In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

মহিমান্বিত কুরআন - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْٓ اُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَ بَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِۚ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُؕ وَمَنْ کَانَ مَرِيْضًا اَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَيَّامٍ اُخَرَؕ يُرِيْدُ اللّٰهُ بِکُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيْدُ بِکُمُ الْعُسْرَ وَلِتُکْمِلُوْا الْعِدَّةَ وَلِتُکَبِّرُوْا اللّٰهَ عَلٰى مَا هَدٰٮكُمْ وَلَعَلَّکُمْ تَشْكُرُوْنَ‏

এ আয়াতের অনুবাদ হল, ‘রমযান সেই মাস যাতে মানুষের জন্য এক মহান দিক নির্দেশক হিসেবে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনস্বরূপ যার ভেতর হেদায়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আর সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যসূচক বিষয়াদি রয়েছে। অতএব, তোমাদের মধ্য হতে যে কেউ এই মাস পায় তার রোযা রাখা উচিত, কিন্তু যে অসুস্থ্য অথবা সফরে থাকে তাকে বছরের অন্য সময়ে এই গণনা পূর্ণ করতে হবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সাচ্ছন্দ্য চান - কাঠিন্য নয়। তিনি চান, তোমরা যেন এই গণনাকে সাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হেদায়াত দান করেছেন এর জন্য তোমরা তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হও।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৮৬)

আজ আমি এ আয়াতের প্রথমাংশ সম্পর্কে কিছু বলবো। রমযান মাসের সাথে পবিত্র কুরআনের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। আমি যে আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং বলেছেন,  شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْٓ اُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ এর (আয়াতের) মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রমযান মাসে রোযা রাখার বিষয়টি এমনিতেই নির্ধারণ করা হয়নি। বরং, এ মাসে মহানবী (সা.)-এর প্রতি পবিত্র কুরআনের মত মহান কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে বা অবতীর্ণ হতে আরম্ভ করেছে। হাদীসে উল্লেখ আছে যে, প্রতি বছর রমযানে হযরত জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাছে পবিত্র কুরআনের নাযিলকৃত অংশ সমূহের পুনরাবৃত্তি করতেন বা করাতেন। খোদা তা’লার সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত এ মাসে অবতীর্ণ হওয়া বা অবতীর্ণ হতে আরম্ভ হবার দৃষ্টিকোণ থেকে এ মাসটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।

অতএব, আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দিতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য রোযা বিধিবদ্ধ করা হল’ এরপর দোয়া কবুল হবার সুসংবাদ দিয়েছেন। এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে রমযান সম্পর্কিত আরো কতক নির্দেশাবলী প্রদান করেছেন এবং এটি স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল রোযা রাখা এবং ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এ মাসে পবিত্র কুরআনের প্রতিও তোমাদের মনোযোগ থাকা চাই; কুরআন পাঠের প্রতিও তোমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত। রোযার অসাধারণ গুরুত্বের কারণ হল, এ মাসে একজন পরিপূর্ণ মানবের প্রতি আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত নাযিল করেছেন, যা পবিত্র কুরআন আকারে অবতীর্ণ হয়েছে। খোদা তা’লার নৈকট্য লাভের রীতি ও দোয়া করার পদ্ধতি তোমরা এ কারণে শিখতে পেরেছ যে, খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনে সেই রীতি-পদ্ধতি শিখিয়েছেন। এর মাধ্যমেই দোয়া গৃহীত হবার নিদর্শন প্রকাশিত হয়; কাজেই এই কিতাব পাঠ করা একান্ত আবশ্যক। রমযান মাসে এর তিলাওয়াত করা একান্ত আবশ্যক, যাতে সারা বছর এর প্রতি তোমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে।

মহানবী (সা.)-এর (জীবনের) শেষ রমযানে জিবরাঈল (আ.) তাঁকে দু’বার সম্পূর্ণ কুরআন করীম পুনরাবৃত্তি করিয়েছেন। তাই, এ সুন্নতের অনুসরণে একজন মু’মিনের সম্পূর্ণ কুরআন (খতম) দুই বার পাঠ করার চেষ্টা করা উচিত। যদি (সম্পূর্ণ কুরআন) দুই বার নাও পারে, তবে কমপক্ষে এক বার যেন নিজে অবশ্যই পুরো কুরআন পড়ে । এছাড়া দরস এবং তারাবীহ্‌র ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে যোগদান করুন এবং (কুরআন) শুনুন। অনেকেই কর্মক্ষেত্রে গিয়ে থাকেন। তারাও আসা-যাওয়ার সময় নিজেদের গাড়িতে ক্যাসেট ও সিডি লাগিয়ে শুনতে পারেন। এভাবে এই মাসে যত বেশি পবিত্র কুরআন পাঠ করা, এবং শোনা সম্ভব তা পাঠ করা ও শোনা উচিত।

এছাড়া, শুধু কুরআন তিলাওয়াতই নয়, বরং এতে বর্ণিত আদেশ-নিষেধসমূহ সন্ধান করা উচিত। এরপর, সারা বছর সেই সন্ধানপ্রাপ্ত বিধি-নিষেধের উপর অনুশীলন করার চেষ্টা করা উচিত। অতঃপর এসব নির্দেশাবলীর ক্ষেত্রে উন্নত থেকে উন্নততর মান অর্জনের চেষ্টা করা প্রয়োজন। তবেই রমযানের গুরুত্বও স্পষ্ট হবে, আর রোযা ও ইবাদত যথার্থভাবে পালিত হবে। কেননা, যে কাজটি করছি এর উদ্দেশ্য কি, এবং খোদা তা’লা কেন শরিয়তের বিভিন্ন শিক্ষা নাযিল করেছেন, তা জানা না থাকলে এসব বিধি-বিধান সঠিকভাবে পালিত হতে পারে না; বরং কি করতে হবে তাও জানা যাবে না। যদি কেবল এটিই শুনেন যে, ‘তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হও, সৎকর্ম কর’ অথচ এটি জানা না থাকে যে, ‘তাক্বওয়া কাকে বলে আর সৎকর্মই বা কী? তাহলে এটি একটি অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। রমযানের দিনগুলোতে বক্তৃতাদি বা খুতবা শুনে যদি চলে যান তাহলে একটি কাজ হয়তো হবে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অর্জিত হবেনা। এ জন্য আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন প্রকৃত মুসলমান তারা, الَّذِيْنَ اٰتَيْنٰهُمُ الْكِتٰبَ يَتْلُوْنَهٗ حَقَّ تِلَاوَتِهٖؕ (সূরা আল্ বাকারা: ১২২) অর্থাৎ ‘যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি তারা একে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে।’ অর্থাৎ, গভীর মনোযোগ ও অভিনিবেশের সাথে যেন নিয়মিত তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমলেরও চেষ্টা করা হয়।

হযরত মসীহ��� মওউদ (আ.) বলেছেন, বরং পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে,

‘একে পরিত্যক্ত বস্তুর ন্যায় পরিত্যাগ করো না।’

অতএব, কুরআনকে পরিত্যক্ত বস্তুর মত বর্জন না করে (এর প্রতি) অভিনিবেশ করা এবং তিলাওয়াত করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

আমি যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেছি, তাতে আল্লাহ্ তা’লা شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْٓ اُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ বলার পর বলেছেন, هُدًى لِّلنَّاسِ وَ بَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِ অর্থাৎ মানুষের হেদায়াতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে, এতে হেদায়াতের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে আর সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যসূচক বিষয়াদিও বর্ণিত হয়েছে। কাজেই, যতক্ষণ সঠিকভাবে এর তিলাওয়াত না করা হবে, হেদায়াতের খুঁটিনাটিও জানা যাবে না, আর সত্য ও মিথ্যার ভেতর পার্থক্যও সুস্পষ্ট হতে পারে না। অতএব, প্রকৃতপক্ষ্যে রোযা রাখতে হলে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও এর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে অবগত হবার চেষ্টা করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্য আবশ্যক।

পবিত্র কুরআন পাঠ করা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা অন্যত্র এভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে,

وَاَنْ اَتْلُوَا الْقُرْاٰنَ‌ۚ وَّاُمِرْتُ اَنْ اَكُوْنَ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَۙ

অর্থাৎ ‘এবং আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভূক্ত হই এবং কুরআন তিলাওয়াত করি।’

(সূরা আন্ নামল: ৯২-৯৩)

অতএব, খোদা তা’লা যে পূর্ণাঙ্গীন শরিয়ত মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, যা আমরা মানার দাবী করি, একই সাথে যুগ মসীহ্ ও মাহদীকে মানার ঘোষণাও দেই; তাই এই পরিপূর্ণ কিতাব, অর্থাৎ পবিত্র কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াতের চেষ্টা করুন, এরই নাম প্রকৃত আত্মসমর্পণ। আর যেখানে এই রমযানে নিয়মিতভাবে কুরআন পাঠের অঙ্গীকার করবেন এবং পাঠ করবেন, সেখানে এই অঙ্গীকারও করুন যে, রমযানের পরেও আমরা দৈনিক এর তিলাওয়াত করব এবং নিজের প্রতি তিলাওয়াত করা আবশ্যক করে নিব। একই সাথে এর বিধি-নিষেধ মোতাবেক চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। কেননা, এটিই আমাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য দান করবে, এবং এটিই আমাদের রমযান গৃহীত হবার কারণ হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ বিষয়টির প্রতিই বিশেষভাবে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।

তিনি (আ.) বলেন:

‘তোমাদের জন্য আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই যে, কুরআন শরীফকে পরিত্যক্ত বস্তুর ন্যায় ছেড়ে দিও কেননা এতেই তোমাদের জীবন নিহীত।’ অর্থাৎ এর প্রকৃত শিক্ষার উপর আমল করা ভুলে যেও না। কেবল পড়া বা তিলাওয়াত করা-ই নয়, বরং এর উপর আমল ও থাকা চাই; নচেৎ মৃতবত হয়ে যাবে। আধ্যাত্মিক জীবন যাকে বলে, তা আর থাকবে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে কৃত বয়’আতের অঙ্গীকার বৃথা সাব্যস্ত হবে। তিনি (আ.) বলেন, ‘সুতরাং একে অনাবশ্যকীয় বস্তুর মত পরিত্যাগ কর না।’

পুনরায় তিনি (আ.) বলেন, ‘যারা কুরআনকে সম্মান করবে, তারা আকাশে সম্মান লাভ করবে। যারা সকল হাদীস ও কথার উপর কুরআনকে প্রাধান্য দেবে, তাদেরকে আকাশে প্রাধ্যান্য দেয়া হবে।’

(কিশতিয়ে নূহ - রূহানী খাযায়েন - ২০তম খন্ড - পৃ:১৩)

আকাশে সম্মান লাভ করা এবং প্রাধান্য পাওয়ার অর্থ কি? তা হলো, খোদা তা’লা কৃপা করতঃ নিজ নৈকট্য প্রদান করবেন। দোয়া গৃহীত হবার নিদর্শন দেখবে। সমাজের রোগ-ব্যাধি থেকে এই পৃথিবীতে রক্ষা পাবে। অতএব, যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা আমাদের বলে দিয়েছেন, প্রথম প্রচেষ্টা যদি তোমাদের পক্ষ থেকে হয়, তাহলে আমিও তোমাদের দিকে ছুটে আসবো। এই দৃশ্য দেখার জন্য কুরআনকে আমাদের সম্মান দিতে হবে, যথাযথভাবে এর তিলাওয়াত করতে হবে, এর নির্দেশাবলী মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) পুনরায় বলেছেন,

‘মানব জাতির জন্য পৃথিবীতে আজ কুরআন ব্যতীত অন্য কোন ধর্মগ্রন্থ নেই এবং সকল আদম সন্তানের জন্য আজ রসূল (সা.) ব্যতীত অন্য কোন শাফী (সুপারিশকারী) নেই। সুতরাং, তোমরা সেই মহাগৌরবসম্পন্ন ও প্রতাপশালী নবীর সাথে প্রেমসূত্রে আবদ্ধ হতে চেষ্টা কর এবং অন্য কাউকেই তাঁর উপর কোনভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান কর না, যেন আকাশে তোমরা মুক্তি-প্রাপ্ত বলে পরিগণিত হতে পার। স্মরণ রেখো! প্রকৃত মুক্তি যে কেবল মৃত্যুর পরই প্রকাশিত হয় তা নয়, বরং প্রকৃত মুক্তি পার্থিব জগতেই স্বীয় জ্যোতিঃ প্রকাশ করে থাকে। মুক্তি প্রাপ্ত কে? সে-ই যে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, আল্লাহ্ সত্য এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর এবং তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মাঝে যোজক স্থানীয় (অর্থাৎ সুপারিশকারী)। এবং আকাশের নিচে তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন আর কোন রসূল নেই এবং কুরআনের সমতুল্য আর কোন গ্রন্থ নেই। অন্য কাউকেই আল্লাহ্ তা’লা চিরকাল জীবিত রাখতে চাননি, কিন্তু তাঁর এই মনোনীত নবী চিরকালের জন্য জীবিত। তাঁকে চিরকাল জীবিত রাখার জন্য আল্লাহ্ তা’লা এই ব্যবস্থা করেছেন যে, তাঁর শরীয়ত ভিত্তিক আধ্যাত্মিক কল্যাণকে কিয়ামত পর্যন্ত জারী রেখেছেন। পরিশেষে তাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণ পৌঁছানোর জন্য এই মসীহ্ মওউদকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন, যার আগমন ইসলামের প্রাসাদকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য অত্যাবশ্যক ছিল। কেননা, এই পৃথিবী লয় হবার পূর্বেই মুহাম্মদী সিলসিলার জন্য একজন আধ্যাত্মিক গুণের মসীহ্কে প্রেরণ করা আবশ্যক ছিল যেভাবে মূসায়ী সিলসিলার জন্য তা করা হয়েছিল।’

(প্রাগুক্ত - পৃ: ১৩-১৪)

অতএব, এটি আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা এই মুহাম্মদী মসীহ্‌র জামাতভূক্ত হয়ে আল্লাহ্ তা’লার পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের মর্যাদাকে বুঝার অঙ্গীকার করেছি যা পবিত্র কুরআন আকারে আমাদের কাছে সুরক্ষিত আছে। মহানবী (সা.)-এর খতমে নবুয়ত পদবীর বুৎপত্তি লাভ করেছি, কিন্তু অন্যান্য মুসলমানরা এত্থেকে বঞ্চিত। অতএব, এই সম্মান আমাদেরকে অন্যদের মাঝে সতন্ত্র করে আর পবিত্র কুরআনের শিক্ষাকে বুঝা, এর তত্ত্বকে অনুধাবন এবং এর প্রকৃত সম্মানকে আপন হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বরং আমাদের প্রত্যেক কথা ও কাজে যেন এটি প্রকাশ পায়। আমাদের প্রত্যেক কথা ও কাজে যদি এর বহিঃপ্রকাশ না ঘটে, তবে এটি অপ্রয়োজনীয় বস্তুর ন্যায় ছেড়ে দেয়া বৈ-কি।

আর আমি পূর্বেই বলেছি, ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে এরূপ পরিস্থিতির কথা খোদা তা’লা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন। সূরা আল্ ফুরকানে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَقَالَ الرَّسُوْلُ يٰرَبِّ اِنَّ قَوْمِىْ اتَّخَذُوْا هٰذَا الْقُرْاٰنَ مَهْجُوْرًا‏

অর্থাৎ, ‘আর রসূল (সা.) বলবে হে আমার প্রভু-প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার জাতি এই কুরআনকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মত পরিত্যাগ করেছে (ছেড়ে দিয়েছে)।’

(সূরা আল্ ফুরকান: ৩১)

পাঠ করে ঠিকই কিন্তু তদনুসারে কাজ করে না। অতএব, এটি অত্যন্ত উৎকন্ঠার ব্যাপার আর প্রত্যেক আহমদীর জন্য চিন্তনীয় বিষয়। কারণ, কুরআনের অনুশাসন শিরোধার্য করার জন্যই তো আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে যুগ ইমামকে মানার সৌভাগ্য দিয়েছেন। আমাদেরকে এই অনুপম শিক্ষানুসারে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করতে হবে। অতএব, এ সুমহান এবং অনন্য গ্রন্থকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর ন্যায় পরিহার করা হতে রক্ষা পাওয়া মূলতঃ নির্ভর করে এই পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত এবং সেই শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপর।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ সম্পর্কে এক স্থানে বলেছেন:

‘স্মরণ রেখ! কুরআন শরীফ প্রকৃত কল্যাণরাজীর উৎসস্থল এবং মুক্তির সত্যিকার উপায়। যারা পবিত্র কুরআনের উপর আমল করে না এটি তাদের নিজেদেরই ভ্রান্তি। যারা এর উপর আমল করে না তাদের একটি দল এতে বিশ্বাসই রাখে না উপরন্তু তারা একে খোদা তা’লার ঐশীবাণী মনে করে না। এরা অনেক দূরে পড়ে আছে। কিন্তু যারা এটিকে আল্লাহ্ তা’লার (কালাম) বাণী এবং মুক্তির নিরাময়ী এ��� ব্যবস্থাপত্র বলে বিশ্বাস করে, তারা যদি এর উপর আমল না করে তবে এটি কত আক্ষেপ ও পরিতাপের বিষয়। এদের ভেতর অনেক এমনও আছে যারা সারা জীবনে কখনো এটি পড়েও নি। অতএব, যারা খোদা তা’লার বাণী সম্পর্কে এমন উদাসীন ও ভ্রুক্ষেপহীন, তাদের দৃষ্টান্ত এমন একজন মানুষের মত - যে জানে অমুক ঝর্ণাটির পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ, সুমিষ্ট, সুশীতল, অনেক রোগের মহৌষধ এবং আরোগ্য।’

(তারা জানে যে, এটি অত্যন্ত সুমিষ্ট পানির ঝর্না। ঠাণ্ডা ও মিষ্টি পানি যা অনেক রোগের জন্য চিকিৎসাস্বরূপ)

এবং ‘তার এই নিশ্চিত জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু এই সুনিশ্চিত জ্ঞান থাকার পরও পিপাসার্ত হওয়া এবং বিভিন্ন প্রকার ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সে (ঝর্ণার) কাছে যায় না। এটি তার কতবড় দুর্ভাগ্য ও অজ্ঞতা। অথচ তার সেই ঝর্ণা থেকে তৃপ্তি সহকারে পান করা আর এর সুস্বাদ ও নিরাময়ী পানিকে উপভোগ করা উচিত ছিল। কিন্তু জানা সত্ত্বেও সে তা থেকে এক অজ্ঞের ন্যায় দূরে অবস্থান করেছে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না মৃত্যু এসে তাকে ধ্বংস করে ততক্ষণ পর্যন্ত সে এর থেকে দূরে অবস্থান করে। এই ব্যক্তির অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। বর্তমানে মুসলমানদের অবস্থা এমনই। তারা জানে, এই কুরআন শরীফই সমস্ত উন্নতি ও সফলতার চাবিকাঠি, যার উপর আমাদের আমল করা উঠিত। কিন্তু না! এর প্রতি ভ্রূক্ষেপই করা হয় না। এক ব্যক্তি যে পরম সহানুভূতি ও হিতাকাঙ্খীতার প্রেরণা নিয়ে এ দিকে ডাকে আর নিছক সহানুভূতিই নয় বরং খোদা তা’লার নির্দেশ ও ইঙ্গিত অনুযায়ী এর প্রতি আহবান করে তাঁকে মিথ্যাবাদী ও দাজ্জাল (কায্যাব ও দাজ্জাল) অভিহিত করা হয়।’

(হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজের সম্পর্কে বলছেন যখন আমি একান্ত বেদনার সাথে তোমাদের অর্থাৎ মুসলমানদেরকে আমার দিকে আহ্বান করেছি যে, পবিত্র কুরআনের উপর আমল করো তখন আমাকে কায্যাব, মিথ্যাবাদী ও দাজ্জাল আখ্যা দেয়া হয়)

তিনি (আ.) বলেন, ‘এই জাতির জন্য এর চেয়ে করুণ অবস্থা আর কি হতে পারে।’

তিনি (আ.) বলেন, ‘মুসলমানদের উচিত ছিল, আর এখনও তাদের এই ঝর্ণাকে এক মহান নিয়ামত মনে করা উচিত এবং এর মূল্যায়ন করা আবশ্যক। এর মূল্যায়ন হলো, এর শিক্ষার উপর আমল করা এরপর তারা বুঝতে পারবে যে, খোদা তা’লা কীভাবে তাদের বিপদাপদ ও সমস্যাবলী দূর করেন। হায়! মুসলমানরা যদি বুঝতো আর চিন্তা করতো যে আল্লাহ্ তা’লা তাদের জন্য একটি পুণ্যের পথ খুলেছেন আর তারা এ পথে পরিচালিত হয়ে যদি লাভবান হত!

(মলফুযাত - ৪র্থ খন্ড - রাবওয়াহ্ থেকে প্রকাশিত - পৃ: ১৪০-১৪১)

এই উদ্ধৃতিতে, যেখানে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) মুসলমানদের অবস্থার চিত্র অঙ্কন করেছেন আর পরিতাপ করেছেন, সেখানে আমাদের দায়িত্বও বেড়ে যায়। এই আকর্ষণীয় শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে আমাদের এতটা প্রতিফলিত করা উচিত, যাতে কতক মুসলমান গোষ্ঠির অপকর্মের কারণে অমুসলমানরা ইসলাম ও কুরআনের প্রতি অঙ্গুলী নির্দেশের যে ধৃষ্টতা দেখায় সে সুযোগ যেন আর না থাকে। আহমদীদের ব্যবহার দেখে তারা যেন নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। আর আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় অনেক আহমদী আছেন যারা পবিত্র কুরআনের অনুপম শিক্ষা জগতের সামনে তুলে ধরে, মানুষের সামনে তুলে ধরে। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে যখনই আমাদের জলসা বা সেমিনার হয় তাতে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা উপস্থাপন করা হয় ফলে অমুসলমানরা প্রকাশ্যে এ অভিমত ব্যক্ত করে যে, ইসলামী শিক্ষার এই চেহারা আজ আমরা প্রথমবার দেখলাম। অতএব, আমরা যদি এ বিষয়গুলোকে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত করি, তাহলে কেবলমাত্র শিক্ষা শোনানোই নয় বরং এর ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত প্রদর্শনকারীও হবো।

অনুরূপভাবে, আহমদীদেরকে স্ব-স্ব গন্ডিতে মুসলমানদের কাছেও এই শিক্ষা এভাবে পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত যে, তোমরা আমাদের সাথে মতবিরোধ রাখতে চাও রাখো, কিন্তু ইসলামের নামে ইসলামের উৎকর্ষ শিক্ষার দুর্নাম করো না। তোমাদের জন্য এতেই মুক্তি নিহিত। তোমরা শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনকে মানার (মৌখীক) দাবী করো না, বরং এর শিক্ষার প্রতি অভিনিবেশ কর। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যে অবস্থাকে চিহ্নিত করেছেন, আর মুসলমানদের যে সব বিপদাপদ ও সমস্যাদির কথা বর্ণনা করেছেন, তা আজও সেভাবেই বিদ্যমান রয়েছে বরং অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবস্থা অধিক শোচনীয়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনকে নিজেদের জীবন বিধান হিসেবে অবলম্বন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যাদী ও বিপদসঙ্কুল যুগ থেকে মুসলমানরা নিষ্কৃতি পাবে না। কেবল ইসলামের নাম জপলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় না। ইসলামের অনুপম শিক্ষাই এর সৌন্দর্যের পরিচয়। কোন আলেম নিজ থেকে পবিত্র কুরআনের তফসীর করতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত খোদা তা’লার পক্ষ থেকে তাকে সেই পন্থা না শিখানো হয়। আর এ যুগে তা আল্লাহ্ তা’লা তাঁকেই শিখিয়েছেন যাঁকে এরা দাজ্জাল (প্রতারক), কায্যাব (মিথ্যাবাদী) না জানি আরও কত কিছু বলে!

আল্লাহ্ তা’লাই এদের প্রতি করুণা করুন আর তাদেরকে কান্ডজ্ঞান দিন। আর আমাদেরকে পবিত্র কুরআন যথাযথ তিলাওয়াত ও এর শিক্ষার উপর পূর্বের চেয়ে অধিক সচেতনতার সাথে প্রতিষ্ঠিত হবার তৌফিক দান করুন। আমরা যেন এর সম্মান প্রতিষ্ঠাকারী হই ও একে সর্বদা শ্রেষ্ঠত্ব দেই। এই সম্মান কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে আর একে কীভাবে প্রাধান্য দেয়া যায় তা আমি পূর্বেই বলেছি। এ সম্পর্কে স্বয়ং পবিত্র কুরআন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শিক্ষার আদলে আমাদেরকে দিক নিদের্শনা দিয়েছে।

আমি এখানে সংক্ষেপে কতক আয়াত বা আয়াতাংশ উপস্থাপন করছি। আল্লাহ্ তা’লা কত সুন্দরভাবে (এতে) পবিত্র কুরআনের মর্যাদা এবং এর সুমহান শিক্ষা সম্পর্কে দিক নিদের্শনা প্রদান করেছেন। আজ হয়তো এ বিষয়টি শেষ হবে না, অর্থাৎ যে দিকটা আমি বর্ণনা করতে চাচ্ছি তা শেষ হবে না; নতুবা পবিত্র কুরআন এমন এক সমুদ্র, যদি মানুষ তা বর্ণনা করা আরম্ভ করে তা কখনও শেষ হবার নয়। নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষ যখন এ নিয়ে প্রণিধান করে নিত্য নতুন রহস্য উদ্ঘাটিত হতে থাকে।

সর্ব প্রথম বিষয় হলো - পবিত্র কুরআন পাঠ করার আদব বা রীতি কি? আর পবিত্র কুরআন পাঠের পূর্বে মন-মস্তিষ্ককে কীভাবে পরিস্কার করা উচিত? সে সম্পর্কে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

فَاِذَا قَرَاْتَ الْقُرْاٰنَ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطٰنِ الرَّجِيْمِ‏

‘সুতরাং যখন তুমি কুরআন পাঠ করো তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করো।’

(সূরা আন্ নাহ্ল: ৯৯)

আমরা জানি যে, মানুষকে তাক্বওয়ার পথ থেকে বিচ্যুত করার ব্যাপারে শয়তান প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে, একটি খোলা চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআন এমন এক গ্রন্থ যার প্রতিটি অক্ষর খোদার পানে পথের দিশা দেয় আর তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিতকারী এবং আল্লাহ্ তা’লার দিকে যাবার পথ দেখিয়ে থাকে। তাই খোদা তা’লা বলেছেন - যদি তুমি খোদা তা’লার নৈকট্যের উন্নত মানে অধিষ্ঠিত হতে চাও আর পবিত্র কুরআনে বর্ণিত শিক্ষা বুঝতে চাও, তাহলে পবিত্র কুরআন পাঠ করার পূর্বে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্ তা’লার নিকট এ প্রার্থনা কর, যেন তিনি তোমাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও আক্রমন হতে রক্ষা করেন, আর যা তুমি পড়ছ সে শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হবার সামর্থ দান করেন। কেননা এটি এমন এক অমূল্য ধনভান্ডার, যা পর্যন্ত পৌঁছার পথে শয়তান হাজারো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

অতএব, যদি শয়তানের খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য দোয়া না কর তাহলে তুমি বুঝতেই পারবে না - শয়তান তোমাকে আল্লাহ্ তা’লার বাণী বুঝার ক্ষেত্রে কখন - কীভাবে বাঁধা দিয়েছে। শয়তানের খপ্পরে পড়ার কারণে আল্লাহ্ তা’লার কালাম (বাণী) হওয়া সত্ত্বেও এ কালাম পড়ে তোমরা নির্দে��না লাভ করতে সক্ষম হবে না। তাই, প্রথম বিষয় হলো- আল্লাহ্ তা’লার আশ্রয়ে এসে আন্তরিকভাবে পবিত্র কুরআন পাঠ করা, অন্যথায় এটি বুঝবে না। তাই আল্লাহ্ তা’লা এক স্থানে বলেছেন,

وَلَا يَزِيْدُ الظّٰلِمِيْنَ اِلَّا خَسَارًا

অর্থাৎ ‘এই কুরআন যালেমদেরকে কেবল ক্ষতিতেই বৃদ্ধি করে।’

(সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৩)

অথচ মু’মিনদের জন্য এটিই কল্যাণের মাধ্যম।

পুনরায় আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

وَاللّٰهُ يُقَدِّرُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ‌ؕ عَلِمَ اَنْ لَّنْ تُحْصُوْهُ فَتَابَ عَلَيْكُمْ‌ فَاقْرَءُوْا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْاٰنِ‌ؕ عَلِمَ اَنْ سَيَكُوْنُ مِنْكُمْ مَّرْضٰى‌ۙ وَاٰخَرُوْنَ يَضْرِبُوْنَ فِىْ الْاَرْضِ يَبْتَغُوْنَ مِنْ فَضْلِ اللّٰهِ‌ۙ

অর্থাৎ, ‘আল্লাহ্ রাত ও দিনের পরিমাণকে নির্ধারণ করেন (আয়াতের প্রথমাংশ আমি ছেড়ে দিচ্ছি)। এবং তিনি জানেন তোমরা কখনও সময় গণনা করতে পারবে না, সুতরাং তিনি তোমাদের প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত করলেন। অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটা সম্ভব আবৃত্তি কর। তিনি এটিও জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কতক অসুস্থ্য হবে এবং কতক আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অন্বেষণে ভূপৃষ্ঠে ভ্রমন করবে।’

(সূরা আল্ মুয্‌যাম্মেল: ২১)

এরপরেও কতক দিকনির্দেশনা রয়েছে। এর পূর্বের আয়াতে তাহাজ্জুদের (নফলের) প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন - এতে কুরআনের যতটা মুখস্থ আছে তা পাঠ কর, এছাড়া অভিনিবেশের উদ্দেশ্যে যতটুকু কুরআন পড়তে পার - ততটুকু পড়া উচিত। একজন মু’মিনের এটিই কাজ تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْاٰنِ এর অর্থ নিছক এটিই করা উচিত নয় যে, যতটুকু আমাদের মুখস্থ আছে ততটুকুই যথেষ্ট - তাই পড়েছি এর বেশি মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। অথবা (কুরআন সম্বন্ধে) যতটুকু শিখেছি তাই যথেষ্ট, এর বেশি শেখার প্রয়োজন নেই; বরং যতদূর সম্ভব, এক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ্ তা’লা অপর একস্থানে বলেছেন, فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ (সূরা আল্ মায়েদা: ৪৯) অর্থাৎ পুণ্যকর্মে প্রতিযোগিতা কর। আর যতক্ষণ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনে বর্ণিত পুণ্য বা নেকী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ না হবে, কোন্ কোন্ কাজকে পবিত্র কুরআন পুণ্যকর্ম বলেছে তা যদি জানা না থাকে তাহলে প্রতিযোগিতা করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে? অতএব, কুরআন করীম পাঠ করা, শেখা ও এর উপর চিন্তা ও প্রণিধান করা একান্ত আবশ্যক।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উপর ইলহাম হয়েছিল, ‘আল খাইরু কুল্লুহু ফিল কুরআন’ অর্থাৎ সকল আশিস ও কল্যাণ পবিত্র কুরআনে নিহিত রয়েছে।

অতএব, এখানে ‘তাইয়াস্সার’ (যতটা সম্ভব) অর্থ এই নয় যে, আর শেখার প্রয়োজন নেই, যা মুখস্থ আছে তাই যথেষ্ট! বরং নিজের যোগ্যতা ও জ্ঞান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা উচিত, যাতে পবিত্র কুরআন থেকে উত্তরোত্তর অধিক কল্যাণ লাভ করা সম্ভব হয়। এছাড়া অন্যান্য অবস্থার কথাও কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, যেমন তোমরা অসুস্থ্য থাকবে, রোগাক্রান্ত হবে কিংবা সফরে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী নামায ছোট-বড় হয়, কুরআন (পাঠে) কমবেশিও হয়ে থাকে। কিন্তু এর অর্থ কখনোই এই নয় যে, কুরআন যতটুকু শিখেছি - শিখেছি আর শেখার প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

اَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْاٰنَ تَرْتِيْلاًؕ‏

‘অথবা এরচেয়ে কিছু বাড়াও আর সুললিত কন্ঠে কুরআন পাঠ করো।’

(সূরা আল্ মুয্‌যাম্মেল: ৫)

অর্থাৎ, এমনভাবে তিলাওয়াত করো যেন এক একটি শব্দ স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত হয়, বোঝা যায় আর সুললিত কন্ঠে পাঠ করা হয়। তাড়াহুড়ো করে পড়ে নিলাম এমনটি যেন না হয়। যেমন পূর্বেও একবার আমি বলেছি, অন্যান্য মুসলমানরা তারাবীহ্‌তে এত দ্রুত তেলাওয়াত করে যে, কিছুই বোঝা যায় না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন:

‘সুললিত কন্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করাও ইবাদত।’

(আল্ হাকাম - ২৪ মার্চ, ১৯০৩)

একটি হাদীসে এসেছে, হযরত সাঈদ বিন আবু সাঈদ (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি সুললিত কন্ঠে কুরআন পাঠ করে না, সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়।’

(সুনান আবু দাউদ)

অন্যত্র আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন:

وَّاذْكُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَيْكُمْ وَمَآ اَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتٰبِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُمْ بِهٖ‌ؕ

অর্থাৎ, ‘এবং তোমরা আল্লাহ্ তা’লার সেই নিয়ামতকে স্মরণ কর - কিতাব ও প্রজ্ঞা থেকে যা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, যদ্বারা তিনি তোমাদের নসীহত করেছেন।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২৩২)

অর্থাৎ, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লার যেসব নির্দেশ রয়েছে তার সবই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামত। সূরা নূরের প্রারম্ভে বলে দিয়েছেন, তোমাদের যে নিয়ামত দান করা হয়েছে তাতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা রয়েছে; তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করো। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ নিয়ামতরাজি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে না - তা বুঝবে না। অতএব, পবিত্র কুরআন পাঠ করা মূলতঃ উপদেশ গ্রহণ করা আর একজন মু’মিনের জন্য এটি একান্ত আবশ্যক। কেননা এটিই মানুষকে তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে উন্নত করে।

আল্লাহ্ তা’লা অপর একস্থানে বলেন:

كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَيْكَ مُبٰرَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْۤا اٰيٰتِهٖ وَلِيَتَذَكَّرَ اُولُوْا الْاَلْبَابِ‏

‘আমরা তোমার প্রতি এই কল্যাণময় গ্রন্থ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে লোকেরা এর আয়াতসমূহকে অনুধাবন করে আর ধীসম্পন্ন ব্যক্তিগণ শিক্ষা গ্রহণ করে।’

(সূরা সাদ: ৩০)

অতএব, পবিত্র কুরআনের মান্যকারী ও এর পাঠকই বুদ্ধিমান বা ধীসম্পন্ন। কি কারণে বুদ্ধিমান? এজন্য যে, এতে বিগত সকল নবীর শিক্ষা সমূহের সেসব বিষয়াদিও সন্নিবেশিত হয়েছে যা আল্লাহ্ তা’লা বলবৎ রাখতে চেয়েছেন, যেগুলো যুগোপযোগী সঠিক শিক্ষা। আর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষামালা অথবা সেসব বিষয়েরও উল্লেখ রয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির জন্য আল্লাহ্ তা’লা প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, অর্থাৎ তিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতি তা অবতীর্ণ করেছেন। অতএব, পবিত্র কুরআন যে ঘোষণা দিয়েছে তার প্রতি অভিনিবেশ করো, শিক্ষা গ্রহণ করো, কেননা এটিই বুদ্ধিমানের কাজ। এ ঘোষণার উপর আমরা তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারবো, যখন স্বয়ং আমরা এ শিক্ষা নিজেরা শিরোধার্য করবো।

এরপর তিলাওয়াত কীভাবে শোনা উচিত এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَاِذَا قُرِئَ الْقُرْاٰنُ فَاسْتَمِعُوْا لَهٗ وَاَنْصِتُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ‏

‘এবং যখন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা গভীর মনোযোগের সাথে শোন এবং নিরব থাক, যেন তোমাদের উপর অনুগ্রহ করা হয়।’

(সূরা আল্ আ’রাফ: ২০৫)

প্রতিটি আহমদীর হৃদয়ে পবিত্র কুরআনের প্রতি এই মর্যাদা বা সম্মান সৃষ্টি করতে হবে, আর নিজেদের সন্তান-সন্ততির মাঝেও এর গুরুত্ব স্পষ্ট করতে হবে। অনেকেই অসতর্কতা প্রদর্শন করে, তিলাওয়াতের সময় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মগ্ন থাকে, কোন কোন বাড়ির টিভিতে অনেক সময় কুরআন তিলাওয়াত হতে থাকে অথচ ঘরের লোকজন ব্যক্তিগত কথা-বার্তায় মশগুল থাকে। নিরবতা অবলম্বন করা উচিত, হয় নিরবে তিলাওয়াত শুনুন, অথবা জরুরী কথা বলার প্রয়োজন হলে, যদি একান্ত কথা না বললেই নয় তবে টিভির আওয়াজ বন্ধ করে দিন। অমুসলমানদের প্রেক্ষাপটেও একই নির্দেশনা রয়েছে, যদি নিরবতার সাথে এ কালাম (কুরআন) শোনে, তবে তারাও বুঝতে পারবে যে, কীরূপ মহান বাণী এটি। আল্লাহ্ তা’লা এ কারণে তাদের প্রতিও করুণা করতঃ হেদায়াত ও পথপ্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন। অতএব, আল্লাহ্ তা’লার কালামকে নিরবতার সাথে শুনা ও বুঝার, আর বেশি বেশি আল্লাহ্ তা’লার রহমত লাভের মানসে আমাদের মাঝে গভীর সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত।

এরপর অন্যত্র আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন:

فَاسْتَقِمْ كَمَاۤ اُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا‌ؕ اِنَّهٗ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ‏

‘অতএব তোমাকে যেভাবে নির্দেশ দেয়া হয়, তুমি এর উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও, আর তারাও যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা তোমার সাথে তত্তবা করেছে আর সীমাতিক্রম করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’লা ঐ সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত যা তোমরা কর।’

(সূরা হূদ: ১১৩)

এটি সূরা হুদের আয়াত। এই নির্দেশ শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্যই ছিল না, এমনিতেও মহানবী (সা.)-এর প্রতি যত নির্দেশ অবতীর্ণ হয়েছে তা তাঁর উম্মত ও তাঁর মান্যকারীদের জন্যই। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে মু’মিন ও অনুশোচনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, অর্থাৎ সমুদয় নির্দেশের উপর (নিজেরাও) দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও এবং অন্যদেরও করাও। আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখ, কেবলমাত্র ইবাদতের উপরেই নির্ভর করবে না, বরং মূল বিষয় সন্ধান কর যা এর প্রাণ, আর তা হল, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ করা। খোদা তা’লা মহানবী (সা.)-কে এ নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, যারা এ দাবী করে যে, আমরা তওবা করেছি, তারাও যেন আল্লাহ্ তা’লার নির্ধারিত সীমারেখা সম্বন্ধে অবগত হয় এবং বুঝে। আর এ সম্পর্কে বেশি বেশি জ্ঞান লাভ করে, উপরন্তু কখনোই এটি লঙ্ঘন করার স্পর্ধা না দেখায়, তবেই আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ হতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের আর একটি দায়িত্ব হলো - নিজ সন্তান-সন্তুতির এমনভাবে তরবিয়ত করা, যাতে তারা আল্লাহ্ তা’লার এ কালামকে বুঝার, প্রণিধান করার ও নিজেদের জীবনে এ শিক্ষা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একস্থানে বলেন:

‘আমার গভীর আক্ষেপ হয় যখন দেখি যে, মুসলমানরা মৃত্যু সম্পর্কে হিন্দুদের মতও সচেতন নয়। রসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখ! কেবল একটি নির্দেশ فَاسْتَقِمْ كَمَاۤ اُمِرْتَ ’ই তাঁকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। মৃত্যুর কত গভীর উপলব্ধি। তাঁর অবস্থা কেন এমন হয়েছিল? কেবল এ জন্য, যাতে আমরা এত্থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি।’

মহানবী (সা.)-এর প্রতি যখন এ নির্দেশ আসে তখন তিনি (সা.) বলেন, এ আয়াতটি আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। কেন (বলেছেন)? যেন তাঁর মান্যকারী উম্মত এত্থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তিনি (সা.) তাদের কথা চিন্তা করতেন। তিনি (আ.) বলেন,

‘রসূলে করীম (সা.)-এর পুত পবিত্র জীবনের এর চেয়ে বড় আর কী প্রমাণ হতে পারে যে, আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে সর্বোত্তম পথ প্রদর্শক তথা কিয়ামত পর্যন্ত গোটা বিশ্বের জন্য মনোনীত করেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সমস্ত ঘটনাবলী একটি ব্যবহারিক শিক্ষার সমষ্টি। যেভাবে পবিত্র কুরআন আল্লাহ্ তা’লার উক্তি ভিত্তিক গ্রন্থ আর প্রাকৃতিক নিয়মাবলী (কানুনে কুদরত) হচ্ছে তাঁর ব্যবহারিক গ্রন্থ, অনুরূপভাবে মহানবী (সা.)-এর জীবন একটি ব্যবহারিক গ্রন্থ যাকে পবিত্র কুরআনেরই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ বলা যায়।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.), সূরা হূদ:১১৩, ২য় খন্ড - পৃ: ৭০৪)

এ বিষয়ে আরো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি (আ.) বলেছেন:

‘রসূলুল্লাহ্ (সা.) মানুষের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেন, সূরা হূদ আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। কেননা এই নির্দেশের মাধ্যমে অনেক গুরুদায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। মানুষের নিজের যতটুকু সম্পর্ক আছে, স্বয়ং নিজেকে ঠিক করা আর আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী পূণরূর্পে অনুসরণ করা সম্ভব। কিন্তু অন্যদেরকেও অনুরূপ বানানো সহজ কাজ নয়। এর মাধ্যমে আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর সুউচ্চ মর্যাদা এবং পবিত্র করণশক্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। দেখুন তিনি (সা.) এই নির্দেশ কত সফলরূপে পালন করেছেন। সম্মানিত সাহাবীদের এমন একটি পবিত্র জামাত প্রতিষ্ঠা করেছেন যাদেরকে كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ (সূরা আল্ ইমরান: ১১১) বলা হয়েছে আর رَّضِىَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ‌ؕ (সূরা আল্ মায়েদা: ১২০) এর উপাধি তারা লাভ করেছেন। তাঁর জীবদ্দশায় পবিত্র মদীনাতে কোন মুনাফিক বা কপট ছিল না। মোটকথা, এমন সফলতা তিনি লাভ করেছেন যার দৃষ্টান্ত অন্য কোন নবীর জীবন চরিতে দেখা যায় না। এতে আল্লাহ্ তা’লার উদ্দেশ্য এটিই ছিল যে, ‘শুধু কথার মাঝে বিষয় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।’ কেননা (তা যদি) কেবল কথার খৈ ফুটানো এবং লোক দেখানো পর্যন্তই যদি বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকে তবে আমাদের ও অন্যদের মাঝে পার্থক্য কি থাকল? অন্যদের উপর কী বিশেষত্ব থাকবে?’

(আল্ হাকাম - ৫ম খন্ড, নাম্বার - ২৯, ১০ আগস্ট, ১৯০১ - পৃ: ১ এবং প্রাগুক্ত - পৃ: ৭০৪-৭০৫)

অতএব, আজ আমাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য, কেবল বুলি সর্বস্ব হলেই চলবে না বরং আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী বুঝে সে অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করা উচিত, কেননা এটিই আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ। যেমন একস্থানে তিনি বলেন:

وَهٰذَا كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ مُبٰرَكٌ فَاتَّبِعُوْهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَۙ‏

‘এবং এটি একটি আশিষমন্ডিত কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি, সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর আর তাক্বওয়া অবলম্বন কর যেন তোমাদের প্রতি দয়া করা যায়।’

(সূরা আল্ আন্’আম: ১৫৬)

আরও একটি বিষয় যা আমাদের সমাজের জন্য, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আবশ্যক তা আমি এখানে উল্লেখ করছি, যদিও পূর্বেই উল্লেখ করা আবশ্যক ছিল, আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَاِذَا جَآءَكَ الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِاٰيٰتِنَا فَقُلْ سَلٰمٌ عَلَيْكُمْ‌ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلٰى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ‌ ۙ اَنَّهٗ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوْٓءًۢا بِجَهٰلَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْۢ بَعْدِهٖ وَاَصْلَحَ فَاَنَّهٗ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ‏

‘যারা আমাদের আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান এনেছে তারা যখন তোমার নিকট আসে তাদেরকে বল, ‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক’। তোমাদের প্রভু তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করার বিষয়টি নিজের পক্ষ থেকে অবধারিত করে নিয়েছেন। অর্থাৎ, তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি অজ্ঞতা বশতঃ মন্দ কাজ করে এরপর যদি সে তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।’

(সূরা আল্ আন্’আম: ৫৫)

অতএব, এই অনুপম শিক্ষাই সমাজের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। যদি পরস্পরকে শান্তির বাণী প্রেরণ করতে থাকেন তাহলে পারস্পরিক বিদ্বেষ, অভিযোগ এবং দূরত্ব আপনা-আপনি দূর হয়ে যাবে, আর হওয়া উচিৎ। এর ফলে যেসব ভাই-ভাই পরস্পর বিবাদে লিপ্ত, এবং যাদের মাঝে বিভিন্ন অসন্তোষ রয়েছে, তাদের ভেতর আপোষ হয়ে যাবে। আমাদের দাবী হলো, আমরা আহমদী এবং পবিত্র কুরআনের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখি, আর এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন যাপনের চেষ্টা করি। প্রশ্ন হলো, কুরআন বলে - মীমাংসা কর, তাসত্ত্বেও কোন কোন ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।

অতএব, চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ। আর নিজেদের তুচ্ছাতিতুচ্ছ স্বার্থে পবিত্র কুরআনের মহান শিক্ষা এবং এর নির্দেশাবলীকে জলাঞ্জলি দেয়া উচিত নয়। কাজেই প্রত্যেক আহমদীকে বুঝে-শুনে পবিত্র কুরআন পাঠ করা উচিত। এটি এমন এক সুমহান গ্রন্থ যাতে এমন কোন দিক নেই যা বর্ণিত হয়নি। তাই সমাজের শান্তি, নিজ আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং খোদার নৈকট্য লাভের জন্যও, আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের নির্দেশাবলী চিহ্নিত করে তার প্রতি আমল করার চেষ্টা করা একান্ত আবশ্যক। আর এটি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করবো এবং এর প্রতি গভীর অভিনিবেশ করবো। আমি পূর্বেই বলেছি, সব কথা বলা সম্ভব নয়। কিছু উল্লেখ করেছি, বাকী ইনশাল্লাহ্ আগামীতে বলবো।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘কুরআন শরীফের প্রতি গভীর অভিনিবেশ করো - এতে সব কিছু রয়েছে। পাপ-পুণ্যের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে আর ভবিষ্যতের খবরাখবর ইত্���াদিও আছে। ভালোভাবে জেনে রাখ! এটি সেই ধর্ম উপস্থাপন করে যার উপর কোন আপত্তি হতে পারে না। কেননা এর আশিস ও ফলসমূহ সকল ঋতুতে সতেজ পাওয়া যায়। ইঞ্জিলে ধর্মকে পরিপূর্ণরূপে বর্ণনা করা হয়নি। এর শিক্ষা সে যুগের উপযোগী হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সকল যুগ ও সকল পরিস্থিতি অনুযায়ী নয়। এ গৌরব কেবল পবিত্র কুরআনেরই, কেননা আল্লাহ্ তা’লা এর মাঝে সকল রোগের চিকিৎসা বাতলে দিয়েছেন আর সকল বৃত্তির পরিচর্যা বাতলে দিয়েছেন। এছাড়া যেসব পাপের কথা উল্লেখ করেছেন তা দূর করার উপায়ও বলে দিয়েছেন। তাই পবিত্র কুরআন পাঠ করতে থাকো, এবং দোয়া অব্যাহত রাখ; আর স্বীয় আচার-আচরণকে কুরআনের শিক্ষার অধীনস্ত রাখার চেষ্টা কর।

(মলফুযাত - ৫ম খন্ড, পৃ: ১০২ - নবসংস্করণ)

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে কুরআন পড়ার, বোঝার এবং এর প্রতি আমল করার তৌফিক দান করুন। আমরা নিজেরাও যেন এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। নিজেদের বংশধরদেরকেও কুরআনের অনুপম শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করুন এবং তাদের হৃদয়ে কুরআনের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টিকারী হোন, আমীন।

(জামেয়া আহমদীয়া বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্কের যৌথ উদ্যোগে অনুদিত)

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে