In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘আল্‌-নাফী’ (দাতা) - প্রথম অংশ - (লাভবান হবার প্রকৃত অর্থ)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৪শে এপ্রিল, ২০০৯ইং

যতক্ষণ নিজের প্রিয়তম বস্তু খোদার পথে খরচ না করা হবে আর খোদার সৃষ্টির সেবা না করা হবে খোদাতালার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রায়ই একটি শব্দ শুনি এবং বলেও থাকি। সেই শব্দটি হচ্ছে ‘নাফা’ বা লাভ। এ শব্দের উপর-ই ব্যবসায়ী লোকদের ব্যবসার ভিত্তি। হোক সে কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা কোনো কোটিপতি, যার ব্যবসা সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত। এ সব লোক সর্বদা এই চিন্তায় বিভোর থাকে যে, কীভাবে বেশি বেশি লাভ করা যাবে। এ জন্য তারা বৈধ পন্থাও অবলম্বন করে, তবে বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসদুপায়ই অবলম্বন করা হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে একজন সাধারণ মানুষ, ব্যবসার সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু তারও অহর্নিশি চিন্তা নিজ স্বার্থ নিয়ে, যে কীভাবে কোনো জিনিস হতে বেশি বেশি লাভবান হওয়া যায়। এটাই হচ্ছে একজন সাধারণ মানুষের লাভবান হওয়া।

এ তো গেল পার্থিব ক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহার, কিন্তু ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক জগতেও এর অনেক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এ সম্পর্কে আমি কুর’আন করীমের আয়াত ও হাদীসের আলোকে কিছুটা আলোচনা করবো।

আরবী অভিধানে এ শব্দটির ব্যবহার রয়েছে, এ জন্য সর্বপ্রথম আমি এর আভিধানিক অর্থ বর্ণনা করছি। নাফা (লাভ) অর্থ হচ্ছে,

কোনো জিনিসের মাধ্যমে মানুষের উপকার করা, কোনো জিনিস মানুষের হস্তগত হওয়া, কোনো জিনিস ব্যবহারযোগ্য ও লাভজনক হওয়া।

লেইন রচিত অভিধানেই এ অর্থগুলো লেখা রয়েছে। লেইনেই লেখা রয়েছে,

‘নাফ্‌ফাআ’ অর্থাৎ ফা-এর উপর শাদ দিয়ে যদি লেখা হয়, তাহলে এর অর্থ হলো অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য কল্যাণের কারণ হওয়া।

কোনো কোনো হাদীস অনুযায়ী এটাই একজন মুমিনের পরিচয় যে, সে অন্যের কল্যাণের কারণ হয়ে থাকে।

মুফরাদাত-এ লিখা রয়েছে,

‘আন্নাফয়ু’ প্রত্যেক সেই বস্তু, লাভবান হওয়ার জন্য যার সাহায্য নেয়া হয় বা যাকে ওসীলা বা মাধ্যম হিসেবে অবলম্বন করা হয়। সুতরাং লাভের নামই নাফা।

এরপর লেইনেই অর্থ লেখা রয়েছে,

কোনো ব্যক্তির লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম।

‘লিসানুল আরব’ আর একটি অভিধান যাতে লিখা হয়েছে,

‘আন্ নাফে’ আল্লাহ্‌ তা‘লার পবিত্র নামসমুহের একটি; যার অর্থ, সেই সত্তা যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যাকে খুশি এবং যতোটুকু ইচ্ছা উপকার করেন। কেননা তিনিই সমস্ত লাভ-লোকসান ও কল্যাণ-অকল্যাণের স্রষ্টা।

আভিধানিক আলোচনার পর এখন একজন মুমিনের ক্ষেত্রে এ শব্দটির কেমন প্রতিফলন হওয়া উচিত তা আমি হাদীসের আলোকে বর্ণনা করবো।

একজন মুমিন, একজন বস্তুবাদী মানুষের ন্যায় শুধু নিজের স্বার্থের কথাই ভাবে না, বরং অন্যদের মঙ্গলের কথাও ভাবে। সত্যিকার অর্থে তার চিন্তা-ভাবনা এমনই হওয়া উচিত। কুর’আন করীমে আমাদের এ শিক্ষাই দেয়া হয়েছে এবং এ সম্পর্কিত আঁ হযরত (স.)-এর যে-সব দিকনির্দেশনা আমরা হাদীসে দেখি, তাতেও এ কথাই বলা হয়েছে। এই হিত সাধনেরও বিভিন্ন পন্থা রয়েছে, যা আঁ হযরত (স.) আমাদের বলেছেন।

এখন আমি এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উপস্থাপন করছি, যা থেকে অন্যের হিত সাধন সম্পর্কে মহানবী (স.) কী বলেছেন তা স্পষ্ট হয়। সাঈদ বিন আবি ওয়ারদা তাঁর পিতা হতে, তাঁর পিতা তাঁর দাদার [অর্থাৎ সাঈদ বিন আবি ওয়ারদার দাদা হযরত আবু মূসা আশারি (রা.)] পক্ষ হতে বর্ণনা করেন,

তিনি নবী করীম (স.) হতে বর্ণনা করেন, প্রত্যেক মুসলমানের উপর সদকা করা আবশ্যক। লোকেরা বলল, হে আল্লাহ্‌র নবী! যে ব্যক্তি এর ক্ষমতা রাখে না তার কী হবে? তিনি (স.) বললেন, তার উচিত হবে কায়িক শ্রম করে নিজেও উপকৃত হওয়া এবং সদকা দেয়া। তাঁরা বলল, যদি এতোটুকুও সম্ভব না হয় তা হলে? তিনি (স.) বললেন, সে যেন অভাবী ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে। তারা বলল, যদি এটিও সম্ভব না হয় তা হলে? তিনি (স.) বললেন, তার উচিত নেক কর্ম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত থাকা, এটিই তার পক্ষে সদকা।

(সহীহ্ বুখারী - কিতাবুল আদাব, অধ্যায়: কুল মারুফ সাদ্‌কা)

একই ভাবে আরেকটি হাদীস রয়েছে, যা হযরত আবু হুরায়ারা (রা.) বর্ণনা করেন,

রাসুলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন, এক ব্যক্তি রাস্তায় একটি গাছের ডাল দেখে বলল, আল্লাহ্‌র কসম আমি এটিকে এখান থেকে অবশ্যই অপসারণ করবো, যেন এটি মুসলমানদের কষ্টের কারণ না হয়; এ কাজের জন্য তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হলো।

(সহীহ্ মুসলিম - কিতাবুল বার্‌রো সালা, অধ্যায়: ফয্‌ল আযালা আল্ আজি আন্ আল্-তারিক, হাদীস নাম্বার: ৬৫৬৫)

আরেকটি রেওয়ায়েতে এসেছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন,

রাসুলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন, সেই ব্যক্তি, যে এমন জ্ঞান গোপন করে যার মাধ্যমে মানুষের উপকার হতে পারে এবং যা ধর্মীয় বিষয়ে কল্যাণকর হতে পারে, তবে আল্লাহ্ তা’লা কিয়ামত দিবসে এমন মানুষকে আগুনের লাগাম পরাবেন।

(সুনান ইব্‌নে মাজা, আধ্যায়: মিন সা’ল আনিল ইল্‌ম ফিক্‌মাহ, হাদীস নাম্বার: ২৬৫)

কাজেই একজন মুমিনের জন্য নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করা ও আর্থিক স্বার্থ সিদ্ধিতেই লাভ নিহিত নয়, বরং খোদার সন্তুষ্টি যদি অর্জন হয় সেটিই প্র��ৃত মুনাফা বা লাভ যা চিরস্থায়ী এবং যার হিসাব পরকালে হবে। এ সব হাদীসে আঁ হযরত (স.) এই মুনাফা অর্জন বা লাভের জন্য সর্ব প্রথম যে বিষয়টির উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে সদকা, যা অভাবী, গরিব, দরিদ্র ও অনাথদের ক্ষুধা ও নগ্নতা দূর করার জন্য করা হয়।

এক হাদীসে আছে, হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন,

তিনি একবার একটি ছাগল জবাই করলেন এবং এর মাংস গরিব দুঃখীদের ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বণ্টন করেন, আর ঘরের জন্যও কিছুটা রাখলেন, তখন মহানবী (স.) জিজ্ঞাসা করলেন, ছাগল যে জবাই করেছিলে তার কী পরিমাণ মাংস অবশিষ্ট আছে? হযরত আয়শা (রা.) বললেন, আমি তো সমস্ত মাংস-ই বণ্টন করে দিয়েছি, শুধু এক দস্তি [ছাগলের সামনের পা] অবশিষ্ট আছে। তখন আঁ হযরত (স.) বললেন, এই এক দস্তি ব্যতীত বাকি সবটা মাংসই সঞ্চয় হয়েছে, কেননা যা কিছু লোকদের কল্যাণের জন্য খরচ করেছো, তারই মুনাফা আর যা মুনাফা তা-ই সঞ্চয়।

(তিরমিযি, আব্বাব উল সাফাহ আল কিয়ামাহ)

সুতরাং এটা হচ্ছে কামেল মানবের আদর্শ। তাঁর পার্থিব জিনিসের প্রতি বিন্দুমাত্রও আকর্ষণ ছিল না। প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টিই ছিল তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য। সব মানুষের পক্ষে তো এ মার্গে পৌঁছা সম্ভব নয়। কিন্তু এই আদর্শ স্থাপন করে তিনি (স.) আমাদেরকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, তোমাদেরও সর্বদা গরিব-দুঃখীদের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। তোমাদের দৃষ্টিতে সর্বদা এ বিষয়টি থাকা উচিত যে, যেহেতু প্রকৃত মুনাফা তা-ই যা খোদা তা’লার পক্ষ থেকে লাভ হয়ে থাকে। আর এ বিষয়টি এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, যখন সাহাবাগণ বললেন, যদি সদকা দেয়ার সামর্থ্য না থাকে তবে কী করা যায়? তিনি (স.) বললেন, তোমরা নিজেরা পরিশ্রম করে রোজগার কর, যার ফলে তোমরা নিজেরাও লাভবান হবে আর জাতিও লাভবান হবে। জাতির জন্য বোঝা হয়ো না, তোমরা যদি রোজগার কর, তাহলে প্রথমত, তুমি জাতির জন্য বোঝা হবে না। দ্বিতীয়ত, তুমি গ্রহীতা নয় বরং দাতা হবে, যারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ করে থাকে।

এখানে, পশ্চিমা বিশ্বে যারা সরকার থেকে ভাতা নিয়ে থাকে তাদেরও এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত, যতটুকু সম্ভব কাজ করা উচিত, যে ধরনের কাজই হোক না কেন। অনেক সময় পড়াশোনার সাথে সঙ্গতি রেখে চাকরি বা কাজ পাওয়া যায় না, এরপরও যে কাজই পাওয়া যায় তা করে যতটা সম্ভব উপার্জন করা উচিত এবং সরকারের ব্যয় হ্রাস করা উচিত।

একজন আহ্‌মদীর জন্য কোনোক্রমেই সঙ্গত নয় যে, সে কোনো ভুয়া তথ্য দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ করবে। এমন টাকা হস্তগত করা কোনোভাবে লাভজনক নয় বরং প্রকাশ্য ক্ষতিকর কাজ।

একইভাবে পাকিস্তান, ভারত এবং অন্যান্য দরিদ্র দেশেও একজন আহ্‌মদীকে সাধ্যমত চেষ্টা করা উচিত, যেন সে গ্রহীতা নয় বরং দাতার ভূমিকা রাখে। এরপর যখন সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন যে, যদি আয় রোজগারের পরিস্থিতিই না থাকে আর কাজই যদি পাওয়া না যায়, আর পেলেও, আয় এত সামান্য হয় যে তাতে মানুষের নিজেরই বড় কষ্টে চলে, সদকা দেয়ার তো প্রশ্নই উঠে না, এমতাবস্থায় কী করা যেতে পারে? এ কথা শুনে আঁ হযরত (স.) বললেন, অন্যকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করা যায়, সে মাধ্যমগুলো অবলম্বন কর। কোনো অভাবী ও দরিদ্র ব্যক্তিকে যেভাবে পার সাহায্য কর, যে-কোনো প্রকারের সেবা কর।

এমনই সাহায্যের একটি মহান দৃষ্টান্ত মহানবী (স.) স্থাপন করে গেছেন।

এক বৃদ্ধা, যে কিনা শহরে নতুন এসেছিল, যাকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপানো হয়েছিল; তিনি বৃদ্ধার মালামালের পুটলি নিজ মাথায় উঠিয়ে তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেন। সেই বৃদ্ধা রসূলুল্লাহ (স.)-কে চিনতেন না। অজান্তে তাঁর (স.) নিকট তাঁরই সম্পর্কে অনেক কটুক্তি করলেন। তিনি (স.) শুধু শুনে গেলেন, কিন্তু কিছুই প্রকাশ করেন নি। গন্তব্যে পৌঁছে যখন নবী করীম (স.) বললেন, আমি-ই সেই ব্যক্তি, যাকে এড়িয়ে চলার পরামর্শ আপনাকে দেয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল যে, ঐ যাদুকরের কাছ থেকে দূরে থেকো। এ কথা শুনে সেই বৃদ্ধা নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন, তাহলে তো আমি আপনার যাদুর শিকারে পরিণত হলাম।

সুতরাং যেভাবে সম্ভব, কারো কষ্ট দূর করে তার উপকার সাধনের চেষ্টা করাও সদকার মতোই পুণ্যের কাজ। যখন সাহাবাগণ বললেন, যদি এমনটিও সম্ভব না হয়, যদি কেউ সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়? এ কথা শুনে তিনি (স.) বললেন, অসংখ্য নেক কর্ম রয়েছে, আল্লাহ্ তা’লা যা আমাদেরকে করার আদেশ দিয়েছেন, সেগুলো কর, সেগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত হও। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। এরপর যেসব মন্দ কাজ রয়েছে তা এড়িয়ে চল। সৎকর্ম করা আর মন্দ কাজ এড়িয়ে চলা এমন কাজ যা চরম হতদরিদ্র লোকের জন্যও করা সম্ভব। এর জন্য তো কোনো প্রকার খরচের প্রয়োজন নেই, আর শারীরিক শক্তিরও দরকার নেই।

এখন দেখুন, আমাদের প্রিয় খোদা আমাদের জন্য কতো তুচ্ছ নেকীরও প্রতিদান নির্ধারণ করেছেন এবং আঁ হযরত (স.)-এর মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে এ সম্পর্কে অবগতও করেছেন। এ সম্পর্কেও এক হাদীসে আমরা শুনেছি যে,

মুমিনদের পথের কষ্ট দূর করার মানসে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছের ডাল-পালা অপসারণের কারণে আল্লাহ্ তা’লা সেই ব্যক্তিকে জান্নাত দান করেছেন।

(সুনান ইব্‌নে মাজা - কিতাব উল আদাব, অধ্যায়: আমাতাল আযি মিন আল্ তারীক)

সুতরাং এটা কতো বড় লাভজনক ব্যবসা! আল্লাহ্ তা’লা পুণ্যের সীমাহীন প্রতিদান দিয়ে থাকেন। মানুষ ভাবতেও পারে না আল্লাহ্ তা’লা তার উপর কতোটা অনুগ্রহ করতে পারেন।

হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) বলেছেন,

মানুষের জন্য দু’টি বিষয় আবশ্যক আর তা হল, সে যেন মন্দ কাজ এড়িয়ে চলে এবং পুণ্য কর্মের দিকে ধাবিত হয়। নেকীর দু’টি দিক রয়েছে: প্রথমত, মন্দ কাজ পরিত্যাগ, দ্বিতীয়ত, কল্যাণ বণ্টন করা।

এক, মন্দ বিষয় ত্যাগ করা এবং দ্বিতীয়টি অন্যের উপকার করা।

শুধু মন্দ কাজ পরিত্যাগের মাধ্যমে মানুষ পূর্ণতা পেতে পারে না, যতক্ষণ না এর সাথে কল্যাণ বণ্টনের গুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পৃক্ত না হয়, অর্থাৎ অন্যের হিতসাধন। এ থেকে বুঝা যায়, সে নিজের মাঝে কতোটা পরিবর্তন সাধন করেছে। এই মার্গ তখন অর্জিত হয়, যখন আল্লাহ্ তা’লার সিফতের উপর ঈমান থাকবে এবং এ বিষয়ে তার জ্ঞান থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এমনটি না হবে, মানুষ মন্দ কাজ হতেও বাঁচতে পারবে না।

তিনি (আ.) বলেছেন,

অন্যের উপকার করা তো একটি বড় ব্যাপার, রাজাদের প্রতাপ এবং রাষ্ট্রীয় দণ্ডবিধিকেও মানুষ কিছুটা ভয় করে, এমন অনেক লোক আছে, যারা আইন ভঙ্গ করে না, তাহলে (আহকামুল হাকিমীন) সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারকের আইন ভঙ্গের ব্যাপারে কেন এতোটা ধৃষ্টতা সৃষ্টি হয়?

অর্থাৎ, ঐশী গুণাবলীর যদি জ্ঞান থাকে, তবে তাঁর নির্দেশাবলীর উপর অনুশীলন হবে। কেউ কেউ এতোটা দুঃসাহসী হয়ে যায় যে, অন্যের উপকার সাধন করা তো দূরের কথা, আল্লাহ্‌ তা’লার যে শিক্ষা রয়েছে, তাঁর যেসব আদেশ ও নিষেধ রয়েছে, সেগুলোরও তোয়াক্কা করে না, বরং আল্লাহ্ তা’লা যেসব কাজ করতে বারণ করেছেন, সেগুলো সে ধৃষ্টতার সাথে করে, অথচ সে পার্থিব প্রশাসনকে ভয় পায়!

এরপর বলেছেন,

এমন অনেক লোক রয়েছে যারা আইন অমান্য করে না, তবে কেন সর্বাধিপতির আইন অমান্যের ক্ষেত্রে এই দুঃসাহসিকতার সৃষ্টি হয়। অতএব তাঁর উপর ঈমানহীনতা ছাড়া এর আর কোনো কারণ আছে কি? এটাই একমাত্র কারণ।

(মালফুযাত, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৪৬৬, নতুন সংস্করন)

এরপর নিজ জ্ঞানের মাধ্যমে অন্যের উপকার সাধন করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। আঁ হযরত (স.) বলেছেন, যদি জ্ঞান থাকে (হোক তা পার্থিব জ্ঞান বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান) আর এর মাধ্যমে অন্যের উপকার কর, তবে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের এ যাত্রায় এক লাভজনক ও কল্যাণময় ব্যবসা করছো বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ্ তা’ল��� প্রদত্ত এ জ্ঞান, যদি এই ভয়ে গোপন রাখ যে, আমি যদি এ কথা আরেক জনকে বলে দেই, তবে তার জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে! আঁ হযরত (স.) এমন লোককে সাংঘাতিক ভাবে সতর্ক করেছেন এবং নিজ (স.) উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন যে, এমন কাজ করা হতে সর্বদা বিরত থেকো বরং এ অবস্থা হতে বাঁচার জন্য আঁ হযরত (স.) কতক দোয়াও শিখিয়েছেন। তিনি তো সেই কামেল মানব যার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস অন্যের কল্যাণার্থে নিবেদিত ছিল। তিনি (স.) যখন সাহাবাগণের সম্মুখে এই দোয়াগুলো করতেন, তখন আসলে তাঁদেরকে শেখানোর জন্য করতেন যে, সবর্দা এই দোয়াগুলো কর এবং উম্মতের মাঝে এর প্রচলন কর আর এমনটি করে যাও। প্রকৃত মুনাফা বা লাভ তখন অর্জিত হয়, যখন আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ হয়। এখন আমি এ দোয়াগুলোর মধ্য থেকে দু’টি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন বা বলতেন,

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি সেই হৃদয় হতে যা (তোমাকে) ভয় পায় না, সেই দোয়া হতে যা (তোমার সন্নিধানে) গৃহীত হয় না, সেই আত্মা হতে যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং সেই জ্ঞান হতে যা উপকারে আসে না। আমি এই চারটি বিষয় হতেই তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি।

(সুনান আল্-তিরমিযি, কিতাবুল দাওয়াত, অধ্যায়: ৬৮, হাদীস নাম্বার: ৩৪৮২)

এরপর একটি হাদীসে এসেছে, হযরত উম্মে সালমা বর্ণনা করেন,

নবী করীম (স.) ফজরের নামাযের সালাম ফিরানোর পর এ দোয়া করতেন,

আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকা ইলমান নাফেআন ওয়া রিয্‌কান তাইয়্যেবান ওয়া আমালান মুতাকাব্বালান।

অর্থাৎ, হে আল্লাহ্‌! আমি তোমার নিকট এমন জ্ঞান চাই, যা কল্যাণকর, এমন রিযক যা পবিত্র এবং এমন আমল যা (তোমার দরবারে) গৃহীত হওয়ার যোগ্য।

(সুনান ইব্‌নে মাজা - কিতাবুস সালাত ও সুন্না, অধ্যায়: মা ইয়াকাল বাদাত তাস্‌লিম, হাদীস নাম্বার: ৯২৫)

কাজেই, নিজেকে কল্যাণকর সত্তায় পরিণত করতে হলে নেক কর্মের পাশাপাশি আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির সাহায্যেরও প্রয়োজন। একমাত্র আল্লাহ্ তা’লার সত্তাই মানুষকে শয়তানের বিভ্রান্তি হতে রক্ষা করতে পারে। আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য তখনই পাওয়া যায়, যখন আল্লাহ্ তা’লার প্রিয়তম বান্দাগণের বরাতে বা উছিলায় তাঁর নিকট দোয়া চাওয়া হয়। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা আঁ হযরত (স.)-এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করবো। আর এটি হলে, তখনই আমরা আমাদের কর্মকে লাভজনক বলতে পারবো।

একটি দোয়া যা আঁ হযরত (স.) আমাদেরকে শিখিয়েছেন, এটি হযরত আব্দুল্লহ বিন কাতমী আনসারী রেওয়ায়েত করেন:

রাসূলুল্লাহ (স.) নিজ দোয়ায় এটিও বলতেন যে,

হে আমার আল্লাহ্! তুমি আমাকে তোমার ভালবাসা দান কর এবং সেই ব্যক্তির ভালবাসা দান কর, যার ভালবাসা তোমার নিকট আমার কাজে লাগবে। হে আমার আল্লাহ্! আমার প্রিয় জিনিসগুলোর মধ্য হতে যা তুমি আমায় দান করেছো তার মাঝে যা তোমার পছন্দনীয় তাকে আমার শক্তির কারণ করো। হে আমার আল্লাহ্‌! আমার পছন্দনীয় বস্তু যা তুমি আমা হতে দূরে রেখেছো সেগুলো হতে তুমি আমায় অব্যাহতি দাও। সে সকল বস্তুকে আমার দৃষ্টিতে পছন্দনীয় করে তুলো যা তোমার পছন্দ।

(সুনান আল্ তিরমিযি – আবওয়াবুদ দায়ওয়াত, অধ্যায়: ৭৩/৭৪, হাদীস নাম্বার: ৩৪৯১)

পৃথিবীতে কেউ আল্লাহ্ তা’লার কাছে মহানবী (স.) থেকে বেশি প্রিয় নয়। এ জন্য যেভাবে আমি বলেছি, তাঁর (স.) বরাতে সর্বদা দোয়া করা উচিত। যিনি আল্লাহ্ তা’লার প্রিয় পাত্র, তিনি যেন আমাদেরও প্রিয় সত্তায় পরিণত হন, এর মাধ্যমে আমরাও যেন সেই কল্যাণের অংশীদার হই, যা প্রতিষ্ঠা ও বিতরণের জন্য তিনি (স.) এ ধরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন।

মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে কুর’আনের আয়াত: لَنْ تَنَالُوْا الْبِرَّ حَتّٰى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ (সূরা আল্ ইমরান: ৯৩)-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) বলেন,

পৃথিবীতে মানুষ সম্পদকে সব চেয়ে বেশি ভালবাসে। এ অর্থেই স্বপ্নের তাবীরের বইয়ে লিখা রয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে, সে অন্য কাউকে নিজের কলিজা বের করে দিচ্ছে, তবে এর অর্থ সম্পদ। এ কারণেই, প্রকৃত তাকওয়া ও ঈমান লাভ করা সম্পর্কে বলা হয়েছে لَنْ تَنَالُوْا الْبِرَّ حَتّٰى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ (সূরা আল্ ইমরান: ৯৩) ততোক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রিয়তম জিনিস খরচ করবে। কেননা, আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও আত্মিক সফরের একটি বড় অংশ অর্থ খরচের প্রয়োজনীয়তার কথাই বলে।

‘আব্ নায়ে জিন্স’ এবং মানুষ ও আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি এমনই একটি জিনিস, (অর্থাৎ, আপন জাতি ও নিজ দেশের এবং আল্লাহ্ তা’লার সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি এমনই একটি জিনিস।), যা ঈমানের অন্য একটি অংশ, যা ব্যতীত ঈমানের পূর্ণতা ও দৃঢ়তা অর্জন সম্ভব না। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ত্যাগ স্বীকার না করবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সে কীভাবে অন্যের উপকার সাধন করতে পারে? অন্যের কল্যাণ সাধন ও সহানুভূতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ আয়াত: لَنْ تَنَالُوْا الْبِرَّ حَتّٰى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ (সূরা আল্ ইমরান: ৯৩) তে এই ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন,

সুতরাং আল্লাহ্ তা’লার পথে সম্পদ খরচ করাও মানুষের পুণ্য ও তাকওয়ার মানদণ্ড।

(মালফুযাত, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৬৭-৩৬৮, নতুন সংস্করন)

যেভাবে হাদীসেও অন্যের উপকার সাধনের জন্য সদকা করার নির্দেশ রয়েছে, এর উপর তখনই প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব যদি মানুষের মাঝে কুরবানি ও আত্মত্যাগের প্রেরণা থাকে আর এটা তখনই বাস্তবিক অর্থে সম্ভব হবে যদি আল্লাহ্‌ তা’লা এবং তাঁর রাসূল (স.)-এর জন্য হৃদয়ে ভালবাসা থাকে।

আমি যে দোয়াটি পড়েছি তাতে এ ভালবাসা লাভের জন্যই আঁ হযরত (স.) দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন যে, আমার ভালবাসা সন্ধান কর। নাফা (লাভ) শব্দটির আভিধানিক অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে আমি বলেছিলাম যে, ‘আন্ নাফে’ আল্লাহ্ তা’লার একটি নাম। তিনি-ই সেই সত্তা যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য হতে যাকে যতোটুকু চান কল্যাণমণ্ডিত করে থাকেন। তিনি-ই সেই সত্তা যিনি লাভ ও কল্যাণের সৃষ্টা। সুতরাং, মানুষ ততোক্ষণ পর্যন্তই কল্যাণমণ্ডিত ও কল্যাণকর হতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’লা চাইবেন।

এ জন্যই আঁ হযরত (স.) যখন তাঁর উম্মতকে তাগিদ করেছেন যে, তোমরা কল্যাণকর সত্তায় পরিণত হও, তখন একই সাথে তিনি নিজ কর্ম ও আমলের এবং উপদেশের মাধ্যমে এটা বলেছেন যে, আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমেই হিতসাধনকারী সত্তায় পরিণত হওয়ার চেষ্টা কর। একমাত্র আল্লাহ্ তা’লার কাছেই সাহায্য ভিক্ষা চেয়ে হিতসাধনকারী সত্তায় পরিণত হওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, প্রকৃত কল্যাণকর সত্তা খোদা-ই যার রং তার বান্দারা নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী ধারণের চেষ্টা করে থাকে। আল্লাহ্ তা’লাও পবিত্র কুর’আন করীমে বর্ণনা করেছেন আর স্পষ্ট করেছেন যে, প্রকৃত মুমিন শুধুমাত্র আমার সত্তা হতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারে। তাই আমার সম্মুখেই বিনত হও, সর্বদা আমাকে স্মরণ রাখ এবং আমাকে ডাক।

কুর’আন করীমের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। এক স্থানে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন,

قَالَ اَفَتَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَا لَا يَنْفَعُكُمْ شَيْـًٔـا وَّلَا يَضُرُّكُمْؕ‏

তিনি বললেন, তোমরা কি আল্লাহ্ তা’লার পরিবর্তে তার ইবাদত কর, যে তোমাদের সামান্য পরিমাণ উপকারও করতে পারে না আর কো��ো অনিষ্টও করতে পারে না? সুতরাং, পৃথিবীতেও এবং আখেরাতেও কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লার সত্তা-ই কল্যাণকর সত্তা।

(সূরা আল্ আম্বিয়া: ৬৭)

কোনো কোনো প্রকারের শির্‌ক তো বাহ্যিক হয়ে থাকে, যেমন মানুষ প্রতিমা পূজার শিরকে লিপ্ত যা সেই যুগে মুশরেকরা করতো। বর্তমানেও এমন লোক রয়েছে যারা মূর্তি পূজা করে, যা এদের নিজেদের হাতে তৈরি। এসব মূর্তি কোনো উপকারও করতে পারে না, কোনো অপকারও করতে পারে না। এই প্রকাশ্য পৌত্তলিকতা সম্পর্কে সকলেই অবগত।

কিছু গুপ্ত শির্‌কও হয়ে থাকে। যেমন কোনো সমস্যার সময় পার্থিব উপকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা, পার্থিব উপকরণকে প্রয়োজনের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া ও সন্ধান করা, বিনা প্রয়োজনে কর্মকর্তার চাটুকারিতা করা; অথচ যদি আল্লাহ্ তা’লার ইচ্ছা না থাকে তবে এ পার্থিব উপকরণ কোন কাজেই আসতে পারবে না।

কোনো এক ব্যক্তি একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে,

সে চাকরি পাচ্ছিল না। অবশেষে একদিন তার নিকট-আত্মীয় জানতে পারলেন যে সে চাকরির সন্ধানে রয়েছে। পড়ালেখা শেষ করেছে আর উচ্চ শিক্ষিতও। সে বললো, আমার পরিচিত অনেক বড় এক কর্মকর্তা বন্ধু আছেন। তুমি আগামীকাল সকালে এসো, আমরা তার বাসায় যাবো। যাহোক, তার সাথে দেখা করতে গেলো। বন্ধুটি বললো, আগামীকাল সকালে আমার অফিসে এসো আমি তোমার কাজ করে দিব। একটি শূন্য পদে তোমার চাকরি হয়ে যাবে। সে বললো, আমি সকালে সাইকেল যোগে অফিসে গেলাম। অফিসের ফটক বন্ধ ছিল। নিরাপত্তা প্রহরী বললো, কী ব্যাপার? আমি বললাম, অমুক সাহেব আমাকে ডেকেছেন, তাই আমি তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছি। সে নিরাপত্তা প্রহরীকে বেশ প্রতাপ ও অহংকারের সাথে বললো, আমাকে যেতে দাও, ফটক খুলে দাও। নিরাপত্তা প্রহরী বললো যে, সেই কর্মকর্তা সকালে অফিসে আসার আগে হৃদরোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

সুতরাং, এভাবে যারা খোদা ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করে আল্লাহ্‌ তা’লা তাদের সকল আশা ভঙ্গ করেন। সে বলে যে, সে অত্যন্ত নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরে। অতএব, যখনই মানুষকে খোদার সমতূল্য করা হয় তখন এ অবস্থাই হয়ে থাকে। আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন, যদি সত্যিকার অর্থে আমার দিকে প্রত্যাবর্তন কর তবে আমিই সেই সত্তা যে তোমাদের কাজে লাগে। আমিই তোমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ করবো, আমিই তোমাদের দাতা। তোমাদের সকল কিছু প্রদানকারী।

একস্থানে আরো বিস্তারিত ভাবে তিনি বলেন যে, এ পৃথিবী তো ক্ষণস্থায়ী। তোমাদেরকে সব সময় নিজেদের পরজগত নিয়ে ভাবা উচিত। পরজগতের বিষয়ে চিন্তা করা উচিত। কেননা, সকল প্রকার লাভ ও ক্ষতি পরজগতে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। যেমন কিনা আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন,

يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَّلَا بَنُوْنَۙ‏
اِلَّا مَنْ اَتَى اللّٰهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍؕ‏

অর্থাৎ, এ দিন না সম্পদ কাজে আসবে আর না সন্তান। কেবল সেই ব্যক্তিই লাভজনক অবস্থায় থাকবে যিনি আল্লাহ্‌র সমীপে ক্বালবিন সলীম বা সুস্থ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবেন।

(আল্-শুআরা: ৮৯-৯০)

অতএব, আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন, যদি আল্লাহ্‌ তা’লার ইবাদত না কর এবং যে সমস্ত পুণ্য করতে তিনি বলেছেন সেগুলোর উপর যদি আমল না করা হয়, তবে অর্থ ও সন্তান নিয়ে আনন্দিত হবে না। এগুলো কোনো কাজে আসবে না। খোদা তা’লা একথা জিজ্ঞেস করবেন না যে, কী পরিমাণ অর্থ রেখে এসেছো; তিনি এটিও জিজ্ঞেস করবেন না যে, কয়জন সন্তান রেখে এসেছো। স্বীয় পুণ্যই শুধু কাজে আসবে।

আর যেমন কিনা হাদীসেও উল্লিখিত হয়েছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, গাছের একটি ডাল সরানোর কারণে আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ক্ষমা করলেন এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট করলেন। হ্যাঁ, যদি সন্তান কোনো উপকারে আসতে পারে, কেবল সেই সন্তান কাজে আসবে, যে পুণ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যে কিনা ঐ সমস্ত সৎকর্ম প্রতিষ্ঠিত রাখে বা জীবিত রাখে যা তার মাতাপিতা করেছেন। তবে ঐ সন্তানদের পুণ্য পরকালে প্রতিনিয়ত পিতামাতার কাজে লাগে এবং উপকারে আসে।

অতএব, আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন, একটি অনুগত হৃদয় নিয়ে যদি আল্লাহ্‌ তা’লার সমীপে উপস্থিত হও তবে সেটিই হবে তোমার সত্যিকার লাভ। ঐ হৃদয় নিয়ে আল্লাহ্‌ তা’লার সমীপে উপস্থিত হবে যা পৃথিবীতে সারা জীবন আল্লাহ্‌ তা’লার ইবাদতের প্রতি মনোযোগী ছিল, তবে সেটিই হচ্ছে মানব-জন্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য। এমন হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ্‌ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জন করবে।

যদি এমন হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হও যা মানুষের অধিকার প্রদান করে আসছে তবেই নাফে বা কল্যাণকর সত্তার সীফত বা বৈশিষ্ট্য নাফে’র কল্যাণ লাভে সক্ষম হবে। অভিধান অনুসারে সুস্থ হৃদয় হচ্ছে সেই হৃদয় যা পরিপূর্ণরূপে গয়েরুল্লাহর (আল্লাহ্‌ ব্যতীত সকল) সংশ্রবের ঊর্ধ্বে। আবার এর আরেকটি অর্থ হচ্ছে যে, ঈমানের দুর্বলতা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। আবার সব ধরনের প্রতারণা হতে পবিত্র। কারো ক্ষতি করার মানসিকতামুক্ত, চারিত্রিক যথেচ্ছচারিতা থেকে মুক্ত। এ হচ্ছে সুস্থ হৃদয়। আবার অনেকের মতে সুস্থ হৃদয় হচ্ছে এমন এক হৃদয় যা অন্যের জন্য দরদ রাখে। খোদা তা’লা বলেন যে, আমার ইবাদতকারী এবং পুণ্যকর্মশীল তারা যারা আমার সন্তুষ্টির জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ্‌ তা’লা আমাদেরকে এমন হৃদয় দান করুন যেন আমরা পুণ্যকর্ম করে আল্লাহ্‌ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনকারী হতে পারি।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর একটি উদ্ধৃতি উপস্থাপন করছি যাতে জামাতে সদস্যদের জন্য তাঁর কী ইচ্ছা ও কেমন আবেগ ছিল আর যে দোয়া তিনি করেছেন তা জানা যায়। তিনি বলেন,

যে অবস্থা আমার মনেযোগ আকর্ষণ করে এবং যা দেখে আমি দোয়ার জন্য নিজের ভিতর প্রেরণা পাই তা কেবল একটি, অর্থাৎ আমি যদি কারো সম্পর্কে জানতে পারি যে, এই ব্যক্তি ধর্মের খেদমত করে থাকে, তার সত্তা খোদা তা’লার জন্য, খোদার রসূল (সা.)-এর জন্য, খোদার কিতাবের জন্য এবং খোদার বান্দাদের জন্য কল্যাণকর। এমন ব্যক্তির ব্যথা ও কষ্ট সত্যিকার অর্থে আমার ব্যথা ও কষ্ট।

তিনি আরো বলেন,

আমাদের বন্ধুদের উচিত ধর্মসেবার বিষয়ে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হওয়া আর যেভাবে পারে ধর্মের সেবা করা।

পুনরায় বলেন,

জোর দিয়ে বলছি, খোদার দৃষ্টিতে সে ব্যক্তিরই শুধু মূল্য ও মর্যাদা রয়েছে, যে ধর্মের সেবক এবং মানুষের জন্য কল্যাণকর। নতুবা মানুষ কুকুর ভেড়ার মতো মারা গেলেও তিনি ভ্রুক্ষেপ করেন না।

(মলফুযাত, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা: ২১৫-২১৬, নতুন সংস্করন)

খোদা আমাদের সেই অবস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন যা হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুর’আনী শিক্ষা ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নত মোতাবেক নিজ জামাতে দেখতে চেয়েছেন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে