In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

ইসলামে জুমুআর দিনের গুরুত্ব

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ইং

ইসলামে জুমুআর দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

فَاِذَا قُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَانتَشِرُوْا فِىْ الْاَرْضِ وَابْتَغُوْا مِنْ فَضْلِ اللّٰهِ وَاذْكُرُوْا اللّٰهَ كَثِيْرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ

‏وَاِذَا رَاَوْا تِجَارَةً اَوْ لَهْوَاۨ انفَضُّوْۤا اِلَيْهَا وَتَرَكُوْكَ قَآٮِٕمًا‌ؕ قُلْ مَا عِنْدَ اللّٰهِ خَيْرٌ مِّنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ‌ؕ وَاللّٰهُ خَيْرُ الرّٰزِقِيْنَ

এ আয়াত সমূহের অনুবাদ হল:

‘হে যারা ঈমান এনেছো! জুমুআর দিনের একাংশে তোমাদেরকে যখন নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহ্‌কে স্মরণের উদ্দেশ্যে দ্রুত অগ্রসর হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পরিত্যাগ করো, এটিই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানতে। নামায যখন শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহ্‌র কল্যাণরাজির অন্বেষণ করো আর আল্লাহ্‌কে বেশি বেশি স্মরণ করো যেন তোমরা সফলকাম হও। আর যখন তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের (মধ্য থেকে) হৃদয় আকৃষ্টকারী কোন কিছু দেখবে তখন তোমাকে একাকী দন্ডায়মান রেখে সেদিকে দৌড়ে চলে যাবে। তুমি বলে দাও, আল্লাহ্‌র কাছে যা কিছু রয়েছে তা আমোদ-প্রমোদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য হতে উৎকৃষ্টতর। বস্তুত: রিয্ক দানকারীদের মধ্যে আল্লাহ্-ই সর্বোত্তম।’

(সূরা আল্ জুমুআ: ১০-১২)

সর্বপ্রথম আমি আল্লাহ্ তা’লার প্রশংসা করতঃ একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই যে, এই রমযানের প্রায় প্রতিটি জুমুআয় আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় বায়তুল ফুতুহ মসজিদে জুমুআর নামাযে আগমনকারীদের এত বেশি ভিড় ছিলো যে, মসজিদে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না, দরজা খুলে সামনের গ্যলারিতেও মুসল্লিদের জন্য নামাযের জায়গা করতে হয়েছে। বরং উপচে পড়া ভিড় (overflow) ছিলো। এমন জনসমাগম সাধারণত বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে অথবা রমযানের শেষ জুমুআ যাকে সাধারণত জুমুআতুল বিদা বলা হয় তাতে হয়ে থাকে। অতএব প্রত্যেক আহমদীকে সর্বদা এ কথা মনে রাখতে হবে যে, জুমুআর বিশেষ প্রস্তুতির সাথে জুমুআর নামায পড়তে আসার নামই প্রকৃত জুমুআতুল বিদা, কেননা আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশে আমরা আমাদের সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যস্ততা উপেক্ষা করে (জুমুআর নামাযে) এসেছি। এর কারণ, জুমুআর সাথে যেসব ঐশী কল্যাণ সম্পৃক্ত রয়েছে তা যেন আমরা লাভ করতে পারি। আর এই কল্যাণরাজি সংগ্রহ ও সমবেত করে যখন আমরা জুমুআর পর আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ অনুযায়ী পার্থিব ব্যস্ততায় লিপ্ত হবো তখন যেন এ দোয়া ও পণ করে বের হই যে, আল্লাহ্ তা’লার স্মরণকে বিস্মৃত হবো না এবং ইবাদতের অপরাপর আবশ্যিক বিষয়সমূহও শর্তানুযায়ী যথাযথভাবে পালনের আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আজকের জুমুআ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়াটা যেন আগামী সপ্তাহে আগত জুমুআকে স্বাগত জানানোর এক ব্যাকুলতার জন্ম দেয় আর দেয়া উচিৎ। আমাদের এমন কোন জুমুআতুল বিদার প্রয়োজন নেই যা রমযানের শেষ জুমুআ হয়ে থাকে আর যা বছরে মাত্র একবার এসে থাকে। আর যারা আল্লাহ্ তা’লাকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে না তারা ভুলে যায় যে, বছরে আরো একান্ন-বায়ান্নটি জুমুআ রয়েছে; রমযান মাসের শেষ জুমুআকে যেভাবে স্বাগত জানানো হয় সেগুলোকেও সেভাবেই স্বাগত জানানো উচিত। আজকের এই জুমুআ যা রমযানের শেষ জুমুআ তা আমাদের এবং বিশেষ করে তাদের যারা সারা বছর জুমুআর নামায পড়ার ক্ষেত্রে আলস্য দেখিয়েছে এ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণকারী হোক, আর আজকের এই জুমুআয় আমরা যেন এ অঙ্গীকার করি, রমযান মাসের এই শেষ জুমুআকে বিদায় দিয়ে আগামী বছরের রমযানের জুমুআকে স্বাগত জানাবো না বরং আগামী সপ্তাহের জুমুআকে স্বাগত জানাবো। জুমুআর নামায পড়ে বের হবার পরই আমরা আমাদের সকল প্রকার পাপ পঙ্কিলতা, দুর্বলতা, ঘাটতি ও আলস্যকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাবো এমনটি যেন না হয় বরং এগুলোকে স্মরণ রেখে সংশোধনের প্রতি মনোযোগী হই। আমি আশা করি, আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় এ রমযান মাসে বায়তুল ফুতুহ্ মসজিদে জুমুআর নামাযে আমরা যেভাবে মুসল্লিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি, পৃথিবীর সর্বত্র আমাদের প্রতিটি মসজিদে একই চিত্র পরিদৃষ্ট হয়ে থাকবে।

আমি এ দোয়াও করি, আল্লাহ্ করুন - জুমুআর উদ্দেশ্যে মসজিদে আসার এই সুখকর প্রবণতা চিরস্থায়ী হোক আর প্রত্যেক আহমদীকেও এ দোয়া করা উচিত। কেননা এ যুগে প্রত্যেক আহমদীর এটি একটি গুরু দায়িত্ব আর আমি যে আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেছি তা থেকেও এটিই প্রমাণিত হয়। এগুলো সূরা জুমুআর শেষ রুকুর আয়াত যা শুরু হয়েছে এভাবে, يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا অর্থাৎ হে যারা ঈমান এনেছো! যখন জুমুআর জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমাদের কেবল একটিই উদ্দেশ্য ও ইপ্সিত লক্ষ্য হওয়া উচিত আর তা হলো, জুমুআর নামায পড়তে হবে। এখন বাকী সব কাজ গৌণ বলে বিবেচিত হবে।

এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে ইহুদীদের উল্লেখ রয়েছে, যাদের প্রতি তওরাত অবতীর্ণ করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা এই শিক্ষার উপর আমল করেনি, এছাড়া সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী থাকা সত্ত্বেও মহানবী (সা.)-কে অস্বীকার করেছে। এই অস্বীকার অনিবার্য ছিলো কেননা, আমি পূর্বেই বলেছি - তারা এর (তওরাতের) শিক্ষা ভুলে গিয়েছিল, এর প্রতি আমল করা ছেড়ে দিয়েছিল। তারা এর বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতঃ একে উপেক্ষা করতো। আল্লাহ্ তা’লা এ সূরাতেও বলেছেন, শিক্ষাকে শিরোধার্য না করার কারণে তাদের অবস্থা এমনই হয়েছে যেন গাধার পিঠে বই-এর বোঝা চাপানো হয়েছে। যাহোক, তাদেরকে যে বিশেষ দিনে ইবাদতের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, যে দিনটি প্রতি সাত দিন পর পর আসতো, তাও তারা ভুলে বসেছিল। সাবাত তাদের জন্য একটি বিশেষ দিন ছিলো, তাতেও তারা এমন কিছু আচরণ করেছিলো যা আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ছিলো। শনিবারকে ‘সাবাত’ বলা হয় অবশ্য এর আরো কতক অর্থ আছে। একটি অর্থ হলো, ইবাদতের বিশেষ দিন। যাহোক, ইহুদীদের জন্য সাবাত অর্থাৎ শনিবার খুবই কল্যাণময় ও ইবাদতের বিশেষ দিন। যেভাবে আমি বলেছি, এ দিন তাদের জন্য কতক বিধিনিষেধ ছিলো, চতুরতা করে তারা তা লঙ্ঘণ করেছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এভাবে উল্লেখ রয়েছে,

وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِيْنَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِىْ السَّبْتِ

অর্থাৎ ‘এবং যারা সাবাত সম্পর্কে সীমালঙ্ঘন করেছিল তাদের সম্পর্কে তোমরা অবগত আছো।

(সূরা আল্ বাকারা: ৬৬)

আর তাদেরকে তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য শাস্তিও দেয়া হয়েছে। এ সূরাতে সেই দিশেহারা ইহুদীদের উল্লেখ করার পর يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا বলে মুসলমানদের মনোযোগ এ দিকে আকর্ষণ করা হয়েছে যে, তোমাদেরকে জুমুআর আবশ্যকীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। এটি এ বিষয়ের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যে, তোমরা যদি এ পবিত্র দিনটিতে নিজেদের করণীয় যথাযথভাবে পালন না করো তবে তোমরাও একই অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হতে পারো। সকল জাতির মতো মুসলমানদেরও সাবাতের দিন রয়েছে আর আমাদের সাবাত হলো শুক্রবার। তাই প্রত্যেক মুসলমানকে বিশেষভাবে এই দিনটির বিষয়ে যত্নবান হওয়া চাই আর যেভাবে ইবাদতের রীতি-নীতি পালনের শিক্ষা রয়েছে সেভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা আর দোয়া করাও কর্তব্য। এ দিনে দায়িত্ব পালনের রীতি হল, মু’মিনদেরকে যখনই জুমুআর নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন সব কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিত্যাগ করে মসজিদের দিকে তাদের রওয়ানা দেয়া উচিত। ইমামের খুতবা শোনার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের দিকে ছুটে আসা উচিত। যদি সুযোগ সন্ধানীরা কখনো বলে যে, এসব দেশে অথবা বর্তমানে পৃথিবীতে (বিভিন্ন দেশে) আমরা আযানের ধ্বনি শুনতে পাই না, তবে এ যুগে আল্লাহ্ তা’লা অন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রকার ঘড়ির ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে মানুষ ফোনের রিং টোনের পরিবর্তে বিভিন্ন শব্দ রেকর্ড করে যা ধ্বনিত হয় ও শোনা যায়। বিশেষ সময়ে আযানের ধ্বনি এলার্ম হিসেবে শোনা যায় কিনা এটা আমার জানা নেই আর যদি এটা সম্ভব হয় তবে আযানের ধ্বনিসমূহ রেকর্ড করা উচিত। এর দ্বিগুণ সুফল বরং বহুমুখী সুফল পাওয়া যেতে পারে। জুমুআর সময় আযান যেখানে তার (অর্থাৎ ফোনের মালিককে) জুমুআর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেখানে আশ-পাশের লোকদেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে, আর শ্রবণকারীদের জন্য এ আযানের ধ্বনিসমূহ মনোযোগ আকর্ষণের কারণ হবে। ফলে এটি তবলীগের পথ সুগম করার মাধ্যমে পরিণত হবে। যাহোক, অবস্থা যেমনই হোক না কেনো, শুধুমাত্র এলার্মও মানুষকে স্মরণ করাতে পারে। কাজেই জুমুআর নামাযের গুরুত্বকে কখনোই ভুলা উচিত নয়।

এ প্রসঙ্গে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.) যে ব্যাখ্যা করেছেন তা নিশ্চিতরূপে বর্তমান যুগের জন্য শতভাগ যুগোপযোগী ও সঠিক ব্যাখ্যা, অর্থাৎ,

‘এ যুগে يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا ’র অর্থ কেবল সেই জাতি-ই হতে পারে বা হবে, যারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর মান্যকারী।’

(হাক্বায়েকুল ফুরকান - ৪র্থ খন্ড - পৃ: ১২২-১২৩)

এতে সন্দেহ নেই যে, এর অর্থ সাধারণ মুসলমানও। কিন্তু এ সূরাতে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের সাথে জুমুআর নামাযের গুরুত্বকে সম্পৃক্ত করা - বিশেষভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর মান্যকারীদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। অন্যান্য অ-আহমদী মুসলমানরা মুসলমান, মু’মিন ও ঈমান আনয়নকারী হবার দাবী করার পরও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে অস্বীকারের কারণে اَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتٰبِ وَتَكْفُرُوْنَ بِبَعْضٍ -এর পরিপূরণস্থল সাব্যস্ত হয় {অর্থাৎ: তোমরা কি কিতাবের একাংশের উপর ঈমান রাখ এবং অন্য অংশের অস্বীকার কর? (সূরা আল্ বাকারা: ৮৬)}। অতএব প্রকৃত মু’মিন তারা-ই যারা পবিত্র কুরআনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি নির্দেশের প্রতি ঈমান রাখে, এবং হযরত আদম (আ.) থেকে আরম্ভ করে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) পর্যন্ত সকল নবীর প্রতি ঈমান রাখে। তাই আমাদের অনেক বড় দায়িত্ব হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিত্যাগ করে হলেও এই দিনের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি অনেক বিস্তৃতি লাভ করেছে। স্টক বাজারের মাধ্যমে পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্থান-পতনের সংবাদ জানা যায়। যারা এ কাজে জড়িত বা যারা এ কাজ করে তারা এতো ব্যস্ত থাকে যে, বিভিন্ন কম্পানির শেয়ারের উত্থান-পতন দেখে তারা নিজেদের ব্যবসার পরিকল্পনা করে আর তারা এতোটাই ব্যস্ত থাকে যে, সেই ‘ডাক’-এর সময় অর্থাৎ রেটের উত্থান-পতনের সময় এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পলক ফেলা বা অন্যমনষ্ক হওয়া তাদেরকে লক্ষ কোটি বা হাজার-হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। অনুরূপভাবে বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসা রয়েছে। আর এ সব ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত মানুষ কখনও এতো ব্যস্ত ছিলো না; হোক সে বেতনভোগী কর্মচারী। আর ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ পূর্বে কখনো, কোন যুগে এত বেশি এবং এতটা সুশৃংখল ছিলো না, যতটা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে হয়েছে। এতে প্রতিদিন অধিকহারে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ব্যবহৃত হবার কারণে ব্যবসার ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্বও অনেক বেড়ে চলেছে। তাই আল্লাহ্ তা’লা বলছেন, ব্যবসা যত বড়ই হোক না কেনো, তোমাদের সময় যত স্বল্পই হোক না কেন জুমুআর নামাযের বিপরীতে এর কোনোই মূল্য নেই। সম্ভাব্য সকল ক্ষয়-ক্ষতিকে উপেক্ষা করে, জুমুআর নামাযের ব্যবস্থা করা একান্ত আবশ্যক। ছোট-খাটো ব্যবসায়ীদের জন্য অজুহাত দেখানোর আর কোন সুযোগ বাকী থাকে না। কাজেই আজ আমরা আহমদীরাই হচ্ছি সেই মু’মিন, বা আমাদের সেই মু’মিন হওয়া উচিত; যাদেরকে জুমুআর নামাযের সুরক্ষা করা প্রয়োজন। (যদি এমনটি করি-অনুবাদক) তবেই আমরা এ যুগের পথ-প্রদর্শকের নির্দেশনা হতে প্রকৃত অর্থে কল্যাণ লাভ করতে পারবো আর তখনই আমরা ঐশী কল্যাণরাজি আকর্ষণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনকারী চিহ্নিত হতে পারবো।

জুমুআর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) কীভাবে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং ইহুদী-খ্রিষ্টান থেকে কীভাবে আমাদেরকে সতন্ত্র করে দেখিয়েছেন তা একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে - তিনি (রা.) মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে,

‘আমরা আখারীন (পরে আগমনকারী) হওয়া সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন সাবেকীন (অগ্রগামী) হবো। যদিও তাদেরকে পূর্বেই কিতাব দেয়া হয়েছিলো। এরপর হলো, তাদের সেই দিন (অর্থাৎ সাবাত দিবস-অনুবাদক) যা তাদের জন্য আবশ্যক করা হয়েছিলো কিন্তু তারা (এ বিষয়ে) মতবিরোধ করেছে কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এ ব্যাপারে সঠিক পথ প্রদর্শন করছেন। মানুষ এখন আমাদেরই অনুসরণ করবে। হয়তো, ইহুদীরা একদিন পর এবং খ্রিষ্টানরা পরশু।’

(বুখারী - কিতাবুল জুমুআ)

এ হাদীসটি বুখারী শরীফের - কিতাবুল জুমুআর ফারযুল জুমুআ অধ্যায়ে রয়েছে। এ হাদীসটি এমন যে, এর ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। এই প্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্তভাবে শুধু এতোটুকু বলছি, হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-এর যুগে জামাতের ভেতর এ কাজের অর্থাৎ বুখারী শরীফের হাদীস সমূহ্ সংকলন এবং এর সামান্য ব্যাখ্যা রচনার দায়িত্বভার হযরত ওয়ালী উল্লাহ্ শাহ্ সাহেবের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো, তখন এ গ্রন্থের কয়েকটি খন্ড প্রকাশ হয়েছিল, পরে দীর্ঘকাল তা আর প্রকাশ করা হয়নি। এখন কয়েক বছর হলো, আমি নূর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছি, এর তত্ত্বাবধানে জামাতের ভেতর হাদীসের গ্রন্থাবলী প্রকাশের কাজ হচ্ছে। মুসলিম ও বুখারীর কয়েক খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা, শাহ্ সাহেব এর যে ব্যাখ্যা লিখেছেন তা এমনই যদ্বারা এই হাদীসের অর্থ সুস্পষ্ট হয়।

শাহ্ সাহেব দীর্ঘ ব্যাখ্যায় জুমুআর নামায ফরয হবার আবশ্যকতা ও গুরুত্বের ব্যাপারে কতক ফিকাহ্‌বিদ, যারা জুমুআর নামাযকে ‘ফরযে কিফায়া’ (‘ফরযে কিফায়া’ বলা হয় তাকে, যাতে কয়েকজন শামিল হয়ে নামায আদায় করে নিলেই যথেষ্ট, সবার যোগদান করা আবশ্যক নয়) মনে করতেন, তাদেরকে জ্ঞান ও ভাষার রীতি-নীতি অনুসারে উত্তর দেবার পর এটাকে ভুল সাব্যস্ত করেছেন যে, এটি ‘ফরযে কিফায়া’ নয় বরং ফরয। তেমনিভাবে, অন্যান্য যেভাবে নামায ফরয।

তারপর সাবাত শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ করেছেন। আর ইহুদীদের ইতিহাস ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত থেকে প্রমাণ করেছেন, যেভাবে এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, জুমুআর দিনই ইহুদীদেরও সাবাতের দিন ছিলো, এতে এর কিছু অংশ অন্তর্ভূক্ত ছিলো যা পরে শনিবারে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাই এ প্রসঙ্গে শাহ্ সাহেব যে ব্যাখ্যা করেছেন তা থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করছি।

‘লিসানুল আরব’ অনুসারে সাবাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, কাজ-কর্ম ত্যাগ করে বিশ্রাম করা। আর পরিভাষাগত অর্থ হলো, সকল প্রকার কর্মকান্ড হতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহ্‌র ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে যাওয়া। বণী ইসরাঈলের জন্য গোটা একটি দিন ইবাদতে রত থাকার নির্দেশ ছিল। যার উল্লেখ ‘যাত্রা পুস্তকের’ ৩১তম অধ্যায়ের, ১৪-১৬ নাম্বার আয়াত ছাড়া - অন্যান্য স্থানেও রয়েছে। ‘যাত্রা পুস্তক’ এবং ‘লেবিও পুস্তকে’ও রয়েছে। মোটকথা, পরিশেষে তারা এই নির্দেশ অমান্য করেছিলো, যদ্দরুণ তারা শাস্তিও পেয়েছে।

তাই জুমুআর দিনে (আমি এই অংশ সম্পর্কে শাহ্ সাহেবের ব্যাখ্যা পড়ছি) মুসলমানদের জন্য তেমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই, যেমন বণী ইসরাঈলের জন্য ছিলো। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে এভাবে এই বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন: اِنَّمَا جُعِلَ السَّبْتُ عَلَى الَّذِيْنَ اخْتَلَفُوْا فِيْهِ অর্থ: ‘জাগতিক কাজকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে এই সাবাতের দিনে ইবাদতের শিক্ষা তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, যারা একে অমান্য করেছে।’ (সূরা আন্ নাহ্‌ল: ১২৫) এ আয়াতের অর্থ এমন নয় যে, সপ্তম দিনটি তাদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছিলো। যদি খ্রিষ্টানরা কালের প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে শনিবারের পরিবর্তে রবিবারকে ইবাদতের দিন নির্ধারণ করে, তাহলে ইহুদীদের জন্য (শুক্রবারকে শনিবার বানিয়ে নেয়া) একেবারেই অযৌক্তিক নয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনা ও নিদর্শন এ বিষয়ের সত্যায়ন করে যে, ইহুদীরা নিজেদের নির্বাসনের দিনগুলোতে বেবিলিওন ও পারস্যদের মাঝে দীর্ঘকাল বসবাসের কারণে তাদের শির্করূপী বিশ্বাস ও রীতি-নীতি আত্মস্থ করেছিলো, আর ঐ মুশরিক (অংশিবাদী) জাতিগুলোর প্রভাবে তারা নিজেদের ধর্মীয় মূলনীতিতেও পরিবর্তন-পরিবর্ধন এনেছে। অতীতে ইহুদীদের মাঝেও শুক্রবার দিনটির একটি বিশেষ মূল্য ছিলো। অতএব আধ্যাত্মিক বিধি-বিধান ও মিমাংসিত বিষয়াবলী যা ঐতিহাসিক ‘জোসেফাস’ তার বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থে সংকলন করেছেন তাত্থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, শুক্র ও শনিবার এই দু’দিনই আইনগতভাবে কোন ইহুদীকে বিচারের জন্য ম্যাজিষ্ট্রেটের দরবারে উপস্থাপন করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। জুমুআর নাম হিব্রুতে ‘ঊরীতু হাশাবাত’ রাখা হয়েছিল, আর ষষ্ঠ দিন শুক্রবার অষ্টপ্রহরে অর্থাৎ প্রায় আড়াইটার সময় সাবাতের প্রস্তুতি শুরু হয়। যদিও কুরবানী দেয়া হতো আর নবম প্রহর অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিনটায় এটি শেষ হতো এরপর ‘সোখতানী’ কুরবানী দেয়ার পর ইহুদীরা কাজকর্ম শেষ করে, গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে, পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরিধান করে সাবাতকে অর্থাৎ শনিবারকে স্বাগত জানাতো। অতএব এই বিস্তারিত বিবরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জুমুআর দিনটিও তাদের দৃষ্টিতে কিছুটা সাবাতের মর্যাদা রাখতো। এজন্য ইসলামী ঐতিহাসিকগণের এই বর্ণনাও নিজের মাঝে সত্যতা রাখে যে, জুমুআর দিন এর নাম আরোবা যা প্রাচীন আরবদের মাঝে প্রসিদ্ধ ছিল তা মূলত: আহলে কিতাব থেকেই নেয়া হয়েছিলো।

যাহোক, এরপরে লিখেন: মোটকথা ‘আরোবা’ নাম এর প্রচলন আজও ইহুদীদের মাঝে পাওয়া যায়, আর সাবাতের ইবাদতও শুক্রবার থেকেই শুরু হয়, এবং এ দু’টি সাক্ষ্যই আসল সত্যের প্রতি ইঙ্গীত করে। পরিশেষে যে ফলাফল দাঁড়ায় তা হলো, এ বিষয়টি নিশ্চিত যে, ইহুদীরা সাবাতের বিধি-বিধান চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে, বরং তাদের কতক নবী, এই সাবাত দিবসের অসম্মান প্রদর্শনকেই তাদের লাঞ্ছনা ও অপদস্তের কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। আর হযরত মূসা (আ.)-ও এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সাবাতকে অসম্মান করাই বনী ইসরাঈলের ধ্বংসের কারণ হবে। বাইবেলেও এ কথাই লেখা আছে।

(সহীহ্ বুখারী - ২য় খন্ড - হযরত সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ওলী উল্লাহ্ শাহ্ সাহেব (রা.) লিখিত ‘শরাহ্’ পৃ: ২৭৩-২৭৫)

অতএব কুরআনের এসব সাক্ষ্যও মহানবী (সা.)-এর উল্লিখিত বিবরণের সত্যায়ন করে। এ হাদীস তাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করেছে কিন্তু আমাদেরকে আলাহ্ তা’লা এর প্রতি পথ প্রদর্শন করেছেন, আর আজ পর্যন্ত ১৫শ বছর অতিক্রান্ত হবার পরও আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় মুসলমান, সে যেমনই হোক না কেন, কোন না কোনভাবে জুমুআর সম্মান করে। কম হোক, পুরো শহরবাসী একত্রিত না হলেও অবশ্যই তারা জুমুআয় আসে, আর যতদিন সমবেত হতে থাকবে ততদিন কল্যাণ পেতে থাকবে। যেভাবে আমি বলেছি, এ যুগ অর্থাৎ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের সাথে এর বিশেষ গুরুত্ব আছে, তাই আহমদীদেরকে বিশেষভাবে এর মূল্যায়ন করা উচিত।

অতএব যেভাবে মহানবী (সা.) বলেছেন, আমাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা এর প্রতি সঠিক নির্দেশনা প্রদর্শন করেছেন। আমাদের উপর প্রথম দায়িত্ব বর্তায়, আল্লাহ্ তা’লার এ নির্দেশ পালনের জন্য আমরা যেন বিশেষ গুরুত্ব দেই। এই নির্দেশ অমান্য করে আল্লাহ্ তা’লার শাস্তির লক্ষ্যস্থলে যেন পরিণত না হই। আল্লাহ্ তা’লা অতীত নবীদের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, ইহুদীদের, বণী ইসরাঈলীদের ইতিহাস এজন্য তুলে ধরেছেন যাতে আমরা সাবধান থাকি। যদি ইহুদীদের বিশেষ ইবাদতের সূচনা এ দিনের মাধ্যমে হতো, যেভাবে শাহ্ সাহেব প্রমাণ করেছেন আর ইতিহাস থেকেও প্রমাণিত হয়, তবুও তারা জুমুআর দিনকে উপেক্ষা করতোই।

এ দিনের গুরুত্ব মহানবী (সা.)-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত। ঐশী পরিকল্পনা অনুযায়ী এ দিন পরিহার করার-ই ছিলো, কেননা এ আশিসপূর্ণ দিনটি মহানবী (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য নির্ধারিত ছিলো। এ দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) আমাদেরকে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে বলেছেন, কেন এ দিনটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এটি হযরত আদম (আ.)-এর জন্ম ও মৃত্যুর দিন, আর হযরত আদম (আ.) আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনায় এক বিশেষ মর্যাদা রাখেন। যা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ্ তা’লা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, এছাড়া মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে; হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর নাম খোদা তা’লা আদম রেখেছেন। এ যুগে ‘ধর্মের জীবন’ তাঁর (আ.) সাথে সম্পর্কযুক্ত। কাজেই আহমদীদের জন্য জুমুআর সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহলেই আমাদের লক্ষ্য সমূহ্ ঠিক থাকবে, আমরা এর আশিসমালা থেকে সর্বদা কল্যাণ লাভ করতে থাকবো, যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের সাথে সম্পৃক্ত।

মহানবী (সা.) জুমুআর দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে যা বলেছেন তা সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরছি। হযরত আওস (রা.) বিন আওস বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন:

‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সবোর্ত্তম দিন হচ্ছে জুমুআর দিন। এদিনে হযরত আদমের জন্ম হয়েছে আর এ দিনেই (তাঁর) মৃত্যু হয়েছে। এ দিনই শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে আর এ দিনেই অচৈতন্য হয়ে পড়বে। অতএব এ দিনে, অধিকারে আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ করো কেননা, এ দিন তোমাদের এই দরূদ আমার খিদমতে পেশ করা হবে।’

(সূনান আবু দাউদ - কিতাবুস সালাত)

ইবনে মাজাহ্’র অন্য আরেকটি হাদীস। এতে হযরত আবু লুবাবাহ্ (রা.) বিন মুনযের বর্ণনা করেন যে, মহানবী (সা.) বলেছেন:

‘জুমুআ হচ্ছে দিনের সর্দার আর আল্লাহ্ তা’লার নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত দিন। এটি আল্লাহ্ তা’লার নিকট ঈদুল আযহিয়া ও ঈদুল ফিতরের চেয়ে মূল্যবান। এ দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এ দিনে আল্লাহ্ তা’লা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়তঃ এ দিনে আল্লাহ্ তা’লা হযরত আদমকে ভূপৃষ্ঠে অবতীর্ণ করেন। তৃতীয়তঃ এ দিনে আল্লাহ্ তা’লা হযরত আদম (আ.)-ক মৃত্যু দেন। চতুর্থতঃ এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে যখন বান্দা হারাম জিনিষ ব্যতীত আল্লাহ্ তা’লার কাছে যা চায় তা তাকে দেয়া হয়। পঞ্চমতঃ এ দিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে। নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশ্তা, আসমান, যমীন, বায়ু, পাহাড়, ও সমুদ্র এ দিনকে ভয় করে।’

(ইবনে মাজাহ্ - কিতাবু ইকামাতিস সালাত)

এই হাদীসগুলো থেকে এ দিনের গুরুত্ব আরো সুস্পষ্ট হয়- যেভাবে মহানবী (সা.) বলেছেন- এদিন অধিকহারে আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ করো। এমনিতে তো সাধারণভাবেও দরূদ প্রেরণ করা উচিত কিন্তু বলেছেন, প্রত্যেক জুমুআয় অধিকহারে দরূদ পাঠ করো। এজন্য প্রত্যেক জুমুআয় বিশেষভাবে এর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা উচিত কেননা দোয়া কবুল হবার সাথে মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরূদ প্রেরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনেও তা বলেছেন:

اِنَّ اللّٰهَ وَمَلٰٓٮِٕكَتَهٗ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِىِّؕ يٰۤـاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا‏

অর্থাৎ আল্লাহ্ নিজ বান্দার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন আর তাঁর ফিরিশতারাও। হে যারা ইমান এনেছো! তোমরাও এ নবীর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করতে থাকো।

(সূরা আল্ আহযাব: ৫৭)

অতএব মহানবী (সা.) যেভাবে বলেছেন, ‘এ দিনে এক মুহূর্ত এমন আসে যা দোয়া কবুলিয়্যতের মুহূর্ত।’ দরূদ শরীফ প্রেরণের যে দোয়া আমাদেরকে খোদা তা’লা শিখিয়েছেন, এ দোয়া যদি আমরা করি, তাহলে এ দরূদের বরকতে আমাদের অন্যান্য সময়ে করা দোয়াগুলোও গ্রহণযোগ্যতার মর্যাদা লাভ করবে। সুতরাং জুমুআর দিন দরূদ পাঠ করার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। মুসলমানদের প্রতি এটিও খোদা তা’লার বিশেষ অনুগ্রহ যে, জুমুআর নামাযের পর জাগতিক কাজকর্মে লিপ্ত হবার অনুমতি দিয়েছেন। পুরো দিনের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেন নি যে, কিছু করবে না, তবে শর্তসাপেক্ষে এই অনুমতি দেয়া হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার যিকর (স্মরণ) করতে ভুলে যেও না। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্ তা’লার কৃপা অন্বেষণ করতে হবে। অথবা নির্দেশানুসারে আল্লাহ্‌র ফযল অন্বেষণ করতে হবে আর তাঁর যিকর করতে হবে। খোদা তা’লার এই নির্দেশ যে, আমার অনুগ্রহ অন্বেষণ করো, এ কথা মাথায় রেখে আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ অনুযায়ী যে ব্যক্তি পার্থিব কাজকর্মে নিয়োজিত হবে, তখন এর পাশাপাশি তার হৃদয়ে এটিও থাকবে যে, আমার কোন কাজ যেন শুধুমাত্র জাগতিক লোভ-লালসার কারণে না হয়, আমার কাজকর্ম, চাকরী-বাকরী, ব্যবসা-বাণিজ্য এই নীতির উপর ভিত্তি করে যেন হয়, যা তাক্বওয়ার পানে পরিচালিত করে। আমি কখনো যেন এ ধারণা না করি যে, যেহেতু এটি পার্থিব কাজ-কর্ম তাই এতে ছল-চাতুরী করা বৈধ। না, বরং যেহেতু খোদা তা’লার কৃপা অন্বেষণ করতে হবে, তাই আমাদের প্রত্যেকটি বিষয় পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্ তা’লাকে অধিকহারে স্মরণ করতে বলেছেন। এরফলে একেতো, সর্বদা এটি স্মরণ থাকবে যে, আমাকে আল্লাহ্ তা’লার ইবাদতের সুরক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ এটাও স্মরণ থাকবে যে, আমার কাজকর্ম ভাল হচ্ছে এবং এতে সফলকাম হচ্ছি শুধু এ কারণে যে, খোদা তা’লার উপর আমার পূর্ণ ভরসা রয়েছে। অত:পর শেষ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, খোদা তা’লার সত্তাই প্রকৃত রিয্কদাতা, কাজ-কর্মে সমৃদ্ধিলাভ হলে তা কেবলমাত্র খোদা তা’লার অনুগ্রহের কারণেই। যদি তোমার কোন পরিচিতি থাকে, তবে তাও কেবলমাত্র খোদা তা’লার কৃপার মাধ্যমেই হয়েছে।

অতএব শেষ যুগে যেহেতু মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মেনেছো তাই জাগতিক লোভ-লালসা ও ক্রিড়া-কৌতুক থেকে তোমাদের অনেক দূরে থাকা প্রয়োজন। যদি এগুলোকে দূরে নিক্ষেপ না করো, তাহলে তোমাদের অবস্থা এমন হবে, যেভাবে মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে এ শর্তে বয়’আত করার পর, অর্থাৎ আমি আমার প্রাণ, সম্পদ ও সম্মান কুরবাণী করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকবো, এরপর তোমরা মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলে, আর মসীহ মওউদ (আ.) যে কাজের উদ্দেশ্যে তোমাদের সমবেত করেছিলেন, একটি জামাত গঠন করেছিলেন, জামাতভূক্ত হবার জন্য বলেছিলেন, তা ভুলে গেলে। অর্থাৎ খোদা তা’লার সাথে কি কাজ ছিলো, তাহলো, খোদা তা’লার সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি করা, আল্লাহ্ তা’লার ইবাদত ও তার যিক্র দ্বারা জীবনকে সাজানো আর আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা। মোটকথা, শেষ যুগে প্রেরিত মহানবী (সা.)-এর সত্যিকার প্রেমিকের সাথে তোমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর, আর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে কৃত বয়’আতের অঙ্গীকার সমূহ পালনের জন্য তোমরা কতটা বদ্ধপরিকর তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য আল্লাহ্ তা’লা যে মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন, তা হচ্ছে, জুমুআর নামাযে তোমাদের উপস্থিতি। তাই প্রত্যেক আহমদীকে সর্বদা এটি স্মরণ রাখা উচিত, জুমুআর জন্য মসজিদে আসা অথবা মসজিদ না থাকলে কিছু সংখ্যক আহমদী কোন জায়গায় একত্রিত হয়ে জুমুআর নামায পড়া একান্ত জরুরী।

অতএব কেবল রমযানের শেষ জুমুআ বা অন্যান্য জুমুআ যেন মসজিদে অধিক উপস্থিতি এবং প্রদর্শনের কেন্দ্র না হয়। বরং সারা বছরই যেন দেখা যায় যে, জুমুআর দিন আমাদের মসজিদগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে গেছে। এখন নামাযীদের দ্বারা টইটুম্বুর হওয়া শুরু হয়ে গেছে। জুমুআর গুরুত্ব সম্বন্ধে এখন আমি আরো কয়েকটি হাদীস পেশ করছি, যদ্বারা জুমুআর কতিপয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ও গুরুত্ব সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

হযরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,

‘ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ্ ও পরকালের উপর ঈমান রাখে, তার জন্য জুমুআর দিনে জুমুআর নামায পড়া ফরজ করা হয়েছে, কেবল অসুস্থ্য, মুসাফির, নারী, শিশু ও গোলাম ব্যতিরেকে। যে ব্যক্তি ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে জুমুআর ব্যাপারে ঔদাসিন্য দেখাবে, আল্লাহ্ তা’লাও তার প্রতি উদাসীনতার আচরণ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসার অধিকারী।’

(সূনান দার কূত্বনী - কিতাবুল জুমুআ)

অপর আরেকটি হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘জুমুআর দিন পুণ্যের প্রতিদান কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়।’

(সূনান দার কূত্বনী - কিতাবুল জুমুআ)

অতএব জুমুআর দিন জুমুআর নামায ছাড়াও যথাসম্ভব সকল প্রকার পুণ্যকাজ যেন করা হয়। কেননা আল্লাহ্ তা’লা এর প্রতিদান কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ পালন করার মতো কোন পুণ্য কর্ম নেই আর সেই নির্দেশটিও অতি আবশ্যকীয় বিষয়াবলীর অন্তভূর্ক্ত। অতএব জুমুআর নামাযে আসা পুণ্যে অগ্রগামী হবার সবচাইতে বড় মাধ্যম, আর এটি মুনাফিক ও মু’মিনের পরিচয়ও তুলে ধরে।

অনুরূপভাবে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি অকারণে জুমুআ পরিত্যাগ করবে, আমলনামাতে তাকে মুনাফিক লেখা হবে, যা নিশ্চিহ্নও করা যাবে না আর পরিবর্তনও করা যাবে না।’

(মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ - কিতাবুস সালাত)

আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত জায়াদুয্ যামরী (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি অলসতা পূর্বক লাগাতার তিন জুমুআ পরিত্যাগ করে, (আলস্য দেখিয়ে লাগাতার তিন জুমুআ না পড়ে-অনুবাদক) আল্লাহ্ তা’লা তার হৃদয়ের উপর মোহর মেরে দেন।’

(আবু দাউদ - কিতাবুস সালাত)

আর যখন মোহর মেরে দেন, তখন পুণ্যকাজ করার ক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকে, আর ধীরে-ধীরে মানুষ একেবারেই দূরে সরে যায়।

হযরত সালমান ফারসী (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি জুমুআর দিন গোসল করে ও নিজ সামর্থানুসারে পবিত্রতা অবলম্বন করে, আর তেল ও সুগন্ধী মেখে ঘর থেকে বের হয় আর দু’ব্যক্তিকে পৃথক না করে (অর্থাৎ নিজে বসার জন্য জোরপূর্বক দু’জনকে দূরে সরায় না-অনুবাদক) অতঃপর তার জন্য আবশ্যকীয় নামায আদায় করে। অতঃপর ইমাম যখন খুতবা প্রদান করেন তখন সে নীরবে তা শ্রবণ করে, তখন তার ঐ জুমুআ হতে পরবর্তী জুতুআ পর্যন্ত সকল পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’

(বুখারী - কিতাবুল জুমুআ)

এরপর হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘জুমুআর দিন ফিরিশ্তারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে যায়। সর্বপ্রথম আগমনকারীকে সে প্রথম আগমনকারী হিসেবে লিখে, আর প্রথম আগমনকারীর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে উট কুরবানী করে। এরপর আগমনকারীর দৃষ্টান্ত গাভী কুরবানীকারীর ন্যায়। এরপর আগমনকারীদের দৃষ্টান্ত যথাক্রমে: ভেড়া, মুরগী ও ডিম কুরবানীকারীর মতো। অতঃপর যখন ইমাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে যায় তখন সে তাঁর রেজিষ্ট্রার বন্ধ ফেলে, অর্থাৎ ফিরিশ্তারা স্বীয় রেজিষ্টার বন্ধ করে ফেলে আর যিকর শুনতে আরম্ভ করে।’

(বুখারী - কিতাবুল জুমুআ)

সেই খুতবা শুনতে আরম্ভ করে যা ইমাম প্রদান করেন। এতে সওয়াব ছাড়াও মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে মসজিদ বা বৈঠকে আল্লাহ্ তা’লার ফিরিশ্তারা বসে থেকে কথা শ্রবণ করেন, তার চেয়ে বরকতময় বৈঠক আর কোনটি হতে পারে?

এরপর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি জুমুআর দিন ইমামের খুতবা চলাকালীন সময় কথা বলে, তার দৃষ্টান্ত ঐ গাধার ন্যায় যে বইয়ের বোঝা বহন করে, আর যে তাকে বলে, চুপ করো - সে-ও জুমুআ থেকে বঞ্চিত হবে।’

(মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল)

অর্থাৎ কথায় লিপ্ত ব্যক্তিকে চুপ করানোর জন্য কথা বলাও নিষেধ। যদি কোন ছোট্ট শিশু চিৎকার-চেচামেচি করে, তবে সেখান থেকে তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া উচিত। আর যদি কোন বয়স্ক কিশোর কথা-বার্তা বলে, দুষ্টুমি করে, তবে তাকে ইঙ্গিতে চুপ থাকতে বলতে হবে।

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ্ (রা.) বর্ণনা করেছেন,

‘সুলায়ক গাতফানী জুমার দিন এমন সময় এসে বসে পড়লো যখন রসূলুল্লাহ্ (সা.) খুতবা প্রদান করছিলেন। তখন তিনি (সা.) তাকে বললেন, হে সুলায়ক! তুমি দাঁড়িয়ে দু’রাকাত নামায আদায় করো আর সংক্ষিপ্ত করো। অত:পর তিনি (সা.) বলেন, যখন তোমাদের কেউ জুমুআর দিন খুতবা চলাকালীন সময়ে আসে, সে যেন দু’রাকাত নামায পড়ে আর তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করে।’

(মুসলিম - কিতাবুল জুমুআ)

আলকামা বর্ণনা করেন যে,

‘আমি হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রা.)-এর সাথে জুমুআর উদ্দেশ্যে যাই। তিনি দেখলেন, তার পূর্বেই তিন ব্যক্তি মসজিদে পৌঁছে গেছেন। তিনি বললেন, চতুর্থ ব্যক্তি আমি। অতঃপর বললেন, চতুর্থ হওয়াতেও তেমন দূরত্ব নেই। আমি রসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে একথা বলতে শুনেছি, কিয়ামত দিবসে মানুষ আল্লাহ্ তা’লার সমীপে জুমুআয় আসার ভিত্তিতে বসা থাকবে। অর্থাৎ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় তারপর বলেছেন, চতুর্থ। আর চতুর্থও বেশী দূরে নয়।’

(সূনান ইবনে মাজাহ্ - কিতাব ইকামাতিস্ সালাত)

এই হচ্ছে জুমুআর গুরুত্ব।

আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, ‘হযরত সামুরা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,

‘জুমুআর নামায পড়তে আসো আর ইমামের নিকটবর্তী স্থানে বসো। এক ব্যক্তি জুমুআ থেকে পিছনে থাকতে থাকতে জান্নাত থেকেও পিছনে পরে যায়, অথচ যে জান্নাতবাসী হয়ে থাকে।’

(সূনান আবু দাউদ - কিতাবুস্ সালাত)

প্রথমে আমি পুণ্যের তৌফিক সম্পর্কে যে হাদীস পাঠ করেছি, মানুষ পুণ্যকাজ করে থাকে, কিন্তু জুমুআ না পড়ার কারণে, হৃদয়ে দাগ লাগার ফলে সেসব পুণ্য ধীরে-ধীরে নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে। অতঃপর সেই ব্যক্তিই, যেভাবে মহানবী (সা.) বলেছেন, জান্নাতের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও জান্নাত থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।

আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত উবায়েদ বিন সাবেত বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা.) এক জুমুআর দিন বলেছেন,

‘হে মুসলমানদের দল! নিশ্চয় এ দিনকে খোদা তা’লা তোমাদের জন্য ঈদের দিন বানিয়েছেন, অতএব তোমরা গোসল করো আর যার নিকট সুগন্ধি আছে সে যেন তা মাখে এবং মিসওয়াক করো।’

(সূনান ইবনে মাজাহ্ - কিতাব ইকামাতিস্ সালাত)

সুতরাং জুমুআর এ গুরুত্বকে সর্বদা আমাদের দৃষ্টিপটে রাখা উচিত। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আরেক আঙ্গীকে এ দিনের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন, তারপর জুমুআর গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। তিনি (আ.) اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَـكُمْ دِيْنَكُمْ (সূরা আল্ মায়েদা: ৪) এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:

‘মূলত: اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَـكُمْ دِيْنَكُمْ আয়াতটির দু’টি দিক রয়েছে। ‘প্রথমতঃ তোমাদের পবিত্র করা হয়েছে’ (এমন দিন এসে গেছে যা পবিত্র করার দিন) ‘দ্বিতীয় হচ্ছে, কিতাব পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। বলা হয়, যেদিন আয়াতটি অবতীর্ণ হয় সেটি ছিল জুমুআর দিন। হযরত উমর (রা.)-কে কোন ইহুদী বলল, এই আয়াত অবতীর্ণ হবার দিনটিকে ‘ঈদ (হিসেবে) উদ্‌যাপন করি।’ (বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে, ইহুদী তাকে বলেছে আর তিনি বলেছেন, জুমুআতো ঈদ-ই। কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যে রেওয়ায়েত আছে আর কতক এমনও আছে যা সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.) কতক রেওয়ায়েত সরাসরি বর্ণনা করেছেন। অতএব এর যে অবস্থান, মূল্য ও গুরুত্ব তা অবশ্যই বেশি যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন; তাই আমাদেরকে তা দেখা উচিত, ওগুলো নয় যা বিভিন্ন রেওয়ায়েতকারীর বর্ণনার মাধ্যমে পৌঁছেছে। যাহোক, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন যে) ‘কোন ইহুদী হযরত উমর (রা.)-কে বলে, এই আয়াত অবতীর্ণ হবার দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করি, (অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে -যদি এটি আমাদের উপর অবতীর্ণ হতো তাহলে আমরা এদিন ঈদ উদযাপন করতাম) । (বুখারী কিতাবুত্ তফসীর)

হযরত উমর (রা.) বলেন, ‘জুমুআতো ঈদ-ই।’ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, ‘কিন্তু অনেক মানুষ এই ঈদ সম্বন্ধে অনবহিত। অন্যান্য ঈদে কাপড় পরিবর্তন করে, অথচ এ ঈদের প্রতি ভ্রুক্ষেপই করে না, নোংরা-ময়লা কাপড় পড়ে এসে যায়। আমার নিকট এ ঈদ অন্যান্য ঈদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এ ঈদ অন্যান্য ঈদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ ঈদের জন্য সূরা জুমুআ আর এ জন্যই কসর নামাযের বিধান আছে। আর জুমুআ হচ্ছে সেদিন, যেদিন আসরের সময় আদম জন্ম নিয়েছে। আর এই ঈদ ঐ যুগের দিকেও ইঙ্গিত করে যে, প্রথম মানুষ এই ঈদে-ই জন্ম নেয়। কুরআন শরীফও এদিনই পরিপূর্ণ হয়।’

(আল্ হাকাম - ২৭ জুলাই, ১০ম খন্ড-পৃ: ৫)

অর্থাৎ এ আয়াত’টি জুমুআর দিনেই অবতীর্ণ হয়। অতএব একটি সুমহান ধর্মের অনুসারী, যা অবতীর্ণ করে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর ধর্মকে কামেল ও পূর্ণতা দিয়েছেন, আর একজন ইহুদীও এর শ্রেষ্ঠত্ব, এ আয়াতের মাহাত্ব্য ম্বীকার করতে বাধ্য হয়। অতএব যে খোদা ধর্ম পরিপূর্ণ করে পবিত্র কুরআন আকারে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, সে-ই খোদাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি এ গ্রন্থে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন বরং নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এটি আমাদের প্রতি অনেক বড় একটি দায়িত্ব, এটি পালনে আমরা যেন কখনো শৈথিল্য প্রদর্শন না করি। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের ও আমাদের সন্তান-সন্তুতিকেও এই দিনের বিশেষ মর্যাদা প্রদানের সৌভাগ্য দান করুন। আর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের নিকট যেরূপ প্রত্যাশা করেছেন, আমরা যেন তা পূরণ করতে সক্ষম হই, আমীন।

(জামেয়া আহমদীয়া বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্কের যৌথ উদ্যোগে অনুদিত)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে