In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

মু’মিন বান্দার বৈশিষ্ট - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

وَعِبَادُ الرَّحْمٰنِ الَّذِيْنَ يَمْشُوْنَ عَلَى الْاَرْضِ هَوْنًا وَّاِذَا خَاطَبَهُمُ الْجٰهِلُوْنَ قَالُوْا سَلٰمًا‏

وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا‏

وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَـنَّمَ‌ۖ اِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا‌ۖ‏

اِنَّهَا سَآءَتْ مُسْتَقَرًّا وَّمُقَامًا‏

وَالَّذِيْنَ اِذَاۤ اَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا وَكَانَ بَيْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا‏

وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ اِلٰهًا اٰخَرَ وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِىْ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالْحَـقِّ وَلَا يَزْنُوْنَ‌ۚ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذٰلِكَ يَلْقَ اَثَامًاۙ

(সূরা আল্ ফুরকান: ৬৪-৬৯)

وَالَّذِيْنَ لَا يَشْهَدُوْنَ الزُّوْرَۙ وَ اِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا‏

وَالَّذِيْنَ اِذَا ذُكِّرُوْا بِاٰيٰتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوْا عَلَيْهَا صُمًّا وَّعُمْيَانًا

وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا هَبْ لَـنَا مِنْ اَزْوَاجِنَا وَذُرِّيّٰتِنَا قُرَّةَ اَعْيُنٍ وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا‏

اُولٰٓٮِٕكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوْا وَيُلَقَّوْنَ فِيْهَا تَحِيَّةً وَّسَلٰمًاۙ‏

خٰلِدِيْنَ فِيْهَا‌ؕ حَسُنَتْ مُسْتَقَرًّا وَّمُقَامًا‏

(সূরা আল্ ফুরকান: ৭৩-৭৭)

এ আয়াতক’টির অনুবাদ হল,

‘রহমানের প্রকৃত বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলে, এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা (কোন বিবাদ না করে) বলে, ‘সালাম’। এবং যারা স্বীয় প্রভুর সমীপে সেজদাবনত ও দন্ডায়মান অবস্থায় রাত্রি যাপন করে। এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক-প্রভু! আমাদের উপর থেকে তুমি দোযখের আযাবকে অপসারিত কর, নিশ্চয় এর আযাব সর্বনাশা। নিশ্চয় এটি অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবেও অতি মন্দ এবং স্থায়ী ঠিকানা হিসেবেও। এবং যারা খরচ করার সময় অপব্যয় করে না আবার কার্পণ্যও করে না বরং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে; এবং যারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না এবং ন্যায়-সংগত কারণ ব্যতীত এমন কোন প্রাণকে হত্যা করে না যাকে আল্লাহ্ (হত্যা করা) হারাম করেছেন এবং তারা ব্যভিচার করে না; বস্তুতঃ যে কেউ এমন কাজ করবে সে শাস্তির সম্মুখীন হবে’।

(সূরা আল্ ফুরকান: ৬৪-৬৯)

‘এবং যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন বৃথা বিষয়ের পাশ দিয়ে যায় স্বসম্মানে চলে যায়; এবং তাদেরকে যখন তাদের প্রভুর আয়াতসমূহ স্মরণ করানো হয় তখন এর প্রতি বধির ও অন্ধের ন্যায় আচরণ করে না। এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক-প্রভু! তুমি আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি হতে চক্ষুর স্নিগ্ধতা দান করো আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানাও। এরাই এমন লোক যাদেরকে তাদের সৎকর্মের উপর অবিচল থাকার কারণে প্রতিদান সরূপ (সুরম্য) বালাখানা দেয়া হবে এবং সেখানে তাদেরকে শুভাশীষ ও শান্তির বাণী দ্বারা সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হবে, সেখানে তারা চিরকাল বাস করবে। অস্থায়ী ও স্থায়ী বিশ্রামাগার হিসেবে তা কতইনা উত্তম।’

(সূরা আল্ ফুরকান: ৭৩-৭৭)

রমযান মাস এসেছিলো আবার চলেও গেলো। এখনো মানুষের চিঠি-পত্র আসছে। এ (চিঠি) গুলোর মাঝে রমযান মাসে লেখা পত্রও রয়েছে এবং রমযানের পর লেখা চিঠি-পত্রও ফ্যাক্সের মাধ্যমে পৌঁছাচ্ছে। আল্লাহ্ করুন, আমরা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য পবিত্র পরিবর্তন সাধনের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি বলে যেন গণ্য হই, আর যদি কোন পবিত্র পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে তবে খোদা তা’লা যেন তা স্থায়ী করেন। আমাদের মধ্য হতে কতক মানুষের মাঝে এই যে অনুভুতি জাগ্রত হয়েছে ও চৈতন্যোদয় ঘটেছে এটিই রমযানের মূখ্য উদ্দেশ্য।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লা কতক বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নাবলী বর্ণনা করেছেন যা অবলম্বন করে অথবা যার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে মানুষ ইবাদুর রহমান বা রহমান খোদার বান্দা আখ্যায়িত হতে পারে।

যে আয়াতসমূহ আমি তিলাওয়াত করেছি তাতে যেসব বৈশিষ্ট্যাবলী বর্ণিত হয়েছে তা আপনারা শুনেছেন। যাতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্বাবলী এবং আল্লাহ্ তা’লার বিধি-বিধান সঠিকভাবে পালনের প্রতিও দৃষ্টি আর্কষণ করা হয়েছে। এসব অর্জনের জন্য যদি চেষ্টা করা হয় তবে আল্লাহ্ তা’লা এমন লোকদেরকে ইবাদুর রহমান বা রহমান খোদার বান্দা আখ্যা দিয়ে স্বীয় সন্তুষ্টির সু-সংবাদ প্রদান করেন। তাঁর জান্নাতের সু-সংবাদ দেন। অতএব রমযানের পরেও যদি আমরা আল্লাহ্ তা’লা নির্দেশিত পথে চলতে থাকি তবেই আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনকারী হবো, তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো এবং এর থেকে অংশ পাবো। এ কারণে আল্লাহ্ তা’লা যদি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন আর এর কল্যাণে আমাদের কারো মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধিত হয়, তাহলে তা আমাদের মাঝে স্থায়ী হবে।

ইবাদুর রহমান বা রহমান খোদার এমন বান্দাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো, يَمْشُوْنَ عَلَى الْاَرْضِ هَوْنًا অর্থাৎ, পৃথিবীতে তারা নম্রতা ও গাম্ভীর্যের সাথে বিচরণ করে। তাদের সকল সিদ্ধান্ত মধ্যম পন্থা ভিত্তিক হয়ে থাকে। সে অনর্থক কোন কারণে কখনো এমন কঠোরতা দেখায় না এবং রাগান্বিত হয় না যা পরবর্তীতে অনেক সময় অহংকারে রূপ নিতে পারে। তাদের স্বভাবে অপছন্দনীয় আলস্যও থাকে না যা আত্মসম্মানহীনতা ও তোশামোদে পর্যবসিত হতে পারে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভাবে নয় বরং যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে সমষ্টিগতভাবেও তা অবলম্বনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। জামাতবদ্ধ ভাবেও (তোমরা) আল্লাহ্ তা’লার বান্দা ও তাঁর ইবাদতকারী হবার মাধ্যমে (নিজেদের মধ্যে) এসব বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করো। এতে এ ভবিষ্যদ্বাণীও রয়েছে যে, যারা ইবাদুর রহমান বা রহমানের বান্দা হয় তারা আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে বিজয় বা সফলতা লাভ করে। যখন বিজয় আসে তখন যেন (তোমাদের মাঝে) অহংকার সৃষ্টি না হয়, অতীত (নির্যাতনের) প্রতিশোধ নেয়ার প্রতি দৃষ্টি যেন না যায়। তোমরা তখন আল্লাহ্ তা’লাকে ভুলে যেও না বরং তোমাদেরকে ভদ্র ও নম্র হয়ে অধিকার প্রদানের প্রতি মনোযোগী হওয়া চাই।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, خَاطَبَهُمُ الْجٰهِلُوْنَ قَالُوْا سَلٰمًا এক অর্থে একথার-ই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র প্রত্যেক বান্দার মাঝে ব্যক্তিগত ভাবে এ বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করতঃ প্রত্যেক নির্যাতনকারী এবং বিতন্ডাকারীকে বিনয়ের সাথে বুঝাও। আর দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্ তা’লার আদেশে তোমরা বিনয়ের যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছো এবং একইভাবে তোমাদের আপন সমাজ ও এলাকায় তোমরা জামাতী দিক থেকে যে সম্মানের অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছো, যখন শক্তিশালী হবে তখনও এটি স্মরণ রাখবে। শয়তান তার কাজ করেই যাবে। তোমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে এমন মোর্চা গড়বে যার ভিত্তিতে তোমাদের আবেগ অনুভূতিতে আঘাত হানা হবে। আবার একথাও বলা হবে যে, দেখো! এরা কতো অত্যাচারী মানুষ। এমতাবস্থায় তোমাদের আবেগকে সংযত রাখো। সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করো, সেই আদর্শকে সমুন্নত রাখো যা আমাদের সামনে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার সাহাবারা (রা.) উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে সমষ্টিগতভাবে আমাদের অবস্থার যে উন্নতি হবে এতে সেই ভবিষ্যদ্বাণীও অন্তর্নিহিত আছে।

কিন্তু এই সময় বিভিন্ন দেশে আর বিশেষ করে পাকিস্তানে এমন অবস্থা যে, আহমদীদেরকে বিরক্ত করা হয় তাদের আবেগ অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। চেষ্টা করা হয় - কোনভাবে যেন আহমদীরা বিরুদ্ধবাদীদের কর্মকান্ডে উত্তেজিত হয়ে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়; আর এরপর আইনের অজুহাতে আহমদীদেরকে যুলুম নির্যাতনের লক্ষ্যে পরিণত করা যায়।

তিনি বলেন, এই শয়তানী তকদীরের মোকাবিলায় রহমানের বান্দা হয়ে আইনের অনুশাষন মেনে তোমাদের কর্মকান্ড করো। কোনক্রমেই বন্দুকের উত্তর বন্দুকের মাধ্যমে দিও না। এরফলে জামাত ও অন্যান্য আহমদীদের জন্য বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

কাজেই বর্তমান অবস্থায় আমি আহমদীদের বলবো, এমন ইবাদুর রহমান হবার চেষ্টা করুন যা খোদা তা’লার সন্তুষ্টির কারণ হয় আর যেমনটি আমি বলেছি, এতে আল্লাহ্ তা’লা ভবিষ্যদ্বাণীও নিহিত রেখেছেন - একসময় জামাতবদ্ধভাবেও তোমাদের সাফল্য আসবে, ইনশাআল্লাহ্। সেই সময় পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেবে, প্রকৃত ইনসাফ বা ন্যায়বিচার কাকে বলে এবং শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্যের আবেগের প্রতি সম্মান দেখানো এবং নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা কাকে বলে।

আজকাল পাকিস্তানে বিশেষকরে বিরোধীরা বিভিন্নভাবে আহমদীদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। এবং চরমভাবে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাই একান্ত সতর্কতা ও সাবধানতার সাথে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন এবং ধৈর্য্য ও দোয়ার সাথে আল্লাহ্ তা’লার নিকট সাহায্য চেয়ে এই অবস্থার প্রতিরোধ করুন।

রহমান খোদার বান্দার বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেন:

‘রহমানের প্রকৃত পূজারী তারা - যারা পৃথিবীতে নম্রতার সাথে বিচরণ করে আর যখন অজ্ঞরা তাদের সাথে কঠোর আচরণ করে তখন তারা শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং সদয় বাক্যে তাদের প্রতিদান দিয়ে থাকে।’

আমাদের বোঝাপড়া করতে হচ্ছে চরম মূর্খ লোকদের সাথে। তাই স্বীয় আবেগকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে শান্তি এবং দয়ার রীতি অবলম্বন করতে হবে এবং তা প্রকাশ করতে হবে। তিনি (আ.) বলেন,

‘(তারা) কঠোরতার পরিবর্তে কোমলতা আর গালির পরিবর্তে দোয়া দেয়। আর রহমান খোদার গুণাবলী ধারণ করে। রহমান খোদা, পুণ্যবান ও পাপীদের মাঝে পার্থক্য করা ছাড়াই সকল বান্দাকে চাঁদ, সূর্য, আকাশ ও পৃথিবীর অগণিত নিয়ামতের মাধ্যমে কল্যাণ পৌঁছিয়ে থাকেন। অতএব এ আয়াতগুলোতে খোদা তা’লা ভালভাবে সুস্পষ্ট করেছেন রহমান শব্দ খোদা তা’লার ক্ষেত্রে যে-ই অর্থে ব্যবহৃত হয় তা হলো, তাঁর ব্যাপক রহমত সকল ভালো মন্দকে পরিবেষ্টন করে আছে।’

(বারাহীনে আহমদীয়া - রূহানী খাযায়েন - ১ম খন্ড - পৃ: ৪৪৯, টীকা)

অতএব আজও এবং ভবিষ্যতেও প্রত্যেক ভালো-মন্দ এবং বন্ধু-শত্রুকে আল্লাহ্ তা’লার রহমতের প্রতিফলনস্থল করার প্রচেষ্টায় দয়া ও আশিসপূর্ণ ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে, তাদের ভুলভ্রান্তি উপেক্ষা করে যেতে হবে। আর দোয়ার মাধ্যমে নিজের জন্য সাহায্য যাচনা করতে হবে আর অন্যের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য চাইতে হবে - যেন আমরা সর্বদা রহমান খোদার বান্দাদের ভেতর অন্তর্ভূক্ত থাকি।

ইবাদুর রহমানের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا অর্থাৎ, প্রভুর জন্য তারা নিজেদের রাতগুলো সিজদাবনত ও দন্ডায়মান অবস্থায় অতিবাহিত করে।

বিগত কয়েকদিনে অনেক বড় সংখ্যক লোক এ মোতাবেক কাজ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা এটি বলেন নি যে, ইবাদুর রহমান গুটি কয়েক দিন (এভাবে) কাটায় বরং স্থায়ীভাবে তারা তাদের রাতসমূহ ইবাদত করে ও দন্ডায়মান অবস্থায় অতিবাহিত করে। কাজেই একজন আহমদীর এটি একটি অনেক বড় দায়িত্ব। বিশেষ করে তখন যখন কিনা পৃথিবীর সকল মুসলমান দেশসমূহ সমস্যা ও বিপদাবলীতে জর্জরিত। আহমদীরা যেন শুধুমাত্র ফরয নামায পড়েই ক্ষান্ত না হয় বরং তাদের রাতগুলোকে যেন নফল ইবাদতের মাধ্যমে সজ্জিত করে এবং তাহাজ্জুদ নামাযের প্রতি মনোযোগী হয়। কেননা রাতের বেলা আরামের নিদ্রা পরিত্যাগ করা মুলতঃ নফসকে (প্রবৃত্তিকে) দমন করার নামান্তর, আর আল্লাহ্ তা’লাও একথাই বলেছেন। আমরা যদি একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ্ তা’লার জন্য রাতের বেলা (নফল) ইবাদত করি তবে, এটি জামাতের সমস্যাসমূহ দূর করার কারণ হবে। অতএব এটি স্মরণ রাখতে হবে যে, রাতের বেলা উঠা যেন কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে না হয় বরং (এ রাত জাগা যেন) আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ এবং জামাতী উন্নতির মানসে দোয়ার জন্য হয়। পৃথিবীর সকল আহমদী যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় জামাতের উন্নতির লক্ষ্যে রাতের বেলা কমপক্ষে দু’রাকাত নফল নামায পড়া অত্যাবশ্যকীয় করে নেয় তবে ইনশাআল্লাহ্ তা’লা আপনারা দেখবেন, কীভাবে পূর্বাপেক্ষা বেশি আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য আমরা লাভ করি এবং শত্রুদের শত্রুতা ও বিরোধীদের বিরোধিতাকে কীভাবে আল্লাহ্ তা’লা ধুলিস্মাৎ করে দেন।

মহানবী (সা.) এও বলেছেন,

আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, নফলের মাধ্যমে মানুষ আমার এতো নিকটবর্তী হয়ে যায় যেন আমি তার কান হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে শুনে থাকে, তার চোখ হয়ে যাই যদ্বারা সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে (কোন কিছু) ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যদ্বারা সে হাটে।

(সহীহ্ বুখারী - কিতাবুর রিক্বাক)

অতএব আল্লাহ্ তা’লা নফল নামায আদায়কারী ও তাহাজ্জুদ নামাযে অভ্যস্তদের এতোটা-ই নিকটবর্তী হয়ে যান; তাই আমাদের দায়িত্ব হলো, আল্লাহ্ তা’লার এ নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। রমযান চলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, রাতকে পূর্বের মত নষ্ট করবো আর অনেক রাত পর্যন্ত বৃথা বৈঠক করবো যার ফলে ফজরের নামাযের জন্য উঠাও কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। বরং সে ধরনের রাত লাভের চেষ্টা করুন যা আল্লাহ্ তা’লাকে নিকটে নিয়ে আসবে আর আমাদের জন্য আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য দানকারী হবে।

রমযান যা আমাদেরকে রহমান খোদার দাসত্ব শিখিয়েছে - তাই আমাদের কাজ হলো, এর উপর অনুশীলনের মানসে নিজেদের রাতগুলোকে ইবাদতের মাধ্যমে সজ্জিত রাখা। যেভাবে আমি বলেছি, ইনশাআল্লাহ্ - এটিই আমাদের স্বপক্ষে দ্রুত বিপ্লব নিয়ে আসবে।

মহানবী (সা.)-এর সাহাবীরা এর যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন আর বিশ্ববাসী দেখেছে, তারা কি বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন। বাধ্য হয়ে দিনের বেলা তাঁদের যুদ্ধ করতে হতো কিন্তু তাই বলে রাতের বেলা তারা আরাম করতেন না বরং সারারাত ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে রাতে ইবাদতের এ রীতি প্রতিষ্ঠিত ছিলো তাদের মাঝে উন্নতির ধারাও অব্যাহত ছিলো। আজ এটি আহমদীদের দায়িত্ব - তারা যেন এটি বাস্তাবায়ন করে আর আহমদীয়াত এবং ইসলামের উন্নতির জন্য অনেক বেশি দোয়া করে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবকালে আরব ও বিশ্বের কি অবস্থা ছিলো তা কারো অজানা নয়। তারা ছিলো চরম অসভ্য জাতি। পানাহার ছাড়া আর কিছুই জানতো না। মানুষের অধিকার কাকে বলে তাও জানতো না আর খোদার অধিকার সম্পর্কেও অবহিত ছিলো না। কাজেই খোদা তা’লা তাদের অবস্থান চিত্র অঙ্কন করে বলেন, يَاْكُلُوْنَ كَمَا تَاْكُلُ الْاَنْعَامُ অর্থ: শুধু পানাহারই তাদের কাজ ছিলো আর তারা সেভাবে আহার করে যেভাবে পশুরা খায়। (সূরা মুহাম্মদ: ১৩) পক্ষান্তরে আল্লাহ্‌র রসূল (সা.)-এর পবিত্র শিক্ষা তাদের উপর এমন প্রভাব ফেললো যে, তারা يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا -এ রূপান্তরিত হয়ে গেলো। অর্থাৎ নিজেদের প্রভুর স্মরণে রাতগুলো - সেজদা ও দন্ডায়মান অবস্থায় তাঁরা কাটিয়ে দিতেন। হায় আল্লাহ্! তাঁরা কতো বড় মাহত্বের অধিকারী ছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাহচর্যে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ও মহান পরিবর্তন সাধিত হলো। যুগপত মানুষ ও আল্লাহ্‌র অধিকারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনলেন। আর মৃত ভক্ষক ও মৃত জাতিকে এক উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী পুতপবিত্র জীবন্ত জাতিতে পরিণত করেছেন। অনুপম বৈশিষ্ট্য মূলতঃ দু’টিই হয়ে থাকে। প্রথমতঃ জ্ঞানগত, দ্বিতীয়তঃ ব্যবহারিক। ব্যবহারিক অবস্থার চিত্র ছিলো এরূপ: يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا আর জ্ঞানগত অবস্থার চিত্র হলো, প্রকাশনা ও ভাষাশিক্ষা প্রসারের সেবার কাজ এতো ব্যাপক পরিসরে হচ্ছিলো যে, এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া ভার।’

(আল্ হাকাম - ২য় খন্ড - নাম্বার: ২৪-২৫, ২০-২৭ আগস্ট, ১৮৮৯ - পৃ: ১০)

তিনি (আ.) আরও বলেন:

‘আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতা ছাড়া কোন ধর্ম চলতে পারে না। মহানবী (সা.)-এর আগমনের পূর্বে জগতের অবস্থা কিরূপ ছিলো তা পবিত্র কুরআন উল্লেখ করেছে। এরা ছিলো, يَاْكُلُوْنَ كَمَا تَاْكُلُ الْاَنْعَامُ এরপর যখন মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো তখন তারা হয়ে গেলো, يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا । যতক্ষণ পর্যন্ত আকাশ থেকে প্রতিষেধক না আসে ততক্ষণ হৃদয় সুস্থ্য হতে পারে না। মানুষ অগ্রসর হবার চেষ্টা করে ঠিকই কিন্তু সে পিছিয়ে যায়। মানুষ যদি পবিত্র গুণাবলী আর পবিত্র স্বভাবের অধিকারী হয় - তাহলে ধর্ম চলতে পারে। এছাড়া কোন ধর্মই উন্নতি করতে পারে না। করলেও প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না।’

(আল্ বদর - ২য় খন্ড - নাম্বার: ৩৭, ২ অক্টোবর, ১৯০৩)

কাজেই আমরা যারা এ অভিপ্রায় রাখি যে, জামাতের দ্রুত উন্নতি হোক; জামাতের সদস্যদেরকে যে সমস্যাবলী ও বিপদাবলীর সম্মুখীন হতে হচ্ছে তা দ্রুত কেটে যাক, তাহলে যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন যেভাবে ঐশী প্রতিষেধকের প্রয়োজন। আর ঐশী ব্যবস্থাপত্র পাওয়া যায় আল্লাহ্ তা’লার সমীপে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী উপস্থিত হয়ে প্রার্থনার মাধ্যমে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের এর সৌভাগ্য দিন।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য যা বর্ণনা করেছেন – তাহলো - ইবাদুর রহমান খোদা তা’লার নিকট জাহান্নামের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হবার জন্য প্রার্থনা করে আর জাহান্নাম দ্বারা দুই জাহান্নামই বুঝায়।

পরকালের জাহান্নামও যা পাপের ফলশ্রুতিতে পাবে। আর এই জগতের জাহান্নামও যা বিভিন্ন মন্দকর্ম বা ভুল-ভ্রান্তির অশুভ পরিণাম হিসেবে দেখতে হয়। অতএব ইবাদুর রহমান বা রহমান আল্লাহ্‌র বান্দার কাজ হলো, সর্বদা তওবা ও ইস্তেগফার করে যাওয়া। আল্লাহ্ তা’লার নিরাপত্তা বেষ্টনিতে থাকার চেষ্টা করা। আর আল্লাহ্ তা’লার নিকট দোয়া করুন যেন খোদা তা’লা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক লাঞ্চনা হতে রক্ষা করে। আর সর্বপ্রকার পার্থিব বিপদাবলীরূপী জাহান্নাম থেকে যেন রক্ষা করেন। ইহজাগতিক চাকচিক্য, মোহ ও জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার শৃঙ্খল যেন আবদ্ধ করতে না পারে। এগুলো পার্থিব জগতেও খোদা তা’লা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় আর পরিশেষে পারলৌকিক জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার কারণ হয়। এছাড়া এই দোয়াও করা উচিত যেন সন্তান-সন্তুতির পক্ষ থেকে আমাদের যেসব দুঃশ্চিন্তা অর্থাৎ যে কারণে আমাদের অভ্যন্তরে অস্থিরতার আগুন জ্বলে রয়েছে; তাও যেন দূর হয়।

রহমান খোদার ইবাদতকারীর পঞ্চম বৈশিষ্ট্য যা বর্ণনা করা হয়েছে তাহলো, لَمْ يُسْرِفُوْا অর্থাৎ, তারা অপব্যয় করে না। বৃথা খরচ করে না। না-ই তারা লোক দেখানোর জন্য ব্যক্তিগত সম্পদ খরচ করে আর না-ই অবিবেচকের মতো জামাতের সম্পদ ব্যয় করে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে অযথা খরচের একটি দৃষ্টান্ত আমাদের মাঝে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাহলো, বিয়ে-শাদীতে বাজে খরচ করা। এখানে এবং পাকিস্তানেও একে অন্যের দেখাদেখি বিয়েতে বিভিন্ন প্রকার খাবার রান্না করা হয়, এরপর ওলীমার ব্যবস্থা করা হয়। নিমন্ত্রণে কোন অশুবিধা নেই কিন্তু সাদামাটা হলে অশুবিধা কি? আবার বিয়ের আগে মেহেদী অনুষ্ঠানেরও একটি প্রচলন শুরু হয়েছে। এতেও প্রচুর খরচ করা হয়। আর মেয়ে পক্ষের লোকেরা যারা বিয়ের সাজসজ্জা বাড়াতে চায়, তারা এ উপলক্ষ্যেও নিমন্ত্রণ কার্ড ছাপায় ও বন্টন করে এবং মানুষকে রীতিমত নিমন্ত্রণ করা হয়। মেহেদী লাগাতে হলে মেয়েরা অথবা যারা কনের বান্ধবী তারা একত্রিত হয়ে লাগাতে পারে। কিন্তু এটিও প্রতিনিয়ত সংক্রমিত হয়ে চলেছে। আর শুধু দেখাদেখি তা করা হচ্ছে।

এরসাথে নতুন আরেকটি মাত্রা যা যোগ হয়েছে তাহলো, ছেলেপক্ষও বিয়ের পূর্বে সাজসজ্জার নামে মেহেদী লাগানোর দাওয়াত দেয়া শুরু করেছে। আমি দেখছি এই ভ্রান্ত প্রথা বরং বি’দাত; এতে ধর্ম সম্পর্কে খুব ভাল জ্ঞান রাখেন এমন লোকও জড়িয়ে পড়েছে। আর কোন কারণে কেউ যদি বড় কোন দাওয়াতের ব্যবস্থা নাও করে (যাহোক, কারণ আমাদের এটিই মনে করা উচিত, কোন নেকীর কারণে করে থাকবেন) তাহলে তাদের ব্যাপারে বলা হয় যে, এই ব্যক্তি কৃপণ, ইনি এই-সেই। বিশেষভাবে, যারা বিদেশ থেকে পাকিস্তানে যায় তারা দাওয়াত, অলংকারাদী আর পোশাক ইত্যাদিতে বেহিসাব খরচ করে থাকে আর পরস্পর প্রতিযোগিতামূলকভাবে খরচ করে। এসব অপচয়। যেভাবে আমি প্রথমে বলেছি, এক্ষেত্রে সাশ্রয়ের অভ্যাস থাকলে তা দরিদ্রদের কাজে আসতে পারে। গরীবদের বিয়ে-শাদীতে কাজে আসতে পারে। এরমধ্য হতে বড় অংক এতীমদের লালন-পালনের কাজে লাগতে পারে। অন্যান্য পুণ্যকাজে ব্যয় করা যেতে পারে। এভাবে যদি সাশ্রয়ের চেতনা সৃষ্টি হয় তাহলে এটিই মানুষকে রহমান খোদার বান্দা বানাতে পারে।

আর ৬ষ্ঠ বিষয় হলো, لَمْ يَقْتُرُوْا অর্থাৎ, তারা কার্পণ্য করে না। অনেকেই কার্পণ্য করতে গিয়ে যেখানে খরচ করা আবশ্যক সেখানেও খরচ করে না। কৃপণতার ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর এসব কিছু করে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার অভিপ্রায়ে। কোন কোন মানুষের কৃপণতা এমন পর্যায়ে পৌছে যায় যে, নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও খরচ করে না। আপন আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্য করে না আর গরীবদেরও কিছু দেয় না আর জামাতের জন্যও ত্যাগের বৈশিষ্ট্য তাদের মাঝে থাকে না। অতএব যেসব সামর্থবান সম্পদ থাকা সত্ত্বেও খরচ করে না তারাও রহমান খোদার বান্দাদের শ্রেণীভূক্ত হতে পারে না। অতএব আল্লাহ্ তা’লা যেখানে অপব্যয়কারীদের অপছন্দ করেছেন আর ইবাদুর রহমানের গন্ডি থেকে তাদের বহিস্কার করেছেন, সেখানে কৃপণদেরও অত্যন্ত অপছন্দ করেছেন। প্রথমতঃ সে যথাযথ ক্ষেত্রে খরচ করে না। দ্বিতীয়তঃ সে অর্থ আটকে রেখে, জমা করে সমাজের উন্নতির পথেও অন্তরায় সৃষ্টি করছে। অতএব খোদা তা’লা বলেন, ইবাদুর রহমান অপব্যয়ও করবে না, লোক দেখানোর জন্যও অপব্যয় করবে না আর এতোটা কার্পন্যও করবে না যে, প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করতেও দ্বিধা করবে বরং এ দু’য়ের মাঝে সে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে। আর ইবাদুর রহমানের খরচ করা ও খরচ থেকে বিরত থাকাও কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে।

ইবাদুর রহমানের সপ্তম পরিচয় হিসেবে বলেছেন, সে শির্‌কর কাছেও যায় না। শির্‌ক খোদা তা’লার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, শির্‌ক ব্যতিরেকে সকল পাপ ক্ষমা হতে পারে। ইবাদুর রহমান শির্‌ক মুক্ত থাকবে বলতে শুধু বাহ্যিক শির্‌ক বুঝানো হয় নি, যেমন মূর্তিপূজা ইত্যাদি। বরং সুপ্ত শির্‌কও তারা এড়িয়ে চলে। তাদের ইবাদত সমূহ ও অন্যান্য বিধি-বিধান পালন করা আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশনুযায়ী হয়ে থাকে। তারা খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখে যে, তাদের কোন আচরণ এবং কোন কাজ যেন গোপন শির্‌ক হিসেবে গণ্য না হয়। এ ব্যাপারে তারা একান্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। কোন কাজকর্ম তাদের ইবাদতের পথে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে না। বিগত খুতবায় আমি যেভাবে বর্ণনা করেছিলাম, এটিও এক প্রকার গোপন শির্‌ক।

ইবাদুর রহমান হবার অষ্টম শর্ত হলো, তারা কোন সৃষ্ট জীবকে অন্যায় ভাবে হত্যা করে না। যদিও মহানবী (সা.), সাহাবাগণ, খোলাফায়ে রাশেদীন ও পরবর্তী মুসলমানগণ তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে যুদ্ধ করেছেন আর তা ছিলো কেবলমাত্র শক্রদের বাড়াবাড়ি ও সীমাতিক্রমের কারণে এবং তাদেরকে নির্যাতন থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে। মহানবী (সা.) ও সাহাবাগণ চেষ্টা করেছেন এবং নির্দেশও দিয়েছেন, কোন শিশু, নারী, গোত্র প্রধান, পাদ্রী, ধর্মজাযক, সন্ন্যাসী এবং যারা যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত নয় তাদের হত্যা করো না। এর বিপরীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, লক্ষ লক্ষ নিরীহ জাপানীদের হত্যা করা হয়েছে। আজও শান্তি প্রতিষ্ঠার অজুহাতে বিমান হামলা করে নিষ্পাপ লোকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এতো হচ্ছে ইসলাম বিরোধীদের অবস্থা। কিন্তু যারা ইবাদুর রহমান হবার দাবী করে আত্মপ্রাসাদ নেয় তারাও আত্মঘাতী হামলা করে নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করছে। এটা আরেক বেদনাদায়ক ও ভয়ানক অবস্থা, ধর্মের নামে নরহত্যা চলছে। কাজেই এমন মানুষ কখনোই ইবাদুর রহমান হতে পারে না।

ইবাদুর রহমানের নবম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ব্যভিচার করে না। আক্ষরিক ব্যভিচারও এর অন্তর্ভূক্ত আর নোংরা, কদর্য অনুষ্ঠান আর দৃশ্য উপভোগ করাও এর অন্তর্ভূক্ত। আজকাল ইন্টারনেট ও টিভি চ্যানেল সমূহে অবাধে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখা হয় যা মানসিক ও চোখের ব্যভিচারের অন্তর্ভূক্ত। আহমদীদেরকে এগুলো বিশেষভাবে এড়িয়ে চলা উচিত।

দশম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইবাদুর রহমান কখনো মিথ্যা বলে না, মিথ্যা সাক্ষ্যও দেয় না। কেননা, জাতিগত পদস্খলন ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে মিথ্যা ভয়ানক ভূমিকা রাখে। আল্লাহ্ তা’লার বান্দা ও ঐশী জামাতকে তো উন্নতির রাজপথে এগিয়ে যেতেই হবে, তাই আল্লাহ্ তা’লা তাদের সাথে এই অঙ্গীকার করেছেন যে, তারা উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহন করবে আর ক্রমশঃ উর্দ্ধে গমন করতে থাকবে। তাদের ভেতর যদি মিথ্যা অনুপ্রবেশ করে তাহলে তারা আল্লাহ্ তা’লার সেই বিশেষ বান্দা বলে গণ্য হবে না, যাদের প্রতি আল্লাহ্ তা’লা অনুগ্রহ বর্ষণ করেন বা যাদের প্রতি অনুগ্রহ করার অঙ্গীকার করেছেন। অতএব সাক্ষ্য দেয়া বা অন্যান্য বিষয়ে যখন আহমদীদেরকে আহবান জানানো হয়, তখন শত ভাগ সত্য কথা বলা উচিত। উদাহরণ স্বরূপ পারিবারিক বিষয়াদিকে নিন; বিবাহের সময় এই সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনের অঙ্গীকার করা হয়ে থাকে যে, আমরা সর্বদা সরল-সোজা কথা বলবো, সত্যের ভিত্তিতে কাজ করবো; এমন সত্য বলবো যাতে কোন ধরনের সংশয় বা সন্দেহ থাকবে না। যার অন্য কোন অর্থও করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিবাহের পরে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে মিথ্যা বলে আর স্বামীও স্ত্রীর সাথে মিথ্যা কথা বলে। উভয়ের শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা পরস্পরের সাথে মিথ্যা বলে। আর দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ ও সংঘাত শুরু হয়, ধীরে-ধীরে তা বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। কেবলমাত্র ব্যক্তিগত অহমিকা ও কামনা-বাসনার কারণে অনেক ঘর ভেঙ্গে যায়। বাচ্চা হবার পরও ঘর ভেঙ্গে যায়। পূর্বেও কয়েকবার এ সম্পর্কে আমি বলেছি। কাজেই আল্লাহ্‌র অধিকার ও বান্দার প্রাপ্য প্রদানের জন্য একজন মু’মিনকে এবং সেসব লোক যারা নিজেদেরকে ইবাদুর রহমানদের অন্তভূর্ক্ত মনে করেন, সর্ব প্রকার মিথ্যার প্রতি তাদের ঘৃণা থাকা আবশ্যক।

এরপর একাদশতম বৈশিষ্ট্য, اِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا অর্থাৎ, পার্থিব আনন্দ-ফূর্তিতে বিভোর হয়ে তাতেই লিপ্ত থাকে না। যেভাবে পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি, এ যুগের অর্থহীন বিনোদন, ইন্টানেট এবং টিভি চ্যনেল সমূহ্ও এর অন্তভূর্ক্ত যা বিভিন্ন রুচিহীন কদর্য অনুষ্ঠান প্রচারে ব্যস্ত। এছাড়া আজকাল স্কুল-কলেজে ছেলে-মেয়েরা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে, ক্লাবে যায়, একত্রে নৃত্য করে ও গানের আসরে বসে, এরপর এগুলো ধারণ করে প্রোগ্রাম তৈরী করা হয়। কনসার্ট দেখার প্রোগ্রাম হয়। একজন মু’মিনের কাছে উক্ত সব কিছুই বৃথা কাজ। একদিকে আমরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আত করার অঙ্গীকার করি আর ইবাদুর রহমান হবারও দাবী করি; তাসত্ত্বেও এসকল বৃথাকর্মে লিপ্ত হওয়া যা চরিত্র ধ্বংস করে - তা কীভাবে সিদ্ধ হতে পারে। অতএব সত্যিকার আহমদীকে এসব কিছু এড়িয়ে চলা একান্ত কর্তব্য।

এছাড়া ঝগড়া-বিবাদও অর্থহীন কর্মের অন্তভূর্ক্ত, যার বিস্তারিত বিবরণ পূর্বেও এসেছে। কাজেই সেসব বিষয়, যা সমাজের শান্তি-সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ, এগুলো সবই বৃথা কাজ।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

وَ اِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا যখন তারা কোথাও কোন বৃথা কথা শোনে যা কোন যুদ্ধ বা ঝগড়া বিবাদের কারণ হতে পারে, তবে তারা ভদ্রতার আশ্রয় নিয়ে তা উপেক্ষা করে। আর সামান্য সামান্য বিষয়ে ঝগড়া শুরু করে না। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত অসহ্য কোন কষ্ট না পায় ততক্ষণ পর্যন্ত ঝগড়া বিবাদ করা পছন্দ করে না। ছোট-খাট বিষয় উপেক্ষা করা, ক্ষমা করাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত রাখার উপায়। এ আয়াতে যে ‘লগব’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে সে সম্পর্কে আরবী ভাষায় এমন আচরণকে ‘লগব’ বলা হয় যেমন, উদাহরণ স্বরূপ কোন ব্যক্তি দুষ্টামী করে এমন বাজে কথা বলে বা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে এমন কোন কাজ করে, যদ্বারা বাস্তবিক কোন ক্ষতি হয় না। অতএব শান্তি প্রিয়তার লক্ষ্যণ হলো, এমন অন্যায় কষ্টকে উপেক্ষা করা আর ভদ্রতার আশ্রয় নিয়ে তা এড়িয়ে যাওয়া।

(ইসলামী নীতি দর্শন)

আর দ্বাদশতম বৈশিষ্ট্য হলো, যখন তাদের সামনে খোদার আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তারা বধির ও অন্ধের মত আচরণ করেন না বরং সজাগ দৃষ্টিতে মনেযোগ সহকারে তা শুনে। কুরআনের বরাতে যে সদুপদেশ দেয়া হয় তখন সে মোতাবেক আমলের চেষ্টা করে। আধ্যাত্মিক উন্নতির চেষ্টা করে। অতএব রহমানের প্রকৃত দাসত্বের জন্য সকল প্রকার সদুপদেশ মোতাবেক কাজ করা আবশ্যক। এটি দেখবেন না যে, কে নসীহত করছেন বরং এটি দেখুন, খোদা ও রসূলের বরাতে যা বলা হচ্ছে তার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে অন্যথায় মানুষ হোঁচট খেতে পারে। আর এমন মানুষ শুধু ইবাদুর রহমানের গন্ডি থেকেই বেরিয়ে যায় না বরং ধীরে ধীরে জামাত থেকেও দূরে সরে যায়।

আর ত্রয়োদশতম বিশেষত্ব হলো, তারা নিজ স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য এই দোয়া করে, খোদা তাদেরকে - তাদের হৃদয়ের প্রশান্তির কারণ করুন। কাজেই অনাগত প্রজন্মের সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য এটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপত্র হলো, যেখানে মানুষ তার সন্তানের আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উন্নতির জন্য বাহ্যিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে; সেখানে এর পাশাপাশি তাকে দোয়াও করতে হবে। কেননা, খোদা তা’লা-ই প্রকৃত সত্তা - যিনি পরিণাম শুভ করেন। যদি কেউ এরূপ মনে করে যে, তারা ব্যক্তিগত যোগ্যতার গুণে সন্তানের তরবিয়ত করছে, তবে এটি তাদের ভুল ধারণা। বস্তুবাদী মানুষ যদি সন্তানের জাগতিক উন্নতি দেখে; তবে তারা জেনে রাখুক, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’লার রহমানিয়াতের কল্যাণেই তারা কল্যাণ মন্ডিত হচ্ছে বা এটি থেকে তারা লাভবান হচ্ছে কিন্তু এটি কেবল জাগতিক উন্নতি। তাদেরকে কোনক্রমেই রহমান খোদার বান্দা বলা যায় না। কেননা, আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম হবার সম্মান প্রদান করেন নি। আর মুত্তাকীদের ইমাম হিসেবে তাক্বওয়ার পানে ধাবমান হবার প্রতি তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ হয়নি। কিন্তু যে নিজ সন্তানের জন্য তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতির দোয়া করবে সে কেবল জাগতিক উন্নতির দোয়া-ই করবে না বরং ধর্মীয় ও আধ্যাতিক উন্নতির জন্যও প্রার্থনা করবে। আর নিজেও তাক্বওয়ায় অগ্রগামী থাকার চেষ্টা করবে আর আল্লাহ্ তা’লার নিয়ামতরাজি অর্জনকারী হবে।

আজকাল পৃথিবীর সর্বত্র পিতামাতা - সন্তানদের তালীম এবং পার্থিব উন্নতির জন্য খুবই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকেন কিন্তু আধ্যত্মিকতার প্রতি মনোযোগ নাই বললেই চলে। এখানে পশ্চিমা বিশ্বে স্বাধীনতার নামে এখন সন্তানদেরকে এমন ধৃষ্ট করে তুলেছে যে, তারা পিতামাতার সুদুপদেশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। আর এখন এসব লোকদের বোধদয় ঘটছে। টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখানো আরম্ভ হয়েছে যে, এটি সন্তানদেরকে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক স্বাধীনতা দেয়ার ফলে হচ্ছে। পিতামাতা সন্তানের ইমাম হওয়া-তো দূরের কথা বরং এখন সন্তানরা পিতামাতার সামনে রুখে দাঁড়ায়। অনেক এমন মামলা আছে, যেখানে সন্তান কর্তৃক পিতামাতা প্রহৃত হবার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এরা সামান্য বাঁধা বিপত্তিও সহ্য করে না। কোন সদুপদেশ তারা সহ্য করে না। আমি পূর্বেও বলেছি, এ আওয়াজ এখন উত্থিত হচ্ছে যে, পরবর্তী বংশধরকে যদি সামাল দিতে হয় তাহলে এর (স্বাধীনতার) কোন সীমা নির্ধারণ করা আবশ্যক; অর্থাৎ পিতামাতা কতদূর সহ্য করবে এবং কখন নিজ সন্তানকে শাস্তি প্রদান করবে। কেননা, পিতা কোন অপকর্মের কারণে সন্তানকে শাস্তি দিলে পাশ্চাতে ছেলেমেয়েদের সুরক্ষার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা বাচ্চাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যায়। ছেলেমেয়ে পিতা-মাতাকে ভয় দেখায়, আমাদেরকে কিছু বললে আমরা সেখানে চলে যাবো। আর এ বিষয়টি সন্তানদেরকে সীমাতিরিক্ত ধৃষ্ট করে তুলেছে। কতক পরিবার এমন রয়েছে যাদের সন্তানদের অবস্থা খুবই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর একটি বড় কারণ হলো, দোয়ার প্রতি অমনোযোগ। তাই তিনি (আ.) বলেছেন, আল্লাহ্ তা’লার কাছে দোয়া করো যেন শিশুদের সঠিক তরবিয়ত হয়। আর এর সাথে সাথে উত্তম দৃষ্টান্তও স্থাপন করো।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘আরও একটি কথা আছে, মানুষ মরিয়া হয়ে সন্তান কামনা করে আর সন্তান হয়েও থাকে কিন্তু সন্তানদের তরবিয়ত, তাদের চাল-চলন উন্নত করা এবং ও খোদার অনুগত করার কোন চেষ্টা বা চিন্তা কখনও দেখা যায় না। কখনো তাদের জন্য দোয়া করে না আর তরবিয়তের গুরুত্বও দৃষ্টিপটে রাখে না। তরবিয়তের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কীভাবে করতে হবে, কোন বয়সে কি ধরনের তরবিয়ত করা দরকার। কোন বয়স থেকে বাচ্চাদেরকে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে - এদিকে তাদের দৃষ্টি নেই।’

তিনি (আ.) বলেন, ‘আমার অবস্থাতো এরূপ যে, এমন কোন নামায নেই যে নামাযে আমি আমার বন্ধুবান্ধব, সন্তান এবং স্ত্রীর জন্য দোয়া করি না। অনেক পিতামাতা এমন আছেন যারা নিজ সন্তানকে বদভ্যাসে অভ্যস্ত করে, শুরুতে যখন তারা মন্দকাজ শিখে তখন তাদেরকে তিরষ্কার করে না। পরিণামে তারা দিনে দিনে দুঃসাহসে ধৃষ্ট হতে থাকে।’

(আল্ হাকাম)

মানুষ সন্তানের আকাঙ্খা করে থাকে, কিন্তু তা এ উদ্দেশ্যে নয় যে তারা ধর্মের সেবক হবে, বরং পৃথিবীতে যেন তাদের কোন উত্তরাধিকার থাকে। আর যখন সন্তান হয় তখন তার তরবিয়তের বিষয়ে চিন্তা করা হয় না আর তার বিশ্বাসেরও সংশোধন করা হয় না। ছেলেমেয়েদের শেখানোও হয় না। কেউ আমাকে বলেছেন, স্কুলে কোন অ-আহমদী মুসলমান কোন আহমদী ছেলে বা মেয়েকে বলেছে, তোমরাতো শয়তানের ইবাদত করো, তোমরাতো খোদাকে মানো না। যথেষ্ট বুদ্ধিমান বা বুদ্ধিমতি ছেলে বা মেয়ে ছিলো কিন্তু তার জানাই ছিলো না - এর কি জবাব দিতে হবে। তাই সে চুপ করে থাকলো। তার এই নিরবতার কারণে অন্যান্য বাচ্চারা এ ধারণাই করে থাকবে যে, আহমদীরা খোদাকে মানে না। এই মৌলিক বিযয়টিও অনেকে নিজ সন্তানদেরকে বলে না।

তিনি (আ.) বলেন, আর তার চারিত্রিক অবস্থারও সংশোধন করা হয় না। শৈশব থেকে চারিত্রিক অবস্থার সংশোধন করলে তুই বলাতো দূরের কথা পিতামাতার সামনে সন্তান কখনো রুখে দাঁড়াতেই পারে না। আগেও আমি একবার বলেছি, মেয়েদের নির্দিষ্ট পোশাক রয়েছে। বাল্যকালে অর্থাৎ, চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই পোশাকের প্রতি যদি দৃষ্টি দেন তাহলে বড় হয়ে তাদের মাঝে চেতনা জাগ্রত হবে। তের-চৌদ্দ বছর বয়সে যদি হঠাৎ করে বলেন যে, তুমি জিন্স ও ছোট কামিজ ছেড়ে লম্বা কোট পরিধান করো, তাহলে সন্তান প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এজন্য তিনি (আ.) বলেন, চারিত্রিক অবস্থার সংশোধন করা হয় না। তাই শিশুকাল থেকেই এদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

তিনি (আ.) বলেন, ‘স্বরণ রাখবে সে ব্যক্তির ইমান সঠিক নয় যে নিকটতম সম্পর্ক কি তা বোঝে না। যেখানে সে এ বিষয়ে অপারগ সেখানে তার কাছ থেকে অন্য কোন নেকীর আশা কীভাবে করা যেতে পারে। (যারা নিকট আত্মীয় - তাদের বিষয়ে যদি কেউ উদাসীন হয় তাহলে সে অন্যান্য পুণ্যকর্ম কীভাবে করতে পারে?) আল্লাহ্ তা’লা সন্তানের বাসনা কুরআনে এভাবে ব্যক্ত করেছেন,

رَبَّنَا هَبْ لَـنَا مِنْ اَزْوَاجِنَا وَذُرِّيّٰتِنَا قُرَّةَ اَعْيُنٍ وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا‏

অর্থাৎ ‘আমাদের প্রতিপালক-প্রভু! আমাদের স্ত্রী সন্তান-সন্তুতির মাধ্যমে আমাদেরকে চোখের স্নিগ্ধতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানাও।’

(সূরা আল্ ফুরকান: ৭৫)

তারা যদি অবাধ্যতা এবং অপরাধপূর্ণ জীবন থেকে দূরে থাকে তাহলেই এটি সম্ভব। বরং তাদেরকে ইবাদুর রহমানের মতো জীবন যাপনকারী হতে হবে আর আল্লাহ্‌কে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দিতে হবে। এরপর স্পষ্ট করে এটি বলেছেন: وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا‏ অতএব সন্তান যদি পুণ্যবান ও মুত্তাকী হয় তবে সে তাদের ইমাম-ই হবে। এখানে মুত্তাকী হবার দোয়া রয়েছে অর্থাৎ স্বয়ং মুত্তাকী হবার দোয়া রয়েছে।

কাজেই সন্তানদের তরবিয়তের জন্য মুত্তাকী হওয়া এবং ইবাদুর রহমান হওয়া হলো শর্ত। যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আঃ) বলেন, স্বয়ং মুত্তাকী হবার জন্য দোয়া এবং চেষ্টা করা আবশ্যক। এরপর যদি আমরা নিজেরা মুত্তাকী হবার জন্য চেষ্টা করি তাহলে সেসব বৈশিষ্ট্যেরও অধিকারী হবো যা আল্লাহ্ তা’লা ইবাদুর রহমানের প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করেছেন। আর এসব কিছুই আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্যের কারণ হবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একস্থলে বলেন,

‘মানুষের মাঝে যে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়নের যোগ্য, আল্লাহ্ তা’লা তার সুরক্ষা নিশ্চিত করেন, আর তারা ঐ সকল লোক! যারা আল্লাহ্ তা’লার সাথে সত্যিকার নিষ্ঠাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে আর নিজেদের ভেতরকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। আর মানবজাতির প্রতি কল্যাণ ও সহানুভূতির সম্পর্ক রাখে এবং খোদার প্রতি প্রকৃত অর্থে অনুগত।’

(আল্ হাকাম)

একজন সত্যিকার আহমদীর মাঝে এসব বৈশিষ্ট্য থাকা চাই। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন, যেন তাঁর সাথে আমাদের সত্যিকার সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর আমাদের হৃদয় যেন সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। আর আমরা সেসব বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক হই যা ইবাদুর রহমান হবার জন্য আবশ্যকীয়। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তার চিরস্থায়ী জান্নাতের উত্তরাধিকারী করুন, আমীন।

(জামেয়া আহমদীয়া বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্কের যৌথ উদ্যোগে অনুদিত)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে