٰهِ‌ؕ সম্বন্ধে বলেন,

‘আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ হতে পাহারাদার নির্ধারন করা রয়েছে, যারা তাঁর বান্দাদেরকে সবদিক থেকে, অর্থাৎ বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকেই রক্ষা করে থাকেন।’

সর্বপ্রথম কাকে বা কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়? আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রেরিতগণের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আল্লাহ্ তা’লার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বলে যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তিনি ছিলেন মহনবী (সা.)। মহানবী (সা.)-এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ তা’লা এমনভাবে তাঁর সুরক্ষা করেছেন যা অতুলনীয়। এজন্যই হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) তাঁর তাফসীরে لَهٗ مُعَقِّبٰتٌ অর্থাৎ, তার জন্য পাহারাদার নিযুক্ত রয়েছে - সম্বন্ধে বলেছেন, لَهٗ -র যমীর (অর্থাৎ ‘তাঁর’ সর্বনামটি) মহানবী (সা.)-এর সত্তার প্রতি ইঙ্গিত করছে।

হুযূর বলেন, মহানবী (সা.) যখন দাবীর পর মক্কায় জীবনযাপন করেছেন, তখন আল্লাহ্ তা’লা সর্বাবস্থায় তাঁকে কীভাবে রক্ষা করেছেন, তা ইসলামের ইতিহাস হতে সবার কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট। সূরা রা’দ-এর যে আয়াতটি আমি পাঠ করেছি তা মহানবী (সা.)-এর প্রতি মক্কায় এমন পরিস্থিতিতে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন চারিদিকে চরম শত্রুতা বিরাজ করছিল। কিন্তু, আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় অঙ্গীকার অনুযায়ী সেই ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ অবস্থাতেও মহানবী (সা.)-এর এমন নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন যে, শত্রুদের সকল উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বদরের যুদ্ধে আমরা বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে পেয়েছি।

একটি বর্ণনায় এসেছে যে,

‘আমের ইবনে তোফায়েল নামের একজন সর্দার (নেতা) ছিল, সে মহানবী (সা.) কে বললো, আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই তবে আপনার পরে কি আমি খিলাফত পাব? মহানবী (সা.) বললেন, এই শর্তারোপকারী এবং তার জাতি কখনোই খিলাফত পেতে পারে না। এতে সে অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, আমি এমন বাহিনী নিয়ে আসবো ও আপনাকে এমন শিক্ষা দিব, যা আপনি সব সময় স্মরণ রাখবেন (নাউযুবিল্লাহ)। মহানবী (সা.) বললেন, খোদা তা’লা তোমাকে কখনই এমন সুযোগ দিবেন না। মোটকথা, সে তার সঙ্গী’কে নিয়ে রাগান্বিত হয়ে ফিরে গেল। রাস্তায় তার সাথী তাকে বলল - আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এসেছে, চল আমরা ফিরে যাই; আমি মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে কথা বলতে থাকবো আর তুমি তাঁকে তরবারি দিয়ে শেষ করে দিবে। মনে হয় আমের কিছুটা সতর্ক ও বুদ্ধিমান ছিল, সে বলল, এতে অনেক বিপদও আছে, কেননা হুযূর (সা.)-এর সাহাবীরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। তখন তার সাথী, যে খুবই দুষ্ট প্রকৃতির ছিল, সে বলল, আমরা দিয়াত (রক্তপন) দিয়ে দিব। সুতরাং সে তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে আবার ফিরে আসল। আমেরের সাথী রসূল (সা.)-এর সাথে কথা বলতে শুরু করলো আর আমের তরবারি বের করে পিছনে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হুযূর (সা.) উপর আক্রমন করতে পারলো না। আল্লাহ্ তা’লা তার হৃদয়ের উপর মুহাম্মদ (সা.)-এর এমন প্রভাব ফেলেছিলেন যে, সে তরবারি নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো, কিন্তু আক্রমন করতে পারল না। মহানবী (সা.) যখন পিছনে ফিরে দেখলেন এবং বুঝতে পারলেন, তখন তিনি এক পাশে সরে গেলেন। এরপর তারা দু’জন চুপ-চাপ সেখান থেকে চলে গেল। তিনি (সা.) তাদের যেতে দিলেন, কিছুই বলেন নি। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা একদিকে মহানবী (সা.)-এর সুরক্ষা করলেন এবং অপরদিকে সেই দু’জনের উপর প্রতিশোধ নিলেন। রাস্তায় তার (আমের এর) সাথীর উপর বজ্রপাত হল এবং সে মারা গেল। আমের-এর সম্পর্কে এসেছে যে, তার একটি ফোঁড়া উঠেছিল, আর তাতেই সে ধ্বংস হয়ে গেল।’

হুযূর বলেন, এটি হচ্ছে একটি মাত্র উদাহরণ, সুরক্ষা নিশ্চিত করার এমন অনেক ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনে দেখতে পাই। মদীনায় এসে পুনরায় হুযুর (সা.)-কে আশ্বস্ত করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা’লা মক্কায় প্রদত্ত সেই নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পুনঃব্যক্ত করেছেন,

وَاللّٰهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ‌ؕ

অর্থ: আল্লাহ্ তা’লা লোকদের আক্রমণ থেকে তোমাকে নিরাপদ রাখবেন।

(সূরা আল্ মায়েদা: ৬৮)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘কারো হাতে মহানবী (সা.) মৃত্যু বরণ না করাও একটি মহান মো’জেযা বা অলৌকিক নিদর্শন। এটি পবিত্র কুরআনের সত্যতার প্রমাণ। কেননা কুরআন শরীফে এ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, وَاللّٰهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ‌ؕ এবং পূর্বের গ্রন্থাবলীতে এই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, শেষ যুগের নবী কারো হাতে নিহত হবেন না।’

হুযূর (আই.) বলেন, এ যুগে আমরা দেখেছি আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতার নিদর্শন হিসেবে যখন প্লেগের নিদর্শন দেখালেন, পাশাপাশি তাঁকে ও তাঁর নিষ্ঠাবান মান্যকারীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যখন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে টিকা দেয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, সে সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ অনুগ্রহশীল সরকারের সেবায় নিবেদন করছি, যদি আমাদের জন্য এক ঐশী বাঁধা না থাকতো তবে প্রজাদের মধ্যে সর্বাগ্রে আমরা টিকা দিতাম। ঐশী বাঁধা হলো, আল্লাহ্ তা’লা চাচ্ছেন এই যুগে মানুষকে যেন রহমতের এক নিদর্শন দেখান। সুতরাং তিনি আমাকে সম্বোধন করে বলেছেন, তুমি এবং যে ব্যক্তি তোমার ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অবস্থান করবে এবং যারা পরিপূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্য এবং সত্যিকার খোদাভীতির সাথে তোমার মধ্যে বিলীন তাদের সবাইকে প্লেগ থেকে বাঁচানো হবে। এটি এই শেষ যুগে খোদা তা’লার নিদর্শন হবে।’

(কিশতিয়ে নূহ্)

বিশ্ববাসী দেখেছে, কীভাবে ব্যাপকহারে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং কয়েক বছর পর্যন্ত এর জীবানু বিস্তার লাভ করা সত্ত্বেও, আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুকম্পায় আহমদীরা সুরক্ষিত ছিল।

আবার এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

اِنَّ اللّٰهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّٰى يُغَيِّرُوْا مَا بِاَنْفُسِهِمْ‌

অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা কখনও কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ তারা স্বয়ং নিজেদের অভ্যন্তরীন অবস্থার পরিবর্তন না করে।

(সূরা আর্ রা’দ: ১২)

এর অর্থ হলো, আল্লাহ্ তা’লা পুণ্যের ক্ষেত্রে নিজ ব্যবহার পরিবর্তন করেন না। পুণ্যবানরা সর্বদা তাঁর কল্যাণরাজি পেতে থাকে। যতক্ষণ তারা সৎকর্ম করে, খোদা তা’লার নির্দেশানুসারে কাজ করে, যতক্ষণ তারা আল্লাহ্‌র অধিকার প্রদান করে, আর বান্দার প্রাপ্য অধিকারও স্বাচ্ছন্দ্যে দিতে থাকে, যতক্ষণ তারা দলবদ্ধভাবে পুণ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহে তারা এবং তাদের জামাত উভয়ই আল্লাহ্ তা’লার আশিসের উত্তরাধিকারী হতে থাকবে।

আল্লাহ্ তা’লার কৃপা, দয়া ও তাঁর পুরস্কার হতে মানুষ তখনই বঞ্চিত হতে শুরু করে যখন তারা আল্লাহ্ তা’লাকে অভিভাবক বানানোর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবক বানাতে আরম্ভ করে। পুণ্যকাজ কমতে শুরু করে। যুলুম বৃদ্ধি পেতে থাকে। পৈশাচিকতা জন্ম নিতে শুরু করে। অধিকার খর্ব হতে শুরু করে। সরকারী কর্মকর্তারা ঘুষ ও অবিচারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করতে আরম্ভ করে। প্রত্যেক ব্যক্তি অন্যের ধন-সম্পদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি রাখে। ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যকে খুন করে থাকে। সে সময় আল্লাহ্ তা’লা পুনরায় তাঁর শান্তি ও সুরক্ষার ব্যবস্থা উঠিয়ে নেন।

মোটকথা, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা স্বয়ং নিজেদেরকে মন্দ ও খারাপ কাজে নিমজ্জিত করে, খোদা তা’লা তাদেরকে তাঁর কল্যাণরাজি হতে বঞ্চিত করেন না। এটিই আল্লাহ্ তা’লার চিরন্তন বিধান। কুরআন করীম অত্যন্ত বিশদভাবে এ বিষয়গুলো আমাদের সামনে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ্ তা’লা কোথাও একথা বলেন নি, একবার কলেমা পাঠ করলেই তোমরা চিরদিনের জন্য নিরাপদ হয়ে যাবে। উক্ত আয়াতের একাংশে আল্লাহ্ তা’লা একটি নীতিগত কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মূল শর্ত হচ্ছে, তোমরা ঈমান আনো আর সৎকর্ম করো।

সুতরাং, গোটা উম্মতের জন্য আজ এটি একটি ভাববার বিষয়। বিশেষভাবে, সেসব মুসলমান রাষ্ট্রের জন্য, যারা নির্যাতন ও অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর উক্ত আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ্ তা’লা যা বলেছেন, বর্তমানে সে সম্বন্ধেও অভিনিবেশের প্রয়োজন। বিশেষভাবে, পাকিস্তানীদের বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করা প্রয়োজন। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

وَاِذَاۤ اَرَادَ اللّٰهُ بِقَوْمٍ سُوْۤءًا فَلَا مَرَدَّ لَهٗ‌

অর্থ: যখন আল্লাহ্ তা’লা কোন জাতির মন্দ পরিণামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন কেউ তা প্রতিহত করতে পারে না।

(সূরা আর্ রা’দ: ১২)

অতএব, আল্লাহ্ তা’লার সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে পুনরায় পুন্য কাজে অগ্রগামী হওয়া উচিত।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

‘সর্বদা নিজ কৃত কর্মের ফলেই মানুষ শাস্তি পায়। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, اِنَّ اللّٰهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّٰى يُغَيِّرُوْا مَا بِاَنْفُسِهِمْ‌ অর্থ: আল্লাহ্ তা’লা কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা স্বয়ং নিজেদের অভ্যন্তরীন অবস্থার পরিবর্তন না করে। (সূরা আর্ রা’দ: ১২) লোকেরা নিজেদের অবস্থা ও কর্ম দ্বারা খোদা তা’লার ক্রোধ প্রজ্জলিত করেছে; ও মন্দকর্ম দ্বারা নিজেদের অবস্থা এমনই পরিবর্তন করেছে যে, খোদার ভয়, তাক্বওয়া ও পবিত্রতা অবলম্বনের সব পথ পরিত্যাগ করেছে। এছাড়াও প্রতি ক্ষেত্রে মন্দ ও পাপের পথ অবলম্বন করেছে, আর সম্পূর্নরূপে খোদা তা’লার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। অন্ধকার রাতের ন্যায় সমগ্র পৃথিবীতে নাস্তিকতা ছড়িয়ে পড়েছে, আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতির্ময় স্বরূপকে গহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। সেজন্য খোদা তা’লা তাদের উপর সে-ই শাস্তি অবতীর্ণ করলেন, যেন লোকেরা খোদা তা’লার স্বরূপ দেখতে পায় ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে। যে ব্যক্তি চায়, আকাশে তার ব্যাপারে গৃহীত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হোক, অর্থাৎ সে সেই শাস্তি ও দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চায়, যা কর্মের পরিনামে তার জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তার প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, নিজের পরিবর্তন ও সংশোধন করা। যখন সে স্বয়ং নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে, তখন আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় অঙ্গীকার অনুযায়ী তার উপর থেকে শাস্তি ও দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন। অতঃপর সে সৎকর্ম করার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে কল্যাণ পেতে আরম্ভ করে। আল্লাহ্ তা’লার আনুগ্রহরাজি তার উপর বর্ষিত হতে থাকে। পাপ কাজের পরিণামে তার প্রতি আল্লাহ্ তা’লার অসন্তুষ্টির যেসব প্রকাশ ঘটতে আরম্ভ হয়, তা দূর হয়ে যায়।’

এরপর আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

وَمَا لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ مِنْ وَّالٍ‏

অর্থ: আল্লাহ্ ব্যতিরেকে কোন কার্যনির্বাহক ও তত্ত্বাবধায়ক নেই।

(সূরা আর্ রা’দ: ১২)

সুতরাং, খোদা তা’লা ছাড়া কোন নিরাপত্তা দাতা ও সাহায্যকারী নেই, আর তিনিই সকল অনিষ্টের হাত থেকে বান্দাদেরকে রক্ষা করে থাকেন। তাই তাঁকে অন্বেষণ করা প্রয়োজন। দেখা প্রয়োজন যে, তিনি কি চান? তাঁকে কোথায় পাওয়া যাবে? যদি নামায পড়া সত্ত্বেও এর প্রত্যাশিত ফলাফল প্রকাশিত না হয়, যদি রোযা রাখা সত্ত্বেও জাতির অধঃপতন ঘটে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ফরজ হজ্জ্ব আদায় করা সত্ত্বেও যদি জাতীয় জীবনে উন্নতির কোন লক্ষণ দেখা না যায়, তবে এটা নিশ্চিত, এসব ফরজ কাজ সম্পাদনে কোথাও কোন ঘাটতি রয়ে গেছে। আল্লাহ্ তা’লা এ উম্মতকে এটি বোঝার ক্ষমতা দিন আর তারা খোদা তা’লার প্রতি সত্যিকার অর্থে প্রত্যাবর্তণকারী বলে গণ্য হোক।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বিষয়টিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন,

ذٰلِكَ بِاَنَّ اللّٰهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّـعْمَةً اَنْعَمَهَا عَلٰى قَوْمٍ حَتّٰى يُغَيِّرُوْا مَا بِاَنْفُسِهِمْ‌ۙ وَاَنَّ اللّٰهَ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌۙ‏

অর্থ: আল্লাহ্ তা’লা কোন জাতিকে নিয়ামত দান করার পর তা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা স্বয়ং নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। স্মরণ রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা সর্বশ্রোতা, সর্ব জ্ঞানী।

(সূরা আল্ আনফাল: ৫৪)

এ আয়াত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, আল্লাহ্ তা’লা নিয়ামত তুলে নেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে স্বয়ং নিজের অবস্থা দ্বারা নিজেকে বঞ্চিত করে। কেবল পুরনো লোকদের গল্প-কাহিনী শুনানোর জন্য আল্লাহ্ তা’লা এটি পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, এমনটি চিন্তা করা ভূল; বরং এটি মুসলমানদের সতর্ক করার জন্য এবং এ চেতনা জাগ্রত করার জন্য যে, কত বড় নিয়ামত আমরা লাভ করেছি- এর সঠিক মর্যাদা দিতে হবে। কুরআন করীমে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং এ নিয়ামত সম্বন্ধে এভাবে বলেন,

اَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِىْ

অর্থাৎ, আমি তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিয়েছি।

(সূরা আল্ মায়েদা: ৪)

অতএব, শেষ শরিয়ত গ্রন্থ কুরআন রূপে আমরা এই অমুল্য নিয়ামত লাভ করেছি, আমাদের প্রতি এর শিক্ষার উপর আমল করার নির্দেশ রয়েছে।

হুযূর বলেন, মওলানা হালী বলেছিলেন,

‘আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষ থেকে যা পেয়েছিলাম তা হারিয়ে গেছে।’

অথচ, এই সেই উম্মত যার সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন যে,

كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ

অর্থ: তোমরাই সেই উত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

(সূরা আল্ ইমরান: ১১১)

যাদেরকে অপরের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তারা স্বয়ং কেন এ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? এর কারণ, নিজেদের লোকদের শিরোচ্ছেদ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা বোমা বিষ্ফোরণ করা হয়। কাল-পরশু পেশওয়ারে বোমা ফোটানো হয়েছে। নিরাপরাধ অনেক মানুষ মারা গেছে। কোথাও আত্মঘাতি বোমা হামলা করা হচ্ছে, কোথাও ধর্মের নামে আহমদীদেরকে আক্রমনের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা হচ্ছে অথবা অন্য লোকদেরকে নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। নামধারী উলামাদের অনুসরণে এই যে কাজ করা হচ্ছে, এটি কেমন পুণ্য তা আমাদের বোধগম্য নয়। অতএব, এ ব্যাপারে চিন্তা করা প্রয়োজন, নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করা আবশ্যক। অন্যথায়, যখন আল্লাহ্ তা’লার শেষ সিদ্ধান্ত ক্রিয়াশীল হবে, তখন সে পরিণামকে প্রতিহত করার ক্ষমতা কারো থাকবে না।

হুযূর বলেন, অনেক সময় অপরের দৃষ্টান্তও সংশোধনের কারণ হয় এবং হওয়া উচিতও। তাই, আহমদীদের আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা আমাদেরকে সোজা পথে চলার সৌভাগ্য দান করেন। আমরা যেন সর্বদা আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশিত পথে চলতে পারি এবং আল্লাহ্ তা’লার কল্যাণের শুকরিয়া আদায় করি। এর ফলে আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমাদের অভিভাবক এবং সাহায্যকারী হবার দৃষ্টান্ত (আমাদেরকে) দেখাতে থাকবেন।

এরপর হুযূর বলেন, পবিত্র কুরআনে অন্যত্র আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

فَاَقِيْمُوْا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوْا الزَّكٰوةَ وَاعْتَصِمُوْا بِاللّٰهِؕ هُوَ مَوْلٰٮكُمْ‌ۚ فَنِعْمَ الْمَوْلٰى وَنِعْمَ النَّصِيْرُ

অর্থ: সুতরাং নামায প্রতিষ্ঠা করো এবং যাকাত দাও, আল্লাহ্‌কে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনি কতই না উত্তম বন্ধু আর কতই না উত্তম সাহায্যকারী।

(সূরা আল্ হাজ্জ্: ৭৯)

অতএব একজন প্রকৃত মু’মিনের জন্য নামায প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহ্ তা’লার পথে আর্থিক কুরবানী করা একান্ত আবশ্যক। কেননা নামায প্রতিষ্ঠা আর আর্থিক ত্যাগের মাধ্যমেই তাদের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধিত হবে।

এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা অন্যত্র বলেন:

اِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللّٰهُ وَرَسُوْلُهٗ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَهُمْ رٰكِعُوْنَ‏

وَمَنْ يَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ্, তাঁর রসুল এবং সে সব লোকেরা তোমাদের বন্ধু, যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ্‌র সামনে বিনয়াবনত হয়। যখন তারা আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তখন তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ্‌র দলই বিজয়ী হবে।

(সূরা আল্ মায়েদা: ৫৬-৫৭)

একটি হাদীসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,

আল্লাহ্ বলেন, ‘যে আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতার মনস্থ করেছে, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছি। আমার কাছে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় যে, আমার বান্দা আমা কতৃক ফরজ বিষয়ের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করবে। ফরজ কি? সবচেয়ে বড় ফরজ হল ইবাদত। প্রত্যেক দিনের নামায। আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। এমনকি আমি তাকে ভালবাসতে আরম্ভ করি। যখন আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যদ্বারা সে শ্রবণ করে, আমি তার চোখ হয়ে যাই যদ্বারা সে দেখে, আমি তার হাত হয়ে যাই যদ্বারা সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই যদ্বারা সে চলাফেরা করে। যদি সে আমার কাছে যাচনা করে, তবে আমি অবশ্যই তাকে দান করব। সে যদি আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দান করব। কোন কিছু করতে আমি এমন দ্বিধাগ্রস্থ হই না, যেভাবে আমি একজন মু’মিনের রুহ (প্রাণ) কবজ করতে দ্বিধাগ্রস্থ হই। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং তাকে কষ্ট দেয়া আমার কাছে অপছন্দনীয়।’

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা এভাবে নিজ বান্দার প্রতি খেয়াল রাখেন। অতএব যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌র সামনে বিনত হওয়া যায়, তাঁর প্রাপ্য তাঁকে প্রদান করা যায়, তাঁর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য করা হয়, খোদা ভীতিকে সর্বদা দৃষ্টিপটে রাখা হয় তাহলে আল্লাহ্ তা’লা এমন মানুষের বন্ধু হয়ে যান। আল্লাহ্ করুন আমরা যেন পুণ্যকর্মের দিকে অগ্রগামী হয়ে আমাদের প্রকৃত মালিক এবং প্রভুর সাথে সর্বদা সম্পর্ক বজায় রাখি। আর আমরা যেন সর্বদা আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য এবং সহযোগিতার দৃশ্য অবলোকন করতে থাকি। (আমীন)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে