In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৬ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং

‘আল্লাহ্ তা’লার ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন, হাদীস এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর লেখনীর আলোকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা।’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লার নাম সমূহের একটি হচ্ছে আল্ হাদী। আরবী অভিধান গ্রন্থ লিসানুল আরবে এর অর্থ করা হয়েছে, সেই সত্ত্বা যিনি স্বীয় বান্দাদের আপন মা’রেফত এবং তাঁকে চেনার পথ বাতলে থাকেন। যারফলে সে তাঁর প্রতিপালনে বিশ্বাস স্থাপন করে। এই পথ কিভাবে আল্লাহ্ তা’লা প্রদর্শন করেন, যখন দেখান তখন কি অবস্থা সৃষ্টি হয়? এটি তখনই দেখান যখন বান্দা খোদা তা’লার প্রতিপালন বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে। অস্বীকারের বিভিন্ন ধরন ও বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। মানুষ কখনও বান্দাকে খোদা বানিয়ে বসে, যেভাবে খৃষ্টানরা হযরত ঈসাকে বানিয়েছে। কখনও মানুষ শক্তির অহমিকায় স্বয়ং খোদা এবং প্রতিপালক বনে বসে। যেভাবে বিগত নবীদের যুগে হয়েছে, ফেরআউনও এমনটি করেছে। অথবা এযুগেও কেউ স্বয়ং নিজেকে খোদা বলে অথবা এই পার্থিব জগতে খোদার মূর্ত বিকাশ বলে দাবী করে। কবর পূজার নির্দেশ দেয়। অথবা পার্থিব বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদেরকে অবিনশ্বর শক্তির অধিকারী মনে করে আর এ অর্থে প্রভু সেজে বসে আছে। মোটকথা তখন পৃথিবীতে এমন এক নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে যার কোন সীমা নেই। তখন খোদা তা’লা আপন শক্তি প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন যে, তিনিই রাব্বুল আলামীন। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘খোদা তা’লা ‘রব্বুল আলামীন’ বাক্যে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, তিনি সব কিছুর স্রষ্টা আর আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পক্ষ থেকে, এ পৃথিবীতে যত হেদায়াতপ্রাপ্ত জামাত অথবা পথভ্রষ্ট এবং পাপাচারীর দল রয়েছে তার সবই আলামীন (বিশ্বজগত) শব্দের অন্তর্ভূক্ত। কখনও ভ্রষ্টতা, কুফর, অবাধ্যতা এবং মধ্যপন্থা পরিহারের ঘটনা পৃথিবীতে বেড়ে যায়, এমন কি পৃথিবী যুলুম-অত্যাচারে ছেয়ে যায় এবং মানুষ মহা পরাক্রমশালী খোদার পথ পরিত্যাগ করে, না দাসত্বের তাৎপর্য বুঝে আর না-ই প্রতিপালকের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে।’

অর্থাৎ এটিও বুঝে না যে বান্দার অবস্থান কি আর এটিও জানে না যে, তাদের প্রভু-প্রতিপালকের মোকাম বা মর্যাদা কি? পুনরায় বলেন,

‘যুগে অমানিশা ছেয়ে যায় আর ধর্ম এই বিপদের আবর্তে পিষ্ট হয়।’

তিনি বলেন যে,

‘তখন শয়তানী সৈন্যের মোকাবিলার জন্য অযাচিত-অসীম দাতা খোদার পক্ষ হতে একজন ঈমাম নাযিল হন আর শয়তান ও রহমান (খোদা) উভয়ের সৈন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আর তাদের কেবল সেই দেখতে পায় যাকে দৃষ্টি শক্তি দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে মিথ্যা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় এবং মিথ্যার পক্ষে প্রদত্ত আলেয়া তুল্য দলীল-প্রমাণ কর্পূরের মত উবে যায়। সুতরাং সেই ইমাম সর্বদা শত্রুর উপর জয়যুক্ত থাকেন এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত শ্রেণীর সাহায্যকারী হন।’

হুযূর বলেন, অতএব ইনি হলেন, হাদী খোদা! যিনি মানুষকে হেদায়াতের পথে আনার জন্য তাঁর রবুবিয়্যত বৈশিষ্ট্যকে কার্যকর করেন। কিন্তু যেভাবে তিনি (আ:) বলেছেন যে, আল্লাহ্ তা’লা শত্রুদের বিরুদ্ধে হেদায়াতপ্রাপ্ত দলের সাহায্যের আদলে বিজয়ের লক্ষণাবলী প্রকাশ করেন আর বিশৃঙ্খলাপরায়নদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে প্রতিহত করেন বরং সেসব শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর যুগেই দেখুন! খৃষ্টানদের আগ্রাসন এমন ছিল যে, খৃষ্টধর্ম বিশ্বের সর্বত্র সফলতার পর সফলতার পথ পাড়ি দিচ্ছিল। ভারতের মুসলমানরাও তাদের খপ্পরে পড়ে অহরহ খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করছিল। খৃষ্টান মিশনারীরা ভারতে খৃষ্টধর্মের বিজয়ের অলীক স্বপ্নে বিভোর ছিল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) কেবল ভারতেই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেননি বরং পিছু হটতে বাধ্য করেছেন। উপরন্তু আফ্রিকা যা তখন খৃষ্টান মিশনারীদের হাতের মুঠোয় ছিল সে সম্পর্কেও তারা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, আহ্‌মদীয়াত কেবল আমাদের উন্নতির গতিই রুদ্ধ করেনি বরং আমাদের মূলোৎপাটন করেছে। এভাবে আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াতের পথে পরিচালিত করার জন্য আপন রবুবিয়্যত (প্রতিপালন) বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটান এবং স্বীয় ইমাম প্রেরণ করেন। কিন্তু যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেছেন, তাদেরকে কেবল তারাই দেখতে পায় যাদেরকে দু’টি চোখ প্রদান করা হয়েছে।

হুযূর বলেন, বড় বড় মুসলমান উলামা, যারা ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার দাবী করে, তারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরোধিতায় অন্ধ হয়ে তাদের অর্জিত জ্ঞান ভুল পথে পরিচালিত করে পাশাপাশি এই জ্ঞানের ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহ্কেও পথভ্রষ্ট করে। অথচ পক্ষান্তরে সে যুগের উলামারা এটিও মানে যে, ইসলাম, মুলমান এবং ধর্মের ভেতর আজ চরম বিকৃতি ঘটেছে। মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম কেবল নামমাত্র অবিশিষ্ট আছে, খিলাফতের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করে। কিন্তু খিলাফতের প্রথম ধাপ সম্পর্কে এরা এখন ভাবাই ছেড়ে দিয়েছে আর তাহলো মসীহ্ এবং মাহ্‌দীর আগমন। তাঁর আগমনের পরেই কেবল খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনও এই দৃষ্টিভঙ্গির উপরই অনড় যে, হযরত ঈসা (আ:) আকাশে জীবিত বসে আছেন এবং তিনি পুনরায় আসবেন তারপর মাহ্‌দীর সাথে সম্মিলিতভাবে ধর্মের প্রচার করবেন। হাদীস সমূহকে ভুল বুঝে তারা এই ফলাফলে উপনীত। যাইহোক না কেন যতক্ষণ পর্যন্ত নবুয়তকে মানবে না ততক্ষণ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আল্লাহ্ তা’লা যে এই উম্মতের মধ্য থেকেই মসীহ্ এবং মাহ্‌দী প্রেরণ করবেন এ প্রসঙ্গে তিনি স্বয়ং আমাদেরকে দোয়া শিখিয়েছেন। এরপরও যদি না মানে আর দোয়া করতে থাকে তাহলে আর কি করা যেতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা একটি রীতি শিখিয়েছেন যে, এই দোয়া করো এবং নিষ্ঠার সাথে করো তাহলে আমি তোমাদের দোয়া কবুল করবো। এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘মুহাম্মদী নবুওয়ত স্বীয় আশিস বন্টনে অসমর্থ নয় বরং সকল নবুয়ত অপেক্ষা এতে অধিক ফয়েয বা আশিস রয়েছে। এই নবুয়তের অনুসরণ অতি সহজে খোদা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় এবং এর অনুবর্তিতায় খোদাপ্রেম ও তাঁর সাথে বাক্যালাপের পুরস্কার পূর্বাপেক্ষা অধিকহারে লাভ করা যায়।.............যখন সেই বাক্যালাপ মান, গুণ এবং সংখ্যার দিক দিয়ে পরম পর্যায়ে উপনীত হয়, আর তাতে কোনরূপ দুষণ ও ত্রুটি অবশিষ্ট না থাকে’ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লার সাথে বাক্যালাপ, বান্দার সাথে আল্লাহ্ তা’লা কথোপকথনের মান যখন এতটা উন্নত হয় যে, এর মধ্যে কোনরূপ পঙ্কিলতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি, বক্রতা অবশিষ্ঠ থাকে না ‘এবং স্পষ্টত:ই তা অদৃশ্য বিষয় সম্বলিত হয়’ প্রকাশ্যে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাকে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ‘অন্য কথায় এটিই নবুয়ত নামে অভিহিত হয়।’ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লার সাথে বান্দার কথোপকথন এবং বাক্যালাপ, আল্লাহ্ তা’লা কর্তৃক বান্দাকে সম্বোধন করা, অদৃশ্য বিষয় জ্ঞাত করার বিষয়টি যখন চরমোৎকর্ষে পৌঁছে এরই নাম নবুয়ত। ‘যা সম্পর্কে সকল নবীর মতৈক্য রয়েছে। সুতরাং যে উম্মত সম্বন্ধে বলা হয়েছে, كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ যাদেরকে বলা হয়েছে, [‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য উত্থিত করা হয়েছে’ (সূরা আল্ ইমরান: ১১১)] ‘এবং যাদেরকে এই দোয়া শিক্ষা দেয়া হয়েছিল যে: اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ [‘তুমি আমাদেরকে সরল সুদৃঢ় পথে পরিচালিত কর তাঁদের পথে, যাঁদেরকে তুমি পুরস্কৃত করিয়াছ’ (সুরা ফাতেহা: ৬-৭)] ‘তাহাদের জন্য এটি কখনও সম্ভব নয় যে, তারা সকলেই এই উচ্চমর্যাদা লাভে বঞ্চিত থাকবে এবং কোন একজনও এই মর্যাদা লাভ করবে না। এমতাবস্থায় উম্মতে মুহাম্মদীয়ার অপূর্ণ ও অপরিণত থাকার ত্রুটিই শুধু থেকে যেতো না অর্থাৎ তারা সবাই অন্ধের ন্যায় হতো বরং আঁ-হযরত (সা:)-এর কল্যাণপ্রসারী শক্তি (কুওয়্যতে ফয়যান) কলঙ্কিত হতো, তাঁর পবিত্রকরণ শক্তি অসম্পূর্ণ প্রতিপন্ন হতো এবং ততসঙ্গে সেই দোয়া যা পাঁচবেলা নামাযে পাঠ করার জন্য শিক্ষা দেয়া হয়েছিল, তা শিখানো বৃথা সাব্যস্ত হতো।’ (আল্ ওসীয়্যত-পৃ: ১২-১৩)

হুযূর বলেন, এই দোয়া সম্পর্কে একস্থানে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) বলেছেন,

‘আমি অনেককে এই দোয়া اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ পড়ার জন্য বলেছি কেননা, এই দোয়া পাঠ করতে কোন সমস্যা নেই; যাতে আল্লাহ্ তা’লা সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেন। এরফলে আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।’

সুতরাং আমিত্বের খোলস থেকে মুক্ত হয়ে, স্বীয় ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে এবং নিজের উপর যে আবরণ চড়িয়ে রেখেছে তাত্থেকে মুক্ত হয়ে, স্বীয় মস্তিষ্ককে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরোধিতা থেকে মুক্ত করে যদি দোয়া করা হয় তাহলে আল্লাহ্ তা’লা সঠিক পথের দিশা দিবেন। এটি খোদার উপর অপবাদ আরোপের সমতূল্য যে, একদিকে তিনি বলেন: আমার কাছে দোয়া করো আমি কবুল করবো। যেমন, আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُم

অর্থ ‘এবং তোমাদের প্রতিপালক বলছেন, ‘আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো।’ (সূরা আল্ মোমেন: ৬১)

আমাদের পার্থিব বিষয়ের দোয়া সম্পর্কে আমরা প্রতিনিয়ত বলি যে, আল্লাহ্ কবুল করেছেন, আমরা এটা পেয়েছি ওটা পেয়েছি। কিন্তু মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কৃত দোয়া যা স্বয়ং আল্লাহ্ শিখিয়েছেন তা তিনি শুনবেন না এটি কি করে হতে পারে। একদিকে নির্দেশ হলো, হেদায়াত লাভের জন্য আমার কাছে দোয়া করো, এহেন অবস্থায় যখন ধর্মের জন্য এক ‘হাদী’র প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তখন দোয়া করার সময় মানুষের উপর একটি বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ তা’লাকে স্বীয় প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দোয়া করা যে, তুমি এমন পরিস্থিতিতে হাদী প্রেরণ করে থাকো আর আল্লাহ্ই বলবেন, তোমার অন্যান্য দোয়াতো কবুল হবে কিন্তু এই দোয়া গৃহীত হবে না। এটি আল্লাহ্ তা’লার উপর আপত্তি, আল্লাহ্ তা’লার সত্ত্বার উপর অপবাদ বৈ কিছু নয়। উম্মতে মুসলেমার শোচনীয় অবস্থা ক্রমশ অধপতিত হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লা বলবেন, ঠিক আছে! তোমরা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত; আর অবস্থা মারাক্তকরূপ পরিগ্রহ করছে, করুক, যত ইচ্ছে এ নিয়ে হাহুতাশ হোক, ধর্ম উঠে গেছে তাও সত্য আর ঈমানও হারিয়ে গেছে কিন্তু ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদানের নিমিত্তে তোমাদের জন্য হাদী প্রেরণের দোয়া আমি কবুল করবো না। এটি হতে পারে না যে, আল্লাহ্ বলবেন, তোমরা যতই ক্রন্দন বা আহাজারি করো না কেন আমি তোমাদের হেদায়াতের কোন ব্যবস্থা নিবো না। যা করার ছিল তা আমি করেছি এখন হেদায়াতের সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। তবে একটি কথা অবশ্যম্ভাবী যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বারংবার ঘোষণা করেছেন; তিনি বলেন:

‘আমি ছাড়া অন্য কোন হাদী বা প্রথপ্রদর্শকের জন্য দোয়া ও নাক ঘষতে ঘষতে তোমাদের জীবন যদি নি:শেষও হয়ে যায় তোমাদের সন্তানদের জীবন নি:শেষ হয়ে যায় আর তোমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মও যদি অতীত হয়ে যায় তথাপী আর কোন মসীহ্ মওউদ আসবে না, কোন মাহ্‌দী আবির্ভূত হবে না কারণ যাঁর আগমনের কথা ছিল তিনি এসে গেছেন। এখন তাঁকে মানা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।’

হুযূর বলেন, সুতরাং মুসলমানদের নিজেদের অবস্থার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেয়া উচিত। আহ্‌মদীদের উপর অত্যাচারের পরিবর্তে নেক নিয়্যতের সাথে খোদা তা’লার কাছে হেদায়াত লাভের জন্য দোয়া করা উচিত। বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত আহ্‌মদীদের উপর প্রতিদিন নিত্যনতুন যুলুম হচ্ছে। অত্যাচারের নিত্যনতুন পথ খুঁজে, বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দিয়ে এরা মনে করে যে, সম্ভবত: এর ফলে কিছু মানুষ আহ্‌মদীয়াত পরিত্যাগ করবে। আহ্‌মদীয়াত যে শেষ হবার নয় এটা তারাও ভালভাবে জানে। ১৪ থেকে ১৬ বছরের আহ্‌মদী স্কুলগামী ছাত্র ও কিশোরদের ভীত-ত্রস্ত করার সম্প্রতি এরা নুতন একটি কৌশল বের করেছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো,

‘নাউযুবিল্লাহ্ এরা নাকি শৌচাগারে বা অন্য কোন নোংরা স্থানে মোহাম্মদ নাম লিখে মহানবী (সা:) এর সম্মানহানি করেছে।’

এরা স্বয়ং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত আর অপবাদ আরোপ করে আহ্‌মদীদের উপর। এমন অপকর্ম তারা করতে পারে যাদের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি নেই। যারা মহানবী (সা:)-এর মোকাম বা মর্যাদা সম্বন্ধে অনবহিত। এরাতো ১৪/১৫ বছরের কিশোর কিন্তু আহ্‌মদী ছোট্ট শিশু পর্যন্ত এমন অপকর্ম করতে পারে না। আগমনকারী মসীহ্ এবং মাহ্‌দীতো আমাদেরকে রসূলপ্রেমের সেই পথ দেখিয়েছেন, সেই শিক্ষা প্রদান করেছেন যে পর্যায়ে এদের চিন্তাও যেতে পারে না। যাইহোক মুসলমান পৃথিবীর যে দেশেই বসবাস করুক না কেন আল্লাহ্ তা’লা তাদের বিবেক দিন যাতে এরা আহ্‌মদীদেরকে নির্যাতনের লক্ষবস্তু বানানো থেকে বিরত থাকে। এবং হেদায়াতের পথ সন্ধান করার মানসে বিনয়ের সাথে খোদা তা’লার প্রতি সমর্পিত হয়। এখানে আমি আরো একটি বিষয় স্প���্ট করছি, সম্প্রতি লাজনাদের রিফ্রেসার্স কোর্স হয়েছে সেখানে কেউ প্রশ্ন করেছিল, অ-আহ্‌মদীরা বলে যে, তোমরা মির্যা সাহেবকে যদি নবী না বলো তাহলে আমরা মানতে পারি। প্রথম কথা হচ্ছে, এটিও ঐসব অতিসরল আহ্‌মদীদের ভুল ধারণা যারা এদের কথায় গলে যায় আর মনে করে যে, এরা মানবে। বিরোধিতা হয়ত: কমিয়ে দিতে পারে কিন্তু যারা মানার নয় তাদের ভেতর কখনও মানার মত সৎসাহস হবে না। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) নিজ উদ্ধৃতিতে নবীর যে সংজ্ঞা উপস্থাপন করেছেন, সেই দৃষ্টিকোন থেকে তিনি নবী এবং তিনি বিভিন্ন স্থানে নবী হিসেবে দাবী করেছেন। যখন আল্লাহ্ তা’লা কোন বান্দার সাথে অত্যধিক মাত্রায় বাক্যালাপ করেন, তাঁকে সম্বোধন করেন, তাঁকে অদৃশ্য বিষয়াবলী অবহিত করেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেছেন, এরই নাম নবুয়ত আর বিগত সকল নবীরা একথাই বলে গেছেন। যদি এ দাবীকে অগ্রাহ্য করা আরম্ভ করেন তাহলে পরের ধাপে বলবে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর প্রতি যে ইলহাম হয় তাও বলো না। তখন তাদের এ আবদারও মানতে হবে। তারপর অন্য কোন বিষয় পরিত্যাগ করার দাবী উঠবে কেননা, যদি একবার মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত হয়ে দুর্বলতা দেখাতে থাকেন তাহলে নিজ ইমানকেও দুর্বলতর করতে থাকবেন। প্রশ্ন হলো আমরা কি সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর দাবী এবং আল্লাহ্ ও রসূল (সা:)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের বিপরীতে নতুন কোন মসীহ্ এবং মাহ্‌দী উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো? এই দাবী এখানে আর পাকিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে করা হচ্ছে। এদের দাবী অনুযায়ী নবুয়তের দাবী ছেড়ে দেবার পর, তাঁর মসীহ্ এবং মাহ্দী হবার দাবীও ধোপে টিকবেনা কেননা, মহানবী (সা:)-এর একটি হাদীস যাতে তিনি বলেছেন,

‘সাবধাণ! ঈসা ইবনে মরিয়ম (অর্থাৎ মসীহ্ মওউদ) এবং আমার মধ্যে কোন নবী নেই।’

সুতরাং আমরা যখন বলি যে, হযরত ঈসা (আ:) মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তিনি পুনরায় এ পৃথিবীতে আসতে পারেন না আর মহানবী (সা:)-এর উম্মতের মধ্য থেকেই মসীলে মসীহ্ জন্ম নিবেন। বুঝা গেল এই হাদীস অনুসারে তিনি আল্লাহ্‌র নবীই হবেন। অন্যথায় একথা মানতে হবে যে, তিনি নবী নন আর হযরত ঈসা (আ:) জীবিত আকাশে বসে আছেন তিনি পরে আসবেন। যদি একবার নবুয়ত অস্বীকার করেন তাহলে কার্যত: কথা যা দাঁড়াবে তাহলো, পূর্বের ঈসা (আ:) তাঁর জন্য নির্ধারিত সময়ে আসবেন এবং তিনি নবী হবেন। এর অর্থ হলো এদের একথা মেনে, আপনি তাদের একথাও স্বীকার করলেন যে, হযরত ঈসা (আ:)ও আকাশে জীবিত আছেন। যেভাবে আমি বলেছি, একথার জের স্বরূপ আপানাকে ধাপে ধাপে অনেক কিছু পরিত্যাগ করতে হবে। মহানবী (সা:) আগমনকারী ঈসা ইবনে মরিয়ম বা মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে নবী বলেছেন। মোটকথা যেসব আহ্‌মদী পুরো বিষয় অবহিত নয় তাদের কাছে এটি সুস্পষ্ট হওয়া চাই যে, যদি একটি বিষয় অস্বীকার করেন তাহলে অন্য দাবীকেও অস্বীকার করতে হবে। তাই নির্ভীকভাবে কোনরূপ হীনমন্যতার আশ্রয় না নিয়ে তাই বলুন যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) দাবী করেছেন এবং মহানবী (সা:) যা ঘোষণা করেছেন।

হুযূর বলেন, কেননা আহ্‌মদীদের জন্য এই শুভ সংবাদ রয়েছে যে, তারা সত্যের জ্যেতির মাধ্যমে অন্যের মুখ বন্ধ করে দেবে সুতরাং এতে চিন্তিত হওয়ার কি আছে!

হযরত মসীহ্ মওউদ (আঃ) সুরা ফাতিহার আয়াতের তফসীর করতে গিয়ে এক স্থানে বলেন,

‘এই সূরার ষষ্ঠ আয়াত হলো اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيم এটি যেন এ কথার ইঙ্গিত বহন করে যে, ষষ্ঠ সহস্রের অমানিশা স্বর্গীয় হেদায়াত প্রত্যাশা করবে আর মানুষের সুস্থ্য প্রকৃতি খোদার সন্নিধান থেকে একজন হেদায়াতদাতা অর্থাৎ মসীহ্ মওউদকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে।’ (তোহফা গোলড়বিয়া-পৃ: ১১২-টিকা)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) খুতবা ইলহামিয়ায় এক স্থানে বলেন:

‘খোদার কসম কুরআন শরীফ যা সকল মতভেদের মিমাংসাকারী; এর কোথায়ও উল্লেখ নেই যে, মুহাম্মদী ধারার খাতামুল খোলাফা মূসায়ী ধারা থেকে আসবেন। তোমাদের কাছে যে বিষয়ের কোন প্রমাণ নেই তার অনুসরণ করবেনা।তোমাদেরকে এর বিপরীত কথা শিখানো হয়েছে। সুতরাং তোমরা বহুমুখী কথা বলবেনা কেননা সেগুলো এমন যা অন্ধকারে ছোড়া তীর সদৃশ আর যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সত্য, তাই তোমরা প্রতারিত হবেনা। সূরা ফাতিহায় দ্বিতীয়বার এ প্রতিশ্রুতির দিকে ইশারা করা হয়েছে। তোমরা সূরা ফাতিহার এই আয়াত অর্থাৎ صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِم নিজেদের নামাযে পড়ে থাক তা সত্ত্বেও বিভিন্ন টালবাহানা করে আর খোদার প্রতিষ্ঠিত প্রমাণকে প্রত্যাখ্যানের পরামর্শ কর। তোমাদের কি হয়েছে যে, খোদার কথাকে পদতলে পিষ্ট করছ? তোমরা কি একদিন মরবেনা? তোমারা কি জিজ্ঞাসিত হবে না? (খুতবা ইলহামিয়াহ্-পৃ: ৬৩-৬৪)

হযরত মসীহ মওউদ (আ:) তাঁর কিশতিয়ে নূহ্ গ্রন্থে اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيم এর একটি সুন্দর তফসীর উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন যে, এই আয়াতে মুহাম্মদী ধারা হতে মসীহ মওউদ এর আগমনের কথা প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন:

‘মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে? সে-ই যে বিশ্বাস করে- খোদা সত্য এবং মুহাম্মদ (সা:) তাঁর এবং তাঁর সৃষ্ট সকল জীবের মধ্যে যোজক স্থানীয় এবং আকাশের নিম্নোক্ত তাঁর সম-মর্যাদাবিশিষ্ট আর কোন রসূল নেই এবং কুরআনের সমতুল্য আর কোন গ্রন্থ নেই। অন্য কোন মানবকেই খোদা তা’লা চিরকাল জীবিত রাখতে ইচ্ছে করেন নি কিন্তু তাঁর এই মনোনীত নবীকে তিনি চিরকাল জীবিত রেখেছেন। এবং তাঁকে চিরকাল জীবিত রাখার মানসে খোদা তা’লা তাঁর শরিয়ত এবং আধ্যাত্মিক শক্তিকে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণবর্ষী করেছেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’লা এই যুগে তাঁরই আধ্যাত্মিকতার প্রসাদে এই প্রতিশ্রুত মসীহ্কে জগতে প্রেরণ করেছেন, যার আগমন ইসলামের প্রাসাদটিকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য একান্ত আবশ্যক ছিলো। কারণ, ইহজগতের সময়সীমা অবসান হবার পূর্বে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর ধর্মে একজন আধ্যাত্মিক মসীহ্‌র আবির্ভাব হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেমন ইতিপূর্বে মূসা (আ:)-এর ধর্মে এসেছিলেন। এই তত্বের প্রতিই কুরআন শরীফের اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ এই আয়াত ইঙ্গিত করছে।’ (কিশতিয়ে নূহ পৃ: ১৩)

সুতরাং এ হলো, ইসলাম এবং মহানবী (সা:)-এর সব ধর্ম ও সকল নবীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ; অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত এখন মহানবীর শরিয়ত এবং তাঁর আধ্যাত্মিকতার কল্যাণধারা প্রবহমান থাকবে আর মসীহ্ মওউদ এবং মাহ্‌দী এই উম্মত থেকেই আসার কথা এবং এসেছেন। তারা পৃথক কোন ব্যক্তিত্ব নন। এক হাদীস অনুসারে উভয় উপাধি একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তাই তাকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া এখন আর কোন উপায় নেই।

اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) অন্যত্র বলেন যে, এ দোয়ায় আগত ইমামকে মানার নির্দেশ রয়েছে। তিনি (আ:) তাঁর রচিত জরুরতুল ইমাম গ্রন্থে বলেন:

‘পবিত্র কুরআনে পার্থিব সমাজ ব্যবস্থার বিষয়ে বাদশার অধিনস্ত হয়ে জীবন যাপনের উপর যেরূপ গুরত্বারোপ করেছে, তদ্রুপ তাগিদ আধ্যাত্মিক ব্যবস্থার ব্যাপারেও রয়েছে। এর প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ তা’লা এ দোয়া শিখিয়েছেন:(সূরা আল্ ফাতিহা:৬-৭) اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ অতএব চিন্তা করা উচিত যে, এমনিতো কোন বিশ্বাসী বরং কোন সাধারণ মানব বা জীব-জন্তুও খোদা তা’লার দান হতে বঞ্চিত নয়, কিন্তু কেউ এটি বলতে পারবে না যে, সেগুলোর অনুসরণের জন্যও খোদা তা’লা আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, যাদের উপর পরম ও চরম আধ্যাত্মিক পুরস্কার বর্ষিত হয়েছে, আমাদেরকে তাঁদের পথে চলার এবং তাদের অনুগমন করার শক্তি দাও। অত্রএব এই আয়াতে এর প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তুমি যুগ ইমামের অনুগামী হও। স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, ‘যুগ ইমাম’ শব্দটিতে নবী, রসূল, মুহাদ্দাস ও মুজাদ্দিদ সকলেই অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু যারা আল্লাহ্‌র সৃষ্টির সংশোধন ও পথ প্রদর্শনের জন্য আদিষ্ট হন না এবং তদুপযোগী কামালত বা উৎকর্ষও প্রদত্ত হননি, তারা ওলী বা আবদাল হলেও ‘যুগ ইমাম’ হতে পারেন না।’ (জরুরতুল ইমাম-পৃ: ২৩-২৪)

হুযূর বলেন, সম্প্রতি এমটিএ’-তে ইমাম সাহেব, মোমেন সাহেব ও আসেফ বাসেত সাহেবরা পার্সিকিউশন (আহ্‌মদীদের উপর বিরোধিতা সংক্রান্ত) এর উপর একটি অনুষ্ঠান পরিবেশন করছিলেন। একজন অ-আহ্‌মদী আলেম যিনি আমেরিকায় সববাস করলেও সেসময় এখানে ছিলেন তিনি এমটিএ’-তে ফোন করেন এবং বলেন যে, এ অনুষ্ঠান আমি দেখেছি আপনারা কিছু হাদীস ভুল পড়েছেন এবং অন্য কিছু কথা ভুল বলেছেন। আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই। আমাদের একজন কর্মী এখান থেকে গিয়ে তার সাকুল্য বক্তব্য রেকর্ড করে নিয়ে আসে। যাইহোক আহ্‌মদীয়াতের শত্রুতায় তিনি অনেক কিছু বলেছেন যা তার কথায় সুস্পষ্ট। এর বিস্তারিত উত্তর তার প্রশ্ন অনুসারে সেই অনুষ্ঠানে পুনরায় প্রদান করা হবে। কিন্তু একটি কথা যা তিনি বলেছেন তা সাধারণ কথা যা অ-আহ্‌মদীরা হরহামেশা বলে থাকে অথাৎ ‘রা’ফা’র অর্থ হযরত ঈসার আধ্যাত্মিক ‘রা’ফা’ নয় যা আহ্‌মদীরা করে থাকে বরং এর অর্থ হলো স্বশরীরে আকাশে যাওয়া। যাই হোক একটি কথা আমার জন্য নুতন ছিল। বলেন যে, ‘আপনারা হযরত ঈসা’কে এজন্য মারতে চান কেননা, আহ্‌মদীয়াতের জীবন এতেই নিহীত।’ যাইহোক তিনি নিজের যথেষ্ট জ্ঞান প্রকাশ করেছেন, জামাতের বই পুস্তকও কিছুটা পড়েছেন আর তিনি পড়ার দাবীও করেছেন, হয়তোবা কিছুটা পড়েও থাকবেন। কিন্তু যদি তিনি মনোযোগ সহকারে চিন্তা করেন তাহলে বুঝবেন যে, আহ্‌মদীয়াতের জীবন নয় বরং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেছেন ঈসার মৃত্যুতে ইসলামের জীবন নিহীত। তিনি (আ:) বলেন,

‘ঈসাকে মরতে দাও এতেই ইসলাম জীবিত হয়’। কেননা খৃষ্টানরা এ কৌশল অবলম্বন করেই দুর্বল মুসলমানদের সামনে হযরত ঈসার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করে। যদিও এখন অনেক মুসলমান আলেমও এ বিষয়টি আর উঠায় না কিন্তু এখনও অনেক এমন আলেম আছেন, পাশ্চাত্যে বসবাসকারী শিক্ষিত আলেমও রয়েছে যারা হযরত ঈসা (আ:)-এর আকাশে জীবিত থাকা এবং শেষে যুগে কোন সময় অবতরণের বিশ্বাস পোষণ করে। অতএব আমরা যুক্তির মাধ্যমে হযরত ঈমার মৃত্যু প্রমাণ করে ইসলামকে জীবিত ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছি। আর মুহাম্মদী মসীহ্কে মূসায়ী মসীহ্‌র প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করি উদ্দেশ্য হলো, ইসলামকে জীবিত ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করা। কেননা আমাদের দাবীই এটি যে, আমরা যা কিছু করি ইসলামের জন্য করি এবং আহ্‌মদীয়াত কি? তা হচ্ছে সত্যিকার ইসলাম। যে খৃষ্টান আহ্‌মদীয়াতের তবলীগের কারণে ইসলাম গ্রহণ করে সে এ কারণেই ইসলাম গ্রহণ করে। যখন তাদের সামনে হযরত ইসা (আ:)-এর মৃত্যু সাব্যস্ত হয়ে যায়, তখন এটা না মেনে তাদের অন্য কোন উপায় থাকে না আর ইসলাম যে জীবন্ত ধর্ম তা তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় আর তাদের নিজ ধর্মের অসারতা তাদের নিকট প্রকাশ পায়। যাইহোক, যেমন কিনা আমি বলেছি এ ভদ্রলোকও যদি পবিত্র অন্ত:করণে আল্লাহ্ তালার নিকট দোয়া করে, আল্লাহ্ তা’লার দরবারে ক্রন্দন করে এবং اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ এর পথে চলার একটি বেদনা সৃষ্টি করেন, যদি তার অন্তর পবিত্র ও কলুষমুক্ত হয় তবে এটা অসম্ভব নয় যে আল্লাহ্ তা’লা তার উপর করুণা করবেন। কেননা যদি ইসলাম প্রেমিকরা ইসলামের বিজয়ে কোন আগ্রহ রাখে তবে স্বরণ রাখুন যে, মসীহ্ ও মাহ্‌দী যার আবির্ভাব ঘটেছে তার সাথেই এই উন্নতী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতদ্ব্যতীত এখন আর অন্য কোন চেষ্টা সফলকাম হতে পারেনা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) খোদা তা’লার নামে এ কথা ঘোষণা করেছেন। আর আল্লাহ্ তা’লার ফযলে বিগত ১২০ বছর ধরে আমরা এর সত্যতা অবলোকন করছি। তিনি বলেন,

‘প্রায় ২০ বছর অতিবাহিত হলো যে, আমার উপর কুরআনের এ আয়াত ইলহাম হয়েছে তা হলো:- هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ (সূরা আস্ সাফ্‌ফ: ১০) সেই খোদা যিনি নিজ রসূলকে হেদায়াত এবং সত্যধর্ম সহকারে পাঠিয়েছেন যেন স্বীয় ধর্মকে সকল ধর্মের উপর জয়যুক্ত করেন। এবং আমাকে এই ইলহামের এ অর্থ বুঝানো হয়েছে যে, ইসলামকে সকল ধর্মের উপর আমার মাধ্যমে জয়যুক্ত করার উদ্দেশ্যে আমি খোদা তা’লার পক্ষ হতে প্রেরিত হয়েছি। আর এ ক্ষেত্রে স্বরণ থাকে যে, এটি হচ্ছে পবিত্র কুরআনের এক মহান ভবিষ্যদ্বাণী। এ সম্পর্কে উলামা ও চিন্তাবিদগণ একমত যে, এটি মসীহ্ মওউদ এর হাতে পূর্ণতা লাভ করবে। অতএব আমার পূর্বে যে সকল আউলিয়া ও আবদাল অতীত হয়েছেন এবং তাদের কেউ নিজেদেরকে এ ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূরণস্থল সাব্যস্ত করেন নি এ দাবীও করেননি যে, উল্লেখিত আয়াত আমার সম্পর্কে আমার প্রতি ইলহাম করা হয়েছে। কিন্তু যখন আমার সময় আসলো তখন আমার উপর এই ইলহাম হলো এবং আমাকে বলা হয়েছে যে, এ আয়াতের সম্বোধক তুমি এবং তোমারই হাতে আর তোমারই যুগে ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব অপরাপর ধর্মের উপর প্রমাণিত হবে।’ (তিরইয়াকুল কুলুব-পৃ: ৪৮)

আবার তিনি বলেন,

‘সেই খোদা যিনি নিজ প্রত্যাদিষ্টকে প্রেরণ করলেন, তাঁকে দু’টি বিষয়সহ প্রেরণ করেছেন। প্রথমত: এই যে, তাঁকে হেদায়াতরূপী পুরস্কারে ভূষিত করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিজ পথ সনাক্ত করার জন্য তাঁকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টি দান করেছেন।’

সেই হেদায়াতকে অর্জন করার জন্য আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে আধ্যাত্মিক চক্ষু দান করেছেন যার পরম লক্ষ্য হলো হেদায়াত প্রদান করা।

‘আর ইলমে লুদুন্নী দ্বারা তাঁকে স্বাতন্ত্রতা দান করলেন।’

অর্থাৎ এমন জ্ঞান দান করেছেন যা বিনা চেষ্টায় অর্জিত হয় যা আল্লাহ্ তা’লা নিজ সন্নিধান হতে অযাচিতভাবে দান করেছেন।

‘আর দিব্যদর্শন ও ইলহাম দ্বারা তাঁর অন্তর আলোকিত করেছেন। আর এভাবে ঐশী তত্ত্বজ্ঞান, প্রেম-প্রীতি ও ইবাদতের যে দায়িত্ব তার উপর ছিল তা পালনের জন্য তিনি তাকে সাহায্য করেছেন আর এ জন্যই তাঁর নাম মাহ্‌দী রেখেছেন।’

এ সবকিছু যা পিছনে বর্ণিত হয়েছে এর পাশাপাশি তিনি তাঁর নাম মাহ্‌দী রেখেছেন।

‘দ্বিতীয় বিষয় যার দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছেন তাহলো সত্য ধর্মের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকভাবে রুগ্নদের আরোগ্য দান করা অর্থাৎ শরিয়তের শতশত সমস্যা ও জটিল বিষয়াদির সমাধান করে হৃদয় সমূহ থেকে সন্দেহ নিরসন করা। এ দৃষ্টিকোন থেকে তার নাম ঈসা রেখেছেন অর্থাৎ রুগ্নদের নিরাময়দাতা। বস্তুত: এ আয়াতের দু’টো বাক্যাংশ অর্থাৎ بِالْهُدَى এবং دِينِ الْحَقّ এর প্রথমটি থেকে প্রতিভাত হয় যে, সে-ই প্রেরিত মাহ্‌দী খোদার হাতে পরিশুদ্ধ হবেন আর খোদাই তাঁর শিক্ষক হবেন। আর দ্বিতীয় বাক্যাংশ دِينِ الْحَقّ থেকে প্রতিভাত হয় যে, তিনিই হলেন প্রেরিত ঈসা, যাকে পীড়িতদের আরোগ্য করা এবং রুগ্নদেরকে তাদের ব্যাধি সম্পর্কে সাবধান করার জন্য জ্ঞান দান করা হয়েছে আর সত্য ধর্ম দেয়া হয়েছে যেন তিনি সকল ধর্মের অনুসারীদের নত করতে পারেন, পরিশুদ্ধ করতে এবং ইসলামী আরোগ্য নিকেতনের প্রতি আকর্ষণ করতে পারেন। কেননা ইসলামের গুণাবলী ও শ্রেষ্টত্ব সার্বিকভাবে সকল ধর্মের উপর প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত তাই তার অপরাপর ধর্মের গুণ ও দোষ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।’

অর্থাৎ এমন জ্ঞান দেয়া হবে যদ্দারা অন্য ধর্মের গুণ ও দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে স��্যক অবহিত হতে পারবে, বুৎপত্তি লাভ হবে।

‘আর অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ প্রতিষ্ঠা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে তার অলৌকিক যোগ্যতা লাভ হওয়া আবশ্যক।’

অর্থাৎ ‘ইকামাতে হুজাজ’ এমনসব দলিল-প্রমাণ ও নিদর্শন যা সর্বদা স্থায়ী থাকবে তা তাঁকে দেয়া হবে এবং ‘ইফহামে খসম’ অর্থাৎ দলিল-প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে বিরুদ্ধবাদীদের প্রশ্ন এবং বিতর্কের উত্তর দেয়ার ক্ষমতা আগমনকারীকে দেয়া হবে। বিশেষভাবে একটি নিদর্শনরূপে তাঁকে এটি প্রদান করা হবে।

‘যেন সকল ধর্মের অনুসারীদের তাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে সাবধান করতে পারেন।’

অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীকে যেন তাদের মন্দকর্ম সম্বন্ধে সতর্ক করেন।

‘আর সকল অর্থে যেন ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেন, সকলভাবে আধ্যাত্মিক রোগীদের যেন চিকিৎসা করতে পারেন। বস্তুত আগত সংস্কারককে দু’টো যোগ্যতা দেয়া হয়েছে যিনি খাতামুল মুসলেহীন (সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক)। একটি ইলমুল হুদা যা মাহ্‌দী নামের দিকে ইশারা করে, যা মুহাম্মদী বৈশিষ্ট্যের বিকাশ অর্থাৎ নিরক্ষরতা সত্ত্বেও জ্ঞানপ্রাপ্ত হওয়া।’

অর্থাৎ জ্ঞানহীন হওয়া সত্বেও খোদা স্বয়ং শিখান আর এটিই মাহ্‌দী হবার চিহ্ন।

‘দ্বিতীয়ত: সত্যধর্মের শিক্ষা দেয়া যা নিরাময়ী নি:শ্বাষের ইঙ্গিত বহণ করে।’

যা আধ্যাত্মিক আরোগ্যের প্রতি ইশারা করে।

‘অর্থাৎ সার্বিক দৃষ্টিকোন থেকে আধ্যাত্মিক ব্যাধি দূর করা ও পুরো যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের শক্তি প্রাপ্ত হওয়া। হেদায়েতরূপী জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য এই ঐশী কৃপার উপর নির্ভর করে যা মানুষের মাধ্যম ছাড়া খোদা তা’লার পক্ষ থেকে লাভ হয়। এবং ‘দ্বীনুল হক’ জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য মানুষের কল্যাণ, হৃদয়ের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার দলীল বহণ করে।’ (আরবাঈন, নাম্বার-২-পৃ: ৯-১০)

অর্থাৎ প্রথমে তাঁকে জ্ঞান দান করেছেন, তিনি নিজে শিখে পরে তা প্রসার করেছেন যাতে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। অতএব এ হলো খোদা প্রেরিত মসীহ্ ও মাহ্‌দীর পদমর্যাদা যাকে খোদা তা’লা এযুগে পৃথিবীবাসীর হেদায়াত ও ইসলামের নুতন জীবনের জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে ইসলামের সমুজ্জল শিক্ষা মানুষের সামনে সুস্পষ্ট ও প্রতিভাত হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা’লা পৃথিবীবাসীকে এই মসীহ্ ও মাহ্‌দীকে গ্রহণের তৌফীক দান করুন আর আমাদের তৌফীক দিন আমরা যেন হাদী খোদার প্রেরিত মাহ্‌দীর শিক্ষা অনুসারে যে পথে বিচরণ করছি তার উপর অবিচলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি আর কখনও যেন হোঁচট না খাই এবং সে গন্তব্যের দিকে ধাবমান থাকি যা আমাদেরকে খোদার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে।

খুতবার শেষাংশে হুযূর সম্প্রতি প্রয়াত চারজন আহ্‌মদী নারী-পুরুষের বিবরণ পেশ করে তাদের জন্য দোয়ার আহবান জানান এবং নামাযান্তে তাঁদের গায়েবানা জানাযার নামায পড়ান।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে