In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘লতিফ’ (পরম সদয়)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৭ই এপ্রিল, ২০০৯ইং

খোদা তা’লার ‘লতিফ’ (পরম সদয়) বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতির আলোকে তত্বপূর্ণ আলোচনা

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুর’আনের বিভিন্ন আয়াতে এমন কতগুলো বিষয় বর্ণনা করেছেন, যাতে তাঁর বান্দার উপর অনুগ্রহ ও দয়ার বিষয়টি বিভিন্নভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোকে তিনি তাঁর গুণবাচক নাম ‘লতিফ’ এর অধীনে বর্ণনা করেছেন। এখন আমি এসব আয়াত, ও এর বিষয়বস্তু হতে কিছুটা উল্লেখ করবো। কিন্তু এর পূর্বে ‘লতিফ’ শব্দের অর্থটাও পরিষ্কার করে দিচ্ছি, যা অভিধান বা কুর’আন করীমের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে তফসীরকারীরা বর্ণনা করেছেন।

‘আকরাব’ একটি অভিধান গ্রন্থ, এতে ‘লতিফ’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে, দয়া ও অনুগ্রহকারী। আল্লাহ্ তা’লার সুন্দরতম নামসমূহের একটি। এক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, নিজ বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহকারী, নিজ সৃষ্টির স্বার্থ ও মুনাফাকে দৃষ্টিতে রেখে দয়া ও অনুগ্রহবশত তাদেরকে দান করা। তাদের সাথে সদাচারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। যিনি সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম, ও একান্ত গোপনীয় বিষয়ে সবিশেষ জ্ঞাত।

‘আল্লামা কুরতুবি’ এ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলেছেন,

বান্দার প্রতি আল্লাহ্ তা’লার সদয় হওয়া, তাদেরকে সৎকর্ম করার সামর্থ দান করা এবং তাদেরকে পাপ হতে রক্ষা করা। ‘মুলাতেফত’ বা অনুগ্রহ করার বিষয়টিও এখান থেকেই উদ্ভুত।

এরপর, যুনায়েদ বোগদাদী (রহ.) লিখেছেন,

‘লতিফ’ সেই সত্তা যিনি তোমার হৃদয়কে হেদায়াতের আলোয় আলোকিত করেছেন, খাদ্য দ্বারা দেহ প্রতিপালন করেছেন, পরীক্ষার সময় তোমার উপর অভিভাবকত্বের ছায়া দান করেছেন, এবং তুমি যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পতিত হও তখন তিনি তোমার নিরাপত্তা বিধান করেন আর নিজ আশ্রয়ের জান্নাতে তোমাকে প্রবিষ্ট করেন।

‘আল্ কুরাজী’ বলেন,

‘লতিফুম বিল ইবাদ’ এর অর্থ হচ্ছে, আদেশ দান এবং হিসাব গ্রহণে বান্দার প্রতি অত্যন্ত কোমল। কেউ কেউ বলেছেন, ‘লতিফ’ তিনি যিনি-তাঁর বান্দার প্রশংসনীয় গুণাবলী প্রকাশ করেন কিন্তু দুর্বলতা ঢেকে রাখেন।

আর এ বিষয়টি-ই মহানবী (সা.)-এর এ কথায় বর্ণিত হয়েছে যে,

‘ইয়া মান আযহারাল জামিলা ওয়া সাতারাল কাবীহা’

অর্থাৎ, হে সেই খোদা! যিনি ভাল বিষয়গুলো প্রকাশ করেন এবং মন্দ বিষয়গুলো গোপন রাখেন।

‘আল লতিফ’ শব্দের আরেকটি অর্থ করা হয়েছে যে,

যিনি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কুরবানি গ্রহণ করে মহা প্রতিদান দিয়ে থাকেন।

আরেকটি অর্থ করা হয়েছে, ‘লতিফ’ তিনি, যিনি সেই ব্যক্তি যার সমস্ত কাজ বিশৃঙ্খল ও বিক্ষিপ্ত এবং অসচ্ছল এমন ব্যক্তির কাজকে সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত করেন আর তাকে সচ্ছলতা প্রদান করেন। এছাড়া এ অর্থও করা হয়, যিনি অবাধ্যকে ধৃত করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করেন না এবং যে তাঁর নিকট আশা রাখে, তিনি তাকে ব্যর্থ করেন না। কেউ কেউ ‘লতিফ’ শব্দের অর্থ করেছেন, ‘লতিফ’ তিনি, যিনি তত্ত্বজ্ঞানীদের অন্তর্জগতে আপন সত্তা প্রকাশের মাধ্যমে এক প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেন, সোজা সরল পথকে তার বিচরণস্থল বানিয়ে দেন এবং নিজ অনুগ্রহপূর্ণ ব্যবহারে প্রবল বর্ষণশীল বৃষ্টির আদলে তাকে প্রভূত নেয়ামত দান করেন।

‘খাতাবিক’ বলেন,

বান্দার সাথে উত্তম ব্যবহারকারী সেই সত্ত্বাকে ‘লতিফ’ বলা হয়, যিনি এমন সব দিক থেকে দয়া ও অনুগ্রহ করে থাকেন যা বান্দা জানে, আবার তাদের জন্য কল্যাণের উপকরণ এমন স্থান হতে সৃষ্টি করেন, যা তারা কল্পনাও করতে পারে না।

কোনো কোনো উলামার মতে ‘লতিফ’ তিনি, যিনি বিষয়াদির সূক্ষ্ণতা সম্পর্কেও সবিশেষ অবগত রয়েছেন। এর সুস্পষ্ট একটি অর্থ হচ্ছে, সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষকারী।

এই সমস্ত কথার সার কথা হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার সিফতে লতিফ যে সকল অর্থ ধারণ করে তাহলো:

আল্লাহ্ তা’লা কুর’আন করীমে ‘লতিফ’ বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত আয়াতে এ বিষয়সমুহের উল্লেখ করেছেন। কুর’আন করীমের সূরা আন্ আমের ১০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ

কোনো দৃষ্টি তাকে পেতে পারে না, তবে হ্যাঁ, তিনি নিজেই দৃষ্টিতে ধরা দেন। তিনি অতীব সূক্ষ্ণদর্শী এবং সর্বজ্ঞাত।

(সূরা আল্ আনাম: ১০৪)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

বসারাত এবং বাসীরাত তাঁর গভীরতায় পৌঁছতে পারে না।

অর্থাৎ তোমাদের দৃষ্টি এবং অন্তর্দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত্ব করতে পারে না। অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা’লার অন্বেষণের ক্ষেত্রে চেষ্টা যদি এটি হয় যে, আমরা তাকে দেখবো তাহলে জেনে রাখ যে, এটি অসম্ভব। কেননা, আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, তিনি ‘লতিফ’, তিনি এমন এক জ্যোতি যা দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব না। তবে হ্যাঁ, এটা যার উপর প্রতিফলিত হয় তাকে এমন ভাবে আলোকিত করে যে, তিনি আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য ও নিদর্শনের প্রদর্শনস্থল হয়ে যান। নবীগণ সবচেয়ে বেশি এ জ্যোতি পেয়ে থাকেন। আর আমাদের মনিব ও মওলা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ জ্যোতি সবচেয়ে বেশি লাভ করেছেন। কিন্তু যারা অন্ধ ছিল, যাদের বাহ্যিক দৃষ্টি এবং অন্তর্দৃষ্টি দুর্বল ছিল, তারা এসব বিষয় দেখতে পায়নি। তারা তাঁর কল্যাণধারা হতে বঞ্চিত হয়েছে।

যারা বুদ্ধিমান গণ্য হতো এবং যারা জাতির নেতা ছিল, আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতি তাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু দরিদ্র মানুষ, যাদের মাঝে ছিল সত্যিকার একাগ্রতা ও প্রচেষ্টা, যারা চাইতেন যে আল্লাহ্ তা’লার আলো যেন তাদের নিকট পৌঁছে, তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর মাঝে আল্লাহ্ তা’লার নূরের প্রতিফলন দেখেছেন। কাজেই আল্লাহ্ তা’লার নূর চেনার জন্য কোনো পার্থিব বুদ্ধি, শিক্ষা, সম্মান, রাজত্ব বা বিশেষ মর্যাদার প্রয়োজন নেই। বরং আল্লাহ্ তা’লা নিজ সিফতে লতিফের আওতায় প্রত্যেক হৃদয়ের উপর অত্যন্ত সূক্ষ্ণদৃষ্টি রাখেন এবং এ বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত যে, যখন তিনি দেখেন যে, আলোকসন্ধানীর হৃদয়ে এক আকাঙক্ষা রয়েছে এবং সত্যিকারের আকাঙক্ষা রয়েছে, তখন তিনি স্বয়ং এমন উপকরণ সৃষ্টি করেন যার মাধ্যমে নবীগণ যে আলো নিয়ে আগমন করেন, জাগতিক দৃষ্টিকোন থেকে সে ব্যক্তি কোনো মর্যাদার অধিকারী না হলেও তা দেখতে পায় এবং তার জন্য আধ্যাত্মিক রিযিকের ব্যবস্থা হয়ে যায়। কাজেই যদি আকাঙক্ষা সত্য হয়, তবে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিজ সিফতের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বান্দার হেদায়াতের উপকরণ সৃষ্টি করেন।

যেভাবে আমি আগেই বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নবীগণের মাধ্যমে স্বীয় জ্যোতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। যারা তাঁর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এসে থাকেন, তাঁরা আল্লাহ্ তা’লার নূর নিয়ে তৌহিদের আলোর সর্বত্র বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে থাকেন। আর মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে এ নূর সর্বাধিক প্রসারতা লাভ করেছে। কেননা পূর্ণতম মানবই আল্লাহ্ তা’লার সত্তার সর্বাধিক বুৎপত্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই পরিপূর্ণ উপলব্ধির কারণেই তিনি আল্লাহ্ তা’লার রং-এ পরিপূর্ণরূপে রঙিন হয়েছেন এবং ঐশীগুণাবলির প্রতিফলনস্থলে পরিণত হয়েছেন। যেভাবে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পদ্যে একস্থানে বলেছেন:

“নূর লায়া আসমান ছে, খুদ ভী ওহ্ এক নূর থে”

(অর্থাৎ, আলো এনেছেন আকাশ হতে যিনি নিজেও এক আলো-ই ছিলেন। - অনুবাদক)

আঁ হযরত (সা.)-এর দাসত্বের জন্য, বর্তমান যুগে আঁ হযরত (সা.)-এর প্রকৃত দাসকে সেই নূরে আলোকিত করেছেন। যেভাবে তিনি (আ.) নিজের সম্পর্কে বলেছেন,

“আজ উন নূরোকা এক জোড় হ্যা ইস আজিয ম্যা, দিলকো ইন নূরোকা হার রং দিলায়া হামনে। যাবছে ইয়েহ্ নূর মিলা নূরে পয়াম্বরছে হামেঁ, জাতছে হাক কী ওজুদ মিলায়া হামনে।”

(অর্থাৎ, বর্তমান যুগে এই অধমের মাঝে সেই আলোর জোয়ার বইছে, এই আলোর সকল রং-এ আমরা নিজ হৃদয়কে আলোকিত করেছি। নবী (সা.)-এর আলো থেকে এই আলো লাভ করার পরই আমরা খোদার সত্ত্বায় বিলিন হয়ে গেলাম। - অনুবাদক)

সুতরাং আজ আল্লাহ্ তা’লার এই উক্তি:

(সূরা আল্ আনাম: ১০৪) وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ

তাদের ক্ষেত্রে পূর্ণ হয়, যারা তাদের হৃদয়কে পবিত্র করে, প্রকৃত অর্থেই আল্লাহ্ তা’লাকে পেতে চায় এবং তারা মহানবী (সা.)-এর দাসত্বে আগমনকারী যুগের ইমামকেও গ্রহণ করে।

এরপর আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন নবরূপে তাঁর অস্তিত্বের বিকাশ ঘটিয়ে থাকেন, এবং এগুলো দেখে, বান্দা প্রকৃত তৌহিদ সনাক্ত করে থাকে। এক স্থানে মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

আঁ হযরত (সা.)-এর দাসত্বের কারণে আল্লাহ্ তা’লার সত্ত্বায় তিনি একাকার হয়ে যান আর একাকার হওয়ার কল্যাণে তিনি খোদা লাভ করার এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন।

আঁ হযরত (সা.)-এর দাসত্বের কারণে তিনি এই প্রকৃত তৌহিদের প্রকাশস্থল হয়ে গেছেন। তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেন,

আল্লাহ্ তা’লার সত্ত্বা সতত প্রচ্ছন্ন, সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য ও এবং বহু পর্দার অন্তরালে অবস্থিত। অত্যন্ত গুপ্ত, অনেক দূরে, কোনো চিন্তা-ভাবনা তাঁকে খুঁজে পেতে পারে না।

যেভাবে তিনি স্বয়ং বলেন,

(সূরা আল্ আনাম: ১০৪) وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ

অর্থাৎ, কোনো দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি তাকে পেতে পারে না, অপরদিকে তাদের সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত এবং তিনি তাদের উপর প্রবল। সুতরাং তাঁর তৌহিদ শুধুমাত্র যুক্তির মাধ্যমে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব নয়। কেননা, তৌহিদের স্বরূপ হচ্ছে, যেভাবে মানুষ জাগতিক মিথ্যা উপাস্যদের বর্জন করে, অর্থাৎ প্রতিমা, মানুষ, সূর্য-চন্দ্র ইত্যাদির ইবাদত হতে বিরত থাকে; একইভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মিথ্যা মা’বুদকে পরিহার করা উচিত। অর্থাৎ নিজস্ব দৈহিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার উপর ভরসা করা হতে তথা আত্মশ্লাঘার মতো পরীক্ষা হতে নিজেকে বাঁচানো উচিত। অতএব, এ থেকে বুঝা যায় যে, আত্মম্ভরিতা পরিহার ও রাসুলগণের আঁচল ধরা ব্যতীত পরিপূর্ণ তৌহিদ অর্জিত হতে পারে না। যে ব্যক্তি নিজ কোনো শক্তি-সামর্থকে আল্লাহ্ তা’লার সাথে শরিক করে, সে কীভাবে একেশ্বরবাদী আখ্যায়িত হতে পারে?

সুতরাং, এটা হচ্ছে আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতি লাভ ও প্রকৃত তৌহিদ প্রতিষ্ঠার জন্য একজন বান্দার প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, সর্বপ্রথম নিজের অভ্যন্তরীণ মিথ্যা মা’বুদগুলো ত্যাগ করতে হবে। যদি কারো ভেতর এ অহংকার থাকে যে, আমি ধনী, জাতির নেতা এবং মুসলমানও, তাই আমি আল্লাহ্ তা’লাকে পেয়ে গেছি, আমার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই, তবে এটা ভুল। আবার কেউ যদি এমন ধারণা পোষণ করে যে, আমি ধর্মীয় জ্ঞান রাখি, আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে উঁচু মার্গে অধিষ্ঠিত এবং আমার পিছনে এক জনগোষ্ঠী আছে, কাজেই আমি আল্লাহ্ তা’লা সম্পর্কে বুৎপত্তি রাখি, তবে এটাও ভুল। কেননা, এ সব কিছুর অন্তরালে এক গুপ্ত অহংকার রয়েছে, যার কারণে কোনো কাজই নেক নিয়্যতে করা যায় না; হোক-না তা আল্লাহ্ তা’লার নামে বিচার-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, বা ধর্মকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়ার দাবি, বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কেননা, হৃদয়ের অহংকার দুরীভূত হয়নি। তাদের নিজের মাঝে মিথ্যা উপাস্যদের আধিপত্য, যে কারণে তারা যুগ ইমামকেও অস্বীকার করে। কাজেই পথের প্রতিবন্ধক পর্দাই আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতি পৌঁছার পথে বাঁধা হয়ে আছে।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তিনি ‘লতিফ’ এবং ‘খবীর’ ও। যেখানে তিনি এমন নূর, যা পবিত্র হৃদয়ে প্রবেশ করে, সেখানে হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর তাঁর সূক্ষ্ণদৃষ্টিও রয়েছে যার কল্যাণে কার হৃদয়ে কি আছে সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। যার হৃদয় মিথ্যা মা’বুদে ভরা, যে-সব দৃষ্টি পার্থিব কামনা-বাসনার উপরই স্থির, সেখানে আল্লাহ্ তা’লার নূর পৌঁছে না। তাই যদি প্রকৃত অর্থে আল্লাহ্ তা’লার বানী: (সূরা আল্ আনাম: ১০৪) وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ অর্থাৎ তিনি স্বয়ং দৃষ্টিতে ধরা দেন হতে কল্যাণ লাভ ক���তে হয়, তবে নিজ হৃদয়কে পবিত্র করা আবশ্যক। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকেও এই তৌফিক দান করুন।

অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا وَقَالَ يَا أَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُمْ مِنَ الْبَدْوِ مِنْ بَعْدِ أَنْ نَزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِمَا يَشَاءُ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

অর্থাৎ, সে তার পিতা-মাতাকে সম্মানের সাথে আসনে বসাল (হযরত ইউসুফ (আ.)-এর উল্লেখ হচ্ছে) এবং তারা সবাই তার জন্য সেজদাবনত হল। সে বলল, হে আমার পিতা! এই হচ্ছে আমার অতীতে দেখা সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার প্রভূ একে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তিনি আমার উপর অনেক অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি আমাকে জেল থেকে বের করেছেন। শয়তান আমার এবং আমার ভাইদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করার পর, তিনি তোমাদেরকে মরু এলাকা হতে (আমার নিকট) এনেছেন। নিশ্চয়ই আমার প্রভূ যার জন্য চান অনেক দয়া ও অনুগ্রহ করে থাকেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞানী ও পরম প্রজ্ঞাময়।

(সূরা ইউসুফ: ১০১)

এটা হচ্ছে, সূরা ইউসূফের ১০১ নন্বর আয়াত। এ আয়াতে হযরত ইউসূফ (আ.) আল্লাহ্ তা’লার ‘লতিফ’ সিফতের আওতায় তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের উল্লেখ করেছেন। তাঁর পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার কারণে, বাল্যকালেই আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আজ যখন বংশের সবাই একত্রিত হয়েছে তখন তাঁর বাল্যকালের সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল, যা তখন পূর্ণ হচ্ছিল। ভাইদের অত্যাচার সত্ত্বেও, আল্লাহ্ তা’লা পরীক্ষা ও বিপদাপদের যুগে তাঁর বন্ধু ও অভিভাবক হয়েছেন, এবং সর্বদা তাঁকে রক্ষা করেছেন। আজ জাগতিক দৃষ্টিকোন থেকেও উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অল্পবিস্তর যে কুরবানি করেছেন, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সিফতে লতিফের অধীনে সেসবের অশেষ প্রতিদান দান করেছেন।

শুধু হযরত ইউসূফ (আ.)-ই তাঁর ত্যাগের ফল পাননি, বরং হযরত ইয়াকুব (আ.)-ও তাঁর কুরবানির প্রতিদান পেয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে দীর্ঘায়ু দান করেছেন এবং তাঁর সন্তানের জাগতিক সম্মানজনক মর্যাদাও তাঁকে দেখিয়েছেন। এ বিষয়টি আল্লাহ্ তা’লার এই সিফতের সেই সকল অর্থের দিকেও ইঙ্গিত করে যে, আল্লাহ্ তা’লা সব ধরনের বিপদাপদ ও পরীক্ষার সময় অভিভাবক হয়ে থাকেন। পিতা-পুত্র উভয়ের অভিভাবক ছিলেন, কষ্ট হতে পরিত্রাণ দেন, ধৈর্য্য ও মনোবল ও সৎসাহস যোগান। এরপর, আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্যপ্রাপ্ত এই দুই পিতাপুত্রের মাধ্যমে আল্লাহ্ অন্য ছেলেদেরও সংশোধনের উপকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

এখান থেকে আর একটি বিষয়ও বুঝা যায় যে, একে অপরের জন্য দোয়া করার মাধ্যমেও সংশোধনের রাস্তা খুলে। সম্পর্ক যতটা ঘনিষ্ঠ হবে বা সম্পর্কে যতটা ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ পাবে, দোয়াও ততোটা জোরদার হবে। এ কারণেই আঁ হযরত (সা.) স্বজাতির জন্য অনেক দোয়া করেছেন। যখনই তাঁর নিকট অন্য কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করা হতো যে, এরা তো খুব বিরোধিতা করে, তাই এদের জন্য বদ-দোয়া করুন। তিনি (সা.) সর্বদা দোয়া করতেন এবং তাঁর উম্মতকেও তাকিদ করেছেন যে, তোমরা হেদায়াতের জন্য দোয়া করো। কাজেই আজ উম্মতে মুহাম্মদীয়ার জন্য আমাদেরও দোয়া করা উচিত, দোয়ার প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত। আল্লাহ্ তা’লা এদের হৃদয়গুলোকেও পরিষ্কার করুন এবং যেন তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে, যাতে আল্লাহ্ তা’লার জ্যোতি তাদের চোখেও ধরা দেয়।

সূরা হাজ্জ এর ৬৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَتُصْبِحُ الْأَرْضُ مُخْضَرَّةً إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ

অর্থাৎ, তুমি কি দেখ নাই যে, আল্লাহ্ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন যার ফলে জমিন সবুজ শ্যামল হয়ে যায়। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’লা সূক্ষ্ণদর্শী এবং সর্বজ্ঞাতা।

(সূরা আল্ হাজ্জ: ৬৪)

আল্লাহ্ তা’লা এই আয়াতে এ সিফতের অধীনে এমন একটি বিষয় বর্ণনা করেছেন যা পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে বিষয়টি স্মরণ রাখার যোগ্য তা হল, জীবনের সৃষ্টি পানি হতে এবং আধ্যাত্মিক জীবন লাভের জন্য সমস্ত ক্ষমতার আধার আল্লাহ্ তা’লার একত্ববাদের প্রতি দৃষ্টি ফেরানো আবশ্যক। এখানে আকাশ হতে পানি বর্ষণের উদাহরণ দেয়ার কারণ হচ্ছে, বৃষ্টির পানি যেভাবে আকাশ হতে বর্ষিত হয় এবং জমিনকে সবুজ-শ্যামল করে তুলে, ঠিক সেভাবেই আধ্যাত্মিক পানিও যখন দুনিয়াতে বর্ষিত হয় তখন তা মানুষের জন্য আধ্যাত্মিকতার উপকরণ সৃষ্টি করে। যখন মেঘমালা হতে বৃষ্টির পানি বর্ষিত হয় তখন পাথর, শিলাভূমি ও মরুভূমি তো সেভাবে সবুজ-শ্যামল হয় না; একইভাবে যখন আধ্যাত্মিক পানি বর্ষিত হয় তা শুধু তাদেরকেই সবুজ-শ্যামল করে, সেই পবিত্র হৃদয়গুলোকেই উর্বরতা দান করে থাকে, যাদের মাঝে কিছুটা হলেও নেকীর স্পন্দন থাকে। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হলো পানি, যা জীবনের প্রতীক, যখন বর্ষিত হয়, যেখানে জমিন শস্য-শ্যামল হয়, সেখানে পশু-পাখি এমনকি সমস্ত কীট-পতঙ্গও (যেসব সৃষ্ট জীব রয়েছে তারাও) উপকৃত হয়। এগুলোর জীবনও এর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যেভাবে আমি বলেছি, মরুভূমি ও পাথুরে জমিতে সেভাবে জীবনের ছোঁয়া লাগে না, ওখানকার জন্য আল্লাহ্ তা’লা পৃথক জীবনবিধান রেখেছেন। যদিও এগুলোও এ পানি হতে কিছুটা লাভবান হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে সেই সজীবতার সৃষ্টি হয় না যেটা উর্বর জমিতে হয়ে থাকে, সেখানে যেসব জীবন্ত সৃষ্টি রয়েছে সেগুলোও ঐ পানি হতে কিছুটা হলে উপকৃত হয়।

এ ভাবে আধ্যাত্মিক পানির মাধ্যমে যেখানে নেক লোকদের হৃদয়ে নতুন কুঁড়ি গজায়, যেভাবে গাছের নতুন কুঁড়ি গজায় তা থেকে পাতা বের হয় ফুল হয়, ফল ধরে। সুতরাং, যেখানে আধ্যাত্মিক পানির কল্যাণে পুণ্যবান হৃদয় এভাবে ফুলে-ফলে ভরে যায়, সেখানে বিরোধিরা বিরোধিতাকে পুঁজি করে এই আধ্যাত্মিক পানির মাধ্যমে জাগতিক স্বার্থ সিদ্ধি করে। একভাবে সজীবতা যেভাবে মানুষকে উপকৃত করে, অন্যান্য পশু-পাখির উপকারেও আসে, আধ্যাত্মিক সজীবতাও যেখানে উর্বর জমিকে কল্যাণমণ্ডিত করে থাকে, সেখানে কিছু পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী লোকও উপকৃত হয়, কিন্তু সেই কল্যাণ পার্থিব কল্যাণ হয়ে থাকে। জরিপ চালালে আমরা দেখবো যে, যে স্থানে আমাদের জামাত উন্নতি করছে সেই সকল স্থানে আমাদের বিরোধিরা সক্রিয়। তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবার চেষ্টা করে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবের ফলে যেন তাদের জীবিকা নির্বাহের উপকরণ সৃষ্টি হয়েছে। তারা জাগতিক অর্থে লাভবান হচ্ছে। তারা সর্বত্র এই অর্থে লাভবান হচ্ছে, কেউ কেউ অনেক সময় এটি প্রকাশও করে থাকে। যা-ই হোক, আল্লাহ্ তা’লা মানুষের মাঝে যখন মৃত্যুর লক্ষণ দেখেন তখন ঐশী পানি বর্ষণ করেন। যেভাবে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এক স্থানে লিখেছেন:

আমি সেই পানি যা নির্ধারিত সময়ে আকাশ হতে বর্ষিত হয়েছে।

কাজেই আল্লাহ্ তা’লা যখন প্রত্যক্ষ করেন, (সূরা আর্ রূম: ৪২) ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ অর্থাৎ, জলে-স্থলের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা ছেয়ে গেছে, তখন তিনি নবীগণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পানি বর্ষণ করে থাকেন। আর চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে আঁ হযরত (সা.)-কে প্রেরণ করে তাঁর মাধ্যমে সেই কামেল শরিয়ত অবতীর্ণ করেছেন। যা কল্যাণকামী লোকদের হৃদয়কে সজীবতা ও পরিতৃপ্তি দিয়েছে।

এরপর মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এক হাজার বছরের তমসাচ্ছন্ন যুগের পর পৃথিবীতে যখন আরেক বার বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হল, তখন তাঁর (সা.) প্রকৃত দাসকে প্রেরণ করলেন, আর অতীতে যেভাবে (সূরা আর্ রূম: ২০) وَيُحْىِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا -এর দৃশ্য দেখিয়েছিলেন তা আবার দেখান এবং ঐ হৃদয়সমূহে নূর পৌঁছে দেন, যারা এই নূর পাওয়ার জন্য হৃদয়ে সত্যিকারের ব্যাকুলতা রাখে।

এখানে ‘লতিফ’‘খবীর’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করে এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আল্লাহ্ তা’লার সূক্ষ্ম দৃষ্টি জানে যে, কারা সত্যের সন্ধানে রয়েছেন। যাদের জন্য ঐশীবারি থেকে কল্যাণমণ্ডিত হওয়া অবধারিত। আবার আল্লাহ্ তা’লা সূরা শুরার ২০ নম্বর আয়াতে বলেন,

اللَّهُ لَطِيفٌ بِعِبَادِهِ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ

অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি পরম সদয়, তিনি যাকে চান পর্যাপ্ত রিয্‌ক প্রদান করেন। এবং তিনি পরম শক্তিশালী এবং মহাপরাক্রমশালী।

(সূরা আশ্ শুরা: ২০)

যেমন কিনা আমি পূর্বেই বলেছি সূরা আল্ আন’আমের আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, স্বয়ং দৃষ্টি সীমার মধ্যে আসেন। আবার সূরা হাজ্জের আয়াতে বলেন, আল্লাহ্ তা’লা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন যেন জমিন সবুজ-শ্যামল হয়ে উঠে, অর্থাৎ ঐশী বারি। অতএব, এখানে আল্লাহ্ তা’লা বলছেন, স্বীয় বান্দাদের প্রতি পরম সদয় এবং তিনি তাদেরকে সব ধরনের রিয্‌ক প্রদান করেন। কিন্তু লাভবান কেবল তারাই হয়, যারা শুধু পার্থিব রিয্‌কের পরিবর্তে খোদা তা’লার আধ্যাত্মিক রিয্‌কেরও সন্ধানে থাকেন। যারা আধ্যাত্মিক রিয্‌কের সন্ধান করবেন তারা পার্থিব রিয্‌ক তো পাবেনই। আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তা লাভ করা তাদের জন্য নির্ধারিত। যেমন কিনা আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَّيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ‌

আর তাকে এমন স্থান হতে রিয্‌ক প্রদান করবেন যেখান হতে রিয্‌ক লাভের কথা সে ভাবতেও পারে না।

(সূরা আত্ তালাক্: ৪)

সুতরাং বিশ্বাসীদের সাথে এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অতএব, যারা আধ্যাত্মিক রিয্‌কের সন্ধানে থাকবে, তারা পার্থিব রিয্‌ক তো পেতেই থাকবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা দোষত্রুটি ও দূর্বলতা ঢেকে কোমল ব্যবহার করে ভুলত্রুটি ও পাপ ক্ষমা করে স্বীয় নূর সনাক্ত করারও সুযোগ তাদের প্রদান করবেন যারা তাঁর আধ্যাত্মিক বারির সন্ধানে থাকবে। অবশেষে উপরোক্ত আয়াতে ‘কভী’ ও ‘আজিজ’ (পরম শক্তিশালী, মহাপরাক্রমশালী) বলে এ দিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, আল্লাহ্ তা’লা ‘লতিফ’ (পরম সদয়) হওয়া সত্ত্বেও যদি তাঁর দিকে দৃষ্টি না দাও, তবে স্বরণ রেখো যে, তিনি পরম শক্তিশালী এবং সমস্ত শক্তির আধার। তার পাকড়াও অত্যন্ত দৃঢ় হয়ে থাকে। আর বিজয় আল্লাহ্ তা’লা ও তাঁর প্রেরিতদের জন্যই অবধারিত। এটি আল্লাহ্ তা’লার নিজ নবীদের সাথে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সাথেও এ প্রতিশ্রুতিই রয়েছে। বিরোধিতা কখনই এ আলোকে নির্বাপিত করতে পারবে না। আল্লাহ্ তা’লার প্রেরিত মহাপুরুষ যে জামাত প্রতিষ্ঠা করেছেন তাকে কেউ নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। এ কথাও আল্লাহ্ তা’লার সিদ্ধান্তগুলোর একটি এবং অটল তকদীর যে, আল্লাহ্ও তাঁর রসূল বিজয় লাভ করবেন। সুতরাং পৃথিবীবাসীর অস্তিত্বের নিশ্চয়তা তাঁর লতীফ বৈশিষ্ট হতে কল্যাণমণ্ডিত হওয়ার চেষ্টার মাঝে নিহিত আর পরম শক্তিশালী, মহাপরাক্রমশালী খোদার বাঘের জামাতের বিরোধিতায় নিজেদের আল্লাহ্ তা’লার ফজল হতে বঞ্চিত করবেন না।

ইদানিং পাকিস্তানেও এমনিতেই দেশের আভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ; তাই তাদের জন্যও দোয়ার আহ্বান করতে চাই। সারা দেশের অবস্থা অত্যন্ত বিপদজনক এবং পৃথিবীর দৃষ্টিও এ দিকে পড়ছে যে, সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস বর্তমানে পাকিস্তানেই বিরাজ করছে। কিন্তু যা-ই হোক, যে সমস্ত সংবাদ আসছে তাতে এটাই প্রকাশিত হয় যে, চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে সারা দেশে এবং আহ্‌মদী বা অ-আহ্‌মদী কেউই নিরাপদ নয়। কিন্তু আহ্‌মদীদের জন্য পরিস্থিতি আরো বিপদজনক। কারণ, প্রথমত দেশের আভ্যন্তরীণ অবস্থার জের হিসেবে পাকিস্তানী হওয়ার কারণে তারা প্রভাবিত হচ্ছে। বিরোধিদের আজকাল আহ্‌মদীদের উপর অনেক নোংরা দৃষ্টি রয়েছে। বিরোধিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আর যখন যেখানে সুযোগ পাচ্ছে আহ্‌মদীদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা হচ্ছে না।সম্প্রতি, যেমন কিনা আপনারা সকলে জানেন, ১৪-১৫ বছরের ৪ জন অল্পবয়স্ক কিশোরকে একটি ভয়ানক ধরনের অপরাধের অভিযোগে ধৃত করা হয় এবং এ যাবৎ জামিনের কোনো চেষ্টাই ফলপ্রসু হয়নি। এভাবে খোদার পথে আরো অনেকেই কারাজীবন কাটাচ্ছেন যাদেরকে মিথ্যা ও বানোয়াট অপবাদ দিয়ে, এমনকি রসূল (সা.)-এর অবমাননার অপবাদে দোষী আখ্যা দিয়ে আটক করা হয়। আর এ জাতীয় আরো অনেক ভয়ানক ষড়যন্ত্র জামাতের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, এবং এতে কোনো কোনো স্থানে সরকারও জড়িত রয়েছে। কিছু দিন পূর্বে লাহোরের শাহী মসজিদে খতমে নবুয়ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় গণপূর্ত মন্ত্রী এবং মৌলানা ফজলুর প্রমূখ যোগদান করেন যাতে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর বিরুদ্বে অত্যন্ত অশোভনীয় কথা বলা হয়েছে আর জামাতের বিরুদ্ধে অনেক অপালাপ করা হয়েছে। অতএব, সরকারও মৌলভীদের সাথে একত্রিত হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। আর উগ্রপন্থীরা তো করছেই। যা-ই হোক, আজকাল পাকিস্তানে আহ্‌মদীদের অবস্থা অত্যন্ত বিপদজনক রূপ নিচ্ছে। একারণে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক আহ্‌মদীর জানমাল নিরাপদে রাখুন। এবং সব ধরনের অনিষ্ট ও ফিতনা হতে প্রত্যেককে নিরাপদে রাখুন। পাকিস্তানের আহ্‌মদীরা পুর্ব হতেই নিজেদের অবস্থাদৃষ্টে দোয়ার দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকেন কিন্তু এখন পূর্বের তূলনায় অধিক হারে দোয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করুন। বিশ্বের অন্যান্য আহ্‌মদীরাও পাকিস্তানী ভাইদের জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ্ তা’লা সার্বিক দিক থেকে তাদের নিরাপত্তা বিধান করুন।

এভাবে ভারতেও কয়েকস্থানে যেখানে মুসলমানদের আধিক্য রয়েছে বিরোধিতার ঝড় উঠে থাকে যার উল্লেখ পূর্বেও আমি করেছি। ইন্দোনেশিয়ায়ও কখনো কখনো এ ধরনের অবস্থা দেখা দিয়ে থাকে। আজকাল এই দুদেশে নির্বাচন হচ্ছে। দোয়া করা উচিত, আল্লাহ্ তা’লা ন্যায় পরায়ণ ও নাগরিক-অধিকার সংরক্ষণকারী সরকার ক্ষমতায় নিয়ে আসুন। এভাবে সাবেক সোভিয়েত অঙ্গরাজ্য কিরগিজিস্তান, কাজাকিস্তান প্রভৃতি দেশেও কিছু সরকারি সংস্থা সেখানকার সরকারি মৌলভীদের পৃষ্ঠপোষকতায় আহ্‌মদীদেরকে কষ্ট দিচ্ছে। রীতিমতো একটি অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের জন্যও অনেক দোয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা সারা পৃথিবীতে সকল স্থানে প্রত্যেক আহ্‌মদীকে স্বীয় করুণা ধারায় সিক্ত করুন এবং তাঁর নিজ ‘লতিফ’ বৈশিষ্টের সকল কল্যাণ তাদের উপর বর্ষণ করুন এবং আহ্‌মদীরাও বিশেষভাবে দোয়ার দিকে অনেক বেশি মনোনিবেশ করুন। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেককে নিরাপদ রাখুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে