In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্-ওয়াসে’ - চতুর্থ অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৯শে মে, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا‌ؕ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ‌ؕ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِيْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا‌ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِنَا‌‌ۚرَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ‌ ۚ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا اَنْتَ مَوْلٰٮنَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِيْنَ

আমি যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেছি এর অনুবাদ হচ্ছে,

‘আল্লাহ্ তা’লা কোন প্রাণের উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। সে যে ভাল কাজই করবে, তা তারই জন্য কল্যাণকর হবে এবং যেই মন্দ কাজই করবে, তার দায়ভারও তার উপর বর্তাবে। হে আমাদের প্রভু! আমরা যদি বিস্মৃত হই অথবা কোন ভুল-ত্রুটি করে বসি তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না; হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন কোন দায়িত্ব অর্পণ করো না যেমনটি তুমি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর তাদের পাপের পরিণামে অর্পণ করেছিলে এবং হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন বোঝা অর্পণ করো না যা বহন করার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই; তুমি আমাদের মার্জনা করো, আমাদেরকে ক্ষমা করো, আমাদের প্রতি দয়ার্দ্র্র হও, তুমিই আমাদের অভিভাবক, তাই কাফির জাতির বিরুদ্ধে তুমি আমাদের সাহায্য করো।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২৮৭)

এ আয়াতের প্রারম্ভেই আল্লাহ্ তা’লা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লা কোন আত্মার উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্বভার অর্পণ করেন না। সুতরাং মানুষের জন্য ‘উস্আত্’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তার সীমিত যোগ্যতা ও ক্ষমতাকে মাথায় রেখে, যেভাবে لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا -তে এসেছে। কিন্তু গত খুতবাগুলোতে যেভাবে আমি বলেছি, আল্লাহ্ তা’লার জন্য ‘ওয়াসে’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তাঁর গুণবাচক নাম হিসেবে অর্থাৎ তাঁর শক্তি ও ক্ষমতার কোন সীমা পরিসীমা নেই। বরং এভাবে বলা যায়, যেখানে আল্লাহ্ তা’লা সকল গুণের আধার এবং সমস্ত ক্ষমতা ও শক্তির মালিক সেখানে তাঁর ক্ষমতা, শক্তি ও জ্ঞান এত ব্যাপক যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই; এ জন্য তাঁকে আয়ত্ত করার কোন প্রশ্নই উঠে না।

যাহোক, এ আয়াতের বরাতে আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর রচনার আলোকে কিছু কথা বলবো। মানুষের অবস্থানুসারে, তার সাধ্য, ক্ষমতা ও যোগ্যতার নিরিখে - (তার প্রতি) বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। কেননা আল্লাহ্ তা’লা এমন কোন আদেশ দেন না যা মানুষ পালন করতে পারে না বা যা তার শক্তি ও সামর্থের ঊর্ধ্বে। অতএব মানুষের দায়িত্ব হলো, আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী অনুসারে চলার চেষ্টা করা। এই চেষ্টা করলেই একজন মু’মিন আল্লাহ্ তা’লার সে সব পুরস্কার পেতে পারে - যার অঙ্গীকার আল্লাহ্ তা’লা করেছেন।

কাজেই ইসলামের সৌন্দর্য হলো, মানুষের শক্তি ও সামর্থের অন্তর্গত আদেশ দিয়ে প্রত্যেককে তার নিজ আমল অনুযায়ী শাস্তি ও পুরস্কারের জন্য দায়ী করে। আর কাণ্ডজ্ঞানহীন এ মতবাদ উপস্থাপন করে না যে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানবপ্রজন্ম ভুল-ভ্রান্তি করে যাক, পাপাচারিতায় লিপ্ত হোক এবং আল্লাহ্ তা’লার ইবাদতের প্রতি ঔদাসীন্য দেখাক না কেনো - চিন্তার কোন কারণ নেই, কেননা, তওরাতের শিক্ষা মোতাবেক একজন নিষ্পাপ নবী ও রসূলকে আল্লাহ্ তা’লা সেই পাপের জন্য অভিশপ্ত মৃত্যু দিয়েছেন। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লা (মানব) প্রকৃতি মোতাবেক কত প্রজ্ঞাপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন, তাঁর আদেশ প্রত্যেক ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা ও যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া মানুষের পুণ্যকর্ম করা এবং পুণ্যকর্মের চেষ্টা তাকে তার সমস্ত পাপ হতে পবিত্র করে না। যেভাবে হাদীসে এসেছে, শয়তান মানুষের ধমনীতে রক্তের মত প্রবাহিত হচ্ছে; এ জন্য এমন অনেক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যখন মানুষ অনিচ্ছাকৃত ভাবে পাপ ও ভুল-ত্রুটি করে বসে, তখন তার উচিত ইস্তেগফারের মাধ্যমে সেগুলো হতে বাঁচার চেষ্টা করা, পুণ্যের প্রতি ধাবিত হওয়া, আল্লাহ্ তা’লা যেসব কাজ করার জন্য আদেশ দিয়েছেন তা করার চেষ্টা করা, নিজের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধনের জন্য এক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালানো; কেবলমাত্র তাহলেই পরম দয়াময় এবং অতীব ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দার প্রতি ক্ষমা ও দয়ার দৃষ্টিতে তাকান। অতএব এ হচ্ছে সেই সুন্দর শিক্ষা যা পবিত্র কুরআন আমাদেরকে দিয়েছে। যার জন্য কোন প্রকার কাফ্ফারা বা প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন নেই। আমি পূর্বেই বলেছি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এই বিষয়ের অর্থাৎ আয়াত لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا -এর ব্যাখ্যা করেছেন অর্থাৎ বলেছেন যে, এর অর্থ কি এবং এটি কীভাবে ও কোন কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন কোন অবস্থায় মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী নয় কোন কোন ক্ষেত্রে তার অবস্থা ধৃত হওয়ার মতো হয়।

প্রধাণতঃ আল্লাহ্ তা’লা কারো প্রতি তার জ্ঞানের পরিধির অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যদিও এটি সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্ তা’লা কারো জ্ঞানের পরিধির বাইরে তার উপর বোঝা চাপান না কিন্তু একই সাথেই আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, قُل رَّبِّ زِدْنِىْ عِلْمًا‏ (সূরা তাহা: ১১৫) {অর্থাৎ তুমি বল, হে আমার প্রভূ! তুমি আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও - অনুবাদক} দেখুন! হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এই দোয়া শিখানো হয়েছে আর তাঁকে এমন জ্ঞান দান করা হয়েছিল যা কিয়ামত পর্যন্ত প্রকাশিতব্য সকল প্রকার জ্ঞানের উপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখবে।

পবিত্র কুরআন নাযিল হবার যুগে আল্লাহ্ তা’লা জানতেন যে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কি-কি ভান্ডার তাঁর প্রতি নাযিল হবে। তখন আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, কুরআন করীম নাযিল হবার বিষয়ে ত্বরা করো না বরং তুমি জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ্ তা’লার কাছে দোয়া করো; যেন আল্লাহ্ তা’লা তাঁর হৃদয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার যে উদ্বেল সমুদ্র সৃষ্টি করেছিলেন তা আরো বি¯তৃতি লাভ করে।

কুরআন অবতীর্ণ হওয়া সমাপ্ত হবার পরও এটিই ছিলো মহানবী (সা.)-এর দোয়া। অতএব ভেবে দেখুন! তাঁর মান্যকারীদের জন্য এ দোয়াটি কতো আবশ্যকীয় এবং নিজেদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করা কতোটা প্রয়োজন? তিনি (সা.) তাঁর উম্মতকে এ উপদেশও দিয়েছেন যে, জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও অর্থাৎ জ্ঞানার্জনের জন্য পরিশ্রম করো এবং নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আজীবন মনোযোগী থাকো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, তিনি কোন আত্মাকে কষ্টে নিপতিত করেন না অর্থাৎ কোন ব্যক্তিকে সেই সময় পর্যন্ত এর জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করেন না বা তাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করান না যতক্ষণ পর্যন্ত তার মাঝে কোন কাজের যোগ্যতা বা সামর্থ সৃষ্টি না হয় বা শক্তি সৃষ্টি না করা হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি একথাও বলেছেন যে, প্রকৃত মু’মিনকে জ্ঞান অর্জনের জন্যও চেষ্টা করা উচিত আর যথাসম্ভব - নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়াও করা উচিত।

কাজেই একটি হচ্ছে সেই জ্ঞান যা আল্লাহ্ তা’লা নবীগণকে দান করেন এবং মহানবী (সা.)-কে সেই জ্ঞান সর্বাধিক দান করেছেন কিন্তু একইসাথে এ দোয়াও শিখিয়েছেন, رَّبِّ زِدْنِىْ عِلْمًا‏। দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান, তা আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় প্রকার হতে পারে, যার জন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি দোয়াও করতে হবে, এটি মু’মিনের কাজ। জ্ঞানার্জনের জন্য যদি পরিশ্রমের প্রয়োজন না থাকতো তবে মহানবী (সা.)-এর একথা বলা অর্থহীন সাব্যস্ত হয় যে, কষ্ট সহ্য করে হলেও এবং দূরত্ব অতিক্রম করে হলেও জ্ঞান অর্জন করো। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার আশিস ব্যতীত জ্ঞান অজর্নের যোগ্যতাও সৃষ্টি হতে পারে না, আর এ উদ্দেশ্যে দোয়াও শিখানো হয়েছে যে, শুধু নিজের শক্তির উপর নির্ভর করো না বরং জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য লাভের চেষ্টা করো। এমন প্রচেষ্টা যদি চলমান থাকে তবেই প্রত্যেক ব্যক্তি স্ব-স্ব যোগ্যতা ও উপকরণ অনুসারে জ্ঞান লাভ করবে।

আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেকের মাঝে ব্যতিক্রমধর্মী মানসিক শক্তি সৃষ্টি করেছেন। মানুষের উপর শিশুকালের তরবিয়ত, বড় হবার পাশাপাশি সমাজের প্রভাবও পরে। এ জন্য আল্লাহ্ তা’লা তার পদমর্যাদা ও শ্রেণী নির্ধারণ করে দিয়েছেন, প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন করে এবং এর জন্য চেষ্টা করে তবেই তোমাদের মাঝে যোগ্যতা বা পরিব্যাপ্তি সৃষ্টি হবে। আল্লাহ্ তা’লা এর জন্য স্তর বা পর্যায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এমন নয় যে, দুর্বল মানসিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তি অর্থাৎ জ্ঞানের স্বল্পতা বা প্রকৃতিগতভাবে যে অবস্থা কারো মাঝে বিরাজ করে অথবা পরিবেশের প্রভাবে যার জ্ঞানের অপ্রতুলতা রয়েছে তাকেও সেভাবেই দায়ী করবেন যেভাবে প্রখর মেধা ও জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিকে করবেন - যে ধর্মীয় ও পার্থিব জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে সব ধরনের সুযোগ- সুবিধা পেয়েছে।

এটি সর্বজন বিদিত যে, আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় জ্ঞানের পরিব্যাপ্তির কল্যাণে সকল অবস্থা জানেন। তাই তিনি যখন কাউকে দায়িত্ব দেন সেসব বিষয়কে সামনে রেখেই দেন যা কোন মানুষ সম্বন্ধে তাঁর জানা। যদি মানুষ নিজের খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতা ঐ জ্ঞান অর্জনে ব্যবহার না করে - যা অর্জন করার জন্য খোদা তা’লা নির্দেশ দিয়েছিলেন তাহলে এমন ব্যক্তি জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে। এক্ষেত্রে لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا এর অর্থ এটিই, নিজেদের বৃত্তিকে তোমরা সেভাবে ব্যবহার করো নি যেমনটি প্রকৃতপক্ষে করার কথা ছিল। আর মুসলমান অভিহিত হতে হলে একজনকে সর্ব প্রথম ধর্মীয় জ্ঞানে উন্নতির চেষ্টা করা উচিত।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘সত্যসন্ধানীকে কখনও একটি নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত গিয়ে স্থবির হয়ে যাওয়া উচিত নয় নতুবা অভিশপ্ত শয়তান অন্যদিকে (দৃষ্টি) ঘুরিয়ে দিবে। যেভাবে বদ্ধ পানি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায় অনুরূপভাবে মু’মিন যদি স্বীয় উন্নতির জন্য চেষ্টা না করে তাহলে সে অধঃপতিত হয়। অতএব সৌভাগ্যবানদের উচিত সত্য ধর্মের সন্ধানে লেগে থাকা। আমাদের মহানবী (সা.)- এর চেয়ে বড় কোন পূর্ণাঙ্গ মানব পৃথিবীতে আবির্ভূত হন নি। কিন্তু তাঁকেও رَّبِّ زِدْنِىْ عِلْمًا’র দোয়া শিখানো হয়েছে। অতএব আর কে আছে, যে নিজ মা’রেফাত এবং জ্ঞানের উপর ভরসা করে বসে থাকবে এবং উন্নতির প্রয়োজন আছে বলে মনে করবে না।’

(রাবওয়াহ্ থেকে প্রকাশিত - মলফুযাত-২য় খন্ড-পৃ:১৪১-১৪২)

কাজেই এখানে لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا ’র অর্থ হলো, নিজের সমস্ত শক্তি-সামর্থ নিয়োজিত করে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করো, যদি তুমি চেষ্টা করতে থাকো তাহলে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করবে। কেননা জ্ঞানের ব্যাপকতার কারণে অর্থাৎ সেই জ্ঞানের কারণে যা খোদা তা’লাকে চিনার পথে পরিচালিত করে, আল্লাহ্ তা’লার সত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে আর এই বুৎপত্তির কারণে মানুষকে আল্লাহ্ তা’লার দরবারে সমর্পিত হওয়া উচিত। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

اِنَّمَا يَخْشَى اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُ

অর্থ: ‘প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্‌কে তাঁর বান্দাদের মধ্যে থেকে কেবল জ্ঞানীরাই ভয় করে।’

(সূরা আল্ ফাতের: ২৯)

অতএব জ্ঞান-বৃদ্ধি মূলতঃ হৃদয়ে খোদাভীতি সৃষ্টি করে। এখানে সেসব আলেমদের কথা বলা হয়নি যারা নামধারী আর বাহ্যিকতার পূজারী। তারা নিজেদের স্বল্প জ্ঞানের মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করতে চায়; বরং তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় তাদের জ্ঞান-বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জ্ঞান ব্যাপকতা লাভ করে আর খোদা তা’লার সত্তা সম্পর্কে তারা জ্ঞানে সমৃদ্ধি লাভ করে। এবং ‘যে দিকেই তাকাও না কেনো সে দিকেই তোমাকে দেখা যায়’ এর প্রকৃত অর্থ তারা বুঝতে পারে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘যে দিকে তাকাই সে দিকেই তোমায় দেখার দর্পণ’।

(সুরমাহ্ চশমা আরীয়াহ্-রূহানী খাযায়েন-২য় খন্ড-পৃ:৫২)

এটিই মূল তত্ত্ব যা একজন আলেম বা জ্ঞানী বুঝতে পারেন। তিনি আল্লাহ্ তা’লার সামনে মাথা নত করে আর তখন বুঝতে পারে যে, জ্ঞানের দিক থেকে لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا -এর প্রকৃত অর্থ কি?

দ্বিতীয় বিষয় যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই উদ্ধৃতি থেকে আমি অনুধাবন করেছি, যা তিনি বর্ণনা করেছেন তা হলো: لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا বলে আল্লাহ্ তা’লা মানুষের সামনে এটি স্পষ্ট করেছেন যে, আল্লাহ তা’লা সেই বিশ্বাসই উপস্থাপন করেন যা অনুধাবন করা মানুষের ক্ষমতা ও সামর্থ্যরে মধ্যে, যেন সেই নির্দেশ পালন করা সাধ্যাতীত বা সামর্থ্যের বাইরে না হয়। এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে খোদা তা’লা মু’মিনদের সম্বন্ধে এটিও বলেছেন, ঈমান ও বিশ্বাস সম্পর্কে বলেছেন,

اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَمَلٰٓٮِٕكَتِهٖ وَكُتُبِه وَرُسُلِهٖ

অর্থ: ‘আল্লাহ্‌র প্রতি তাঁর ফিরিশ্তা, কিতাবসমূহ এবং তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান রাখে।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২৮৬)

অন্যত্র বলেছেন, পরকালের প্রতিও ঈমান রাখে।

এ সম্বন্ধে একটি হাদীসও আছে যা হযরত উমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন,

‘আমরা মহানবী (সা.)-এর কাছে বসে ছিলাম, তখন তাঁর (সা.) কাছে এক ব্যক্তি আসলো যার পরিহিত পোষাক ছিলো সাদা-শুভ্র; সে এসে রসূল (সা.)-এর হাটুতে হাটু স্পর্শ করে বসলো এবং প্রশ্ন করলো, আর জিজ্ঞেস করলো যে, হে মুহাম্মদ (সা.) ঈমান কাকে বলে? তিনি (সা.) বললেন, ঈমান হলো, তুমি আল্লাহ্‌র প্রতি তাঁর ফিরিশ্তা, কিতাবসমূহ, রসূল এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনো এবং অদৃষ্টের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস রাখো।’

(সহীহ্ মুসলিম-কিতাবুল ঈমান)

এ বিষয়গুলো এমন যা মানা কষ্টসাধ্য নয়। যদি স্বভাব ভালো হয়, খোদার সন্ধানে থাকে তাহলে সমগ্র বিশ্বজগত দূরে থাক এই পৃথিবীতেও আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির বিভিন্ন রূপ-বৈচিত্র রয়েছে যা আল্লাহ্ তা’লার সত্তার প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে। এরপর এই প্রকৃতিকে দেখে, খোদা বর্ণিত পথে পরিচালিত হয়ে মানুষ ফিরিশ্তা সম্পর্কে চিন্তা করে - গোটা বিশ্ব ব্যবস্থাকে দেখে এবং চিন্তা করে। ফলে ফিরিশ্তার স্বরূপ মানুষের নিজস্ব মেধা ও জ্ঞানের যোগ্যতানুযায়ী প্রত্যেকের কাছে প্রাঞ্জলভাবে ধরা দেয়।

আমরা জানি, খোদার নবীদের উপর যেসব গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে তার সত্যায়ন করেছে পবিত্র কুরআন। সে সবের ভুলভ্রান্তি ত্রুটি-বিচ্যূতি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনকে কুরআন চিহ্নিত করেছে। এর কোন কোন শিক্ষাকে কুরআন সত্যায়ন করেছে আবার কোন কোনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘পবিত্র কুরআন’ এর সত্যায়ন ও সংরক্ষণের ঘোষণা করে আর আজ পর্যন্ত ক্রমাগত ভাবে এটি প্রমাণিত যে, এতে কোন হস্তক্ষেপ হয়নি বা পরিবর্তন আসেনি আর আসতে পারে না, এর প্রতি ঈমানকে দৃঢ় করার ঘোষণা দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআনে যে শিক্ষা দিয়েছে সে সম্পর্কে এই ঘোষণা করেছে যে, এতে এমন কোন শিক্ষা নেই যার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানবীয় শক্তির ঊর্ধ্বে। কেননা মহানবী (সা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলমান স্ব-স্ব যোগ্যতা অনুযায়ী এর উপর আমল করে দেখিয়েছেন।

তারপর রয়েছে রসূলের প্রতি ঈমান আনার বিষয়টি। আর যদি রসূলদের অস্বীকার করা হয়ে থাকে তাহলে তা ছিলো সে জাতির দুর্ভাগ্য কেননা, তাদের শিক্ষা ও দাবী কখনো এমন কিছু ছিলো না যা কোনভাবে মানুষকে কষ্ট দিতে পারে। প্রত্যেক নবী একথাই বলেছেন, আমি তোমাদেরকে খোদার সাথে মিলিত করা এবং তোমাদেরকে শিখাতে দিতে এসেছি। আর এ জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান খোদার নিকট আছে। তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া নয় বরং তোমাদের মঙ্গল কামনা করাই আমার উদ্দেশ্য আর এজন্য তোমরা পরকালের প্রতি বিশ্বাস করো এবং তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান এনে, পুণ্যকর্ম করে খোদা তা’লার নিকট থেকে প্রতিদান লাভ করো। তাঁর সন্তুষ্টির জান্নাতে প্রবেশ করো। আর উত্তম প্রতিদান প্রদানের ক্ষেত্রেও খোদার রহমত কতো ব্যাপক তা দেখুন! তিনি বলেন, কোন পাপের শাস্তি ততটাই যতটা সে পাপ করে এবং পুণ্যের প্রতিদান হলো, দশ গুণ বরং খোদা আরও বৃদ্ধি করতে থাকেন।

অতএব খোদা তা’লা নবীদের মাধ্যমে যে শিক্ষাই পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করেন না কেনো তা তাদের অন্তর্নিহিত যোগ্যতা অনুযায়ীই হয়ে থাকে। প্রথম যুগের জাতিগুলোর মেধা দুর্বল ছিলো বলে তাদের শিক্ষাও তদনুযায়ী ছিলো। এ প্রেক্ষাপটে আমি বলেছিলাম যে, জিব্রাঈল (আ.) এসেছিলেন, সেই একই মজলিস যেখানে ঈমানের কথা এসেছে সেখানে আরকানে ইসলামের (ইসলামের স্তম্ভ সমূহ-অনুবাদক) কথাও এসেছে আর সে জিজ্ঞাসা করে যে, ইসলাম কি? মহানবী (সা.) বলেন, কলেমা তৈয়্যবা لا الہ الا اللہ محمد الرسول اللہ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ) । তারপর নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তিনি (সা.) ক্রমাগত ভাবে নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জের কথা বলেন। (সহীহ্ মুসলিম-কিতাবুল ঈমান)

এই নামায ও রোযা, যা ইবাদত- এর মাধমেও কাউকে কষ্টে ফেলেন নি। কেউ অসুস্থ্য হলে তার বসে অথবা শুয়েও নামায পড়ার অনুমতি আছে। কেউ সফরে থাকলে জমা ও কসর পড়ার অনুমতি আছে। আর সফরে ও অসুস্থ্য অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে, যাকাত শুধু তার জন্য আবশ্যক যার ক্ষেত্রে শর্ত পূর্ণ হয়। হজ্জ শুধু তার জন্য আবশ্যক যে ব্যক্তি পথ খরচের সামর্থ্য রাখে, তার নিরাপত্তাও থাকে, স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। আল্লাহ্ তা’লা যে সব বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন সেগুলো মানুষের শক্তি ও সামর্থের গন্ডির ভেতর থেকে পালনের নির্দেশ রয়েছে। আর যেমনটি আমি বলেছি, সকল শ্রেণীর মানুষ এসব বিষয়ের উপর আমল করে দেখিয়েছেন। যারা এ শিক্ষার উপর আমল করে না তাদের বাদ দিলেও কোটি কোটি এমন মুসলমানও অতিবাহিত হয়েছেন যারা এর উপর আমল করতেন আর আমল করে দেখিয়েছেন।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে তৃতীয় বিষয় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বর্ণনা করেন তাহলো, আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, মহানবী (সা.) এর ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। যেমনটি আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِىْ رَسُوْلِ اللّٰهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

অর্থ: ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহ্ তা’লার রসূল (সা.)-এর মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’

(সূরা আল্ আহযাব:২২)

তিনি (আ.) বলেন:

‘আমাদের প্রতি সকল আদেশ নিষেধ, চারিত্রিক আদর্শ ও ইবাদত সমূহে মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ করার নির্দেশ রয়েছে। কাজেই, আমাদের প্রকৃতিতে যদি সেই শক্তি ও সামর্থ্য না দেয়া হতো, যা মহানবী (সা.)- এর সমস্ত পরাকাষ্ঠা - প্রতিচ্ছবি হিসেবে অর্জন করতে পারে তাহলে আমাদের কখনোই এই নির্দেশ দেয়া হতো না যে, এই মহান নবীর অনুসরণ করো। কেননা, খোদা তা’লা কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব দেন না যেমনটি তিনি নিজেই বলেছেন, لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا।’

(হাকীকাতুল ওহী-রূহানী খাযায়েন-২২তম খন্ড-পৃ. ১৫৬)

অতএব এখানে বলা হয়েছে যে, তোমরা ঐ নবীর অনুসরণ করো যার ব্যাখ্যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ‘প্রতিচ্ছায়ারূপে’ বাক্যের মাধ্যমে করেছেন। অর্থাৎ, তোমরা সেই মান অর্জন করতে পারবে না বটে, তবে নিজ নিজ যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুসারে তার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তা অবলম্বন করা প্রয়োজন, এ উদ্দেশ্যে চেষ্টা করো আর এটি প্রত্যেক মু’মিনের জন্য আবশ্যক। কেননা, মহানবী (সা.) যে আদর্শ স্থাপন করেছেন, একজন মু’মিনের মাঝে আল্লাহ্ তা’লা সেসব পুণ্যকর্ম করার যোগ্যতা নিহিত রেখেছেন।

কেবল একথা বলা যে, সেই মানে আমি অধিষ্ঠিত হতে পারি না তাই চেষ্টারও দরকার নেই। একথা আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ হতে একজন মু’মিনের প্রতি অর্পিত অবশ্য করণীয় হতে মানুষকে দায়মুক্ত করে না আর যেভাবে আমি বলেছি, উম্মতের ভেতর কোটি-কোটি মানুষ এই আদর্শ অনুকরণের চেষ্টা করেছেন এবং করে দেখিয়েছেন যে, মহানবী (সা.) কর্তৃক স্থাপিত উত্তম আদর্শে একজন সাধারণ মু’মিন স্বীয় যোগ্যতানুসারে অধিষ্ঠিত হতে পারে এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, যদিও আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য আবির্ভূত করেছেন এবং তিনি যে শিক্ষা নিয়ে এসেছেন তা সবার জন্য গ্রহণ করার নির্দেশ রয়েছে। এছাড়া আমি বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা এবং এই রসূলের প্রতি বিশ্বাস রাখাই নাজাত বা মুক্তির মূলমন্ত্র। যদি এখনও কারো কাছে দলিল-প্রমাণ পুরোপুরি সুস্পষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ তা’লা যেহেতু কারো প্রতি সাধ্যাতীত বোঝা অর্পণ করেন না; তাই এমন ব্যক্তি দায়মুক্ত।

কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ প্রসঙ্গে বলেন,

‘খোদা তা’লার দৃষ্টিতে যার জন্য প্রমাণাদি সুস্পষ্ট হয়েছে তাকে কিয়ামত দিবসে জবাবদিহি করতে হবে এবং খোদা তা’লার দৃষ্টিতে যার উপর এখনও দলীল-প্রমাণ পূর্ণতা পায়নি আর এরফলে সে যদি সত্যকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্নকারী হয় এবং অস্বীকার করে তাহলে যদিও শরিয়ত (বাহ্যিক দিক থেকে) তার নাম কাফিরই রেখেছে আর আমরাও শরিয়তের অনুসরণে কাফির নামেও সম্বোধন করি কিন্তু তারপরও সে খোদার দৃষ্টিতে لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا আয়াতানুসারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে না। তবে, আমরা তাকে মুক্তিপ্রাপ্ত আখ্যা দেয়ার কোন অধিকার রাখি না, তার বিষয় খোদার হাতে। এ ব্যাপারে আমাদের কোন অধিকার নেই।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) - ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭৫)

এখানে এটিও প্রকাশ থাকে যে, এই শব্দগুচ্ছের পর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একথাও বলেছেন, খোদার দৃষ্টিতে যুক্তিতর্ক এবং গ্রান্থিক দলীল-প্রমাণ, শিক্ষা ও ঐশী নিদর্শনাবলীর মাধ্যমে এখনও কারও কাছে পূর্ণাঙ্গরূপে সত্য প্রকাশিত হয়নি তবে কেবলমাত্র খোদা তা’লাই এ সম্পর্কে ভালো জানেন। কারো মনের কথা আমাদের জানা নেই আর যেহেতু সবদিক থেকে দলীল উপস্থাপন করা এবং নিদর্শনাবলী দেখানোর ক্ষেত্রে খোদা তা’লার প্রত্যেক রসূল স্বীয় দলীল-প্রমাণ মানুষের কাছে পূর্ণরূপে প্রকাশ করার আকাংখা রাখতেন এবং খোদাও একাজে তাঁর সহায় ছিলেন, তাই যে ব্যক্তি এ দাবী করে যে, আমার কাছে এখনও দলিল-প্রমাণ স্পষ্ট হয়নি সে স্বয়ং এই অস্বীকারের জন্য দায়ী এবং এটি প্রমাণের দায়িত্ব তার স্কন্ধেই ন্যস্ত আর সে-ই এজন্য জবাবদিহি করবে কেননা যুক্তিতর্ক এবং অতীত গ্রন্থের দলীল-প্রমাণ, উত্তম শিক্ষা এবং সকল অর্থে পথের দিশা দেয়া সত্ত্বেও কেনো তার উপর দলিল-প্রমাণ সুস্পষ্ট হয়নি তা সেই ভালো জানে।

অতএব যদিও সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের পূর্বে খোদা তা’লা কাউকে দায়ী করেন না কিন্তু ইসলাম এবং আহমদীয়াতের বিরোধীদের এটিও চিন্তা করা প্রয়োজন যে, কোথাও প্রবৃত্তির প্রতারণা তাদেরকে একথা বলতে বাধ্য করছে না-তো যে, আমাদের জন্য কোন দলীল-প্রমাণ স্পষ্ট হয়নি। বিশ্বের সর্বত্র বিরাজমান নৈরাজ্য, বিপদাপদ খোদা তা’লার পক্ষ হতে প্রমাণ স্বরূপ প্রদর্শিত নিদর্শনাবলী নয়তো? কেননা যুগ ইমামের দাবীও বর্তমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পঞ্চম বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লা বিবেক বিরোধী কথা মানতে কাউকে বাধ্য করেন না আর এ কারণে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন না যে, কেনো এসব কথা সে মানেনি। পবিত্র কুরআনের অগণিত স্থানে হাকীম শব্দ এসেছে। এর প্রতিটি বিষয় প্রজ্ঞাপূর্ণ। এর প্রজ্ঞার প্রতি ইশারা করে আল্লাহ্ তা’লা তা সম্পাদন করার নির্দেশ প্রদান করেন। যে নির্দেশই অবতীর্ণ করেছেন তার সবই প্রজ্ঞার বিবরণ। বরং মহানবী (সা.)-কে যখন প্রেরণ করেছেন আর তাঁর জন্য যেসব কাজ বিশেষভাবে নির্ধারণ করেছেন তন্মধ্যে একটি হলো, প্রজ্ঞার (হিকমত) প্রসার করা। বরং ভবিষ্যতে আগমনকারীর মর্যাদা সম্পর্কে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে যে দোয়া শিখিয়েছেন তাতেও বিশেষভাবে প্রজ্ঞাকে দৃষ্টিগোচর রাখা হয়েছে। হিকমত বা প্রজ্ঞা কি? আদল ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এর অর্থ হচ্ছে জ্ঞান সম্পূর্ণ করা। এর অর্থ, সকল বিষয়ের দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা অর্থাৎ যখন কোন নির্দেশ দেন তা করা বা না করার যুক্তিও বর্ণনা করেছেন আর এটিই বিবেকসম্মত কাজ।

উদাহরণস্বরূপ, মদ এবং জুয়া থেকে যদি বিরত রাখেন তাহলে বিরত থাকার নির্দেশের পাশাপাশি এটিও বলেছেন যে,

يَسْـَٔـلُوْنَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ‌ؕ قُلْ فِيْهِمَآ اِثْمٌ کَبِيْرٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَاِثْمُهُمَآ اَکْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَا

অর্থ: ‘তারা তোমাকে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলো, এতদুভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং ক্ষতি আছে, এবং মানুষের জন্য এর মধ্যে অল্প কিছু উপকারও আছে; কিন্তু এর পাপ ও ক্ষতি উপকার অপেক্ষা গুরুতর।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২২০)

মদ পান করতে যে কারণে বারণ করা হয়েছে তা হল, একদিকে যেমন তা মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে ইবাদত হতে বিরত রাখে অপরদিকে সমাজের শান্তিও বিনষ্ট করে। এছাড়া এটিও এখন প্রমাণিত সত্য, মদপানকারী যখন এক পেয়ালা মদ পান করে তখন এরদ্বারা মস্তিষ্কের হাজারো কোষ প্রভাবিত হয়। কাজেই, এই দলীল মূলে মদ মান করতে বারণ করেছেন আর একই অবস্থা জুয়াড়ীদেরও। জুয়াড়ীরা এতোবেশি আসক্ত হয়ে যায় যে, ইবাদত থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে বরং কোন কিছুর আর চেতনাই থাকে না। অবৈধ পন্থায় অর্থ হস্তগত করার চেষ্টা করে। সময় নষ্ট করে। পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিবেক খাটানোর পরিবর্তে যারা মদ এবং জুয়ার নোংরামীতে লিপ্ত তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেগ প্রবণ ও ক্রোধ প্রদর্শনকারী হয়ে থাকে। কিন্ত, মানব কল্যাণের জন্য অতি সামান্য মাত্রায় ঔষধে যদি এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, তাহলে মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে ঔষধ হিসেবে তা ব্যবহার করা যেতে পারে আর করা হয়। হোমীও ঔষধে ব্যবহৃত হয় আর অন্যান্য ঔষধেও। এটি এত স্বল্প মাত্রায় ব্যবহার করা হয় যে, তাতে নেশা হয় না। কিন্তু পানকারী খাঁটি মদ যত কমই পান করুক না কেনো তারা নিজেদের ক্ষতি করতে থাকে আর উত্তরোত্তর এই অভ্যাস বৃদ্ধি পেতে থাকে, এবং অল্প-স্বল্প পান করার অভ্যাস বাড়াবাড়িতে রূপ নিতে থাকে। কাজেই সামান্য পান করতেও বারণ করা হয়েছে।

অনুরূপভাবে ইসলামে যেখানে রোযার নির্দেশ রয়েছে সেখানে তার প্রজ্ঞা বা কারণও বর্ণনা করা হয়েছে। যদি মানুষ চিন্তা করে তাহলে বুঝবে যে, নামায অথবা রোযার যে নির্দেশ বা খোদা তা’লার এই যে, আদেশ-নিষেধ সবই মানুষের কল্যাণার্থে দেয়া হয়েছে। ইবাদত ছাড়াও তার সংশোধন এবং তার মাঝে নিয়মানুবর্তিতা সৃষ্টিও এর উদ্দেশ্য। যেসব করতে বারণ রয়েছে তাও উপকারী। যা করতে বারণ করা হয়েছে তা না করাও মানুষের জন্য কল্যাণকর। মোটকথা আল্লাহ্ তা’লার প্রতিটি নির্দেশের মধ্যেই হিকমত বা প্রজ্ঞা নিহিত আর প্রজ্ঞা বা কারণ স্পষ্ট না করে আল্লাহ্ তা’লা কাউকে এ কথা বলে না যে, তুমি এই কাজ করো বা করো না।

ষষ্ঠ বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লা কাউকে অন্তর্নিহিত শক্তি ও সামর্থের উর্ধ্বে শরিয়তের কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন নি। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে,

اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْکُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيْرِ وَمَآ اُهِلَّ بِهٖ لِغَيْرِ اللّٰهِ‌ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَّلَا عَادٍ فَلَاۤ اِثْمَ عَلَيْهِ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ‏

অর্থ: ‘তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত জীব-জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যার উপর আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি এগুলো ব্যবহারে বাধ্য হয়েছে অথচ সে অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তাহলে তার উপর কোন পাপ বর্তাবে না - নিশ্চয় আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৭৪)

এই নির্দেশ সম্পূর্ণরূপে যুক্তিযুক্ত এবং পজ্ঞাপূর্ণ। আর মানুষের সহ্যশক্তি ও সামর্থের দিক থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের। যদি প্রাণহানীর আশংকা থাকে তাহলে এসব হারাম বস্তু কেবলমাত্র প্রাণ রক্ষার খাতিরে ব্যবহার করতে পারো, কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু যতটা সম্ভব এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করো আর যতটুকু সম্ভব বৈধ ও অবৈধের মধ্যকার পার্থক্য বজায় রাখো।

এরপর সপ্তম কথা যা স্মরণ রাখার যোগ্য তাহলো, আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী মানুষের শক্তি সামর্থের অন্তর্গত। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘এ আয়াত হতে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী এমন নয় যা পালন করা মানুষের জন্য অসম্ভব। আর আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় বাগ্নিতা ও বাগ্বৈদগ্ধ, উদ্ভাবনী ও আইন প্রনয়ণশক্তি এবং প্রহেলিকা নিয়ে গর্ব করার জন্য পৃথিবীতে এই শরিয়ত এবং আদেশ-নিষেধ অবতীর্ণ করেন নি।’ অর্থাৎ একথা বলেন নি যে, আমার মাঝে এসব শক্তি রয়েছে আর কেউ যদি পারে এমন ধাঁধা উপস্থাপন করুক যার সমাধান কেউ করতে পারবে না আর এরপর গর্বের সাথে বলবে যে, দেখো! আমার কথা তোমরা বুঝতে পারবে না।

তিনি (আ.) বলেন, এ আয়াত হতে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলী এমন নয় যা পালন করা মানুষের জন্য অসম্ভব। আর আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় বাগ্নিতা ও বাগ্বৈদগ্ধ, উদ্ভাবনী ও আইন প্রনয়ণশক্তি এবং প্রহেলিকা নিয়ে গর্ব করার জন্য পৃথিবীতে এই শরীয়ত এবং আদেশ-নিষেধ অবতীর্ণ করেন নি। যেন এভাবে পূর্বেই সিদ্ধান্ত করে রেখেছেন যে, কোথায় দুর্বল ও মূল্যহীন মানুষ? তারা কি করে এসব নির্দেশাবলীর অনুসরণ করবে।’ আল্লাহ্ তা’লা কোন সমস্যায় ফেলা ও নিজ বান্দাদের পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেননি যে, এভাবে আমি আমার বান্দাদের পরীক্ষা করবো - এই দুর্বল ও বেহুদা মানুষ কীভাবে আমার নির্দেশে মোতাবেক চলতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, ‘খোদা তা’লা এমন বাজে কর্ম থেকে মুক্ত ও পবিত্র।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) - ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭৬)

এরপর এ প্রসঙ্গে অষ্টম বিষয় হচ্ছে, শরিয়তের শিক্ষা পালনের জন্য আল্লাহ্ তা’লা যেসব শর্ত নিরূপণ করেছেন তা প্রত্যেকের মেধা, দেহ, জ্ঞান, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক যোগ্যতার নিরিখে এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ জ্ঞান, বিবেক, শারীরিক, অর্থনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক মান অনুসারে - নির্দেশাবলী পালন ও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে বাধ্য। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা যেসব ফরজ বা অবশ্যকরণীয় কাজ নির্ধারণ করেছেন তা স্বীয় সামর্থানুরে সম্পাদন করা অবশ্যই একজন মু’মিনের জন্য কর্তব্য।

একটি হাদীসে এসেছে,

‘একজন গ্রাম্য মানুষ মহানবী (সা.)-এর সকাশে উপস্থিত হয়ে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলো। তিনি (সা.) বলেন, দিবারাত্র পাঁচ বার নামায পড়া। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এছাড়া আর কোন আবশ্যকীয় নামায আছে কি? তিনি (সা.) বলেন, না, তবে যদি নফল পড়তে চাও তাহলে পড়তে পারো। এরপর মহানবী (সা.) বলেন, রমযানের এক মাস রোযা রাখা আবশ্যক। একথা শুনে সে জিজ্ঞেস করলো, এছাড়া আর কোন ফরয আবশ্যকীয় রোযা আছে কি? তিনি (সা.) বলেন, না, কিন্তু যদি নফল রোযা রাখতে চাও তাহলে রাখতে পারো। অনুরূপভাবে মহানবী (সা.) যাকাতেরও উল্লেখ করেন। একথা শুনে সে বললো, এছাড়াও আমার উপর আর কোন যাকাত আছে কি? তিনি (সা.) বলেন, না, কিন্তু যদি সওয়াবের উদ্দেশ্যে তুমি সদকা দিতে চাও তাহলে দিতে পারো। তখন সেই ব্যক্তি একথা বলে চলে যায় যে, খোদার কসম! আমি এর বেশিও করবো না আর কমও করবো না। তিনি (সা.) সেখানে উপবিষ্ট লোকদের বলেন, যদি সে সত্য বলে থাকে তাহলে তাকে সফলকাম মনে করো।’

(মুয়াত্তা ইমাম মালেক - জামিউত্ তরগীব ফীস্ সালাত)

অতএব প্রত্যেকে স্বীয় শক্তি-সামর্থ অনুযায়ী আমল করে থাকে। তিনি (সা.) কিছু-কিছু নফল আদায়েরও উপদেশ দিতেন।

নবম বিষয় হচ্ছে, পবিত্র কুরআনের সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা সহজসাধ্য। ইতোপূর্বে ভিন্ন আঙ্গিকে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ এসেছে। এমন কোন আদেশ নেই যা মানুষের জন্য বোঝাস্বরূপ হতে পারে। যেভাবে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা প্রসঙ্গে আমি বলেছি যে, সত্যিকার মু’মিন তার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হবার চেষ্টা করে। হযরত আয়শা (রা.) বলেছেন,

‘মহানবী (সা.)-এর আচার-ব্যবহার এবং জীবন ছিল পবিত্র কুরআনের নির্দেশাবলীর ব্যবহারিক চিত্র।’

(মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল)

অতএব নিজ নিজ অবস্থা-অবস্থান ও যোগ্যতানুসারে প্রত্যেককে এর উপর আমল করার নির্দেশ রয়েছে এবং আল্লাহ্ তা’লার ঘোষণা হলো, যেহেতু অকারণে তিনি কোন মু’মিনকে কষ্টে নিপতিত করেন না তাই যে নির্দেশই রয়েছে তা প্রতিটি মানুষ পালন করার শক্তি রাখে।

দশম বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লা সকলকে এজন্য সত্য স্বপ্ন দেখান যাতে নবীদের প্রতি নাযিলকৃত ওহী-ইলহাম সম্পর্কে তার যৎসামান্য হলেও বোধবুদ্ধি লাভ হয়। যদি কখনও সত্য স্বপ্ন না দেখে তাহলে সে নবীদের দাবীকেও মিথ্যা মনে করবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘যে নবী আগমন করেন তাঁর নবুয়ত এবং ওহী ও ইলহাম বুঝার জন্য আল্লাহ্ তা’লা সব মানুষের প্রকৃতিতে সুপ্ত গুণ রেখেছেন আর সেই শক্তি হচ্ছে, স্বপ্ন। যদি কেউ কখনও সত্য স্বপ্ন না দেখে তাহলে সে কিভাবে গ্রহণ করতে পারে যে, ইলহাম ও ওহী বলতে কিছু আছে। অপরদিকে আল্লাহ্‌র বৈশিষ্ট্য হলো لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا তাই তিনি সবার ভেতরই এই মূল উপকরণ নিহিত রেখেছেন।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) - ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭৬)

চোর, ডাকাত এবং ব্যাভিচারীরাও সত্য স্বপ্ন দেখে থাকে।

একাদশতম কথা হচ্ছে, শৈশব এবং যৌবনে পদার্পণের পূর্বের যুগ হলো অজ্ঞতার যুগ। অনুরূপভাবে যাদের বুদ্ধি মোটা বা যারা মানসিক প্রতিবন্ধি, তাদের নির্দেশাবলীর উপর আমল না করা অথবা যথাযথভাবে আমল না করা ধর্তব্য নয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘প্রাথমিক যুগ হচ্ছে অজ্ঞতা এবং ঔদাসীন্যের যুগ। আল্লাহ্ তা’লা এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন না কেননা তিনি স্বয়ং বলেছেন, لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) - ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭৭)

দ্বাদশ বিষয় হচ্ছে, যৌবনে, সচেতন বয়সে, বিবেক-বুদ্ধি এবং সকল বৃত্তির সুস্থাবস্থায় আল্লাহ্ তা’লার আদেশাবলীর প্রতি যদি আমল না করা হয় তাহলে তা ধর্তব্য এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ প্রসঙ্গে বলেন,

‘যুগ একটিই..........অর্থাৎ যৌবনকাল, যখন মানুষ কোন কাজ করার সামর্থ রাখে কেননা, তখন বৃত্তি দৃঢ়তা লাভ করে আর শক্তি বৃদ্ধি পায় কিন্তু এ যুগেই নফসে আম্মারা বা অবাধ্য প্রবৃত্তিও সাথে থাকে এবং বিভিন্নভাবে তার উপর আক্রমণ করতে থাকে এবং পদানত রাখতে চায়। এই যুগই জবাবদিহিতার যুগ এবং শুভ পরিণামের উদ্দেশে কিছু অর্জন করারও এটিই সময়। কিন্তু এমন বিপদাপদ পরিবেষ্টিত যে, যদি কঠোর পরিশ্রম না করে তাহলে এই যুগই জাহান্নামে নিয়ে যাবে এবং দুর্ভাগ্য তার অদৃষ্ট হবে। তবে, উত্তমভাবে পুরো সচেতনতা ও সাবধানতার সাথে যদি এই যুগ কাটানো হয় তাহলে আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় শুভ পরিণামের আশা করা যেতে পারে।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) - ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭৭)

অতএব যদিও আল্লাহ্ তা’লা কারো উপর সাধ্যাতীত বোঝা অর্পণ করেন না কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি যেসব আদেশ দিয়েছেন আর যেসব কাজ করতে বারণ করেছেন, যদি সে মোতাবেক একজন মানুষ আপন জীবন পরিচালিত করার চেষ্টা না করে; আর আল্লাহ্ তা’লা নিজ ব্যাপকতর রহমত ও ক্ষমার সুসংবাদ প্রদান করার পরও এত্থেকে উপকৃত না হয়; বরং মানুষ নিজ শক্তি-সামর্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত করে খোদা তা’লার নির্দেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, এই কর্ম জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার কারণ হয়ে থাকে।

আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ংও لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا বলার পর আবার বলেন, لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ অর্থাৎ সে যা কিছু ভাল করবে, তা তার জন্যই কল্যাণকর হবে এবং সে যা মন্দ করবে, সেটার দায়ভারও তারই উপর বর্তাবে। পুণ্যের জন্য كَسَبَتْ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা সহজে করা সম্ভব, যদি ইচ্ছে থাকে। কেননা, পুণ্য প্রকৃতিগত বিষয়। কিন্তু অনেক সময় মানুষ স্বীয় দুর্ভাগ্যের কারণে প্রকৃতি মোতাবেক কাজ করার পরিবর্তে মন্দের পথ বেছে নেয় যা প্রকৃতি বিরুদ্ধ বিষয়। নৈতিক শক্তিগুলোকে সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহার না করার কারণে মানুষ সে-ই পথে পরিচালিত হয় যা আল্লাহ্ তা’লার পছন্দনীয় নয় অথচ সে মনে করে এটি সহজ পথ। কিন্তু যখন পাপ ও পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হতে থাকে তখন বুঝে যে, আমি এক ক্ষতিকর পথে অগ্রসর হচ্ছি।

হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) ইকতেসাব সম্পর্কে আরও একটি নিগুঢ় কথা বর্ণনা করেছেন যে, পাপের মধ্য হতে কেবল সেই পাপের শাস্তি হবে যাতে ইকতিসাব রয়েছে অর্থাৎ জেনেশুনে ও সংকল্প করে যে পাপ করা। তা পরিহার করে না বরং জেনে-বুঝে তা করতে থাকে। অতএব আল্লাহ্ তা’লা কোন প্রাণের উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না আর না-ই এমন কোন আদেশ দেন যা তাকে কষ্টে নিপতিত করতে পারে বরং মার্জনা, উপেক্ষা এবং ক্ষমা করে থাকেন। কিন্তু যদি কোন মন্দ ও পাপের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে ধৃষ্টতা সৃষ্টি হয় আর সে তা করতেই থাকে তাহলে এর শাস্তি রয়েছে। তাই আমাদের প্রিয় এবং দয়ালু খোদা এই আয়াতের পরবর্তী অংশে আমাদেরকে এই দোয়াও শিখিয়েছেন যাতে পুণ্যকর্মের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে যা সর্বাবস্থায় প্রকৃতিসম্মত এবং এর উপর আমল করা মানুষের সাধ্যের ভিতর রয়েছে। যেমন তিনি বলেন:

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِيْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا‌ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِنَا‌‌ۚرَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ‌ ۚ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا اَنْتَ مَوْلٰٮنَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِيْنَ

অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক-প্রভু! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা কোন ভুল-ত্রুটি করে ফেলি তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না; হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না যেমনটি তুমি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর তাদের পাপের পরিণামে অর্পণ করেছিলে এবং হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন বোঝা অর্পণ করো না যা বহণ করার মত ক্ষমতা আমাদের নেই; তুমি আমাদের মার্জনা করো, আমাদেরকে ক্ষমা করো, আমাদের প্রতি দয়া করো, তুমি-ই আমাদের অভিভাবক, সুতরাং তুমি আমাদেরকে কাফির জাতির বিরুদ্ধে সাহায্য করো।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২৮৭)

আত্মশুদ্ধির জন্য এই দোয়াগুলো একান্ত আবশ্যক। কেননা, যখন আত্মশুদ্ধি হবে তখন لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا ’র সঠিক ব্যুৎপত্তিও লাভ হবে। একান্ত বিনয়ের সাথে মানুষ এই দোয়া করে যে, হে আমাদের খোদা! এসব পুণ্যকর্ম যা আমরা ভুলে গেছি তার জন্য আমাদের ধৃত করো না। যাদেরকে তুমি ধৃত করছো - আমাদের পরিণতি তাদের মত করো না। এখানে ‘তাদের পরিণতি দিও না’ এই দোয়া আমরা বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী অথবা তোমার নির্দেশের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন ছিলাম বলে নয়। বরং বিস্মৃতি অথবা ভুল-ত্রুটির কারণে যা মানব প্রকৃতির অংশ। কাজেই আমাদের পক্ষ থেকে যদি কোন ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে তাহলে আমাদেরকে তাদের মধ্যে গণ্য করো না যারা এ অপরাধে অভ্যস্ত ছিল।

তারপর একান্ত বিনয়ের সাথে একজন মু’মিন এই দোয়াও করে হে খোদা! আমাদেরকে সেজন্য পাকড়াও করো না যা আমরা পরিকল্পিতভাবে ও জেনে-শুনে করিনি। বরং আমাদের দ্বারা এই কর্ম সংঘটিত হওয়া আমাদের - বুঝার ভুল। আর আমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছো - যে বোঝা আমাদের উপর অর্পণ করেছো তার পরিণতিও যেন পূর্ববর্তী জাতির মতো না হয় বরং আমাদেরকে আমাদের অঙ্গীকার পালনের তৌফিক দাও। নতুবা যারা জবাবাদিহির সম্মুখীন হয়েছিল আমরাও তাদের দলভূক্ত হতে পারি।

তারপর খোদা তা’লার একথা বলা সত্ত্বেও যে, আমি কারো উপর সাধ্যাতীত বোঝা অর্পণ করি না, কিন্তু একজন সত্যিকার মু’মিন এবং আল্লাহ্ তা’লার ভয়ে ভীত ব্যক্তির কাজ হচ্ছে, স্বীয় বিনয় প্রকাশ করতঃ খোদা তা’লার কাছে তাঁর সেই কথার বরাত দিয়ে দোয়া করা যে, কোথাও আমার কর্মফল, সাধ্যাতীত কোন পরীক্ষা ও বোঝা আবার আমার উপর চাপিয়ে না দেয়। তাই সর্বদা আমায় মার্জনা করো। আমাকে সর্বদা তোমার ক্ষমার চাদরে আবৃত রাখো যেন আমি তোমার রহমত থেকে অংশ পেতে থাকি, আর যে ইমামের প্রতি ঈমান আনার তৌফিক আমায় দিয়েছো তাঁর উপর সর্বদা যেন অটল থাকি এবং তা যেন সর্বদা দৃঢ়তর করতে থাকি। আমার দুর্বলতা যেন আমার শত্রুদেরও - আমার ঈমান বিনষ্ট করার সুযোগ না দেয় অথবা আমার কারণে আমার ধর্ম এবং জামাতের যেন কোন ক্ষতি না হয়।

অনেক সময় এক ব্যক্তির ভুল গোটা জামাতকে পরীক্ষায় ফেলতে পারে। তাই ‘আমরা’ বলে সকল মু’মিনকে জামাতবদ্ধভাবে পরস্পরের জন্য দোয়ার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যাতে দোয়ার সর্বাত্মক প্রভাব পড়ে এবং প্রত্যেকের স্বয়ং নিজেকে পবিত্র করার ও দায়-দায়িত্ব অনুধাবনের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হয় আর জামাতও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে শত্রুর সকল অনিষ্ট হতে রক্ষা পায়।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে পুরো শক্তি-সামর্থ দিয়ে সকল শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তৌফিক দিন। নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা আমাদের শক্তি-সামর্থ ও যোগ্যতাকে দৃষ্টিতে রেখেই তা সম্মাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা যেন একই অবস্থানে স্থির-স্থবির না থাকি বরং সকল শক্তিসামর্থেও ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’লা আমাদের উন্নতি দেয়া অব্যাহত রাখুন আর জামাতবদ্ধভাবেও যেন আমরা উন্নতির রাজপথে দ্রুততার সাথে সোপান মাড়াতে পারি। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের তৌফিক দান করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্র: কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে