In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

পবিত্র রমযান এবং আমাদের করণীয়

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৮শে আগস্ট, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

وَاِذَا سَاَلَـكَ عِبَادِىْ عَنِّىْ فَاِنِّىْ قَرِيْبٌؕ اُجِيْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيْبُوْا لِىْ وَلْيُؤْمِنُوْا بِىْ لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُوْنَ‏

(সূরা আল্ বাকারা: ১৮৭)

এ আয়াতটির অর্থ হল, যখন আমার বান্দা তোমাকে আমার সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, (তুমি) বল, নিশ্চয় আমি কাছেই আছি। প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার আহবানে সাড়া দেই। অতএব তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় আর আমার ওপর ঈমান আনে, যাতে তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়।

এটি আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপা যে, তিনি আমাদেরকে আরো একটি রমযান দেখার সৌভাগ্য দান করছেন। আজ আমরা কেবলমাত্র তাঁরই কৃপায় এ রমযানের ষষ্ঠ দিন অতিবাহিত করছি। মানুষ যদি ভাবে তাহলে দেখবে যে, আল্লাহ্ তালার অনুগ্রহরাজির কোন শেষ নেই। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থাৎ, ‘যারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে পুরো চেষ্টা-সাধনা করে, আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথের দিকে আসার সুযোগ দেই।’

(সূরা আল্ আন্‌কাবূত: ৭০)

তিনি বলেছেন, যারা আল্লাহ্ তা’লার দিকে আসার চেষ্টা করে, তিনি তাদেরকে তাঁর দিকে আসার সুযোগ দেন। কিন্তু একে আল্লাহ্ তা’লা বান্দার উপর ছেড়ে দেননি যে, তোমরা নিজেরাই আমার দিকে আসার পথ অন্বেষণ কর। যদি নিজে- নিজেই সঠিক পথ খুঁজে বের করতে পার তবে ঠিক আছে, আমি তোমাকে আগলে রাখবো এবং আগুনে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবো - না, বিষয়টি এমন নয় বরং প্রত্যেক যুগে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর রীতি অনুযায়ী স্বীয় নবীদের মাধ্যমে সেই পথ প্রদর্শন করেছেন যা মানুষকে আল্লাহ্ তা’লা পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর মানুষ যখন আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় এক বিবর্তণের প্রক্রিয়ায় মানবীয় গুণাবলীতে ঊৎকর্ষতা লাভ করল তখন আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-কে প্রেরণ করেছেন। মহানবী (সা.)-কে আবির্ভূত করে তাঁর কামেল বা পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর কাছে যাবার পথ দেখিয়েছেন যাতে করে মানুষ ধ্বংস ও জাহান্নামে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং সেই পথের পথিক হয়ে যায় যে পথ আল্লাহ্ তা’লার পানে নিয়ে যায়। সে পথগুলোর একটি পথ হল রমযানের রোযা।

রমযান মাস অশেস কল্যাণের মাস বলে আমরা পবিত্র কুরআন হতে জানতে পারি। যে আয়াতটি আমি তেলাওয়াত করেছি এর পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর একটিতে এর উল্লেখ রয়েছে যে, তাঁর নৈকট্য প্রদানকারী এ মাধ্যম, অর্থাৎ রোযা, আল্লাহ্ তা’লা পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের জন্যও বিধিবদ্ধ করেছিলেন। আর এখন মুসলমানদের জন্যও আবশ্যক, যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ধর্ম, তাই আল্লাহ্ তা’লা ইসলামের মাধ্যমে রোযার শিক্ষাও সম্পূর্ণরূপে প্রদান করেছেন। সেহরী ও ইফতারীর জন্য সময় নির্ধারণ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথাও উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে অসুস্থতা ও সফররত অবস্থায় অবকাশও দিয়েছেন। তবে পরবর্তীতে (রোযার এ গণনাকে) পূর্ণ করতে হয় এবং সামর্থ থাকলে ফিদিয়া দেয়ারও নির্দেশ রয়েছে। এছাড়া চিররুগ্ন বা বৈধ কোন কারণে রোযা রাখতে অসমর্থ হলে ফিদিয়া দেয়ার আদেশ রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা একজন মু’মিনের জন্য ইবাদত ও কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করাকে আবশ্যক করেছেন এবং তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেহেতু এ মাসটি কল্যাণের মাস, তাই একজন মু’মিনের স্মরণ রাখা উচিত যে, ছোটো-খাটো রোগ-ব্যাধি ও দুর্বলতার অজুহাত দেখিয়ে, সুযোগের অন্যায় ব্যবহার করে রোযা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। একজন মু’মিনের পরিপূর্ণ আনুগত্যের ধারণা তখনই পাওয়া যায়, যখন সে শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা’লার জন্য পানাহার ও কতক সঙ্গত কাজ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিরত থাকে এবং আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য বেশি বেশি চেষ্টা করতে থাকে। কেননা, আল্লাহ্ তা’লা এ দিনগুলোতে বান্দার পাপ ক্ষমা করা এবং তাকে তাঁর নৈকট্য প্রদান করার লক্ষ্যে বিশেষ উপকরণ সৃষ্টি করেন। একদিকে তো لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا বলে সব সময়, সকল ঋতু, সকল যুগ এবং প্রত্যেক দেশের মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, যে-ই আমাদের দিকে আসার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে আমরা তাকে আমাদের দিকে আসার পথ দেখাব।

এটি যেন একটি সাধারণ ঘোষণা। যখনই কেউ পবিত্র মনমানসিকতা নিয়ে আল্লাহ্ তা’লার দিকে যাবে, সে আল্লাহ্ তা’লার আশিস লাভ করবে। কিন্তু রমযান মাস এমন একটি মাস, যে মাসে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টির জন্য এবং তাঁর আদেশে বান্দার কৃত কুরবানীর ফলে কল্যাণের এক বিশেষ প্রস্রবণও তিনি প্রবাহিত করেন। তাঁর বান্দার আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা করেন। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেন যা পুণ্যের পথ দ্রুত অতিক্রমে সহায়ক। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাঁর বান্দাদের চেষ্টার সুযোগ সৃষ্টি করেন। বান্দার দোয়া কবুল করার জন্য সব দূরত্বকে নৈকট্যে বদলে দেন।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন,

إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ وَصُفِّدَتْ الشَّيَاطِينُ

(ইযা জায়া রামাযানু ফুতিহাত আবওয়াবুল্ জান্নাতি ওয়া গুল্লিকাত আবওয়াবুন্ নারি ওয়া সুফ্‌ফিদাতিশ্ শায়াতিন)

এর অর্থ হল: ‘মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন রমযান মাস আসে তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, দোজখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’

(সহীহ্ মুসলিম-কিতাবুস সিয়াম)

অতএব, দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে কীভাবে এই অবস্থার চিত্রাঙ্কন করেছেন আর বলেছেন, রমযানে অবস্থা এরূপ হয়ে থাকে। অতএব এটি কি আমাদের সৌভাগ্য নয় যে, আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে আরেকটি রমযান হতে লাভবান ও কল্যাণমন্ডিত হবার সুযোগ দান করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা স্বাভাবিক অবস্থাতেও একটি পুণ্যের বিনিময়ে অনেক গুণ প্রতিদান দিয়ে থাকেন, আর পাপের শাস্তি হয়ে থাকে এর সমপরিমান। তবে এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, এ দিনগুলোতে আল্লাহ্ তা’লার কৃপার কোন সীমা নেই, তিনি তাঁর বান্দার প্রতি অশেষ কৃপা বর্ষণ করে থাকেন। আর স্বাভাবিক অবস্থায় শয়তানের লাগাম ছাড়া থাকে, সে সকল দিক থেকে বান্দাদের প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। ফলে অনেক সময় সৎকর্মশীলরাও তার ধূর্ততার খপ্পড়ে পড়ে, তার ধোকায় প্রতারিত হয়ে পুণ্যকর্মে উন্নতির গতি মন্থর হয়ে যায়। প্রকৃত পক্ষে শয়তান অনেক সময় কোন কোন পুণ্যবানকেও সৎকর্মের ছদ্মবেশে কতক মন্দ কাজে লিপ্ত করিয়ে দেয়। কিন্তু মহানবী (সা.) এখানে এটা ঘোষণা করেছেন এবং নিশ্চিতভাবে আল্লাহ্ তা’লার অনুমতি সাপেক্ষেই তিনি এই ঘোষণা করেছেন, وَصُفِّدَتْ الشَّيَاطِينُ (ওয়া সুফ্‌ফিদাতিশ্ শায়াতীন) অর্থাৎ, শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। আর শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তার সাঙ্গপাঙ্গদের যেসব পথে বসিয়ে রাখে - তাদের সকলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেয়া হয়। অতএব এটিই সুযোগ; রমযানের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে সব ধরনের পুণ্যকর্মের মাধ্যমে জান্নাতের যত বেশি বেশি সংখ্যক দরজা দিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব, মানুষের তাতে প্রবেশের চেষ্টা করা উচিত। (তোমরা) সেই সকল উচ্চতায় পৌঁছার চেষ্টা কর যেখানে শয়তান পৌঁছতে পারে না। এরপর সেই অর্জিত পরাকাষ্ঠাকে আমাদের জীবনের অংশ বানিয়ে নেয়া উচিত। ইবাদতের মান উচ্চ থেকে উচ্চতর করতে থাকুন, সদকা-খয়রাতে অগ্রগামী হোন, কেননা আমাদেরকে আমাদের নেতা ও মান্যবর হযরত মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উত্তম জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হবে, রমযানে সদকা খয়রাত করার বেলায় তাঁর হাত প্রবল ঝড়ের বেগে চলত।

উত্তম চরিত্রিক মানে প্রতিষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রে নিত্য-নতুন মাইল ফলক অতিক্রমের চেষ্টা করতে হবে, কেননা আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য লাভের এটিও একটি অনেক বড় মাধ্যম। বিশেষ একাগ্রতা ও উৎসাহের সাথে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত এবং এর আদেশ নিষেধসমূহ মান্য করার চেষ্টাও করা উচিত, কেননা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের এটিও একটি মাধ্যম। কাজেই রমযানের এ দিনগুলোতে রমযানের কল্যাণ লুফে নিয়ে, একে কার্যে রূপায়িত করে আল্লাহ্ তা’লার নিষ্ঠাবান বান্দায় যদি পরিণত হই, তবেই আমরা সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভূক্ত হব। আমরা যেন সেসব লোকদের মধ্যে পরিগণিত হই, যাদের সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,

‘আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আদম সন্তান (অর্থাৎ মানুষ) রোযা ব্যতীত বাকী সব কর্মই তার নিজের জন্য করে। রোযা রাখা হয় আমার জন্য এবং আমি-ই এর পুরস্কার দিব। আর রোযা হল ঢালসরূপ, তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ যখন রোযা রাখে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, আর গালিগালাজ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করে তবে উত্তরে তাকে শুধু এতটুকু বলা উচিত যে, আমি রোযা রেখেছি। সেই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে মুহাম্মদের (সা.) প্রাণ, আল্লাহ্ তা’লার কাছে রোযাদারের মুখের গন্ধ মৃগনাভীর (কস্তুরি) সুগন্ধির চেয়েও বেশী প্রিয়। রোযাদারকে দু’টি বিষয় আনন্দিত করে, একটি হল যখন সে ইফতার করে তখন সে আনন্দিত হয় এবং দ্বিতীয়টি হল যখন সে তার প্রভু-প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে, তখন সে তার রোযার জন্য আনন্দিত হবে।’

(সহীহ্ বুখারী-কিতাবুস সওম)

অতএব, আমাদের সেই রোযা রাখা উচিত, যা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের উঠাবসা, চলাফেরা, সর্বোপরি আমাদের প্রতিটি কথা ও কাজ দ্বারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আমাদেরকে খোদার সাথে মিলিত করবে। স্মরণ রাখা উচিত, আমাদের মধ্য থেকে সেসব রোযাদার যারা রোযার সমস্ত আবশ্যকীয় দিকগুলোর প্রতি স্বযত্ন দৃষ্টি রাখেন নি, হাদীসের বাক্য:

إِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ

(ওয়া ইযা লাকেয়া রাব্বাহু ফারিহা বিসওমিহি)

অর্থাৎ, ‘যখন সে তার প্রভুর সাথে সাক্ষাত করবে তখন সে তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে’।

(বুখারী-কিতাবুস সওম)

এটি তার বেলায় প্রযোজ্য হবে না। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) সতর্কও করেছেন, নিছক রোযা রাখাই যথেষ্ট নয়, তোমরা রোযা রাখবে আর আল্লাহ্ তা’লার সাক্ষাতে আনন্দিত হবে! বরং রোযা গৃহীত হবার জন্য রোযার আবশ্যক দিকগুলো পূর্ণ কর।

একটি হাদীসে এ সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন,

‘যে ব্যক্তি রোযাবস্থায় মিথ্যা বলা এবং এর মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি হতে বিরত হয় না, তার পানাহার বর্জন করার প্রতি আল্লাহ্ তা’লা ভ্রুক্ষেপ করেন না।’

(বুখারী-কিতাবুস সওম)

অতএব, প্রথম হাদীসে মন্দকর্ম পরিহারকারীদেরকে খোদার সন্তুষ্টির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। আর এই হাদীসে বলা হয়েছে, মন্দকর্ম করা থেকে যারা বিরত হয় না, তাদের রোযা গৃহীত হয় না বরং এটি শুধু ‘উপবাস’ বৈ-কি। আর কোন ব্যক্তির অনাহার থাকায় আল্লাহ্ তা’লার কিছু যায় আসে না, অথবা ঐ ব্যক্তির উপবাস থাকাতে তার পুণ্যের কোন বৃদ্ধি ঘটে না। সুতরাং এই বিশেষ পরিবেশে আল্লাহ্ তা’লার কাছে কৃপাভিক্ষা চাওয়া এবং রমযানের বরকত থেকে কল্যাণমন্ডিত হবার জন্য একজন প্রকৃত মু’মিনকে চেষ্টা করা উচিত। পরিবেশ সবার জন্যই সমান, এখানে যেমন ভাল লোকজনও আছে, পুণ্যের পথের পথিকও রয়েছে, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্টরাও রয়েছে, তেমনিভাবে খারাপ কাজে লিপ্ত মানুষও এখানে বাস করছে। নোংরামিতে নিমজ্জিত, মদ্যপায়ী, ব্যভিচারী, এবং মন্দকর্মে লিপ্ত লোকজনও বসবাস করছে। এমন লোকও আছে, যারা রোযা রেখে খোদা ও ধর্মের নামে একে অন্যকে হত্যা করছে। এমন লোকও আছে, যারা রমযানে আহ্‌মদীদের কষ্ট দেয়া এবং শহীদ করাকে পুণ্যকর্ম মনে করে। তবে কি সৎকর্মশীল এবং পাপাচারী কেবল রমযানের কল্যাণময় মাসের কারণে সমান হয়ে যাবে? সৎকর্মশীলদের জন্য যেভাবে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়েছে, তবে কি মন্দকর্মে লিপ্ত লোকদের জন্যও জান্নাতের দ্বার সেভাবে খুলে দেয়া হবে? সৎকর্মশীল এবং ইবাদতকারীদেরকে যেভাবে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখা হয়েছে এবং তাদের শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়েছে, তবে কি এসব মন্দকর্মে লিপ্ত ব্যক্তিদেরও জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখা হয়েছে আর তাদের শয়তানকেও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়েছে? যদি তাদের শয়তানকেও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হত, তাহলে এই শয়তানী কার্যকলাপ তাদের দ্বারা সংঘটিত হত না বরং তারা পুণ্য কাজ করত। অতএব এটি আপেক্ষিক ও কর্মের সাথে শর্তসাপেক্ষ। যে-ই খোদা তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন ও রমযানের কল্যাণ লাভের চেষ্টা করবে, তাকে খোদা তা’লা সাধারণ অবস্থার চাইতে অধিকতর এই সুযোগ দান করবেন। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করতে এবং আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোযা রাখে, বস্তুত সে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের আশায় এসব মন্দকর্ম পরিত্যাগ করে, এমনকি বৈধ বিষয়ও পরিহার করে। কাজেই আল্লাহ্ তা’লার দেয়া এই বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থেকে আমাদেরকে উপকৃত হতে হলে, তাঁর আশিস প্রার্থী হয়ে তাঁর সামনে বিনত হওয়া আবশ্যক। আল্ল��হ্ তা’লা মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে যে সংবাদ মহানবী (সা.)-এর সাহাবাদের প্রশ্নের অথবা সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরে দিয়েছিলেন, তা আমাদের জন্য সুসংবাদ স্বরূপ আর তা স্থায়ীভাবে পবিত্র কুরআনে সুংরক্ষিত রয়েছে।

আমি যে আয়াত তিলাওয়াত করেছি এবং যেভাবে আমি বলেছি, রোযার বিধি-নিষেধ সংক্রান্ত আয়াতগুলোর মাঝে এই আয়াতও রয়েছে। যাতে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দাকে স্বীয় নৈকট্য, এবং বান্দা যেসব দোয়া করে সেগুলো গ্রহণ করার সুসংবাদ দিয়েছেন। আর যে হাদীসটি আমি উপস্থাপন করেছি, সেটিও এই আয়াতের ব্যাখ্যা করে। হাদীস সমূহে রোযার বরাতে কতক আদেশ-নিষেধের উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিকটে আসার ও নৈকট্য লাভের, এবং তাঁর বান্দার দোয়া কবুল করার কথা বলে কতক শর্ত আরোপ করেছেন।

প্রথমতঃ سَأَلَكَ عِبَادِي বলে জানিয়ে দিয়েছেন, সবাই (অর্থাৎ, রহীম, করীম যেই হোক না কেন সবার জন্য - অনুবাদক) রমযানের বরকত ও কল্যাণ লাভ করা এবং দোয়া কবুলের দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। বরং তিনি বলেন ‘আমার বান্দা’ হল তারা যারা আল্লাহ্ তা’লার দাস হতে চায় এবং হয়েও থাকে, তারাই এই সান্নিধ্য অর্জন করে থাকে। সেসব লোক যারা আল্লাহ্ তা’লার নিষ্ঠাবান বান্দা এবং নিষ্ঠাবান বান্দা হবার আকাঙ্খা রাখে, তাদের সকল কর্মে إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি আর তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি - অনুবাদক) এর প্রতিফলন হয়ে থাকে। এখানে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বিশেষ বান্দাদের এই লক্ষণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা عَنِّي (অর্থাৎ আমার সম্পর্কে - অনুবাদক) প্রশ্ন করে থাকে। আল্লাহ্ তা’লা বলছেন, তারা আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করে, আমাকে খুঁজে। তাদের চাওয়া-পাওয়া পার্থিব নয়, খোদাকে পেলে তারা ব্যবসার উন্নতির জন্য দোয়া করবে, তাঁর কাছে ব্যবসা এবং অন্যান্য জাগতিক লক্ষ্য পূরণের আকুতি জানাবে। এমনটি নয় বরং তারা আকুল হয়ে এই জিজ্ঞাসাই করে যে, বল আমার আল্লাহ্ কোথায়? আমি আমার খোদার অন্বেষণে অস্থির। বিশ্ববাসী নাস্তিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, খোদা পরিপন্থী পুস্তকাদী লেখা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে আমি নিজের ব্যাপারে চিন্তিত - আমি এক খোদায় বিশ্বাসী। আমার শুধুমাত্র এটাই আকাঙ্খা, আমি যেন খোদা তা’লার সত্তার এতটুকু তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে পারি যার ফলে কোন জাগতিক বস্তু বা নাস্তিকতার চাকচিক্য বা প্রবঞ্চনা আমাকে আহ্‌মদী মুসলমান হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিতে না পারে। আর এই ইচ্ছে পূরণের জন্যই আমি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে রমযানের রোযা রাখছি। আল্লাহ তা’লা বলেন - আমার একনিষ্ঠ অন্বেষীরা জেনে রেখ! আমি তোমাদের নিকটে আছি। যারা মুসলমান আর প্রকৃত মুসলমান হতে চায়, মহানবী (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ পুর্ণাঙ্গ শরীয়তের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তদনুযায়ী কর্ম সম্পাদনে সচেষ্ট, খোদা তা’লার অন্বেষণে মহানবী (সা.)-এর সুন্নত ও হাদীস অনুযায়ী কর্ম সম্পাদনকারী এবং আল্লাহ্ তা’লার ভালবাসার উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.)-কে ভালবাসে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আমি তোমাদের নিকটে আছি। আর যখনই আমার বান্দা আমাকে ডাকে আমি তাঁর আহবানে সাড়া দেই।

অতএব, যদি আল্লাহ্ তা’লার সাথে কথোপকথন আরম্ভ করতে চান, তবে সর্বপ্রথম একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ্ তা’লার অন্বেষণ করুন। আর অন্বেষণের পথ আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং বাতলে দিয়েছেন, যার কথা আমি উল্লেখ করেছি, তা হলো কুরআনের অনুশাসন শিরোধার্য করা, রসূল (সা.)-এর সুন্নত অনুসারে জীবন যাপন করা, মহানবী (সা.)-এর প্রতি পরম ভালবাসা রাখা। আর পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী যা আসমান ও জমিন থেকে প্রকাশিত নিদর্শনের আকারে পূর্ণতাও লাভ করেছে, সে মোতাবেক যুগ ইমামের সাথে পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সম্পর্ক স্থাপন করা, মহানবী (সা.)-এর সত্যিকার প্রেমিকের হাতে আন্তরিকভাবে বয়’আত করা। শুধুমাত্র মুসলমান হবার ঘোষণা দেয়াই যথেষ্ট নয়, পুনরায় একই বিষয় এসে যায় যে أَسْلَمْنَا (অর্থাৎ, আমরা আত্মসমর্পন করলাম - অনুবাদক) বলাই যথেষ্ট নয়। বরং يُؤْمِنُوابِي (অর্থাৎ, তারা যেন আমার প্রতি ঈমান আনে - অনুবাদক) এর বিষয়কে বুঝ, স্বীয় ঈমানকে পরিপূর্ণ কর, আর ঈমানকে পরিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে নিজের মনগড়া পদ্ধতি অবলম্বন করো না। বরং সে পথে সম্পূর্ণ ঈমানের সাথে আস যার দিশা স্বয়ং আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সা.) দিয়ে গেছেন। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, يُؤْمِنُوابِي (তথা - তারা যেন আমার প্রতি ঈমান আনে - অনুবাদক) আমার প্রতি ঈমান আনার ‘মান’এ কীভাবে অধিষ্ঠিত হওয়া যাবে? এর উপর তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন فَلْيَسْتَجِيبُوالِي (অতঃপর তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় - অনুবাদক) এর উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ আমার আহবানে সাড়া দিবে, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে। মোটকথা যদি পবিত্র কুরআনের আদেশাবলী পালন করার চেষ্টা করা হয় তবেই এই কর্ম সম্পাদন সম্ভব হবে। তাক্বওয়ার পথে বিচরণের জন্য, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য, আল্লাহ তা’লার ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য, একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ্‌র অধিকার ও বান্দার প্রাপ্য প্রদানের চেষ্টা করা আবশ্যক। আল্লাহ্ তা’লার ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠার সাথে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। আর বান্দার অধিকার প্রদানের জন্য উত্তম চারিত্রিক গুণাবলীতে সজ্জিত হওয়া আবশ্যক।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘যার মাঝে এই দু’টি বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রাপ্য ও বান্দার অধিকার প্রদান সৃষ্টি হয়, তারাই মুত্তাকী আখ্যায়িত হন। তাঁর সম্পর্কেই বলা যেতে পারে, তিনি খোদা তা’লার অন্বেষী। তার ব্যাপারেই বলা যেতে পারে যে, তিনি খোদা তা’লার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু যদি কতিপয় চারিত্রিক গুণাবলী থাকে, আর কিছু অধিকার আদায়েরও চেষ্টা করা হয় আর কতককে সম্পূর্ণভাবে উপক্ষো করা হয় তবে তাকে মুত্তাকী বলা যেতে পারে না।’

অতএব, নিজেদের দোয়াকে গ্রহণযোগ্য করার এবং আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য লাভের জন্য খোদাভীতির এই মানে আমাদের অধিষ্ঠিত হতে হবে। তাই এই রমযানে আমাদের এ চেষ্টা করা উচিত যেন আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্ তা’লার ইবাদতগুজার হতে পারি। আল্লাহ্ তা’লার তৌহীদকে যেন বুঝতে পারি, আর সমস্ত শক্তি-সামর্থ নিয়োজিত করে তাঁর অধিকার প্রদানে যেন সচেষ্ট থাকতে পারি, এবং যথাযথভাবে নামায পড়তে পারি। অনেকের কাছ থেকে এই কথা শুনে আমি বিস্মিত ও বিচলিত হই যে, আমরা পাঁচ বেলা নামায পড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু তারপরও কোন কোন সময় দু-এক বেলার নামায ছুটে যায়। নামাযই যদি ছুটে যায় তাহলে আল্লাহ্ তা’লার নিকট দোয়া গৃহীত হবার জন্য কীভাবে আবেদন করা যেতে পারে?

এভাবে সকল উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের জন্য একাগ্রতার সাথে চেষ্টা করা প্রয়োজন। অতএব, রমযান যা তাক্বওয়া ও আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে উচ্চ থেকে উচ্চতর মান অর্জনের মাধ্যম, আমাদের প্রত্যেককে তা থেকে পুরোপুরি লাভবান হবার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের জন্য জান্নাতের যে সব দরজা খুলেছেন, আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য যাচনা করে এর প্রতিটি দ্বারে আমাদের সবারই প্রবেশ করার চেষ্টা করা উচিত, আর তখনই আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আমরা পদক্ষেপ বাড়িয়েছি বলে স্বীকৃত হবো। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর সামর্থ দান করুন।

এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেন:

‘আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তাদের উচিত দোয়ার মাধ্যমে আমার সান্নিধ্য অন্বেষণ করা এবং আমার প্রতি ঈমান আনা যাতে তারা সফলকাম হতে পারে’।

(ইসলামী নীতি দর্শন - রূহানী খাযায়েন - দশম খন্ড, পৃ: ৩৯৬)

অতএব, এটি দোয়া গৃহীত হবা��� একটি বিশেষ মাস। আর সবচেয়ে বড় দোয়া যা আমাদের করা উচিত তাহলো, আল্লাহ্ তা’লার সাক্ষাৎ লাভের চেষ্টা করা, তাঁর নৈকট্য সন্ধান করা, তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার বাসনা রাখা এবং আল্লাহ্ তা’লার কাছে তাঁকে লাভ করার জন্য দোয়া করা। যখন খোদাকে পেয়ে যাবে, তখন অন্যান্য আকাঙ্খাও আপনা-আপনিই পূর্ণ হতে থাকবে। দোয়া করি আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর সৌভাগ্য দিন।

কিন্তু এখানে আরো একটি বিষয় স্মরণ রাখবেন, দোয়া কী আর দোয়া করার পদ্ধতি কী? তার সংজ্ঞাও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিরূপণ করেছেন এ সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘তোমরা মনে করো না যে, আমরা প্রতিদিন দোয়া করি! আর যে নামায পড়ি তার পুরোটাইতো দোয়া। কেননা যে দোয়া তত্ত্বজ্ঞান অর্জনের পরও ঐশী কৃপার ভিত্তিতে হয়ে থাকে তার বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি বিলীন করে দেয়ার মত জিনিষ। এটি বিগলিত করে দেয়ার মত এক আগুন। এটি রহমতকে আকর্ষণ করার মত এক চৌম্বকীয় শক্তি। এটি এক মৃত্যু যা পরিণামে জীবন দান করে। এটি এক প্রবল স্রোত যা নৌকায় রূপ নেয়, প্রতিটি ভঙ্গুর কাজ এর মাধ্যমে সঠিকরূপে সম্পাদিত হয় এবং প্রত্যেক প্রকার বিষ এর মাধ্যমে প্রতিষেধক হয়ে যায়।’

(লেকচার সিয়ালকোট - রূহানী খাযায়েন - ২০তম খন্ড, পৃ: ২২২)

তিনি (আ.) আরো বলেন:

‘দোয়া খোদা তা’লার পক্ষ থেকেই আসে আর আল্লাহ্ তা’লার দিকেই ফিরে যায়। দোয়ার ফলে খোদা তা’লা এত নিকটবর্তী হয়ে যান যেভাবে তোমার প্রাণ তোমার সন্নিকটে। মানুষের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সৃষ্টি হয়ে যাওয়াই হল দোয়ার প্রথম পুরস্কার।’

(প্রাগুক্ত - পৃ: ২২৩)

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে সেই তত্ত্বজ্ঞান দান করুন, যার মাধ্যমে আমরা দোয়ার তাৎপর্য ও খোদা তা’লার নৈকট্য লাভের দর্শনকে বুঝতে পারবো। আমাদের প্রতিটি কথা এবং কর্ম যেন আল্লাহ্ তা’লার সন্তষ্টির জন্যই হয়। যেসব দোয়ার ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দার কাছে এসে যান, রমযানে সেসব দোয়ার কল্যাণে আমাদের মাঝে সেই পরিবর্তন সাধিত হোক যা অন্যদের মাঝে আমাদেরকে সর্বদা স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করবে। প্রত্যেক অনিষ্ট থেকে জামাতের সুরক্ষা ও ইসলামের উন্নতির জন্যও আমাদের অনেক বেশি দোয়া করা উচিত। খোদা তা’লার কাছে ধর্মের উন্নতি ও দৃঢ়তার জন্য যেসব দোয়া করবো তা অবশ্যই আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্যের কারণ হবে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এরূপ দোয়া করার তৌফিক দিন, আর এর ফলে আমাদের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সৃষ্টি করুন, যাতে আমরা আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য অর্জনকারী হই।

এরপর আমি হযরত মওলানা দোস্ত মোহাম্মদ শাহেদ সাহেবের জিকরে খায়ের (স্মৃতিচারণ) করবো। দু’দিন পূর্বে তিনি ইন্তেকাল করেছেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ তিনি জামাতের শীর্ষস্থানীয় আলেম ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকুন। তিনি আহ্‌মদীয়াতের ঐতিহাসিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আহ্‌মদীয়াতের ইতিহাস লিখেছেন এবং এর বিশ খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি শুধুমাত্র আহ্‌মদীয়াতের ঐতিহাসিকই ছিলেন না বরং আহ্‌মদীয়া ইতিহাসেরও একটি অধ্যায় ছিলেন; আর তিনি এমন এক প্রদীপ্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন - যখনই সুযোগ পেতেন আহ্‌মদীয়াত তথা সত্যিকার ইসলামের জ্যোতিকে জগতময় ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় রত থাকতেন। তিনি প্রখর স্মরণ শক্তির অধিকারী ছিলেন। আমি তাকে এনসাইক্লোপিডিয়া বলতাম। আর এটি বলা অযৌক্তিক হবে না, কেননা অনেকে আমাকে এই কথা লিখেছেন যে, ইতোপূর্বে হযরত খলীফাতুল্ মসীহ্ রাবে (রাহে.)-ও তাঁর সম্পর্কে একই কথা বলেছেন, কিন্তু আমি জানতাম না। পড়ার পর আমি তখন জানতে পারলাম, খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.)-ও তাঁকে এনসাইক্লোপিডিয়া আখ্যা দিয়েছেন। অতীতের বুযুর্গ, আওলিয়া ও মুজাদ্দিদগণের (নাম-ধাম) উদ্ধৃতিসমূহ তাঁর মুখস্ত ছিল। আর তাঁর পড়াশোনা ছিল অনেক ব্যাপক। শুধুমাত্র উদ্ধৃতি-ই নয় বরং এর বইয়ের পৃষ্ঠাসহ তার মুখস্ত ছিল। অনেকে চিঠিতে তার ব্যক্তিগত গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন। কতক তথ্য আমি তাঁর ছেলের মাধ্যমে জেনেছি। যেভাবে আমি বলেছি - তিনি আহ্‌মদীয়া ইতিহাসের এক অধ্যায় ছিলেন।

সবকিছু এখানে বলা সম্ভব নয়, কয়েকটি কথা তাঁর সম্পর্কে বলবো। তিনি একজন নিঃস্বার্থ ব্যক্তি ছিলেন - নিজের বেশীর ভাগ সময় ধর্মের কাজে ব্যয়কারী বুযুর্গ ও ওয়াকেফে যিন্দেগী ছিলেন। খিলাফতের সাথে প্রগাঢ় ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। তিনি একজন উচ্চ পর্যায়ের পুণ্যবান ও দোয়াকারী মানুষ ছিলেন। আমাকে কেউ লিখেছে, যখনই কেউ তাঁকে দোয়া করার জন্য বলত, তিনি সবসময় বলতেন, আমাকে নয় বরং খলীফাতুল মসীহ্‌কে লিখ।

তিনি পরম বিনয়ী মানুষ ছিলেন। নতুন কোন কিছু পড়লে এর ফটোকপি করে আমাকেও পাঠাতেন। তিনি এমন একজন আলেম ছিলেন যিনি ‘আলেম বাআমল’ (অর্থাৎ এমন আলেম যার কথা ও কাজের মিল ছিল - অনুবাদক) আখ্যায়িত হবার যোগ্য ছিলেন। আমি পূর্বেই বলেছি, তিনি একজন নিঃস্বার্থ কর্মী ছিলেন। এরূপ একজন ‘সুলতানান নাসির’ (পরম সাহায্যকারী ব্যক্তি - অনুবাদক) এর পরলোক গমনে স্বভাবতঃই চিন্তা হয়। তবে আল্লাহ্ তা’লার কাছে আশা রাখি তিনি সর্বদা খিলাফতকে এরূপ ‘সুলতানান নাসির’ দিয়ে সাহায্য করতে থাকবেন।

একজন, অর্থাৎ আমাদের মুবাশ্বের আইয়ায সাহেব লিখেছেন,

“আমরা যখন মিটিং-এর জন্য মিলিত হতাম, তখন তাঁকে গভীর প্রেমাবিষ্ট এক ব্যক্তি মনে হত। কম্পাসের কাটা যেভাবে সর্বদা উত্তর মুখী হয়ে থাকে, অনুরূপভাবে তার চিন্তাভাবনার কক্ষপথ রচিত হতো খিলাফতকে কেন্দ্র করে। লম্বা চওড়া উদ্ধৃতি ও ফতওয়াকে একটি তৃণ খন্ডের সমানও মূল্য দিতেন না আর বলতেন, যেহেতু হযরত খলীফাতুল মসীহ্ একথা বলে দিয়েছেন তাই অমুকের উদ্ধৃতি বা অমুকের কথার গুরুত্বই বা কি?”

একজন মুরুব্বী সাহেব আমাকে লিখেছেন,

সৌদি আরবের আমীর সাহেব এসে বলেন যে, আমরা সেখানকার আহ্‌মদীয়াতের ইতিহাস সংকলন করবো তাই মওলানা দোস্ত মোহাম্মদ শাহেদ সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। তিনি তাঁর অফিসে যান এবং আধ ঘন্টার মধ্যে বিভিন্ন কথার বরাতে তিনি তার সামনে ইতিহাস তুলে ধরেন, সেগুলোর ফটোকপিও তাঁকে দিয়ে দেন।

আমি পূর্বেই বলেছি, তিনি খুব প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ও উদ্ধৃতির বাদশা ছিলেন।

একজন লিখেছেন,

কোন উদ্বৃতি সন্ধানের জন্য আমি তাঁর দপ্তরে যাই। জামাতের সম্পদের সুরক্ষার বিষয়ে তিনি একান্ত যত্নবান ছিলেন। তিনি আমাকে কাঙ্খিত উদ্ধৃতি বের করে দিলেন। আমি সেখান থেকে কাগজ ও কলম নিয়ে লেখা আরম্ভ করলাম। তিনি আমার নিকট থেকে কলম ও কাগজ নিয়ে নিলেন এবং বললেন, তুমি তোমার ব্যক্তিগত কাজের জন্য উদ্ধৃতি নিতে এসেছ তাই নিজের কলম ও নোট বুক ব্যবহার কর।

মাহমুদ মালেক সাহেব আমাকে লিখেছেন:

মওলানা সাহেব তাঁর পিতার অর্থাৎ আব্দুল জলিল ইশরাত সাহেবের বন্ধু ছিলেন। মওলানা সাহেব একবার লাহোর সফরে যান। তিনি তাঁকে সংবাদ পাঠান, আমি আসতে পারবো না তাই এখানে এসে পড়–ন। বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত সর্ম্পকের কারণে তিনি চলে যান। রিক্সায় করে তিনি তাঁকে সেখানে নিয়ে যান। মৌলভী সাহেব রিক্সার ভাড়া দিতে চান কিন্তু তার বন্ধু তা পরিশোধ করে দেন। পরবর্তী দিন সেখানকার দারুয্ যিকরে যাবার কথা ছিল। তিনি বললেন, টেক্সি নিয়ে আস ভাড়া আমি পরিশোধ করবো কেননা, কেন্দ্র আমাকে টেক্সি ভাড়া প্রদান করে থাকে আর আমাদের জামাত আলেমদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে চায় তাই আমি রিক্সাতে না গিয়ে টেক্সিতে যাব।

এটা শুধু আনুগত্যই ছিল না বরং এত্থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। যে-ই সুযোগ নেয়ার অনুমতি আছে আর কেন্দ্র যে-ই সুবিধ�� দিয়ে থাকে, তা ব্যবহার করা উচিত যেন মানুষ কোনভাবে আনুগত্যের বাইরে চলে না যায়, আর দ্বিতীয়তঃ জামাতের আলেমদের যে আত্মসম্মান আছে সে বিষয়ও সচেতনতা থাকে।

তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে যেভাবে আমি বলেছি, দু’দিন পূর্বে ২৬ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কাদিয়ানের মাদ্রাসা আহ্‌মদীয়ায় ভর্তি হন। আর ১৯৪৪ সালে জামেয়া আহ্‌মদীয়ায় তাঁর শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। ১৯৪৬ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৌলভী ফাযেল পাশ করেন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘ ৬৩ বছর জামাতের নিরলস সেবা করেছেন। ১৯৫২ সালে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর নির্দেশে আল ফযল পত্রিকায় ‘শাযারাত’ শিরোনামে লিখতে আরম্ভ করেন এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৫৩ সালে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) তাঁকে আহ্‌মদীয়াতের ইতিহাস সংকলন করতে বলেন। এ পর্যন্ত এর বিশ খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত কাজ (আহ্‌মদীয়াতের ইতিহাসের - অনুবাদক) শেষ করে গেছেন এবং এর পরবর্তী সময়ের নোট প্রস্তুত করে গেছেন। তাঁর এক ছেলে ডা: সুলতান আহমদ মুবাশ্বের সাহেব যিনি ফযলে ওমর হাসপাতালে আছেন এবং পাঁচজন কন্যা আছে।

তাঁর এক আত্মীয় হযরত মিয়াঁ মোহাম্মদ মুরাদ হাফেযাবাদী সাহেবের মাধ্যমে তাদের বংশে আহ্‌মদীয়াত প্রবেশ করে, যিনি অত্যন্ত নেক ও বুযূর্গ মানুষ ছিলেন। ঘটনা এভাবে ঘটে, তিনি আহ্‌মদীয়াত কবুল করেন, মৌলভী সাহেবের দাদা তা জানতে পেরে তার উপর চরম অত্যাচার করেন, এমনভাবে মারধর করতেন যে, কখনো কখনো মারাত্মকভাবে তিনি আহত হতেন। মিয়াঁ মুরাদ মোহাম্মদ সাহেব বলেন, “ইনশাআল্লাহ্ তা’লা তোমার তিনজন বুদ্ধিমান পুত্র অবশ্যই আহ্‌মদী হয়ে যাবে”। এতে হযরত মৌলভী সাহেবের বড় দাদা আরো ক্ষীপ্ত হয়ে তাকে আরো কঠিন শাস্তি দেন।

এ সম্বন্ধে একটি ঘটনা আছে, হযরত মৌলভী সাহেব বর্ণনা করেছেন:

‘জাবাহ্ নাখলা’ নামক একটি ছোট স্থান যা হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) গ্রীষ্মে অবকাশ যাপনের জন্য আবাদ করেছিলেন, আর সেখানে বসে তিনি তফসীরে সগীর লিখেছিলেন। মৌলভী সাহেব সেই দিনগুলিতে একবার সেখানে যান। তিনি বলেন, যাবার পূর্বে তিনি ‘খানকা ডোগরা’র নিকটস্থ নিজ গ্রামে দাদার সাথে দেখা করতে যান। তখন ছিল তাঁর দাদার জীবনের অন্তিম সময়। তিনি তাঁকে বললেন, “তোমার খলীফা সাহেবকে আমার একটি পয়গাম পৌঁছে দিও, আমার ছয় ছেলের মধ্যে তিনজন আমার কাছ থেকে তিনি ছিনিয়ে নিয়েছেন যাদের একজন কুরআনের হাফেজ্ব আর বাকী দু’জন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। বাকী তিনজন যারা অজ্ঞ ও দুর্বল তাদেরকে আমার কাছে রেখে গেছেন। যদি তাকে গণনাই পূর্ণ করতে হয়, তবে যে তিনজন অথর্ব তাদের নিয়ে যান আর আমার শিক্ষিত তিন ছেলেকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন”।

(তিনি বলেন,) আমি জাবাহ্’তে গেলাম, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর সাথে দেখা হলো আর তাঁকে আমার দাদার পয়গাম পৌঁছালাম। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) আমার পয়গাম শুনে হেসে বললেন, “আপনার দাদাকে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দিন, সন্তানদের এই অদল-বদলের প্রস্তাব আমি সানন্দে গ্রহণ করছি। তাকে বলুন, তার গয়ের আহ্‌মদী ছেলেদের আমার হাতে তুলে দিতে, আর তার আহ্‌মদী ছেলেদের আমার পক্ষ থেকে অনুমতি দিচ্ছি, যদি তারা স্বেচ্ছায় আহ্‌মদীয়াত ছেড়ে চলে যেতে চায়, তবে যেতে পারে”।

(মৌলভী সাহেব বলেন,) যখন আমি আমার দাদাকে এ পয়গাম পৌঁছালাম, তিনি বললেন, “তোমাদের খলীফা সাহেব খুব চালাক। তিনি জানেন যে, তারা মির্যায়ীয়াত ত্যাগ করবে না”। অত:পর তিনি খুব চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। হযরত মৌলভী সাহেবের মাতাও একটি রুইয়ার মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করেন।

১৯৫১ সালে রাবওয়ার জামেয়াতুল মোবাশ্বেরীন এর প্রথম সফল শাহেদ ক্লাসে তিনি অন্তর্ভূক্ত ছিলেন, আর এর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। মৌলভী সাহেব স্বাগত ভাষণ দেন, যা শুনে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) একান্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। জামেয়াতুল মোবাশ্বেরীন থেকে শাহেদ ডিগ্রী লাভের পর ‘জামাতে ইসলামী’ সম্পর্কে তিনি একটি গবেষণা মূলক সন্দর্ভ লেখেন। এর বিষয়বস্তু হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) স্বয়ং নির্ধারণ করে দেন এবং হুযূরের তত্ত্ববধানে তিনি এ প্রবন্ধ লিখেন। হযরত আমীর মিনাই এর স্থলাভিষিক্ত ও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাহাবী হযরত হাফেজ্ব সৈয়দ মোখতার আহমদ শাহ্জাহানপুরীও বিভিন্ন সময় তাকে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। যেভাবে আমি পূর্বেই বলছি, ১৯৫৩ সালে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) তাঁর উপর আহ্‌মদীয়াতের ইতিহাস সংকলনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ইতিমধ্যে এর বিশ খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। আর পঞ্চম খিলাফতের ইতিহাসের সংকলন এখনো চলছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর চল্লিশটির অধিক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে থেকে কয়েকটি গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায়ও অনুদিত হয়েছে।

তিনি একজন বিদগ্ধ আলেম, সাহিত্যানুরাগী ও পন্ডিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, আর রীতি-নীতি মেনে চলতেন। রচনা ও বক্তৃতায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাকে গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.)-এর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধিবর্গ সংসদে গিয়েছিলেন, তিনিও এর একজন সদস্য ছিলেন। তিনি এই প্রতিনিধিদলের শেষ সদস্য ছিলেন যার মৃত্যু হলো। সেখানে যে তথ্যাবলী ও উদ্ধৃতির প্রয়োজন হতো তা সরবরাহের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত ছিল। তিনি যখনই উদ্ধৃতি উপস্থাপন করতেন সংসদ সদস্যরা হতবাক হয়ে যেত। একবার একজন সাংসদ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, উদ্ধৃতি বের করতে গিয়ে আমাদের আলেমদের কয়েকদিন লেগে যায় এবং তারা মহা সমস্যায় পড়ে যায়। অথচ মির্যায়ীদের এই ছোটখাট মৌলভী জানি না কীভাবে পনের মিনিটের মধ্যেই তা বের করে নিয়ে আসে।

আল্লাহ্ তা’লা তাকে সুদীর্ঘ কাল জলসায় বক্তৃতা দেয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন। ১৯৫৭ সালে সান্ধ্য অধিবেশনে তিনি প্রথমবার বক্তৃতা করেন। তার এ বক্তৃতা লিখিত আকারে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) তা এতোটাই পছন্দ করেন যে, তিনি শূরাতে বিশেষভাবে এর উল্লেখ করেন। গবেষণা বিভাগে কাজ করেছেন, কাজীর দায়িত্বও পালন করেছেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত খলীফাতুল মসীহ্ কর্তৃক নির্বাচিত ব্যক্তি হিসেবে পাকিস্তানের মজলিসে শূরার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেছেন।

১৯৯২-১৯৯৩ সালে ক্যাম্ব্রিজের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বায়োগ্রাফিকাল সেন্টার তাঁকে Man of the year এর পুরস্কার প্রদান করে। এই সম্মান এমন বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে প্রদান করা হয়, যাদের যোগ্যতা, সফলতা ও নেতৃত্ব বিশ্বাঙ্গনে স্বীকৃতি লাভ করে থাকে। ১৯৯৪ সালে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কুইম্বেটর শহরে জামাতে আহ্‌মদীয়া আর আহলে কুরআন ও হাদীসের মধ্যে ধর্মীয় বির্তক হয়। এই ধর্মীয় বিতর্ক সেখানকার একটি হোটেলের বড় হলে অনুষ্ঠিত হয়। নয় দিন ধরে এই ধর্মীয় বিতর্ক সভা চলতে থাকে। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে.)-এর নির্দেশে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জামাতে আহ্‌মদীয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন। আল্লাহ্ তা’লা সেখানেও তাঁকে জয়যুক্ত করেন এবং তিনি বিজয়ী হন। সেখানে অবস্থানকালে তাঁর এক মেয়ের বিয়ে হয় আর এতে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন নি। বরং তাঁর দুই মেয়ের বিবাহ এমন সময় হয়েছে যখন তিনি সফরে ছিলেন এবং তাদের বিয়ের দিন তিনি বাড়ীতে পৌঁছেন। তিনি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করেন নি যে, তাঁর ব্যক্তিগত কোন কাজ আছে কি-না?

১৯৮২ সালে তিনি ধর্মীয় কারণে কারাবরণের সম্মানও লাভ করেছেন। তিনি কিছুদিন রাবওয়ার কারাগারে ছিলেন। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয়বার গুজরাওয়ালার জেলা কারাগারে আটক রাখা হয়। এরপর ১৯৯০ সালে বিচারক তার জামানত বাতিল করে তাঁ���ে এবং তাঁর সাথীদের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন। এর কিছুদিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। জেলখানাতেও তিনি কুরআনের দরস ও তবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন।

মৌলভী সাহেব নিজের একটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন,

জলসা সালানার সময় রীতি অনুসারে দুই সপ্তাহের জন্য রাতে আমার বিছানা অফিসেই বিছানো ছিল। প্রাইভেট সেক্রেটারীর অফিস থেকে ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় লাহোর পত্রিকার সম্পাদক সাকেব জিরবী সাহেব আসেন। তিনি বলেন, “আমি এখনই হুযূরের সাথে সাক্ষাত করে আসলাম। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) প্রাইভেট সেক্রেটারী সাহেবকে বলেন যে, মৌলভী সাহেবকে ফোন করে অমুক-অমুক উদ্ধৃতি পাঠিয়ে দিতে বলুন। তখন সাকেব সাহেব বললেন, “আমি বললাম রাত হয়ে গেছে এখন মৌলভী সাহেবকে কোথায় পাওয়া যাবে?” তখন হযরত সাহেব বললেন, “তিনি এখন তাঁর অফিস - ইতিহাস বিভাগেই থাকবেন”। সাকেব সাহেব বলে, “আমি দপ্তরে অনুসন্ধান করতে আসলাম যে, সত্যিই আপনি দপ্তরে আছেন কি-না?”

মোটকথা অহোরাত্র তাঁর একটিই কাজ ছিল আর তা হল ধর্মের সেবায় রত থাকা।

যুগ খলীফার পক্ষ থেকে যখনই কোন কাজ দেয়া হত হোক না তা রাত ২টার সময়, তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে কাজ আরম্ভ করে দিতেন এবং কাজটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোন কাজ করতেন না আর বিশ্রামও নিতেন না, বরং বলতেন আমি অন্য কোন কাজ করা বৈধই মনে করি না। ডা: মুবাশ্বের সাহেব বলেন, মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে তিনি বলেছিলেন,

আমি ড. আব্দুস সালাম সাহেবের কন্ঠ শুনতে পেয়েছি, তিনি আমাকে বললেন, ‘আস্‌সালামু আলাইকুম’।

যাহোক, বিদায়ের ইঙ্গিত পাচ্ছিলেন। ডা: সুলতান মুবাশ্বের সাহেবই লিখেন,

কোন দু:শ্চিন্তা হলেই বলতেন, সবার আগে যুগ খলীফার কাছে দোয়ার জন্য লেখ, এরপর সদকা দাও এবং বেশি বেশি দরূদ শরীফ ও ইস্তেগফার পড়।

আরবী, ফারসী এবং ইংরেজীতে তাঁর পড়াশুনার গন্ডী ছিল ব্যাপক। তিনি কেবল অধ্যায়নই করতেন না, বরং পড়ার সময় বইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করতেন এবং পাশে পয়েন্টসগুলো নোট করতেন। তিনি বলতেন,

হযরত মিয়া বশির আহমদ সাহেব আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘বই সর্বদা নিজে কিনবে এবং পড়বে’।

তিনি এটিকে অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন। তাঁর একটি ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ছিল যাতে প্রায় আট হাজার বই ছিল। খলীফাতুল মসীহ্‌র উপস্থিতিতে যখনই রাবওয়া থেকে বাহিরে যেতেন তখনতো অনুমতি নিতেনই কিন্তু (খলীফার হিজরতের ) পরও যখনই তিনি রাবওয়ার বাহিরে যেতেন স্থানীয় আমীরের অনুমতি ছাড়া রাবওয়ার বাইরে যেতেন না। জামাতী কাজের জন্য যখন যেতেন অনেক সময়, বরং প্রায়ই নিজ আত্মীয়-স্বজনের সাথেও সাক্ষাত করতেন না। তাঁর মেয়েরা লাহোরে থাকতো, জামাতী সফরে লাহোর গেলে মেয়ের সাথে সাক্ষাতের চিন্তাও করতেন না, বরং অনেক সময় তাঁর ফেরত যাবার পরই তাঁর মেয়েরা জানতে পারতো। আর সাক্ষাত করতে হলে, আমীর সাহেবের অনুমতিক্রমে তাদের সাথে দেখা করতে যেতেন। সর্বদা বলতেন,

আমি খলীফায়ে ওয়াক্তের সৈনিক আর সৈনিক কখনো তার বাঙ্কার ছেড়ে যায় না।

কখনো তিনি জুমুআর দিনও ছুটি ভোগ করেন নি। জুমুআর দিন রাবওয়াতে অফিস ছুটি থাকে, তিনি সর্বদা কাজ করতেন, ছুটির চিন্তাই করতেন না।

খুবই সাদামাটা পোষাক পরতেন তবে তা হতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। নিয়মিত গোসল করতেন, সুগন্ধি লাগাতেন এবং সবসময় বলতেন, জামাতের প্রতিনিধিকে জামাতের সম্মান বজায় রাখা উচিত এবং বাহ্যিক বেশভূষাও ঠিক রাখা উচিত। জীবন উৎসর্গ করার পর অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু কখনো কারো সামনে হাত পাতেন নি। ইশারা ইঙ্গিতেও তিনি কখনো নিজের দারিদ্র ও অভাবঅনটনের কথা প্রকাশ করেন নি। বরং ডা: সুলতান মুবাশ্বের লেখেন,

একবার আমার মা বললেন, “অমুক আলেম! তার সম্পদশালী বন্ধুর কাছ থেকে নিয়মিত ভাতা পান, আপনিও যদি চেষ্টা করেন তা পাওয়া সম্ভব আর এর মাধ্যমে (আর্থিক) অবস্থারও উন্নতি হতে পারে”। তিনি বলেন, “আমি এমন নির্লজ্জ কাজ করতে পারব না। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে হাত পাতা আমি সঙ্গতই মনে করি না”।

একবার কয়েকজন মুরব্বী তাঁর কাছে এসে বললেন,

“আপনি এই কাগজে স্বাক্ষর দিন, তাতে লেখা ছিল ‘তাহরীকে জাদীদের মোবাল্লেগরা বেশি ভাতা পায় কিন্তু সদর অঞ্জুমানে আহ্‌মদীয়ার মোবাল্লেগরা কম পায়’; তাই এটি পুনঃবিবেচনা করা উচিত”।

(তিনি বলেন,) “আমি স্বাক্ষর করবো না, কারণ আমি একজন ওয়াকেফে যিন্দেগী। জামাত আমাকে যা-ই দিবে আমি তা কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করব। আমরা জামাতের প্রতি কৃতজ্ঞ যে, জামাত আমাদের কাছে কিছু চায় না বরং কিছু না কিছু দিয়ে থাকে”।

তিনি তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনো খলীফাকেও লিখতেন না, কখনো কোন অভিযোগ করেন নি। একবার কোন প্রয়োজনে খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) বলেন, মৌলভী সাহেবকে ডেকে আন। লাইব্রেরীতে, অফিসে এবং ঘরে সর্বত্র তাঁকে খোঁজা হল, কোথাও পাওয়া গেল না। যখন তিনি আসরের নামাযে আসেন তখন খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) বলেন, “আপনাকে খুঁজছিলাম কোথায় ছিলেন?” তিনি বলেন, “আমি লাইব্রেরীতে ছিলাম। যা ঘটেছে তাহলো, লাইব্রেরীর কর্মচারী বাইরে তালা লাগিয়ে চলে গিয়েছিল। আমার ভেতরে যাবার প্রয়োজন ছিল, সময় নষ্ট না করে আমি দেয়াল টপকে ভেতরে গিয়ে সেখানে বসে কাজ করছিলাম”। এখানেও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন, আর যথাযথভাবে কর্মীর ভুলের দিকেও ইঙ্গিত করেন।

আমি পূর্বেও বলেছি তিনি কারাগারে ছিলেন। সেখানে পরিশ্রমের কাজ করানো হতো, কিন্তু কখনো বলেননি যে, কারাগারে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং আমি খুব চিন্তিত। ছাড়া পাওয়ার পর বলেছেন, “আমার দ্বারা কষ্টসাধ্য কাজ করানো হতো”। সব কাজ স্বহস্তে করে অভ্যস্ত ছিলেন। নিজেই বই বাঁধাই করতেন। ঘরে ব্যক্তিগত লাইব্রেরী রাখার উদ্দেশ্য ছিল, আমি পূর্বেও বলেছি তিনি ঘরে লাইব্রেরী রেখে ছিলেন, রাতে খলীফায়ে ওয়াক্তের পক্ষ থেকে যদি কোন নির্দেশ আসে, কোন উদ্ধৃতি দেখার যদি প্রয়োজন পড়ে তবে স্বল্পতম সময়ে যেন তা সরবরাহ করা যায়, লাইব্রেরী খোলার অপেক্ষায় যেন থাকতে না হয়।

প্রথম দিকে সাইকেল ছিল না। সর্বত্র পায়ে হেঁটে যেতেন। একথা শুনে আমার মনে পড়ল যে, যখন টি.আই কলেজের সামনে হর্স রেইস ময়দানে (ঘোড়া দৌড়ানোর মাঠে) খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়ার ইজতেমা হতো, যা আঞ্জুমানের কোয়ার্টার থেকে বেশ দূরে অবস্থিত ছিল - তিনি পায়ে হেঁটে সেখানে যেতেন। যদিও তখন তিনি খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়াতেই ছিলেন তথাপি গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতেন, কোট পরতেন, হাতে লাঠি রাখতেন। সাইকেল ক্রয় করার সামর্থ ছিল না, আর তখন জামাতের অবস্থাও ভাল ছিল না। মোবাল্লেগদের, ওয়াকেফে যিন্দেগীদের ভাতা ছিল যৎসামান্য। তাঁর ছেলে আমাকে লিখেছে, আসলে তাঁর সাইকেল কেনার মত সামর্থ ছিল না। সমস্ত রাবওয়াতে যেখানেই যেতেন পায়ে হেঁটে যেতেন। ১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে তিনি অফিসের পক্ষ থেকে সাইকেল পান।

যখনই খলীফাদের মজলিসে ইরফানে (জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বৈঠকে - অনুবাদক) বসতেন সর্বদা মাথা নত করে বসে থাকতেন। তিনি বলতেন, খলীফাতুল মসীহ্ আউয়ালের (রা.) অভ্যাস ছিল, মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সামনে তিনি নতশিরে বসতেন। তাঁর ছেলে লিখেছে:

একবার মৌলভী সাহেব আনন্দিত অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন, আমরা আনন্দের হেতু জিজ্ঞেস করলাম? তিনি বললেন, খলীফাতুল মসীহ্ সালেসের সাথে সাক্ষাতের জন্য গিয়েছিলাম, কোন কাজে অল্প সময়ের জন্য হুযূর (রাহে.) ভেতরে গেলে তাঁর জুতা বাইরে পড়ে ছিল, আর আমি আমার রুমাল দ্বারা তা পরিষ্কার করার সূযোগ পেয়েছি। এজন্য খুব খুশি লাগছে।

কোন একবন্ধু যথার্থই লিখেছেন, “পৃথিবীতে যে কাজের জন্য প্রতিষ্ঠান কাজ করে, এ ব্যক্তি একাই তা করেছেন”। ১৯৮২ এর পূর্বে তার সাথে স্থায়ী কোন মুরব্বীও ছিল না। ইতিহাস লেখার সাথে সম্পর্কযুক্ত বেশীরভাগ কাজ তিনি একাই করতেন, (যেমন) উদ্ধৃতি খোঁজা, লেখা ও নোট্স তৈরি করা। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে অতি সাফল্যের সাথে তিনি ইতিহাস লিখেছেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা বলেছেন, মাসের পর মাস আমরা জানতেও পারতাম না আমাদের আব্বা কখন ঘরে আসতেন আর কখন ঘর থেকে চলে যেতেন। যখন তিনি সকাল সকাল উঠে চলে যেতেন তখন আমরা ঘুমিয়ে থাকতাম আর যখন ঘরে ফেরত আসতেন তখনও আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। জাগতিক কারণে মানুষ এমনটি অনেক সময় করেই থাকে কিন্তু এরপরও তারা সপ্তাহান্তে ছুটিতে সন্তানদের সাথে সময় কাটায়।

ওয়াকেফে যিন্দেগী এবং মোবাল্লেগদের জন্য এটি নি:সন্দেহে একটি ঐতিহাসিক উপদেশ। তিনি বলেন,

১৯৬৫ সালে খিলাফতে সালেসার ঐতিহাসিক যুগের প্রথম জুমুআর দিন, হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে:) মৌলভী সাহেবকে ডেকে বলেন, “জুমুআর দিন ছুটি হয় (সেদিন জুমুআর দিন ছিল - অনুবাদক) কিন্তু আমি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি”। আমি বললাম, “এটা তো বড় আনন্দের কথা”। এরপর খলীফাতুল মসীহ্ সালেস বললেন, “আপনাকে ডাকার কারণ হল, আমি যখন ওয়াকেফে যিন্দেগীর ফরম পূরণ করে মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর সামনে রাখলাম তিনি বললেন, আজ তুমি আমার হৃদয়ের সুপ্ত আকাঙ্খা পূর্ণ করেছো। আমার বলার পূর্বেই তুমি স্বত:স্ফূর্তভাবে তাহরীকে জাদীদের মুজাহিদদের সাথে যোগ দেবে, এই ছিল আমার বাসনা। আজ আমার আনন্দের সীমা নেই; কিন্তু স্মরণ রেখ! এখন তুমি তোমার জীবন উৎসর্গ করেছ, মৃত্যুর পূর্বে তোমার আর কোন ছুটি নেই”। মওলানা সাহেব বলেন, “আমি নিবেদন করলাম হুযূর আমিও এ অঙ্গীকার করছি। একজন ওয়াকেফে যিন্দেগী হিসেবে দিন-রাত ধর্মের সেবায় রত থাকব”।

আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ অঙ্গীকার পালন করেছেন।

হাসপাতালে থাকাকালিন মারাত্মকভাবে অসুস্থ্য ছিলেন, যতক্ষণ তাঁর জ্ঞান ছিল (শেষ তিন-চার দিন তিনি অজ্ঞান ছিলেন) দুর্বলতা একটু কমলেই অস্থির হয়ে বলতেন,

“আমাকে হাসপাতাল থেকে দ্রুত নিয়ে যাও, আমাকে অফিসে যেতে হবে কেননা খলীফাতুল মসীহ্ আমাকে কিছু কাজ দিয়ে রেখেছেন যা দ্রুত শেষ করতে হবে”।

মোটকথা, শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত তিনি সেই অঙ্গীকার পালন করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর পদমর্যাদা উন্নীত করুন এবং তাঁর সন্তানদেরকেও এ পুণ্যকর্ম অব্যাহত রাখার তৌফিক দিন। তার ছেলে ডাক্তার সুলতান মুবাশ্বেরও ওয়াকেফে যিন্দেগী। আল্লাহ্ তা’লা তাকেও প্রকৃত অর্থে ওয়াক্‌ফের চেতনায় সমৃদ্ধ জীবন যাপনের তৌফিক দান করুন।

জুমুআর নামাযের পর আমি তাঁর গায়েবানা জানাযার নামায পড়াব। এর সাথে আরও দু’টি জানাযা আছে, একটি হল মৌলভী সাহেবের ছোট ভাই-এর। তিনি তাঁর চেয়ে সাত বছরের ছোট ছিলেন। মৌলভী সাহেবের মৃত্যুর এক ঘন্টা পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি একজন মুসী এবং নি:সন্তান ছিলেন। তাকে বেহেশতি মাকবেরাতে দাফন করা হয়েছে। যখনই আর্থিক কুরবানীর সুযোগ এসেছে তিনি তাতে বেশি বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ নিতেন। মৃত্যুর পূর্বেও তিনি তার পরিবারের মধ্যে মরিয়ম ফান্ডের জন্য দুই লাখ রুপী দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়াও তার আত্মীয়স্বজনদের মধ্য থেকে দু’জন মেয়ের বিয়ে ও বিধবাদের জন্য দুই লাখ রুপী দিয়েছেন। এই অর্থে তিনিও পুণ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ত্যাগের মনমানসিকতা রাখতেন। মৌলভী সাহেবের ভাই এর নাম মোহাম্মদ আসলাম সাহেব।

অনুরূপভাবে আরেকটি জানাযা হচ্ছে নাসিম বেগম সাহেবার। তিনি উত্তর সারগোধার ৪৬নং চকের অধিবাসী বশির আহমদ সাহেবের স্ত্রী ছিলেন। ইনিও ১৭ আগস্ট মৃত্যু বরণ করেছেন। বর্তমানে তানজানিয়ার মোবাল্লেগ মোহাম্মদ আরেফ বশির সাহেবের মাতা ছিলেন। তিনি কর্মক্ষেত্রে ছিলেন বলে মায়ের জানাযাতে অংশ নিতে পারেন নি। তিনি বলেন, আমি যখন জামেয়াতে ভর্তি হলাম, আমার মা আমাকে পাঞ্জাবীতে নসিহত করেছিলেন, যার উর্দু হল ‘হে আমার ছেলে! এখন তোমার কাজ পড়াশুনা করে ধর্মের সেবা করা।’ মরহুমা মুসীয়া ছিলেন এবং বেহেশতি মাকবেরায় সমাহিত হয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাদের সবার পদমর্যাদা উন্নীত করুন; সন্তান সম্পর্কে যেসব নেক ইচ্ছে ছিল, আল্লাহ্ তা’লা তাও পুর্ণ করুন। (আমীন)

(জামেয়া আহ্‌মদীয়া বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্কের যৌথ উদ্যোগে অনুদিত)

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে