In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহ্ তা’লার ঐশী গুণ ‘আল্- কাফী’ (আল্লাহ্ই যথেষ্ট) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৬ই জানুয়ারী ২০০৯ইং

‘পবিত্র কুরআনের আলোকে আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্- কাফী’ (আল্লাহ্ই যথেষ্ট) সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর আনোয়ার (আই:) বলেন, যে মু’মিন খোদা তা’লার সিফাত বা ঐশী গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত তিনি এটি ভাল করেই জানেন যে, আল্লাহ্ তা’লার একটি গুণবাচক নাম বা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘কাফী’ (যথেষ্ট)। ঐশী গুণাবলীর জ্ঞান না থাকলেও অনেকেই এমন আছেন যারা পরিবেশ বা সমাজের প্রভাবে খোদার গুণবাচক নামের বরাতে কথা বলে থাকেন। আল্লাহ্ তা’লার কাফী বৈশিষ্ট্য এমন একটি বৈশিষ্ট্য একজন মুসলমান কখনও না কখনও কোন না কোন বরাতে তার উল্লেখ করেই থাকে। অনেক সময় স্বল্পেতুষ্ট বা কৃতজ্ঞ না হলেও বারবার শোনার কারণে মানুষ কথার কথা হলেও এবাক্য বলে থাকে যে, আল্লাহ্ কাফী বা আল্লাহ্ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু একজন মু’মিন যখন খোদার গুণাবলী সম্পর্কে কথা বলেন তখন তিনি হৃদয়ের গভীর থেকেই তা বলেন। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনের অগণিত স্থানে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে তাঁর এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

আরবী অভিধানে এই শব্দের বিভিন্ন অর্থ করা হয়েছে। অভিধান গ্রন্থ ‘লেইন’ থেকে আমি কাফী শব্দের কয়েকটি অর্থ উপস্থাপন করছি। ‘কাফা’ কোন জিনিষ যথেষ্ট হওয়া, কোন জিনিষ বা কোন কিছুতে তুষ্ট হওয়া, কারো উপর নির্ভর করা বা প্রশান্তি বোধ করা। প্রকৃত অর্থে খোদা তা’লা ছাড়া অন্য কেউ মানুষের আত্মার প্রশান্তির কারণ হতে পারে না। ‘কাফা ইয়াক্‌ফী কিফায়াতান’ এর অর্থ হচ্ছে, যখন কোন মানুষ কোন কাজের জন্য দন্ডায়মান হয়। ‘কাফানী ফুলানুন আল্ আমরা’ এর অর্থ হচ্ছে, ‘কোন বিশেষ বিষয়ে অমুক ব্যক্তির উপর আমি নির্ভর করেছি অথবা বা তার উপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে। অর্থাৎ যদি ভালো কিছু হয় তা তার মাধ্যমে লাভ করেছি এবং যদি কোন অশুভ বিষয় থাকে তাহলে তার মাধ্যমে আমি তা থেকে রক্ষা পেয়েছি।’ অভিধান গ্রন্থে আরেকটি অর্থ করা হয়েছে, ‘কাফা মিনহু’ অর্থ হচ্ছে, ‘কোন জিনিষ কারো থেকে দূর করে এর অনিষ্ট থেকে তাকে বাঁচানো বা নিরাপদ রাখা।’ আবার যখন বলা হবে যে, ‘কাফাহু আল্ শার্‌রা’ তখন এর অর্থ হবে, ‘সে মন্দকে দূরীভূত করে তার নিরাপত্তা বিধান করেছে এবং তাকে মুক্ত করেছে। এটি খোদা এবং বান্দা উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।’ যখন বলা হয় যে, ‘কাফাকা হাযাল আমরু’ তখন এর অর্থ হবে, ‘তোমার জন্য এই কর্ম যথেষ্ট।’

একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে,

من قرأَ الآيتين من آخر سورة البقرة في ليلة كَفَتاه أَي أَغْنَتاه عن قيام الليل

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সূরা বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করবে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ, সেই দু’টি আয়াত তাকে রাতের বেলা দন্ডায়মান হবার কারণে তাকে পরবিমুখ করবে।’

অনেকে এর অর্থ করেছেন, রাতের বেলা তাহাজ্জুদের সময় যদি অন্তত পক্ষে এ দু’টো আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তা হলে সংখ্যার দিক থেকে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। অনুরূপভাবে অনেকে এর অর্থ করেছেন, এই দুটো আয়াত অনিষ্টের মোকাবিলায় যথেষ্ট এবং এ দু’টি আয়াত সৃষ্টির অনিষ্টের মোকাবেলায় মানুষের জন্য রক্ষা কবচ। এ আয়াত দু’টির প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে যে, এতে অনেক মূল্যবান বিষয়ের প্রতি আল্লাহ্ তা’লা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এতে দোয়ার পাশাপাশি ক্ষতিকর বিষয় থেকে রক্ষা পাবার রীতি-নীতি আর ঈমানের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা লাভের উপায় শিক্ষা দেয়া হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে হাদীস অনুসারে মনে হয় যেন এ আয়াতগুলো পাঠ করাই যথেষ্ট হবে কিন্তু বিষয় এমন নয়। আমি এখন এই দু’টি আয়াতের সূত্র ধরে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করবো:-

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

অর্থ: ‘এই রসূল স্বয়ং তার উপর ঈমান রাখে যা তার প্রতি তার প্রভুর পক্ষ হতে নাযেল করা হয়েছে এবং অপরাপর মু’মিনগণও; তারা সবাই আল্লাহ্ এবং তাঁর ফিরিশ্তা, কিতাবসমূহ, এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান রাখে; এবং তারা বলে, আমরা রসূলদের কারো মধ্যে কোন পার্থক্য করি না। এবং তারা বলে, আমরা শ্রবণ করলাম এবং আনুগত্য করলাম; হে আমাদের প্রভু! আমরা তোমার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন।’ (সূরা আল্ বাকারা: ২৮৬)

لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْساً إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْراً كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلا تُحَمِّلْنَا مَا لا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

অর্থ: ‘আল্লাহ্ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন না। সে যা ভাল উপার্জন করবে তা তার জন্যই কল্যাণকর হবে এবং যা মন্দ উপার্জন করবে তা তারই বিপক্ষে যাবে। হে আমাদের প্রভু! যদি আমরা ভুলে যাই বা ত্রুটি-বিচ্যুতি করি, তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না; হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন দায়িত্বভার অর্পণ করো না যেরূ��� দায়িত্বভার তুমি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছিলে। হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন বোঝা চাপিও না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই; তুমি আমাদেরকে মার্জনা কর���, আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি রহম কর���, কারণ তুমিই আমাদের অভিভাবক, অতএব কাফির জাতির বিরুদ্ধে তুমি আমাদেরকে সাহায্য করো।’ (সূরা আল্ বাকারা: ২৮৭)

হুযূর বলেন, এ আয়াতের অর্থ শুনে নিশ্চয় আপনারা বুঝতে পারছেন যে, কেন মহানবী (সা:) রাতের বেলা এ আয়াত দু’টি পাঠ করাকে যথেষ্ট বলেছেন। প্রথম আয়াতে আত্মশুদ্ধির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে। ফিরিশ্তা ও রসূলদের প্রতি ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে। কেবল মৌখিকভাবে পাঠ করাই যথেষ্ট নয় এর মর্মার্থ অনুধাবন করে ব্যবহারিক জীবনে এর প্রতিফলন ঘটানো আবশ্যক। সর্বদা এটি দৃষ্টিপটে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস বা ঈমান তখনই দৃঢ় হয় যখন তোমরা ত্বাকওয়া বা খোদা ভীতিতে ক্রমোন্নতি করতে থাকবে। খোদার ফিরিশ্তাদের প্রতি বিশ্বাসের অর্থ হলো: এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, তাদের কাজ থেমে যায়নি বরং নিরন্তর তারা কাজ করে যাচ্ছেন। অনুরূপভাবে পূববর্তী নবীদের প্রতি যেসব ঐশী গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে তা খোদার পক্ষ থেকে ছিল; কালের প্রবাহে তা বিকৃতির শিকার হলেও খোদা তা’লা এর মূল শিক্ষামালাকে পবিত্র কুরআনে সংরক্ষণ করেছেন আর এভাবে অতীত ঐশী গ্রন্থের সত্যায়ন হয়েছে। খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত সব ধরনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে মুক্ত রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। এ আয়াতের আরেকটি দিক হলো, সকল নবীদের উপর বিশ্বাস রাখার নির্দেশ। এটি ইসলামেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য অন্য কোন ধর্মে এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া ভার। এখানে একথা বলা হয়নি যে, অতীতের সকল নবীদের প্রতি ঈমান রাখো বরং বলা হয়েছে সকল নবীর উপর ঈমান আনো, অর্থাৎ ভবিষ্যতে আগমনকারীর উপরও ঈমান আনো। পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা:) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আগমনের পথ উম্মোচন করে ভবিষ্যতে আগমনকারী রসূলদের মান্য করা এবং তাদের প্রতি ঈমান আনারও সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান যুগের নামধারী মোল্লাদের দুর্ভাগ্য যে, তারা আল্লাহ্‌র সুন্নত বা রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেভাবে মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আগমন প্রতীক্ষায় রত যা খোদার নিয়ম বিরোধী। পবিত্র কুরআনের প্রতি বিশ্বাস রাখার দাবী করা সত্বেও তারা কুরআনের শিক্ষা বিরুদ্ধ কাজ করছে। যেমন, আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, হযরত ঈসা (আ:) মৃত্যুবরণ করেছেন আর যে কেউ এ ধরায় জন্ম নিবে সে কোনভাবেই শুধু এই জড়দেহের উপর ভর করে আকাশে যেতে পারবে না বরং তার রূহ বা আত্মা আকাশে যাবে। এ পৃথিবীতে যে জন্ম নিবে তাকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে কেননা সবকিছুই লয়শীল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে অস্বীকার করে এরা নিজেদের সব রসূলের প্রতি ঈমান আনার দাবীও মিথ্যা প্রমাণ করছে। আর সাধারণ মুসলমানকে নিজেদের মনগড়া বিশ্বাস দ্বারা প্রতারিত করছে। এদের কিছুটা হলেও বিবেক খাটানো উচিৎ কেননা এরা কুরআন এবং হাদীস পাঠ করে; তাদের জানা আবশ্যক যে, অন্যান্য নবী রসূলগণ যেভাবে এসেছেন সেভাবেই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) আবির্ভূত হবেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) খোদার পক্ষ থেকে আবির্ভূত হবার দাবী করেছেন এবং নিজের সত্যতার স্বপক্ষে দলীল-প্রমাণও দিয়েছেন আর খোদার পক্ষ থেকে ব্যবহারিক সমর্থনও তাঁর সত্যতার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন এদের উচিত বিবেক খাটানো এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জামাতভূক্ত হওয়া। সেই দলে এদের যোগ দেয়া উচিত যারা বলে, সামি’না ও আত্বা’না আর এই কর্মই ‘গুফরানাকা রব্বানা’র দোয়া গৃহীত হওয়ার কারণ হবে। অর্থাৎ, হে আমাদের প্রভু! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সুতরাং আল্লাহ্‌র দিকে প্রত্যাবর্তনের ফলে এই জান্নাত লাভ হবে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের মুসলমান ভাইদেরকে এই বাস্তবতা অনুধাবন করার তৌফিক দিন। আল্লাহ্ তা’লা সূরা বাকারার শেষ আয়াতটি لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْساً إِلَّا وُسْعَهَا বাক্য দিয়ে আরম্ভ করেছেন। অর্থাৎ, খোদা যা বলেছেন তা মানুষের সাধ্যের ভেতর রয়েছে, তিনি কোন সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না। অনেকেই বলে, খোদার অমুক নির্দেশ পালন করা খুবই কষ্টসাধ্য অথচ এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা পরিস্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি মানুষের উপর কোন সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না। এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

আমাদের জন্য নির্দেশ হলো, সকল নৈতিক গুণাবলী এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে মহানবী (সা:)-এর অনুসরণ করা। অতএব আমাদের প্রকৃতি এবং বৃত্তি’তে যদি রসূলে করীম (সা:)-এর সকল আধ্যাত্মিক পরাকাষ্ঠাকে অবলম্বন করার শক্তি না রাখা হতো তাহলে কখনই তাঁকে অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হতো না। কেননা আল্লাহ্ তা’লা মানুষের উপর সাধ্যাতীত কোন দায়িত্বভার অর্পণ করেন না। তিনি স্বয়ং ঘোষণা করেছেন যে, لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْساً إِلَّا وُسْعَهَا

এরপর হুযূর আয়াত দু’টির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আহ্‌মদীদেরকে বুঝে-শুনে এ আয়াত দু’টি পাঠ করার উদ্বাত্ত আহবান জানান। প্রথম আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা ঈমান দৃঢ় বা মজবুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। খোদার প্রতিটি নির্দেশ আমাদেরকে শিরোধার্য করতে হবে। আমরা খোদার কিছু কথা মানবো আর কিছু মানবো না! এমনটি হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ্ বলেছেন, তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে মহানবী (সা:)-এর আদর্শ। তোমরা তাঁর আদর্শের অনুসরণ করো। খোদা তা’লা তাঁর বান্দার প্রতি বড়ই মমতাশীল তাই তাঁর সকল নির্দেশ মান্য করা মানুষের সাধ্য ও সামর্থের অন্তর্গত।

হুযুর বলেন, সূরা বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করলে ধর্মীয় দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বরং আমল ও অনুশীলন আবশ্যক। এ আয়াত দু’টি পাঠের কল্যাণে মানুষ আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করে; সে রাতের বেলা স্বীয় মুক্তির জন্য দন্ডায়মান হয়। রাতের প্রিয় ঘুম হারাম করে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে। শুধু আল্লাহ্ তা’লার করুণার ফলেই এ আয়াত দু’টি মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে আর শুধু তখনই ইবাদত এবং সৎকর্মের প্রতি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে। নতুবা যদি কেউ এ কথা মনে করে যে, এ আয়াত দু’টি পাঠ করাই যথেষ্ট, তাদের ধারণা ভুল কেননা আল্লাহ্ বলেন,

لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ

অর্থ: সে যা ভাল কাজ করবে তা তার জন্যই কল্যাণকর এবং যা মন্দ উপার্জন করবে তা তারই বিপক্ষে যাবে।

এত্থেকে বুঝা যায় যে, এই আয়াতগুলো কেবল মৌখিকভাবে আওড়ানো যথেষ্ট নয় বরং নিজেদের ইবাদত এবং সৎকর্মের প্রতি সদা-সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে; তাহলেই বান্দা খোদার নৈকট্য ও ক্ষমা লাভ করবে। প্রত্যহ এ আয়াত পাঠ করলে পুণ্যকর্মের প্রতি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে এবং আত্মবিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে। একজন মু’মিন যেহেতু জানে যে, সে তার প্রবৃত্তি দ্বারা প্রতারিত হতে পারে তাই সে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য দোয়া করে,

হে আমাদের খোদা! যদি আমি প্রতারিত হই তাহলে নিজ করুণায় আমাকে ক্ষমা করো।

আয়াতের বাক্যাবলী মু’মিনকে খোদার সামনে অবনত করে আর আত্মশুদ্ধির জন্য এ বাক্যাবলী একান্ত আবশ্যক। নিষ্ঠা এবং একান্ত আন্তরিকতার সাথে যদি কেউ এ দোয়া করে তাহলে তার দোয়া খোদার দরবারে গৃহীত হবে। শেষ আয়াতে আল্লাহ্ প্রথম যে দোয়া শিখিয়েছেন তাহলো,

رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না যদি আমরা ভুলে যাই বা ত্রুটি-বিচ্যুতি করি।’

অর্থাৎ হে খোদা! আমরা তোমার নির্দেশ পালন করার চেষ্টা করবো, আদেশ নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করবো। মানুষের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করবো। মানবিক দুর্বলতা এবং আলস্যহেতু যদি আমাদের দ্বারা কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, সৎকর্মের সময় শয়তানের কুমন্ত্রণা যদি আমাদেরকে পদস্খলিত করে তাহলে তুমি আমাদে��কে ধৃত না করে কৃপা ও একান্ত করুণাবশত: নিজ সন্তু��্টির পথে পরিচালিত করে। এরপর দ্বিতীয় দোয়া শিখানো হয়েছে:

رَبَّنَا وَلا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْراً كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا

অর্থ: হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন দায়িত্বভার অর্পণ করো না যেরূপ দায়িত্বভার তুমি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছিলে।

অর্থাৎ, হে খোদা! আমাদের কোন কর্ম যেন তোমার সন্তুষ্টি বহির্ভূত না হয়। আমরা যেন সর্বদা তোমার নির্দেশ মোতাবেক চলতে পারি। পূর্ববতীদের মত আমারা যেন ধৃষ্ট না হই। তারা তোমার নির্দেশকে অবজ্ঞার মত অপরাধ করেছে; তাই সকল কাজে সফলতা লাভের জন্য আমরা তোমার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। এমন কোন সময় যেন না আসে যখন আমাদের কর্মফল তোমা থেকে আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। কোনভাবেই আমরা যেন তোমার নির্দেশকে অবজ্ঞা না করি। এটি জানা কথা যে, খোদা কখনও মানুষের উপর এমন বোঝা চাপান না যা মানুষের জন্য অসাধ্য। সতিকার অর্থে মানুষ নিজের দুর্বলতার কারণই ব্যর্থ হয়, তাই আমাদেরকে দোয়া করতে হবে যে, হে আমাদের খোদা! আমরা যেন তোমার সাথে কৃত আমাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ না করি, যেভাবে পূর্ববর্তীরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তোমার শাস্তি পেয়েছে। إِصْر (ইছর) শব্দের একটি অর্থ হলো অঙ্গীকার বা চুক্তি, সেই দৃষ্টিকোন থেকেই আমি এ কথা বললাম। দোয়াটি হলো,

হে খোদা! পূর্ববতীরা তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা না করে শাস্তি পেয়েছে আমরা যেন এমন না হই।

এরপরে দোয়া শিখানো হয়েছে:

رَبَّنَا وَلا تُحَمِّلْنَا مَا لا طَاقَةَ لَنَا بِهِ

অর্থ: হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন বোঝা চাপিও না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।’

অনেক সময় আল্লাহ্ তা’লা মানুষের কাছ থেকে জাগতিক পরীক্ষা নেন। কোন পরীক্ষা বা সমস্যা দেখা দিলে বা অনাকাংখিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মু’মিন সর্বদা এ দোয়াতেই রত হয় যে, হে খোদা! তুমি আমাদেরকে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা করো। কোন পরীক্ষা যেন আমাদের জন্য সাধ্যাতীত না হয়। আমরা আমাদের দু:খের দিনে তোমাকে যেভাবে স্মরণ করি সেভাবেই সুখের দিনেও যেন তুমিই আমাদের ধ্যান ও জ্ঞানে থাক। আমরা যেন কোন অবস্থাতেই তোমাকে বিস্তৃত না হই। আধ্যাত্মিক পরীক্ষার পাশাপাশি জাগতিক পরীক্ষা থেকেও বাঁচার জন্যও মু’মিনকে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত কেননা জাগতিক পরীক্ষা অনেক সময় আধ্যাত্মিক পরীক্ষার কারণ হয়। খোদা তা’লা অনেক সময় সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের মাধ্যমেও পরীক্ষা নেন। আর এই উভয় প্রকার পরীক্ষা থেকে উত্তরোণের জন্যও খোদা তা’লাই দোয়া শিখিয়েছেন, وَاعْفُ عَنَّا অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত কোন ভুলের জন্য যদি পরীক্ষা এসে তাকে তাহলে তা তুমি অপসারণ করো। এরপর দোয়া শিখিয়েছেন, وَاغْفِرْ لَنَا আমাদেরকে ক্ষমা কর আর আমাদের অবস্থা সুধরে দাও। ‘গাফারা’ শব্দের একটি অর্থ হলো, ‘ঢাকা’ অপরটি হলো, বিষয়কে সঠিক খাতে পরিচালিত করা। আমাদের ভুল-ত্রুটি, দুর্বলতা দূর করে ভবিষ্যতে এমন কর্ম সম্পাদনের তৌফিক দাও যা তোমার সন্তুষ্টির কারণ হবে। وَارْحَمْنَا ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ভুল থেকে বাঁচার তৌফিক দাও আর এমন কাজ করার সৌভাগ্য দাও যা তোমার স্নেহের দৃষ্টি লাভে সহায়ক হবে। আমাদের কর্মের কারণে যেন তোমার দয়া স্তিমিত না হয়। أَنْتَ مَوْلانَا অর্থাৎ খোদার পবিত্র সত্ত্বাই পারে ক্ষমা ও করুণা করতে।

হুযূর বলেন, এক ব্যক্তির অন্যায় আচরণের কারণে মানুষ জামাতকে তির্যক দৃষ্টিতে দেখে, আবার অনেক সময় সামগ্রিকভাবেও দুর্বলতা প্রকাশ পায় আর জামাতের কর্মকর্তারা মানবিয় দুর্বলতা বশতঃ ভুল করে বসে। এ বিষয়ের প্রতি সদা যত্নবান থাকা চাই কেননা আপনার ভুল যেন অন্যকে জামাতের বিরুদ্ধে আঙ্গুল উঠানোর সুযোগ না দেয়। আমাদের ব্যক্তিগত ভুলের কারণে বিরুদ্ধবাদীরা যেন বলতে না পারে যে, মন্দকর্মের কারণে তোমরা ধৃত হচ্ছ। যদি অবস্থা এমন হয় তাহলে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত যে, হে খোদা! তোমার জামাতের পয়গাম পৌঁছানোর কাজ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এই দোয়াও করা উচিত,

হে খোদা! আমাদের হৃদয়কে কঠোর হতে দিও না আর আমাদেরকে সরল-সোজা পথে পরিচালিত করো এবং আমাদের সংশোধন কর فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ অতএব কাফির জাতির বিরুদ্ধে তুমি আমাদেরকে সাহায্য করো কেননা আমরা দুর্বল এবং অসহায় তোমার কৃপা ও করুণার ফলেই বিজয় বা সফলতা আসবে। নিজ করুণায় আমাদেরকে তোমার প্রিয়দের অন্তর্ভূক্ত রাখ। নিজ অনুগ্রহে আমাদের এবং কাফির জাতির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করো। যেন আমাদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় তোমা দ্বারা সম্পাদিত হয়। তোমার মসীহ্‌কে মানা যেন আমাদের জন্য সার্থক হয়।

এই চেতনা নিয়ে উপরোক্ত দু’টি আয়াত পাঠ করলে আমাদের লক্ষ্য ও গন্তব্য সঠিক থাকবে নচেৎ কেবল বুলি সর্বস্ব দোয়া কোন কাজে আসবে না। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে একদল নামাযীর নামায মুখে ছুড়ে মারার কথা বলেছেন সেভাবে এই আয়াত দু’টি পাঠ করা সত্বেও এর উপর যারা আমল করবে না তাদের জন্য এ আয়াত অভিসম্পাত বয়ে আনবে। সফলতা লাভ করতে চাইলে নিজেদের ঈমান, আমল, বিশ্বাস ও সৎকর্মের যে শিক্ষা রয়েছে সে মোতাবেক জীবন যাপন করুন আর আপন কর্ম দ্বারা প্রমাণ করুন যে, খোদা’ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে পাপমুক্ত হয়ে সৎকর্মের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের তৌফিক দিন।

খুতবার শেষ পর্যায়ে হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লার ‘কাফী’ বৈশিষ্ট্য বা গুণবাচক নামের সূত্র ধরে আরো কিছু আয়াত উপস্থাপন করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সময়ের দিকে দৃষ্টি রেখে বিষয়টি আজ এখানেই শেষ করছি বাদবাকী আগামী খুতবায় বলবো, ইনশাআল্লাহ।

এরপর হুযূর বলেন, বর্তমানে ইসরাইল নিরীহ এবং নিষ্পাপ ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উপর অত্যন্ত বর্বর এবং নৃশংস আক্রমন করছে। তাদের তান্ডবে হাজার হাজার শিশু এবং অসহায় মুসলমান প্রাণ হারাচ্ছে। দোয়া করুন আল্লাহ্ তা’লা যেন অসহায় মুসলমানদের সাহায্য করেন এবং বর্বর আক্রমনের কারণে যালেম ইসরাইলকে শাস্তি প্রদান করেন। বিভিন্ন সংগঠন ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সাহায্য করছে এবং তাদের মাঝে ত্রাণ-সামগ্রী বিতরণ করছে যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল তারপরও তারা যথাসাধ্য করছে। আমাদেরও উচিত তাদের সাহায্য করা। ইনশাআল্লাহ্ হিউম্যানিটি ফার্ষ্টের মাধ্যমে এবং জামাতীভাবেও সাহায্য করা হবে। আপনাদের মধ্যে যাদের সামর্থ আছে আপনারা দোয়ার পাশাপাশি তাদেরকে সাহায্য করুন। আল্লাহ্ তা’লা সবাইকে তৌফিক দিন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে