In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্ ওয়াসে’ - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৮ই মে, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লার পবিত্র নাম সমূহের একটি হলো ‘আল্ ওয়াসে’। এর অর্থ: সেই সত্তা যাঁর রিয্‌ক থেকে তাঁর পুরো সৃষ্টি লাভবান হচ্ছে, যার রহমত সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। সেই সত্তা যার পরবিমুখতা বা প্রাচুর্য্য সকল অভাব বা পরমুখাপেক্ষিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর একটি অর্থ করা হয়, সেই সত্তা যিনি অনেক বেশি দানকারী, সেই সত্তা যাঁর নিকট যাচনা করলে তিনি তাঁর দানের পরিধিকে ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত করতে থাকেন। আবার অনেকের মতে এর অর্থ হচ্ছে, সেই সত্তা যিনি সকল বস্তুকে ঘিরে রেখেছেন, সব বিষয়ের জ্ঞান রাখেন। আল্লাহ্ তা’লার এ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এই সবগুলো অর্থই পবিত্র কুরআন থেকে প্রমাণিত হয়।

এখন আমি পবিত্র কুরআন থেকে কতক আয়াত উপস্থাপন করবো, যেগুলোতে আল্লাহ্ তা’লা বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি মু’মিনদের মনোযোগ আকর্ষণ করে স্বীয় ‘ওয়াসে’ বৈশিষ্ট্যের অধীনে তা বর্ণনা করেছেন।

সূরা বাকারার ২৬৯ নম্বর আয়াতে শয়তান কর্তৃক বান্দার প্রতারিত হওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

الشَّيْطٰنُ يَعِدُكُمُ الْـفَقْرَ وَيَاْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَآءِ‌ ۚ وَاللّٰهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا ؕ وَاللّٰهُ وٰسِعٌ عَلِيْمٌۚ

অর্থাৎ ‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়, পক্ষান্তরে আল্লাহ্ নিজ পক্ষ হতে তোমাদেরকে ক্ষমা ও কল্যাণ দানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বস্তুত: আল্লাহ্ প্রাচুর্য্যের অধিকারী এবং সর্বজ্ঞানী।’

(সূরা আল্ বাকারা: ২৬৯)

এ আয়াতে খোদা তা’লা দু’টি বিষয় বর্ণনা করেছেন, যা আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে তাঁর বান্দাকে দূরে সরানোর জন্য শয়তান ব্যবহার করে থাকে। প্রধানত, দারিদ্র্য অর্থাৎ দরিদ্র হবার ভয় দেখানো; দ্বিতীয়ত, অশ্লীলতার আদেশ দেয়া। এই যে দারিদ্র্যের ভয় দেখানো, তার বহু প্রকারভেদ রয়েছে। শয়তান আল্লাহ্ তা’লাকে বলেছিল, আমি সব রাস্তায় বসে মানুষকে সরল রাস্তা হতে বিচ্যূত করার চেষ্টা করে যাবো আর সে তার এ কথা পূর্ণ করার জন্য কখনই কোন সুযোগ হাতছাড়া করেনি। এ সব রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা তার নিজ শক্তি বলে ছিল না বরং আল্লাহ্ তা’লা তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন, এবং বলেছেন, ঠিক আছে তুমি যখন এমন করতে চাও তো করো; কিন্তু আমি তোমার পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের দ্বারা জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করবো।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’লা এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে আমাদেরকে বলেছেন, সাবধান! তোমরা যদি আমার দাসত্ব করতে চাও তবে শয়তানের হাত থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেবে। বাহ্যত: শয়তানের বিভ্রান্ত করার রীতি তোমাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হবে, কিন্তু এর ফলাফল তোমাদের জন্য শুভ হবে না।

এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে অসংখ্য স্থানে বিভিন্ন ভাবে শয়তানের হাত থেকে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছেন, তার ক্ষতিকর দিকগুলো স্পষ্ট করেছেন। একস্থানে বলেছেন,

وَيُرِيْدُ الشَّيْطٰنُ اَنْ يُّضِلَّهُمْ ضَلٰلاًۢ بَعِيْدًا‏

অর্থাৎ ‘শয়তান তোমাদেরকে ভয়াবহ ভ্রষ্টতায় নিপতিত করতে চায়’।

(সূরা আন্ নিসা: ৬১)

এরপর বলেছেন, শয়তান তোমাদেরকে অনেক বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে, আর বন্ধু সেজে তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আরো বলেছেন,

اِنَّ الشَّيْطٰنَ لَـكُمَا عَدُوٌّ مُّبِيْنٌ‏

অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের দু’জনের প্রকাশ্য শত্রু’।

(সূরা আল্ আ’রাফ: ২৩)

আদম ও হাওয়ার (ঘটনার) বরাতে এ কথা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি শুধু আদম ও হাওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয় বরং নারী-পুরুষ উভয়কে সাবধান করা হয়েছে যে, শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু । কাজেই তার ফাঁদে পা দেয়া হতে সাবধান থেকো। সৎকর্ম করো, ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হও।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেছেন, পবিত্র কুরআনে যেসব ঘটনাবলী ও কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এসব পুরনো কথা কেবল আমাদের জ্ঞাত করার জন্যই পুনরাবৃত্ত করা হয়নি বরং এগুলো ভবিষ্যদ্বাণী অর্থাৎ ভবিষ্যতে এভাবে ঘটবে। তাই যদি মু’মিন হও আর প্রকৃতপক্ষেই মু’মিন হয়ে থাক তবে, সাবধান! কেননা এখনো এমনটি ঘটতে পারে। যুগ পরিবর্তনের পাশাপাশি শয়তানের আক্রমণের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সকল প্রকার নতুন আবিষ্কার এবং অগ্রগতির পানে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ যেখানে এর কল্যাণরাজি দ্বারা আমাদের উপকার সাধন করছে, সেখানে শয়তানও একে ব্যবহার করছে।

আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, শয়তান তোমাদের ক্ষতি করবে এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করলে ভ্রষ্টতার অতল গহবরে নিপতিত হবে। সূরা বাকারার যে আয়াতটি আমি পাঠ করেছি তাতে বলেছেন, শয়তান তোমাদেরকে ‘ফকরের’ ভয় দেখায়, ‘ফকর’-শব্দের একটি অর্থ হলো দারিদ্র্য। মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাওয়া ‘ফকরের’ আরেকটি অর্থ। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায়, যদি তোমরা এই কাজটি কর তবে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর যোগ্যতা রাখবে না। এই কাজ বা অমুক কাজ করলে অভাব তোমাকে ঘিরে ফেলবে এবং এই পৃথিবীতে পার্থিব উন্নতির দৌড়ে তুমি অনেক পিছিয়ে থাকবে। যদি কুরবানী ও ত্যাগ স্বীকার করতে থাক তবে কখনোই নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে পারবে না।

অতএব কুরবানীর সূত্র ধরে শয়তানের এই ভয় দেখানোর রীতিও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কখনো সে এই বলে ভয় দেখাবে যে, এখন কাজের সময় তাই ইবাদতের পিছনে সময় ব্যয় করা সমীচিন হবেনা। কখনো আর্থিক কুরবানী থেকে বিরত রাখার জন্য দীনতার ভয় দেখাবে যে, এই মহূর্তে যদি তোমাদের কাজ ও অর্থ ব্যয় হয় তবে তোমাদের ব্যবসায় ক্ষতি হবে। কখনো এই বলে ভয় দেখাবে যে, আজ এই অর্থ যদি এখানে খরচ কর তবে তোমাদের সন্তান ক্ষুধার্ত থাকবে। কিন্তু যারা আল্লাহ্ তা’লার বান্দা তারা তার এই ভীতি প্রদর্শনে ভীত হয় না।

সম্প্রতি, আল্ ফযলে একটি প্রবন্ধ পড়ছিলাম। আর্থিক ত্যাগ স্বীকার সম্পর্কে কেউ একজন লিখেছেন, রাবওয়ার কোন এক আহ্‌মদীর ঘটনা; তিনি মাংস ক্রয় করছিলেন। তখন সেক্রেটারী মাল সাহেব সাইকেলে সে পথে যাচ্ছিলেন। যিনি বাজার করছিলেন তাঁকে দেখে সেক্রেটারী মাল সাহেব সেখানে থামেন আর কেবল স্মরণ করানোর উদ্দেশ্যে তাকে বলেন, আপনার অমুক চাঁদা বকেয়া পড়েছে। তখন সেই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকা বাকী আছে? সেক্রেটারী মাল সাহেব তাকে জানালেন। বেশ বড় অংক ছিল। তিনি সেখানে দাঁড়ানো অবস্থায় চাঁদা আদায় করে রশিদ সংগ্রহ করেন। কসাই-এর কাছ থেকে যে মাংস কিনেছিলেন তা এই বলে ফেরত দেন যে, আজ আমরা মাংস খেতে পারবো না। সাদামাটা খাবার খাবো।

অতএব এরাই এমন বান্দা যারা শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হন না। যখন সে (শয়তান) বলে যে, কি করছো? তোমার সন্তান আছে, আজ তাদের হয়ত মাংস খেতে মন চাচেছ, আর তুমি তাদেরকে এত্থেকে বঞ্চিত করছ? আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় শুধু একটাই নয় বরং জামাতে আহ্‌মদীয়াতে এমন শত শত দৃষ্টান্ত রয়েছে, যারা শুধু মাংস খাওয়া থেকেই বিরত থাকেনা বরং প্রয়োজনে অনেক সময় আর্থিক কুরবানীর জন্য উপবাস করে কিন্তু মালী কুরবানী হতে পিছ পা হয় না।

এরপর রয়েছে জীবনের কুরবানী। জামাতে আহ্‌মদীয়ার ইতিহাস এ ধরনের কুরবানীতেও সমৃদ্ধ। বর্তমানে পাকিস্তানে শত শত সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে। বুঝার উপায় নেই যে, কে আকস্মিক ভাবে গুলির লক্ষ্যে পরিণত হবে। কিন্তু আহ্‌মদীরা যে কুরবানী করে সেটা তারা জেনে শুনেই করে যে, এই কাজ করলে, এই এলাকায় থাকলে, অমুক পথে চললে আহ্‌মদী হওয়ার দোষে যে কোন সময় মৃত্যুর সমূহ আশংকা রয়েছে; কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার খাতিরে তারা এ কুরবানী করে যাচ্ছে।

জামাতে আহ্‌মদীয়ার ইতিহাসে সৈয়্যদুশ্ শুহাদা (শহীদদের সর্দার) হযরত সাহেবজাদা আব্দুল লতিফ শহীদ (রা.)-এর কুরবানী, মৌলভী আব্দুর রহমান (রা.)-এর ত্যাগ যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে তাঁরা কাবুলে করেছিলেন, এসব কুরবানী বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে! এরা হচ্ছে আব্দুর রহমান বা রহমান খোদার প্রকৃত বান্দা। যাঁরা একটি মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন না। আহ্‌মদীদের জীবনে এ ধরণের কুরবানীরও ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে অতর্কিত আক্রমণ তাদের কুরবানী বা শাহাদতের কারণ হয়নি বরং বুক ফুলিয়ে নিজ ধর্ম বিশ্বাসের উপর অটল থেকে তারা এসব কুরবানীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, নিজেদের প্রাণের নযরানা পেশ করেছেন।

যাহোক, শয়তান সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, সে তোমাদেরকে কুরবানী সম্পর্কে ভয় দেখায়। কখনো এ বলে ভয় দেখায় যে, তোমরা দারিদ্র্যের শিকার হবে, আবার কখনো বলে, তোমাদের এই কুরবানীর ফলে তোমাদের সন্তান-সন্ততিও সমাজে কোন কাজের যোগ্য থাকবেনা। যখন প্রাণের কুরবানীর প্রশ্ন আসে তখন তাদেরকে এভাবে ভয় দেখায় যে, তোমার মৃত্যুর পর সন্তানদের কি হবে? বর্তমান যুগে অর্থনীতিকেও মেরুদন্ড বলা হয়ে থাকে। অতএব ত্যাগী মানুষ- যারা প্রাণ, সম্পদ ও সময়ের কুরবানী করেন তাদেরকে তাদের নিজেদের এবং সন্তানদের জীবিকার উপকরণ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয় কিন্তু তারা অব্যাহতভাবে কুরবানী করতে থাকেন। তারা কখনো এমন বিভ্রান্তিতে পড়েন না। এভাবে মানব জীবনে আরো অনেক ধরনের কুরবানী মানুষকে দিতে হয় যা সম্পর্কে শয়তান ভয় দেখায়।

এরপর সময়ের কুরবানীর উদাহরণ রয়েছে। এটা সকল আহ্‌মদী-ই জানেন, কেননা আল্লাহ্ তা’লার ফযলে যেসব আহ্‌মদী নেযামে জামাতের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন তারা কিছুটা হলেও জামাতের জন্য সময় ব্যয় করেন। আর কিছু না হলেও তারা মিটিং, ইজতেমা ও জলসার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করেন। এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী সময়ের কুরবানী করে প্রত্যেক সপ্তাহে জুমুআর নামাযে এসে থাকেন এবং শয়তান যখন বাঁধা দেয় তখন তারা তার কুমন্ত্রণার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেন না।

কিন্তু কতক মানুষ এমনও আছে যারা শুধু জুমুআয় নয় বরং কোন সময় ঈদেও আসে না, তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এসব ইবাদতকে জলাঞ্জলি দেয় আর তাদের নামাযের যে অবস্থা তাও মহা চিন্তার বিষয়। আহ্‌মদীদের মাঝেও একটা অনেক বড় শ্রেণী আছে যারা সময়ের এই কুরবানীর প্রতি মনোযোগী নয়। ইবাদতে আলস্যের কারণ আছে, সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিজেদের কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে মহাব্যস্ত কিন্তু নামায পড়ার জন্য সময় ব্যয় করে না।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, যখন তোমরা কুরবানী কর তখন শয়তান তোমাদেরকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখায়। কখনো দারিদ্রের ভয় দেখিয়ে নামাযে সময় ব্যয় (কুরবানী) করতে বাঁধা প্রদান করে। বস্তুত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে বাঁধা প্রদান করে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, একজন সত্যিকার মু’মিন হওয়ার সুবাদে শয়তান থেকে সাবধান থাক। মোটকথা আল্লাহ্ তা’লা থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার জন্য শয়তানের বিভিন্ন পন্থা রয়েছে যা সে বান্দার উপর প্রয়োগ করে।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, শয়তান এক দিকে তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে এই কুরবানীর পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে অথচ অপরদিকে অশ্লীলতার প্রতি আকৃষ্ট করে সময় ও অর্থ সবই নষ্ট করায়। যারা বস্তুবাদী তারা তার প্ররোচনায় পড়ে এসব কাজে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। একজন অবিশ্বাসী, বস্তুবাদীকে শয়তান পার্থিব ক্রীড়া-কৌতুকের পিছনে খরচ করতে প্ররোচিত করে। যারা শয়তানের পিছনে চলে তারা জুয়া, মদ এবং এ রকম অন্যান্য বেহুদা কাজে অঢেল খরচ করে আর তারা বুঝতেও পারে না কেননা, শয়তান সাময়িক ভোগ-বিলাসের প্রতি এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে, মানুষ ভুলে যায়, সে মন্দ কাজ করছে আর এ কারণে তারা শয়তানের পিছু চলতে থাকে।

অতএব আল্লাহ্ তা’লা মু’মিনদেরকে বলেছেন,

وَّلَا تَتَّبِعُوْا خُطُوٰتِ الشَّيْطٰنِؕ

অর্থাৎ ‘তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না’।

(সূরা আল্ বাকারা: ১৬৯)

কেননা সে তোমাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা হতে দূরে সরানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টায় রত। তার কাছে কখনও কল্যাণের আশা করো না। শয়তানের কাছ থেকে কোন কল্যাণ আসতে পারে এমনটি ভাবাও চরম ভ্রান্তি। কেননা তার কাজই হচ্ছে বান্দাদেরকে অশ্লীলতা ও অপছন্দনীয় কর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা।

যদি আমরা একজন বস্তুবাদী মানুষকে জিজ্ঞেস করি যে, শয়তান সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? তাহলে সে একথাই বলবে, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর হাত থেকে আমাদের নিরাপদ রাখুন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যে বস্তুবাদিতার পূজারী ত্যাগ-তিতিক্ষার পথ পরিহার করে অশ্লীলতায় জড়িয়ে যায় এবং তার পদাঙ্গ অনুসরণ করে, সে মূলতঃ বুঝতেই পারছেনা যে সে কি করছে। শয়তান এমন বান্দাদেরকে তার অনুসরণ করিয়ে সেই কথা পূর্ণ করছে যে, আমি অধিকাংশ মানুষকেই আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেবো।

কাজেই আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, তোমরা শয়তানের এমন প্রতারণামূলক কার্যকলাপ হতে সাবধান থেকো। সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে তোমাদেরকে প্ররোচিত করে। আল্লাহ্ তা’লার প্রতি ধাবিত হও কেননা এটাই তোমাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্য, আর এটি লাভের উপায় হলো, অনুতাপের সাথে তাঁর প্রতি বিনত হও তাহলে জেনে রেখো আল্লাহ্ তা’লা তোমাদের সাথে ক্ষমার অঙ্গীকার করেছেন। তোমাদের অত��ত পাপ এবং ভুল-ত্রুটি সমূহ ক্ষমা করবেন এবং ভবিষ্যতে তোমাদেরকে পুণ্যকর্ম ও কুরবানীর তৌফিক দান করে তোমাদের জন্য ক্ষমা ও কল্যাণের বিধান করবেন।

আল্লাহ্ তা’লা এখানে يَعِدُكُمُ (সূরা আল্ বাকারা: ২৬৯) শব্দ ব্যবহার করে আশ্বস্ত করেছেন যে, যদি তওবা আন্তরিক হয়ে থাকে তবে অবশ্যই ক্ষমা পাবে। শুধু ক্ষমাই নয় বরং তাঁর কল্যাণের এমন সব দ্বার উম্মোচিত হবে যা মানুষের কল্পনাতীত। আল্লাহ্ তা’লা এ আয়াতে সর্ব প্রথম শয়তানের যে কাজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেভাবে আমি পূবেই বর্ণনা করেছি তা হল, দারিদ্রতার ভয় দেখানো। অর্থাৎ শয়তান মানুষের হৃদয়ে এই ভয় সৃষ্টি করে যে, কুরবানী করার ফলে, দারিদ্রের শিকার হবে আর শুধু দারিদ্রই নয় বরং অবস্থা এমনভাবে বিধ্বস্ত হয় যে যেভাবে মেরুদন্ড ছাড়া মানুষ দাঁড়াতে পারে না, কুরবানী করার ফলে তোমরা সেভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াবার যোগ্যতা হারিয়ে বসবে।

পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, শয়তান মিথ্যা বলে। কিয়ামত দিবসে সে তার এ কথা অস্বীকার করবে, কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, তিনি তোমাদের ক্ষমার ব্যবস্থা করবেন। এরফলে যেখানে ইহকালে তিনি পুরস্কারে ভূষিত করবেন সেখানে পারলৌকিক জীবনেও আল্লাহ্ তা’লা মানুষের সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ যে, তাকে স্বীয় ক্ষমার চাদরে আবৃত করবেন।

এরপর শয়তান যে অশ্লীলতার আদেশ দেয়, তাতে লিপ্ত হলে এ পৃথিবীতেই মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় জর্জরিত হয়। বিভিন্ন নোংরামী ও বেহুদা কাজ এমন রয়েছে যাতে লিপ্ত হয়ে মানুষ রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, যাতে জাগতিক ক্ষয়-ক্ষতিও রয়েছে এবং পরকালেও শাস্তি হিসেবে তা ভোগ করবে। কিন্তু একজন মু’মিনের সাথে আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তার উপর অনুগ্রহরাজি বৃদ্ধি করবেন এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে যাবেন আর কল্যাণের বিভিন্ন দ্বার উম্মুক্ত করতে থাকবেন; যা মানুষকে ইহ ও পরকালে আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য প্রদানের মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হবে।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, এই প্রতিশ্রুতি সেই খোদার যিনি স্বর্গ ও মর্তের অধিপতি, তিনিই ‘ওয়াসে’ বা প্রাচুর্য দাতা। তাঁর নিকট অফুরন্ত কল্যাণের ভান্ডার রয়েছে। আজ একজন আহ্‌মদী সে যে কোন ধরনের কুরবানী করে থাকুক না কেন এটি জানে যে, প্রত্যেক কুরবানীর ফলে আল্লাহ্ তা’লা এমন আশিস বর্ষণ করেন যা মানুষ কখনো ভাবতেও পারে না, আল্লাহ্ তা’লা তাকে কীভাবে সাহায্য করছেন। আর্থিক কুরবানীকারীদের সম্পদকে এতটা বৃদ্ধি করেন যে, অনেক সময় তা তারা কল্পনাও করতে পারেনা না। অনেকে চিঠি লিখে তা প্রকাশ করে, তাদের রিয্‌ক’এ এতটা বরকত সৃষ্টি হয়েছে যা তারা ভাবতেও পারেনা। প্রাণ বিসর্জনকারীদের ধন ও জনসম্পদে এত বরকত দান করেন যা তাদের সন্তান-সন্তুতির জন্য কল্পনাতীত।

অনেক আহ্‌মদী পরিবারের সদস্যরা আহ্‌মদীয়াতের জন্য শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন, তাদের সন্তান-সন্তুতি ও আত্মীয়-স্বজনরা এ বিষয়ের সাক্ষী যে, আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় এসব শাহাদত তাদের উপর অপরিসীম আশিস ও কল্যাণ বর্ষণের কারণ হয়েছে এবং তারা সেই খোদা যিনি স্বাচ্ছন্দ্য দাতা ও সর্বজ্ঞানী তাঁর সীমাহীন কৃপার দৃশ্য দেখেছে। এখানে সর্বজ্ঞানী বলে এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে যে, তোমাদের ত্যাগ ও তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে তিনি সবিশেষ জ্ঞাত। ভবিষ্যতেও আল্লাহ্‌ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যেসব কর্ম করবে তখন প্রাচুর্যদাতা খোদা তাঁর অশেষ কৃপা হতে তোমাদের কল্পনাতীত অংশ দান করতে থাকবেন।

অতএব এ হচ্ছে সেই মৌলিক কথা যা সর্বদা আমাদের দৃষ্টিপটে রাখা উচিত যে, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দার উপর কীভাবে বর্ধিত অনুগ্রহ করে থাকেন! স্মরণ রাখুন যে কেবল তওবা, ইস্তেগফার, সৎকর্ম ও কুরবানীই (ত্যাগ-তিতিক্ষা) কারো ক্ষমা লাভের কারণ নয় বরং আল্লাহ্ তা’লা তাঁর অপার করুণায় ফিরিশ্তাদেরও সেসব বান্দার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার কাজে নিয়োজিত করে রেখেছেন, যেসব বান্দা ঈমান আনে, তওবা করে, আল্লাহ্ তা’লা নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করে এবং তাঁর জন্য কুরবানী করে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা সূরা আল্ মো’মেন এ বলেছেন,

اَلَّذِيْنَ يَحْمِلُوْنَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهٗ يُسَبِّحُوْنَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُوْنَ بِهٖ وَيَسْتَغْفِرُوْنَ لِلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا‌ ۚ رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَىْءٍ رَّحْمَةً وَّعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِيْنَ تَابُوْا وَاتَّبَعُوْا سَبِيْلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيْمِ

অর্থ: ‘যারা আরশকে বহন করছে এবং যারা এর চতুর্দিকে রয়েছে, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, তাঁর উপর ঈমান আনে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে, হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! তুমি তো সব কিছুকে তোমার দয়া ও জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করে রেখেছ, কাজেই ঐ সব লোক যারা তাওবা করেছে এবং তোমার পথ অনুসরণ করেছে, তাদেরকে তুমি ক্ষমা কর এবং দোযখের আযাব হতে রক্ষা কর।’

(সূরা আল্ মো’মেন: ৮)

এখানে আরশ বহনকারী বলতে ফিরিশ্তাকে বুঝায়। সূরাতুল হাক্কায় সুস্পষ্টভাবে ফিরিশ্তাদের উল্লেখপূর্বক বলেছেন, কিয়ামত দিবসে আটজন ফিরিশ্তা আরশকে বহন করবে। যাহোক, এখানে আরশ বহনকারী অর্থ আল্লাহ্ তা’লার ফিরিশ্তা অথবা সেসব বৈশিষ্ট্য (গুণাবলী), যার উপর আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে এসব ফিরিশ্তা প্রত্যাদিষ্ট হয়েছেন, যার কথা সূরাতুল্ ফাতিহায় বর্ণিত হয়েছে, অর্থাৎ রব, রহমান, রহীম ও মালিকে ইয়াওমিদ্দীন। যা এই পৃথিবীতে মানুষের কাজে আসে। যারা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপর ঈমান আনয়নকারী এবং ঈমান আনয়নের পর তওবার প্রতি মনোযোগী হয়, যারা আল্লাহ্ তা’লার দরবারে অবনত হয় এবং সৎকর্ম সম্পাদনকারী, তাদের জন্য ফিরিশ্তারাও দোয়া করে। বিশেষভাবে সেসব ফিরিশ্তা যাদের উপর খোদা তা’লা এই বৈশিষ্ট্যাবলী মানুষের ক্ষেত্রে কার্যকরী করার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। প্রত্যেক ফিরিশ্তা যাঁর উপর নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের দায়িত্ব রয়েছে, সে খোদা তা’লার কাছে সেই বৈশিষ্ট্যের বরাতে দোয়া করে। ঐ সব লোকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যারা ঈমান আনার পর আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য লাভের জন্য চেষ্টা করে এবং সর্বদা তওবা (অনুতাপ) করা অবস্থায় সৎকর্ম করত: এই নৈকট্য লাভের আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং শয়তানের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করে।

একইভাবে এসব ফিরিশ্তার অধিনস্ত যেসব ফিরিশ্তা রয়েছে অর্থাৎ ফিরিশ্তা সংক্রান্ত আল্লাহ্ তা’লার যে নেযাম বা ব্যবস্থাপনা আছে তাতে ফিরিশ্তার অধিনস্ত ফিরিশ্তাও রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য যেসব ফিরিশ্তা ধারণ করে রেখেছে তাদের অধীনে যেসব ফিরিশ্তা কাজ করছে তারাও আল্লাহ্ তা’লার এসব বান্দাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।

মোটকথা খোদা তা’লা তাঁর পুণ্যবান বান্দার কর্মের বেশি বেশি প্রতিদান দেয়ার জন্য তাঁর ফিরিশ্তাদের ব্যবস্থাপনাকেও কাজে লাগিয়ে রেখেছেন যে, আমার এই বান্দাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক। এরফলে যেখানে তাদের প্রতিদান বৃদ্ধি পেতে থাকবে সেখানে ফিরিশ্তাদের ক্ষমা প্রার্থনার ফলে সর্বদা সৎকর্ম ও তওবা করার সৌভাগ্যও লাভ হতে থাকবে। মানুষের ভুল-ভ্রান্তি ও স্খলন ঘটেই থাকে; যদি স্খলন হয়ে যায় আর ভুল-ত্রুটি বশত: কোথাও যদি সাময়িক হোঁচট খায়, মানুষ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল না করে তবে এই ফিরিশ্তারা আল্লাহ্ তা’লাকে তাঁর দয়া এবং তাঁর অপরিসীম ও অসীম জ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলেন যে, এদের ক্ষমা কর। আর ভবিষ্যতেও তোমার আনুগত্য করে এরা যেন তোমার ক্ষমা থেকে অংশ পেতে থাকে���

এখানে রহমতের কথা প্রথমে উল্লেখের পর ক্ষমার দোয়া করেছে কেননা, ক্ষমা শুধু তোমার রহমতের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। অতএব স্বীয় ব্যপক রহমতকে কার্যকর করে ক্ষমার বিধান কর। নি:সন্দেহে তোমার জ্ঞান ব্যপক, মানুষের হৃদয়ে এবং এই সকল লোকদের হৃদয়ে যা রয়েছে, তাও তুমি জ্ঞাত।

আজ এই পুণ্যকর্মের পর ভবিষ্যতে যে কর্ম সম্পাদিত হবে সে সম্পর্কেও ফিরিশ্তারা বলে, হে খোদা! সে সম্পর্কে তুমিও সম্যক অবহিত। মোটকথা তুমি এদের পরিবেষ্টন করে রেখেছে আর হতে পারে, এরা যে বিগড়ে যাবে আর জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হবে সেকথা তুমি জান। কিন্তু আপন রহমত বিস্তৃত করে তাদের পুণ্যকর্ম সমূহকে স্থায়ী রুপ দাও যাতে তারা সর্বদা পুণ্যের প্রতি আকৃষ্ট থাকে এবং জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা পায়। যদি তোমার দয়া বর্ষিত হয় তাহলে তারা এই সৌভাগ্য লাভ করতে থাকবে।

অতএব ইনি হলেন আমাদের রহমান, ক্ষমাশীল ও দয়ালু খোদা। যিনি মানুষের জন্য ক্ষমার এবং তাকে পুণ্যের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সকল উপায় অবলম্বন করেন। যদি একটি অপরাধ করে তাহলে সে সেই অপরাধেরই শাস্তি পায় কিন্তু যদি একজন মানুষ পুণ্য কর্ম করে তাহলে সে এর দশগুণ প্রতিদান লাভ করে। কুরবানীর ব্যাপারে বলেছেন, এই কুরবানীর প্রতিদান সাতশত গুণ বরং বলেন, এর চেয়েও অধিক হতে পারে। কেননা খোদা হলেন প্রাচুর্য দাতা তাই তাঁর পুরস্কার বা দানের কোন সীমা নেই। এতদসত্ত্বেও মানুষ কত অকৃতজ্ঞ যে, শয়তানের প্ররোচনায় ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পিছনে ছুটে সেই রহমান ও রহীম খোদাকে অস্বীকার করে যার প্রতিদান বা পুরস্কারের কোন শেষ নেই।

এরপর মূসা (আ.)-এর একটি দোয়ার ফলশ্রুতি স্বরূপ আল্লাহ্ তা’লা আপন রহমতের উল্লেখ করেছেন। সূরা আল্ আ’রাফে এর উল্লেখ রয়েছে:

وَاكْتُبْ لَـنَا فِىْ هٰذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِىْ الْاٰخِرَةِ اِنَّا هُدْنَاۤ اِلَيْكَ‌ؕ قَالَ عَذَابِىْۤ اُصِيْبُ بِهٖ مَنْ اَشَآءُ‌ۚ وَرَحْمَتِىْ وَسِعَتْ كُلَّ شَىْءٍ‌ؕ فَسَاَكْتُبُهَا لِلَّذِيْنَ يَتَّقُوْنَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِاٰيٰتِنَا يُؤْمِنُوْنَ‌ۚ‏

অর্থ: এবং তুমি আমাদের জন্য এই পার্থিব জগতে কল্যাণ নির্ধারণ কর এবং পরকালেও। (পূর্বোক্ত আয়াতেও এই দোয়াই করা হয়েছে, কিছুটা অংশ এই আয়াতে রয়েছে) নিশ্চয় আমরা তোমার প্রতি অনুতাপের সাথে প্রত্যাবর্তন করেছি। তিনি বললেন, আমি যাকে চাই আমার আযাব দিয়ে থাকি; কিন্তু আমার রহমত প্রত্যেক বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে। সুতরাং আমি ঐসব লোকের জন্য এই রহমত নির্ধারিত করবো যারা ত্বাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাকাত প্রদান করে আর যারা আমার নিদর্শনাবলীর প্রতি ঈমান আনে।

আমি বলেছি যে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন: পবিত্র কুরআনে যেসব নবীদের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে তা আগামী দিনের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী স্বরূপ। যখন এসব দোয়া গৃহীত হবার বিবরণ আসে এবং আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় রহমতের উল্লেখ করেন; স্মরণ রাখতে হবে যে, আজও এই রহমত সেভাবেই বিস্তৃত রয়েছে যেভাবে পূর্বে ছিল তবে শর্ত হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লা যেসব শর্তাবলী নির্ধারণ করেছেন মানুষ যেন তা মেনে চলার চেষ্টা করে। আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় অসীম এবং অকুল রহমতের উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এটি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। কিন্তু একইসাথে সৃষ্টির উদ্দেশ্যের প্রতিও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, নিঃসন্দেহে আমার রহমত প্রত্যেক বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে কিন্তু তোমাদের উপরও কতক দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে তা পালন করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। দায়িত্বাবলী হচ্ছে, ত্বাকওয়া অবলম্বন করো, আমার ইবাদত করো। আমাকে সবার তুলনায় বেশী ভালবাসো। আল্লাহ্‌র অধিকার এবং বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের জন্য আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করো এবং আমার নিদর্শনাবলীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।

আল্লাহ্ তা’লার মনোনীত ও প্রত্যাদিষ্টদের এ পৃথিবীতে আগমন তাঁর আয়াত এবং নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভূক্ত কেননা, তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লার নিদর্শনাবলীর একটি ধারা সূচিত হয়। আমরা জানি এ যুগে মহানবী (সা.)-এর নিষ্ঠাবান প্রেমিক; হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ তা’লা নিদর্শনাবলী প্রকাশের একটি ধারা সূচিত করেছেন, যা চন্দ্র এবং সূর্য গ্রহণ রূপেও আমরা দেখেছি। কোন সময় ভূমিকম্পের আকারে তা প্রকাশ পেয়েছে, আবার কখনও প্লেগের আকারে তা প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া বর্তমান যুগের আবিষ্কারাদি সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। এগুলোও নিদর্শন যা পূর্ণ হচ্ছে এবং আল্লাহ্ তা’লা এই নিদর্শনাবলী হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবের পর দেখাচ্ছেন। এরা স্বয়ং স্বীকার করে যে, ভূমিকম্প এসেছে রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমেও ছিল কিন্তু এরা নিজেরা স্বীকার করে যে, প্রথমে এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেনি। সুতরাং যখন দাবীকারক ঘোষণা করেন যে, এটি ঘটবে এবং আমার সমর্থনে ঘটবে তখন তা বিশেষ নিদর্শনে পরিণত হয়।

অতএব আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আমার নিদর্শনাবলী দেখো; এর প্রতি ঈমান আনো এবং আমার প্রেরিতকে উপহাস করো না তাহলে তোমাদের প্রতি আমার অসীম রহমতের ব্যপকতার কোন সীমা থাকবে না। রহমত বিস্তার লাভ করতে থাকবে আর যারা সৎকর্ম করতে থাকবে তাদের কাছে এটি অবশ্যই সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য আল্লাহ্ তা’লা- মালিক বা সর্বাধিপতি। তিনি স্বয়ং বলেছেন, যাকে চান শাস্তি প্রদান করেন আর যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা যেহেতু নিজ রহমত বা দয়ার মাধ্যমে সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন তাই বান্দাদের তাঁর কাছে এটিই প্রত্যাশা রাখা উচিত; আর আল্লাহ্ তা’লার কাছে ক্ষমা লাভের বাসনায় তাঁর নির্দেশাবলী অনুসারে চলার আপ্রাণ চেষ্টাও করা উচিত। একজন মু’মিনের এটিই অন্যতম কাজ। এটি তাকে শোভা পায়না যে, আল্লাহ্ তা’লা যা নিজের জন্য আবশ্যক করেছেন তা বাদ দিয়ে এই বিশ্বাসের পিছনে চলবে কারণ খোদার রহমত অত্যন্ত ব্যপক তাই যাচ্ছেতাই করতে পারি ক্ষমাতো পেয়েই যাবো। এটি নির্বোধের কাজ বরং আল্লাহ্‌র বৈশিষ্ট্য না বোঝার ফল।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:

‘এ আয়াত হতে জানা জায় যে, রহমত সার্বজনীন এবং বিস্তৃত। আর গযব অর্থাৎ আদল (ন্যায়বিচার) বৈশিষ্ট্য বিশেষ পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ঐশী আইন লঙ্ঘণের ফলে এই বৈশিষ্ট্য কার্যকর হয়।’

(জঙ্গে মুকাদ্দস - রূহানী খাযায়েন, ৬ষ্ঠ খন্ড - পৃ:২০৭)

নি:সন্দেহে আল্লাহ্ তা’লার রহমত বা দয়া ব্যপক কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা নিজ আদল (সুবিচার) বৈশিষ্ট্যের অধীনে ক্রোধও (ক্ষমতা) প্রকাশ করেন। যখন তিনি সিদ্ধান্ত করতে চান তখন ইনসাফের ভিত্তিতে করেন। যখন মানুষ ঐশী আইন ভঙ্গ করে ও সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন এই আদল বা ন্যায়বিচারের বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হওয়ার অধিকারের কথা জানান দেয় এবং তখন এর বিশেষত্ব বুঝা যায়।

অতএব আল্লাহ্ তা’লা প্রকৃতির যে নিয়ম নির্ধারণ করেছেন সে মোতাবেক যারা সীমালঙ্ঘন করে তাদেরকে তিনি শাস্তিও প্রদান করেন। তাই তিনি বলেন নি যে, পাপিষ্ঠদের উপর তাঁর রহমত ছেয়ে থাকবে বরং ত্বাকওয়ার পথে বিচরণকারী, যাকাত প্রদানকারী এবং খোদার নিদর্শনাবলীর প্রতি যারা ঈমান আনে তাদের সম্পর্কে বলেছেন, আমার রহমত তাদের জন্য অবধারিত। অতএব একজন মু’মিনের উচিত সেই রহমত লাভ করার চেষ্টা করতে থাকা তাহলেই সে আল্লাহ্ তা’লার ব্যপক রহমতের প্রত্যাশা রাখতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সকলকে এর তৌফিক দান করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে