In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘আল্‌-ওয়াহাব’ (মহান দাতা) - দ্বিতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২১শে নভেম্বর, ২০০৮ইং

ছোট-খাট জাগতিক বিষয়কে ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়া বা জামাতের কোন কর্মকর্তার সাথে ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের কারণে নেযামে জামাতকে আক্রমন না করে সদা দোয়া করা উচিত যেন সত্য গ্রহণের পর হৃদয় বক্র না হয়।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

অর্থ: হে আমাদের প্রভু! হেদায়াত দেয়ার পর তুমি আমাদের হৃদয়কে বক্র হতে দিও না এবং তোমার সন্নিধান হতে আমাদেরকে রহমত দান করো, নিশ্চয় তুমি মহান দাতা। (সূরা আল্ ইমরান: ৯)

এরপর হুযূর বলেন, যে আয়াত আমি পাঠ করেছি এর অনুবাদও আপনারা শুনেছেন। এতে আল্লাহ্ তা’লার ওয়াহ্হাব বৈশিষ্ট্যের দোহাই দিয়ে নিজেদের ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ও অবিচল থাকার দোয়া শিখানো হয়েছে। প্রথমত: হে খোদা! মহানবী (সা:)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আগত যুগ ইমাম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে তুমি আমাদের মানার তৌফিক দিয়েছ। হে আল্লাহ্! তুমি তোমার প্রিয়দের প্রার্থনা কবুল করত: শেষ যুগে আখেরীনদের মধ্যে মহানবী (সা:)-এর সত্যিকার প্রেমিককে আবির্ভূত করেছ এবং একান্ত করুণাবশত আমাদেরকে তাঁর জামাতভূক্ত হবার সৌভাগ্য দিয়েছ। হে খোদা! তোমার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হলেন মহানবী (সা:), যাঁর ভবিষ্যদ্বাণী কখনই মিথ্যে হবার নয়। তিনি (সা:) বলেছেন, মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে পুনরায় খোদার মহান নিয়ামতরূপী খিলাফত ধরায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা হবে চিরস্থায়ী। এই খিলাফতের সাথে যুক্ত থাকার ফলে সেসব কল্যাণ লাভ হবে যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জামাতের জন্য খোদা নির্ধারিত করে রেখেছেন। হে আল্লাহ্! তুমি একান্ত দয়াপরবশ হয়ে আমাদেরকে খিলাফতরূপী এই নিয়ামতের সাথে যুক্ত করে দিয়েছ। এখন আমাদের দুর্বলতা, অলসতা, অক্ষমতা এবং ভূল-ত্রুটির ফলে এই নিয়ামত থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত রেখো না। মানুষ মাত্রই ভুল করে, অতএব তোমার কাছে আমাদের বিনয়াবনত প্রার্থনা হলো, কখনও আমাদের মাঝে যেন অহংকার, ঔদ্ধত্ব্য এবং আত্মম্ভরিতা সৃষ্টি না হয় যার ফলে আমাদের হৃদয় বক্র হয়ে যেতে পারে। অথবা আমাদের দ্বারা এমন কর্ম সম্পাদিত না হয় যা তোমার দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং যা আমাদেরকে তোমার রহমত থেকে বঞ্চিত করবে। তারপর এই দোয়াতে কেবল খোদার রহমত থেকে বঞ্চিত না থাকার আকুতিই করা হয়নি বরং একজন মু’মিন বান্দাকে এই দোয়া শেখানো হয়েছে যে, সে বলবে হে খাদা! কেবল তোমার হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই নয় বরং তুমি আমাদেরকে তোমার রহমত ও দয়ার চাদরে আবৃত করে নাও। সেই চাদরে আবৃত করো যা সর্বদা আমাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রাখবে এবং আমাদের ঈমানকে দৃঢ় ও মজবুত করবে। যার ফলে আমরা ঈমান, বিশ্বাস ও ত্বাকওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতি করতে থাকবো। আমাদের প্রত্যেক আগত দিন পূর্বের দিনের তুলনায় ত্বাকওয়া এবং ঈমানে যেন সমৃদ্ধ হয়। প্রত্যেক আহ্‌মদীর দৈনন্দিন দোয়া এটিই হওয়া উচিত। তাহলে আমরা আমাদের নামায ও ইবাদতের প্রতি যত্নবান হবো এবং আমাদের ভুল-ত্রুটির প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রেখে তা শোধরাতে পারবো। ফলে নামায আমাদেরকে হিফাযত করবে। এমন কর্ম সম্পাদনের চেষ্টা করবো যা ঈমানকে মজবুত করবে এবং হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ

অর্থ: নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং পুণ্য কর্ম করেছে, তাদের প্রভূ তাদের ঈমানের জন্য তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন। (সূরা ইউনুস: ১০)

সুতরাং যেহেতু আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, ঈমান আনার পাশাপাশি তোমরা সৎকর্ম করো যা তোমাদেরকে হেদায়াতের পানে পরিচালিত করবে। একজন মু’মিন যেখানে আল্লাহ্‌র কাছে এই দোয়া করে যে, رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا সেখানে এই দোয়া থেকে কল্যাণমন্ডিত হবার জন্য এবং ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার লক্ষ্যে সকল প্রকার নোংরা ও মন্দকর্ম থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রাখারও চেষ্টা করে। নিজেদের ঈমানের নিরাপত্তার জন্য আমরা যে দোয়া করছি তা খোদার দৃষ্টিতে গ্রহণীয় হবে যদি আমরা অবিরত ইবাদত করতে থাকি এবং প্রতিনিয়ত সৎকর্ম করে যাই আর নেযামে জামাতের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখি।

হুযূর বলেন, ছোট-খাট জাগতিক ব্যাপারকে কোনক্রমেই ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়া উচিত নয়। জামাতের কোন কর্মকর্তার সাথে ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের কারণে নেযামে জামাতকে আপত্তি বা আক্রমনের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করা অসমীচীন। যদি কোন মু’মিন এমন মনোবৃত্তি নিয়ে দোয়া করে তাহলে পথের হোঁচট থেকে রক্ষা পেতে পারে। জামাতের কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কোন সিদ্ধান্ত হয় আর সে যদি মনে করে যে, তার উপর অন্যায় করা হয়েছে তাহলে সে আপিল করার পুরো অধিকার রাখে। আপিলের পর বিষয় খোদার হাতে ছেড়ে দিয়ে ধৈর্য্য ধারণ করা উচিত। যদি তা না করে অভিযোগ ও অনুযোগ করতে থাকে তাহলে একসময় সে জামাত থেকে ছিটকে পড়বে এবং খিলাফতের প্রতিও হৃদয়ে কুধারণা সৃষ্টি হতে থাকবে। আল্লাহ্ তা’লা দয়া করুন এবং আমাদের হৃদয়কে বক্র হওয়া থেকে রক্ষা করুন যাতে নেয��মে জামাতের প্রতি কখনও আমাদের হৃদয়ে কুধারণা না জন্মে। যদি মানবীয় দুর্বলতার কারণে কখনও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তবুও আমাদের হোঁচট খাওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু যতক্���ণ পর্যন্ত খোদার রহমত এবং দয়া আমাদের সাথী না হবে ততক্ষণ এটি সম্ভব নয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর হাতে বয়’আত করার পর আমাদের উদাসীন বা ভ্রুক্ষেপহীন হওয়া উচিৎ নয় বরং পূর্বের তুলনায় আরো বেশি খোদার রহমত, করুণা এবং দয়ার সন্ধানে লেগে থাকা চাই। আল্লাহ্ তা’লা এজন্যই পবিত্র কুরআনে অতীতের নবী ও তাঁদের জাতির বিভিন্ন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। তারাও মনে করতো যে, আমরা যুগ নবীর প্রতি ঈমান এনেছি তাই ভবিষ্যতে আমাদের আর কোন হেদায়েতের প্রয়োজন নেই। ইহুদী এবং খৃষ্টানরা পরবর্তী যুগে আগত নবীকে না মেনে পথভ্রষ্ট হয়েছে কেবল ভ্রষ্টই হয়নি বরং খোদা তা’লা এদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন। তাই নিজেকে জ্ঞানী মনে করলে মানুষের চিন্তা-ভাবনা বিকৃত হয় আর এদের নষ্ট হবার এটিই কারণ। অতীতের বিভিন্ন জাতীর অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং প্রতিটি মূহুর্ত খোদার কৃপা ও রহমত ভিক্ষা চাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক নামাযের প্রতিটি রাকাতে আমাদেরকে সূরা ফাতিহা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে যে, নিজেদের হৃদয়কে বক্র হওয়া থেকে রক্ষা করো নতুবা তাদের ধর্মের চোখ যেভাবে অন্ধ হয়ে গেছে কোথাও তোমাদের অবস্থা যেন আবার একই না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, দৈনিক পাঁচ বেলা এই দোয়া করা সত্বেও অধিকাংশ মুসলমান আজ তাদের পদাঙ্কই অনুসরণ করছে যা মানুষকে খোদা তা’লা থেকে দূরে নিক্ষেপ করে। এর মূল কারণ হচ্ছে কুধারণা বা ভুল ধারণা এবং নিজেকে জ্ঞানী বা বড় মনে করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘সূরা ফাতিহায় আল্লাহ্ তা’লা মুসলমানদেরকে এই দোয়া শিখিয়েছেন যে, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ(৭) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ(৮) সহীহ্ হাদীস অনুসারে এটি ধারাবাহীকভাবে প্রমাণিত যে, مَغْضُوبِ (মাগযুব) বলতে পাপাচারী বা দুরাচারী ইহুদীদের বুঝানো হয়েছে, যারা মসীহ্‌কে কাফের আখ্যা দিয়েছে এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অপমান করেছে এবং যাদেরকে হযরত ঈসা (আ:) অভিশাপ দিয়েছেন; একথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে। আর ضَّالِّينَ (যাল্লিন) বলতে খৃষ্টানদের সেই পথভ্রষ্ট শ্রেণীকে বুঝায় যারা হযরত ঈসা (আ:)-কে খোদা জ্ঞান করেছে এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে এরা মসীহ্‌র ক্রুশীয় মৃত্যুকেই নিজেদের মুক্তির কারণ মনে করে, এবং এরা তাঁকে মহান খোদার আরশে বসিয়েছে। অতএব এখন এ দোয়ার অর্থ হচ্ছে, হে খোদা! এমন ফযল ও কৃপা করো যাতে আমরা সেই ইহুদী ও খৃষ্টানদের মত না হই যারা মসীহ্‌কে কাফের আখ্যা দিয়ে তাঁকে হত্যা করার মত ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে এবং আমরা মসীহ্‌কে খোদা আখ্যা দিয়ে কোথাও ত্রিত্ববাদীদের মত না হয়ে যাই। যেহেতু খোদা তা’লা জানতেন যে, শেষ যুগে এই উম্মতের মধ্যে মসীহ্ মওউদ (আ:) আবির্ভূত হবেন আর ইহুদী প্রকৃতির কতক মুসলমান তাঁকে কাফের আখ্যা দিবে এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করবে, তাঁকে চরমভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে এবং আল্লাহ্ তা’লা এটিও জানতেন যে, সে যুগে ত্রিত্ববাদের ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করবে এবং অনেক দুর্ভাগা খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করবে। সে কারণেই মুসলমানদেরকে এই দোয়া শিখানো হয়েছে এবং দোয়ার مَغْضوبِ عَلَيْهِمْ বাক্যাংশ ঘোষণা করছে যে, যারা মোহাম্মদী মসীহ্‌র বিরোধিতা করবে তারাও খোদা তা’লার পবিত্র দৃষ্টিতে সেভাবেই مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ যেভাবে ইসরাঈলী মসীহ্‌র বিরোধিরা مَغْضُوبِ বা অভিশপ্ত ছিল।’

অতএব আমরা আহ্‌মদীরা সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভূক্ত যারা যুগ মসীহ্‌কে মেনে مَغْضوبِ عَلَيْهِمْ এর দোয়া নিজেদের পক্ষে গৃহীত হতে দেখেছি আর ضَّالِّينَ হতে বাঁচার দোয়াও খোদা আমাদের পক্ষ থেকে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ আমরা এক খোদার ইবাদতকারী; আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা আমাদেরকে এর উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।

হুযূর বলেন, কিন্তু খোদার এই নির্দেশ যে, দোয়া করতে থাকো যাতে হৃদয় কখনও বক্র না হয় এটি সর্বদা আহ্‌মদীদের দৃষ্টিপটে থাকা চাই। পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা’লা অন্যান্য মুসলমানকেও এটি বুঝার এবং অনুধাবনের তৌফিক দিন। মনে রাখবেন! কুধারণা এবং ছোট-খাট বিষয়ের পিছু লেগে থাকলে তা একসময় মানুষকে ধর্মচ্যুত করে; তাই এত্থেকে বাঁচার জন্য খোদার নির্দেশ মান্য করার চেষ্টা করা উচিত। হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, মহনাবী (সা:) رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করতেন তাই আমাদেরও এই দোয়াটি বারংবার পাঠ করতে থাকা উচিত।

এরপর হুযূর একটি হাদীসের উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন,

হযরত শাহার বিন হাওশেক (রা:) থেকে বর্ণিত যে, আমি হযরত উম্মে সালমা (রা:)-কে জিজ্ঞেস করেছি, ‘হে উম্মুল মু’মিনীন! মহানবী (সা:) যখন আপনার ঘরে থাকতেন তখন কোন দোয়া পাঠ করতেন? তিনি বলেন, মহানবী (সা:) এই দোয়া পাঠ করতেন যে,

يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك

(ইয়া মুকাল্লেবাল ক্বুলুবী সাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনেকা)

অর্থ: ‘হে হৃদয়সমূহের নিয়ন্তা! তুমি আমার হৃদয়কে তোমার ধর্মের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করো।’

হযরত উম্মে সালমা (রা:) বলেন, আমি মহানবী (সা:) যথারীতি এই দোয়া পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন, হে উম্মে সালমা! মানুষের হৃদয় খোদার দু আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে যাকে তিনি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে চান রাখেন আর যাকে না চান তার হৃদয় বক্র হতে দেন।’

অতএব দেখুন! কত ভয়ের ব্যাপার; মহানবী (সা:)-এর হৃদয় কখনও বক্র ছিল বা হতে পারে তা আমরা ভাবতেও পারি না। কেননা তাঁর হৃদয়তো সর্বদা খোদার স্মরণে রত ছিল কিন্তু তারপরও তিনি অনবরত এই দোয়া করেছেন তাহলে আমাদের কত বেশি দোয়া করা প্রয়োজন তা একবার ভেবে দেখুন।

মহানবী (সা:)-এর প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

অর্থ: ‘(যদি তোমরা আল্লাহ্‌র ভালবাসা চাও) তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ্ও তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তিনি তোমাদের সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সূরা আল্ ইমরান: ৩১)

তাঁর অনুসরণ পাপ মুক্ত হবার নিশ্চয়তা প্রদান করে। মহানবী (সা:) অন্যত্র বলেছেন,

‘নিদ্রাকালে আমার চোখ ঘুমালেও আমার হৃদয় খোদার স্মরণে ব্যাপৃত থাকে।’

অতএব যখন তিনি খোদার কাছে কোন কিছুর জন্য দোয়া করেন এটি তাঁর নিজের জন্য নয় বরং উম্মতকে শেখানো উদ্দেশ্য বরং উম্মতের জন্য উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে এরূপ করেন।

হুযূর বলেন, একান্ত পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে যে, মুসলমানরা মহানবী (সা:)-কে মেনে একবার খোদার ফযল লাভ করা সত্বেও যুগ ইমামকে অস্বীকার করার কারণে পুনরায় খোদার দৃষ্টিতে ক্রোধভাজন হচ্ছে। বর্তমানে গোটা বিশ্বের মুসলমানদের অবস্থা দৃষ্টে এটিই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, খোদা তা’লা তাদের প্রতি রুষ্ট। আজ উম্মতে মুসলেমার এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির পথ একটিই আর তাহলো যুগ ইমামকে মানা এবং তাঁর আনুগত্যের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার উদ্যোগ নেয়া। অনেকে অজুহাত দেখায় যে, মহানবী (সা:)-এর পর আর কোন নবী আসতে পারে না। আমাদের হেদায়াতের জন্য পবিত্র কুরআন আছে, তাই নতুন কারো আগমনের প্রয়োজন নেই বিধায় আমরা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ:)-এর দাবী মানতে পারছি না। সত���য কথা হলো, যদি আজ মুসলমান আলেমরা যুগ ইমামকে মানে তাহলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে, তাদের রুটি-রুজি বন্ধ হবে তাই এরা সত্য জেনেও মানতে অস্বীকার করছে। অপরদিকে এরাই আবার খিলাফতের প্রয়োজনীয়তার বুলি আওড়ায়। কিন্তু এরা জানে না যে, মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আবির্ভাব ছাড়া কোন ক্রমেই খিলাফত প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি, এরা কুরআন জানে না। আর জানবে কি করে, যারা সত্যিকার অর্থে খোদার মনোনীত আর খোদার প্রতি অনুগত তারাই কুরআনের পবিত্র রহস্যাবলী অনুধাবন করতে পারে অন্যরা নয়। এ যুগে খোদার প্রেরিত যুগ ইমাম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) কুরআনের রহস্য বুঝেছেন এবং সত্যিকার কুরআনের শিক্ষা অবহিত হয়ে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন আর কুরআন বুঝার রীতি তিনিই আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তিনি (আ:) এক স্থানে বলেছেন,

‘ধর্মীয় জ্ঞান এবং সত্যিকার মা’রেফত অর্জনের জন্য প্রথমে পবিত্র হওয়া ও অপবিত্র পথ পরিত্যাগ করা একান্ত আবশ্যক। সে কারণেই খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন, لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (সূরা আল্ ওয়াকে’আ: ৮০) অর্থাৎ খোদার পবিত্র কিতাবের রহস্যাবলী তারাই বুঝে যাদের হৃদয় পবিত্র এবং যাদের আমল পবিত্র। জাগতিক চাতুর্য বা শঠতার মাধ্যমে কখনও ঐশী জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন যে,

‘কুরআনের তত্বজ্ঞান কেবল তাদের সম্মুখেই উম্মুক্ত করা হয় যাদেরকে খোদা তা’লা স্বয়ং নিজ হাতে পুত-পবিত্র করেন।’

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) অন্যত্র বলেন,

‘এরা বলে যে, মসীহ্ এবং মাহদীর কোন প্রয়োজন আমাদের নেই বরং কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং আমরা সরল-সুদৃঢ় পথে আছি। অথচ এরা জানে যে, কুরআন এমন এক গ্রন্থ যা পবিত্র মানুষ ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারে না, সেজন্য এমন একজন তফসীরকারকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে যাকে খোদা তা’লা পবিত্র করবেন এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি প্রদান করবেন।’

অতএব এ যুগে আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে নিজ হাতে পবিত্র করেছেন এবং কুরআনের সঠিক জ্ঞান ও বুৎপত্তি দান করেছেন। এরা যতই দোয়া করুক এবং বড় বড় বুলি আওড়াক না কেন যুগ মসীহ্‌কে না মানলে কোন ক্রমেই কুরআনের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। এদের অবস্থা দেখে যেখানে সত্যের উপর আমাদের ঈমান দৃঢ় হয় সেখানে হৃদয়ের বক্রতা থেকে রক্ষা পাবার জন্যও দোয়া করা আবশ্যক। সর্বদা দৃঢ় চিত্ততা এবং সত্যের উপর অবিচল থাকুন। খোদা তা’লা তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে তাঁর রহমত লাভের দোয়াও শিখিয়েছেন। আর খোদার রহমত ও করুণা তারাই লাভ করে যারা তাঁর ইবাদত করে এবং ঈমানের বলে সর্বদা বলীয়ান হয়।

এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একস্থানে বলেন,

‘কুরআন করীমে এক স্থানে বলা হয়েছে যে, وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (সূরা আল্ আহযাব: ৪৪) অর্থাৎ খোদার দয়া কেবল বিশ্বাসীদের জন্যই নির্ধারিত। কাফির, বেঈমান এবং বিদ্রোহী এথেকে অংশ পেতে পারে না।’

তিনি আরো বলেন,

‘বিশেষ রহমত যা মু’মিনদের সাথে সম্পর্কযুক্ত তা পবিত্র কুরআনের সর্বত্র রহীমিয়্যতের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (সূরা আল্ আ’রাফ: ৫৭) অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্‌র রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী। আবার বলা হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (সূরা আল্ বাকারা: ২১৯) অর্থাৎ নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহ্‌র খাতিরে জন্মভূমি থেকে হিজরত বা কুপ্রবৃত্তির পূজা পরিত্যাগ করে এবং জিহাদ করে, এরাই আল্লাহ্‌র রহমতের আশা রাখতে পারে। বস্তুত: আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। অর্থাৎ তাঁর রহীমিয়্যতের এই কল্যাণধারা থেকে কেবল তারাই অংশ লাভ করে যারা যোগ্য। এমন কেউ নেই যে খোদাকে সন্ধান করবে অথচ পাবে না।’

সুতরাং এখানে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রহমত খোদার পক্ষ থেকে আসে এবং কেবল তারাই লাভ করে যারা সৎকর্মশীল হবার এবং ঈমানের ক্ষেত্রে উন্নতি করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। মুহসিনুন বা সৎকর্মশীল কারা? যারা বক্রতা থেকে বাঁচার জন্য নিরলস চেষ্টা চালান এবং পাশাপাশি সৎকর্মের ধারা বলবৎ রাখেন। এরা এমন মানুষ যারা কেবল সাধারণ নেকী বা পুণ্য করেই থেমে থাকেন না বরং নেকীর উন্নত মানে অধিষ্ঠিত হবার উদগ্র বাসনা রাখেন আর সেলক্ষ্যে চেষ্টা করতে থাকেন। মহানবী (সা:)-এর একটি উক্তি অনুসারে তারা এই চেতনা নিয়ে সকল কাজ করে যে, প্রতিটি মূহুর্ত খোদা আমাদেরকে দেখছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এর কথা অনুসারে তারা ‘নফস’ বা প্রবৃত্তির পূজা থেকে তারা বিরত হয় বা প্রবৃত্তির তাড়না থেকে মুক্ত থাকেন। এবং খোদার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এরা পুণ্য কাজ সম্পাদন করেন। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে প্রবৃত্তির তাড়না থেকে মুক্ত হয়ে তার বিনত বান্দা হবার তৌফিক দান করুন।

হুযূর বলেন, আমি একটি বিষয় আপনাদের কাছে বিশেষভাবে দোয়ার উদ্দেশ্যে বলতে চাই। চলতি সপ্তাহে আমি ভারত সফরে রওয়ানা হবো, ইনশআল্লাহ্। আপনারা দোয়া করুন খোদা তা’লা যেন আমার এই সফর সবদিক থেকে আশিসমন্ডিত করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আহ্‌মদীরা দলে দলে এ জলসায় যোগদানের উদ্দেশ্যে সফর করছেন, সবার সফলতা এবং সফরের নিরাপত্তার জন্যও দোয়া করুন। ভারত সরকারের আভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার কারণে তারা সবাইকে ভিসা দিতে পারছেন না তারপরও তারা যথেষ্ট করেছেন এজন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। যারা জলসায় যাচ্ছেন এবং যারা নিয়্যত থাকা সত্বেও যেতে পারছেন খোদা তাদের সবার আন্তরিকতা গ্রহণ করুন এবং জলসায় যোগদানকারীদের সোয়াব দান করুন। ভারত অনেক বড় একটি দেশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আহ্‌মদীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাদের সবার পক্ষে কাদিয়ান জলসায় যোগদান করা সম্ভব নয় তাই তাদের একান্ত বাসনা আমি যেন তাদের জামাত সফল করি। আল্লাহ্‌র ফযলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যাবার আকাংখা রাখি দোয়া করুন যেন খোদা তা’লা দুষ্কৃতিকারীর সকল দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করেন এবং সকলকে নিজ নিরাপত্তার বেষ্টনিতে আশ্রয় দেন।

সবশেষে হুযূর বলেন, আজ নামায শেষে দু’টি গায়েবানা জানাযার নামায পড়াবো। একজন হচ্ছেন, আমাদের দরবেশ ভাই মোকাররম বশীর আহমদ মুহার সাহেব। তিনি গত ১৩ই নভেম্বর কাদিয়ানে ইন্তেকাল করেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। মরহুম কাদিয়ানের প্রাথমিক যুগের একজন দরবেশ ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী, বন্ধুবৎসল এবং নেক ও পুণ্য স্বভাবের অধিকারী একই সাথে যথারীতি তাহাজ্জুদ গুজার ও মূসীও ছিলেন। পাঁচ মেয়ে এবং এক ছেলে রেখে গেছেন। কাদিয়ানের বেহেশতী মকবেরায় দরবেশদের জন্য নির্ধারিত অংশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

আরেকজন হচ্ছেন, মোকাররম মোহাম্মদ গযন্‌ফর চাট্‌ঠা সাহেব। তিনি জামাতের ইন্সপেক্টর বাইতুল মাল ছিলেন। গত ১৮ই নভেম্বর জামাতী সফর শেষে ফেরার পথে দুজন অজ্ঞাত পরিচয় মটর সাইকেল আরোহী তার ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে গেলে তিনি বাঁধা প্রদান করেন এবং দুষ্কৃতিকারীরা তার উপর গুলি বর্ষণ করলে তিনি সেখানেই শাহাদত বরণ করেন। মৃত্যুকালে মরহুমের বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। যেহেতু তিনি জামাতের কাজে নিয়োজিত ছিলেন তাই আমার মতে তাঁর মৃত্যু ধর্মীয় শাহাদত ছিল।

আপনারা দোয়া করুন আল্লাহ্ তা’লা যেন তাদের রূহের মাগফিরাত করেন এবং তাঁর করুণার চাদরে আবৃত রাখেন আর শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গকে ধৈর্য্য ধারণের তৌফিক দান করুন আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে