In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘আল্‌-ওয়াহাব’ (মহান দাতা) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৪ই নভেম্বর, ২০০৮ইং

আল্লাহ্ তা’লার ওয়াহাব বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে পুণ্যবান ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ত্বাকওয়ার ভূমিকা এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বারোপ

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লার একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে ‘ওয়াহেব’ বা ’ওয়াহ্‌হাব’ সকল অভিধান গ্রন্থে এই শব্দের প্রায় একই অর্থ করা হয়েছে তাই আমি লিসানুল আরবে এর যে অর্থ করা হয়েছে তা তুলে ধরছি। ‘আল্ ওয়াহ্‌হাব’ আল্লাহ্ তা’লার একটি গুণবাচক নাম, বলা হয়েছে ‘আল্ মুনিমু’ ‘আল্ লেবাদ’ অর্থাৎ সেই সত্ত্বা যিনি তাঁর বান্দার প্রতি নিয়ামত বর্ষণ করেন। ‘আল্ হেবা’ এমন দান যার পরিবর্তে কিছু নেয়া হয় না অর্থাৎ যে দানের পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে না। যে সত্ত্বা বারংবার এবং অজস্র ধারায় দান করেন তাঁকে ‘ওয়াহ্‌হাব’ বলা হয়। মানুষের জন্য এই শব্দ ব্যবহার করা হয় কিন্তু সত্যিকারের ওয়াহ্‌হাব বা দাতা আল্লাহ্ তা’লাই। যিনি নিজ বান্দাকে চাইতে এবং না চাইতে দান করেন। যদি একজন মু’মিন গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে আল্লাহ্ তা’লার ওয়াহ্‌হাব হওয়া এবং তাঁর অযাচিত দানের দৃষ্টান্ত দেখতে পায় এবং এটিই আমাদের জীবন্ত খোদার অস্তিত্বের প্রমাণ। কিন্তু যে ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ; খোদার দান এবং কৃপা তার চোখে পড়েনা বা সে দেখেও না। যে ব্যক্তি জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সে ইহলৌকিক উপকরণকেই সবকিছু মনে করে এবং এর উপর নির্ভর করে। পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর এই গুণবাচক নাম বা বৈশিষ্ট্যের বরাতে আলোচনা করেছেন। আল্লাহ্ তাঁর পবিত্র নবীদের এবং পুণ্যবানদেরকে দানের বরাতে যে দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন তাতেও এই শব্দ রয়েছে। নেক ও পুণ্যবান সন্তান লাভের দোয়াও রয়েছে এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং নেকীর উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আর ইমানী উন্নতির জন্যও দোয়া শিখিয়েছেন।

হুযূর বলেন, এখন আমি এই সব কুরআনী দোয়াগুলোর একটি দিক আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। আল্লাহ্ তা’লা মু’মিনদেরকে সৃষ্টির উদ্দেশ্যের প্রতি এভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, তারা যেন তাদের স্ত্রী এবং সন্তান-সন্তুতির জন্যও দোয়া করেন আর স্ত্রীদেরকে স্বামী-সন্তানের জন্য দোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন বংশপরম্পরায় নেকীর প্রেরণা উজ্জীবিত থাকে এবং সকল প্রজন্মের মধ্যে যেন পুণ্যের প্রতি ভালবাসা থাকে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

অর্থ: ‘এবং যারা বলে, ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে চক্ষু স্নিগ্ধতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানাও।’ (সূরা আল্ র্ফুকান: ৭৫)

হুযূর বলেন, এটি একটি উৎকর্ষ দোয়া। আল্লাহ্ তা’লা এতে পিতামাতাকে দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন, সন্তানের মাধ্যমে যেন তাদের নয়ন শীতল হয় অর্থাৎ এই দোয়া করা শিখিয়েছেন যে, হে খোদা! এমন সন্তান দাও যাদের মাধ্যমে হৃদয় প্রশান্ত হবে। আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং চোখের স্নিগ্ধতার দোয়া শিখাচ্ছেন আসলে এখানে খোদা তাঁর সে অনন্ত ও অশেষ কৃপা ও অনুগ্রহের জন্য দোয়া শিখিয়েছেন যার পরিব্যাপ্তির কথা মানুষ ধারণাই করতে পারেনা যা শুধু খোদা তা’লাই জানেন। আর এই পৃথিবীতেই নয় বরং খোদার নির্দেশ পালনে স্বামী-স্ত্রী পরকালেও পরস্পরের নয়নের স্নিগ্ধতার কারণ হতে পারে। একজন মু’মিনের মৃত্যুর পর তার সন্তানরা তার পুণ্য কর্মসমূহ অব্যাহত রাখে ফলে পরকালে পিতা-মাতার পদমর্যাদা উন্নীত হয়। অতএব সন্তানের নেকী এবং পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দোয়া পরকালেও তাদের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

অর্থ: ‘বস্তুত: কেউই জানে না যে, তাদের জন্য তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ কি কি নয়ন-তৃপ্তিকর বস্তু গোপন করে রাখা হয়েছে।’ (সূরা আস্ সাজদা: ১৮)

হুযূর বলেন, এ আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে যারা ত্বাকওয়ার ভিত্তিতে খোদার ইবাদত করেন এবং তাঁর পথে আর্থিক কুরবানী করেন এবং অন্যান্য সৎকর্মও করে। যথারীতি তাহাজ্জুদ পড়েন। ঘুমকে হারাম করে রাত জেগে সন্তান-সন্ততির জন্য দোয়া করেন। খোদা তা’লার কাছে তারা এমন নয়ন স্নিগ্ধতার জন্য দোয়া করেন যার গভীরতার স্বরূপ কেবল খোদা তা’লাই জ্ঞাত। সুতরাং খোদার সত্যিকার বান্দা যাদেরকে ইবাদুর রহমান বলা হয় তারা সৎকর্ম করার পর আল্লাহ্‌র সমীপে এ দোয়া করেন এবং এ পৃথিবীতে এমন সন্তান-সন্ততি রেখে যান যারা সত্যিকারেই ত্বাকওয়া বা খোদা ভীতির পথে পরিচালিত হন। رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এ দোয়া শিখানোর কারণ হচ্ছে যে, তিনি এ দোয়া কবুল করতে চান। এ দোয়ার মাধ্যমে তিনি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যাতে আমরা স্বয়ং ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হই এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও ত্বাকওয়ার পথে পরিচালিত করি। এটি মূলত আমাদের জন্যই কল্যাণকর। وَاجْعَلْنَا لِلْمُت��َقِينَ إِمَامًا বলে ঘোষণা করেছেন এই অশেষ কল্যাণের উত্তরাধিকারী তখনই হবে যখন তুমি এবং তোমার সন্তান ত্বাওয়ার পথে পরিচালিত হবে। যদি তোমার কর্ম থেকে এটি প্রকা��� ���া পায় যে, তুমি ত্বাকওয়াশীল তাহলে নিজ গন্ডীতে তুমি মুত্তাকীদের ইমাম হতে পারবে না। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ আত্মবিশ্লেষণ করা যে, ��মরা ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সবার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করছি কি? নিজেদের সন্তানদের তরবিয়তের জন্য ত্বাকওয়ার আলোকে উদ্যোগ নিচ্ছি কি? যদি কোন গৃহে স্বামী-স্ত্রী ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকে তাহলে তারা নিজ আওলাদের ব্যাপারে কি করে আশা করতে পারেন যে, তারা ত্বাকওয়াশীল হবে। আর ত্বাকওয়া না থাকলে খিলাফতের অফুরান কল্যাণরাজি থেকে তারা কিভাবে আশিসমন্ডিত হবে? খিলাফতের নিয়ামত লাভের জন্য আল্লাহ্ তা’লা সৎকর্মকে শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যদি ত্বাকওয়া না থাকে সৎকর্ম কিরূপে সম্পাদিত হবে। আর সৎকর্ম না করলে ত্বাকওয়ার পানে কিভাবে পরিচালিত হবে। ত্বাকওয়া না থাকলে একে অপরের চক্ষুর স্নিগ্ধতার কারণও হতে পারবে না। অতএব যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরের নয়নের স্নিগ্ধতার কারণ হতে চাও, যদি চাও যে তোমাদের সন্তান তোমাদের চক্ষু শীতলতার কারণ হোক তাহলে নিজেদের অবস্থান খতিয়ে দেখো। ইবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করো। যাচাই করে দেখো, আমরা সেই মান অর্জনের চেষ্টা করছি কিনা যা স্বামী-স্ত্রী’র জন্য মহানবী (সা:) নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সা:) বলেন,

‘আল্লাহ্ সেই ব্যক্তির মঙ্গল করুন যে রাতে জেগে নামায আদায় করে এবং স্বীয় স্ত্রীকে জাগায়। যদি স্ত্রী উঠতে আলস্য দেখায় তাহলে মুখে পানির ছিটা দিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গায়। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা’লা দয়া করুন সেই রমণীর প্রতি যে রাতের বেলা ঘুম থেকে জেগে নামায আদায় করে এবং স্বামীকে জাগায়, যদি সে উঠতে আলস্য দেখায় তাহলে মুখে পানির ছিটা দিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে।’

সুতরাং এ দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রী উভয়ের। নিজেদের ইবাদতের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করুন যাতে সন্তানরা আপনাদের চোখের স্নিগ্ধতার কারণ হয়। অনেক মহিলা স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, রাতের বেলা জাগা তো দূরের কথা অনেক সময় স্বামীকে ফজরের নামাযের জন্য জাগাতে গেলে বেচারীকে নাজেহাল হতে হয়। অনেক এমনও আছেন যারা কেবল ফজরের নামাযই নয় বরং অন্যান্য নামাযের বেলায়ও অলসতা দেখান এ ধরনের মানুষ কোন মুখে খোদার কাছে এই দোয়া করেন যে, رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ এবং কিভাবে আশা করেন যে, সন্তান-সন্ততি তাদের চোখের স্নিগ্ধতার কারণ হবে? এমন পরিবরারের কর্তা কি করে আশা করতে পারেন যে, তাদের সন্তান ত্বাকওয়াশীল হবে? বা তাদের জন্য নয়নের স্নিগ্ধতার কারণ হবে? হ্যাঁ আল্লাহ্ মালিক! তিনি চাইলে করতে পারেন কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব বলেই মনে হয়। কিন্তু ত্বাকওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এবং আত্মসংশোধন করা এটিও খোদারই নির্দেশ। যদি চাও যে, তোমাদের সন্তান তোমাদের নয়নমণি হোক তাহলে মহানবী (সা:)-এর এই নির্দেশ স্মরণ রেখো যে,

‘উত্তম তরবিয়তের চেয়ে সন্তানের জন্য ভালো উপহার আর হতে পারে না যা পিতা তার সন্তানকে দেন বা দিতে পারেন।’

এবং উত্তম তরবিয়ত তখনই হবে যখন আপনার কর্ম সন্তানের জন্য আদর্শ হবে। উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একস্থানে বলেছেন,

‘খোদা তা’লা আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের মাধ্যমে চোখের স্নিগ্ধতা দান করুন এবং এটি তখনই লাভ হতে পারে যখন সেই মানুষ পাপাচার মুক্ত জীবন যাপন করবে অথবা (ইবাদুর রহমান) রহমান খোদার বান্দা হয়ে জীবন যাপন করবে এবং সব কিছুর উপর খোদাকে অগ্রাধিকার প্রদান করবে। আল্লাহ্ তা’লা সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا অর্থাৎ সন্তান যদি নেক ও পুণ্যবান হয় তাহলে এমন সন্তানদের পিতা তাদের ইমাম হবেন। মূলত: এখানে মুত্তাকী হবার দোয়া শিখানো হয়েছে।’

সুতরাং এই দায়িত্ব পুরুষের উপর বর্তায় কারণ তারা গৃহের কর্তা বা নেতা। যদি সত্যিকারেই তারা খোদাভীতি সহকারে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয় তাহলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মও নেক বা পুণ্যবান হবে ফলে তারা নিজের আপন গন্ডীতে হলেও পুণ্যবানদের ইমাম বিবেচিত হবেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা গৃহের পরিচর্যাকারীনি হিসেবে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলা। তাদের উচিৎ স্বামী এবং সন্তানের তরবিয়তের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান থাকা তাহলে এরা সমাজের কল্যাণকর অংশে পরিণত হবে। কিন্তু নারীর তরবিয়তের জন্য সর্বপ্রথম পুরুষকে দায়িত্ববান হতে হবে। যদি উভয়ে নেকীর পথে পরিচালিত হয় তাহলে তাদের সন্তান-সন্ততিও নেকী ও পুণ্যের পথে পরিচালিত হবে। উভয়ের সম্মিলিত দোয়া সন্তাদের জন্য সাহায্যকারী হবে। যে হাদীস আমি পাঠ করেছি তার উপর তখনই আমল করা সম্ভব যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম-প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হবে এবং পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব ও সমঝোতা থাকবে। নতুবা সকালে নামাযের জন্য স্বামীকে জাগানোর পরও যদি স্বামী না উঠে তাহলে একদিন দু’দিন করে ধীরে ধীরে এমন গৃহের রমণীও হয়ত নিরাশ হয়ে নিজে সংগোপনে পুণ্যের পথ অবলম্বনের চেষ্টা করবে আর যদি দুর্বল হয় তাহলে স্বামীর পথের পথিক হবে। আর সেই গৃহের সন্তানরা জাগতিকভাবে সফল হলেও ধর্মের ব্যাপারে হবে চরম উদাসীন এবং বিকৃত মনমানসিকতার অধিকারী। অনেক ক্ষেত্রে এটিও দেখা গেছে যে, জাগতিকভাবেও সেসব পরিবারের সন্তানরা একেবারেই উচ্ছন্নে যায়। সুতরাং সন্তানদেরকে নয়নের মণি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতকে নিজেদের অবস্থার সংশোধন করতে হবে আর তাদের জন্য উত্তম আদর্শ হতে হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এ প্রসঙ্গে বলেন,

‘আমাদের জামাতের জন্য আবশ্যক আমরা যেন ধার্মীক হবার জন্য নিজ স্ত্রীদেরকে ধার্মিকতার শিক্ষা দেই। নতুবা তারা গোনাহ্‌গার বা পাপাচারিনী হবে। আর যখন কোন স্ত্রী স্বামীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারে যে, তোমার মধ্যে অমুক অমুক দোষ-ত্রুটি আছে তাহলে সেই স্ত্রী কিভাবে স্বামীকে ভয় পাবে? তার মধ্যে কোন ত্বাকওয়া থাকবে না এমন পরিবেশে সন্তানও নষ্ট হয়ে যায়। সন্তান পবিত্র হতে হলে তাকে একটি পবিত্র পরিবেশ দিতে হবে নতুবা সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য সময় থাকতে তওবা করা উচিৎ এবং সন্তানের জন্য উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। নারীরা স্বামীর পরিচর্যাকারীনি হয়ে থাকেন তাই স্বামী কখনই স্ত্রীর কাছে নিজ দুর্বলতা লুকোতে পারে না। এটি মনে করা উচিৎ নয় যে, সে কিছু বুঝে না বা নির্বোধ। পতি যদি পবিত্র স্বভাবের হয় তাহলে সেই গৃহের পত্নী তাকে ভয় করবে এবং খোদাকে ভয় পাবে। সহধর্মীনি তার স্বামীর প্রভাবে প্রভাবান্তিতা হয় তাই স্বামী যত বেশি নেকী বা পুণ্যের পথে পরিচালিত হবে তা থেকে স্ত্রী কিছু না কিছু অংশ অবশ্যই গ্রহণ করবে।’

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এখানে প্রত্যেক পুরুষের চেতনাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। অতীতকালে নারীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিতা ছিলেন কিন্তু বর্তমানে তারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত। অনেক নারী স্বামীর এ ধরনের মন্দ কর্ম দেখে নিরাশ হয়ে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নেন আবার অনেকে স্বামীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ পর্যন্ত করেন। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

হুযূর বলেন, এই সমাজে বিশেষ করে যেখানে পিতার প্রয়োজন অনেক বেশি সেখানে পিতৃ স্নেহ থেকে বঞ্চিত সন্তান বড় হয়ে একেবারেই বখে যায়। আর এ সব কিছুর দায়দায়িত্ব পুরুষের উপর বর্তাবে। এমন পুরুষদের চিন্তা করা উচিৎ। কত দুর্ভাগ্য যে, আমাদের খোদা আমাদের মুক্তি এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্���ের মুক্তির জন্য আমাদেরকে একটি দোয়া শিখিয়েছেন এবং বলেছেন তোমাদের কাছে আমার কিছুই চাওয়ার নেই আমি তোমাদের ইহ ও পরকালকে সুন্দর করার জন্য এবং তোমাদের পরবর্তী প���রজ��্মের মুক্তির লক্ষ্যে যে সঠিক পদ্ধতি শিখাচ্ছি তা অবলম্বন কর। যদি খোদার শিখানো পথে চল তাহলে তাঁর অনন্ত নিয়ামতের উত্তরাধি���ারী হবে। ক��ন্ত আমরা যারা এই পুরস্কার থেকে অংশ পাচ্ছি না আমাদেরকে আত্মিক বিশ্লেষণ করে সেই পথে পরিচালিত হবার চেষ্টা করা উচিত যা আমাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার প্রিয়ভাজন বানাবে। আমাদের ঘরে সর্বদা শান্তি বিরাজ করবে। প্রত্যেক আহমদী গৃহে ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত মানুষ যেন বসবাস করে। আহমদী সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তাহলে আমরা খিলাফতের কল্যাণে আশিস মন্ডিত হতে পারবো আর মহানবী (সা:)-এর দাসত্বে আগমনকারী মসীহ্ ও মাহদী এবং যুগ ইমামের জামাতভূক্ত হবার যে দায়িত্ব তা পালনে এটি সহায়ক হবে। অতএব আমদের মধ্যে সৌভাগ্যবান তারাই যারা এই মূল তত্বকে অনুধাবন করে তারপর যখন ওহাব আল্লাহ্‌র কাছে চান তখন আল্লাহ্ তা’লা ইহ ও পরকালে এমন মাধ্যমে তাদের নয়নের তৃপ্তির ব্যবস্থা করবেন যা তারা কল্পনাও করতে পারবেনা।

হুযূর বলেন, এখানে কথা প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলেত চাই তাহলো, বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের একটি কারণ হচ্ছে সন্তান। অনেক স্বামী আছেন যারা স্ত্রীর কাছে অন্যায় আব্দার করেন যে, আমাকে ছেলে দিতে হবে। তারা জানে না যে, ছেলে বা মেয়ে দেবার মালিক হচ্ছেন আল্লাহ্ তা’লা এতে মানুষের কোন হাত নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেছেন,

يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ

অর্থ: তিনি যাকে চান কন্যা দান করেন এবং যাকে চান পুত্র দান করেন। (সূরা আশ্ শূরা: ৫০)

বর্তমানে মানুষ চিকিৎসা বিজ্ঞানে যথেষ্ট উন্নতি করেছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এর দ্বারা লাভবানও হন। কিন্তু খোদা তা’লা খালেক বা স্রষ্টা, তিনি তাঁর এ বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটান। অনেক সময় হাজার চেষ্টা করলেও খোদার ইচ্ছে বিরোধী ফল লাভ সম্ভব নয়। অনেকে এ বিষয়টি না বুঝে কন্যা সন্তান প্রসবের কারণে স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এমন অবস্থা বর্তমান সভ্যতার জন্য লজ্জাস্কর। আরবের অজ্ঞ যুগে এমনটি দেখা যেত, সেখানে কন্যা সন্তানের জন্মকে আদৌ ভালো দৃষ্টিতে দেখা হতো না কিন্তু আজও অনেক পরিবারে মেয়ের জন্ম হলে তাদের মুখ কালো হয়ে যায়।

হুযূর বলেন, আমি একটি পরিবারকে চিনি। বিয়ের পর স্ত্রীর গর্ভে একে একে চারটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলে স্বামী ছেলের আশায় পালাক্রমে চারটি বিয়ে করে কিন্তু সবার ঘরেই একাধিক কন্যা সন্তান জন্মে পরিশেষে প্রথমা স্ত্রীর গর্ভেই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। আসলে খোদা যাকে যখন যা ইচ্ছা তাই দেন এতে মানুষের কোন হাত নেই। যদি আপনারা ছেলে চান তাহলে খোদার কাছে চান তিনি চাইলে দিতে পারেন। তবে খোদার কাছে ছেলে না চেয়ে নেক সন্তানের জন্য দোয়া করা উচিৎ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ দোয়া শিখিয়েছেন,

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সৎ কর্মশীল পুত্র দাও।’ (সূরা আস সাফ্‌ফাত: ১০১)

رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً

অর্থ: ‘হে আমার প্রভু! তুমি তোমার সন্নিধান হতে আমাকে পবিত্র সন্তান-সন্ততি দান করো।’ (সূরা আলে ইমরান: ৩৯)

মোটকথা এমন সন্তান চাওয়া উচিত যারা পুণ্যবান হবে। এমন সন্তানের জন্য দোয়া করা উচিত যাদের দেখে নয়ন জুড়ায়। অনেকে আমাকে লিখেন যে, দোয়া করুন যাতে ছেলে সন্তানের মুখ দেখতে পাই। আমি তাদেরকে বলি, নেক সন্তানের জন্য দোয়া করুন। অনেক সময় দেখা গেছে যে, ছেলের তুলনায় মেয়েই পিতামাতার বেশি সেবা করছে। অনেক সময় ছেলে দুশ্চিন্তা এবং দুর্ণামের কারণও হয়। অনেকেই আমার কাছে চিঠি-পত্রে এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাতে সন্তান নষ্ট হবার কথা বলে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা ব্যক্ত করেন। তাই আসল বিষয় হলো হৃদয়ের প্রশান্তি নতুবা ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন যদি তারা নেক না হয় তাহলে পরীক্ষার কারণ হয়। পুণ্যবানের (সালেহ্) সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘পুণ্যবানদের মাঝে কোনরূপ আধ্যাত্মিক ব্যাধি থাকে না। কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য তাদের ভেতর দেখা যায় না।’

এ মানে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। এ মানকে দৃষ্টিপটে রেখেই সন্তানের জন্য দোয়া করা উচিত যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে নেকী ও পবিত্রতার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং পবিত্র প্রজন্ম যেন জন্ম নেয় যারা বংশ পরম্পরায় পিতামাতার নয়নের আলো এবং জামাতের সম্মানের কারণ হবে। যতক্ষণ আমরা নিজেদের অবস্থার প্রতি সজাগ দৃষ্টি না দেবো ততক্ষণ পর্যন্ত এটি সম্ভব নয়। যতক্ষণ আমরা নিজেরা পুণ্যবানদের অন্তর্ভূক্ত না হবো এবং ত্বাকওয়ার পথে বিচরণ না করবো ততক্ষণ এমনটি ঘটা অসম্ভব। সুতরাং একে অবলম্বন করা এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আমাদের জন্য একান্ত আবশ্যক। খোদা আমাদের সকলকে তৌফীক দান করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে