In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জামাতে আহ্‌মদীয়ার নবনির্মিত প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে মোবারক’-এর উদ্বোধন

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

মসজিদে মোবারক, প্যারিস, ফ্রান্স

১০ই অক্টোবর, ২০০৮ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করেন,

يَا بَنِي آَدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآَتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آَيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

অর্থ: ‘হে আদম সন্তানগণ! আমরা তোমাদের জন্য পোষাক নাযেল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানসমূহকে আবৃত করে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ; কিন্তু ত্বাকওয়ার পোষাকই সর্বোত্তম। এটি আল্লাহ্ তা’লার আদেশাবলীর অন্তর্গত যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।’ (সূরা আল্ আ’রাফ: ২৭)

এরপর হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহে জামাতে আহ্‌মদীয়া ফ্রান্স প্রথম মসজিদ নির্মাণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে। এই মসজিদ ফ্রান্স জামাতের জন্য একটি মাইল ফলক হবে বলে আমি আশা করি। মসজিদ নির্মাণ করার জন্য স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন মনমানসিকতার পাশাপাশি এর মূল উদ্দেশ্যকেও দৃষ্টিপটে রাখা চাই। এই মসজিদ নির্মাণের কল্যাণে ফ্রান্স জামাত একটি বাস্তব শিক্ষা লাভ করেছে যে, যদি মানুষের ইচ্ছা ও আকাংখা পবিত্র হয় তাহলে চুড়ান্ত লক্ষ্যের পথে যত অন্তরায়ই থাকুক না কেন খোদা তা’লা নিজ করুণায় তা দূরীভূত করেন। এখানে ইতোপূর্বে একটি কক্ষে নামায আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিবেশীদের বিরোধিতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের বৈরী মনোভাবের কারণে জামাতকে অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আজ আল্লাহ্ তা’লা তাঁর অপার অনুগ্রহে যারা আমাদের বিরোধিতা করতো তাদের হৃদয়কে পরিবর্তন করেছেন। এলাকার মেয়র মহোদয় যিনি পূর্বে শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন তাঁর মন-মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। এখন খোদার ফযলে তিনিই সাহায্য করছেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদেরকে এই স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য অনুমতি দিয়েছেন। গতবার যখন আমি জলসায় এসেছিলাম তখন তিনি সম্মান প্রদর্শনার্থে জুতো খুলে ষ্টেজে এসে আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা মেয়র মহোদয়ের হৃদয়-দুয়ার সত্যের জন্য খুলে দিন এবং তিনি যেন ইসলামের অনুপম শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে সত্য গ্রহণের তৌফিক পান। মসজিদের মিনার উঁচু করা নিয়ে স্থানীয় লোকরা বিরোধিতা করেছে ফলে মিনার ছোট বানাতে হয়েছে। এছাড়া আনুষঙ্গিক যে বাঁধা-বিপত্তি এখনও আছে তা দূরীভূত হবার জন্য দোয়া করুন। আশা করি অচিরেই আল্লাহ্ তা’লা সকল সমস্যার সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাধান করবেন। আল্লাহ্ তা’লা যুগ মসীহ্‌কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে,

‘ইয়ানসুরুকা রিজালুন নূহী ইলাইহিম মিনাস্সামায়ে’

অর্থাৎ, এমন কতক মানুষ তোমাকে সাহায্য করবেন যাদের প্রতি আমরা আকাশ থেকে ওহী করবো।’

খোদার এই অঙ্গীকার আমাদেরকে শক্তি ও সাহস যোগায়। ইনশাআল্লাহ্ অচিরেই খোদার সাহায্য আসবে কিন্তু এজন্য আমাদেরকে খোদা প্রদত্ত শিক্ষার উপর পূর্ণ অনুশীলন করতে হবে। বর্তমানে যে মসজিদ নির্মিত হয়েছে তা ফ্রান্স জামাতের বর্তমান চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। মহিলা-পুরুষদের জন্য পৃথক নামায আদায়ের ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ইনশাআল্লাহ্ ভবিষ্যতে জামাতের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে খোদা তা’লা তা পূরণের সামর্থও দেবেন।

পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর লেখনীর আলোকে মসজিদ নির্মাণ এবং একে আবাদ রাখা ও এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে জামাতকে গুরুত্বপূর্ণ নসীহত করতে গিয়ে হুযূর বলেন, আমরা যুগ মসীহ্‌কে মেনে নিজেদের ভেতর পবিত্র পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেছি। আমাদেরকে এ অঙ্গীকার পূর্ণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। মসজিদে সকল জাগতিক চিন্তা-ভাবনা পরিত্যাগ করে কেবল খোদার ইবাদতের জন্য আসতে হবে। খোদার নৈকট্য লাভের জন্য মানুষের হৃদয়ে একটি ব্যাকুলতা থাকা চাই। যদি কোন বৈধ কারণ না থাকে তাহলে যথারীতি মসজিদে এসে বাজামাত নামায আদায় করতে হবে। আর মসজিদে যখনই আসবে তখন তনু-মন-ধ্যান সবই যেন খোদার প্রতি নিবদ্ধ থাকে সেদিকে দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। মনে রাখা আবশ্যক প্রথাগত ইবাদত মূল্যহীন।

মসজিদের প্রতি মানবের যে দায়িত্ব রয়েছে তা কিভাবে পালন করা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘মানুষ সৃষ্টির পিছনে খোদা তা’লার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন খোদার মা’রেফত এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করে। وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ (সূরা আয্ যারিয়াত: ৫৭) অর্থ: ‘এবং আমি জিন্ন ও ইনসানকে শুধু এ জন্য সৃষ্টি করেছি যেন তারা কেবলমাত্র আমারই ইবাদত করে। যে নিজ সৃষ্টির এই প্রধান উদ্দেশ্য ও মৌলিক বিষয়কে দৃষ্টিতে রাখে না বরং জাগতিকতার পিছনে ছুটে; সদা এ ভাবনায় থাকে যে, অমুক জমি কিনতে হবে, ওখানে ঘর বানাতে হবে বা এই কাজ করতে হবে এমন মানুষকে কিছু দিনের অবকাশ দিয়ে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয়া ছাড়া আর কি করা যেতে পারে। মানুষের হৃদয়ে খোদার নৈকট্য লাভের জন্য একটি বেদনা বা আকুলতা থাকা চাই। যার ফলে সে খোদার দৃষ্টিতে এক মূল্যবান সত্ত্বায় পরিগণিত হতে পারবে। মানুষের উচিত খোদার সাথে কিছুটা হলেও সম্পর্ক রাখা কেননা, সমস্ত ইবাদতের কেন্দ্র হচ্ছে হৃদয়। যদি ইবাদত করে আর হৃদয় খোদামূখী না হয় তাহলে ইবাদত কোন কাজে আসবে? দেখো! পৃথিবীতে হাজার হাজার মসজিদ রয়েছে কিন্তু সেখানে প্রথাগত ইবাদত ছাড়া আর কি আছে।’

হুযূর বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর এই সতর্কব�����ী হৃদয়কে প্রকম্পিত করে। মসীহ্ মওউদ (আ:) আমাদের কাছ����� কত বড় প্���ত্যাশা রাখেন। তিনি আমাদেরকে খোদার দৃষ্টিতে মূল্যবান বানানোর জন্য এবং আমাদেরকে খোদার নৈকট্যে ভূষিত করার জন্য কত বেদনা ও আন্তরিকতা রাখতেন। আজ আপনারা যদি যুগ মসীহ্‌র নির্দেশ মান্য করেন তাহলেই ইবাদতের সত্যিকার হক্ব আদায় করতে পারবেন আর খোদার নৈকট্য লাভেও সক্ষম হবেন। পৃথিবীতে অনেকেই মসজিদ নির্মাণ করে যার বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে আমাদের মসজিদের কোন তুলনা হয়না। কিন্তু এর নির্মাতারা যেহেতু আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের প্রতি অবাধ্যতা প্রদর্শন করেছে, যুগ মসীহ্‌কে মানতে অস্বীকার করেছে তাই তাদের মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও সত্যিকারের সৌন্দর্য নেই কেননা খোদার নির্দেশ পালনের মাঝেই মসজিদের আসল সৌন্দর্য নিহিত।

হযরত মসীহ মওউদ (আ:) আরো বলেন,

‘যদি কোন গ্রাম বা শহরে জামাতের উন্নতি চাও তাহলে সেখানে মসজিদ বানিয়ে দাও। মসজিদ নির্মাণের জন্য নিয়্যত স্বচ্ছ হতে হবে। জাগতিক কোন স্বার্থ যদি না থাকে তাহলে খোদা তা’লা মসজিদ নির্মাণের ফলশ্রুতিতে আমাদের অশেষ কল্যাণে ভূষিত করবেন।’

হুযূর বলেন, বর্তমানে পাশ্চাত্যে অমুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম হচ্ছে মসজিদ। আজ আপনারা যে ত্যাগ করে এ মসজিদ নির্মাণ করেছেন, অবশ্যই এর পিছনে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর কথা আপনাদের দৃষ্টিপটে থাকবে। জামাতের মাঝে ঐক্যের ভিতকে দৃঢ় ও মজবুত করার জন্য এ মসজিদ নির্মিত হয়েছে।

হুযূর বলেন, এই মসজিদ তারা নির্মাণ করেছে যারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর সত্যিকার প্রেমিক অর্থাৎ হযরত মসীহ্ মওউদ (আঃ)-এর মান্যকারী। তিনি (আ:) এ যুগে মানুষকে খোদার নিকটতর করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। আমাদেরকে এ মসজিদের অধিকার প্রদান করতে হবে আর মসজিদের অধিকার প্রদানের অর্থ হলো, একে বাজামাত নামাযের মাধ্যমে আবাদ রাখা।

হুযূর আরো বলেন, মসজিদ নির্মাণের সাথে সাথে আপনাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। বিশেষভাবে তিনটি দায়িত্ব বর্তেছে। ১. মসজিদ আবাদ রাখা অর্থাৎ যখন নামাযের সময় হবে মসজিদে এসে নামায পড়া আর পুরো আন্তরিকার সাথে কেবল খোদার উদ্দেশ্যেই মসজিদে আসা। ২. আহ্‌মদীয়াত তথা ইসলামের বাণী সর্বত্র পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া। গতকাল এখানকার একটি পত্রিকায় মসজিদ উদ্বোধন উপলক্ষ্যে মসজিদের ছবি এবং জামাতের পরিচিতিমূলক লেখা ছেপেছে। মসজিদ তবলীগের কেন্দ্র। তাই আপনারা মহানবী (সা:)-এর পতাকাতলে বিশ্ববাসীকে সমবেত করার প্রয়াসে তবলীগে ব্রতী হোন। ৩. আপনাদের নিজেদের মাঝে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করুন। কারণ এখন আমাদের প্রতি স্থানীয় লোকদের দৃষ্টি থাকবে তারা দেখবে আমরা কেমন মানুষ, আমাদের উঠাবসা কেমন? সবকিছু এরা গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করবে। তাই যারা মসজিদ নির্মাণ করেছেন তাদের কাজে ও কথায় মিল থাকা আবশ্যক। সুতরাং যারা পাশ্চাত্বে বসবাস করছেন আপনারা খোদার পূর্ণ আনুগত্য ও ইবাদতের মান সমুন্নত রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করুন।

হুযূর বলেন, আমি আগেও বলেছি, এখানকার পত্র-পত্রিকায় মসজিদের ছবি ছেপেছে। এখন আমাদের সম্পর্কে মানুষ আরো জানতে চাইবে, এটি অনেক বড় একটি কাজ। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হোন। ফ্রান্সে অনেক আরবী ভাষাভাষি মানুষ বসবাস করেন, তাদের কাছে সত্যের বাণী আমাদেরকে পৌছাতে হবে কেননা তারা আমাদের প্রতি অনেক বড় অনুগ্রহ করেছেন। মহানবী (সা:)-এর আগমন বার্তা পৌঁছিয়ে আমাদেরকে ইহ ও পারলৌকিক জীবনে সফলকাম করছেন। আজ রসূলের পতাকাতলে গোটা বিশ্বকে সমবেত করা যুগ মসীহ্‌র কাজ। আমাদের প্রত্যেককে যুগ ইমামের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। যার স্বভাব পবিত্র সে অবশ্যই এ পতাকা তলে আশ্রয় নিবে। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পয়গাম পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব। মনে রাখবেন তবলীগে সফলতা লাভের জন্য কেবল বাহ্যিক জ্ঞানের উপর নির্ভর করা চলবে না। আল্লাহ্ তা’লা মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে দোয়ার অস্ত্র দিয়েছেন। তাই তবলীগের পাশাপাশি বেশি বেশি দোয়া করুন, আমাদের দোয়াতেই ফল ধরবে। খোদার কৃপাভাজন হওয়ার জন্য দোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আপনারা কখনো দোয়াকে ভুলাবেন না। যাকে আপনি তবলীগ করবেন সে আপনার চাল-চলন ও উঠাবসা দেখবে। তাই নিজেদের ভেতর এমন পরিবর্তন আনুন যা অন্যদেরকে আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।

এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘আমাদের জামাতের সদস্যদেরকে আদর্শবান হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি আমাদের জামাতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে নোংরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, বিশ্বাস বা কর্মে দুর্বলতা দেখায় সে জালেম। সে জামাতের জন্য দুর্নামের কারণ হয় আর আমাদেরকেও আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করে। নোংরা নমুনা দেখলে ঘৃণার সৃষ্টি হয় আর ভালো আদর্শ স্থাপন করলে মানুষের মধ্যে জামাতের প্রতি আকর্ষণ জন্মে। অনেকই আমাদের কাছে পত্র লিখে বলেন যে, যদিও এখনও আমি আহ্‌মদী হইনি কিন্তু আপনার জামাতের কতককে দেখে ধারণা করতে পারি যে, অবশ্যই আপনাদের শিক্ষা পুণ্য ভিত্তিক। ‘ইন্নাল্লাহ্ মায়াল্লাযিনাত্ত্বাকাও ওয়াল্লাযীনা হুম মুহসিনূন’ আল্লাহ্ তা’লা সেসব লোকদের সাথে আছেন যারা পুণ্যকর্ম এবং ত্বাকওয়া অবলম্বন করেন। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যহ মানুষের কর্মের দিনলিপি প্রস্তুত করেন তাই মানুষকেও নিজ কর্মের একটি দিন পঞ্জিকা প্রস্তুত করা উচিত আর ভাবা উচিত যে, সে প্রত্যহ পুণ্যের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রসর হয়েছে। মানুষ যদি খোদাকে মানে আর তাঁর প্রতি পুরো ঈমান থাকে তাহলে এমন মানুষকে আল্লাহ্ তা’লা ব্যর্থ বা ধ্বংস করেন না। বরং একজনের খাতিরে লক্ষপ্রাণ রক্ষা করা হয়। সুতরাং আজকে আমাদেরকে নিজেদের কৃতকর্মের উপর দৃষ্টি রেখে নিজেদের পাশাপাশি পৃথিবীর লক্ষ-লক্ষ বরং কোটি কোটি মানুষকে আকাশ ও ভূমি থেকে উদ্ভুত বিপদাবলী থেকে রক্ষা করতে হবে একই সাথে পৃথিবীবাসীকে মহানবী (সা:)-এর পতাকাতলে আশ্রয় দিয়ে ইহকালীন ও পারলৌকিক আযাব থেকে রক্ষা করতে হবে ।’

সুতরাং মসজিদ বানিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করবেন না বরং ত্বাকওয়ায় সমৃদ্ধ হলেই আরো নেকী ও পুণ্যকর্ম করার তৌফিক পাবেন। মহানবী (সা:) মসজিদ নির্মাণকারীদেরকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তারা জান্নাতে বাসগৃহ লাভ করবে কিন্তু একই সাথে তিনি শর্ত রেখেছেন যে, সে মসজিদ কেবল খোদার খাতিরেই নির্মিত হতে হবে। যারা খোদার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদ বানায় তাদের মনে অহংকার সৃষ্টি হয় না বরং তারা আরো দৃঢ়তার সাথে ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ফ্রান্সের মাটিতে আপনাদের প্রথম মসজিদ। আপনারা খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন আর জেনে রাখুন সর্বোত্তম কৃতজ্ঞতা হচ্ছে ত্বাকওয়ায় সমৃদ্ধ হওয়া। খুতবার শুরুতে আমি যে আয়াত পাঠ করেছি তাতে আল্লাহ্ বলেছেন, সব কিছুর মূল হচ্ছে ত্বাকওয়া। তোমরা ত্বাকওয়ার পোষাক পর। মূর্তিমান ত্বাকওয়া হয়ে যাও। বর্তমানে পাশ্চাত্যে বিশেষ করে ফ্রান্সে পোষাকের ফ্যাশন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কাপড় না পরাই এখানে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েদের পোষাকের অবস্থা এমন শোচনীয় যা বলার অপেক্ষা রাখে না। গরমের সময় এরা প্রায় নগ্নই হয়ে যায় আর বলা যায় যে, নগ্নতাই এদের ফ্যাশন। খোদা তা’লা বলেন, পোষাকের দু’টি উদ্দেশ্য। এক হলো সৌন্দর্য বর্দ্ধন আর দ্বিতীয়ত: লজ্জাস্থান আবৃত করা। কোন পোষাক যদি মানুষের নগ্নতা ঢাকতে না পারে তাহলে তাকে পোষাক বলা যেতে পারে না। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলছি যে, বর্তমানে পাশ্চাত্যে বসবাসকারী কতক আহ্‌মদীও এই ফ্যাশানে প্রভাবিত হচ্ছে।

হুযূর বলেন, সাবালক হলেই নয় বরং শিশুকাল থেকেই বাচ্��াদের পোষাকের ব্যাপারে যত্নবান হোন। ৫/৬ বছর বয়স থেকেই বাচ্চাদের বুঝ��ন যে, অন্যদের থেকে তোমাদের পৃথক হতে হবে কারণ তোমরা আহ্‌মদী মুসলমান। খোদা তা’লা নগ্নতা ঢেকে রাখাকে পছন্দ করেন। আমাদের হাল জামানার ফ্যাশনে গা ভাসিয়ে না দিয়ে খোদার সন্তুষ্টির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।

হুযূর বলেন, অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ভক্ষন করবে না। অবৈধ ব্যবসা করবে না। সরকারের কর ফাঁকি দিবে না। চুরি করবে না। অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদদ্বারা যদি অট্টালিকাও নির্মাণ করো তাহলে জেনে রাখো তা হবে সাময়িক, বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও তা হবে ত্বাকওয়া শূন্য। যদি ত্বাকওয়া থাকে তাহলে যেভাবে খোদা তা’লা বলেছেন সেভাবে তোমাদের সৌন্দর্যের হেফাযত করো। দোয়া ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে যদি চেষ্টা করো তাহলে তোমরা সমাজের নোংরামি থেকে বাঁচতে পারবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে ত্বাকওয়াকে পোষাক বলে উল্লেখ করেছেন। যেভাবে পোষাক তোমাদের নগ্নতা ঢেকে রেখে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে অনুরূপভাবে ত্বাকওয়ার ফলে তোমরা সামাজিক কদাচার থেকে নিরাপদ থাকবে এবং খোদার বান্দা হিসেবে বিবেচিত হবে। সর্বদা আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আমাদের আসল সৌন্দর্য খোদার ইবাদতে নিহিত। আর ত্বাকওয়ার পোষাক পরিধান ছাড়া মানুষ সত্যিকার অর্থে খোদার ইবাদত করতে পারে না।’

আমরা মোহাম্মদী মসীহ্‌র হাতে বয়’আত করেছি। তাঁর সাথে কৃত বয়’আতের অঙ্গীকারগুলোর প্রতি আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়। সংক্ষেপে বয়’আতের শর্তগুলো হচ্ছে, ‘শির্‌ক বা অংশীবাদিতা হতে মুক্ত থাকা। মিথ্যা, ব্যাভিচার, কুদৃষ্টি, প্রত্যেক পাপ ও অবাধ্যতা, যুলুম, খেয়ানত, অশান্তি ও বিদ্রোহের পথ পরিহার করা। খোদা ও রসূলের নির্দেশানুযায়ী পাঁচ বেলা নামায আদায়, সাধ্যমতো তাহাজ্জুদ পড়া, রসূলের প্রতি দরুদ প্রেরণ এবং খোদার হাম্‌দ ও মহিমা কীর্তণ করা। কাজ বা কথা দ্বারা খোদার সৃষ্ট জীব বিশেষত: কোন মুসলমানকে কষ্ট না দেয়া। সুখে-দু:খে সর্বাবস্থায় খোদার সাথে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক বজায় রাখা। সামাজিক কদাচার পরিহার করা। অহংকার ও গর্ব সর্বতোভাবে পরিহার করা। ধর্মের সম্মান করাকে সকল প্রিয়জন হতে প্রিয়তর জ্ঞান করা। আল্লাহ্‌র ভালবাসা লাভের জন্য সৃষ্ট জীবের সেবায় যত্নবান থাকা এবং খোদা প্রদত্ত শক্তি ও সম্পদ মানব কল্যাণে নিয়োজিত রাখা। মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে আজীবন তাতে অটল থাকা এবং পার্থিব সকল সম্পর্কের উপর এ সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়া।

হুযূর বলেন, ত্বাকওয়ার উপর পদচারনার ফলেই মানুষ সকল সৌন্দর্য লাভ করতে পারে। এই ত্বাকওয়ার বলে বলীয়ান হবার মানসে যখন আমরা মসজিদে যাবো তখন আমাদেরকে খোদার এই ফরমানের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে যে,

يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

{ইয়া বনী আদামা খুযু যিনাতাকুম ইনদা কুল্লে মাসজিদিন}

অর্থ: ‘হে আদম সন্তানগণ! তোমরা প্রত্যেক মসজিদে উপস্থিতির সময় সৌন্দর্য অবলম্বন করো।’ (সূরা আল্ আ’রাফ: ৩২)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘যদি তোমরা চাও যে, পুন:পুন: খোদা তোমাদের প্রতি দয়া করুক তাহলে ত্বাকওয়া অবলম্বন করো আর যা আল্লাহ্ তা’লাকে অসন্তুষ্ট করে তা পরিহার করো। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ভেতর খোদা ভীতি সৃষ্টি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সত্যিকার ত্বাকওয়া অর্জন করতে পারবে না। মুত্তাকী বা খোদাভীরু হবার চেষ্টা করো। যারা খোদাভীতি রাখেনা তাদেরকে ধ্বংস করা হয় পক্ষান্তরে যারা সত্যিকার অর্থে আপন হৃদয়ে খোদা ভীতি রাখে তাদেরকে রক্ষা করা হয়। মানুষ নিজেদের চাতুরতা দ্বারা রক্ষা পেতে পারে না। স্মরণ রেখো! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা মুত্তাকী বা খোদা ভীরু না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর দরবারে তোমাদের দোয়া গৃহীত হবে না। তাই ত্বাকওয়া অবলম্বন করো। ত্বাকওয়া দু প্রকারের, একটির সম্পর্ক জ্ঞানের সাথে অপরটির সম্পর্ক আমলের সাথে। সত্যিকার জ্ঞান ও মা’রেফত তোমরা ত্বাকওয়াশীল না হলে লাভ করতে পারবে না। যদি চাও যে তোমাদের নামায, রোযা বা অন্যান্য ইবাদত খোদার দৃষ্টিতে গৃহীত হোক তাহলে তোমাদেরকে ত্বাকওয়ার পথে বিচরণ করতে হবে।’

পরিশেষে হুযূর হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে:)-র ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৮৪ সনের একটি রুইয়ার কথা উল্লেখ করেন যাতে তিনি দেখেন যে ঘড়ির কাটার ১০ অঙ্কটি ঝলঝল করছে। আজ ঘটনাক্রমে ১০ তারিখ এবং Friday the 10th । আজ ফ্রান্সে প্রথম আহ্‌মদী মসজিদ উদ্বোধন করা হচ্ছে। আপনারা দোয়া করুন খোদা তা’লা যেন আমাদের জন্য এই দেশের পক্ষে এই স্বপ্নের উত্তম তা’বীর প্রকাশ করেন। মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কল্যাণ লাভে আপনারা ধন্য হোন। কর্মকর্তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে যত্নবান হোন। পুরনো আহ্‌মদীরা বয়’আতের শর্তাবলীর প্রতি অভিনিবেশ করুন আর নবাগতদের চেহারায় আমি আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার যে দ্যুতি দেখেছি আল্লাহ্ তা’লা নিজ করুণায় তা স্থায়ী করুন।

জুমুআর নামায শেষে হুযূর সম্প্রতি মৃত্যুবরণকারী দু’জন আহ্‌মদী মোবাল্লেগের গায়েবানা জানাযার নামায পড়ান।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে