In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

যুক্তরাজ্যের ৪৩তম সালানা জলসা সাফল্যজনকভাবে সমাপন উপলক্ষ্যে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৩১শে জুলাই, ২০০৯ইং

যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহ্ তা’লার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারে না।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

গত রবিবার আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় যুক্তরাজ্যের সালানা জলসা স্থানীয় অংশগ্রহণকারী বরং পৃথিবীর সর্বত্র যেখানেই আহ্‌মদীরা এম.টি.এ-র মাধ্যমে এ জলসায় অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে এর সমস্ত কল্যাণে পরিতৃপ্ত করে সমাপ্ত হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আল্লাহ্ তা’লার যতই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিনা কেন তা যথেষ্ট হবে না কেননা আল্লাহ্ তা’লা সমগ্র বিশ্বে বিস্তৃত আহ্‌মদীদেরকে এক জাতিসত্ত্বায় পরিণত করেছেন। এটিই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবের উদ্দেশ্য ও অন্যতম কাজ। যদি আজ মুসলমানরা এ বিষয়টি অনুধাবন করে এবং জামাতে আহ্‌মদীয়ার প্রতি আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহরাজি প্রত্যক্ষ করে মুহাম্মদী মসীহ্‌র হাতে বয়’আত করে তাহলে তারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রকৃত দাসে পরিণত হবে। মুসলমানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত প্রতিটি শত্রুতামূলক দৃষ্টি এবং দুরভিসন্ধিমূলকভাবে প্রসারিত প্রতিটি হাত নিরাপত্তার এই দুর্গের সাথে সংর্ঘষে লিপ্ত হয়ে শুধু ব্যর্থই হবে না বরং খোদা তা’লার শাস্তিরও শিকার হবে। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আমরা একশত বিশ বছর বরং এরও অধিক সময় ধরে এ দৃশ্য দেখে আসছি। এটি যদি কোন মানবসৃষ্ট জামাত হতো তবে তা সে সব শত্রু ও বিরোধিদের আক্রমণে কবেই ধ্বংস হয়ে যেতো যাদের হাতে সমস্ত জাগতিক ক্ষমতা রয়েছে!

যাহোক আমি চলমান বছরে এবং জলসার সময় বর্ষিত ঐশী করুণাবারির বিবরণ জলসার একটি বক্তৃতায় দিয়ে থাকি। ঐশী কৃপার যেসব ঘটনাবলী ঘটে তার কয়েকটি মাত্র বর্ণনা করা হয় বা সেগুলো হতে কয়েকটি বেছে নেয়া হয় কিন্তু বলার সময় হয়তো তার শতকরা দশ ভাগও বলা সম্ভব হয় না। যাহোক, বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ্ তা’লার যেসব কৃপা বর্ষিত হয় তা সময়-সুযোগমত জামাতের সামনে লিখিত আকারে আসতে থাকবে। ঐতিহ্যগতভাবে এখন আমি জলসার বরাতে কথা বলব, আর তার মধ্যে থাকবে রীতি অনুসারে ঐশী কৃপারাজির উল্লেখ ও খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা। যেভাবে আমি বলেছি, আমরা আল্লাহ্ তা’লার কৃতজ্ঞতা যতই জ্ঞাপন করি না কেন তা যথেষ্ট হবে না। আমরা কেবল সে বিষয়গুলোরই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারি যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ধরা পড়ে এবং যা আমরা বুঝতে পারি। অধিকাংশ মানুষই তা অনুধাবন করতে পারে। জলসার দিনগুলোতে আল্লাহ্ তা’লার অগণিত এমন কৃপাবারি বর্ষিত হয় যেগুলো আমরা জানি না বা অধিকাংশ মানুষ তা অনুধাবন করে না।

আল্লাহ্ তা’লা সূরা আন্ নাহ্ল এর এক আয়াতে বলেন,

وَاِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللّٰهِ لَا تُحْصُوْهَاؕ اِنَّ اللّٰهَ لَـغَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ‏

অর্থাৎ, তোমরা যদি আল্লাহ্ তা’লার নিয়ামতসমূহ গণনার চেষ্টা কর তবে তোমরা তা আয়ত্ত্ব করতে পারবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’লা অতীব ক্ষমাশীল ও বার বার কৃপাকারী।

(সূরা আন্ নাহ্ল: ১৯)

অতএব, এ বিষয়টি আল্লাহ্ তা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত যেন আমাদের জিহ্বা সর্বদা আল্লাহ্ তা’লার কৃতজ্ঞতায় রত থাকে। আল্লাহ্ তা’লার যেসব আশিস দৃশ্যমান তার জন্যও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এবং যা দৃশ্যমান নয় তারও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

জলসার প্রথম দিন আল্লাহ্ তা’লা বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন, তাও আমাদের উপকারের জন্যই আর আমাদের উপর কৃপাবশতই বৃষ্টি বন্ধ করেছেন। এমন সব অনিষ্ট হতে আমাদের রক্ষা করেছেন যা আমাদের জানাই ছিলনা। এছাড়া বর্তমানে এসব দেশে বরং বলা উচিত সারা বিশ্বে সোয়াইন ফ্লু (Swine flu) নামক এক ধরণের ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়েছে; বড় দু:চিন্তা ছিল এবং এই ভেবে চিন্তিত ছিলাম যে, জলসা উপলক্ষে বিভিন্ন স্থান হতে জনসমাগম ঘটবে, জানা নেই যে, কে কোন ধরনের জীবাণু বহন করছে। সাধারণ অবস্থায় যখন মহামারী বা ভয়াবহ রোগ থাকে না তখনও এক জন হতে অন্যের দেহে রোগ-ব্যাধির সংক্রমণ ঘটে থাকে। যেহেতু ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে তাই ধারণা ছিল যে, জলসার দিনগুলোতে কিছু সংখ্যক লোক অবশ্যই সংক্রমিত হবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা অনুগ্রহ করেছেন, আমার জানা মতে তিন-চারজন ব্যতীত অন্য কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়নি। আল্লাহ্ তা’লার কৃপারাজির ভেতর এটিও একটি বড় কৃপা।

তাই সর্বপ্রথম আমরা আল্লাহ্ তা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এবং আল্লাহ্ তা’লার সমীপে পূর্বের চেয়ে অধিক বিনত হয়ে তাঁর আশিস প্রার্থনা করছি যেন তাঁর কৃপাবারি আমাদের জন্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

فَاِنَّ اللّٰهَ شَاكِرٌ عَلِيْمٌ‏

অর্থাৎ, সুতরাং নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’লা অতীব গুণগ্রাহী ও সর্বজ্ঞানী।

(সূরা আল্ বাকারা: ১৫৯)

আল্লাহ্ তা’লা সম্পর্কে যখন شَاكِرٌ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তখন এর অর্থ হয় আল্লাহ্ তা’লা মূল্য দিয়ে থাকেন বা মূল্যায়ন করেন। আমরা যদি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকি তবে আল্লাহ্ তা’লা একে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন,

لَٮِٕنْ شَكَرْتُمْ لَاَزِيْدَنَّـكُمْ‌

তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও তবে আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দিব।

(সূরা ইব্রাহীম: ৮)

অতএব, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন তখনই হবে যখন আমরা অবিচলতার সাথে আল্লাহ্ তা’লার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী বান্দা হবো। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, তিনি شَاكِرٌ عَلِيمٌ অর্থাৎ তিনি গুণগ্রাহী আর সর্বজ্ঞানীও। তিনি জানেন, কে প্রকৃত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে, কেননা তাঁকে ধোকা দেয়া যায় না। কাজেই আমাদের সবাইকে প্রকৃত অর্থে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত এবং কৃতজ্ঞ হবার চেষ্টা করা উচিত।

সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার পর আমি নারী ও পুরুষ কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই এবং সকল অংশগ্রহণকারী বরং পৃথিবীর যে কোন স্থানে বসে যারা জলসার কার্যক্রম শুনছিলেন তাদেরও এসব নারী ও পুরুষ কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কেননা এই স্বেচ্ছাসেবকদের একটা শ্রেণী এমন রয়েছে যারা গোটা পৃথিবীতে জলসার সকল কার্যক্রম দেখানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেহেতু মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার আদেশ রয়েছে আর এই কৃতজ্ঞতাই আল্লাহ্ তা’লার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী বানায়। একটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন,

‘ওয়া মাল্ লাম ইয়াশকুরিন্নাসা লাম ইয়াশকুরিল্লাহা’

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহ্ তা’লার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারে না।

এবার অধিকাংশ সাক্ষাতকারী আমায় বলেছেন, আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের ব্যবস্থা ছিল অনেক উন্নত। নারী-পুরুষ সব কর্মীই গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চার ও উত্তম আচরণ প্রদর্শনকারী ছিলেন। প্রত্যেক বিভাগ নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন ও আতিথেয়তার জন্য সর্বশক্তি নিয়োজিত করার চেষ্টা করেছে, তাই অতিথিদেরও অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। আমি জলসাগাহে যাওয়া আসার পথে অনেক যুবক এবং ছেলেদের চেহারা দেখতাম, পরিস্কার বুঝা যেত ঘুমের ঘাটতি ও চরম ক্লান্তি রয়েছে তবুও পরম একাগ্রতার সাথে নিজেদের কাজ করে চলেছেন। বরং জলসার দিনগুলোতেই আমি জানতে পারলাম যে, কোন এক বিভাগে একজন নাযেম ও এক নাযেমা যারা ভাই-বোন ছিলেন, বিশ্রাম না নেয়ার কারণে এবং বিরামহীনভাবে দায়িত্ব পালন করার ফলে, অধিকন্তু তারা সকালে নাস্তাও করেন নি, খাবার খান নি অথবা রাতে কম খেয়েছেন; যাহোক এসব কারণে তারা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। মনে হয়, এই ভাই-বোনের জুটি সংকল্প নিয়ে এসেছিলেন যে, আমরা সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত পরিশ্রম করবো যেন সেবার একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়। কিন্তু এটি ভুল কাজ। এরূপ পরিশ্রমের কারণে তারা সংজ্ঞা হারিয়েছে এবং ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী সেবা থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হয়, ফলে শেষ দিন তারা ডিউটি দিতে পারে নি। কাজেই এ দৃষ্টিকোন থেকেও নিজের প্রতি খেয়াল রাখা কর্তব্য আর প্রশাসন অর্থাৎ যারা তাদের নাযেমীন বা কর্মকর্তা তাদেরও দৃষ্টি রাখা উচিত। বিশ্রামের জন্য কিছু সময়-সুযোগ দিবেন আর তাদের খাবার-দাবারের প্রতিও যত্নবান থাকবেন।

জলসার এ দিনগুলিতে এমন নি:স্বার্থ সেবার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যা আমরা দেখতে পাই। আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে বিস্ময়কর হৃদয়ের অধিকারী অনেক লোক দান করেছেন। ডিউটি প্রদানকারীদের মধ্যে এশিয়ান এবং এখানকার স্থানীয় ইংরেজরাও ছিল, এখানে বসবাসকারী আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লোকজনও ছিল। মোটকথা জলসার শ্রোতারা যেভাবে বহু জাতিগোষ্ঠির সাথে সম্পর্ক রাখতেন, সেভাবেই যারা দায়িত্ব পালন করেন তারাও বহু জাতিভূক্ত ছিলেন। অতএব, এই হল হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের উপর আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপা। বাচ্চাদের কথাই ধরা যাক, পানি পান করানো, খাবার খাওয়ানো অথবা অন্য যে কাজের দায়িত্বই তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল তারা তা খুব সুন্দরভাবে পালন করেছে। বড়রাও সূচারুরূপে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। যুবক-যুবতী, মহিলা এক কথায় সকলেই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব অতি উত্তমরূপে পালন করেছেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বছর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (Health and Safety)-র প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে। এজন্য একটি নতুন বিভাগও খোলা হয়েছে। এই বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত সরকারী প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন সময় এই বিভাগের কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য আসেন। Inspection এর জন্য আসেন। কেননা স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা জলসা সালানার সকল বিভাগের সাথেই সম্পর্ক রাখে আর জলসাগাহের সাথেও সম্পর্কযুক্ত। অতিথিদের সাথেও সম্পর্ক রাখে আর কর্মীদের সাথেও; তাই চিন্তা ছিল, কোথাও কোন ঘাটতি দেখা গেলে তারা অজুহাত পেয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় ব্যবস্থা সর্বত্রই তাদের নির্ধারিত মান অনুযায়ী ছিল।

প্রথম দিন আমি খুতবায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। অতিথিদের মধ্য হতে আমি অনেকের চিঠি পেয়েছি। (তারা লিখেছেন - অনুবাদক) আপনি খুতবায়, দরজার সামনে পাপোশ রাখার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, যাতে বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট ময়লা ও কাঁদা ইত্যাদি যেন ভেতরে যেতে না পারে। জুমুআর পরে যখন আমি গোসলখানায় যাই তখন তা সেখানে বিছানো ছিল। সুতরাং কর্মীরা যেখানে গোসলখানা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি দৃষ্টি রেখেছে, সেখানে অতিথিরাও আমার কথামত কাজ করেছেন এবং অধিকাংশ মানুষ গোসলখানা ব্যবহারের পর তা পরিস্কার করার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।

যুগ খলীফার আহ্বানে আহ্‌মদীদের আনুগত্য প্রদর্শন এবং তাৎক্ষণিকভাবে আমল করার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়াও একটি বিশেষ ঐশী কৃপা।

যেভাবে আমি বলেছিলাম, মহামারীরূপী সোয়াইন ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে; সাবধানতা স্বরূপ হোমিও ঔষধ সেবনের জন্য বলেছিলাম। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় এর উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করা হয়েছে। হোমিওপ্যাথি বিভাগের স্বেচ্ছাসেবীরা তা সবাইকে সরবরাহ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। প্রতি দিন পনের থেকে বিশ কেজি ঔষধ ব্যবহার করা হয়েছে। এত অধিক পরিমানে ঔষধ মিশানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারা সঠিকভাবে ঔষধ বানিয়ে বিতরণ করেছেন না-কি শুধু মিষ্টি বড়ি খাওয়ান হয়েছে তা আমি জানি না, কেননা বড়ির সাথে তরল ঔষধ মিশিয়ে এটা তৈরী করতে হয়। যাহোক, আল্লাহ্ তা’লার ফযলে এই মিষ্টি বড়িতেও আল্লাহ্ তা’লা আরওগ্য নিহিত রেখেছেন। অতএব, এটাও আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপা।

লাজনাদের পক্ষ থেকে একবার রিপোর্ট পেয়েছি যে, একজন মহিলা এই ঔষধ খেতে অস্বীকার করেন, সম্ভবত তিনি আমার খুতবা এবং নির্দেশ শুনেন নি বলে অস্বীকার করেছেন। তখন কর্তব্যরত মহিলা বললেন, ঠিক আছে আপনি যদি যুগ খলীফার কথা না মানেন তাহলে এর দায়-দায়িত্ব আপনাকেই বহন করতে হবে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাত বাড়িয়ে বললেন, আমাকে ঔষধ দাও। অতএব, আনুগত্যের এমন দৃষ্টান্ত আহ্‌মদীদের ভেতর দেখা যায়। এসব আল্লাহ্ তা’লার ছোট-ছোট নিয়ামত যা বাহ্যত ছোট মনে হলেও এমন অনুগ্রহরাজি এত বেশী যে, আমরা গণনা করে শেষ করতে পারবো না।

এ বছর মহিলারা খুব ভালভাবে জলসা শুনেছেন বলে মহিলাদের তাবু থেকে রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। কর্মীদের খুব কম সময়ই ‘নিরবতা পালন করুন’ লেখা বোর্ড দেখাতে হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা থেকে আগত একজন মহিলা আমাকে বলেছেন, মহিলারা নিরব ছিলেন না, যার ফলে ভালভাবে জলসা শোনা যায় নি। কোন ক্ষেত্রে হয়ত অল্প সময়ের জন্য তা হয়ে থাকবে কিন্তু মোটের উপর রিপোর্ট হল, নিরবতার সাথেই জলসা শোনা হয়েছে। আমি কতক মানুষকে দেখেছি ভাল গুণাবলী সন্ধান না করে দোষ খুঁজে বের করাই তাদের অভ্যাস। এই মহিলাটিও হয়তো তাদেরই একজন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা যেহেতু আমাকে নিশ্চিন্ত করাতে চেয়েছেন, তাই ঘটনাক্রমে এর পরপরই জলসায় যোগদানকারিনী আমেরিকার একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য আসলো যে প্রথমবারের মত জলসায় যোগদান করেছে। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“প্রথমবার এসেছ! জলসা কেমন লাগল? শুনেছি লাজনাদের তাবুতে অনেক হট্টগোল হয়েছে”।

সে তাৎক্ষণিক উত্তর দিল,

“একেবারেই না। আমি বিভিন্ন জায়গায় বসে জলসা শুনেছি, সকল মহিলা ও মেয়েরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে জলসা শুনেছে আর বিশেষভাবে আমার (হুযুর আকদাসের – অনুবাদক) বক্তৃতা চলাকালে নিরবতা বিরাজ করছিল। (হট্রগোলের - অনুবাদক) প্রশ্নই উঠে না বরং আমিতো এত প্রভাবিত হয়েছি, যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়”।

অতএব, যে আপত্তি আমেরিকা থেকে এসেছে তার খন্ডনও আমেরিকা থেকেই আসলো। যাহোক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বদা একথা স্মরণ রাখবেন, জলসা শোনার মাঝেই জলসার প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

আমি বলছিনা যে, জলসার ব্যবস্থাপনার মাঝে যেসব দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, বরং এর উল্লেখের প্রয়োজন আছে আর করা আবশ্যক, যাতে ভবিষ্যতে এসবের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায়। কিন্তু যেসব দুর্বলতা দেখা যায় এতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমি দেখেছি ত্রুটি অতিথিদেরই হয়ে থাকে। সামনে জার্মানীর জলসা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এতেও অনেকটা লন্ডন জলসার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও জলসা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আমি যখন নির্দেশনা দেই তখন বিশ্বের অন্যান্য জামাতকেও তদনুসারে কাজ করার চেষ্টা করা উচিত।

এরই মাঝে আমি একটি রিপোর্ট পেয়েছি; মানুষ যখন জলসা শোনার জন্য গিয়েছিল তখন ইসলামাবাদের কতক তাবু হতে তাদের বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। তাবুতে অবস্থানকারী অতিথিদেরই এ বিষয়ে সজাগ থাকা উচিত ছিল অর্থাৎ তাদের কোন মূল্যবান জিনিসপত্র ছেড়ে গিয়ে ব্যবস্থাপকদের বা নিজেদের পরীক্ষায় ফেলা উচিত হয়নি। মূল্যবান জিনিসপত্র আমানত দপ্তরে রাখার পুন:পুন: ঘোষণা সত্ত্বেও যেসব অতিথি নিজেদের মূল্যবান জিনিস তাবুতে রেখে গেছেন এটা তাদেরই ভুল। খোলা স্থানে জিনিস রেখে যাওয়া এমনিতেই উদাসীনতা। পরিবেশ ভাল হলেও সব জায়গায় কিছু মন্দ লোকও এসে যায় এবং এসে থাকে। যেখানে তাবু খোলা স্থানে এবং এর ভেতর ঢোকাও সহজ, সেখানে যদি কোন জিনিস অরক্ষিত পড়ে থাকে তবে এটা (চোরকে - অনুবাদক) দাওয়াত দেওয়ারই নামান্তর। আর আমি মনে করি অসাবধানভাবে নিজেদের বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস ফেলে যাওয়া শুধু উদাসীনতাই নয় বরং নিবুর্দ্ধিতাও বটে। হয় সাথে করে নিয়ে যাওয়া উচিত, নতুবা যেভাবে আমি বলেছি, অফিসের দায়িত্বরত কর্মীদের কাছে এগুলো জমা দিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তবে ব্যবস্থাপকদেরও নিজেদের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা উচিত। সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে বার বার ঘোষণা দেয়া অফিসার জলসা সালানার কাজ। তাঁবু এবং যেখানে তাঁবু খাটিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয় বা টেন্ট লাগানো হয়, সে স্থানটিকে পুরোপুরিভাবে বেষ্টনীর আওতায় এনে একটি বা দু’টি গেট রেখে তাতে পাহারার ব্যবস্থা করা উচিত। জার্মানীতেও এভাবে তাঁবু খাটানো হয়, তাই সেখানেও এর প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত। তাদের জলসাও সন্নিকটে। আমি পূর্বেই বলেছি, একে অন্যের থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। জলসাগাহের নিরাপত্তা ছাড়াও গেটেও পাহারার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যাহোক, এটি একটি বড় অভিযোগ ছিল যার উল্লেখ করা প্রয়োজন; কেননা অন্যান্য স্থানেও এরূপ হতে পারে।

মোটের উপর নিরাপত্তা ও যান চলাচল ইত্যাদির ব্যবস্থা আল্লাহ্ তা’লার ফযলে খুবই ভাল ছিল। বর্তমানে বিশ্বের যে অবস্থা তাতে প্রত্যেক দেশে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত। গত বছর বরং দুই বছর পূর্বে পুলিশের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ উঠেছিল তা গত বছর থেকে দূর হতে শুরু করেছে। কিন্তু এ বছর পুলিশ ইন্সপেক্টর লিখিত দিয়েছেন এবং বলেছেন, আপনারা চাইলে পত্রিকায় ছাপিয়ে দিতে পারেন যে, ট্রাফিকের নিয়ম-শৃংখলা সর্বতোভাবে মেনে চলা হয়েছে এবং সর্বোত্তম নিয়মানুবর্তীতার পরিচয় দেয়া হয়েছে যা আমরা অন্য কোথাও দেখতে পাই না।

একজন অ-আহ্‌মদী অতিথি বলেছেন, যদিও মূল রাস্তায় (জলসাস্থলের গেটের বাইরে - অনুবাদক) পুলিশ দাঁড়িয়েছিল, তারা জলসাস্থলের ভেতরে আসেনি, হাদীকাতুল মাহদীর ভেতরে, কিন্তু বাইরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু এরও কোন প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, যদিও এমন জনসমাবেশে বিপুল সংখ্যক পুলিশের প্রয়োজন পড়ে, তবুও তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

অল্টনের মেয়রও একথাই বলেছেন,

(তিনি বলেন - অনুবাদক) আমার সব সংশয় দূর হয়ে গেছে। এখন আমি মন খুলে বলছি, আপনাদের পক্ষ থেকে বিপদের কোন আশঙ্কা নেই। আমার প্রাথমিক ধারণা ছিল আপনারাও হয়ত অন্যান্য ইসলামী সংগঠনগুলোর মত একটি।

মোটকথা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, কর্মীরা যেখানে আল্লাহ্ তা’লার ফযলে পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছে সেখানে অতিথিরাও সহযোগিতা করেছেন। বিশেষভাবে যাতায়াত ব্যবস্থাকে নিন; এ বছর ট্রেনের পর্যাপ্ত ব্যবহার হয়েছে এবং এটা পছন্দ করা হয়েছে এবং সবাই প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকারও করেছে। প্রায় সবাই বলেছে, জলসাগাহে পৌঁছতে আমরা খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি। নিজের গাড়িতে করে জলসাগাহে আসার জন্য যে মানসিক চাপ ও অস্থিরতা থাকে, তা থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছি। যানজট ইত্যাদির কবল থেকেও রক্ষা পেয়েছি।

একটি বিষয় যা এ বছর অতিথিরা আমার কাছে প্রকাশ করেছেন এবং তা খুবই ভাল বিষয় অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের আমীর সাহেব ও জলসার ব্যবস্থাপকগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। তারা বলেন, আমীর সাহেব ও ব্যবস্থাপকগণ আমাদের আবাসস্থলে এসে বার বার আমাদের প্রয়োজনাদির বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন, এটিই আদর্শ, যা সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকা প্রয়োজন এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যবস্থাপকদের তা প্রদর্শন করা উচিত।

বহির্বিশ্বের আহ্‌মদী বা অসুস্থ ও অপারগ আহ্‌মদী যারা জলসায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি তাদের পক্ষ থেকেও এম.টি.এ-র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য অগণিত চিঠি ও ফ্যাক্স আসছে, যারা আমাদের জন্য জলসার যাবতীয় অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বয়’আত দেখা, শোনা ও এতে অংশ নেয়া সম্ভব করেছেন। আরবদের পক্ষ থেকেও অগণিত বার্তা আসে যে,

অহোরাত্র জলসার অনুষ্ঠান সম্প্রচার আমাদের ঈমানকে এক বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক সজীবতা প্রদান করেছে।

সমগ্র বিশ্ব এম.টি.এ-র সকল পুরুষ ও মহিলা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। যাহোক, যারা যে ভাবেই জলসার অতিথিদের সেবা করেছেন আমিও আমার পক্ষ থেকে এমন সকল পুরুষ ও মহিলা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আর জলসায় আগত অতিথিদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা কতক ঘাটতি ও দুর্বলতা দেখেও সেগুলোকে উপেক্ষা করেছেন।

একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন:

‘জিব্রাইল আমাকে বলেছে যে, আল্লাহ্ তা’লা কিয়ামত দিবসে তার সৃষ্টিকে উত্থিত করবেন আর তিনি বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমার এক বান্দা তোমার উপর অনুগহ করেছিল, তুমি কি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছ? সে উত্তরে বলবে হে আমার প্রভু! আমি মনে করেছিলাম এটি তোমার পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহ ছিল তাই আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি। একথা শুনে আল্লাহ্ বলবেন, যার হাত দিয়ে আমি তোমার উপর অনুগ্রহ করেছি যেহেতু তুমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করনি, তাই আমার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করনি।’

মু’মিনদের পরস্পরের প্রতি এরূপ আচরণই করা প্রয়োজন। এবং এরূপ আচরণই পরস্পরকে একই সূত্রে গ্রথিত থাকার দৃশ্য উপস্থাপন করে।

এখন আমি এমন কিছু অতিথির অনুভূতি তুলে ধরবো যারা জামাতের সাথে সম্পৃক্ত নয়, কিন্তু আমাদের সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে এ জলসায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। তারা জলসার ব্যবস্থা দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছেন এবং জলসার পরিবেশও তাদের ওপর আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলেছে। একইভাবে অনেক আহ্‌মদী যারা প্রথমবারের মত জলসায় এসেছেন এবং জলসা তাদের জীবনে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে তাদেরও কিছু অনুভূতি তুলে ধরব।

প্রথমত রজার ক্যা��িফ যিনি সুইডেনের কালমার্ক কাউন্টির প্রেসিডেন্ট এবং তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি জলসায় শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেছেন এবং লিখিতও দিয়েছেন। তিনি বলেন,

আমি আমার দলের পক্ষ হতে স্বদেশে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছি এবং আয়োজনও করেছি, আর অনেক জনসভায়ও যোগদান করেছি। কিন্তু বিভিন্ন বর্ণ, গোত্র, ও বিভিন্ন বস্ত্র পরিহিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মাঝে যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা আমি দেখেছি এরূপ দৃশ্য আমি আর কোথাও দেখিনি। বিশেষভাবে দীর্ঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের পর যখন তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেছি তখন কোন ধরনের অবসাদ ও ক্লান্তি অনুভব করিনি কেননা চতুর্দিক থেকে জামাতের সদস্যরা এতো ভালবাসা ও আন্তরিকতার সাথে সাক্ষাৎ করত যে ক্লান্তি অনুভূতই হত না। আফ্রিকা থেকে আগত রাজা-বাদশাহ্ এবং ইউরোপ থেকে আগত বিভিন্ন সাংসদ ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের মিলিত হওয়ার জন্য জামাতে আহ্‌মদীয়া যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে তা সত্যিই অতুলনীয়।

সুইডেনেরই ৭৪-৭৫ বছর বয়ষ্ক আরেকজন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ বলেন,

প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও শৃঙ্খলার যে দৃষ্টান্ত আমি এ তিন দিন জলসাগাহে দেখেছি, তা অতুলনীয়। এক ডাকে সবাই দাঁড়িয়ে যেত আর এক ডাকে সবাই বসে পড়ত। আর এই সবকিছু এক ব্যক্তির প্রতি ভালবাসার কারণে হচ্ছিল। এটা আমার জীবনের প্রথম ও একমাত্র এবং বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা যা আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। আমার চুয়াত্তর বছরের জীবনে আনন্দ ও তৃপ্তির যে বিরল অভিজ্ঞতা এখানে লাভ করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

এরপর কাজাকিস্তানের অধ্যাপক কিঙ্গিস কাযাকমেতুলী সাহেব, তিনি বিশ্ব ইতিহাসের প্রফেসর। তিনি লিখেছেন,

সালানা জলসা উপলক্ষে এই সমাবেশ, আহ্‌মদীয়া জামাতের শিক্ষার সৌন্দর্য এবং এর অনুপম ধ্যান-ধারণা যে সফল তারই সাক্ষ্য বহণ করে। তিনি আরও বলেন, জামাতের ধ্যান-ধারণা অন্য ধর্মকে সম্মান করতে শেখায় এছাড়া একটি শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় জীবনের প্রতি আমন্ত্রণ জানায়। অবশেষে এই দৃষ্টিভঙ্গিই জয়যুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ্। আল্লাহ্ তা’লা আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতকে সকল মহান লক্ষ্যে সাফল্য দান করুন। আমরা এখানে প্রথম বার এসেছি, কল্পনাও করিনি, এমন সম্মান ও মর্যাদার সাথে আমাদের স্বাগত জানানো হবে। এ ক’দিনে আমরা এখানে যা দেখিছি তা আমাদের কাছে আশাতীত।

কাজাকিস্তানেরই আর একজন অধ্যাপক স্যার গেই মানাকোফ সাহেব লিখেছেন,

জামাতে আহ্‌মদীয়ার শিক্ষার সাথে পরিচিত হবার এটাই আমার প্রথম সুযোগ। তবে এটি অনুধাবন করেছি যে, মানবিক সহমর্মিতা, শান্তি ও সম্প্রীতি এবং সব নবী ও ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই হল জামাতে আহ্‌মদীয়ার শিক্ষার ভিত্তি। সত্যের সন্ধান প্রাপ্ত এমন লোকদের মাঝে অবস্থান করাও একটি সম্মানের বিষয় আর বিশ্বময় পৌঁছে দেয়ার জন্য তারা এই সত্যকে সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সালানা জলসায় অংশ গ্রহণ করে এ বিষয়টি প্রতিভাত হয়েছে যে, জামাতে আহ্‌মদীয়ার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ও সম্মানজনক বিষয় হল আল্লাহ্‌র সৃষ্টি ও এর কল্যাণ কামনা করা। এ বিষয়টি বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আগত প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে। জামাতে আহ্‌মদীয়া দরিদ্র ও অভাবীদের সেবার মানসে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানে স্কুল, হাসপাতাল ও লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করছে এবং এগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি দেখেছি যে সদাচরণ জামাতে আহ্‌মদীয়ার একটি সতন্ত্র মর্যাদা রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে জলসা সালানায় অংশগ্রহণ করতে আসা আস্তিক ও নাস্তিকগণ কোন সাধারণ পর্যটক নয় বরং তারা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর শিক্ষার প্রকৃত মর্ম অনুধাবনকারী এবং তা পালনকারী। এ বিষয়ে আমাদের পরিস্কার ধারণা আছে, জলসায় যোগদানকারী হাজার হাজার অতিথির আতিথেয়তা ও তাদের দেখাশুনা করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। আমরা এও জানি যে, এর প্রতিদানে আপনারা সবাই এবং আপনাদের পরিবারবর্গ কেবল আর শুধুমাত্র খোদা তা’লার সন্তুষ্টি ও কৃপার সন্ধানী।

অতএব, আমাদের কর্মীদের এটিই একটি সতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা সর্বদা মনে রাখা উচিত। আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই আমরা অতিথিসেবা করি।

পুনরায় কাজাকিস্তানের একজন মহিলা তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন,

আমাদের সাথে সবার সদাচরণ দেখে এমন মনে হলো যেন আমরা সেই অতিথি যাদের জন্য তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলেন। আমাদের সকল প্রয়োজনের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। এজন্য আমরা হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে নিখিল বিশ্ব জামাতে আহ্‌মদীয়ার জন্য দোয়া করছি যেন আল্লাহ্ তা’লা এ জামাতকে উত্তরোত্তর উন্নতি দান করেন এবং জামাতের সত্য শিক্ষার আলো প্রত্যেক দেশ, শহর, ও মানবাত্মাকে যেন আলোকিত করে তোলে।

বেনিন থেকে এসেছেন ড. জন আলেকজান্ডার। তিনি বেনিনেন রাজনীতি বিষয়ক মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির বিশেষ উপদেষ্টা। আমি যখন সফরে গিয়েছিলাম তখন তিনি আমাকে স্বাগত জানাতে সীমান্তে এসেছিলেন। তখন থেকেই তার বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত রয়েছে এবং বড় বিশ্বস্ততার সাথে তা রক্ষা করছেন, অথচ তিনি একজন খ্রিষ্টান। তিনি লিখেছেন,

আহ্‌মদীয়াতই হল সত্যিকার ইসলাম। পৃথিবীতে কেবল আহ্‌মদীয়াতই ইসলামের ভবিষ্যত হতে পারে। আহ্‌মদীয়াতই ইসলামের এক নতুন চেহারা আমাদের দেখিয়েছে, যা ইতোপূর্বে আমরা অন্য কোন মুসলমানের মধ্যে দেখিনি। আর এটি হল মূলত: ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ব, আন্তরিকতা ও মানব সেবার চেহারা। মহান আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের পরিচায়ক চেহারা, যাতে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার আকর্ষণীয় সমন্বয় ঘটেছে। ভালবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে এই শ্লোগানের বাস্তব নমুনা প্রদর্শন করেছে জামাতে আহ্‌মদীয়া। এটিই একটি ঐশী জামাতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এবং সমগ্র বিশ্বের এত্থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

তিনি বলেন,

সালানা জলসা সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ত্রিশ হাজার মানুষ এতে যোগদান করেন, কিন্তু এটি আমাদের জন্য অবিশ্বাস্য বিষয় ছিল। এখানে এসে আমরা স্বচক্ষে সকল ব্যবস্থাপনা, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ দেখলাম যেখানে একে অপরের সঙ্গে ভালবাসা ও আন্তরিকতার সাথে মিলিত হয় এবং পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।

তিনি আরও বলেন,

দেখে মনে হয় যেন এরা ভিন্ন কোন সৃষ্টি, যাদের জাগতিক স্বার্থপরতা ও বৈষয়িকতার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। এরা মানুষ নয় বরং ফিরিশ্তা, যারা আকাশ থেকে নেমে এসে ধরায় বসবাস করছে। ছোট ছোট বাচ্চারাও এমন প্রশিক্ষণ পেয়েছে যেন মাতৃজঠর থেকেই শিক্ষা নিয়ে এসেছে। হায়! যদি আমাদের দেশ বেনিনেও আমরা এমন হয়ে যেতে পারতাম। সকলেই অত্যন্ত সম্মান ও ভালবাসার সাথে আমাদের সেবাযত্ন করেছেন, যা সারাজীবন আমাদের মনে থাকবে।

আহ্‌মদী মায়েরা তাদের সন্তানদের এমন তরবিয়তই করে থাকেন আর তা সর্বদা চলমান থাকা উচিত, এটিই আহ্‌মদীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তিনি আরও বলেছেন,

আন্তর্জাতিক বয়’আত ও সমাপনী ভাষণ, যা আমার (হুযুর আকদাস – অনুবাদক) ছিল, আমাদের মাঝে আমূল পরিবর্তন এনেছে, অথচ তিনি অদ্যবধি খ্রিষ্টান। আল্লাহ্ চাহে তো, এই ইসলাম আমাদের অদৃষ্ট হোক এবং আমাদের সকলের হেদায়েতের কারণ হোক। আন্তর্জাতিক বয়’আতের পর সবাইকে অঝোরে কান্নাকাটি করে চোখের পানি দিয়ে নিজেদের অন্তরকে পরিস্কার ও ধৌত করতে দেখেছি। সে সময় আকাশ থেকে কোন ঐশী বিষয় অবতীর্ণ হচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছিল, যার আমরাও অংশীদার ছিলাম।

তিনি আরও বলেন,

আমরা দেশে ফিরে যাবার অপেক্ষায় আছি যেন সেখানে গিয়ে অন্যদের বলতে পারি যে, কেবল আহ্‌মদীয়াতের ছায়াতলেই আম���া এমন জীবন যাপন করতে পারি, যা এক দিকে ভয়-ভীতিমুক্ত আর অপরদিকে খোদার নৈকট্য প্রদানকারী।

এরপর বলেন,

যখন কেউ আল্লাহ্‌র পথে কোন সত্য নিয়ে অগ্রসর হয়, তখন বিরোধীরা তার পথে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে। কিন্তু আমি আমার দেশে যথাসাধ্য চেষ্টা করব যাতে সেখানে জামাত কোথাও কোন বাধা বিপত্তির সম্মুখীন না হয়।

এ ছাড়াও তিনি আমার সাথে আরও অনেক কথা বলেন। পরিশেষে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

আপনি মনে করবেন, বেনিনে আপনার একজন সন্তান রয়েছে।

এরপর সিয়েরালিওনের একজন বিচারপতি Abdulai Sheikh Fofanah লিখেছেন:

জলসা খুবই মহতী ছিল এবং চিরদিন পবিত্র স্মৃতি হয়ে আমার অন্তরে বিরাজ করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লোকজন ভাই এর ন্যায় সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে একত্রে থাকে, একসাথে নামায পড়ে এবং ইসলামের উন্নতির জন্য দোয়া করে।

এরপর বুর্কিনাফাঁসোর বাম্বারা আইলাওয়া, যিনি গর্ভনর ছিলেন, লিখেছেন,

অধম বুর্কিনাফাঁসোর প্রতিনিধি হয়ে এখানে এসেছে আর জামাতে আহ্‌মদীয়ার প্রধানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছে। এ জলসায় আমি দেখেছি, নি:সন্দেহে পৃথিবীর সকল জাতি ও বংশের মানুষ উপস্থিত আছে কিন্তু সবাইকে এক বর্ণের ও মানবতার পতাকাবাহী বলে মনে হয়েছে। আজকের জলসা অনুষ্ঠিত হচ্ছে সব ধরনের বর্ণ বৈষম্য ও জাতিগত ভেদাভেদের উর্ধ্বে থেকে। জামাতে আহ্‌মদীয়ার শ্লোগান, ‘সবার তরে ভালবাসা, কারো পরে ঘৃণা নয়’ এর স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। এই শ্লোগান থেকে সমগ্র বিশ্বের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। আমার দেশে জামাতে আহ্‌মদীয়াকে পরম সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা হয়। মাত্র বিশ বছরে জামাতে আহ্‌মদীয়া বুর্কিনাফাঁসোর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মন জয় করেছে। এ বিষয়টিও অনুধাবন করতে আমাদের অসুবিধা হয়নি যে, এই জামাতই ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত ভেদাভেদের উর্ধ্বে থেকে মানব সেবা করছে। আর কেবল আধ্যাত্মিক খাবারই নয় বরং বাহ্যিক সেবামূলক কর্মকান্ডের দিক দিয়েও আপনারা প্রথম সারিতে আছেন।

তিনি বলেন,

আহ্‌মদীয়া জামাত আমাদের দেশে শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মত মহান কাজ করছে। তাই রাষ্ট্রপতি জামাতের এমন সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পদক (Order of Distinction) প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। গত ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে জামাতে আহ্‌মদীয়াকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।

আমরা কোন প্রকার পুরস্কারের অভিলাসী নই। কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের আশায় আমরা সেবা করে থাকি। প্রত্যেক আহ্‌মদী কর্মীর প্রেরণা ও চেতনা এরূপই।

এরপর ইব্রাহীম জিয়ামা গারবা সাহেবা বলেন, তিনি একজন মহিলা ও নাইজার এর মেয়রের উপদেষ্টা:

আপনাদের শ্লোগান ‘সবার তরে ভালবাসা, কারো পরে ঘৃণা নয়’, এটি আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। আর আমি এখানে বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের বিভিন্ন মানুষ এখানে এসেছেন। আপনাদের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই আমাদেরকে ভালবাসা দিয়েছে। আর যেভাবে আমাদের দেখাশুনা করা হয়েছে এ দিনগুলো আমরা কখনো ভুলতে পারব না।

এরপর আমেরিকার একজন আহ্‌মদী নূরউদ্দীন সাহেব লিখেন:

আমি প্রথমবার এখানে এসে যা কিছু দেখলাম তাতে আমার চোখ হতে অশ্রু বইতে লাগল এবং খোদা তা’লার অনুগ্রহরাজি স্মরণ করে আমি কাঁদতে আরম্ভ করি। নিশ্চয় সে সময় সমাগত যখন আমি মনে করি আমার এ সুখকর অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি বই লিখতে পারবো। আমার আবেগ আছে কিন্তু তা বর্ণনা করার শক্তি নেই। কেননা খোদা তা’লার দয়া ও অনুগ্রহরাজি গণনা করা সাধ্যাতীত। আমি বলতে পারি, আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে আমি আমার বাড়ি অর্থাৎ আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় ফেরত যাচ্ছি। আমি আমার পাপ থেকে তওবা করছি এবং তা পরিহার করছি। মহানবী (সা.) এবং তাঁর মহান সেবক হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পয়গাম সে সব মানুষ যাদের কাছে পৌঁছানো আমার সাধ্যে আছে আমি পৌঁছে দিব।

মোহতারমা সাওয়াদ রাযূক সাহেবা যিনি বেলজিয়ামের একজন মুসলমান সাংসদ। তিনি মরক্কোর অধিবাসী হলেও অনেক দিন থেকে এখানে বসবাস করছেন এবং সংসদেরও সদস্য। তিনি জলসায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রেখেছেন। তিনি লিখেছেন,

জলসায় অংশ গ্রহণ করা আমার জন্য প্রথম এবং অনেক বড় একটি অভিজ্ঞতা ছিল, যা আমি পূর্বে কখনো চিন্তাই করতে পারতাম না।

এরপর, তিনি দাওয়াতে গিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে বসেন। তিনি তাকে তবলীগ করেন। মহানবী (সা.)-এর পদমর্যাদা, হযরত ঈসা (আ.)-এর মোকাম এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমন ও আবির্ভাব সম্পর্কে আহ্‌মদীদের কি বিশ্বাস তা ছিল তবলীগের আলোচ্য বিষয়। এ সব বিষয়ে প্রায় আধা ঘন্টা আলোচনা হয়। এরপর তিনি আমাদের মিশনারীকে তার (হুযুর আকদাসের স্ত্রী’র - অনুবাদক) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,

আমি তার কাছে বসেছিলাম, আর তিনি আমাকে এভাবে বুঝিয়েছেন যে, আমার চিন্তাধারা আমূল বদলে গেছে।

এরপর তিনি বলেন, “ইমাম মাহদী (আ.) সম্বন্ধে আমি আরও জানতে চাই”, রাত আড়াইটা পর্যন্ত বসে থেকে তিনি এ বিষয়ে জেনেছেন। আমার স্ত্রীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,

তিনি আমাকে এমনভাবে বুঝিয়েছেন যে, এখন আমি পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন,

জামাতে আহ্‌মদীয়ার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানার পর আমি পুনরায় আধ্যাত্মিক জীবন লাভ করেছি। আর এখন ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের পর জামাতে আহ্‌মদীয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আমি জামাতে আহ্‌মদীয়া সম্বন্ধে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। আর আল্লাহ্ তা’লা যদি চায় যে, আমি আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করি, তবে আমি একাই আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করব না, বরং আমার সাথে আমার আত্মীয়-স্বজন, নিকটজন এবং বন্ধু-বান্ধব ছাড়াও জানাশোনা অনেক মানুষ যোগ দিবে।

আমার সমাপনী ভাষণের কথা উল্লেখ করে বলেন,

বক্তৃতার শেষাংশে আরবের আহ্‌মদীদের উদ্দেশ্য করে আপনি যে বলেছেন, হে লোক সকল! আপনারা জাগ্রত হোন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া আপনাদের কর্তব্য। আর মক্কায় গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং তাঁর জামাতের জন্যও দোয়া করুন। তিনি বলেন, সেসময়ে আমি অনেক কেঁদেছি আর আমার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু প্রবাহিত হয়, কেননা আমি আরব জাতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এক নারী। কেবল একদিন পূর্বেই বেগম সাহেবা আমাকে ইমাম মাহদী (আ.) ও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের আবশ্যকতা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতা সম্বন্ধে অবহিত করেছেন। সে মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, আমার বরাত দিয়ে, যেন তিনি স্বয়ং আমাকে সম্বোধন করছেন। তিনি বলেন, তখন আমার হৃদয়ে এই অনুভূতিরও সৃষ্টি হল যে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আপনাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে যা নিঃসন্দেহে অবিচার। তিনি বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী বছর যুক্তরাজ্যের জলসায় আমি একাই আসব না বরং অনেক সাংসদও আমার সাথে এতে যোগদান করবেন, ইনশাআল্লাহ্।

এটিও আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহ, নিরব তবলীগ হচ্ছে বা ব্যক্তিগত তবলীগ হয় যা বাহ্যত দেখা যায় না কিন্তু মানুষ পরিবেশ হতেও প্রভাবিত হয় এবং পরস্পরের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমেও প্রভাবিত হয়। আমাদের খোদ্দাম যারা ডিউটি দেন (তাদের ব্যাপারে - অনুবাদক) আমি জানতে পেরেছি, একজন খাদেম বাসের একজন ইরানী ড্রাইভারকে হযরত ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কে বলেছেন এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমন সম্বন্ধেও অবহিত করেছেন। মোটকথা এ ধরনের সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে, এগুলোও আল্লাহ্ তা’লার এ���ন অনুগ্রহ যা থেকে অবশেষে উত্তম ফল পাওয়া যায়।

এরপর একজন আহ্‌মদী মহিলা হলেন রীম শরীকী আখলাফ সাহেবা। তিনি বলেন,

প্রথমবার আমি এতে অংশগ্রহণ করেছি। পৃথিবীর কোন ভাষায়ই আমি আমার এ আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারব না। এই জলসার মাহাত্ম্য, সৌন্দর্য্য, শৃঙ্খলা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলকভাবে দায়িত্ব পালনকারীদের উৎসাহ দেখে তাৎক্ষণিকভবে হৃদয়ে এ প্রশ্ন জাগ্রত হত, কে আছে যে পৃথিবীতে এত সুশৃঙ্খলভাবে এই কাজ করতে পারে? এই বিশাল জনগোষ্ঠির আতিথেয়তা কে করতে পারে? সহস্র সহস্র মানুষকে এক জনের ভালবাসায় কে একত্রিত করতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু একটিই, আর তা হচ্ছে, তাঁর হাতের উপর খোদা তা’লার হাত রয়েছে, তিনিই হৃদয়সমূহে প্রেম-প্রীতি ও অনুরাগ সৃষ্টি করেন আর তিনিই কাজ সহজতর করেন।

তিনি আরও বলেন,

ইতিপূর্বে টেলিভিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বয়’আত দেখতাম। স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বয়’আত করা ছিল স্বপ্নের মত বিষয়, তবে এ বছর খোদা তা’লা তা পূর্ণ করেছেন, তিনিও কিছু দিন পূর্বেই বয়’আত করেছেন। জলসাগাহে বসে বয়’আত করার সময় মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক নতুন জগতে আছি। আবেগের আতিশয্যে হৃদয়ের অবস্থাটাই অন্য রকম ছিল, শরীর কাঁপছিল, চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল, খোদার করুণা ও মার্জনার প্রতি দৃষ্টি ছিল এবং হৃদয়ে খুশির ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। সিজদায় শুকুর-এর সময় আমি খোদাকে কিছুটা দূরেই অবস্থান করছেন বলে অনুভব করেছি। খোদা তা’লার কাছে আমি আমার পাপ ও অপরাধসমূহ হতে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। মনে হচ্ছিল এটি যেন কিয়ামত দিবস আর পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে।

আরেকজন মহিলা, আবীর রাযা হিলমী সাহেবা,

জলসার শেষের দিকে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং আমি বলছিলাম, যখন মিশর ফিরে যাব তখন আমি দেশবাসীকে চিৎকার করে বলব, হে রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উম্মত! তোমরা ঘুম থেকে জাগ্রত হও, তোমাদের মাহদী এসে গেছেন আর নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছে। অতএব তাঁকে শনাক্ত করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা কর।

এরপর আরেকজন মহিলা আযীয আমানী ওদে সাহেবা বলেন,

এবছরই প্রথম আমি জলসায় যোগদান করেছি। একই সময় এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এতো লোকের আপ্যায়ন করা হচ্ছে দেখে খুবই অবাক হতে হয়।

রাবী মুফলেহ্ ওদে সাহেব বলেন,

জলসা সম্প্রচারের মান খুবই উন্নত ছিল। অতিথি আপ্যায়ন এবং সদাচরণ দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছি। জলসার অনুষ্ঠানে আমি সারা বছর এবং জলসার সময় মনে জাগ্রত হওয়া প্রশ্নাবলীর মন:পুত উত্তর পেয়ে গেছি, জলসার বিভিন্ন কার্যক্রম এবং প্রোগ্রাম হতে।

মোকাররম আব্দুর রঊফ ইব্রাহীম কাযাক সাহেব বলেন,

আমার মনে হয়েছে যে, এই জলসা একান্ত আরবদের জন্যই নির্ধারিত ছিল। ইনশাআল্লাহ্ শত্রুদের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে। এবং আরবের লোকেরা দলে-দলে জামাতে অন্তভূর্ক্ত হবে, ইনশাআল্লাহ্। মোটকথা, যেন একটি বাঁধ ভেঙ্গেছে। বিরুদ্ধবাদীদের অহংকারের পতন ঘটবে এবং অচিরেই ইমাম মাহদী (আ.)-এর পতাকা পুরো আরব বিশ্বে পত পত করে উড়তে থাকবে। অচিরেই এ ইলহাম ‘ইয়াসলুনা আলাইকা সুলাহায়েল্ আরাব ওয়া আবদালেশ্ শাম’ অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ হবে।

জলসার পর পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে বিশেষ করে আরব দেশগুলো থেকে এমনসব বার্তা পেয়েছি। যা দেখে মনে হয় আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বিশেষ কৃপাবারী বর্ষণ করেছেন। বিশ্ববাসী যেখানে পার্থিব বিলাসিতায় মত্ত, সেখানে মুহাম্মদী মসীহ্‌র দাসগণ তাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির চেষ্টায় প্রাণপণ রত, এক নব উদ্যমে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে এবং অগ্রসরের চেষ্টা করছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ থেকে এই বার্তা আসছে এবং অধিকাংশ দেশ থেকে আসছে, তাতে এতো বেশি আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে যা বর্ণনা করা অসম্ভব না হলেও অবশ্যই কষ্ট সাধ্য।

আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হৃদয়সমূহে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ভালবাসায় এমনভাবে পূর্ণ করেছেন, পৃথিবীর অন্য কোথাও এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং তাঁরই (আ.) কারণে খিলাফতের প্রতি ভালবাসা। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক আহ্‌মদীর নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং ভালবাসাকে বৃদ্ধি করতে থাকুন আর আল্লাহ্ তা’লার নিয়ামতরাজির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন যেন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ পায়। আল্লাহ্ তা’লার সত্তা যেন আমাদের সকল ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর তৌফিক দান করুন, আমীন।

(জামেয়া আহ্‌মদীয়া বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্কের যৌথ উদ্যোগে অনুদিত)

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে