In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্‌ - ওয়াসে’ - তৃতীয় অংশ - তাক্ওয়া (খোদাভীতি)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২২শে মে, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى

(সূরা আন্ নাজ্‌ম: ৩৩)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেছেন,

‘কখনো এই দাবী করো না যে, আমি পূত-পবিত্র। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআন বলেছেন, فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ (সূরা আন্ নাজ্‌ম: ৩৩) অর্থাৎ তোমরা স্বয়ং নিজেদেরকে পূত-পবিত্র বলে ঘোষণা দিও না, তোমাদের মাঝে কে মুত্তাকী তিনি তা ভালো জানেন।’

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড-পৃ: ৯৬; নবসংস্করণ)

অতএব পাক-পবিত্র হওয়া, মুযাক্কা (পবিত্র) হওয়া ত্বাকওয়ার সাথে শর্তযুক্ত।

ত্বাকওয়া কী? ত্বাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য সব ধরনের পাপ এড়িয়ে চলা, এবং প্রত্যেক সেই কাজ করা আল্লাহ্ তা’লা যা করার আদেশ দিয়েছেন, আর এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা যা করতে আল্লাহ্ তা’লা বারণ করেছেন। এজন্য আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বারবার বলেছেন, আমি তোমাদের আত্মাকে পবিত্র করে থাকি, এও জানি কার হৃদয় প্রকৃত খোদা ভীতিতে পরিপূর্ণ এবং কে কতটা পবিত্রতা লাভ করেছে। আল্লাহ্ তা’লা যিনি হৃদয়ের স্বরূপ সম্পর্কে অবগত, যা কিছু আমরা প্রকাশ করি এবং গোপন করি সে সম্পর্কেও তিনি সবিশেষ অবহিত। আল্লাহ্ তা’লাকে কখনো এবং কোন ভাবেই ধোকা দেয়া যায় না।

হাদীসে এসেছে, কর্মের ফলাফল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। মানুষের মনের অবস্থা সম্পর্কে খোদা তা’লা সবিশেষ অবগত, বান্দার সকল কর্মের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত। বাহ্যিকভাবে যারা পুণ্যকর্ম করে, ইবাদতকারী, রোযাদার, এমনকি কতক মানুষ এমনও রয়েছে যারা কয়েকবার হজ্জ্ব করেছে কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে যদি, তাদের নিয়্যতের ত্রুটি থাকে তবে তা আল্লাহ্ তা’লার নিকট গৃহীত হবার অযোগ্য। এ সমস্ত ইবাদত ও নেকী শুধু প্রত্যাখ্যাতই হয় না বরং আল্লাহ্ তা’লা কুরআন করীমে বলেছেন, এগুলো ধ্বংসেরও কারণ। কিন্তু এটাও আমাদের উপর আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহ, যেখানে তিনি আমাদেরকে সতর্ক করেন আর মনোযোগ আকর্ষণ করেন যে, সতর্ক হয়ে যাও; সেখানে আপন সর্বব্যাপি করুণার বরাতে ক্ষমার নিশ্চয়তাও দিয়ে থাকেন। আল্লাহ্ তা’লার সতর্ক করা প্রকৃত পক্ষে আমাদের মঙ্গলের জন্য এবং আমাদেরকে সহজ সরল পথে পরিচালিত করার জন্য। আমি পূর্বেই বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা আমাদের মনের খবর রাখেন এবং আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থের পরিধি সম্পর্কে অবহিত। তাই তিনি এ সুসংবাদও দিয়েছেন, যদি তোমাদের হৃদয়ে ত্বাকওয়া থাকে, নিয়্যত পরিস্কার হয় এবং তোমরা যদি আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সৎকর্ম করার চেষ্টা কর তবে যেসব ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলন ঘটে থাকে তা তিনি নিজ ক্ষমার চাদরে ঢেকে রাখেন। আমি যে আয়াত তেলাওয়াত করেছি তাতে তিনি বলেন, সৎকর্মশীল তারা যারা সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ব্যতীত বড় ধরনের পাপ ও অশ্লীলতা এড়িয়ে চলেন, নিশ্চয় তোমার প্রভূ অতীব ক্ষমাশীল। যখন তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন তখন থেকে তিনি তোমাদেরকে জানেন এবং যখন তোমরা তোমাদের মাতৃগর্ভে ভ্রুণরূপে ছিলে তখনও তিনি জানতেন, কাজেই তোমরা নিজেদেরকে অনর্থক পূত-পবিত্র মনে করো না। কে মুত্তাকী, তা তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন।

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বড় বড় পাপ ও অশ্লীলতা হতে বাঁচার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন এবং একইসাথে সামান্য ভুল-ত্রুটিকে উপেক্ষা করে নিজের ব্যাপক ক্ষমাশীলতার আওতায় মার্জনারও শুভসংবাদ দিয়েছেন; কিন্তু এর সাথে পরবর্তী কথা এও বলে দিয়েছেন যে, খোদা তা’লা তোমাদের হৃদয়ের চিত্র সম্পর্কেও সম্যক অবহিত। তিনি কতটা জানেন, তা আমাদেরকে বুঝানোর জন্য সেই চরম সীমার অর্থাৎ এ পৃথিবীতে যখন জীবনের অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন তার কথা উল্লেখ করেছেন। মানব সৃষ্টির শত কোটি বছর পূর্বে প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যা মানুষের অস্তিত্বের জন্য আবশ্যক। তখন থেকে তিনি তোমাদেরকে জানেন। এরপর কেমন প্রকৃতির সাথে মানুষকে সৃষ্টি করতে হবে, কি-কি যোগ্যতা ও সামর্থ দান করতে হবে এটি একটি গভীর বিষয়, যে দিকে অপর কয়েকটি আয়াত দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে।

যাহোক আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তিনি তোমাদের সম্পর্কে এতটা গভীর জ্ঞান রাখেন যতটা তোমরা নিজেরাও রাখ না। এই সৃষ্টি ও ক্রমন্নোতির প্রক্রিয়ার তোমাদের সংখ্যা গরিষ্ঠ শ্রেণী জ্ঞানই রাখে না। একে আয়ত্ত করা তো দূরের কথা, এর জ্ঞানও নেই।

বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের গবেষণার ফলে এ বিশ্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য সামনে আসছে, যা কেবল এক বিশেষ স্তরের মানুষ এবং বিশেষ জ্ঞানের অধিকারীরা বুঝতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আমি তখন থেকে এ বিষয়ে জ্ঞাত যে, তোমাদের যোগ্যতা কি, তোমরা কি করতে সক্ষম হবে এবং তোমাদের নিয়্যত কেমন হবে। এরপর এর পূর্ববর্তী অবস্থার দিকে দেখ; খোদা তা’লা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন যে, তোমাদের মাতৃগর্ভে তোমাদের বেড়ে উঠা সম্পর্কে অধিকাংশ লোকই জানে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, শোন! ���োমরা যখন তোমাদের মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় ছিলে, যখন তোমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বৃদ্ধি পাচ্ছিল মাত্র, আমি সে অবস্থা সম্পর্কেও অবহিত।

বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে বরং উন্নয়শীল দেশগুলোতেও চিকিৎসা শাস্ত্রে এতটা উন্নতি সাধিত হয়েছে যে, গর্ভাবস্থায় মাতৃগর্ভে শিশু বিভিন্ন ধরনের যেসব আকার-আকৃতি ধারণ করে তা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে বুঝা যায়। এ সুবাদে মানুষ এটা জানে, বুঝাও যায় যে, ছেলে হবে না কি মেয়ে। সাধারণত ডাক্তার কিছুটা অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলে থাকে, তারাও শত ভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।

যাহোক, আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আল্লাহ্ তা’লা এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার যুগ থেকেই তোমাদের সম্পর্কে জানেন যে, কি যোগ্যতা ও সামর্থসহ তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আর জন্মের পর কোন্ পরিক্রমায় আবর্তিত হয়ে তোমরা বিভিন্ন মাইল ফলক অতিক্রম করবে। কিন্তু অদৃশ্য সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর বান্দার সম্মুখে ভাল ও মন্দ কর্মের পরিবেশ সহজলভ্য করে দিয়েছেন। যে উত্তম কাজ করবে সে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করবে এবং যে মন্দ কাজ করবে সে আল্লাহ্ তা’লা কর্তৃক ধৃত হতে পারে।

নেক কর্ম কী? নেক কর্ম হচ্ছে সেই কাজ যা শুধু মাত্র আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করা হয়। এ জন্য বলেছেন, যখন তোমরা নেক কাজ কর তখনও অনেক ক্ষেত্রে আত্মম্ভরিতা প্রকাশ পেতে পারে। তাই কাজ করার পরও এ সিদ্ধান্ত নেয়া তোমাদের দায়িত্ব নয় যে, আমরা পুণ্যকর্ম করেছি। কাজ কোন্ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? কাজ যদি নেক মনমানসিকতায় হয়ে থাকে তবে তা আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য দানকারী হবে। আল্লাহ্ তা’লাই জানেন কি উদ্দেশ্যে ভাল কাজ করা হচ্ছে। তাই তিনি বলেন, কোন পূণ্যকর্ম করে অহংকারী হওয়ার পরিবর্তে নেককর্ম যেন বিনয় ও ত্বাকওয়াকে আরো উন্নত করে। এরপর বলেছেন, কোন মানুষ নিজেকে নিজে ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সনদ প্রদান করতে পারে না আর অন্য কাউকে ত্বাকওয়ার সনদ প্রদান করাও কোন বান্দার কাজ নয় বরং এটা আল্লাহ্ তা’লার কাজ। আল্লাহ্ তা’লাই এ কথা সবচেয়ে ভাল জানেন যে, মুত্তাকী কে?

এখানে এ কথাটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, আল্লাহ্ তা’লা আয়াতের শুরুতেই বলেছেন,

الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ

অর্থাৎ, সেইসব লোক যারা সামান্য ভুল-ত্রুটি ব্যতীত বড় পাপ ও অশ্লীলতা হতে আত্মরক্ষা করে চলে।

(সূরা আন্ নাজ্‌ম: ৩৩)

এখানে ‘লামাম’ শব্দের অর্থ কি তাও স্পষ্ট করা উচিত। আমি অনেককে দেখেছি তারা এ স্থানে নিজেদের মনগড়া অর্থ করে। এই অর্থ যেন না করে যে, বড় বড় পাপ বা গুনাহে কবীরা বা অশ্লীলতা অল্প সল্প হয়ে গেলে কোন অসুবিধা নাই বরং বলা হয়েছে মানুষ যেহেতু দুর্বল কোন কোন ক্ষেত্রে অজান্তে বা অবচেতন মনে গুনাহ্ হয়ে যায়। যদি এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে প্রকৃত অনুশোচনা হওয়া উচিত এবং এর জন্য অনেক বেশি ইস্তেগফার করা আবশ্যক।

‘লামামা’ হচ্ছে মন্দের দিকে ঝুঁকার প্রবণতা অথবা সাময়িক বা তুচ্ছ স্খলন বা ভুল-ভ্রান্তি যদি হয়ে যায় তবে তা হবে সাময়িক, স্থায়ী নয়। এর অন্য অর্থ হতে পারে, শয়তানী ধ্যান-ধারণা হঠাৎ করে যদি মাথায় আসে তাৎক্ষণিক ভাবে খোদার অনুগ্রহে মানুষ যেন সেটিকে এড়িয়ে চলে। আর এর ফলে এসব শয়তানী ধ্যান-ধারণা মানুষের মাথায় যেন স্থায়ী প্রভাব না ফেলে। সুতরাং এটি হলো মানুষের প্রকৃতি সম্মত নির্দেশ। কেননা ভাল অথবা মন্দকে গ্রহণ বা বর্জন করার জন্য মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে? আর সমাজে এই সমস্ত পাপ নিজের দিকে আকর্ষণের চেষ্টাও করছে। চতুর্দিকে স্বাধীনতাই স্বাধীনতা, লজ্জাহীনতা চোখে পড়ে, দুশ্চরিত্রতার রাজত্ব। এ কারণে যদি কখনো কোন মন্দের দিকে আকর্ষণ অনুভব হয় তখন তাৎক্ষণিক ভাবে ইস্তেগ্ফারের মাধ্যমে পাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করা উচিত। সুতরাং খোদা তা’লার ক্ষমা সীমাহীন। আল্লাহ্ তিনি যিনি অতীব ক্ষমাশীল, দানশীল এবং তওবা কবুলকারী, তিনি মানুষের তওবা কবুল করে থাকেন। সুতরাং যা প্রকৃত ত্বাকওয়ার পানে পথ প্রদর্শন করে সে অবস্থা সৃষ্টি করা উচিত। নতুবা মানুষতো সামান্য নেকী নিয়ে অহংকার আরম্ভ করে এবং নিজেকে পবিত্র জ্ঞান করতে থাকে।

এ জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

কখনো এটা দাবী করো না যে, আমি পূত-পবিত্র। কেউ পবিত্র কিনা এবং ত্বাকওয়া উপর চলছে কিনা সে জ্ঞান শুধুমাত্র আল্লাহ্ই রাখেন। সুতরাং তাঁর সামনে বিনত হওয়া উচিত।

এই বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করতে গিয়ে এক জায়গায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন:

‘আল্লাহ্ তা’লা যিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ (সূরা আন্ নাজ্‌ম: ৩৩) এই আয়াতের সঠিক অর্থ বুঝার জন্য তোমাদের পবিত্র হওয়ার দাবী করা এবং নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশের ভেতর সুস্পষ্ট পার্থক্য জানা থাকা প্রয়োজন; যদিও বাহ্যিক দিক থেকে উভয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ। অতএব তুমি যদি শ্রেষ্ঠত্বকে নিজের প্রতি আরোপ কর আর মনে কর যে, তুমি কোন বিশেষ যোগ্যতা রাখ আর সেই সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যাও যিনি তোমার উপর অনুগ্রহ করেছেন তখন তোমার এই কর্ম আত্মশুদ্ধি পরিপন্থী হবে। কিন্তু যদি তুমি নিজের পরাকাষ্ঠার সাধুবাদ প্রভুকে দাও আর বিশ্বাস রাখ যে, সকল প্রকার নিয়ামত আল্লাহ্ তা’লারই দান এবং নিজের উৎকর্ষতা দেখে তুমি তোমার আমিত্ব নয় বরং চতুর্দিকে আল্লাহ্ তা’লার শক্তি, তাঁর সামর্থ, তাঁর অনুগ্রহ এবং তাঁর কৃপার প্রতি দৃষ্টি রাখ এবং নিজেকে গোসল দাতার হাতে মৃত লাশ সদৃশ জ্ঞান কর এবং নিজের নফসের প্রতি কোন পরাকাষ্ঠা আরোপ না কর, তাহলে এটিকে বলা হয় আল্লাহ্‌র নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ।’

(হামামাতুল বুশরা-রুহানী খাযায়েন-৭ম খন্ড-পৃ: ৩২১-৩২২)

এই উদ্ধৃতি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আরবী বই হামামাতুল বুশরা থেকে নেয়া হয়েছে যার অনুবাদ উপস্থাপন করলাম। এটি একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) প্রকাশ করেছেন। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ

অর্থ: যে পবিত্র হয়, সে নিজ স্বার্থেই পবিত্রতা অবলম্বন করে।

(সূরা আল্ ফাতের: ১৮)

তারপর সূরা আল্ আ’লায় বলেন, যা আমরা প্রত্যেক জুমুআর নামাযে পড়ি,

قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى

অর্থ: যে পবিত্র হবে সে সফলকাম হবে।

(সূরা আল্ আ’লা: ১৫)

আর এক জায়গায় বলেন,

قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا

অর্থ: নিশ্চয় সে সফলকাম হয়েছে যে তাকে পবিত্র করেছে, অর্থাৎ নিজ আত্মাকে পবিত্র করেছে।

(সূরা আশ্ শামস: ১০)

অতএব এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তোমাদের সফলতা- তোমাদের আত্মশুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। এ আয়াতগুলোতে আর আমি যে আয়াত তেলাওয়াত করেছি আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যার ব্যখ্যা করেছেন তা হল সূরা নাজমের আয়াত। এই আয়াতগুলোতে কোন বিরোধ নেই বরং যেমনটি কিনা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে যা সর্বদা স্মরণ রেখো। আত্মশুদ্ধির নির্দেশ রয়েছে, এর জন্য চেষ্টা কর কিন্তু এই চেষ্টা করে তুমি দাবী করতে পারবে না যে, আমি পবিত্র হয়ে গেছি বা আমার কর্ম এমন, যা করার পরে এখন আমি পবিত্র বলে গণ্য হতে পারি।

সূরা ফাতের এর আয়াত, যার একটি অংশের কথা আমি বলেছি, وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ (সূরা আল্ ফাতের: ১৮) অর্থাৎ যে-ই পবিত্র হয় সে তার নিজের নাফসের জন্যই পবিত্র হয়ে থাকে। এর পুরো আয়াতটি এমন যে,

وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرَىٰؕ وَاِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ اِلٰى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَىْءٌ وَّلَوْ كَانَ ذَا قُرْبٰى ؕ اِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِيْنَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَاَقَامُوْا الصَّلٰوةَ ؕ وَمَنْ تَزَكّٰى فَاِنَّمَا يَتَزَكّٰى لِنَفْسِه ؕ وَاِلَى اللّٰهِ الْمَصِيْرُ‏

অর্থাৎ, কোন বোঝা বহনকারী অন্য কারো বোঝা বহন করবে না এবং কোন ভারাক্রান্ত তার ভার বহনের জন্য কাউকে ডাকলেও তার ভার হতে সামান্য পরিমানও লাঘব করা হবে না, যত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ই হোক না কেন। (এখানে পরকালের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। আয়াতের পরের অংশে যে বিষয় বর্ণিত হয়েছে তা হলো) তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পারো যারা অদৃশ্যেও নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। এবং যে ব্যক্তি পবিত্র হয় সে নিজ আত্মারই কল্যাণের জন্য পবিত্র হয়, এবং আল্লাহ্‌র নিকটই সকলকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

(সূরা আল্ ফাতের: ১৯)

অতএব এখানে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, শুধু তারা আত্মাকে পবিত্র করতে পারে যে,

يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ

অর্থাৎ, যারা প্রভু-প্রতিপালককে অদৃশ্য হওয়া সত্ত্বেও ভয় করে।

(সূরা আল্ আম্বিয়া: ৫০)

অতএব অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে তাদের নামায অন্যান্য ইবাদত এবং অপরাপর পূণ্যকর্মও খোদাভীতির সাথে খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়ে থাকে। অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে মানুষ কখনো স্বীয় পবিত্রতার ঢোল পিটাতে পারে না। যদি হৃদয়ে খোদাভীতি থাকে তাহলে প্রত্যেকটি পুণ্যকর্ম যা সে করে এবং পুণ্য করার যেসব সুযোগ সে লাভ করে তাকে সে খোদা তা’লার অপার কৃপা জ্ঞান করে।

সুতরাং যে এ অবস্থায় আত্মজিজ্ঞাসার চেতনা নিয়ে আত্মাকে পবিত্র করার চেষ্টা করে এবং ত্বাকওয়ার পথে চলে সে-ই আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে পবিত্র এবং সফলকাম। কেউ যদি নিজের কোন যোগ্যতার বলে পুণ্য হয়েছে বলে মনে করে, তাহলে তার আত্মা পরিশুদ্ধ নয়। সুতরাং একজন মু’মিন সব সময় খোদা ভীতির সাথে সেসব পুণ্যের সন্ধান করতে থাকে যেন সে তদ্বারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। বরং আল্লাহ্ তা’লা বলেন, যদি সে সকল পাপ হতে বাঁচার চেষ্টা কর তাহলে খোদা তা’লা নিজেই তোমাদের পাপ দূরীভূত করবেন এবং তোমাকে সম্মানজনক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। এক জায়গায় বলেন:

اِنْ تَجْتَنِبُوْا كَبَآٮِٕرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّاٰتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُّدْخَلاً كَرِيْمًا‏

অর্থাৎ যদি তোমরা বড় গুনাহ্‌কে এড়িয়ে চল, যা থেকে তোমাদের বারণ করা হয়েছে, তাহলে আমরা তোমাদের পাপ দূরিভূত করে দিব। শুধু পাপই যে দূর করব তা নয় বরং সম্মানজনক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবো।

(সূরা আন্ নিসা: ৩২)

আমি পূর্বেই একবার বলেছি, পবিত্র কুরআনে ‘বড় পাপ’ শব্দ এসেছে কিন্তু বড় এবং ছোট পাপের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য করা হয়নি। প্রত্যেক সেই গুনাহ্ যা পরিত্যাগ করা মানুষের জন্য কঠিন তা যদি সামান্যও হয় সেটা তার জন্য বড় গুনাহ্। এজন্য আল্লাহ্ তা’লা কতককে চিহ্নিত করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এটি পাপ; একথা সঠিক কিন্তু প্রত্যেক পাপ যাকে মানুষ সামান্য মনে করে তা যদি পরিত্যাগ করা কঠিন হয় তাহলে তা বড় পাপ বলে গণ্য হবে।

সে কারণে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, অদৃশ্যে খোদার ভয় হৃদয়ে লালন করে নিজ আত্মাকে পবিত্র করার চেষ্টা কর। সুতরাং আল্লাহ্ তা’লার ভয় থাকলেই পাপের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হবে আর তাহলেই খোদা তা’লার দৃষ্টিতে মানুষ পবিত্র আখ্যায়িত হয় এবং যখন খোদা তা’লার দৃষ্টিতে মানুষ পবিত্র হয় তখন সেটিই আসল সম্মানের মোকাম যেখানে মানুষকে খোদা তা’লা পবিত্র করে প্রবিষ্ট করেন। সেই সম্মান প্রকৃত সম্মান নয়, যদ্বারা মানুষ আত্মম্ভরিতা ও অহংকার বশে স্বীয় পুণ্যকর্ম প্রকাশের মাধ্যমে পবিত্র হওয়ার দাবী করে।

পবিত্র কুরআনের এক স্থানে খোদা তা’লা বলেন, মু’মিনের লক্ষণ হলো,

وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ

অর্থ: এবং যারা বড় বড় পাপ এবং অশ্লীল কাজ বর্জন করে এবং যখন রাগান্বিত হয়, তখন ক্ষমা করে দেয়।

(সূরা আশ্ শূরা: ৩৮)

অতএব এখানে পুনরায় সকল পাপ ও নৈতিক দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে এবং তা থেকে আত্মরক্ষার সদুপদেশ দেয়া হয়েছে; কিন্তু এ সকল পাপ, নির্লজ্জতা ও চারিত্রিক ব্যাধিকে ক্রোধের সাথে একত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। অতএব যারা ক্রোধ বা রাগকে সামান্য জিনিস মনে করে তাদের জন্য উপদেশ হলো, (জেনে রাখো) এটি বৃদ্ধি পেতে পেতে বড় পাপের রূপ ধারণ করে। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে, রাগ কোন সাধারণ পাপ নয়। যদি একে নিয়ন্ত্রণ না করা হয় পরন্তু এর অন্যায় ব্যবহার করা হয় তাহলে এটি বড় পাপের রূপ নেয়। অনেক সময় রাগ ধরে কিন্তু মানুষ ক্রোধের বশীভূত হয় না বরং মানুষ এর বৈধ ব্যবহার করে যাতে অন্যের সংশোধন হয়।

যদি মানুষ ক্রোধের বশীভূত হয়ে পড়ে তাহলে আত্মা আর পবিত্র থাকে না। তাই এটি মনে করো না যে, আমি যেহেতু অন্যান্য পূণ্যকর্ম করছি তাই রাগের কুফলকে আমার অন্যান্য পূণ্য বিদূরিত করবে। আল্লাহ্ তা’লা পূর্বেই বলে রেখেছেন, এই অলীক ধারণা মন থেকে বের করে দাও। যদি পবিত্র হতে চাও আর সত্যিকার পবিত্রতা কামনা করো তাহলে তোমাদের চারিত্রিক অবস্থার সংশোধন করো।

প্রায় অভিযোগ আসে- রাগের অবস্থায় ঘরে ঝগড়া হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ চলছে। কখনও স্ত্রী নিজেকে সম্বরণ করতে পারে না আবার কোথাও স্বামী নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সমাজে ঝগড়া-বিবাদ হচ্ছে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ চলছে। খেলার মাঠে ঝগড়া-বিবাদ হয়ে থাকে। অথবা মারামারি না হলেও বিভিন্ন ব্যাপারে একে অপরের বিরুদ্ধে হৃদয়ে ক্রোধ লালন করে। এরফলে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। পরষ্পরের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, এটিও অনেক বড় পাপ এবং তোমাদের আত্মশুদ্ধির পথে অন্তরায়। আর এটি যখন পথের প্রতিন্ধকতা বা বাঁধ সাথে তখন সফলতার সোপান অতিক্রম হয় না। এমন মানুষ আল্লাহ্ তা’লার কাছেও সম্মানজনক মর্যাদা লাভে সক্ষম হয় না। কেননা আল্লাহ্ তা’লা সুস্পষ্টভাবে বলে রেখেছেন, আমি পাপ এবং অশ্লীলতা থেকে মুক্তদের সম্মান প্রদান করবো। অতএব এটি সেই চুড়ান্ত লক্ষ্য যার জন্য একজন মু’মিনকে চেষ্টা করা উচিত। যাতে আল্লাহ্ তা’লার ব্যাপক ক্ষমা হতে অংশ লাভ করে আমরা তাঁর সন্তুষ্টির জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘স্মরণ রেখো! তাঁর (খোদা তা’লা) উক্তি মোতাবেক প্রকৃত পরিচ্ছন্নতা হলো قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا । প্রত্যেককে নিজের অবস্থার পরিবর্তন আবশ্যক করে নেয়া উচিত।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.), ৪র্থ খন্ড-সূরা আশ্ শামস এর ১০ নাম্বার আয়াতের তফসীর; পৃ: ৫৩৫)

অবস্থার সংশোধনের জন্যও আল্লাহ্ তা’লার সাহায্যের প্রয়োজন। তাঁর কৃপা লাভের জন্য সর্বদা তাঁর সমীপে বিনত থাকা আবশ্যক। তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা আবশ্যক। তাঁর দয়া অন্বেষণ করা প্রয়োজন। আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং বলেছেন, আমার দয়া সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে এবং তা অত্যন্ত ব্যাপক। আরো বলেন, আমার ক্ষমাও অত্যন্ত ব্যাপক। অতএব সৎকর্ম সম্পাদনের পাশাপাশি যখন আমরা আল্লাহ্ তা’লার কৃপা আকর্ষণের চেষ্টা করবো। তাঁর কাছে তাঁর ব্যাপক ক্ষমা লাভের প্রার্থনা করবো তখনই আমরা সফল হবো।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আত্মশুদ্ধির রীতি এবং যেসব পথে সত্যিকার ত্বাকওয়া লাভ হওয়া সম্ভব তার দিশা দিতে গিয়ে একটি উদ্ধৃতিতে বলেন, এই উদ্ধৃতি দীর্ঘ কিন্তু সবার শোনা উচিত, তিনি (আ.) বলেন,

‘আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, মানুষ বড় বড় পাপ সহজেই পরিত্যাগ করে কিন্তু কতক পাপ এত সূক্ষ্ম এবং প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে যে, প্রথমত মানুষ যে সে পাপে অভ্যস্ত তা বুঝে উঠাই কঠিন হয়ে যায়। এরপর তা পরিত���যাগ করতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এর দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে, টাইফয়েড যদিও একটি মারাত্মক জ্বর কিন্তু এর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা সম্ভব। অপরপক্ষে যক্ষ্মার চিকিৎসা সম্ভব হলেও তা ভেতরে ভেতরে মানুষকে খেয়ে ফেলে- একারণে এর চিকিৎসা করা খুবই কঠিন।

সূক্ষ্ম এবং প্রচ্ছন্ন পাপের অবস্থাও অনুরূপ যা মহান মার্গ অর্জনের পথে অন্তরায়। এগুলো হলো নৈতিক ব্যাধি যা পারষ্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় ও সামান্য মতানৈক্যের ফলে হৃদয়ে হিংসা, বিদ্বেষ, কপটতা ও অহংবোধ জন্ম নেয় ফলে মানুষ নিজ ভাইকে ছোট মনে করে। কয়েক দিন যদি সুন্দরভাবে নামায আদায় করে আর মানুষ তার প্রশংসা করে তাহলে কপটতা ও লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হয় কিন্তু আন্তরিকতা যা মূল উদ্দেশ্য ছিল তা লোপ পেতে থাকে।

যদি খোদা তা’লা সম্পদ ও জ্ঞান দিয়ে থাকেন বা বংশীয় কোন সুনাম থাকে তাহলে অন্য ভাই যারা এগুলো থেকে বঞ্চিত তাদেরকে তুচ্ছ এবং লাঞ্ছিত মনে করে। আর নিজ ভাইয়ের ছিদ্রান্বেষণে লেগে থাকে। অহংকার বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়ে থাকে। কারো ভেতর এক ভাবে আবার কারো মাঝে অন্য কোন রূপে। উলামারা জ্ঞানের আকারে তা প্রকাশ করে আর জ্ঞানের গরিমা দেখিয়ে আপন ভাইকে অপদস্থ করতে চায়। মোটকথা কোন না কোন ভাবে দোষ-ত্রুটি বের করে ভাইকে লাঞ্ছিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। দিবারাত্র তার দোষ-ত্রুটির সন্ধানে থাকে।

এমন সূক্ষ্ম পাপ থেকে থাকে যা বিদূরিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায় এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। এসব পাপাচারে যে কেবল সাধারণ মানুষই লিপ্ত থাকে তা নয় বরং ঐসব লোক যারা জানা পাপ এবং বড় বড় পাপ করে না এবং বিশেষ লোক বলে বিবেচিত তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতে জড়িয়ে পড়েন। এসব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া এবং মারা যাওয়া একই কথা। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব পাপ হতে মুক্তি না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণরূপে আত্মশুদ্ধি হবে না এবং মানুষ সেই পরাকাষ্ঠা এবং নিয়ামতরাজির উত্তারধিকারী হয় না যা আত্মশুদ্ধির পর খোদা তা’লার পক্ষ হতে আসে।

অনেকেই আত্মপ্রসাদ নিয়ে থাকে যে, এসব চারিত্রিক ব্যাধি থেকে আমরা পরিত্রাণ লাভ করেছি। কিন্তু যখন পরীক্ষার মুহূর্ত আসে আর কোন নির্বোধের মুখোমুখী হয় তখন তারা চরম উত্তেজিত হয় আর তাদের আচরণে এমন নোংরামী প্রকাশ পায় যা কল্পনাও করা যায় না। তখন বুঝা যায় যে, এখনও কিছুই অর্জন করেনি এবং সেই আত্মশুদ্ধি যা পরিপূর্ণতা দান করে তা অর্জিত হয়নি। এত্থেকে এটিও বুঝা যায় যে, সেই আত্মশুদ্ধি যাকে চারিত্রিক আত্মশুদ্ধি বলা হয় তা অত্যন্ত কঠিন আর আল্লাহ্ তা’লার কৃপা ব্যতীত অর্জন সম্ভব নয়। আল্লাহ্ তা’লার কৃপাভাজন হওয়ার জন্যও সেই তিনটি দিকই রয়েছে। প্রথম সংগ্রাম ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা, দ্বিতীয়তঃ দোয়া এবং তৃতীয়ত: সত্যবাদীদের সাহচর্য।’

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড - পৃ. ২১০-২১১; নব সংস্করণ)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ যুগের ইমাম, যাঁকে আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সংশোধন ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য প্রেরণ করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলী যা সংশোধনের লক্ষ্যে এক বিশাল সাহিত্যকর্ম, তা পাঠ করা উচিত এবং এটি পবিত্র হবার মাধ্যম। কেননা এগুলো পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা ও তফসীর।

কয়েকদিন পূর্বে জার্মানী থেকে কোন এক মহিলা আমাকে লিখেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লার যেসব নির্দেশাবলী রয়েছে উনি তা অন্বেষণ করছিলেন আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি তা একত্রিত করেছেন। তিনি যে কথা লিখেছেন তা হল, এসব নির্দেশাবলী অনুসন্ধানের পর যখন আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন করি তখন আমার মনে হয় যেন আমি পবিত্র কুরআনের তফসীর পাঠ করছি আর বই পাঠ করার পর যখন কুরআন করীম পাঠ করি তখন আমি বুঝতে পারি যে, নির্দেশাবলীর প্রকৃত গুরুত্ব কী? এবং এর গভীরতা কত। কেননা এ ছাড়া বুঝা সম্ভব নয়।

সত্যবাদীদের সাহচর্য দেয়ার জন্য এ যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর গ্রন্থাবলী আমাদের নাগালের মাঝে আছে তা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি নিয়ামত, তাই জামাতের এগুলো অনেক বেশি পাঠ করা উচিত।

পুনরায় তিনি (আ.) বলেন,

‘প্রকৃতপক্ষে প্রবৃত্তির তাড়নারূপী নোংরামি যা অসদাচরণ, অহংকার, কপটতা ইত্যাদিরূপে প্রকাশ পায়; যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌র ফযল না হয় ততক্ষণ তা দূরীভূত হয় না এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তত্ত্বজ্ঞানের অগ্নি একে ভস্মিভূত না করবে ততক্ষণ এই আবর্জনা ভস্মিভূত হতে পারে না। যার ভেতর এই তত্তবজ্ঞানের আগুন জন্ম নেয় সে এসব নৈতিক দুবর্লতা হতে মুক্ত হতে আরম্ভ করে আর বড় হয়েও নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং নিজ অস্তিত্বকে কোন গুরুত্ব দেয় না। তত্বজ্ঞানের জ্যোতি থেকে সে যেই জ্যোতি লাভ করে তাকে স্বীয় কোন যোগ্যতা বা গুণের ফলাফল মনে করে না এবং তাকে নিজের প্রতি আরোপ করেনা। বরং সে একে খোদা তা’লার কৃপা এবং অনুকম্পা বলে বিশ্বাস করে।’

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড-পৃ:২১১-২১২; নবসংস্করণ)

.........এবং এটি সবচেয়ে বেশি (এরপর বিস্তারিত উল্লেখ পূর্বক বলেন, নবীদের ভেতর এই গুণাবলী সবচেয়ে বেশী বিদ্যমান থাকে তারপর প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ সাধ্য ও সামর্থ্য মোতাবেক তা লাভ করে)...............

তিনি (আ.) বলেন,

‘এমন মানুষ যারা দু’দিন নামায পড়ে অহংকারী হয়ে উঠে। অনুরূপভাবে রোযা এবং হজ্জ্বের মাধ্যমে পবিত্রতার পরিবর্তে অহংকার এবং আত্মম্ভরিতা জন্মে।’

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড-পৃ:২১১-২১২; নবসংস্করণ)

তিনি (আ.) বলেন,

‘স্মরণ রেখো! অহংকার শয়তান থেকে উৎসারিত আর শয়তান বানিয়ে ছাড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এত্থেকে দূরে না সরবে ততক্ষণ এটি সত্য গ্রহণ এবং ঐশী কল্যাণের ধারার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কোনভাবেই অহংকার করা উচিত নয়। জ্ঞান, সম্পদ, প্রতিপত্তি, জাত, গোষ্ঠি এবং বংশ সবই মূল্যহীন। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কারণেই অহংকার সৃষ্টি হয়। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ নিজেকে এসব আত্মশ্লাঘা হতে পবিত্র ও মুক্ত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত খোদার দৃষ্টিতে মনোনীত হতে পারে না। এবং সেই তত্ত্বজ্ঞান যা অনিয়ন্ত্রিত আবেগ-অনুভূতির আবর্জনাকে ভস্মিভূত করে তা তাকে দেয়া হয় না, এটি শয়তানের অংশ। একে আল্লাহ্ তা’লা পছন্দ করেন না। শয়তান অহংকার করেছিল এবং নিজেকে আদমের চেয়ে বড় মনে করেছিল আর বলেছিল, أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ (সূরা আল্ আ’রাফ: ১৩) এর ফলাফল যা দাঁড়িয়েছিল তাহলে, সে খোদা তা’লার দরবার হতে বিতাড়িত হয় এবং আদম পদস্খলন হেতু (যেহেতু তত্বজ্ঞান দেয়া হয়েছিল তাই) স্বীয় দূর্বলতা স্বীকার করে, ফলে খোদা তা’লার কৃপাভাজন হয়। তিনি জানতেন যে, খোদা তা’লার কৃপা ছাড়া কিছুই হতে পারে না। তাই দোয়া করেছেন رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ (সূরা আল্ আ’রাফ: ২৪)’।

(মলফুযাত, ৪র্থ খন্ড-পৃ:২১১-২১২; নবসংস্করণ)

অতএব সত্যিকার আত্মশুদ্ধি লাভের এটিই রহস্য এবং প্রকৃত মু’মিন ও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের মাঝে এটিই পার্থক্য। এত্থেকে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয় যে, শয়তান অহংকারবশে أَنَا خَيْرٌ এর ধ্বনি উচ্চকিত করেছিল এবং বড়াই করেছিল কিন্তু আদম খোদা তা’লা প্রদত্ত তত্বজ্ঞানের কল্যাণে এই রহস্যটি বুঝেছিলেন এবং একান্ত বিনয়ের সাথে এই দোয়া করেছিলেন,

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! আমরা আমাদের প্রাণের উপর অত্যাচার করেছি যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না করো এবং রহম না করো তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্���ূক্ত হয়ে যাবো।

(সূরা আল্ আ’রাফ: ২৪)

অতএব আজও এই দোয়াই আল্লাহ্ তা’লার ব্যাপক ক্ষমা আকর্ষণ করবে, পাপ হতে রক্ষা করবে এবং ভুল-ভ্রান্তি ও শিথিলতাকে গোপন করবে এবং আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হবে।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে সর্বদা আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ দিন। আমরা যেন খোদা তা’লাকেই সকল পূণ্যকর্মের উৎস জ্ঞান করি। সকল পাপ হতে স্বয়ং নিজেকে পবিত্র করতে পারি এবং এ লক্ষ্যে নিরবধি চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি আর সর্বদা খোদা তা’লার ক্ষমার সন্ধানী হই। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর তৌফিক দান করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে