In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবার সারাংশ

খোদার পথে জীবন উৎসর্গকারীরা মৃত নয় বরং জীবিত

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১২ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হুযূর পবিত্র কুরআনের সূরা আল্ বাকারার নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

অর্থ:-

‘হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। এবং যারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয় তাদের সম্বন্ধে বলো না যে তারা মৃত; বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারছো না। এবং নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে ভয়-ভীতি ও ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, প্রাণসমূহ এবং ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করবো; এবং তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও। যারা, তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহ্‌রই, এবং নিশ্চয় আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। এরাই ঐসব লোক যাদের প্রতি তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আশিস এবং রহমতসমূহ বর্ষিত হয় আর এরাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’

(সূরা আল্‌ বাকারা: ১৫৪-১৫৮)

হুযূর বলেন, এ আয়াতগুলোর তেলাওয়াত শুনে আপনারা হয়তো কিছুটা অনুমান করতে পারছেন যে, সম্প্রতি পাকিস্তানে দু’জন নিষ্ঠাবান ও নিবেদিত প্রাণ আহ্‌মদীর শাহাদতের বরাতে আজ কিছু বলবো।

এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ্ তা’লা মু’মিনদেরকে সতর্ক করেছেন যে দেখ, ঈমানের পথ বড় বন্ধুর; বিপদ আসবে, তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হবে কিন্তু তোমাদেরকে ধৈর্য্যর সাথে এগোতে হবে। আর এ পরীক্ষা যখন আসে তখন পার্থিব কোন সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবে না বরং যতই বিপদ আসুক না কেন কেবলমাত্র খোদার সম্মুখেই সমর্পিত হবে। বিপদ এলে একজন সত্যিকার মু’মিনের দৃষ্টি ধৈর্য্য ও প্রার্থনার প্রতি নিবদ্ধ হওয়া আবশ্যক।

হুযূর বলেন, আজ আমাদেরকে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক ও আধ্যাত্মিক কষ্ট দেয়া হচ্ছে। আমাদেরকে কলেমা পাঠ করতে দেয়া হচ্ছে না। স্বাধীনভাবে আমরা নিজেদের ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারছি না। এমন অবস্থায় আমাদেরকে খোদার সমীপে অধিক বিনত হতে হবে এবং খোদা, রসূল ও যুগ মসীহ্‌র বাণীকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছানোর মত পবিত্র কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। যারা ধর্মের খাতিরে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, এরা মৃত নয় বরং লক্ষ কোটি মানুষের মাঝে এরা ঈমানী উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন। আল্লাহ্ বলেন, শত্রু তোমাদের প্রাণ হরণের জন্য তোমাদের উপর আক্রমন করে বা তোমাদেরকে জনবলের দিক থেকে দুর্বল করতে চায়। কিন্তু যদি খোদা তোমাদের সাথে থাকেন তাহলে একজন বা গুটিকতক মানুষের হত্যা কোনভাবেই আধ্যাত্মিক জামাতের দুর্বলতার কারণ হয় না। খোদা তা’লা অধিপতি! তাঁর কারণে যদি কেউ এই নশ্বর প্রাণ কেড়ে নেয় এর বিনিময়ে তিনি পরকালে একটি অনন্ত জীবন দান করেন, শহীদের নিজের পদমর্যাদা উন্নীত হতে থাকে আর একই সাথে বহুকাল ধরে মু’মিনদের মাঝে ঈমানী প্রেরণা সৃষ্টির কারণ হয়। শাহাদত আধ্যাত্মিক জামাতের সদস্যদের সাহস বৃদ্ধি করে, নতুনভাবে তাদের মাঝে প্রাণ সঞ্চার করে এবং তাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়। তাঁরা নির্ভিকভাবে শত্রুর সামনে দাঁড়ান আর বীরদর্পে সম্মুখ সমরে এগিয়ে যান আর ঘোষণা করেন, আমরা খোদার রাস্তায় উৎসর্গ হতে প্রস্তুত, তোমাদের সাকুল্য শক্তি দিয়ে আমাদেরকে অবদমিত করার চেষ্টা করো কিন্তু জেনে রাখো যে, ব্যর্থতা বৈ তোমাদের নিয়তিতে আর কিছুই নেই।

সম্প্রতি ডা: আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের শাহাদতের ঘটনার পর অনেকেই মৌখীক ও লিখিতভাবে আমাকে জানিয়েছেন যে,

‘যদি কোন স্থানে রক্তের প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা তার জন্য প্রস্তুত। তাঁরা লিখেন, কোন স্থানে যদি আহ্‌মদীর রক্তের প্রয়োজন হয় তাহলে আমাদেরকে সেই সুযোগ দেয়া হোক।’

ডা: মান্নান সিদ্দিকীর আকাংখা ছিল আন্তরিক আর তিনি খোদার দৃষ্টিতে শাহাদতের যোগ্য বিবেচিত ছিলেন বলেই খোদা তা’লা তাঁকে অমর জীবন দান করেছেন। আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা: খোদার পথে মৃত ব্যক্তি মৃত নয় বরং জীবিত। এ ধরাধাম থেকে সবাইকে বিদায় নিতে হবে, মৃত্যুর পেয়ালা পান করতে হবে সবাইকে, কেউ অমর নয় কিন্তু শাহাদাতের ফলে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে যে পদমর্যাদা লাভ করে তা অন্যদের সহজে লাভ হয়না বরং সে সৌভাগ্যের জন্য তাদেরকে এক সুদীর্ঘ কাল অপেক্ষা করতে হয়।

পবিত্র কুরআন, হাদীসের আলোকে হুযুর শহীদের মোকাম ও মর্যাদা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেন। এক হাদীসে এসেছে,

আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে একজন শহীদের ছয়টি অনুপম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ১. রক্তের প্রথম ফোটা ঝরার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। ২. তিনি জান্নাতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট ভাবে দেখতে পান। ৩. তাকে কবরের আযাব থেকে নিরাপত্তা দেয়া হবে। ৪. তিনি চরম উদ্বিগ্নতা থেকে নিরাপত্তা লাভ করবেন। ৫. তার মাথায় সম্মান ও গৌরবের এমন এক মুকুট পরানো হয় যার সামনে পার্থিব সকল মনিমুক্তা বা পদ্মরাগমনি অর্থহীন। ৬. এবং তাকে সত্তরজন নিকটাত্মীয়ের �����্ষে সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হবে।’

হুযূর বলেন, ‘أَحْيَاءٌ শব্দটি ‘হাই’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে, এমন জীবন লাভ যার কর্ম কখনো বৃথা যায় না। أَحْيَاءٌ এর আর একটি অর্থ হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যার প্রতিশোধ নেয়া হবে। খোদা শহীদের প্রতিটি রক্তবিন্দুর প্রতিশোধ নিয়ে থাকেন তাই আমরা ভীত নই। পূর্বেও ধর্মের সম্মান রক্ষার জন্য মু’মিনরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন এখনও দিতে প্রস্তুত। কিন্তু যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের রক্ত কোনদিন বৃথা যায়নি আজও ধর্মের খাতিরে প্রদত্ত আহ্‌মদীদের রক্ত বৃথা যাবে না। কারণ আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে মু’মিনদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করার কথা বলেছেন। সবশেষে বলেছেন যারা পরীক্ষার সময় ঈমানী দৃঢ়তা দেখাবে, ধৈর্য্য প্রদর্শন করবে তাদের জন্য সুসংবাদ অর্থাৎ

وَبَشِّرِالصَّابِرِينَ

অর্থ: ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ দাও।

হুযূর বলেন, আজ শত্রুরা যদি দু’একজন আহ্‌মদীকে শহীদ করে খোদার এই মনোনীত জামাতের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করার পাঁয়তারা করে তাহলে আমরা বলবো এটি তাদের অলীক স্বপ্ন মাত্র। আমাদের অগ্রযাত্রাকে তারা বাঁধাগ্রস্ত করতে পারবে না আর কোনদিন পারেওনি। তোমরা এমন নির্বোধ যে, মুসলমান হওয়ার দাবী করা সত্বেও কুরআনের অমোঘ ঘোষণার প্রতি দৃষ্টি দাও না। আল্লাহ্তা’লা বলেন:-

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

অর্থ: ‘এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু’মিনকে হত্যা করলে তার প্রতিফল হবে জাহান্নাম, যাতে সে বসবাস করতে থাকবে, আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রোধ বর্ষণ করবেন, তিনি তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহা আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সূরা আন্ নিসা: ৯৪)

হাদীসে এসেছে,

‘এক যুদ্ধে হযরত ওসামা বিন যায়েদ এবং অন্য একজন আনসারী এক কাফিরের পিছু ধাওয়া করেন। ধরা পড়ার পর সে কাফির কলেমা পাঠ করে। আনসারী সাহাবী কিছু না বললেও ওসামা (রা:) তাকে হত্যা করেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এ ঘটনা যখন মহানবী (সা:)-এর কাছে বিবৃত করা হয় তখন তিনি (সা:) বলেন, ‘লা ইলাহা পাঠ করার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? ওসামা (রা:) বলেন, সে-তো মৃত্যুভয়ে কলেমা পড়েছে! মহানবী (সা:) বলেন, তুমি কি তাঁর বুক চিঁড়ে দেখেছিলে যে, সে তরবারির ভয়ে কলেমা পাঠ করেছে? একথা শুনে ওসামা (রা:) বলেন, আমি ভাবলাম এ ঘটনার পূর্বে যদি আমি মুসলমান না হতাম তাহলেই ভাল হতো।’

অন্য হাদীসে আবু মূসা আশআরী (রা:) বলেন,

‘মহানবী (সা:) বলেছেন; যে ঘোষণা করে যে ‘আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই আর মুহাম্মদ (সা:) তাঁর রসূল’ তার ধন-সম্পদ ও প্রাণ সম্মানযোগ্য।’

হুযূর বলেন, আজ আহ্‌মদীদের উপর অপবাদারোপ করা হয় যে, আমরা নাকি মহানবী (সা:)-কে মানি না, আহ্‌মদীরা নাকি খাতামান্নবীঈন-এ বিশ্বাসী নয় অথচ আহ্‌মদীরা যেভাবে খাতামান্নবীঈন-এ বিশ্বাস করে বা এর মর্ম বুঝে অন্যরা তার সহস্র ভাগের একভাগও বুঝেনা; তা সত্ত্বেও বলে যে আহ্‌মদীরা হত্যা যোগ্য।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একস্থানে বলেন,

‘সেই ইনসান যিনি সর্বাপেক্ষা কামেল বা পরিপূর্ণ মানব এবং প্রকৃত অর্থেই যিনি ইনসানে কামেল এবং কামেল নবী যাঁর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক অভ্যুত্থান ও পুনরুত্থান সংঘটিত হওয়ায় পৃথিবীতে প্রথম কিয়ামত সংঘটিত হয়েছে এবং মৃত জগৎ পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সেই কলাণমন্ডিত নবী হচ্ছেন, হযরত খাতামুল আম্বিয়া ইমামুল আসফিয়া জনাবে মুহাম্মদ মুস্তফা (সা:)। হে আমাদের খোদা! তুমি সেই প্রিয়তম নবীর উপর রহমত ও দরূদ বর্ষণ করো যা তুমি পৃথিবীর আদিকাল থেকে অদ্যাবধি অন্য কারো উপরেই বর্ষণ করো নি।’

হুযূর বলেন, এরা যে কাজ করছে, আর প্রচার মাধ্যমে যা প্রচার করে বেড়াচ্ছে তা খোদা এবং তাঁর রসূল কর্তৃক কোন ভাবে সমর্থিত নয় কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো তাদের নামে (খোদা ও রসূল) এই অন্যায় করা হচ্ছে। হে অত্যাচারীরা! আহ্‌মদীদের উপর নির্যাতন করা থেকে বিরত হও। যে খোদা কাল ধৃত করেছেন আজও তিনি সক্রিয়। আল্লাহ্ বলেন

وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ

অর্থ: ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দিতেছি, নিশ্চয় আমার কৌশল সুদঢ়।’ (সূরা আল্ আ’রাফ: ১৮৪)

তাঁর প্রদত্ত অবকাশকে বিজয় মনে করো না। জামাতে আহ্‌মদীয়া খোদার নবীর শিক্ষা মোতাবেক ধৈর্য ধারণ করছে। যেখানে ধৈর্যশীলদের জন্য খোদার পক্ষ থেকে সুসংবাদ রয়েছে সেখানে তোমরা আমাদের কি-ই বা ক্ষতি করতে পার। জামাত দু:খ-কষ্ট সহ্য করছে এর ফলে যেখানে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি হচ্ছে সেখানে সামগ্রিকভাবেও জামাতের উন্নতি হচ্ছে। জামাতকে নসীহত করতে গিয়ে হুযুর বলেন, যখনই কোন চরম বিপদ আসে তখন খোদার শিক্ষা মোতাবেক মুখ থেকে যেন إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ শব্দ নির্গত হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘যারা দৃঢ়চিত্ততা প্রদর্শন করে তারাই মূলত: খোদার নিয়ামত ও পুরষ্কার লাভ করে।’

আল্লাহ্ তা’লা ইলহামে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে বলেছেন,

إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا

(ইন্না ফাতাহ্‌না লাকা ফাতহাম মুবীনা)

নিশ্চয় আমরা তোমাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।

যদি ঈমানে দৃঢ় হও এবং অবিচল থাক তাহলে এই ইলহাম তোমাদের পক্ষেও পূর্ণ হবে। আজ জামাত যে কষ্টের সম্মুখিন হচ্ছে এর পিছনেও বিজয়ের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। খোদা তা’লা কোন অবস্থাতেই শত্রুকে উল্লাসে মেতে উঠার সুযোগ দেবেন না। প্রতিটি শাহাদতের পর জামাত উন্নতি করেছে আর আজও করবে, ইনশাআল্লাহ্। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ وَاقٍ

অর্থ: ‘কিন্তু আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে ধৃত করেছেন, এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তি হতে তাদেরকে রক্ষা করার মত কেউ ছিল না।’ (সূরা আল্ মো’মেন: ২২)

হুযুর বলেন, এ আয়াতে অত্যাচারীকে শাস্তি দেয়ার ঐশী প্রতিশ্রুতি আমরা পূর্বেও পুর্ণ হতে দেখেছি আর এখনও দেখবো ইনশাআল্লাহ্। এইসব ত্যাগী ভাইদের উন্নত গুণাবলীকে কখনই বিস্মৃত হতে দেবেন না বরং তা অবলম্বন করার চেষ্টা করুন।

খুতবার শেষাংশে হুযূর আনোয়ার (আই:) দু’জন শহীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও সেবামূলক কর্মের কথা উল্ল্যেখ করেন। সম্প্রতি সিন্ধু প্রদেশের মিরপুর খাছ জামাতের আমীর এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক জনাব আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবকে নামাধারী ইসলাম সেবক উগ্রপন্থীরা গুলি করে হত্যা করে। এটি আহ্‌মদীয়া খিলাফতের দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম শাহাদত। তিনি ৪৬ বছর বয়স্ক একজন যুবক ডাক্তার ছিলেন। তাঁর পিতা জনাব আব্দুর রহমান সিদ্দিকী সাহেবও ডাক্তার ছিলেন। তিনি খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:)-এর নির্দেশে মিরপুর খাছ এলাকায় বসবাস আরম্ভ করেন। ছেলেকে চিকিৎসায় উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য আমেরিকা পাঠান এবং শিক্ষার পর সেখান থেকে আর্ত মানবতার সেবার জন্য ফিরিয়ে আনেন। এলাকার সর্বস্তরের মানুষের কাছে শহীদ একজন সর্বজনপ্রিয়, সজ্জন ও সদাহাস্যোজ্জল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমার সাথেও ডাক্তার সাহেবের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। তাঁর পিতার সাথে আমার পিতার ছিল গভীর বন্ধুত্ব আর তিনি ছিলেন আমার সর্বোত্তম সাথীদের একজন। তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর জামাতের আমীর হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় অনেক গুরুত্���পূর্ণপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। একজন বড় মাপের দাঈলাল্লাহ্ এবং আপাদমস্তক খিলাফতের প্রতি ভালবাসায় নিমগ্ন ছিলেন। তার সাথে শত্রুতার মূল কারণ হচ্ছে তবলীগ। তিনি একজ�� ত��লীগ পাগল মানুষ ছিলেন। সবসময় নিজ দায়িত্বে যেরে তবলীগদেরকে কেন্দ্রে নিয়ে আসতেন। কিছুদিন থেকে শত্রুরা তাঁকে হত্যার হুমকী দিয়ে আসছিল কিন্তু তিনি হেসে উড়িয়ে দিতেন, বলতেন দেখা যাবে। শত্রুরা তাঁকে হত্যা করে আহ্‌মদীয়াতের তবলীগের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে বলে আত্মপ্রসাদ নিচ্ছে; কিন্তু তারা জানে না ডা: আব্দুল মান্নান শাহাদত বরণ করে পিছনে অগণিত মান্নান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে ধনী-দরিদ্র সবাই শোকাতুর। সবাই তাঁকে অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ছিলেন গরীবের বন্ধু। বিনামূলে চিকিৎসা সেবাই প্রদান করতেন না বরং গাঁটের পয়সা খরচ করে দরিদ্রদের জন্য ঔষধ-পথ্যেরও ব্যবস্থা করতেন। আল্লাহ্ তাঁর পদমর্যাদা উন্নীত করুন। তিনি বিধবা স্ত্রী, মা এবং দু’সন্তান রেখে গেছেন। ডাক্তার সাহেব তার আমেরিকা প্রবাসী মামাত বোনকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী’ও স্বামী এবং জামাতের প্রতি একান্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত। আল্লাহ্ তা’লা শোক সন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য্যরে সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার তৌফিক দিন।

হুযূর বলেন, ডাক্তার সাহেবের মৃত্যুতে পাকিস্তানের সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবির মানুষ শোকবার্তা দিয়েছেন। সবাই একবাক্যে একথা স্বীকার করেছেন যে, ডাক্তার সাহেবের মৃত্যু শুধু জামাতে আহ্‌মদীয়ার জন্য নয় বরং সিন্ধু প্রদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এরপর শহীদ করা হয় জামাতের অপর একজন বুযুর্গ জনাব শেঠ মুহাম্মদ ইউসুফ সাহেবকে। তিনি নওয়াব শাহ জেলার আমীর ছিলেন। ১৯৬২ সনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জামাতের সেবা আরম্ভ করেন এবং আমৃত্যু বিশ্বস্ততার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আপনারা সবাই শহীদদের মাগফিরাত ও তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের ধৈর্যের জন্য দোয়া করুন।

এছাড়া এসব ঘটনায় আহতদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশংকাজনক। হুযূর উনাদের আশু আরোগ্যের জন্য সবার কাছে দোয়ার আবেদন করেন।

সবশেষে হুযূর বলেন,

এই শহীদগণ মৃত্যুকালে আমাদেরকে জানিয়ে গেছেন যে, আমরা মৃত নই বরং জীবিত। কিন্তু হে আহ্‌মদীগণ! তোমরা জামাত, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এবং আল্লাহ্‌র সাথে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক আরো দৃঢ় করো যাতে অমর জীবনের স্বাদ লাভে ধন্য হতে পারো।

হুযূর বলেন, রমযানে এই নামধারী ইসলাম সেবকরা সোয়াবের নেশায় মত্ত হয়ে বিভিন্ন উগ্রতা ও উম্মত্ততা প্রদর্শন করে। আল্লাহ্ তা’লা এদের শুভবুদ্ধি দিন এবং আমাদেরকে এদের নগ্ন আক্রমন থেকে রক্ষা করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে