In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্‌-নাফী’ (দাতা) - দ্বিতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১লা মে, ২০০৯ইং

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

গত খুতবায় আমি আল্লাহ্ তা’লার ‘আন্ নাফে’ গুণবাচক নামের আলোকে বলেছিলাম যে, প্রকৃত কল্যাণকর সত্তা হলো খোদা তা’লার সত্তা। এ জন্য শুধু তাঁরই ইবাদত কর। (আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আমার ইবাদত কর) তাহলে তোমরা এ পৃথিবীতে তাঁর কৃপার উত্তরাধিকারী হবে এবং পারলৌকিক জীবনেও কৃপাভাজন হবে। আরো বলেছেন, ইবাদতের পাশাপাশি সেসব নির্দেশাবলীও মেনে চল যার উপর আল্লাহ্ তা’লা আমল করার আদেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে শুধু এ কথাই বলেননি যে, সব ধরনের কল্যাণ যেহেতু আমার সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট তাই তোমরা আমার ইবাদত কর এবং কৃতজ্ঞ হও বরং তিনি বলেছেন, বিশ্ব জগত এবং এর অভ্যন্তরীণ প্রতিটি বস্তু আমার সৃষ্ট আর আমার আদেশেই এগুলো কল্যাণকর ও ক্ষতিকর হতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, যে সমস্ত জিনিসের উপর তোমাদের জীবন নির্ভরশীল, আমি হচ্ছি সেগুলোর সৃষ্টিকর্তা। তিনি বলেন, আমিই ‘রাববুল আলামীন’। যেখানে আমিই রাববুল আলামীন, সেখানে অন্য কোন স্থান থেকে কল্যাণ লাভের কোন প্রশ্নই উঠে না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এ বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে এক স্থানে বলেন,

‘আল্লাহ্ তা’লার রবুবিয়্যত অর্থাৎ, সৃষ্টি করা এবং চুড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজ সকল বিশ্বে অবিরত চলছে।’

এটা হচ্ছে আল্লাহ্ তা’লার রবুবিয়্যত; তিনি শুধু সৃষ্টিই করেন নি, বরং সৃষ্টিকে যে চরম শিখরে পৌঁছানো আবশ্যক, সেই স্থানে পৌঁছে দেন। এই বিশ্ব ব্যবস্থা সৃষ্টির পর প্রতিদিন এক নতুন মহিমা ও রূপ প্রকাশ করছে।

আল্লাহ্ তা’লা মানব প্রকৃতিতে অনুসন্ধান ও গবেষণার বৈশিষ্ট্য রেখেছেন। তাই এই মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণার ফলে, মানুষের নিকট আল্লাহ্ তা’লা নতুন নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এই জগত সমুহের মধ্যে রয়েছে মহাশূণ্য, যেখানে বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে, এ গুলোর মাঝে ভূ-জগতও রয়েছে, ভূ-গর্ভে বিভিন্ন ধরনের ধনভান্ডার রয়েছে, ভূগর্ভের বাহ্যিক আকৃতিই সব কিছু নয় বরং একটি পৃথক জগত রয়েছে সেখানে, বিজ্ঞানীরা যার উপর গবেষণা করে প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈচিত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করছেন। এরপর রয়েছে উদ্ভিদ জগত, যেখানে রয়েছে গুল্ম-লতা, গাছ-গাছালি, ফুল-ফলাদির এক ভিন্ন জগত। এর প্রকারভেদ এত বেশী যে, গণনা করে শেষ করা যায় না। প্রতিটির মাঝে আবার ঐশী কুদরতের এক নবরূপ চোখে পড়ে। অসংখ্য গুল্মলতা, গাছ-গাছড়া রয়েছে যা খাদ্য ছাড়াও নানা রোগ-ব্যাধির ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গবেষণার পর এর কতক সম্পর্কে মানুষ অবগত হয়েছে কিন্তু হয়তো অনেকগুলো এমনও আছে, যেগুলো সম্পর্কে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গের একটা আলাদা জগত রয়েছে। মোটকথা, এই মহাবিশ্বে আল্লাহ্ তা’লার অগণিত সৃষ্টি রয়েছে। প্রতিটি সৃষ্টির পিছনে একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে, সকলেই তা পূর্ণ করছে এবং আল্লাহ্ তা’লা প্রয়োজন মোতাবেক সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য উপকরণও সৃষ্টি করেছেন।

এরপর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘সুতরাং ঐশী প্রতিপালন বিধান সার্বজনীন কল্যাণধারা হিসেবে পরিচিত কেননা তা সকল আত্মা, দেহ, জীবজগত ও উদ্ভিদজগত এবং জড় বস্তুর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।’

আল্লাহ্ তা’লার রবুবিয়্যত সমস্ত আত্মা, সকল বস্তু, সমস্ত জীব-জন্তু, সব ধরনের গাছ-পালা, তরু-লতা এবং জড়বস্তুর উপরও কার্যকরী রয়েছে যাকে বলে সামগ্রিক কল্যাণ, অর্থাৎ এমন কল্যাণধারা যা আল্লাহ্ তা’লা সবকিছুর জন্য সার্বজনীন করে দিয়েছেন।

‘কেননা প্রত্যেক অস্তিত্বশীল তা থেকে কল্যাণ লাভ করে এবং এর মাধ্যমেই প্রত্যেকটি জিনিস অস্তিত্ব লাভ করে।’

অর্থাৎ পৃথিবীতে যত জিনিস রয়েছে, তা তাঁর মাধ্যমেই কল্যাণ লাভ করছে এবং সব জিনিসের অস্তিত্ব সেখান থেকেই উৎসারিত হচ্ছে, তাঁর কল্যাণেই সবকিছু অস্তিত্ব পেয়েছে। তিনি (আ.) বলেন,

‘অবশ্য ঐশী প্রতিপালন যদিও প্রতিটি অস্তিত্বের অস্তিত্বদাতা এবং প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর প্রতিপালক, কিন্তু অনুগ্রহ ও অনুকম্পা লাভের দৃষ্টিকোন থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় মানুষ; কেননা মানুষ আল্লাহ্ তা’লার সমস্ত সৃষ্টি হতে উপকৃত হয়ে থাকে। এ জন্য মানুষকে স্মরণ করানো হয়েছে যে, তোমাদের খোদা রাববুল আলামীন। যাতে মানুষ আশায় বুক বাঁধতে পারে এবং এই বিশ্বাস পোষণ করে যে আমাদের উপকারের জন্য আল্লাহ্ তা’লার শক্তি অতি ব্যপক, তিনি উপায়-উপকরণের বিভিন্ন ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারেন।’

অতএব আল্লাহ্ তা’লা-ই বিশ্ব প্রতিপালক। আমরা জানি বা না জানি এই পৃথিবীতে যত জিনিস রয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটি আল্লাহ্ তা’লা কর্তৃক সৃষ্ট। মানুষের উপর এই রাববুল আলামীনের অনুগ্রহ হলো, তিনি যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন সব কিছুই সৃষ্টির সেরা জীব তথা মানুষের জন্য কল্যাণকর বানিয়েছেন যেন সে উপকৃত হতে পারে।

গবেষণার মাধ্যমে খোদার বিভিন্ন সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির সুবাদে এতে মানুষের উপকারিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে সামনে আসছে।

হযরত মসীহ্ মউওদ (আ.) আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্ট এই সমস্ত জিনিসের উল্লেখ করে বলেন, এ জিনিস গুলো দেখে মানুষের এই বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত যে, যে খোদা মানুষের প্রতি এতটা স্নেহ প্রদর্শনকরত মানুষের জন্য অগণিত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, এরপর তাদের কল্যাণার্থে এসবকে আবার মানুষের অধীনস্থ করেছেন সেই খোদা নিজ বান্দার কল্যাণের জন্য ভবিষ্যতেও অনুরূপ বস্তু সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন, অথবা যে সৃষ্ট বস্তুনিচয় রয়েছে, সে সবের অজানা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে তা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করতে পারেন। সুতরাং মানুষের উপর যেখানে এই রাববুল আলামীনের এত করুণা, তখন তাঁর প্রতি মানুষের কতটা কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, তাঁর প্রাপ্য অধিকার প্রদানে কতটা মনোযোগী হওয়া উচিত এবং সম্পূর্ণরূপে নিজেকে শির্কমুক্ত করে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভে কতটা সচেষ্ট হওয়া উচিত!

কুর’আন করীমের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ্ তা’লা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে, আমি তোমাদের কল্যাণের জন্য অসংখ্য উপকরণ সৃষ্টি করেছি। এই জিনিস গুলো ভোগ করতে গিয়ে সর্বদা স্মরণ রেখো যে, এগুলোর আদি ও একমাত্র সৃষ্টা আমিই। শুধু স্রষ্টা-ই নই বরং পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুকে প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং এর নিয়ন্ত্রণও আল্লাহ্ তা’লার হাতে। যেখানে এই সব কিছুই সেই সর্বোচ্চ সত্তার হাতে, যিনি রাববুল আলামীন, যিনি রহমান, যিনি তাঁর রহমানিয়াতের মাধ্যমে মানুষকে কল্যাণমন্ডিত করেন আবার রহীমিয়তের অধীনে এ সৃষ্টি হতে তারা আরো বেশি লাভবান হয় যারা পরিশ্রম করে। এমন খোদাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন খোদার প্রতি দৃষ্টি দেয়া চরম নির্বুদ্ধিতা। সুতরাং এমন খোদাই একমাত্র উপাসনার যোগ্য, যিনি রব (প্রভু), রহমান, রহীম এবং অন্যান্য অগণিত গুণাবলীর অধিকারী।

কুর’আন করীমের এক স্থানে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

اِنَّ فِىْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِىْ تَجْرِىْ فِىْ الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَمَآ اَنْزَلَ اللّٰهُ مِنَ السَّمَآءِ مِنْ مَّآءٍ فَاَحْيَا بِهِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيْهَا مِنْ کُلِّ دَآبَّةٍ وَّتَصْرِيْفِ الرِّيٰحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَآءِ وَالْاَرْضِ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ‏

অর্থ: ‘নিশ্চয় আকাশ সমুহ ও পৃথিবীর সৃজন, দিন ও রাতের আবর্তনের মাঝে, মানুষের উপকারে আসে এমন পণ্যসামগ্রী নিয়ে সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযানের মাঝে, সেই বারিধারা যা আল্লাহ্ তা’লা আকাশ হতে বর্ষণ করেন, এরপর এর মাধ্যমে জমিনকে মৃত্যুর পর পুনরায় সঞ্জীবিত করেন, এতে সব ধরনের বিচরণশীল জীব-জন্তুর বিস্তার ঘটান, একইভাবে বায়ু প্রবাহের পরিবর্তনের মাঝে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সেবায় নিয়োজিত মেঘমালার মাঝেও বুদ্ধিমান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৬৫)

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা মানুষের উপর কৃত নিজ কতক অনুগ্রহের উল্লেখ করে বলছেন, তোমাদের যদি বুদ্ধি থাকে তবে কখনো এদিক-সেদিক হাবুডুবু খাবে না। বরং আল্লাহ্ তা’লার প্রতিটি সৃষ্টি, যা হতে তোমরা লাভবান হচ্ছো, তা তোমাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার সামনে বিনত রাখার কারণ হওয়া উচিত।

শুরুতে আমি যে আয়াত পড়েছি তার পূর্বের আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলছেন:

وَاِلٰهُكُمْ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ ۚ لَآ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمُ

অর্থ: ‘বস্তুত: তোমাদের মা’বুদ নিজ সত্তায় এক-ই মা’বুদ, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি অসীম দাতা, পরম দয়াময়।’

(সূরা আল্ বাকারা: ১৬৪)

তিনি অযাচিত দয়ার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর নিয়ামত দান করেন এবং মানুষ যখন কৃতজ্ঞতার চেতনা নিয়ে সেসব নিয়ামত ভোগ করে, তখন এমন মানুষ উত্তরোত্তর আল্লাহ্ তা’লার অধিক নিয়ামতের উত্তরাধিকারী হতে থাকে। এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর রহমানিয়াতের কতক দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন।

পূর্বোক্ত যে আয়াত আমি পাঠ করেছি তাতে তিনি বলেছেন, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি আমার নিয়ামতসমুহের মধ্য থেকে একটি। আল্লাহ্ তা’লা আকাশ ও পৃথিবী নিরর্থক সৃষ্টি করেননি, বরং আমাদের পৃথিবী এবং এর সাথে সম্পর্কযুক্ত গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি, এ দুয়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে যে সব গ্যাস ও বায়ুমন্ডল রয়েছে, এসব কিছু মানুষের উপকারার্থে। যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতির আলোকে আমি বলেছিলাম, পৃথিবীতেই অসংখ্য জগত রয়েছে, বিভিন্ন ধরনের মাখলুক (সৃষ্টি) রয়েছে অর্থাৎ, এ সমস্ত জিনিসের নিজস্ব একটা জগত রয়েছে, এসব জিনিস মানুষের উপকারের জন্য। এরপর দিন ও রাতের আবর্তন, চবিবশ ঘন্টার দিনরাত বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত, যা মানব জীবনের একঘেয়েমি দূর করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্রাম ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির জন্য আবশ্যক। এরপর রয়েছে সমুদ্র, এর একটা উপকারিতা হলো, এতে নৌযান চলাচল, যা যাত্রী ও মালামাল এক স্থান হতে অন্য স্থানে পরিবহন করে। আল্লাহ্ তা’লার এই নিয়ামতকে আজও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অধিকাংশ বাণিজ্যিক পণ্য এসব নৌকা ও জাহাজের মাধ্যমেই এক স্থান হতে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। অতঃপর এই সমুদ্র সমুহের আরেকটি উপকারিতা হলো আল্লাহ্ তা’লা এর পানিকে মেঘ রূপে প্রবাহিত করে মানুষের জীবনোপকরণ সৃষ্টি করেন। মানবজাতি এবং প্রাণীকূলের খাদ্যের বিষয়টিও এই পানির উপর নির্ভরশীল। যদি এ পানি না থাকে তবে চাষাবাদের কোন প্রশ্নই উঠে না। বৃষ্টি একটু কমে গেলে হাহাকার দেখা দেয় আর যদি দীর্ঘ কাল বৃষ্টি বন্ধ থাকে তবে তো দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি দেখা দেয়।

আল্লাহ্ তা’লা পানির গুরুত্বের এই চিত্রটি সূরা আল্ মুলকে এভাবে উল্লেখ করেছেন যে,

قُلْ اَرَءَيْتُمْ اِنْ اَصْبَحَ مَآؤُكُمْ غَوْرًا فَمَنْ يَّاْتِيْكُمْ بِمَآءٍ مَّعِيْنٍ

অর্থ: ‘তুমি বলে দাও, তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছ যদি তোমাদের পানি ভূ-গর্ভে হারিয়ে যায় তখন আল্লাহ্ তা’লা ব্যতীত আর কে আছে, যে তোমাদের জন্য প্রবাহমান পানির ব্যবস্থা করবে?’

(সূরা আল্ মুল্‌ক: ৩১)

সুতরাং পৃথিবীর পানি ততক্ষণ জীবনের বিধান করতে সক্ষম যতক্ষণ আল্লাহ্ তা’লার পানি আকাশ হতে বর্ষিত হয়।

এরপর মানব জীবন, বৃক্ষ ও উদ্ভিদের উপরও বাতাসের প্রভাব পড়ে। এটি জানা কথা বা আমাদের কৃষকরা জানেন, অনুন্নত বিশ্ব যেমন পাকিস্তান, ভারত ও অন্যান্য দেশের কৃষকরাও জানে যে বায়ু প্রবাহ ফসলের জন্য উপকারী হয়ে থাকে। অমুক দিক থেকে যদি বায়ু প্রবাহিত হয় অমুক ফসলের জন্য ভাল হবে, ঠান্ডা বাতাস যা এক সময় এক ফসলের জন্য উপকারী হয় অন্য সময় সেই একই বাতাস ক্ষতিকর হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, খোদা তা’লা যা কিছু বানিয়েছেন, এ সব কিছু কোন ঘটনাচক্রে ঘটে যাওয়া বিষয় নয়, বরং আমার অস্তিত্বের প্রমাণ। এ জন্য বিশ্ব জগত, আকাশ ও পৃথিবীর গঠন, দিন-রাতের আবর্তন এবং মৌসুমের পরিবর্তনের প্রতি গভীর ভাবে মনোনিবেশ করলে, আল্লাহ্ তা’লার অস্তিত্বের উপর মানুষের নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপিত হয় আর হওয়া উচিতও। আল্লাহ্ তা’লা এ সবকিছু সৃষ্টি করে ঘোষণা করেছেন যে, এ জিনিস গুলো শুধু সৃষ্টি-ই করিনি, বরং এ গুলোর তত্ত্বাবধায়কও। যেখানে রহমানিয়াতের জ্যোতির্বিকাশে সাধারণ ভাবে আমি আমার সৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীর উপকার করি, সেখানে রহিমিয়াতের অধীনে অসাধারণ নিদর্শনও দেখিয়ে থাকি। মক্কায় একবার লাগাতার সাত বছর দুর্ভিক্ষ বিরাজ করে, এমন অবস্থা দেখা দেয় যে, মানুষ হাড়, চামড়া পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়। সেই অবস্থায় মক্কার নেতারা মহানবী (সা.)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে যখন, সাহায্য ও দোয়ার আবেদন করল, ঐশী গুণাবলীর সবচেয়ে বড় মূর্ত বিকাশ (সা.) দোয়া করলেন, এরপরই হিজাযের খরাকবলিত অবস্থার অবসান ঘটলো এবং তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা হল। একবার বৃষ্টির জন্য মদীনাবাসীর আবেদনের প্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) দোয়া করলেন, ফলে হঠাৎ আকাশে মেঘ জমে এবং বৃষ্টি আরম্ভ হয় আর বর্ষণ অব্যহত থাকে। অবস্থা এমন রূপ নিল যে, এক সপ্তাহ পর সাহাবাগণ তাঁর (সা.) ���মীপে এসে বৃষ্টি বন্ধ হবার জন্য দোয়া চাইলেন, তিনি (সা.) আবার দোয়া করলেন, হে আল্লাহ্! তুমি আমাদের চতুর্পার্শ্বে বৃষ্টি দাও, কিন্তু আমাদের এলাকায় নয়, কেননা বৃষ্টিতে ঘর বাড়ি ধ্বসে পড়ছে। যে স্থানে বৃষ্টি উপকারী হতে পারে সেখানে বর্ষণ কর। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা’লা তাৎক্ষণিক ভাবে সেই দোয়া কবুল করলেন। মহানবী (সা.)-এর উম্মতে আল্লাহ্ তা’লা সদা এমন কল্যাণকর ব্যক্তির ধারা অব্যাহত রেখেছেন যাদের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লা নিজ খোদা হওয়ার স্বাক্ষর রেখে মানুষের জন্য কল্যাণের উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। বর্তমান যুগেও আমরা দেখছি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জীবন এমন অনেক ঘটনায় পরিপূর্ণ, যেখানে তাঁর দোয়ার ফলে মানুষের উপকার হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, আমি আমার সৃষ্ট বস্তুনিচয় তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছি তা দেখে তোমাদের ঈমানের উন্নতি হওয়া উচিত। এরপর আল্লাহ্ তা’লা এই বাহ্যিক, পার্থিব ও জাগতিক দৃষ্টান্তকে আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনার সাথে তুলনা করেছেন, বরং আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনা আরো ব্যপকতর। কেননা এ পৃথিবীর স্বার্থ ও কল্যাণ এখানেই থেকে যাবে, কিন্তু আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে অর্জিত কল্যাণ পারলৌকিক জীবনে কাজে লাগবে।

কাজেই একজন মু’মিন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকে শুধু এই পার্থিব জগতের কল্যাণের কারণ মনে করেনা, বরং সেগুলোর উপর গভীর ভাবে মনোনিবেশ করে আল্লাহ্ তা’লার একত্ববাদ, তাঁর উপর বিশ্বাস এবং আখিরাতের উপর ঈমান দৃঢ়তর হতে থাকে। মানব জীবন এবং প্রয়োজনীয়তার উপর যেভাবে দিন ও রাতের বাহ্যিক প্রভাব ও উপকারিতা রয়েছে, একই ভাবে আল্লাহ্ তা’লা দিন ও রাতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আধ্যাত্মিক ভাবেও আমি অন্ধকারের পর আলোর বিধান করে থাকি, যার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক অন্ধকার দূরীভুত হয় এবং ফিরিশ্তা, নবী ও প্রত্যাদিষ্টগণের মাধ্যমে এই অন্ধকার দূরীকরণের জন্য উপকরণ সরবরাহ করে থাকি। আল্লাহ্ তা’লা কোন যুগেই এই নূর ও জ্যোতি প্রকাশের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন নি, বরং সকল যুগেই তিনি নূর ও জ্যোতি প্রেরণ করেছেন। বর্তমান যুগেও তিনি নিজ অঙ্গীকার মোতাবেক হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে প্রেরণ করেছেন। যিনি আমাদের নবরূপে ইসলামের আলো দেখিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা যেভাবে পার্থিব জগতে মানুষের মঙ্গলের জন্য নৌকার মাধ্যমে নিরাপদ পরিবহণ ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন, ঠিক একইভাবে আধ্যত্মিক জগতেও তিনি তাঁর বিশেষ বান্দাদেরকে প্রেরণ করে থাকেন, তাঁরা আধ্যাত্মিক নৌকা তৈরী করেন, যা বিপদাপদ ও সমস্যার সমুদ্রে তাঁর মনোনীত বান্দার মান্যকারীদেরকে গন্তব্যে পৌছে দেয়। সেই গন্তব্য হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি এবং ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণ।

আমরা দেখেছি যে, বান্দার উপর আল্লাহ্ তা’লার এই অনুগ্রহ কখনো এবং কোন যুগেই বন্ধ হয়নি। পূর্বেই আমি বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা যখনই, ظَهَرَ الْفَسَادُ فِىْ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ (সূরা আর্ রূম: ৪২) এর পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন, এই পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও ফ্যাসাদ দেখেন এবং যখন এটি সীমাতিক্রম করার উপক্রম হয়, তখনই তাঁর বান্দা, মানুষ এবং তাঁর সৃষ্টিকে এ অবস্থা হতে রক্ষা করার জন্য তিনি স্বীয় মনোনীত বান্দাকে প্রেরণ করেন। যিনি একটি নৌকা তৈরী করেন, যা এই ঝড়-তুফান হতে তাঁর মান্যকারীদেরকে নিরাপদে উদ্ধার করে। বর্তমান যুগে এই নৌকা হলো হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বানানো নৌকা। এই নৌকায় তারাই আরোহী বলে বিবেচিত হবেন যারা এর প্রতি করণীয় করবে, বা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে।

এই দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হবে তা স্পষ্ট করার মানসে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কিশতিয়ে নূহ্ নামে একটি বই রচনা করেছিলেন যাতে তাঁর যুগে যখন প্লেগ মহামারী রূপে দেখা দিয়েছিল তা হতে বাঁচার আধ্যাত্মিক আরোগ্যের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি (আ.) এই পুস্তকে লিখেছেন,

‘যদি এই প্রশ্ন উঠে যে, সেই শিক্ষা কি, যার পরিপূর্ণ অনুসরণ প্লেগের আক্রমণ হতে রক্ষা করতে পারে? এর উত্তরে আমি নিচে সংক্ষিপ্তাকারে কয়েকটি লাইন লিপিবদ্ধ করছি।’

(কিশতিয়ে নূহ্ - রূহানী খাযায়েন - ১৯তম খন্ড, পৃ: ১০)

এরপর তিনি (আ.) সেই পুস্তকে ‘তালীম’ বা শিক্ষা শিরোনামে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। যাতে তিনি (আ.) আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,

‘কেবল মৌখিক বয়’আতের কোন মূল্য নাই, যে পর্যন্ত না মানব সর্বান্ত:করণে তন্নিহিত শিক্ষাকে পূর্ণভাবে কার্যে পরিণত করে।’

(কিশতিয়ে নূহ্ - রূহানী খাযায়েন - ১৯তম খন্ড, পৃ: ১০)

অর্থাৎ, পুরো দৃঢ়চিত্ততা ও আন্তরিক সংকল্প নিয়ে এর উপর আমল করার চেষ্টা করতে হবে।

এরপর বলেন,

‘বাহ্যিক বয়’আত করে তোমাদের কর্তব্য শেষ হয়েছে, এটি কখনও মনে স্থান দিও না। বাহ্যিকতার কোন মূল্য নেই, আল্লাহ্‌ তা’লা তোমাদের হৃদয় দেখেন আর তদনুসারে তোমাদের সাথে ব্যবহার করবেন।’

(কিশতিয়ে নূহ্ - রূহানী খাযায়েন - ১৯তম খন্ড, পৃ: ১৮)

এরপর তিনি (আ.) বলেন,

‘তোমরাই আল্লাহ্ তা’লার শেষ ধর্মমন্ডলী, কাজেই পুণ্যকর্মের এমন দৃষ্টান্ত দেখাও যা হতে আর উৎকৃষ্টতর দৃষ্টান্ত হওয়া সম্ভব নয়।’

(কিশতিয়ে নূহ্ - রূহানী খাযায়েন - ১৯তম খন্ড, পৃ: ১৫)

যাহোক, সারকথা হিসেবে আমি কয়েকটি কথা তুলে ধরলাম, তিনি (আ.) এই পুস্তকে সেই মাপকাঠি তুলে ধরেছেন, যা অর্জন করে বা অর্জনের চেষ্টা করে একজন মানুষ, একজন মু’মিন, একজন আহ্‌মদী হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যে নৌকা বানিয়েছেন, তাতে উঠে নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এই শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার সুযোগ দিন যাতে আমরা আল্লাহ্ তা’লা প্রেরিত যুগ ইমামের কথা এবং শিক্ষা হতে বেশি বেশি কল্যাণ লাভ করতে পারি।

আজও পৃথিবী বিপদাপদ ও বালা-মুসিবতে জর্জরিত। নিত্য নতুন রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি এক ধরনের ফ্লু’র (সর্দি-জ্বর) প্রাদুর্ভাব হয়েছে, যাকে Swine Flue বলা হয়। সুতরাং পৃথিবীতে বিস্তৃত এসব বিপদাপদ ও মুসিবত, আমাদেরকে চিন্তার আহবান জানাচ্ছে, চিন্তা করতে বাধ্য করছে; যেন আমরা নিজ নিজ অবস্থানকে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোন থেকে দেখে আল্লাহ্ তা’লা, তাঁর রসূল (সা.) এবং তাঁর প্রেরিত যুগ ইমামের আদেশ সমূহ ও শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য চেষ্টা করি। যদি আমরা নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করি, তাহলে সেই আধ্যাত্মিক পানি হতেও আমরা কল্যাণ লাভ করবো, যা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, فَاَحْيَا بِهِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا (সূরা আল্ বাকারা: ১৬৫) অর্থাৎ ‘যদ্বারা পৃথিবীকে এর মৃত্যুর পর আমরা সঞ্জীবিত করেছি।’ যেভাবে বস্তুজগতে ভূমিতে বৃষ্টির পর তরুলতা গজায়, একইভাবে আধ্যাত্মিক বৃষ্টির ফলে একটি নব জীবন লাভ হয় যা আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় নবী এবং প্রত্যাদিষ্টদের মাধ্যমে নাযিল করেন, কিন্তু এ পানি দ্বারা কেবল তারাই কল্যাণমন্ডিত হয়ে থাকে যাদের ভেতর ঊর্বর ভূমির ন্যায় তা থেকে উপকৃত হওয়ার যোগ্যতা নিহিত থাকে। আল্লাহ্ তা’লা তো আধ্যাত্মিক সতেজতা ও সার্বজনীন কল্যাণের বিধান মোতাবেক পানি বর্ষণ করেছেন। কিন্তু ঐ পানি শোষণ করে এর দ্বারা লাভবান হওয়ার জন্য হৃদয়ের ঊর্বরতার প্রয়োজন।

মহানবী (সা.) হাদীসে এর একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। তিনি (সা.) বলেন যে,

‘পৃথিবীতে তিন প্রকার মানুষ দেখা যায়। কতক এমন যারা ভাল ভুমির মত নরম এবং নিজের ভেতর পানি ধারণ করার বৈশিষ্ট্য রাখে। তারপর এমন ভুমি যা নিজে পানি শোষণ করে অথবা এদ্বারা উপকৃত হয়, আর এর ফলে ভাল ফসল উৎপন্ন হয়। পানি শোষণ করে তারপর সেই পানি ব্যবহার করে ভাল ফসলাদি উৎপাদনের জন্য। এমন ভুমিতে যখন বৃষ্টি বর্ষিত হয় তা শোষণের ফলে এতে ত���ুলতা গজায় আর ফসলও ভাল হয় এবং তা অন্যকে খোরাক সরবরাহের মাধ্যমে তাদের উপকার সাধন করে।’

তিনি (সা.) বলেন,

‘দ্বিতীয় ধরনের জমি শক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে, পানি শোষণ করতে পারে না ঠিকই কিন্তু পানি ধরে রাখে, যেমন পুকুর ইত্যাদি। এই পানি দ্বারা ঐ ভূমি সরাসরি উপকৃত হয় না। এতে কোন কিছু উৎপাদিত হয় না। কিন্তু যে পানি সেখানে জমা হয় তা জীবজন্তু ও মানুষ পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার করে এবং পান করা ব্যতীত চাষাবাদের কাজেও সেই পানি ব্যবহৃত হয়।’

আবার তিনি (সা.) বলেন,

‘তৃতীয় ধরনের ভূমি হচ্ছে সেই ভূমি যা কঠিন পাথুরে ও মসৃণ, বা এমন ঢালু জমি যার পানি গড়িয়ে অন্যত্র চলে যায় এবং এতে কোন গর্ত থাকেনা। এ জাতীয় ভূমি নিজের ভেতর পানি শোষণও করে না এবং এতে পানি থাকেও না। অতএব এ জাতীয় ভূমি, পানি দ্বারা নিজেও লাভবান হয়না আর নিজের বুকে ধারণ করে অন্যেরও কল্যাণ সাধন করতে পারে না।’

মহানবী (সা.) বলেন, প্রথম প্রকারের ভূমি যা পানি শোষণ করে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে অন্যের উপকার করে, তা সেই জ্ঞানী ব্যক্তির ন্যায়, যে কেবল নিজেই ধর্ম শিখে না বা জ্ঞান অর্জন করে না বরং অন্যেরও এই অর্জিত জ্ঞান দ্বারা উপকার ও কল্যাণ সাধন করে। আর তিনি (সা.) বলেন, তৃতীয় প্রকারের মানুষ সেই পাথুরে ভূমির ন্যায় যার উপর পানি দাঁড়ায়ও না এবং পানি শোষিতও হয় না। আধ্যাত্মিক বৃষ্টি তারও কোন কল্যাণ সাধন করতে পারে না এবং অন্যরাও এদ্বারা কোনভাবে উপকৃত হয় না। আর দ্বিতীয় প্রকারের ভূমির উদাহরণ তিনি (সা.) বর্ণনা করেননি। কিন্তু ইতিপূর্বে দেয়া পানির দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট যে, এর অর্থ তাই যা তিনি পূর্বে বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ এমন পুকুর যা থেকে ভূমি নিজে লাভবান হয় না বৈ-কি কিন্তু অপরের উপকার সাধন করে। এমন মানুষ যিনি ধর্ম ও জ্ঞান অর্জন করেন, কিন্তু নিজে এর উপর আমল করেন না। তথাপি তিনি যে ধর্ম ও জ্ঞান আহোরণ করেছেন তা অপরকে শিখান এবং এ শিখানোর কারণে কতক সৎ প্রকৃতির লোক সে মোতাবেক আমল করতে শুরু করেন। অতএব আল্লাহ্ তা’লা যখন তাঁর প্রত্যাদিষ্ট প্রেরণ করেন তখন তাদের আধ্যাত্মিক পানি দ্বারা এ তিন প্রকার মানুষ সামনে আসে। সুতরাং একজন সত্যিকার মু’মিনকে প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হবার চেষ্টা করা উচিত। নিজেও যেন লাভবান হয় এবং অপরের উপকার সাধনের প্রতিও যেন মনোনিবেশ করে। নিজ বংশ ও নিজ পরিবেশে এমন শস্য রোপন করা উচিত যা মানবতার হিতসাধনকারী হবে। তাহলেই ‘আন্ নাফে’ খোদার কৃপা হতে সত্যিকার অর্থে আমরা লাভবান হবো। কল্যাণ অর্জনকারী হবো।

পুনরায় আল্লাহ্ তা’লা বলেন, وَبَثَّ فِيْهَا مِنْ كُلِّ دَآبَّةٍ‌ (সূরা লুকমান: ১১) অর্থাৎ এবং সব ধরনের বিচরণকারী প্রাণীর বিস্তার ঘটিয়েছি, এটি তোমাদের জন্য কল্যাণের কারণ। এসব প্রাণীর বিস্তার ঘটানোও আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহরাজির একটি। আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুর’আনে বিভিন্ন স্থানে এর উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা নাহ্ল’এ বলেছেন:

وَالْاَنْعَامَ خَلَقَهَا‌ۚ لَـكُمْ فِيْهَا دِفْءٌ وَّمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَاْكُلُوْنَ

وَلَكُمْ فِيْهَا جَمَالٌ حِيْنَ تُرِيْحُوْنَ وَحِيْنَ تَسْرَحُوْنَ

অর্থ: ‘আর চতুস্পদ জন্তুকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। যাদের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তাপের উপকরণ এবং নানাবিধ উপকার নিহিত আছে এবং ওদের মধ্য হতে কতককে তোমরা ভক্ষণ করে থাক। এবং ওদের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সৌন্দর্য, যখন তোমরা তাদিগকে চারণভূমি হতে গোধূলী লগ্নে (গৃহে) নিয়ে আস এবং যখন তোমরা ওদেরকে প্রভাতে চারণভূমিতে নিয়ে যাও তখনও।’

(সূরা আন্ নাহ্ল: ৬-৭)

মানুষ এসব জীবজন্তু দ্বারা উপকৃত হয়। এদের মাংস, পশম, চামড়া ব্যবহার করে বরং কখনও কখনও পশুদের হাঁড়ও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আবার এটি সম্পদশালী হওয়ারও একটি মাধ্যম বটে। পশু পালন করা হয়, মানুষ এর ব্যবসা করে।

সুরা বাকারা’র যে আয়াতটি আমি সর্বপ্রথম পাঠ করেছি তাতে ‘দাববা’ শব্দ রয়েছে আর এখানে ‘আন্’আম’ শব্দ এসেছে। চতুষ্পদ জন্তুকে আন্’আম বলা হয়। কিন্তু পবিত্র কুর’আনে দাববা শব্দ চতুষ্পদ জন্তু তথা সকল প্রকার প্রাণীর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং ‘দাববা’ বলতে সকল প্রকার জীবজন্তু বুঝায়। একস্থানে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللّٰهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِمْ مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِنْ دَآبَّةٍ وَّلٰـكِنْ يُّؤَخِّرُهُمْ اِلٰٓى اَجَلٍ مُّسَمًّى‌‌ۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُهُمْ لَا يَسْتَـاْخِرُوْنَ سَاعَةً‌ وَّلَا يَسْتَقْدِمُوْنَ‏

অর্থাৎ ‘যদি অপরাধের দায়ে মানুষকে আল্লাহ্ তা’লার তাৎক্ষণিকভাবে ধৃত করার রীতি হতো এবং ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ না দিতেন, তাহলে তিনি কোন প্রাণীকে ছাড়তেন না।’

(সূরা আন্ নাহ্ল: ৬২)

অবএব আল্লাহ্ তা’লা যেহেতু তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দিতে চান না, সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি প্রদান করা তাঁর রীতি নয়; এজন্য তিনি তার কল্যাণার্থে সবধরনের জীবজন্তু পৃথিবীময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। যাদের মধ্যে ছোট ছোট কীট-পতঙ্গ রয়েছে এবং বড় বড় জীবজন্তুও রয়েছে। অতএব আল্লাহ্ তা’লা ভূমি বিরান হবার পর তাকে জীবিত করে তাতে বিভিন্ন প্রকার জীবজন্তু বিস্তারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৃথিবীর সমগ্র প্রাণীকূলের পিছনে এসব জীবজন্তুরও অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। কেননা আল্লাহ্ তা’লা বলেন, যদি জীবন নি:শেষ করতে হয় তবে শুধু এখানকার যে প্রাণী রয়েছে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিলেই মানব জীবনের অবসান ঘটবে। অনুরূপভাবে বলেন, আধ্যাত্মিক জগতেও ‘দাববা’ রয়েছে। আর তারা এমন মু’মিন যারা আধ্যাত্মিক পানি হতে লাভবান হয়ে তারপর পৃথিবীর সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে ব্যপকভাবে আল্লাহ্ তা’লার বাণী প্রচার করেন।

অতএব আল্লাহ্ তা’লার বাণী প্রচার করে এই পৃথিবীর জীবন ও সৌন্দর্যের ব্যবস্থা করা প্রত্যাদিষ্টদের জামাতের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আবার বাতাস সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, বাতাসকে বিশ্বাসীদের সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে। আধ্যাত্মিক জগতেও এমনি হয়ে থাকে। এ আধ্যাত্মিক বাতাস দ্বারা যেন পৃথিবী লাভবান হতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় করুণার বাতাস আধ্যাত্মিক জগতে প্রবাহিত করে থাকেন এবং এর দ্বারা তাঁর প্রত্যাদিষ্টদের ও তাঁর জামাতের সাহায্য করে থাকেন। যদি বিরোধিতার ঝড় আসে তবে এর ক্ষয়ক্ষতি হতে আল্লাহ্ তা’লা রক্ষা করেন। বিশ্বাসীদের সেবায় তা নিয়োজিত করেন। আহ্‌মদীয়া জামাতের ইতিহাসই দেখুন না! হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগ হতে আজ পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’লা নিজেই স্বীয় করুণায় বিরোধী বাতাসের গতিপথ পরিবর্তন করে আসছেন। কেবল গতিপথই পরিবর্তনই করছেন না বরং আমাদের অনুকূলে এমন বাতাস প্রবাহিত করছেন যা বিশুদ্ধ অন্তরকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতার দিকে আকৃষ্ট করে। আমি প্রায়ই উল্লেখ করে থাকি, আমার নিত্যদিনের ডাকে অনেক সময় এমন বিষয় সম্বলিত চিঠি থাকে যে, এদের কাছে আহ্‌মদীয়াতের বাণীর সুশীতল বায়ু স্বয়ং খোদা তা’লার নিকট হতে পৌছে; বিশেষ করে আরবদের মাঝে। আরবদের ভাষার গভীরতার কারণে, দ্বিতীয়তঃ আরব বৈশিষ্ট্যের কারণেও হতে পারে হয়তো, কিন্তু ভাষার গভীরতার কারণেই হবে; তাদের বিবরণ এমন হয়ে থাকে যে, যখন নিজেদের বয়’আতের কথা উল্লেখ করেন তথা কীভাবে আল্লাহ্ তা’লা তাদের পথ দেখিয়েছেন তা উল্লেখ করতে গিয়ে তারা সুশীতল বাতাসের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। এ হলো খোদা তা’লার কাজ; তিনি মু’মিনদের সমর্থনে বৃষ্টি ও বাতাস প্রবাহিত করেন। সুতরাং ইনি হলেন আমাদের ‘না’ফে’ খোদা যিনি প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের উপকার করছেন। আর আজকে এই রাববুল আলামীন খোদা, যিনি বর্তমান যুগে স্বীয় আধ্যাত্মিক কল্যাণধারা প্রবহ��ান রাখার জন্য নিজ মা’মুর প্রেরণ করেছেন আর আমরা তাঁর জামাতভুক্ত। আমাদের বিরোধীরা পূর্বে কঠোরতার সাথে আমাদের পথে বাঁধা সৃষ্টি এবং চরম শত্রুতা প্রকাশে কোন ত্রুটি করতোনা যার প্রত্যুত্তরে আমরা হিতসাধন করতঃ তাদেরকে সেই আধ্যাত্মিক ফল ও ফসল সরবরাহের চেষ্টা করতাম যদ্বারা তারা লাভবান হতে পারে এবং আজও করছি। আর তাদের জন্য মহানবী (সা.)-এর এই দোয়া আগেও করতাম আর এখনও করি যে, ‘আল্লাহুম্মাহদে কওমী ফাইন্নাহুম লা ইয়া’লামুন’ আল্লাহ্ তা’লা তাদের হেদায়াতের উপকরণ সৃষ্টি করুন। কিন্তু এখন এরা একটি ভিন্ন রীতি অনুসরণ করছে যা পূর্বে কম ছিল, এখন অনেক বেড়ে গেছে। এরা বলে যে, হে কাদিয়ানীরা! মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে অস্বীকার করে আমাদের কাছে চলে আসো তাহলে আমরা তোমাদের বুকে টেনে নেব। অর্থাৎ ‘না’ফে’ খোদার মা’মুরের জামাত ছেড়ে আমাদের সাথে যোগ দাও যেখানে ফিৎনা ফাসাদ ছাড়া আর কিছু নেই। এক দিকে মহানবীর উম্মত হবার দাবী অপর দিকে উম্মতের লোকদের শিরচ্ছেদ করা হচ্ছে। যাই হোক, খোদা তা’লা আমাদের শুধু হেদায়াতই দেননি বরং কুর’আনে বলেছেন, এদের উত্তর দাও যে, প্রকৃত হেদায়াত আমাদের কাছে আছে তোমাদের কাছে নয়। তাই তোমরাও যদি বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য থেকে রেহাই পেতে চাও তবে সেই মাহদীকে গ্রহণ কর যাকে খোদা তা’লা প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা কুর’আনে বলেন যে,

قُلْ اَنَدْعُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَا لَا يَنْفَعُنَا وَلَا يَضُرُّنَا وَنُرَدُّ عَلٰٓى اَعْقَابِنَا بَعْدَ اِذْ هَدٰٮنَا اللّٰهُ كَالَّذِىْ اسْتَهْوَتْهُ الشَّيٰطِيْنُ فِىْ الْاَرْضِ حَيْرَانَ لَـهٗۤ اَصْحٰبٌ يَّدْعُوْنَهٗۤ اِلَى الْهُدَى ائْتِنَا‌ؕ قُلْ اِنَّ هُدَى اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰى‌ؕ وَاُمِرْنَا لِنُسْلِمَ لِرَبِّ الْعٰلَمِيْنَۙ‏

অর্থ: ‘তুমি বল, আমরা কি আল্লাহ্‌কে ছেড়ে এমন কিছুকে ডাকবো যা না আমাদের কোন উপকার করতে পারে এবং না আমাদের কোন অপকার করতে পারে; এবং আল্লাহ্ আমাদেরকে হেদায়াত দেবার পরও কি আমরা আমাদের গোড়ালির উপর সেই ব্যক্তির মত প্রত্যাবর্তিত হবো, যাকে শয়তান প্রলুব্ধ করে ভূপৃষ্ঠে হতবুদ্ধি করেছে? তার কতক সঙ্গী আছে, যারা তাকে হেদায়াতের দিকে এই বলে ডাকে, আমাদের নিকট আসো। তুমি বল, নিশ্চয় আল্লাহ্‌র হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত; এবং আমরা আদিষ্ট হয়েছি যেন আমরা সমগ্র জগতের প্রভু-প্রতিপালকের সমীপে আত্মসমর্পণ করি।’

(সূরা আল্ আন্’আম: ৭২)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আয়াতাংশ قُلْ اِنَّ هُدَى اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰى ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,

‘এদের বল, তোমাদের মতামতের কোন গুরুত্ব নেই। প্রকৃত হেদায়াত তা যা খোদা সরাসরি স্বয়ং দিয়ে থাকেন। নতুবা মানুষ নিজ ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে ঐশী কিতাবের অর্থ বিকৃত করে আর এক বিষয়কে ভিন্ন বিষয়ে রূপান্তরিত করে। তিনিই খোদা! যিনি ভ্রান্তি মুক্ত। তাই তার হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত। মনগড়া অর্থ নির্ভর যোগ্য নয়।’

(তফসীর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) {সূরা আল্ আন্’আম:৭২} ২য় খন্ড, পৃ: ৪৭৮)

এটিই প্রকৃত হেদায়াত ও ইসলামী শিক্ষা। এটি সে বিষয় যার প্রতি মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এখন এই হেদায়াতকে ছেড়ে আমরা তাদের অনুসরণ করব? যারা আজ পর্যন্ত কুর’আনের আয়াত সম্পর্কে নাসেখ ও মনসুখের বিতর্কে লিপ্ত। প্রথমে চৌদ্দ শতাব্দীর অপেক্ষায় ছিল যে, মসীহ্ ও মাহদী আসবেন এখনতো শতাব্দীই দীর্ঘ হয়ে গেছে আর মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অস্বীকারে বদ্ধপরিকর। যারা একই বই ও একই রসূলের মান্যকারী হওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের বিরুদ্ধে কুফরী ফতোয়া দিচ্ছে। অতএব আমরা সেই মসীহ্ ও মাহদীর কল্যাণে খোদার জ্ঞান লাভ করেছি যিনি (খোদা তা’লা) মহানবী (সা.)-কে শেষ শরিয়তধারী নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন যিনি তাঁর (সা.) উপর কুর’আনের মত মহান গ্রন্থ নাযিল করেছেন যা সকল হেদায়াতের উৎসস্থল। আর খোদা সম্পর্কে এ উপলদ্ধি ও জ্ঞান আমাদেরকে এই যুগের ইমাম মসীহ্ ও মাহদী দান করেছেন। সুতরাং এ যুগে যেখানে খোদা তা’লা আমাদের হেদায়াত, কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন ঘটিয়েছেন সেখানে আমাদের কি হয়েছে যে, সেই খোদাকে পরিত্যাগ করে আমরা অন্য কোন খোদাকে মানবো? আর আজ যদি আমরা মসীহ্ (আ.)-এর দাবী সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করি তাহলে সে সকল ভূমি ও আকাশ থেকে প্রকাশিত নিদর্শনকে কি বলবো যা খোদা তা’লা তিনি (আ.)-এর পক্ষে পূর্ণ করেছেন এবং আজ পর্যন্ত নিজ প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পূর্ণ করছেন আর তিনি প্রতিশ্রতি মোতাবেক নিদর্শন প্রদর্শন করে চলেছেন। যদি এটি কোন বান্দার কাজ হতো তাহলে কীভাবে এমন হল যে, গত ১২০ বছর থেকে আহ্‌মদীয়াতের শত্রু আহ্‌মদীয়াতকে নির্মূল করার সকল সম্ভাব্য মানবীয় সকল ষড়যন্ত্র করেছে কিন্তু আমাদের খোদা আমাদেরকে আহ্‌মদীয়াতের উন্নতির নুতন মাইল ফলক অতিক্রমের তৌফিক দিয়ে যাচ্ছেন। আর আমাদের বিরোধীদের আমরা সদা কান্ডজ্ঞান হারানো পেয়েছি। তাদের অবস্থা দেখে খোদার প্রেরিত মা’মুর ও মহানবী (সা.)-এর নিষ্ঠাবান প্রেমিকের উপর আমাদের ঈমান আরও দৃঢ় হয়। সুতরাং তোমরা আর আমাদের কি আমন্ত্রণ জানাবে আমরা তোমাদেরকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যে, এসো এই মসীহ্ ও মাহদীর জামাতভুক্ত হও এতেই তোমাদের জীবনের নিশ্চয়তা এতেই সারা পৃথিবীর অস্তিত্বের নিশ্চয়তা। আল্লাহ্ তা’লা এদের তৌফীক দিন, আমীন।

পরিশেষে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর একটি উদ্ধৃতি উপস্থাপন করতে চাই। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বৈঠকে ভিঁ নিবাসী ফয়েজী’র কথা হচ্ছিল যিনি এজাযুল মসীহ্‌র উত্তর লিখতে চেয়েছিল কিন্তু সফল হয়নি বরং খোদা তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই সভায় বলেন,

‘আমাদের সত্যায়ন ও সমর্থনে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এটি কত বড় নিদর্শন। কেননা পবিত্র কুর’আনে এসেছে, وَاَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِىْ الْاَرْضِ (সূরা আর্ রা’দ: ১৮) (যা মানুষের উপকারে আসে তা ভূ-পৃষ্ঠে স্থায়ী থাকে)

তিনি বলেন, ‘এখন প্রশ্ন যা দাঁড়ায় তা হলো যদি আমাদের বিরোধীদের অপপ্রচার অনুসারে আমাদের এই জামাত আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে না হতো তাহলে ফয়েজী মানবকল্যাণমূলক যে কাজ আরম্ভ করেছিল তাতে তার সমর্থন করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু এভাবে তার যৌবনে মারা যাওয়া সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, (যৌবনেই মারা যায়) এই জামাতের বিরোধিতার লক্ষ্যে কলম হাতে নেয়া মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ ছিল না। নিদেনপক্ষে আমাদের বিরোধীদের এটা মানতে হবে যে, তার নিয়ত ভাল ছিল না নতুবা কারণ কি যে খোদা তাকে সাহায্য করেন নি আর তিনি কাজটি সম্পূর্ণ করার সময় পান নি। (অর্থাৎ কাজ শেষ করার সুযোগ পায়নি)

(আ.) বলেন, ‘আমার নিজের ইলহামেও এটিই রয়েছে, وَاَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِىْ الْاَرْضِ (সূরা আর্ রা’দ: ১৮) । ত্রিশ বছর অধিককাল পূর্বে আমার ভয়াবহ জ্বর হয়। এমন প্রচন্ড জ্বর হয় যেন আমার বুকে অনেক জ্বলন্ত কয়লা রাখা হয়েছে সে সময়ে আমার উপর ইলহাম হয় وَاَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِىْ الْاَرْضِ (সূরা আর্ রা’দ: ১৮) এই যে আপত্তি করা হয় যে, ইসলামের কতক বিরোধীও দীর্ঘ জীবন লাভ করে এর কারণ কি?’

তিনি (আ.) বলেন, ‘আমার মতে এর কারণ হলো তাদের অস্তিত্বও কোন কোন দৃষ্টিকোন থেকে কল্যাণকর হয়ে থাকে। যেমন, আবু জাহল বদরের যুদ্ধ পর্যন্ত জীবিত ছিল। আসল কথা হলো, যদি বিরোধীরা আপত্তি না করতো তাহলে কুর’আন শরীফের ত্রিশ পারা কোথা থেকে আসতো?’ (আপত্তি উঠতে থাকে, অনেক সময় আল্লাহ্ তা’লা আপত্তির উত্তরে শিক্ষা নাযিল করেন।)

তিনি (আ.) বলেন যে, ‘যার অস্তিত্বকে আল্লাহ্ তা’লা উপকারী মনে করেন তাকে অবকাশ দেন। আমাদের যে সকল বিরোধী জীবিত এবং বিরোধিতা করে তাদের ��স্তিত্বের উপকারিতা হলো এর পরিপ্রেক্ষিতে খোদা তা’লা পবিত্র কুর’আনের তত্ত্বজ্ঞান ও নিগুঢ় রহস্য প্রকাশ করেন।’ (অর্থাৎ, যখনই বিরোধিতা বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ্ তা’লা কুর’আন শরীফের নিগুঢ় তত্ত্ব ও রহস্য উম্মোচন করেন।) ‘যেমন মেহের আলী শাহ্ যদি এত হৈ-চৈ না করতো তাহলে নুযূলল্ মসীহ্ কীভাবে লিখা যেতো?’ (হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) রচিত নযুলুল মসীহ্ গ্রন্থ)

এরপর (আ.) বলেন, ‘একইভাবে অন্য যত ধর্ম রয়েছে সেগুলোর অস্তিত্ত্বেরও একই উদ্দেশ্য অর্থাৎ যেন ইসলামী নীতির সৌন্দর্য ও গুণাবলী প্রকাশ পায়।’

(মলফুযাত – ২য় খন্ড - পৃ: ২৩২-২৩৩)

পৃথিবীতে অন্য যেসব ধর্ম আছে সেগুলো থাকলেই ধর্মের মাঝে প্রকৃত তুলনা হবে আর যদি মনোযোগ সহকারে দেখা ও যাচাই করা হয় তাহলে ইসলামের আসল সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হবে।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তাঁর ‘আন্ না’ফে’ বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণমন্ডিত হওয়ার তৌফিক দিন এবং ’না’ফে’ হওয়ার সৌভাগ্য দিন আর হযরত মসীহ্ মওউদ এর হাতে যে বিপ্লব অবধারিত আমাদেরও তিনি যেন এতে অংশীদার করেন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে