In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘সাত্তার’ (পর্দা পোষণকারী) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৭শে মার্চ, ২০০৯ইং

‘খোদা তা’লার সাত্তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্বপূর্ণ আলোচনা’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তা’লার এক নাম সাত্তার, অভিধানে লেখা আছে, ‘সাত্তার’ অর্থ সেই সত্তা যিনি পর্দার আড়ালে আছেন বা যিনি লুকিয়ে আছেন। এছাড়াও, আল্লাহ্ তা’লা সম্পর্কে বলা হয় ‘ওয়াআল্লাহু সাত্তারুল উইয়ুব’। অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা’লাই সেই সত্তা, যিনি ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্বলতাকে গোপন রাখেন। আল্লাহ্ তা’লা শুধু মানুষের ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্বলতা গোপনই করেন না, বরং হাদীসে এসেছে, আল্লাহ্ তা’লা ঢেকে রাখা (দুর্বলতা) ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল এর একটি হাদীসে এসেছে, নবী করীম (সা.) বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ عزّ وجلَّ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ

অর্থাৎ, ‘হযরত ইয়ালা বিন উমাইয়া বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, অবশ্যই আল্লাহ্ তা’লা লজ্জাবোধ ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন।’ (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ:১৬৩)

এছাড়া আল্লাহ্ তা’লা কীভাবে নিজ বান্দার দুর্বলতা ঢেকে রাখেন সে সম্পর্কেও একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সাফওয়া বিন মোহরেয বর্ণনা করেন,

‘এক ব্যক্তি হযরত ইবনে ওমর (রা.)-কে প্রশ্ন করলেন, আপনি রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে গোপনীয়তার বিষয়ে কি শুনেছেন? তিনি বললেন: মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ নিজ প্রভু-প্রতিপালকের এতটা নিকটবর্তী হবে যে তিনি তার উপর রহমতের ছায়া ফেলবেন এবং বলবেন তুমি অমুক অমুক কাজ করেছ? সে বলবে, হ্যা আমার প্রভু; আবার বলবেন তুমি অমুক অমুক কাজ করেছ? সে বলবে হ্যা। আল্লাহ্ তা’লা তার স্বীকারোক্তি নিয়ে বলবেন, আমি সেই জগতে তোমার দোষ গোপন করেছিলাম, আজও (কিয়ামত দিবসে) দোষ-ত্রুটি গোপন করছি আর তুমি যে সব মন্দ কাজ করেছিলে সেগুলো ক্ষমা করছি।’

(বুখারী-কিতাবুল আদাব-সাতরুল মু’মিনে আলা নাফসিহী, হাদীস নাম্বার: ৬০৭০)

আল্লাহ্ তা’লা বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন, এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেছেন,

‘অপরাপর ধর্ম আল্লাহ্ তা’লা যে অন্যের দুর্বলতা ঢেকে রাখেন তার ধারণাই উপস্থাপন করতে পারে না, তাদের মাঝে (আল্লাহ্ তা’লা সম্পর্কে) যদি এমন বিশ্বাস থাকত, উদাহরণস্বরূপ যদি খ্রিষ্টানদের মাঝে অন্যের দোষ গোপন রাখার ধারণা থাকত তবে তাদের মাঝে প্রায়শ্চিত্যবাদের ধারণাই সৃষ্টি হত না আর এভাবে আর্যদের মাঝেও পুর্নজন্ম ও জন্মান্তরবাদের বিশ্বাস থাকত না। অতএব একমাত্র ইসলামই আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াতের এ ধারণা উপস্থাপন করে যার প্রকাশ এ পৃথিবীতেও হয় আর পরকালেও।’

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা আপন বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন, এ প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে,

‘ফিরিশ্তা বান্দার দোষ গোপন করার পর সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ্ তা’লা তার তওবা গ্রহণ করেন এবং তার অপসারিত পর্দা ফিরিয়ে দেন। বরং প্রত্যেক পর্দার স্থলে তাকে আরো নয়টি পর্দা দান করেন, যাতে তার ক্ষমার উপকরণ তৈরি হতে থাকে, এবং তার দুর্বলতা ঢাকা থাকে। কিন্তু বান্দা যদি তওবা না করে এবং পাপে লিপ্ত থাকে তখন ফিরিশ্তা বলবে, আমরা তাকে কীভাবে ঢাকবো? এ ব্যক্তি এতো বাড় বেড়েছে যে আমাদেরকেও কলুষিত করছে। তখন আল্লাহ্ তা’লা বলবেন, একে নি:সঙ্গ ছেড়ে দাও।’

এরপর, তার সাথে কী ব্যবহার করা হয়? হাদীসে লেখা রয়েছে:

‘আল্লাহ্ তখন তার সব ভুল-ত্রুটি ও অপরাধ, তা সে অতি সংগোপনে করে থাকলেও, তা প্রকাশ করে দেবেন।’

অতএব, আমাদেরকে সর্বদা চেষ্টা করা উচিত আল্লাহ্ তা’লা যেন আমাদেরকে তওবাকারী বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করেন, এবং সব সময় যেন আমরা তাঁর সাত্তারিয়াত হতে অংশ পেতে থাকি।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াত (দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা) বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্যত্র বলেন,

‘মালিক ইয়াও মিদ্দীনের কাজ হলো সফলকাম করা, যেভাবে এক ব্যক্তি পরীক্ষার জন্য অনেক পরিশ্রম করে, প্রস্তুতি নেয় কিন্তু পরীক্ষায় দুই-চার নম্বরের ঘাটতি থেকে যায়, জাগতিক আইন ও নিয়মকানুন তাকে কোন ছাড় দেয় না, বরং তাকে ব্যর্থ ঘোষণা করে কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার রহিমিয়াত তার দুর্বলতা ঢেকে রাখে এবং তাকে সফলকাম করে দেয়। রহিমিয়াতে এক ধরনের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার বৈশিষ্ট্যও আছে।

ইসলাম সেই খোদাকে উপস্থাপন করেছে, যিনি সকল প্রশংসার অধিকারী। এ কারণেই তিনি সত্যিকার দাতা, তিনি রহমান, তিনি কোন কর্মীর কর্মের অপেক্ষা না করেই অনুগ্রহ করেন। সেই খোদার ধারণা ইসলাম উপস্থাপন করেছে, যিনি সকল প্রকার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, তাঁর মাঝে সমস্ত প্রশংসা একীভূত। তিনিই একমাত্র সত্তা যার মাঝে এ সমস্ত বৈশিষ্ট্য কেন্দ্রীভূত হতে পারে, এবং তিনি এমন দাতা যিনি বাস্তবিক অর্থেই দাতা আর রহমানিয়াতের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের মাধ্যমে দান করেন। কেউ যদি কোন কাজ নাও করে বা যৎসামান্য আমল করলেও তিনি অগণিত দান করেন, এটা তাঁর মালিকিয়াত, তিনি দাতা, রহমান। তাঁর মালিকিয়াত কখনো কখনো এমন দৃশ্য দ���খায় যা তাঁর রহমানিয়াতের জ্যোতিতে প্রকাশ পায়। তিনি কোন প্রকার কর্ম ছাড়াই দান করে যেতে থাকেন এবং ভুল-ত্রুটি ঢেকে যেতে থাকেন।

আমি এখনই বলেছি, মালিকিয়াত ইয়াওমিদ্দীন সফল করে। পার্থিব রাষ্ট্র ব্যবস্থা কখনো প্রত্যেক বি.এ. পাশ ব্যক্তিকে চাকরি দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার সরকার, অত্যন্ত নিখুঁত, অফুরন্ত ধন ভান্ডরের অধিকারী, যাঁর কাছে কোন কিছুর অভাব নেই। আমলকারী সে যে-ই হোক না কেন, তিনি সবাইকে সফলতা দান করেন। নেকী ও পুণ্যের ক্ষেত্রে কিছু কিছু যে দুর্বলতা রয়ে যায় তিনি তা ঢেকে রাখেন।

তিনি তাওয়াব এবং মুসতাহ্‌য়ী। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দার সহস্র সহস্র দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে অবগত কিন্তু প্রকাশ করেন না। তবে হ্যা, এমন এক সময় আসে যখন মানুষ এতটা ধৃষ্ট হয়ে পড়ে যে পাপের ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে আর আল্লাহ্ তা’লার লজ্জাশীলতা ও অন্যের দোষ গোপন করার বৈশিষ্ট্য হতে সে লাভবান হয় না। বরং নাস্তিকতা তার মাঝে মাথাচাড়া দেয় তখন আল্লাহ্ তা’লার আত্মাভিমান এই ধৃষ্টকে ছাড় দেয়া পছন্দ করে না বিধায় তাকে লাঞ্ছিত করা হয়।

মোট কথা, আমার কথার অর্থ হলো রহিমিয়াতে দুর্বলতা ঢাকার বৈশিষ্ট্য আছে কিন্তু এ দোষ-ত্রুটি ঢাকার পূর্বে কোন আমল থাকাও আবশ্যক, এবং এ আমলের মাঝে যদি কোন কমতি বা ঘাটতি থাকে তখন আল্লাহ্ তা’লা তাঁর রহিমিয়াতের মাধ্যমে তা পূর্ণ করে দেন।’

(মলফুযাত-১ম খন্ড, পৃ: ১২৬-১২৭, নবসংস্করণ, রাবোয়া থেকে প্রকাশিত)

হুযূর বলেন, মহানবী (সা.)-এ সম্পর্কে দোয়া শিখিয়েছেন। হযরত যুবায়ের বিন মুতয়েম বর্ণনা করেন,

আমি হযরত ইবনে ওমর (রা.)-কে বলতে শুনেছি, রসূলুল্লাহ্ (সা.) এ দোয়াগুলো পাঠ করা হতে কখনই বিরত থাকতেন না যে, ‘হে আল্লাহ্! আমার নগ্নতাকে ঢেকে দাও, আমার শঙ্কাগুলো নিরাপত্তায় বদলে দাও, হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে (ঐ সব বিপদাপদ হতে) নিরাপদ রাখো যা আমার অগ্রে ও পশ্চাতে রয়েছে, ডানে-বামে ও উপরে রয়েছে। আমি (ঐ সব বিপদাপদ হতে) তোমার শক্তির আশ্রয়ে আসছি, যা আমাকে নিচ থেকে গ্রাস করতে পারে।’

(আবু দাউদ-কিতাবুল আদাব, বাবু মাযা ইয়াকুলু ইযা আসবাহা-হাদীস নাম্বার: ৫০৭৪)

এটি আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াত হতে পরিপূর্ণভাবে লাভবান হওয়ার দোয়া। মহানবী (সা.)-এর সাথেতো আল্লাহ্ তা’লার ওয়াদা ছিল, তিনি তাঁকে সব ধরনের বিপদাপদ হতে সর্বপ্রকার পাপ হতে নিরাপদ রাখবেন; বরং তিনি এ পর্যন্ত বলেছেন যে, আমার শয়তানও মুসলমান হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে এসব দোয়া আমাদেরকে শেখানো হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এ দোয়াগুলো পাঠ করার ও সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন।

এরপর, এ যুগে মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক আমাদেরকে যে দোয়া শিখিয়েছেন এরও দু’একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এভাবে দোয়া করতেন:

‘হে আমার দয়ালু ও কৃপালু খোদা! আমি তোমার এক অযোগ্য সৃষ্টি, দুরন্ত পাপী এবং উদাসীন। তুমি আমার হাতে অন্যায়ের পর অন্যায় হতে দেখেছ কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে তুমি অনুগ্রহের পর অনুগ্রহ করেছ। তুমি আমাকে উপর্যপুরি পাপ করতে দেখেছ অথচ পুরস্কারের পর পুরস্কার দিয়েছ। তুমি সদা আমার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রেখেছ এবং আমাকে তোমার অগণিত পুরস্কারে ভূষিত করেছ। আমি অনুরোধ করছি এ অধম ও পাপীর উপর পুনরায় সদয় হও এবং তার অযোগ্যতা ও অকৃতজ্ঞতাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখো। তুমি দয়া পরবশ হয়ে আমার এ দুঃখ থেকে আমাকে মুক্ত কর কেননা তুমি ব্যতিত অন্য কোন পরিত্রাতা নেই, আমীন সুম্মা আমীন।’

(মকতুবাতে আহ্‌মদীয়া, ৫ম খন্ড, নাম্বার: ২-হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-কে লেখা দ্বিতীয় পত্র-পৃ: ৩)

এরপর অন্যত্র তাঁর আর একটি দোয়া রয়েছে যা তিনি করতেন:

‘হে বিশ্ব প্রতিপালক! আমি তোমার অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারবো না, তুমি নিতান্তই দয়ালু ও সম্মানিত এবং আমার উপর তোমার অপরিসীম অনুগ্রহ, আমার অপরাধ ক্ষমা করে দাও, যাতে আমি ধ্বংস না হই। আমার হৃদয়ে তোমার প্রতি বিশুদ্ধ ভালবাসা সঞ্চার কর যাতে আমি জীবন লাভ করি। আমার দুর্বলতা ঢেকে রাখ এবং আমার হাতে এমন কাজ করাও যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও। আমি তোমার পবিত্র চেহারার দোহাই দিয়ে তোমার দরবারে এ বিষয় হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমার উপর যেন তোমার ক্রোধ বর্ষিত না হয়। আমার প্রতি দয়া করো। ইহ ও পরকালীন বিপদাপদ হতে আমায় রক্ষা করো। কেননা সকল কল্যাণ ও মঙ্গল তোমা হতে নিসৃত হয়, আমীন সুম্মা আমীন।’

(মলফুযাত, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৩, নবসংস্করণ, রাব্ওয়া থেকে প্রকাশিত)

এরপর হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াত বৈশিষ্ট্য হতে কল্যাণমন্ডিত হওয়া এবং তাঁর কৃপা লাভের জন্য মহানবী (সা.) একজন মু’মিনের উপর কি দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন, এ সম্পর্কেও কয়েকটি হাদীস উপস্থাপন করছি। এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি কোন মু’মিন নারীর সম্ভ্রমের হেফাযত করে আল্লাহ্ তা’লা তাকে আগুন হতে রক্ষা করবেন।’ (মাজমাউয্ যওয়ায়েদ, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ২৬৮)

এ হাদীসটি আমি বিশেষ করে ঐ সব লোকদের জন্য বেছে নিয়েছি যারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলে পরষ্পরকে দোষারোপ করা আরম্ভ করে, শুধু তারাই নয় বরং উভয় পরিবারের সদস্যরাও। বিশেষ করে যখন ছেলে পক্ষের আত্মীয়-স্বজন মেয়ের উপর বা মেয়ের পরিবারের উপর অপবাদ আরোপ করতে থাকে তখন অনেক সময় বিনা কারণেই এসব করে। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখো। কিছু কথা সঠিক বা সঙ্গত ঠিকই আর কিছু কথা ঢাহা অপবাদ দেয়া বৈ কিছু নয়। কখনো কখনো ছেলে অথবা ছেলে পক্ষ কাযা বোর্ডে বা কোর্টে মেয়ের বিরুদ্ধে এমন এমন অভিযোগ আনে যা দেখে বা শুনতেও লজ্জা হয়। অথচ মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘মু’মিন নারীর সম্ভ্রমের হেফাযত কর তাহলে আল্লাহ্ তা’লা তোমাকে আগুন হতে রক্ষা করবেন।’

অনেক সময় স্বভাবের মিল হয় না বলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। কারণ যাই হোক না কেন পৃথক যদি হতে হয় হোন কিন্তু যেসব আপত্তি উত্থাপন করা হয় সেগুলো ছাড়াও বিরোধ মিমাংসা করা যায়। কাজেই আহ্‌মদীদেরকে এ সব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত, সে যে পক্ষই হোক না কেন। এ হাদীসে দৃষ্টান্ত স্বরূপ নারীর সম্মানের কথা বলা হয়েছে কিন্তু পরবর্তী হাদীসে সর্বজনীন দৃষ্টিকোন থেকে এটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেছেন: মহানবী (সা.) বলেছেন:

‘যে মু’মিন নিজ ভাই এর দোষ-ত্রুটি দেখার পর তা ঢেকে রাখবে আল্লাহ্ তা’লা তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।’ (মাজমাউয্ যওয়ায়েদ, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ২৬৮)

আর একটি হাদীসে এ বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়েছে, হযরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (আ.) বলেছেন,

‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, সে তার উপর অত্যাচারও করতে পারে না এবং যখন সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখন তাকে একা পরিত্যাগ করতে পারেনা। যে আপন ভাইয়ের অভাব মোচনের কাজে চেষ্টারত থাকে আল্লাহ্ তা’লাও তার অভাব দূরীভূত করতে সচেষ্ট থাকেন। যে কোন মুসলমানের কষ্ট দূর করবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’লাও তার কষ্ট দূর করবেন। যে কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ্ তা’লাও কিয়ামত দিবসে তার দুর্বলতা ঢেকে রাখবেন।’

(বুখারী-কিতাবুল মাযালেম, হাদীস নাম্বার: ২৪৪২)

এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একস্থানে বলেন,

‘জামাতের ভেতর অনেক সময় ঝগড়া-বিবাদও হয়ে যায়। আর সামান্য ঝগড়ার ফলে পরস্পরের মান-সম্মানের উপ�� আক্রমণ করা আরম্ভ করে। এবং নিজ ভাইয়ের সাথে বিতন্ডায় লিপ্ত হয়। এটি খুবই অপছন্দনীয় কর্ম। এমন হওয়া শোভন নয়। যদি একজন নিজের ভুল স্বীকার করে নেয় তাতে অসুবিধে কী। অনেকে সামান্য ব্যাপারে অন্যকে লাঞ্ছিত না করা পর্যন্ত বিরত হয় না। এমন বিষয় হতে বিরত থাকা আবশ্যক। খোদা তা’লার নাম সাত্তার। তবে এরা কেন নিজ ভাইয়ের প্রতি দয়ার্দ্র হয় না এবং মার্জনা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে না। আপন ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা উচিত। তার মান-সম্মানের উপর আক্রমণ করা অনুচিত।’

তিনি (আ.) বলেন,

‘ছোট্ট একটি পুস্তিকায় আমি পড়েছি, একজন বাদশাহ্ কুরআন (অনুলিখন) লিখতেন! এক মোল্লা বলে, এই আয়াত ভুল লেখা হয়েছে। বাদশাহ্ তখন সেই আয়াতের চারদিকে একটি বৃত্ত এঁকে দিয়ে বুঝান যে, এটি কেটে দেয়া হবে। যখন সে (মোল্লা) চলে যায় তখন সেই বৃত্ত মুছে ফেলেন। বাদশাহ্‌কে এরূপ করার হেতু জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে সে (মোল্লা) ভুল করেছে কিন্তু আমি সে সময় বৃত্ত টেনে দিয়েছিলাম যাতে তার মনতুষ্টি হয়।

অপরের দোষ-ত্রুটি প্রচার করে বেড়ানো এটি অহংকারের মূল এবং ব্যাধি। এমন কর্মের ফলে আত্মা কলুষিত হয়, এত্থেকে বিরত থাকা উচিত। মোটকথা এসব বিষয় ত্বাকওয়ার অর্ন্তগত এবং আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়ে ত্বাকওয়ার আলোকে কর্ম সম্পাদনকারী ফিরিশ্তাদের মাঝে গণ্য হয় কেননা, তার ভেতর লেশমাত্র অবাধ্যতা অবশিষ্ট থাকে না।

ত্বাকওয়া অর্জন করো, কেননা ত্বাকওয়ার মাধ্যমেই খোদা তা’লার আশিস ও কৃপা আসে। মুত্তাকীকে পার্থিব বিপদাপদ হতে রক্ষা করা হয়। খোদা তাদের পর্দাবৃত করে রাখেন। যতক্ষণ এই রীতি অবলম্বন না করা হবে কোন লাভ হবে না। এধরনের মানুষ আমার হাতে বয়’আত করে কিছুমাত্র লাভবান হয় না। কী করে লাভবান হতে পারে, কেননা এক প্রকার অন্যায়তো ভেতরে রয়েই গেছে।

যদি সেই উত্তেজনা, অহংকার, গর্ব, আত্মম্ভরিতা, শঠতা, এবং বদমেজাজ থেকেই যায় যা অন্যদের ভেতরও রয়েছে, তাহলে আর পার্থক্য কী থাকলো?

যদি সাঈদ, অর্থাৎ পুণ্য প্রকৃতির মানুষ, থাকে আর পুরো গ্রামে একজনও থাকে তাহলে মানুষ অলৌকিকভাবে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। নেক মানুষ যিনি খোদা তা’লাকে ভয় করেন নেকী অবলম্বন করেন, তাঁর ভেতর একটি ঐশী প্রতাপ থাকে আর হৃদয় বলে যে, ইনি খোদাপ্রেমী বান্দা। এটি নিতান্তই সত্য কথা, যিনি খোদার পক্ষ থেকে প্রেরিত হন খোদা আপন শক্তি হতে তাঁকে অংশ দান করেন, এবং পুণ্যবানদের রীতিও এটিই।

অতএব, স্মরণ রেখ! ছোট-খাট বিষয়ে ভাইদেরকে কষ্ট দেয়া কাম্য নয়। মহানবী (সা.) উন্নত নৈতিকতার মূর্তিমান রূপ, এবং খোদা তা’লা এযুগে তাঁর উন্নত নৈতিকতার শেষ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখনও যদি সেই পাশবিকতা থেকে যায়, তাহলে চরম পরিতাপ এবং দুর্ভাগ্য।

অতএব, অন্যদের দোষারোপ করো না, কেননা প্রকৃতপক্ষে তার মাঝে যদি সেই দোষ না থাকে, তাহলে অপরকে দোষারোপ করতে করতে অনেক সময় মানুষ স্বয়ং তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। আর যদি সত্যিকারেই তার মধ্যে সেই দোষ থেকে থাকে তাহলে সে খোদার সাথে বুঝবে।

ভাইয়ের উপর অন্যায় অপবাদ আরোপ করা অনেকের অভ্যাস হয়ে থাকে। এমন করা থেকে বিরত হও। মানুষের উপকার করো, এবং নিজ ভাইদের প্রতি সহানুভূতিশীল হও। প্রতিবেশির সাথে সদ্ব্যবহার করো। নিজ ভাইদের সাথে পবিত্র জীবন যাপন করো এবং সর্বাগ্রে শির্ক মুক্ত হও কেননা এটি ত্বাকওয়ার প্রথম ইঁট।’

(মলফুযাত, ৩য় খন্ড, পৃ: ৫৭১-৫৭৩, নবসংস্করণ, রাবোয়া থেকে প্রকাশিত)

হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লা দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখার এবং ব্যক্তিগত দুর্বলতা ফাঁস না করা সম্পর্কে কত কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন সে প্রসঙ্গে একটি আয়াতে এসেছে।

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا اجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ اِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ اِثْمٌ‌ وَّلَا تَجَسَّسُوْا وَلَا يَغْتَبْ بَّعْضُكُمْ بَعْضًا‌ؕ اَ يُحِبُّ اَحَدُكُمْ اَنْ يَّاْكُلَ لَحْمَ اَخِيْهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوْهُ‌ؕ وَاتَّقُوْا اللّٰهَ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ تَوَّابٌ رَّحِيْمٌ‏

অর্থ: হে যারা ঈমান এনেছ! সন্দেহকে যতবেশী সম্ভব এড়িয়ে চলো। কারণ কতক সন্দেহ পাপ বিশেষ। এবং তোমরা ছিদ্রান্বেষণ করো না, এবং একে অপরের পিছনে কুৎসা করে বেড়িও না। তোমাদের মধ্যে কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়া পছন্দ করবে কি? অবশ্যই তোমরা একে ঘৃণা করবে; এবং আল্লাহ্‌র ত্বাকওয়া অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ্ পুনঃ পুনঃ সদয় দৃষ্টিপাতকারী, পরম দয়াময়।’ (সূরা আল্ হুজুরাত: ১৩)

হুযূর বলেন, উপরোক্ত আয়াতের আলোকে কুৎসাকারী একেতো কুৎসার অপরাধে অপরাধী হচ্ছে, গোপনীয়তা রক্ষা না করার অপরাধ করছে। অন্যদিকে অশান্তি সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। আর নৈরাজ্য সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, ফিৎনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর। এভাবে কুৎসা রটনাকারী সমাজে অশ্লীলতা এবং নোংরামী ছড়ানোর কারণ হচ্ছে। কেননা সেই বিষয়, যা বলা হচ্ছে তা যদি মন্দ ও পাপ হয়ে থাকে তাহলে তা অনেক সময় দুর্বল ইমানের লোক এবং যুবকদের মন্দকাজে উৎসাহিত করে। বলে যে, সেও করেছিল তাই আমরা করলে দোষ কি? অথচ, আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آَمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ

অর্থ: যারা এই কামনা করে যে, মু’মিনদের মাঝে অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করুক, তাদের জন্য নিশ্চয় ইহ ও পরকালে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি আছে।’ (সূরা আন্ নূর: ২০)

এখন দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা লজ্জা-শরম, দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা এবং বান্দাকে ক্ষমা করা পছন্দ করা সত্ত্বেও এমন লোকদের জন্য যারা গোপনীয়তা ফাঁস করতে ভালবাসে, এবং এর মাধ্যমে পৃথিবীতে অশ্লীলতা ছড়াতে চায়, যারা একটি কদর্য বিষয় প্রকাশ করে মু’মিনদের মাঝে নোংরামী ছড়াতে চায়। এদের সম্পর্কে বলেছেন, তাদের জন্য ইহ ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। যখন সমাজে প্রকাশ্য অশ্লীলতা ছড়াবে এবং এর চর্চা হবে, একে অপরের গোপনীয়তা ফাঁস করা আরম্ভ হবে তখন আর লজ্জা-শরমের বালাই থাকবেনা। এই সমাজে তথা পাশ্চাত্ব্যে প্রকাশ্যে যেসব অপকর্ম হয় এর কারণ হলো, এদের মাঝে লজ্জা-শরম নেই। আর এখনতো টেলিভিশন ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যম গোটা বিশ্বকেই নির্লজ্জ বানিয়ে দিয়েছে। আবার এরই নাম রাখা হয়েছে স্বাধীনতা। যার ফলে নগ্নতা ও নির্লজ্জতা পরবর্তী প্রজন্মের ভেতরও সঞ্চালিত হচ্ছে। পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে, অনেক সময় কতক আহ্‌মদীও এতে প্রভাবিত হচ্ছে। তাই পর্দা এবং লজ্জা-সম্ভ্রমের উপর ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে। পাশাপাশি অন্যদেরও বলেছে যে, তোমরা অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াবেনা এবং তা ছড়াবেনা। যদি কারো দোষ-ত্রুটি চোখে পড়ে, যে এতই নির্লজ্জ যে, প্রকাশ্যে করছে আর বারংবার করছে তাহলে জামাতের ব্যবস্থাপনা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা নেযাম আছে, অবহিত কর তারপর চুপ করে থাক। তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। এখন তার জন্য দোয়া কর। যদি তুমি কথা বলে বেড়াও এবং তা উপভোগ কর, তার অপরাধ ছড়ানোর কারণ হও তাহলে ত্বাকওয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছ। ধরে নেয়া যাক; যদি ঘটনাক্রমে কেউ কারো কোন অপকর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হয়, তারপর সেই ব্যক্তি যদি সেই মন্দ পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও কোন বিরোধের কারণে সুযোগ বুঝে তা প্রচার করে; তাহলে সে কেবল কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতা ফাঁস করার অপরাধেই অপরাধী নয়, বরং আল্লাহ্ বলেন, তোমার কুৎসা করা কোন ব্যক্তির মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মত বিষয়। অতএব সমাজকে সব ধরনের অশান্তি এবং নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে দুর্বলতা ঢেকে রাখা একান্ত আবশ্যক। কিন্তু যেভাবে আমি বলেছি, যদি কোন মন্দকর্ম দেখতে পান আর সংশোধন উদ্দেশ্য হয় তাহলে দোয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবহিত করা আ���শ্যক। তারপর একান্ত গোপনীয়তার সাথে সব বিষয় সামনে রেখে সংশোধনের চেষ্টা করা উক্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। এরপর কেউ যদি মন্দ কর্মের ব্যাপারে হঠকারীতাপূর্ণ আচরণ না করে তাহলে কর্মকর্তাদের উচিত যতদূর সম্ভব বিষয়টি গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘কোন ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি দেখে আমাদের জামাতের উচিত তার জন্য দোয়া করা। অধিকন্তু, দোয়া না করে সে যদি তা মানুষের কাছে বলে বেড়ায় আর ক্রমাগতভাবে বলতেই থাকে তবে সে পাপ করে। এমন কোন্ রোগ আছে যা দূরীভূত হতে পারে না? এজন্য সর্বদা দোয়ার মাধ্যমে অন্য ভাইয়ের সাহায্য করা উচিত।

মহানবী (সা.)-এর কাছে পরচর্চার (গীবত) স্বরূপ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কারো অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে কোনরূপ সত্য কথা এভাবে বর্ণনা করা যে উপস্থিত থাকলে সে তা পছন্দ করবে না, একেই পরচর্চা (গীবত) বলা হয়। আর তুমি যা বলছো তা যদি তার ভেতর না থাকে তাহলে এর নাম অপবাদ, খোদা তা’লা বলেন, بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا (সূরা আল্ হুজুরাত: ১৩) এখানে কুৎসা রটনাকে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষনের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

কথা হচ্ছে; এখন জামাতের প্রারম্ভিক অবস্থা। যেভাবে কেউ কঠিন রোগের পর আরোগ্য লাভ করে আর পরে ধীরে ধীরে কিছুটা শক্তি ফিরে পায়। অতএব, যার ভেতর দুবর্লতা পরিলক্ষিত হয় তাকে অতি গোপনে নসীহত করা উচিত। যদি না মানে, তার জন্য দোয়া করো। যদি উভয় প্রকার চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে তকদীদের লিখন মনে করো। যেখানে খোদা তা’লা কাউকে গ্রহণ করেছেন সেখানে কারো দুর্বলতা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে তোমাদের উত্তেজিত হওয়া উচিত নয়, সে সংশোধিতও হতে পারে।

অনেক চোর ও ব্যভিচারী একপর্যায়ে কুতুব এবং আবদাল হয়েছেন। ঝট করে কাউকে পরিত্যাগ করা আমাদের রীতি নয়। কারো সন্তান নষ্ট হলে সে তার সংশোধনের পুরো চেষ্টা করে। অনুরূপভাবে নিজের কোন ভাইকে পরিত্যাগ করা উচিত নয় বরং তার সংশোধনের লক্ষ্যে পুরো চেষ্টা করা আবশ্যক। দোষ-ত্রুটি দেখে তা ছড়ানো এবং অন্যের কাছে বলে বেড়ানো কোনভাবেই কুরআনী শিক্ষা সম্মত নয়, বরং তিনি বলেন, تَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ (সূরা আল্ বালাদ: ১৮) অর্থাৎ, তারা ধৈর্য এবং দয়ার মাধ্যমে উপদেশ দেয়। অন্যের দোষ ত্রুটি দেখে তাকে উপদেশ দেয়া এবং তার জন্য দোয়া করার নামই হচ্ছে مَرْحَمَةِ । দোয়ার প্রভাব সুদূর প্রসারী। বড়ই পরিতাপ সেই ব্যক্তির জন্য! যে একজনের দোষ-ত্রুটি শতবার বর্ণনা করে ঠিকই কিন্তু একবারও তার জন্য দোয়া করে না। প্রথমে কারো জন্য কম পক্ষে চল্লিশ দিন কেঁদে কেঁদে দোয়া করার পরই তার দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা যেতে পারে।

তোমাদের ‘তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লা’-এ সজ্জিত হওয়া উচিত। আমাদের কথার উদ্দেশ্য এই নয় যে, পাপের পৃষ্ঠপোষক হও, বরং তোমরা তার প্রচার ও পরচর্চা থেকে বিরত থাক। আল্লাহ্‌র পবিত্র গ্রন্থে এসেছে, পাপের প্রচার এবং পরচর্চা করা পাপ। শেখ সাদী (রহ.)-এর দু’জন শিষ্য ছিল। এদের মধ্য হতে একজন তত্ত্ব এবং মা’রেফত বর্ণনা করতো (জ্ঞানী ছিল) আর অন্যজন তা দেখে হিংসায় জ্বলতো। পরিশেষে প্রথমজন শেখ সাদী (রহ.)-এর কাছে অভিযোগ করে, যখনই আমি কিছু বর্ণনা করি অপরজন তা দেখে হিংসায় জ্বলে। শেখ উত্তরে বলেন, একজন তোমার প্রতি হিংসা করে দোযখের পথ অবলম্বন করেছে আর তুমি করেছ তার গীবত। সারকথা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরের প্রতি দয়া, দোয়া, গোপনীয়তা রক্ষা এবং সহমর্মিতা না করা হবে ততক্ষণ এই জামাত চলতে পারে না।’

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৬০-৬১, নবসংস্করণ, রাব্ওয়া থেকে প্রকাশিত)

হুযূর বলেন, এসকল গুণাগুণ আমাদেরকে জামাতের ভেতর সৃষ্টি করতে হবে। আর যতবেশি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বিভিন্ন স্থানে দোয়া এবং দুর্র্বলতা ঢেকে রাখার ব্যাপারে বারংবার জামাতকে নসীহত করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এই শিক্ষামালার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে খোদা তা’লার সাত্তারী বৈশিষ্ট্য হতে সর্বদা অংশ লাভের তৌফিক দান করুন। আল্লাহ্ তা’লা আপন কৃপায় সকল নোংরামির প্রতি আমাদের হৃদয়ে ঘৃণা সৃষ্টি করে দিন। সর্বদা আমরা যেন নেকীর পানে পদচারণা করতে পারি এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবের মহান উদ্দেশ্য পূর্ণকারী হই।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে