In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

জার্মানীর বার্লিন শহরে জামাতে আহ্‌মদীয়ার নবনির্মিত প্রথম ঐতিহাসিক ‘খাদীজাহ্ মসজিদ’-এর উদ্বোধন

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

খাদীজাহ্ মসজিদ, বার্লিন, জার্মানী

১৭ই অক্টোবর, ২০০৮ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآَتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ

(সূরা আত্ তাওবা: ১৮)

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

(সূরা আত্ তাওবা: ৭১)

এরপর হুযূর বলেন, আলহামদুলিল্লাহ্ যে আজ আল্লাহ্ তা’লা এই মসজিদের আকারে আমাদের উপর তাঁর অনুগ্রহের আরেকটি বারী বিন্দু বর্ষণ করেছেন। আজ জামাতে আহ্‌মদীয়া আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় সাবেক পূর্বজার্মানী এবং দেশের রাজধানী বার্লিনে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে। প্রাথমিক অবস্থায় জামাত জার্মানীতে যেসব মোবাল্লেগদের পাঠিয়েছে এই মসজিদের সাথে তাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাই আজ আমি নুতন প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে সেসব ত্যাগী, নিষ্ঠাবান ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুটা অবহিত করছি। জামাতের সীমিত সামর্থ সত্ত্বেও তাঁরা দোয়ার মাধ্যমে জামাতের উন্নতির লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে গেছেন। ১৯২২ সনে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) জার্মানীতে প্রথম মিশন হাউস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নেন আর বাংলাদেশের মৌলভী মোবারক আলী বিএ সাহেব যিনি সেসময় যুক্তরাজ্যে মিশনারী হিসেবে জামাতের সেবা করছিলেন তাঁকে জার্মানী যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ১৯২০ সন থেকে লন্ডনে মুবাল্লেগ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯২২ সনে হুযূর (রা:)-এর নির্দেশে মৌলভী মোবারক আলী বিএ সাহেব লন্ডন থেকে জার্মানীতে প্রথম মিশনারীর দায়িত্ব নিয়ে বার্লিন গমন করেন। এরপর তাঁকে সাহায্য করার জন্য হুযূর (রা:) মওলানা গোলাম ফরিদ সাহেব এমএ’কে জার্মানী প্রেরণ করেন এবং তিনি ১৯২৩ সনের ২৬শে নভেম্বর তারিখে কাদিয়ান থেকে জার্মানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং ১৮ই ডিসেম্বর ১৯২৩ সনের প্রত্যূষে বার্লিন পৌঁছান। মৌলভী মোবারক আলী সাহেব জার্মানীতে যুগ খলীফার আকাংখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সেসময় দিবারাত্র জামাতের প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে ১৯২৩ সনের ২রা ফেব্রুয়ারীর জুমুআর খুতবায় হুযূর (রা:) বলেন,

‘তার রিপোর্ট আমাদের মাঝে খুবই আশা সঞ্চার করছে। তিনি তার রিপোর্টে বারংবার আমাকে লিখছেন যে, আমি এদেশে জামাতের উজ্জল ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী। জামাতের কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য এখানে একটি মসজিদ এবং মিশন হাউস প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। তিনি আমাকে সেখানে গিয়ে ছয় মাস অবস্থান করার অনুরোধ করেছেন এবং বলেছেন, এতে দ্রুত সফলতা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে বরং গোটা বিশ্বের জন্য এরফলে সফলতার দ্বার উম্মুক্ত হতে পারে।’

হুযূর ব্যক্তিগতভাবে সেখানে যেতে পারেন নি কিন্তু তাঁর প্রস্তাবের গুরুত্ব অনুধাবন করে জার্মানীতে মসজিদ এবং মিশন হাউস নির্মাণের জন্য তিনি জমি ক্রয় করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক মৌলভী সাহেব দ্রুত বার্লিন শহরে দু’একর জমি ক্রয় করেন। এরপর হুযূর (রা:) ১৯২৩ সনের ২রা ফেব্রুয়ারী তাহরীক করেন যে,

‘ইউরোপে ত্রিত্ববাদের ঘাঁটি বার্লিনে মসজিদ এবং তবলীগি কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের (তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ) লাজনা বোনরা যেন অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তাদের অর্থায়নে এই মসজিদ নির্মাণ হোক।’

হুযূরের নির্দেশে সে যুগের দরিদ্র আহ্‌মদী মহিলারা প্রথমে টার্গেট মোতাবেক পঞ্চাশ হাজার এবং পরে বাহাত্তর হাজার সাতশ’র কিছু বেশি রূপী সংগ্রহ করেন। লাজনা ইমাইল্লাহ্ সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর এটি ছিল সর্বপ্রথম বড় কোন তাহরীক। এ তাহরীকের ফলে আহ্‌মদী নারীদের মধ্যে ত্যাগ ও কুরবানীর এক অনুপম প্রেরণা ও বিপ্লব সৃষ্টি হয় যা আল্লাহ্‌র ফযলে আজও আমাদের লাজনা বোনরা জীবিত রেখেছেন। এরপর ১৯২৩ সনের ৫ই আগস্ট, বার্লিন মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জার্মানীর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, অন্য আরেকজন মন্ত্রী, তুরষ্ক এবং আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূতদ্বয়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিনিধি ছাড়াও সমাজের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, সে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির সংখ্যা ছিল চার’শ আর আহ্‌মদী ছিলেন মাত্র চার জন। ....আহ্‌মদীর সংখ্যা কম হলেও সমাজের আপামর জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগ ছিল ব্যাপক যারফলে সেদিন এত অধিক সংখ্যক অতিথি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মারাত্মক ধ্বস নামে। ধারণা ছিল যে, ষাট হাজার রূপীতে মসজিদ নির্মাণ সম্ভব হবে কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পনের লক্ষ রূপীর প্রয়োজন দেখা দেয় কিন্তু জামাতের পক্ষে তখন এত বড় অংকের যোগান দেয়া সম্ভব ছিল না। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) বলেন,

‘বর্তমানে জামাতের পক্ষে বার্লিন এবং লন্ডন এর মত দু’টি মিশন পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।’

মোটকথা পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় সেসময় বার্লিনে মসজিদ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি কিন্তু আহ্‌মদী নারীদের ত্যাগ ও কুরবানী বৃথা যায়নি। হুযূর (রা:)'র নির্দেশে ১৯২৪ সনে বার্লিন মিশন হাউসের নির্মাণের পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয় এবং এ উদ্দেশ্যে সংগৃহীত অর্থে লন্ডনের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে ফযল’ নির্মিত হয়। আর আজ এই ঐতিহাসিক মসজিদের গুরুত্ব সবার কাছে সুস্পষ্ট। এরপর ১৯৪৮ সনে পুনরায় এখানে আসেন মোহতরম শেখ নাসের আহমদ সাহেব। তিনি হ্যামবূর্গে মিশন হাউস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

আজকের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে আর জামাতও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। সেযুগে সমুদ্র পথে সফর করে জামাতের মোবাল্লেগদের বিভিন্ন দূর্গম অঞ্চলে যেতে হতো।

হযরত মওলানা গোলাম ফরিদ সাহেব বাইশ দিন সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে জার্মানী এসেছিলেন। পবিত্র কুরআনের ইংরেজী অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত নোট ইনিই লিখেছেন। তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ ছিলেন যার ইংরেজীতে যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিল। তিনি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাহাবী ছিলেন।

অনুরূপভাবে, মৌলভী মোবারক আলী সাহেবের কথা বলতে হয় যে, তিনিও প্রাথমিক যুগের একজন মোবাল্লেগ ছিলেন। তিনি ১৯০৯ সনে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা:)’র হাতে বয়’আত করেন। তিনি একজন বাঙ্গালী ছিলেন। ১৯১৭ সনে খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) যখন জীবন উৎসর্গের তাহরীক করেন তখন সর্ব প্রথম যে তেষট্টি জন যুবক নিজেদের ওয়াকফ্ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে মৌলভী মোবারক আলী সাহেবও ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সনে বাংলাদেশে মৃত্যু বরণ করেন এবং বগুড়াতে নিজ এলাকাতে সমাহিত আছেন। মোটকথা এই দু’জন ছিলেন জার্মানীর প্রথম মোবাল্লেগ। আপনারা শুনেছেন যে, জামাতের সীমিত সামর্থ সত্বেও তাঁদের যোগাযোগ কত ব্যাপক ছিল। বর্তমান মোবাল্লেগদের উচিত তাদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া এবং নিজেদের অবস্থানকে বিশ্লেষণ করে কাজকে বেগবান করার আপ্রাণ চেষ্টা করা।

হুযূর বলেন, যে আবেগ, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও বেদনাভরা দোয়ার অভ্যাস সে যুগের আহ্‌মদী নারীদের মাঝে ছিল আজও সেই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় আহ্‌মদী মা-বোনরা সমৃদ্ধ বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি এটিও মনে করি যে, সেসব আহ্‌মদী নারীর দোয়াই ছিল যা তাদের আওলাদের মাঝে ধর্মের জন্য ত্যাগের সুমহান প্রেরণা সৃষ্টি করতে পেরেছে।

আজ আল্লাহ্ তা’লা শত বাঁধা-বিপত্তি এবং চরম বিরোধিতা সত্বেও জামাতকে বার্লিনে প্রায় সতের লক্ষ ইউরো এবং উনিশ কোটি পাকিস্তানী রুপী ব্যয়ে ‘খাদীজাহ্’ মসজিদ নির্মাণের সামর্থ দিয়েছেন। এ অর্থের সিংহভাগ যোগান দিয়েছেন জার্মানীর লাজনারা; চার লক্ষ ইউরো এসেছে বর্হিবিশ্বের লাজনাদের কাছ থেকে যার বেশিরভাগ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের লাজনারা। এ মসজিদ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জানিয়ে দিচ্ছি। মসজিদের জন্য সে যুগে দু’একর জমি ক্রয় করা হলেও বর্তমান মসজিদের মোট জমির পরিমাণ এক একরের কিছু বেশি। মসজিদের আয়তন এক হাজার আটশত কয়েক বর্গ মিটার। বিভিন্ন বিধি নিষেধ সত্বেও তের মিটার উচ্চ মিনার নির্মিত হয়েছে। এতে একশত আটষট্টি বর্গ মিটার প্রশস্ত দু’টি হল রয়েছে। চার কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাস গৃহ, গেষ্ট হাউস, চারটি অফিস কক্ষ ছাড়াও একটি প্রশস্ত সম্মেলন কক্ষ রয়েছে। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য একটি পার্ক বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আপনারা জানেন! এখানে মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে চরম বিরোধিতা হয়েছে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা কমে যাচ্ছে। যখন এখান থেকে শান্তি ও ভালবাসার পয়গাম মানুষ লাভ করবে তখন ইনশাআল্লাহ্ অচিরেই বিরোধিতা পুরোপুরি থেমে যাবে বলে আমি আশবাদী।

হুযূর বলেন, কাকতালীয় বিষয় হলো; সেযুগে যখন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় তখন আকস্মিকভাবে অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখা দেয় এবং এখনও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কিন্তু খোদা তা’লা করুণা করেছেন ফলে এমন পরিস্থিতি শুরু হবার আগেই আমাদের মসজিদ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে।

এরপর হুযূর খুতবার শুরুতে পঠিত দু’টি আয়াতের আলোকে মসজিদ নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি বিশ্ব আহ্‌মদীয়া জামাতের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন, কেবল মসজিদ নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়, আমাদেরকে মসজিদের অধিকার প্রদান করতে হবে। সর্বদা মসজিদে এসে যথাসময়ে বাজামাত নামায আদায় করলেই আমরা মসজিদের হক্ব প্রদানে সক্ষম হবো। আমাদের ঈমানকে সতেজ ও শক্তিশালী রাখার জন্য সর্বদা মসজিদের সাথে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ যুগে আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে যুগ ইমাম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে গ্রহণ করার তৌফিক দিয়েছেন। তিনি আমাদের ঈমানী অবস্থাকে দৃঢ় করার জন্য পদে পদে নির্দেশনা দিয়েছেন। মসজিদ বানিয়ে আমাদের আর্থিক কুরবানীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি বরং আরো বেড়েছে। আপনারা যারা ঘরের ব্যয় সংকোচন করে মসজিদ ফান্ডে চাঁদা দিয়েছেন তাদের এই চেতনা বা প্রেরণা কখনো মরবে না আর তারা গর্বও করে না। খোদার ভালবাসায় যারা আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করেন তিনি তাদের ধন ও জন সম্পদে অশেষ বরকত দেন। তাই আমাদের আরো অধিক কুরবানী করার প্রেরণা নিজেদের মাঝে জাগরুক রাখার চেষ্টা করা উচিৎ। আপনারা স্বয়ং এই মসজিদের প্রাপ্য হক্ব আদায় করুন এবং সন্তানদের তরবিয়ত করুন যাতে মসজিদের সাথে তাদের একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। আমাদের লাজনাদের ত্যাগ ও কুরবানী তখনই ফলপ্রদ হবে যখন আপনারা এবং আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম মসজিদের সাথে ওতপ্রতভাবে যুক্ত হয়ে যাবেন।

হুযূর বলেন, আমি জামাতের পুরুষ সদস্যদেরকে বলছি, আপনারা তখনই মহিলাদের এই ত্যাগের প্রতিদান দিতে সক্ষম হবেন যখন তাদের আকাংখা পূরণ করে সত্যিকার অর্থে নামাযী হবেন। মনে রাখবেন, মসজিদে আসা পুরুষদের জন্য আবশ্যক মহিলাদের জন্য নয়। তারা ইচ্ছে হলে আসতে পারেন আবার নাও পারেন। তাই মহিলাদের মসজিদ নির্মাণ করা প্রমাণ করে যে, তারা কেবল খোদার জন্য আন্তরিকভাবে কুরবানী করেন। তাদের স্বামী-সন্তান যেন মসজিদের সাথে যুক্ত থাকে এটিই তাদের পরম চাওয়া।

হুযূর বলেন, আমি খুতবার শুরুতে যে আয়াতদ্বয় তেলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

‘এবং সে ব্যক্তিই আল্লাহ্‌র মসজিদসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে যে আল্লাহ্ ও পরকালের উপর ঈমান আনে এবং নামায কায়েম করে আর যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না, এবং অচিরেই এরা হেদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। মু’মিন নারী এবং মু’মিন পুরুষ পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখে এবং নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও রসূলের আনুগত্য করে। এরা এমন যাদের প্রতি আল্লাহ্ অবশ্যই দয়াপরবশ হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়। (সূরা আত্ তাওবা: ১৮ ও ৭১)

এ আয়াতগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিন এবং নিজেদের ঈমান ও আমলের অবস্থা যাচাই করুন। মু’মিন হবার জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বারংবার বিভিন্ন স্থানে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। একস্থানে তিনি (আ:) বলেন,

‘মু’মিন তারা যাদের কর্ম তাদের ঈমানের সাক্ষ্য বহন করে। তাদের হৃদয়ে ঈমান লিখে দেয়া হয়েছে। তারা খোদা এবং তাঁর রসূলের নির্দেশকে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ত্বাকওয়ার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ ও সংকীর্ণ পথসমূহ তারা খোদার খাতিরে অবলম্বন করেন এবং খোদার ভালবাসায় তাঁরা বিলীন হন। আর প্রত্যেক বস্তু যা মূর্তির মত আল্লাহ্‌র পথে বাঁধা সৃষ্টি করে তা আখলাকের সাথে সম্পর্ক যুক্ত হোক বা মন্দ কর্ম অথবা উদাসীনতাই হোক না কেন এসব কিছু থেকে তারা নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন।’

সুতরাং এ হচ্ছে সেই ঈমান যা আমাদেরকে সর্বদা পরকালের প্রতি বিশ্বস্ত রাখবে। পরকাল সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একস্থানে বলেন,

‘আখিরাত সম্পর্কে আজকে আমার মনে এ ধারণার সৃষ্টি হলো যে, কুরআনের ওহী এবং পূর্বের ওহীর উপর ঈমান আনার কথাতো কুরআনে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু আমার উপর নাযেলকৃত ওহীর উপর ঈমান আনার কথা কেন কুরআনে বলা হয়নি। যখন এ বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবছিলাম তখন আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে ইলকার মাধ্যমে আমাকে জানানো হয় যে,

وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

এ আয়াতে তিনটির কথাই উল্লেখ রয়েছে। أُنْزِلَ إِلَيْكَ বলতে কুরআনের ওহী এবং وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ দ্বারা পূর্ববর্তী নবীদের ওহী আর بِالْآخِرَةِ বলতে মসীহ্ মওউদ এর উপর নাযেলকৃত ওহীকে বুঝায়। আখিরা’র অর্থ হচ্ছে যা পরে আসবে। পরে কি আসবে? পরে আসা বলতে বুঝায় সেই ওহী যা কুরআনের পরে নাযেল হবে।’

হুযূর বলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আখিরাতের একটি অর্থ হচ্ছে, শাস্তি পুরস্কার দিবস কিন্তু মসীহ্ মওউদ (আ:) আখিরাতের এই অর্থও করেছেন।

হুযূর বলেন, এ যুগে অনেক মসজিদ নির্মিত হচ্ছে কিন্তু যারা যুগ মসীহ্কে মানবে তারাই সত্যিকার অর্থে মসজিদ আবাদ করার যোগ্য। আর মসজিদের মাধ্যমেই মূলত: আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে। এ যুগে খোদা প্রেরিত মহাপুরুষকে মানার ফলে আমাদের জন্য নিশ্চয়তা রয়েছে। খোদার করুণায় আমরা মসজিদ আবাদ করার যোগ্যতা অর্জন করেছি এখন আমাদের উচিত দাবীর পাশাপাশি উন্নত নৈতিক গুণাবলী প্রদর্শন করা এবং সময়োপযোগী সৎকর্মের মাধ্যমে এই সতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখা।

হুযূর বলেন, এখানে মসজিদের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হলে স্থানীয় মানুষ এ বলে বিরোধিতা করেছিল যে, এখানে আহ্‌মদীদের সংখ্যা খুব একটা নেই মসজিদ বানানোর দরকার কি? আজ মসজিদ নির্মিত হবার পর যদি তারা দেখে যে, আহ্‌মদীরা যথারীতি নামাযে আসছে, মসজিদ আবাদ করছে, এ মসজিদ থেকে শান্তি ও সৌহার্দের শিক্ষা প্রচারিত হচ্ছে তাহলে তারা বিরোধিতা ছেড়ে শান্তি অন্বেষণে আমাদের জামাতের আশ্রয় নিবে। আজ আমাদের নৈতিক মান এত উন্নত হওয়া প্রয়োজন যাতে বিশ্ববাসী চোখ বুজে আমাদের উপর বিশ্বাস রাখতে পারে, আমাদেরকে ভালবাসে এবং সমাজের সকল শ্রেণী যেন আমাদেরকে তাদের শুভাকাংখী মনে করে।

যুগ ইমাম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে হুযূর জামাতের আপামর সদস্যদের ঈমানী চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ইবাদতের উন্নত মান প্রতিষ্ঠার জন্য ঔদাত্ত আহবান জানান আর খোদা ও বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে যত্নবান হয়ে জাতীর মূল্যবান অংশে পরিণত হবার নির্দেশ দেন।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে কুরআন-হাদীসের শিক্ষা ও যুগ ইমামের নির্দেশনা অনুসারে পবিত্র জীবন যাপনের তৌফিক দিন এবং খোদার কৃপা লাভে ধন্য করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে