In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘সাত্তার’ (পর্দা পোষণকারী) - দ্বিতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৩রা এপ্রিল, ২০০৯ইং

যাদের হৃদয়ে ত্বাক্ওয়া রয়েছে তারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য সর্বদা অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন।

কিন্তু একজন মু’মিন, সে পুরুষ বা নারী যে-ই হোক না কেন, যার হৃদয়ে খোদাভীতি রয়েছে সে সেই পোশাক পরিধান করাই পছন্দ করবে যা খোদা তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনেরও মাধ্যম হবে।

আমি প্রত্যেক আহ্‌মদী নর-নারীকে বলছি, যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, সর্বোত্তম পোশাক হচ্ছে ত্বাক্ওয়ার পোশাক। এই পোশাক পরিধানের চেষ্টা করুন যেন আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াত সর্বদা আপনাদের ঢেকে রাখে; আর শয়তান, যে কিনা পর্দা নষ্ট করার কুমতলবে থাকে সে মানুষকে নগ্ন করার চেষ্টায় লিপ্ত।

অতএব, আমাদিগকে আমাদের ইবাদতের প্রতিও দৃষ্টি রাখতে হবে আর আমাদের কর্মের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। সে সমস্ত পাপের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে যেগুলো আল্লাহ্ তা’লা চিহ্নিত করেছেন। নিজেদের লজ্জাবোধের মানও উন্নত করতে হবে, নিজেদের ক্রোধকেও সংবরণ করতে হবে ফলে আমরা যেখানে খোদার সাত্তার বৈশিষ্ট্যের ধারক-বাহক হবো সেখানে পৃথিবীর জন্যও একটি আদর্শ হতে পারবো।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লা কীভাবে নিজ বান্দার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে থাকেন, তাদের ভুল-ভ্রান্তি উপেক্ষা করেন এবং দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন তা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। এই ‘সাত্তারিয়াত’ কি? ‘সাতারা’ শব্দের অর্থ কোন জিনিসকে ঢাকা এবং নিরাপত্তা বিধান করা। সুতরাং আমাদের খোদা! সেই প্রিয় খোদা যিনি আমাদের অগণিত ভুল-ভ্রান্তি ঢেকে দেন, দেখেও দেখেন না। তাৎক্ষণিকভাবে কোন ভুলের জন্য ধৃত করেন না বরং সুযোগ দেন, যাতে মানুষ, একজন সত্যিকার মু’মিন আল্লাহ্ তা’লার এমন ব্যবহারকে কাজে লাগিয়ে, যেসব ভুল-ভ্রান্তি করেছে তা উপলদ্ধি করে আত্মসংশোধন করে। এটা এজন্য নয় যে, সে ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করবে এবং আরো ধৃষ্ট হয়ে উঠবে। কাজেই আল্লাহ্ তা’লা যেখানে নিজ বান্দার ভুল-ত্রুটিগুলো ঢেকে রাখেন সেখানে বান্দারও উচিত আত্মসংশোধন করে তাঁর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আশ্রয় নেয়া। এ অবস্থায় সে আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াতের নিত্য-নতুন বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাবে।

এখন আমি আপনাদের সম্মুখে কতক আয়াত উপস্থাপন করব, যাতে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর এ গুণবাচক বৈশিষ্ট্য হতে লাভবান হওয়ার জন্য, কিছু বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা সুরা আন্‌কাবুত-এ বলেন:

وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَحْسَنَ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ

অর্থাৎ, ‘এবং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, নিশ্চয় আমরা তাদের পাপসমূহ দূর করে দিব আর আমরা অবশ্যই তাদের কৃতকর্মের সর্বোত্তম পুরস্কার প্রদান করব।’ (সূরা আন্‌কাবুত: ৮)

এখানে আল্লাহ্ তা’লা বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদের সম্পর্কে বলেছেন, তিনি তাদের পাপ দূরীভূত করবেন। لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ অভিধানে ‘কাফারা’ শব্দের অর্থ লিখা রয়েছে, পর্দার মধ্যে রাখা, কোন জিনিসকে ঢেকে নেয়া এবং পুরোপুরি শেষ করে দেয়া, অর্থাৎ যারা মন্দ কাজ করে, তাদের সাথে এমন ব্যবহার করা, যেন সে কোন মন্দ কাজ করেই নি।

অতএব, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দাদের প্রতি একান্ত সদয়। বান্দা পাপ করে, কিন্তু তিনি ঝটকরে তাকে ধৃতও করেন না এবং তার পাপকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশও করেন না; নতুবা সমাজে মানুষ মুখ দেখানোর যোগ্য থাকতোনা। মানুষের হাতে অনেক ধরনের মন্দ কাজ সংঘটিত হয়ে যায়, মানুষ অনেক ধরনের পাপে লিপ্ত হয়, কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার সাত্তার বৈশিষ্ট্য তাকে ঢেকে রাখে। যারা নিজেদের পাপাচারিতার বিষয়টি অনুধাবন করে আত্মসংশোধনের প্রতি মনোনিবেশ করে, নিজেদের ঈমান দৃঢ় করে, সৎকর্মের প্রতি মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ্ তা’লা তার পাপসমুহ এবং মন্দ প্রভাবসমুহ তার ভিতর থেকে এমন ভাবে দূর করে দেন যেন সে পাপ কখনো ছিলই না। সে অপরাধের শাস্তিও দেন না, আর তা জানাজানিও হয়না। সমাজে যদি কোন কথা ছড়িয়েও পড়ে তখন আল্লাহ্ তা’লা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীর প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত করতঃ সেই কথা আর ছড়াতে দেন না, যা সে ব্যক্তির দুর্নামের কারণ হতে পারতো।

এরপর, এই খোদা! যিনি সাত্তারও আর মালিকও, যিনি তাঁর প্রতি বান্দার প্রত্যাবর্তনের পর, তার অপরাধসমুহ শুধু ঢেকেই দেন না, বরং তার সৎকর্মের সর্বোত্তম প্রতিদানও দিয়ে থাকেন। যখন মন্দ কাজের পর উত্তম কাজ করে তখন প্রতিদানও উত্তম হয়ে থাকে। নেকীর প্রতিদান কয়েক গুণ বর্ধিত করে দেয়া হয়। পাপের যুগেও মানুষ যেসব ছোট-খাট নেকী করে, সেগুলোর প্রতিদানও তিনি একসাথে দান করেন। এভাবে পুণ্যের পরিমান এতটাই বেড়ে যায় যে, পাপ আর চোখেই পড়ে না।

সুতরাং, প্রকৃত মু’মিন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহ্ তা’লার কাছে সাত্তারিয়াতের প্রত্যাশা করে, নিজের পাপ উপলদ্ধি করার পরক্ষণে সে তা হতে মুক্ত হবার চেষ্টা করেন। সেগুলো ছেড়ে দেয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করেন; ভুল-ভ্রান্তির জন্য তওবা-ইস্তেগফারের প্রতি মনোযোগী হন, তখন আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনকারী হন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে খুবই দুর্বল এবং তার উপর আল্লাহ্ তা’লার শত শত আদেশ নিষেধের বোঝা চাপানো হয়েছে। কাজেই এটি মানুষের প্রকৃতির অংশ যে সে নিজ দুর্বলতার কারণে কোন কোন নির্দেশ পালনে অসমর্থ থাকতে পারে, কখনো কখনো নফসে আম্মারার (অবাধ্য প্রবৃত্তি) কোন কোন কামনা-বাসনা তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। কাজেই স্খলনের সময় সে যদি তওবা-ইস্তেগফার করে, তবে সে তার দুর্বল প্রকৃতির কারণে এ দাবী রাখে যে, আল্লাহ্ তা’লার রহমত যেন তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।’ (চশমায়ে মা’রেফত-রূহানী খাযায়েন, ২৩ তম খন্ড, পৃ: ১৮৯-১৯০)

এ হচ্ছে আল্লাহ্ তা’লার গুণাবলী সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও ধারণা, যা আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে দান করেছেন, এবং তিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন। নতুবা দেখুন! আজকাল ধর্মের অনেক ঠিকাদার জোব্বাধারী বড় বড় উলামা রয়েছে, যারা আল্লাহ্ তা’লার সত্তাকে এমনভাবে বিকৃত করেছে, এমন ভয়ঙ্কর, কঠোর ও শাস্তিদাতা হিসেবে তাঁকে উপস্থাপন করে, যেন তাঁর ভেতর কোমলতার নাম গন্ধই নেই। এ জন্যই খ্রিষ্টান ও নাস্তিকরা যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই ইসলামের ভুল চিত্র উপস্থাপন করে।

অথচ ইসলামের খোদা সাত্তার ও রহীম। শুধু নিজে নন বরং আল্লাহ্ তা’লা মু’মিনদেরকে বলেছেন, আমার গুণাবলীসমুহ নিজ নিজ সামর্থ অনুসারে অবলম্বনের চেষ্টা কর। যখন এটা হবে তখন কতটা সাত্তারী (দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা), মার্জনা ও দয়ার দৃষ্টান্ত সমাজে পরিলক্ষিত হবে তা একবার ভেবে দেখুন? এ সম্পর্কে ভাবলে আল্লাহ্ তা’লার তাসবিহ্‌র (পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা) প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হতে বাধ্য। এরপর একজন মু’মিন এই ভেবে মহানবী (সা.)-এর প্রতিও দরূদ প্রেরণ করে যে, আল্লাহ্ তা’লা মহানবী (সা.)-এর উপর স্বীয় পরিপূর্ণ ধর্ম অবতীর্ণ করে আমাদের প্রতি পরম অনুগ্রহ করেছেন।

এক স্থানে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

‘কুরআন শরীফে আল্লাহ্ তা’লার একটি উক্তির সারমর্ম হলো, হে আমার বান্দা! তোমরা আমার বিষয়ে নিরাশ হয়ো না। আমি রহীম, করীম, সাত্তার, ও গাফ্‌ফার, এবং তোমাদের উপর সবচেয়ে বেশি দয়ার্দ্র, আমি যেভাবে তোমাদের উপর দয়া করি, সেভাবে আর কেউ দয়া করবে না। আমার সাথে তোমাদের পিতা-পিতামহ অপেক্ষা বেশি ভালবাসার সম্পর্ক রাখ। প্রকৃতপক্ষে আমার ভালবাসা সবার ঊর্ধ্বে, তোমরা যদি আমার দিকে আস, তবে আমি তোমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিব। তোমরা যদি তওবা কর, তবে আমি তোমাদের তওবা কবুল করব। আমার দিকে যদি ধীর গতিতেও আস, তবে আমি দৌড়ে আসব। যে ব্যক্তি আমায় অন্বেষণ করবে সে আমাকে পাবে, যে ব্যক্তি আমার দিকে (রজু) প্রত্যাবর্তণ করবে, সে আমার দ্বার সদা উম্মুক্ত পাবে। পাহাড় সম হলেও আমি তওবাকারীর (অনুশোচনাকারীর) অপরাধ ক্ষমা করে থাকি। তোমাদের উপর আমার দয়া অনেক বেশি, এবং (গযব) ক্রোধ অনেক কম। কেননা তোমরা আমার সৃষ্টি, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। এজন্য আমার দয়া তোমাদের সকলকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।’

অতএব, আল্লাহ্ তা’লার দিকে আসার জন্য স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লাই আমাদেরকে সেই পথ বাতলে দিয়েছেন, যে পথে পরিচালিত হলে তাঁর কাছে পৌঁছা যায়। পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা কর। আল্লাহ্ তা’লার অধিকার প্রদান কর, বান্দার প্রাপ্য অধিকার দাও এবং সৎকর্ম কর।

এই সৎকর্ম সম্পর্কেও আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, তোমাদের কোন্ কোন্ আমল করা উচিত, এমন কি কি কাজ বা আমল রয়েছে যা আল্লাহ্ তা’লা পছন্দ করেন, এমন কি কি কাজ বা আমল রয়েছে যা আল্লাহ্ তা’লা অপছন্দ করেন? কাজেই সেসব আদেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ বিষয় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত যা আল্লাহ্ তা’লা উল্লেখ করেছেন; যেন সর্বদাই আল্লাহ্ তা’লার সাত্তার (দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা) বৈশিষ্ট্য ও দয়া থেকে লাভবান হওয়া যায়।

গত খুতবায় আমি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছিলাম। (বলেছিলাম) কোন-কোন ক্ষেত্রে পারস্পরিক মতবিরোধের সময় কীভাবে পরস্পর পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছোড়ি করে। এ বিষয়টি আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে চরম অপছন্দনীয়। দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্বের বিষয়ে কত অসাধারন গুরুত্বারোপ ও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:

هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ

অর্থাৎ, ‘তারা তোমাদের পোশাকসরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকসরূপ।’ (সূরা আল্ বাকারা: ১৮৮)

এর অর্থ হচ্ছে, পারস্পারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব উভয়েরই।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে পোশাকের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যা বলেছেন তা হল, প্রথমত পোশাক নগ্নতা ঢেকে রাখে, দ্বিতীয়ত সৌন্দর্য্যরে কারণ হয়, এবং তৃতীয়ত শীত-গ্রীস্মের প্রভাব হতে মানুষকে রক্ষা করে। সুতরাং, যখন নারী ও পুরুষ পরস্পর এভাবে একটি অঙ্গীকারের অধীনে একত্রে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন যথাসাধ্য একে অপরকে সহ্য করার এবং একে অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয়।

ছোট-ছোট বিষয়ে পুরুষের উত্তেজিত হওয়া অনুচিত, তদ্রুপে নারীরও; বরং একটি আহ্‌মদী দম্পতির মাঝে এমন সম্পর্ক হওয়া উচিত যা এ দম্পতির সৌন্দর্যকে আরো বর্ধিত করবে। এক আহ্‌মদী দম্পতির মাঝে এমন এমন সৌন্দর্য পরিলক্ষিত হওয়া উচিত যা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হবে।

অনেক সময় মেয়ে পক্ষ বা ছেলে পক্ষের কাছ থেকে প্রশ্ন উঠে যে, আমাদের মনের মিল হচ্ছে না। খতিয়ে দেখলে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়, উভয়-ই একে অপরের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেনি। আল্লাহ্ তা’লা যে উদ্দেশ্যে বিয়ের আদেশ দিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির চেষ্টাই করেনি। অনেক সময়তো মনে হয়, তারা যেন একটা ছেলে-খেলার ছলে বিয়েটা করে ছিল। সহ্য বলতে কিছু নেই, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটে যায়। এক অভাবনীয় কষ্টদায়ক পরিস্থিতির অবতারণা হয়।

তাই গোয়ার্তুমি ও অহংকারের পরিবর্তে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি যদি দৃষ্টিপটে রাখা হয়, তাহলে কখনও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে না। যদি এ অঙ্গীকার করেন, আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য একে অপরের জন্য প্রশান্তির কারণ হতে থাকব, তাহলে কখনও কোন প্রকার অশান্তি দেখা দিতে পারে না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

‘সেই সব পর্দা তখন ছিন্ন হয় যখন মানুষ ক্রোধ ও রাগে অন্ধ হয়ে সীমালঙ্ঘন করে। তাই একে দমন করা উচিত। ক্রোধ সংবরণ করা সেই কাজ, যা আল্লাহ্ তা’লা পছন্দ করেছেন এবং তিনি তা করার জন্য আদেশ দিয়েছেন।’

সুতরাং, প্রত্যেক আহ্‌মদী যিনি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আত করে এ অঙ্গীকার করেছেন যে, নিজের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধন করবো, পারিবারিক সম্পর্কের উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হবো; তাকে যথাসাধ্য স্বীয় অঙ্গীকার পালনের চেষ্টা করা উচিত। বিভিন্ন স্থান হতে আমি ঝগড়া-বিবাদের সংবাদ পাই। ছোট-খাটো মনোমালিন্যের কারণে সংসার ভাঙ্গার উপক্রম হয়। তখন সর্বদাই একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে, এক দম্পতিকে সে একটি উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছিল।

মেয়েটির সামনে কোন এক দম্পতি ঝগড়া করছিল বা উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি করছিল, তখন মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে তাদের প্রতি তাকিয়েছিল। ঐ দম্পতি বিষয়টি উপলব্ধি করে এবং প্রশ্ন করে যে, তোমার পিতা-মাতা কি কখনো ঝগড়া করে না? সে বলে, তারা রাগারাগী করে বৈ-কি কিন্তু যখন আম্মু রাগান্বিত হন তখন আমার আব্বু চুপ থাকেন আর যখন আব্বু রেগে যান তখন আমার আম্মু চুপ করে থাকেন।

এরূপ সহ্য ক্ষমতা নিজেদের মাঝে সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অনেক সময় এমন ছোট-খাটো বিষয়ের কারণে সংসার শুরু হতে না হতেই ভেঙ্গে যায়। বিয়ের অল্প দিনের মাথায় এ সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, আমাদের মনের মিল হওয়া সম্ভব নয়, অথচ অনেক দিনের চেনা-জানার পর বিয়ে হয়।

এরপর আসল বিষয় হলো, যখন একে অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে না, কথাগুলো যখন বাইরে রটিয়ে দেয়া হয়, তখন বাহিরের লোকেরা তথা পরামর্শদাতারা মজা লুটার জন্য বা অভ্যাসজনিত কারণে; যারা মন্দ পরামর্শ দিয়ে অভ্যস্ত, তারা এমন পরামর্শ দেয় যাতে অন্যের ঘর ভেঙ্গে যায়।

স্মরণ থাকে যে, পরামর্শও একটি আমনত। এমন লোক, এমন দম্পতি, পুরুষ হোক বা নারী, ছেলে হোক বা মেয়ে, যখন কারো কাছে আসে তখন একজন আহ্মদীর কর্তব্য হলো এমন পরামর্শ দেয়া যাতে সংসার টিকে থাকবে, ভাঙ্গবেনা।

অতএব, নর-নারী উভয়কে আমি পুনরায় বলছি, রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই কেবল অন্যের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা সম্ভব, এবং এটা তখনই সম্ভব যখন তোমাদের মাঝে খোদাভীতি থাকবে। এজন্য আল্লাহ্ তা’লা এক স্থানে لِبَاسُ التَّقْوَى অর্থাৎ, ত্বাক্ওয়ার পোষাকের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। যেমনটি আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

يَا بَنِي آَدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآَتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آَيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

অর্থাৎ, ‘হে আদম সন্তানগণ! আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক নাযেল করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান সমূহকে আবৃত করে এবং যা সৌন্দর্য স্বরূপ, কিন্তু ত্বাক্ওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম। এটি আল্লাহ্‌র আদেশাবলীর অন্যতম যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে’। (সূরা আল্ আ’রাফ: ২৭)

এখানে পুনরায় সেই বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে যা আমি আগেই বলেছি, আল্লাহ্ তা’লা তোমাদেরকে পোশাক দিয়েছেন নগ্নতা ঢাকার জন্য আর তোমাদের সৌন্দর্য্যরে উপকরণস্বরূপ। এটিতো বাহ্যিক উপকরণ যা আল্লাহ্ তা’লা উল্লেখ করেছেন। মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টি হতে পৃথক করার জন্য একটি পোশাক দিয়েছেন যার মাধ্যমে তার সৌন্দর্য্যও বৃদ্ধি পায় আবার নগ্নতাও ঢাকে। কিন্তু একইসাথে বলেছেন, প্রকৃত পোশাক হচ্ছে ত্বাক্ওয়ার পোশাক।

এখানে আমি আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করে দিচ্ছি, একজন মু’মিন এবং যে মু’মিন নয় তাদের পোশাকে সৌন্দর্য্যরে মানদন্ড ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে। যে কোন ভদ্র লোকের পোশাকের সৌন্দর্য্যরে মান পৃথক হয়ে থাকে।

আজকাল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আধুনিক বস্তুবাদী সমাজে পোশাকের সৌন্দর্য্য বলতে তাকেই বুঝায়, যাতে পোশাকের মাধ্যমে নগ্নতা প্রকাশ পায় এবং শরীর দেখা যায় আর পাশ্চাত্যের সর্বস্তরেই একই মন-মানসিকতা বিরাজ করছে। বলা হয়, পুরুষের জন্য এমন পোশাকই সৌন্দর্য্যরে কারণ যা ঢেকে রাখে, অথচ পুরুষই চায় নারীর পোশাকে নগ্নতা প্রকাশ পাক।

মহিলারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই চায়; এমন মহিলা যার মাঝে আল্লাহ্ তা’লার ভয় নেই এবং ত্বাক্ওয়ার পোশাক নাই। পুরুষরাও এটাই চায়। পুরুষদের একটা শ্রেণী চায়, মহিলাদের পোশাক আধুনিক হওয়া উচিত, বরং নিজেদের স্ত্রীদের ক্ষেত্রেও তারা এটিই পছন্দ করে যেন সমাজে তারা আধুনিক ও ফ্যাশনেবল বিবেচিত হয়; সে পোশাকে তার নগ্নতা ঢাকা পড়ুক বা না পড়ুক তাতে কিছু যায় আসে না।

কিন্তু একজন মু’মিন, সে পুরুষ বা নারী যে-ই হোক না কেন, যার হৃদয়ে খোদাভীতি রয়েছে সে সেই পোশাক পরিধান করাই পছন্দ করবে যা খোদা তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনেরও মাধ্যম হবে। ত্বাক্ওয়ার পোশাকের সন্ধান থাকলেই ঐ পোশাক মানুষের হস্তগত হয়, যখন অত্যন্ত সচেতনতার সাথে নিজেদের বাহ্যিক পোষাকের প্রতিও সে যত্নবান হবে।

স্বামী-স্ত্রী, যারা একে অপরের জন্য পোশাক স্বরূপ, খোদাভীতির সাথে যদি এটি দৃষ্টিগোচর রাখা হয়, একইভাবেই সমাজে একে অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখার জন্য জীবনের কোন প্রকার চড়াই-উৎরাই এর মুহূর্তে খোদাভীতিকে দৃষ্টিপটে রাখা হয়; (তাহলে স্মরণ রাখতে হবে) সমাজে বসবাসকারীদের জীবনে পারস্পরিক সম্পর্কের বেলায় অনেক সময় টানাপোড়েন এর সৃষ্টি হয়েই থাকে আর মনোমালিন্যও দেখা দেয় আবার বন্ধুত্বও হয়।

কিন্তু একজন মু’মিন মনোমালিন্য দেখা দিলে ভাল সময়ের বন্ধুত্বের কথা, যা অন্য বন্ধুর আমানত হয়ে থাকে, তা মানুষের কাছে বলে বেড়ায় না। তেমনিভাবে স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের গোপন কথা অন্যের সামনে বলে বেড়ায় না। যাদের হৃদয়ে ত্বাক্ওয়া রয়েছে তারা আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য সর্বদা অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন।

সুতরাং, এই হচ্ছে ত্বাক্ওয়ার পোশাক, যা বাহ্যিক পোশাকের মাপকাঠি নির্ণয় করে, এবং পরস্পরের দুর্বলতা ঢেকে রাখার মানকে সমুন্নত করে। আল্লাহ্ তা’লার প্রতি বিনত হওয়া ছাড়া এই মান অর্জিত হতে পারে না। কেননা, শয়তান সব সময় বান্দার এই ত্বাক্ওয়ার পোশাক খুলে ফেলার সুযোগের জন্য ওঁৎপেতে থাকে।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনের একস্থানে, অর্থাৎ আমি যে আয়াতটি পূর্বে তেলাওয়াত করেছি এর পরবর্তী আয়াতে, বলেছেন:

يَا بَنِي آَدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآَتِهِمَا إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ

অর্থাৎ ‘হে আদম সন্তানগণ! শয়তান যেন তোমাদেরকে কখনোই বিপথগামী না করে, যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বহিস্কার করিয়েছিল, সে তাদের উভয়ের কাছ থেকে পোশাক হরণ করেছিল যাতে সে তাদের নগ্নতা প্রকাশের জন্য, অবশ্যই সে এবং তার গোত্র তোমাদেরকে এমন স্থান হতে দেখছে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখ না। অবশ্যই আমরা শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি যারা ঈমান আনে না।’ (সূরা আল্ আ’রাফ: ২৮)

সুতরাং, আমি বাহ্যিক পোশাকের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে নগ্নতার কথা উল্লেখ করেছি, একজন মু’মিন কখনই এমন পোশাক পরিধান করতে পারে না যা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির পরিবর্তে দেহাবয়ব প্রর্দশন করে। এখানে এবং পাকিস্তান থেকেও কতক অভিযোগ আসে যে, আহ্‌মদী মেয়েরা অন্যদের অনুকরণে শুধু পর্দাই ছেড়ে দেয়না, বরং অশালীন পোশাকও পরিধান করে। এমন আচরণ শুধু সে-ই করতে পারে, যে ত্বাক্ওয়ার পোশাক শূণ্য।

আমি প্রত্যেক আহ্‌মদী নর-নারীকে বলছি, যেভাবে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, সর্বোত্তম পোশাক হচ্ছে ত্বাক্ওয়ার পোশাক। এই পোশাক পরিধানের চেষ্টা করুন যেন আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারিয়াত সর্বদা আপনাদের ঢেকে রাখে; আর শয়তান, যে কিনা পর্দা নষ্ট করার কুমতলবে থাকে সে মানুষকে নগ্ন করার চেষ্টায় লিপ্ত।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, যে ব্যক্তি মু’মিন নয় শয়তান তার বন্ধু। আমরা যদি ঈমান এনে থাকি এবং যুগের ইমামকে মেনে থাকি তবে বিশেষ প্রচেষ্টার সাথে শয়তানের খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হবে। সর্বদা নিজেকে সেই পোশাকে আবৃত করতে হবে যা ত্বাক্ওয়ার পোশাক। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে সেই তৌফীক দান করুন, আমীন।

যেভাবে আমি বলেছি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আত গ্রহণের পর নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের মত গুরুদায়িত্ব আমাদের উপর অর্পিত হয়েছে। যুগের গড্ডালিকা প্রবাহে যেন আমরা গা ভাসিয়ে না দিই বরং আল্লাহ্ তা’লার সাথে আমাদের সম্পর্ক যেন প্রতিনিয়ত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয় এবং সর্বদাই যেন ত্বাক্ওয়ার পোশাকের মর্ম অনুধাবন করতে সমর্থ হই।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেছেন,

‘মানুষ তার বিগত জীবনে কোন সগীরাহ্ বা কবীরাহ্ গুণাহ্ করে থাকবে তা মোটেই অসম্ভব নয় (অর্থাৎ, যে কোন ছোট-বড় অপরাধ) কিন্তু যদি আল্লাহ্ তা’লার সাথে তার প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে উঠে তাহলে তিনি তার সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন উপরন্তু কখনই তাকে লজ্জিত করেন না; ইহজগতেও না আর পরকালেও না। এটা আল্লাহ্ তা’লার কত বড় অনুগ্রহ যে, তিনি কাউকে ক্ষমা ও মার্জনা করার পর তা আর উল্লেখই করেন না বরং তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন। এরূপ অনুগ্রহ ও দয়ার পরও যদি সে কপটতাপূর্ণ (মুনাফেকের মত) জীবনযাপন করে, তবে তা বড়ই পরিতাপ ও দুর্ভাগ্যের বিষয়।’ (মলফুযাত, ৩য় খন্ড, পৃ: ৫৯৬, নবসংস্করণ, রাব্ওয়া থেকে প্রকাশিত)

পূর্বেই বলা হয়েছে, মানুষ যদি অপরাধ ও মন্দকর্মের ধৃষ্ট না হয় বরং তা থেকে বাঁচার সমূহ চেষ্টা করে এবং ত্বাক্ওয়ার পোশাকের সন্ধানে থাকে, তবে আল্লাহ্ তা’লা নিজ সাত্তারিয়াতের চাঁদরে তাকে এমনভাবে আবৃত করেন যে, পাপের নাম ও নিশানা পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, তাকে কখনো লজ্জিত করেন না, এ পৃথিবীতেও নয় এবং পরকালেও নয়।

আল্লাহ্ তা’লা যদি কারো প্রতি সন্তুষ্ট হন তখন লজ্জিত করার প্রশ্নই উঠে না বরং তাকে তিনি তাঁর অপার নিয়ামতে ভূষিত করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা সুরা আন্ নিসায় বলেছেন:

إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا

অর্থাৎ ‘তোমাদেরকে যা হতে নিষেধ করা হচ্ছে যদি তোমরা সেগুলোর মধ্যে গুরুতর পাপ হতে বিরত থাক তাহলে আমরা তোমাদের কর্মের অনিষ্টসমূহ দূরীভূত করে দিব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবিষ্ট করবো।’ (সূরা আন্ নিসা: ৩২)

এখানে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, গুরুতর পাপ হতে বিরত থাক; এর অর্থ এ নয় যে, গুরুতর পাপসমুহের সন্ধান করতে হবে যে কোন্ কোন্ গুরুতর পাপ রয়েছে যেগুলো হতে বিরত থাকতে হবে। একজন সত্যিকার মু’মিন হচ্ছেন তিনি, যিনি সব ধরনের পাপ হতে বিরত থাকেন। কেননা আল্লাহ্ তা’লার সাত্তারী সর্ব প্রকার দোষ-ত্রুটি ও পাপের সাথে সম্পর্ক রাখে। তাই এ ধারণা করা উচিত নয় যে, গুরুতর পাপসমুহ হতে বিরত থাকলেই হবে এবং ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র পাপ করলে কোন দোষ নেই।

আল্লাহ্ তা’লা বলেন, গুরুতর পাপ হতে বিরত থাক, এর অর্থ হচ্ছে সব ধরণের পাপ ও অপরাধ হতে বিরত থাক। কেননা পবিত্র কুরআনে গুরুতর ও লঘু পাপ বা অপরাধের কোন তালিকা নেই, নেই কোন ভেদাভেদ। আল্লাহ্ তা’লার দৃষ্টিতে প্রত্যেক সেই কর্ম যা করতে খোদা বারণ করেছেন এবং কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন তা যেন একজন মু’মিন এড়িয়ে চলে, কেননা এমন কর্ম করাই পাপ।

অতএব, প্রত্যেক সেই ক্ষুদ্র বা বৃহত্তর মন্দকর্ম যা করতে খোদাতালা বারণ করেছেন, তা পরিত্যাগ করতে যদি কারো কোন কষ্ট হয় তবে তা হবে সে ব্যক্তির জন্য কবিরা বা গুরুতর পাপ। সুতরাং, যখন একটি কঠিন কাজ সমাধা করে ফেলবে, তাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে, তখন এমনসব কর্ম যা পরিত্যাগ করা অপেক্ষাকৃত সহজ তা আপনা আপনি দূর হয়ে যাবে।

কোন কোন তফসীরকারক এও মন্তব্য করেছেন, যে কোন পাপের চরমরূপ হচ্ছে কবীরা গুনাহ্‌র (মহাপাপ) অন্তর্ভূক্ত। অতএব, যদি এ চরমে পৌঁছার পূর্বেই আত্মসংশোধনের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর, তবে আল্লাহ্ তা’লা যিনি এ যাবৎকাল দোষ-ত্রুটি সমূহ ঢেকে রেখেছেন, ভবিষ্যতেও তিনি তোমার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। যদি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সৎকর্মের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর, তবে আল্লাহ্ তা’লার দরবারে পুরস্কৃত হবে। সেই মন্দকর্ম আর প্রকাশ পাবে না।

আর যেমন কিনা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন, যেসব ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পাপ রয়েছে সে গুলোর উল্লেখ পর্যন্ত করেন না। অন্যত্র খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনে বৃহৎ পাপকে অন্য কতক পাপের সাথে একত্রিত করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রতিটি পাপই কবীরা গুণাহ্য় রূপ নিতে পারে।

যেভাবে তিনি সূরা আশ্ শূরা’তে বলেন:

وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ

অর্থাৎ ‘এবং যারা বড় বড় পাপ এবং অশ্লীল কার্যকে বর্জন করে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন ক্ষমা করে দেয়।’ (সূরা আশ্ শূরা: ৩৮)

অর্থাৎ এখানে বিশ্বাসীদের চিহ্ন সম্পর্কে বলা হয়েছে। এখানে বিশ্বাসীদের উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তারা বড় পাপ ও অশ্লীল কাজকর্ম হতে দূরে থাকেন; এখানে দু’টি বিষয় একইসাথে বর্ণিত হয়েছে। আর তারা রাগও সম্বরণ করেন, এদিক থেকে তিনটি বিষয়ই একত্রে বর্ণিত হয়েছে।

এখানে একটি প্রনিধাণযোগ্য বিষয় হলো, মহানবী (সা.) বলেন,

‘লজ্জা ইমানের অঙ্গ।’

তাদের জন্য যারা ফ্যাশন ও জাগতিকতার মোহে অন্ধ এবং এমনই নির্লজ্জ পোশাক পরিধান করে যাতে নগ্নতা প্রকাশ পায়, যাদের লাজ-লজ্জার কোন বালাই নেই। এ বিষয়টি বড় উৎকন্ঠা ও উদ্বেগের কারণ। আল্লাহ্ তা’লা তো দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন ও ক্ষমা করতে চান।

যেমন কিনা আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর একটি উদ্ধৃতি পড়েছি। আল্লাহ্ তা’লা বান্দার দিকে ছুটে আসেন যাতে বান্দাও তার দিকে যায়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও যে বান্দা এ সুযোগকে কাজে লাগায় না, এটি তার জন্য কতই না দূর্ভাগ্য জনক।

আবার যেমন কিনা আমি পূর্বেও বলেছি, এ আয়াতে ক্রোধান্বিত হওয়া, রাগান্বিত হওয়া, তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠাকেও আল্লাহ্ তা’লা গুরুতর পাপ এবং অশ্লীল বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। ক্রোধান্বিত হওয়াও ঈমানকে দূর্বল করে, আর রাগ বা ক্রোধ হচ্ছে অসংখ্য পাপের জনক; রাগের কারণে সমাজের শান্তি বিনষ্ট হয়।

আল্লাহ্ তা’লার শিক্ষার বিরুদ্ধে চলে মানুষ যে কত পাপ করে আর কতটা সীমালঙ্ঘণ করছে তা মানুষ একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারত; কিন্তু এটি তার মনেও পড়ে না। অপরদিকে এতকিছু সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা’লা মানুষের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন। শাস্তি প্রদানের শক্তি ও প্রতিশোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করেন। কিন্তু বান্দা কথায়-কথায় ক্রোধান্ধ হয়ে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অতএব, সত্যিকার মু’মিন হতে হলে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখ কেননা এর ফলেই তোমার দোষ-ত্রুটিও গোপন থাকবে। রাগের মাথায় এমন অনেক কথা মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায় যা অন্যের দুর্বলতা ফাঁস করে দেয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘যতক্ষণ পর্যন্ত না পরস্পরের প্রতি সত্যিকার সহানুভূতি সৃষ্টি হবে আর যাকে পূর্ণ শক্তি দেয়া হয়েছে সে দুর্বলকে ভালবাসবে, ততক্ষণ আমাদের জামাত প্রকৃত শক্তি অর্জন করতে পারবেনা। আমি যখন এটা শুনি, কেউ কারো দুর্বলতা দেখে এবং তার প্রতি সদ্ব্যবহার করে না বরং ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করে। অথচ তার জন্য দোয়া করা উচিত, ভালবাসা এবং নমনীয়তা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাকে বুঝানো কিন্তু এর পরিবর্তে বিদ্বেষ ও ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে সীমাতিক্রম করে। যদি মার্জনা না করা হয়, সহানুভুতি না দেখানো হয় তাহলে অধঃপতিত হতে হতে পরিণতি হয় অশুভ। খোদা তা’লার দৃষ্টিতে এমনটি গ্রহণীয় নয়। জামাত তখনই সৃষ্টি হতে পারে যখন কতক কতকের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে দোষত্রুটি গুলো গোপন রাখা হয়। যখন এ অবস্থা সৃষ্টি হয় তখনই এক ও অভিন্ন দেহ হিসেবে পরস্পরের অঙ্গপ্রতঙ্গ হয়ে যায় এবং পরস্পরকে নিজ ভাইয়ের চেয়েও অধিক আপন মনে করে।’ (মলফুযাত, ২য় খন্ড, পৃ: ২৬৪-২৬৫, নবসংস্করণ, রাব্ওয়া থেকে প্রকাশিত)

এভাবেই একে অপরের অঙ্গপ্রতঙ্গ হয়ে যাওয়া উচিত। সুতরাং, আমরা যারা এ যুগে মহানবী (সা.)-এর সত্যিকার দাস ও প্রেমিকের জামাতর্ভূক্ত হয়েছি, আমরা যারা মহানবী (সা.)-এর ভবিষদ্বাণী অনুযায়ী এ যুগের পয়গম্বরকে মেনেছি; আমরা যারা এ ঘোষণা করি যে, এই সত্যিকার দাস ও যুগ ইমামকে গ্রহণ করা ছাড়া ঈমানের উচ্চতর মান অর্জন সম্ভব নয়। আমরা যারা এই বিশ্বাস রাখি যে, এই মসীহ্ ও মাহদীর উপর ঈমান আনার মাঝেই খোদা তা’লার সন্তুষ্টি নিহিত। আমরা যারা এ ঘোষণা করি, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা এখন মুহাম্মদী মসীহ্‌র মাধ্যমেই পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করা অবধারিত।

অতএব, আমাদিগকে আমাদের ইবাদতের প্রতিও দৃষ্টি রাখতে হবে আর আমাদের কর্মের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। সে সমস্ত পাপের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে যেগুলো আল্লাহ্ তা’লা চিহ্নিত করেছেন। নিজেদের লজ্জাবোধের মানও উন্নত করতে হবে, নিজেদের ক্রোধকেও সংবরণ করতে হবে ফলে আমরা যেখানে খোদার সাত্তার বৈশিষ্ট্যের ধারক-বাহক হবো সেখানে পৃথিবীর জন্যও একটি আদর্শ হতে পারবো।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের এই দোয়ার উত্তরাধিকারী করুন যাতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ

অর্থাৎ, ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা কর এবং আমাদের মন্দ কর্মের অনিষ্টসমূহ্ আমাদিগ হতে দূরীভূত কর; আর আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে (শামিল করে) মৃত্যু দাও।’ (সূরা আল্ ইমরান: ১৯৪)

আমাদেরকে তাদের ভেতর অন্তর্ভূক্ত কর যারা তোমার স্নেহধন্য। আমরা যেন সদা তোমার প্রিয়ভাজন হই এবং সর্বদা তোমার সাত্তার (দুর্বলতা ঢেকে রাখা) বৈশিষ্ট্য থেকে অংশ লাভ করি। আল্লাহ্ করুন যেন এমনই হয়।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে