In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

বিশ্বব্যপী আহ্‌মদীদের উপর নির্যাতন ও দোয়ার উপদেশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২০শে মার্চ, ২০০৯ইং

২৩শে মার্চের প্রেক্ষাপটে আহ্‌মদীয়া জামাত প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জামাতের অনন্য অবদান

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আমরা সবাই অবগত যে, আজ থেকে একশত বিশ বছর পূর্বে এই মাস অর্থাৎ মার্চের ২৩ তারিখে পবিত্র কুর’আনের সেই মহান ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে যা আল্লাহ্ তা’লা সুসংবাদ স্বরূপ মহানবী (সা.)-কে প্রদান করেছিলেন। মুসলিম উম্মাহ্ এক হাজার বছর ধরে ক্রমশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং অধিকাংশ মুসলমানের ভেতর ইসলাম ধর্মের নাম মাত্র অবশিষ্ট থাকার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্ তা’লা সেই চন্দ্রের আলোকিত হওয়ার সংবাদ প্রদান করেন যাঁর জন্য সিরাজে মুনীর (প্রদীপ্ত সূর্য) থেকে আলো বা জ্যোতি লাভ করা অবধারিত ছিল। যাঁর সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, কিয়ামত পর্যন্ত তিনি আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যাবেন আর তাঁর সিলসিলাহ্ বা জামাত স্থায়ী হবে এবং তাঁর আঁকা ও মনিব হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) কর্তৃক আনীত শরিয়তের সৌন্দর্য ও দীপ্তির মাধ্যমে তরবিয়ত প্রাপ্তরাও সর্বদা বিশ্ববাসীর হৃদয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও আলোকিত করে যাবেন। অতএব মহানবী (সা.)-এর এই মহান পুত্রের প্রতিষ্ঠিত জামাতের একটি যুগের সূচনা হয় ১৮৮৯ সনের ২৩ মার্চ, যখন আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রতি ইলহাম করেন:

إِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ

وَ اصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا

إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ

তিনি ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে এর অনুবাদ করেছেন,

‘তুমি যেহেতু এই সেবার সংকল্প করেছ তাই খোদা তা’লার উপর নির্ভর কর এবং তুমি আমাদের তত্ত্বাবধানে আমাদের ওহী অনুযায়ী নৌকা তৈরী কর। নিশ্চয় যারা তোমার হাতে বয়’আত করে বস্তুত তারা আল্লাহ্‌র হাতে বয়’আত করে। আল্লাহ্‌র হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে।’

অন্যত্র তিনি (আ.) বলেন,

‘তিনি এই জামাত প্রতিষ্ঠার সময় আমাকে বলেছেন, পৃথিবীতে ভ্রষ্টতার প্লাবন বিরাজ করছে। তুমি এই প্লাবনের সময় নৌকা তৈরি কর। যে ব্যক্তি এই নৌকায় আরোহণ করবে সে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। আর যে অস্বীকার করবে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হবে।’

যা-ই হোক, তিনি ঐশী নির্দেশে ১৮৮৯ সনের ২৩শে মার্চ বয়’আত গ্রহণ আরম্ভ করেন। সেদিন শত শত সৌভাগ্যবান এই নৌকায় আরোহণ করেন। আর এই সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে তাঁর জীবদ্দশাতেই কয়েক লক্ষে উপনীত হয়েছে। সেসব বয়’আত গ্রহণকারীরাও বয়’আতের পর নিজ দায়িত্ব অনুধাবন করেছেন। আল্লাহ্ তা’লাও তাদের উপর স্বীয় স্নেহের হাত রেখেছেন। ফলে তাঁরা ক্রমশ আধ্যাত্মিকতার উন্নত মার্গে আরোহণ করতে থাকেন। তাদের উপরও বিরোধিতার ভয়াবহ তুফান আসে। আপন-পর সবার পক্ষ থেকে শত্রুতার সম্মুখীন হতে হয়; এমনকি তাঁর হাতে বয়’আত করার অপরাধে অনেককে শহীদও করা হয়েছে। তাদের ভেতর সবচেয়ে মহান হলেন হযরত সাহেবজাদা সৈয়দ আব্দুল লতিফ শহীদ (রা.) যাঁকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে শহীদ করা হয়েছে। এ সকল মৌলভীদের ফতওয়া মোতাবেক বাদশাহ্‌র নির্দেশে তাঁকে প্রথমে মাটিতে পুতে তারপর অত্যন্ত নির্দয়ভাবে পাথর মেরে শহীদ করা হয়। এই সব ঘটনা আমাদেরকে প্রাথমিক যুগের নির্যাতনের সেসব ঘটনা স্মরণ করায় যা মহানবী (সা.)-এর সাহাবীদের উপর করা হয়েছিল। কিন্তু সকল প্রকার যুলুম-নির্যাতন ও বিরোধিতা আর সরকারকে তাঁর বিরুদ্ধে খেপানোর ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা’লার এই জামাত ক্রমশ উন্নতি করতে থাকে। পরিশেষে ১৯০৮ সনের ২৬শে মে তিনি ঐশী সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করে স্বীয় প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর খোদা যেভাবে তাঁকে আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন, তাঁর জামাতের দ্বিতীয় ধাপ কুদরতে সানীয়ার মাধ্যমে আরম্ভ হবে। সেই সম্পর্কে স্বয়ং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘মোটকথা, আল্লাহ্ তা’লা দু’ প্রকার কুদরত প্রকাশ করেন। প্রথমত, নবীদের মাধ্যমে আপন শক্তির এক হস্ত প্রদর্শন করেন। দ্বিতীয়ত, অপর হস্ত এমন সময় প্রদর্শন করেন, যখন নবীর মৃত্যুর পর বিপদাবলী উপস্থিত হয় এবং শত্রু শক্তি লাভ করে মনে করে, এখন (নবীর) কার্য ব্যর্থ হয়ে গেছে; তখন তাদের এই প্রত্যয়ও জন্মে, এখন জামাত (ধরাপৃষ্ঠ হতে) বিলুপ্ত হয়ে যাবে; এমনকি জামাতের লোকজনও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন, তাদের কটিদেশ ভেঙ্গে পড়ে এবং কোনো কোনো দুর্ভাগা মুরতাদ হয়ে যায়। তখন খোদা তা’লা দ্বিতীয়বার আপন মহাকুদরত প্রকাশ করে পতনোম্মুখ জামাতকে রক্ষা করেন। সুতরাং যারা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেন, তারা খোদা তা’লার এই মোজেযা প্রত্যক্ষ করেন।’ (আল্ ওসীয়্যত, পৃ: ১৪-দ্বিতীয় সংস্করণ)

যখন এই দ্বিতীয় যুগ আরম্ভ হয়, যেভাবে তিনি (আ.) বলেছিলেন, অনেক দুর্ভাগা সন্দেহে নিপতিত হয়েছিল, এবং স্বীয় আমিত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.) যাদেরকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে-শুনিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য! দ্বিতীয় খিলাফতের নির্বাচনের সময় তাদের মধ্য হতে কতক মুরতাদ হয়ে যায়। একথা বুঝার চেষ্টা করেনি, পতনোম্মুখ জামাতকে আল্লাহ্ তা’লা يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ এর দৃশ্য দেখিয়ে রক্ষা করেন। কাণ্ডজ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা একথা চিন্তা করে নি যে, নৌকায় আরোহণ করে তারাই নিমগ্ন হওয়া থেকে রক্ষা পাবে যারা দ্বিতীয় কুদরতের সাথে যুক্ত থাকবে। কোনো আঞ্জুমান নয় বরং সেই দ্বিতীয় কুদরত হচ্ছে খিলাফত। অতএব আজও আমরাই সৌভাগ্যবান যারা খিলাফতের সাথে যুক্ত থাকার ফলে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নির্মিত এই নৌকায় আরোহণ করেছি এবং নিমজ্জিত হবার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছি। আমাদের উপর আল্লাহ্ তা’লার হাত রয়েছে। পৃথিবী ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হচ্ছে আর আহ্‌মদীরা স্বীয় মহাশক্তিশালী খোদার কৃপার দৃশ্য অবলোকন করছে। ১৯০৮ থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত শত্রুরা নিত্যনতুনভাবে জামাতকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা বড় বড় বিপদাবলীর মন্দ পরিণতি এবং শত্রুর সম্মিলিত আক্রমন হতে জামাতকে নিরাপদ রাখছেন। আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক যতবেশি জামাত বিশ্বে প্রসার লাভ করছে হিংসা এবং বিরোধিতার আগুনও ততো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিরোধিতা বাড়ছে এবং যেখানে যেখানে নামধারী, স্বার্থপর উলামাদের ক্ষমতা রয়েছে, তারা আহ্‌মদীদের উপর খোদার নাম নিয়ে কৃত সেসব যুলুম-নির্যাতন থেকে বিরত হচ্ছে না। কিন্তু প্রত্যেক বিরোধিতা আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় প্রত্যেক আহ্‌মদীর ঈমান বৃদ্ধির কারণ হয়। কেননা আল্লাহ্ তা’লা পূর্বেই বলে রেখেছেন, মু’মিনদেরকে খোদা তা’লার পথে কষ্ট সইতে হবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘পবিত্র কুরআন থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, ঈমানের পূর্ণতার জন্য বিপদাপদ আসা আবশ্যক। যেভাবে বলা হয়েছে,

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ يُّتْرَكُوْۤا اَنْ يَّقُوْلُوْۤا اٰمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَـنُوْنَ‏

অর্থাৎ ‘লোকেরা কি এটি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হবে আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না।’ (সূরা আল্ আন্‌কাবুত: ৩)

এরপর বলেন,

‘সারকথা হলো পরীক্ষা আবশ্যক। যে এই জামাতভূক্ত হয় সে পরীক্ষা এড়াতে পারে না। আমাদের এমন অনেক বন্ধু আছেন, যাদের পিতা একদিকে আর তারা অন্য দিকে।’

অর্থাৎ আহ্‌মদীয়াত গ্রহণের কারণে পিতামাতা হতে বিতাড়িত।

অন্যত্র তিনি (আ.) বলেন,

‘চরম পরীক্ষার সময় মানুষ যদি খোদার জন্য ধৈর্য ধারণ করে তখন সেই পরীক্ষা ফিরিশ্তার সাথে মিলিত করে দেয়।’

তিনি (আ.) বলেন,

‘নবীদের উপর পরীক্ষা আসে বলেই তাদেরকে খোদার সাথে মিলিত করা হয়।’

তিনি (আ.) বলেন,

‘পরীক্ষা ছাড়া উন্নতি অসম্ভব।’

অতএব এগুলো ঈমানে দৃঢ়তা লাভের জন্য সেসব নসীহত বা উপদেশ যা আল্লাহ্ তা’লার ফযলে আহ্‌মদীরা আজও অবলম্বন করে রেখেছে। প্রত্যেক আহ্‌মদী এটি খুব ভালোভাবে অবহিত আছে যে, বিরোধিতা আমাদের উন্নতির জন্য সার স্বরূপ।

গত খুতবায় আমি বুলগেরিয়ার নবাগত আহ্‌মদীদের উল্লেখ করেছিলাম। এদের মধ্যে কতক নবাগত আর কতক কয়েক বছর পূর্বে আহ্‌মদী হয়েছেন। তাদেরকে সেখানকার মুফতি, যার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তার নির্দেশে পুলিশ আহ্‌মদীদের গ্রেফতার করে এবং ধরে থানায় নিয়ে যায়। তাদেরকে যখন আমি সালাম প্রেরণ করি এবং খবরাখবর নেই; মুরব্বি সাহেব বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের সাথে যোগাযোগ করি এবং যখন পয়গাম পৌঁছাই তখন প্রত্যেকের উত্তর এটিই ছিল,

“আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আমরা ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, এসব দুঃখ-যাতনা কিছুই নয়”।

আবার অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে আর আমার জন্য পয়গাম পাঠান,

“আপনি চিন্তিত হবেন না; আমরা জামাতের খাতিরে সব ধরনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করবো, ইনশাআল্লাহ্। আপনি আমাদের জন্য কেবল দোয়া করতে থাকুন”।

মানুষ বলে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কী বিপ্লব আনয়ন করেছেন? এটি যদি বিপ্লব না হয়, তাহলে কী? আহ্‌মদীয়াত গ্রহণের পর তারা কুরবানীর চেতনা এবং পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে বুঝতে আরম্ভ করেছে। সেই বোধ-বুদ্ধি শক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা তাদেরকে এই সত্যের সাথে পরিচিত করিয়েছে যে, আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য পেতে হলে পরীক্ষা দিতে হয়। ইউরোপের বাসিন্দারা কখনও এই চিন্তাও করতে পারতো না আর বিশেষভাবে যারা দীর্ঘকাল কমিউনিজমের অধীনে থেকেছে তারাতো নয়ই। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং খিলাফতের সাথে তাদের একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যা কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লার বিশেষ কৃপায় হয়ে থাকে। মহানবী (সা.)-এর সত্যিকার দাসের জামাতভূক্ত হবার কারণে আল্লাহ্ তা’লা আহ্‌মদীদের প্রতি এই আশিস বর্ষণ করছেন।

অনুরূপভাবে বর্তমানে ভারতের নবাগত জামাতগুলোর উপরও অনেক যুলুম-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আর যথারীতি সেখানেও নামধারি মোল্লারাই এই যুলুম চালাচ্ছে এবং মোল্লাদের উসকানিতে সেখানকার মুসলমানরা করছে। সরকার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না কারণ অচিরেই সেখানে নির্বাচন হবে আর মুসলমানদের ভোট তাদের প্রয়োজন এবং আহ্‌মদীদের সেখানে তেমন কোনো শক্তি নেই। কিন্তু এসব নির্যাতনকারী আর যুলুম-নির্যাতন দেখেও যারা না দেখার ভান করছে তাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, জামাতে আহ্‌মদীয়ার কাছে পার্থিব কোনো শক্তি নেই ঠিকই কিন্তু খোদা তা’লা জামাতে আহ্‌মদীয়ার সাথে আছেন। তিনি আমাদের মালিক; যখন তাঁর সাহায্য আসে তখন সবকিছু খড়-কুটোর মতো উড়ে যায়। যখন তাঁর তকদীর কার্যকর হয় তখন কোনো কিছু তাঁর সম্মুখে দাঁড়াতে পারে না। অতএব ভারতের আহ্‌মদীরাও ধৈর্য এবং বীরত্ব প্রদর্শন করুন। বিশেষভাবে দোয়ার প্রতি জোর দিন। পূর্বের তুলনায় আপন প্রভূর সাথে সম্পর্ক অধিক বৃদ্ধি করুন।

অনুরূপভাবে আজকাল পাকিস্তানেও আহ্‌মদীয়াতের চরম বিরোধিতা হচ্ছে। সরকার এবং মোল্লাদের কর্মকাণ্ড দেখে বিস্মিত হতে হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবের ফলে উপমহাদেশে মোল্লাদের পক্ষ থেকে বিরোধিতা আরম্ভ হয়েছে, মৌলভীরা ব্যক্তিগতভাবেও ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে এবং অন্যদেরকেও জামাতের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছে এবং তাদের সহায়তা করেছে যাতে যে-কোনোভাবেই হোক জামাতের ক্ষতি করা বা ধ্বংস করা যায়। কিন্তু তাদের সকল ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও জামাতের অগ্রযাত্রা অব্যহত আছে, পূর্বের তুলনায় অধিক উন্নতি করছে জামাত। এসব কিছু দেখা সত্ত্বেও তাদের চৈতন্যোদয় ঘটেনি। এটি প্রমাণ করে যে, জামাত কোনো মানুষ কর্তৃক নয় বরং খোদা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বরং যেভাবে আমি সূচনাতে বলেছি, খোদার নিদর্শনাবলীর অন্তর্গত। একটি ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা এবং আল্লাহ্ তা’লার একটি মহান সুসংবাদ পূর্ণ হবার সুস্পষ্ট নিদর্শন এ জামাত। তাই আমি এদেরকে বলছি, বিবেক খাটান! এবং খোদার সাথে মোকাবিলা করা হতে বিরত হোন। আল্লাহ্ তা’লার সমীপে সমর্পিত হয়ে তওবা এবং ইস্তেগফার করুন। আল্লাহ্ তা’লার প্রেরিতের সাহায্যকারী হোন। কিন্তু এদের বিবেক ও চোখ উভয়ই পর্দাবৃত, চোখে পট্টি বাঁধা আছে যা খোদা ও ইসলামের নামে খোদার বান্দাদের উপর এদের যুলুম করতে প্রবৃত্ত করে। কিন্তু এরা ভুলে যায়, আল্লাহ্‌র বান্দাদের উপর যুলুম-নির্যাতন যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন তারা مَتَى نَصْرُ اللَّهِ (সূরা আল্ বাকারা: ২১৫)-এর ধ্বনি উচ্চকিত করে। অর্থাৎ কখন আল্লাহ্‌র সাহায্য আসবে। আল্লাহ্ তা’লা إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ (সূরা আল্ বাকারা: ২১৫) বলে উত্তর দেন। অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্‌র সাহায্য সন্নিকট। অতএব, আহ্‌মদীদের উপর যে অত্যাচার হচ্ছে তা সর্বত্র তাদেরকে খোদার নৈকট্য দান করছে।

উপমহাদেশ বিভাগের পর দুষ্কৃতিকারী সেসব নামধারি উলামাদের অধিকাংশ পাকিস্তানে আস্তানা গা��ে। আমরা এখানে প্রায়শ জামাতে আহ্‌মদীয়ার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো অঘটনের সংবাদ পাই। সার্বিকভাবে যা ঘটছে তা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, এরা দেশে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে যা করছে তা-তো করছেই উপরন্তু দেশের জন্য দুর্নামও বয়ে আনছে। যারা আজ দেশের শুভাকাক্সক্ষী সেজে বসেছে আর আহ্‌মদীদের বলে,

তোমাদের কাছে কেবল এই পথই খোলা আছে, হয় আহ্‌মদীয়াত পরিত্যাগ করো, বা দেশ থেকে বেরিয়ে যাও, নতুবা মরার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।

আর চরম অন্যায় হলো, এসব কিছু ইসলাম ও রহমাতুল্লিল আলামীনের নামে করা হচ্ছে। অথচ বলা হয়, মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর খাতামীয়তকে অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ধর্মীয় আত্মাভিমানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা এসব করছি। তাদের ভাষ্য মতে, যে দেশ ইসলামের নামে অর্জিত হয়েছে সেখানে তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ধর্মীয় আত্মাভিমান প্রদর্শনের প্রয়োজন রয়েছে। আত্মাভিমান হচ্ছে, খোদার নামে খোদার বান্দাদের হত্যা করো।

প্রথম কথা হচ্ছে, গোটা বিশ্বে মহানবী (সা.)-এর জন্য যে ধর্মীয় আত্মাভিমান আহ্‌মদীরা প্রদর্শন করছে তোমরা এর ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে না। ইসলামের বাণী পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছানোর জন্য আহ্‌মদীরা যে কুরবানী করছে তার লক্ষ নয় বরং কোটি ভাগও এরা করছে না। তেল সম্পদে সমৃদ্ধ বিভিন্ন মুসলমান দেশ এসব মোল্লাদের সহায়তা দিচ্ছে কিন্তু এ সম্পদ ব্যক্তিস্বার্থে তারা ব্যবহার করছে। নিজেদের ভাণ্ডার এদ্বারা সমৃদ্ধ করছে অথবা সন্ত্রাস, নির্যাতন ও বর্বরতার পিছনে সেই সম্পদ ব্যয় করছে। কিন্তু ইসলাম প্রচারের জন্য এদের কোনো উদ্যোগ নেই। আজ পাকিস্তানের স্বত্বাধিকারী হওয়ার দাবীদার এসব মৌলভীরা বলে,

ইসলামের এই দুর্গে কাদিয়ানীরা স্বীয় বিশ্বাস নিয়ে বাস করবে তা আমরা সহ্য করতে পারি না।

তাদের জেনে রাখা দরকার, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্‌মদীরা যে সংগ্রাম করেছে তা সকল ভদ্র ও সজ্জন অ-আহ্‌মদীরাও স্বীকার করেন। যখন এসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা চলছিল তখন তোমরা যারা আজ পাকিস্তানের বড় শুভাকাংক্ষী সেজে বসেছ আর মালিক হবার চেষ্টা করছ, তোমরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভাবধারার বিরোধী ছিলে। মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামাতে আহ্‌মদীয়া কীরূপ চেষ্টা করেছে তা সম্পর্কে তাদেরই কতকের বক্তব্য তুলে ধরছি। কেননা ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসও পালন করা হয়। ঘটনাক্রমে এ বিষয়টিও সামনে এসেছে। ভদ্রমানুষ, যারা সঠিক জ্ঞান রাখেন না তাদের অবগত করার উদ্দেশ্যে আবার মোল্লাদের খপ্পরে পড়ার কারণে পাকিস্তানেরও সঠিক ইতিহাস যারা জানে না, তাদের জ্ঞাতার্থে কতক বুদ্ধিজীবির লেখা থেকে তুলে ধরছি। যাতে তারা জানতে পারে যে, ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য এবং পাকিস্তানের জন্য আহ্‌মদীরা কী করেছে।

একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর সাহেব নিজ পত্রিকা ‘হামদর্দ’ এর ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২৭ সংখ্যায় লিখেছেন:

‘জনাব মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ এবং তাঁর এই সুশৃঙ্খল জামাতের কথা যদি এই ছত্রে উল্লেখ না করি তাহলে অকৃতজ্ঞতা হবে। যারা বিশ্বাসগত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে থেকে সমস্ত মনোযোগ মুসলমানদের কল্যাণে নিবেদিত করেছেন। .....সেসময় দূরে নয় যখন ইসলামের এই সুশৃঙ্খল ফির্‌কার কর্মধারা সাধারণভাবে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর জন্য আর বিশেষভাবে সে সকল ব্যক্তিবর্গের জন্য আলোকবর্তিকা প্রমাণিত হবে যারা নিরাপদ স্থানে বসে বাহ্যত গলা ফাটিয়ে ইসলাম সেবার কথা বলে কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে তাদের দাবী মূল্যহীন।’

(‘হামদর্দ’ পত্রিকা, ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২৭; ‘তা’মীরে তরক্কী পাকিস্তান এবং জামাতে আহ্‌মদীয়া’,পৃ: ৮)

বাইরে তো অনেক বড় বড় দাবী করে বেড়াচ্ছে কিন্তু আসলে তারা যা কিছু বলে বেড়ায় তা অতি নগণ্য এবং তুচ্ছ বিষয়। তাদের জন্য মির্যা বশীর উদ্দীন মাহমুদ আহমদ এবং তাঁর জামাত পথের দিশা বলে বিবেচিত হবে।

এরপর ‘ইনকিলাব’ পত্রিকার মওলানা আব্দুল মজীদ সালেক সাহেব মুসলমানদের একজন প্রখ্যাত নেতা ছিলেন। তিনি লিখেন:

‘জনাব মির্যা বশীর উদ্দীন মাহমুদ আহমদ এই মন্তব্যের মাধ্যমে (মুসলমানদের চলমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি একটি মন্তব্য করেন) মুসলমানদের প্রভূত সেবা করেছেন, এই দায়িত্ব ছিল বড় বড় মুসলমান জামাতের অথচ মির্যা সাহেব তা করলেন।

(‘ইনকিলাব’ পত্রিকা, ১৬ই নভেম্বর ১৯৩০; ‘তা’মীরে তরক্কী পাকিস্তান এবং জামাতে আহ্‌মদীয়া’, পৃ: ৯)

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবাই জানে যে, কায়েদে আযমই আসল ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এমন একটি সময় আসে যখন তিনি নিরাশ হয়ে ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ড চলে আসেন। তিনি স্বয়ং লিখেছেন,

‘আমার এমন মনে হচ্ছিল যে, আমি ভারতের কোনো সাহায্য করতে পারবো না। হিন্দুদের চিন্তাধারায়ও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবো না আর মুসলমানদের চোখ খোলাও সম্ভব হবে না। অবশেষে আমি লন্ডনে বসবাস করাই মনস্থির করি।’

(‘কায়েদ এ আযম আওর উনকা আহদ’- রঈস আহমদ যাফরী’র, পৃ: ১৯২; ‘তা’মীরে তরক্কী পাকিস্তান এবং জামাতে আহ্‌মদীয়া’, পৃ: ৯)

এহেন পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগের মুসলমানরা চরম ধাক্কা খায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় শুভাকাংক্ষী ছিল জামাতে আহ্‌মদীয়া এবং হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)। তিনি এ লক্ষ্যে অনেক চেষ্টা করেন। তখন এখানে লন্ডনে ইমাম ছিলেন মওলানা আব্দুর রহীম দর্দ সাহেব। তার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার জন্য কায়েদে আযমের উপর চাপ দেন খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)। অনেক চেষ্টার পর দর্দ সাহেব তাকে বুঝাতে সক্ষম হন। স্বয়ং কায়েদে আযম বলেছেন,

‘ইমাম সাহেবের প্রেরণা ও জোরালো নসিহতের পর আমার জন্য তা প্রত্যাখ্যানের আর কোনো উপায় ছিল না’।

একজন অ-আহ্‌মদী ঐতিহাসিক ও সাংবাদিক জনাব মীম শীন সাহেবও লিখেছেন,

‘জনাব লিয়াকত আলী খান এবং লন্ডনের ইমাম মওলানা আব্দুর রহীম দর্দ সাহেবের একান্ত প্রচেষ্টাই জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্‌কে স্বীয় সংকল্প পরিবর্তন এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে জনাব জিন্নাহ্ ১৯৩৪ সনে ভারতে ফিরে আসেন এবং কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।’

(পাকিস্তান টাইমস: ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১- সাপ্লিমেন্ট: ১১ নম্বর: ১; ‘তা’মীরে তরক্কী পাকিস্তান এবং জামাতে আহ্‌মদীয়া’, পৃ: ১০)

১৯৫৩ সনে যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল তার প্রধান ছিলেন বিচারপতি মুনির। তিনি লিখেছেন:

‘আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ এবং ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করা হয়েছে যে, সীমানা কমিশনের সিদ্ধান্তে গুরুদাসপুর জেলাকে ভারতভূক্ত করার ক্ষেত্রে আহ্‌মদীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। চৌধুরী মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান বিশেষ ধরনের যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যাকে কায়েদে আযম মুসলিম লীগের পক্ষে কেস উপস্থাপনের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এই আদালতের প্রেসিডেন্ট, যিনি কমিশনের সদস্যও ছিলেন, গুরদাসপুরের মামলায় চৌধুরী যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, এই বীরত্বপূর্ণ কীর্তির জন্য তাঁর প্রতি কৃতার্থ এবং কৃতজ্ঞ হওয়া আবশ্যক মনে করে। সত্যিকার অর্থে সীমানা কমিশন সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্রে এই সত্য স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় আর যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে জানতে আগ্রহী সে সানন্দে এই রেকর্ড ঘেঁটে দেখতে পারে। চৌধুরী ম���হাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান মুসলমানদের নিঃস্বার্থ সেবা করেছেন। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন গোষ্ঠি তদন্ত মুসাবেদায় যেভাবে তার উল্লেখ করেছে তা বড়ই লজ্জাষ্কর অকৃতজ্ঞতার প্রমাণ।’

(রিপোর্ট তাহকিকাতী আদালত আল্মা’রুফ মুনীর ইনকোয়ারী রিপোর্ট, পৃ: ৩০৫, নব সংস্করণ)

চৌধুরী জাফরুল্লাহ্ খান (রা.) যে সেবা করেছেন আর এর বিপরীতে অ-আহ্‌মদীরা আদালতে যে বিবৃতি প্রদান করেছে তা চরম লজ্জাজনক।

এই স্বাধীন দেশ যার নাম পাকিস্তান রাখা হয়েছে; এ জন্য হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.) এবং তাঁর নির্দেশে জামাতের সদস্যরা যে সংগ্রাম করেছে তার দু’একটি দৃষ্টান্ত আমি আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরেছি। ইতিহাস চিরকাল এ সাক্ষ্য বহন করবে যে, আহ্‌মদীয়া খিলাফতই জামাতের সদস্যদের আধ্যাত্মিক, জাগতিক এবং নৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মুসলিম উম্মতের জন্যও সময়ের চাহিদা মোতাবেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তা কাশ্মীরীদের স্বাধীনতা সংগ্রাম হোক বা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আন্দোলন হোক অথবা উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমানদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ই হোক না কেন; জামাতে আহ্‌মদীয়ার ইতিহাস এ কথার সাক্ষী যে, সর্বদা মুসলমানদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জামাতে আহ্‌মদীয়া প্রথম সারিতে ছিল। এর বিপরীতে মৌলভীরা কী ভূমিকা রেখেছে? এরা দাবি করে যে, পাকিস্তান আমাদের! আমাদের চেষ্টাতেই পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। এদের বিবৃতি পড়ুন। এটিও তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট। এতে আহ্‌রারী আন্দোলনের নেতা আতাউল্লাহ্ শাহ্ বোখারীর বরাতে লেখা হয়েছে:

‘এখন পর্যন্ত কোনো মা এমন সন্তানের জন্ম দেয় নি যে পাকিস্তানের ‘প’ও বানাতে পারে।’

তারপর এই রিপোর্টেই লেখা হয়েছে।

ফাসাদ বা বিশৃংঙ্খলার সময় আহ্‌রারী নেতা, আমীরে শরিয়ত সৈয়দ আতাউল্লাহ্ শাহ্ বোখারী লাহোরে যেসব বক্তৃতা করেন তার একটিতে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এক বাজারী নারী (বেশ্যা)’, আহ্‌রারীরা বাধ্য হয়ে একে বরণ করেছে। ইন্নালিল্লাহ্। (রিপোর্ট তাহকিকাতী আদালত, পৃ: ৩৯৮, নব সংস্করণ)

আবার রিপোর্টে লেখা হয়, এটি স্বয়ং শাহ্ সাহেবের বিবৃতি,

‘যারা মুসলিম লীগকে ভোট দিবে তারা শূকর এবং শূকর ভক্ষণকারী।’

(বয়ান আতাউল্লাহ্ শাহ্ বোখারী, ‘চমনিস্তান’- মওলানা জাফর আলী খান, পৃষ্ঠা: ১৬৫, ১৯৪৪ সনে প্রকাশিত; ‘তা’মীরে তরক্কী পাকিস্তান’- প্রফেসর নসরুল্লাহ্ রাজা, পৃষ্ঠা: ১৩)

এরপর তদন্ত কমিশন রিপোর্টে লেখা হয়েছে:

‘১৯৪০ সনের ৩ মার্চ দিল্লিতে আহ্‌রারী আন্দোলনের কার্যকরী পরিষদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় একটি রেজুলেশন পাশ করা হয়, যাতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ঘৃণ্য আখ্যা দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কতক আহ্‌রারী নেতা তাদের বক্তব্যে পাকিস্তানকে ‘পলিদিস্তান’ (নোংরাদেশ) বলেও আখ্যায়িত করেছে।’ (রিপোর্ট তাহকিকাতী আদালত, পৃ: ২৮, নব সংস্করণ)

তদন্ত কমিশনের আরেকটি রিপোর্টে লেখা হয়েছে:

‘পাকিস্তান সম্পর্কে মুসলিম লীগের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ্য বিরোধী ছিল জামাত (জামাতে ইসলামী)। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে একে ‘নাপাকিস্তান’ বলে স্মরণ করা হয় আর তখন থেকেই এই জামাত বর্তমান সরকার এবং এর পরিচালনাকারীদের বিরোধিতা করে আসছে। জামাতের যেসব লেখা আমাদের সম্মুখে পেশ করা হয়েছে তার মধ্যে একটিও এমন নেই যাতে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে দূরতম কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। বরং এর বিপরীতে এসব লেখায় বহু সম্ভাভ্য ধারণা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে যা শতভাগ সে অবস্থার বিরোধী, যে পরিস্থিতির মাঝে পাকিস্তান জন্ম নিয়েছে এবং আজও পাকিস্তান যে পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত।’ (রিপোর্ট তাহকিকাতী আদালত, পৃ: ৩৭৮, নব সংস্করণ)

স্বয়ং মওদুদী সাহেবের একটি বিবৃতি হচ্ছে:

‘যারা এই ধারণা রাখে যে, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল যদি পৃথক হয়ে যায় আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে এখানে ঐশী ব্যবস্থাপনা এসে যাবে, এটি তাদের ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে যা অর্জিত হবে তা কেবলমাত্র মুসলমানদের কাফির সরকার হবে। এর নাম ঐশী ব্যবস্থাপনা আখ্যায়িত করা সেই পবিত্র নামকে অসম্মান করার নামান্তর।’

(সিয়াসী কাশমাকাশ, পৃ: ১১৭, ৩য় খণ্ড- ১ম সংস্করণ; জামাতে ইসলামী কা মাযী আওর হাল, পৃ: ২৯-৩২)

এখন এই কাফিররূপী সরকারের ক্ষমতা করায়ত্ত করার যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চলছে তা সবারই জানা। এখন যারা নিজেদেরকে পাকিস্তানের হর্তা-কর্তা মনে করে পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল তা এসব বিবৃতি এবং বিচারপতি মুনীরের ভাষ্য হতে স্পষ্ট। রাজনৈতিক যে সরকারই ক্ষমতায় আসে তারা এই মোল্লাদেরকে শক্তিশালী মনে করে তাদের সাথে গাটছড়া বাঁধার চেষ্টা করে। আর মোল্লাদের এজেন্ডায় (পরিকল্পনায়) প্রথম কথা হলো, আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব করো। ১৯৫৩ সনেও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সেসময় কিছু না কিছু ন্যায়বান মানুষ ছিল বলে মৌলভীদের আকাক্সক্ষা ততোটা পূর্ণ হয় নি যতোটা তারা চেয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সনে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা ইসলামের নামে মৌলভীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে আহ্‌মদীদের উপর নির্যাতনের যে কাহিনী রচনা করেছে এবং যে ধরনের যুলুম ও বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে, ভবিষ্যতে যখন কোনো ন্যায়পরায়ণ ঐতিহাসিক আসবে এবং পাকিস্তানের ইতিহাস রচনা করবে তখন এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে এটি লিপিবদ্ধ হবে। ১৯৭৪ এ সংসদে যে আইন পাশ করা হয় ১৯৮৪ সনে একজন স্বৈরসাশক সে আইনে পুনঃসংশোধনী এনে তাকে কঠোরতর করে যাতে আহ্‌মদীয়াতকে ধরা হতে বিলুপ্ত করা যায়, এবং অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে এই দাবি করে যে,

আমি আহ্‌মদীয়াতরূপী এই ক্যান্সারকে শেষ করে দিবো।

ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে? আহ্‌মদীয়াত ক্রমোন্নতি করে চলেছে অথচ তারা কোথায় গেছে তা জানা নেই, বা আজও আল্লাহ্ তা’লার শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। জামাতে আহ্‌মদীয়ার উপর অনবরত এসব যুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও আহ্‌মদীয়া খিলাফতের কল্যাণে, একহাতে ঐকবদ্ধ হবার কারণে আল্লাহ্ তা’লা আপন সাহায্যে জামাতকে সেসব বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। ঐ পরিস্থিতিতে জামাত ধৈর্যের যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে আর আজও দেখাচ্ছে তা খিলাফতের সাথে সংশ্লিষ্টতার কল্যাণে। এটি এ কথার প্রমাণ যে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে যারা বয়’আতে অঙ্গীকারাবদ্ধ তারা স্বীয় বয়’আতের অঙ্গীকার পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে এবং করছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সরকারগুলোর সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত যে, যদি পাকিস্তানের অস্তিত্ব তাদের কাছে প্রিয় হয় যার জন্য প্রত্যেক আহ্‌মদী এবং ভদ্র নাগরিক সদা সচেষ্ট থাকে এবং দোয়াও করে, তাহলে ধর্মের নামে ঘৃণার দেয়াল ওঠানোর পরিবর্তে সেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করুন যা হযরত কায়েদে আযম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন; ধর্মের নামে অন্যের রক্ত নিয়ে হলি খেলা নয়। ১৯৪৭ সনে আইন পরিষদীয় সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণে কায়েদে আযম কী বলেছিলেন তা দেখুন, আর ১৯৭৪-এ পাকিস্তানের সংসদ কী সিদ্ধান্ত করেছিল তাও দেখুন। কায়েদে আযম বলেছিলেন,

‘যদি পাকিস্তানরূপী এই মহান দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হয় তাহলে আমাদের পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রতি; বিশেষভাবে সর্বসাধারণ এবং দরিদ্র মানবগোষ্ঠির প্রতি। যদি আপনারা সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের প্রেরণা নিয়ে কাজ করেন তাহলে অতি অল্প সময়ের ম���্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সংখ্যালঘিষ্ঠতা, আঞ্চলিকতা, দলাদলি ও অন্যান্য একপেশে মনোভাব দূর হয়ে যাবে।’

তিনি আরো বলেন,

‘আমাদের দেশটি বৈষম্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। এখানে এক ফির্‌কার সাথে অপর ফির্‌কার কোনো পার্থক্য থাকবে না। এখানে বংশ ও ধর্মের ভিত্তিতে কোনোরূপ বিভেদ থাকবে না। আমরা এই মৌলনীতির আলোকে কাজ আরম্ভ করছি, আমরা এক দেশের নাগরিক এবং এখানে সবার সম-অধিকার থাকবে।

আপনি স্বাধীন, আপনি আপনার মন্দিরে যাওয়ার বেলায় স্বাধীন। আপনি আপনার মসজিদে যাওয়া অথবা পাকিস্তানের সীমারেখার ভেতর যে কোনো উপাসনালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীন। যে কোনো ধর্ম, বিশ্বাস অথবা জাতির সাথেই আপনি সম্পর্ক রাখুন না কেন তা নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো মাথা ব্যথা নেই।’

কায়েদে আযম বলছেন,

‘আমার মতে, এই বিষয়টি আমাদেরকে লক্ষ্য হিসেবে দৃষ্টিতে রাখতে হবে এবং আপনি দেখবেন সময়ের সাথে সাথে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না আর মুসলমান মুসলমান থাকবে না; এটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে নয় বরং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে বলছি। কেননা, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস রয়েছে। এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে বলছি।’

(আফকারে কায়েদ এ আযম (রহ.), পৃ: ৩৫৮, মাহমুদ আছেম কর্তৃক প্রকাশিত)

কায়েদে আযম এই ধারণা উপস্থাপন করেছেন অথচ ১৯৭৪-এর সংসদ সম্পূর্ণভাবে এর বিপরীত কাজ করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এবং সাংসদদের এই ছিল কাজ ও দায়িত্ব। যেভাবে আমি বলেছি, কারো ধর্ম, বিশ্বাস এবং ইবাদতের রীতি-পদ্ধতি নিরূপণ করা কোনো সংসদের কাজ নয়। যেদিন পাকিস্তান সরকার কায়েদে আযম নির্দেশিত মৌলনীতি অনুধাবন করে কাজ করবে সেদিন পাকিস্তানের উন্নতি ও অগ্রগতি নতুন পথের দিশা পাবে, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। ফির্‌কাবাজী এবং জাতিগত ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙ্গে যাবে। তখনই পাকিস্তানীরা কায়েদে আযমের সমৃদ্ধ পাকিস্তান দেখবে। এখন রাজনীতিবিদদেরকে নিজেদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কারো ধর্ম বিশ্বাসের খুঁটিনাটি সম্পর্কে নিজের মত চাপানো বা কারো ধর্ম নিরূপণ করা এবং নিজেদের বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়ার অনুমতি ইসলামও কাউকে প্রদান করে না আর সেই মহান ব্যক্তি যিনি মুসলমানদেরকে একটি পৃথক দেশ বানিয়ে দিয়েছেন তিনিও এই অনুমতি দেননি। একজন নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিককে প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা আবশ্যক। ভোটের অধিকার, চাকুরির অধিকার, ধর্ম ও বিশ্বাসের অধিকার, এগুলো তার প্রাপ্য-তাই তাকে দেয়া হোক। আইন কার্যকর করার যতোটা সম্পর্ক; তা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত এবং তা প্রয়োগ করা উচিত। সম-অধিকার পেলেই দেশে শান্তির পরিবেশ ফিরে আসবে। শাসকদের উচিত এর থেকে শিক্ষা নেয়া, ১৯৭৪-এ যে সিদ্ধান্ত হয় এরপর ১৯৮৪-তে এতে আরো পরিবর্তন এনে আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়, যে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় এরপর থেকেই মূলত দেশ অধঃপতনের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে, কোনো উন্নতি দেখা যায় না। এক পা এগোলে তিন পা পিছিয়ে যায়। সব ধরনের যুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও দেশের মঙ্গলের জন্য আহ্‌মদীদের চেষ্টা ও দোয়া করা উচিত এবং তারা করবে। কিন্তু আহ্‌মদীদের ক্ষতি যারা করছে তাদের যেন স্মরণ থাকে, খোদার নিয়তি একদিন অবশ্যই তোমাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবে। প্রতিনিয়ত ইসলাম ও আইনের মারপ্যাচে আহ্‌মদীদের যে শহীদ করা হচ্ছে, এই রক্ত কখনও বৃথা যাবে না। আল্লাহ্ তা’লার এ উক্তি সর্বদা স্মরণ রাখো! তিনি বলেন,

وَمَنْ يَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهٗ جَهَـنَّمُ خَالِدًا فِيْهَا وَغَضِبَ اللّٰهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهٗ وَاَعَدَّ لَهٗ عَذَابًا عَظِيْمًا‏

অর্থ: এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মু’মিনকে হত্যা করলে তার প্রতিফল হবে জাহান্নাম, যাতে সে বসবাস করতে থাকবে। এবং আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রোধ বর্ষণ করবেন এবং তিনি তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহা আযাব প্রস্তুত করবেন।’ (সূরা আন্ নিসা: ৯৪)

সুতরাং আল্লাহ্‌র শাস্তিকে ভয় করো। আর এরা বলে আহ্‌মদীরা মু’মিন নয়। অথচ ঈমান সম্পর্কে তো হাদিসে এসেছে যে, ঈমানের সর্বোত্তম অংশ হচ্ছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” বলা; পুরো কলেমাও এতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ইমানের সর্বোত্তম অংশ হচ্ছে-কেবলমাত্র “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” বলা। আবার সেই ঘটনার কথা শুনুন,

একজন সাহাবী যুদ্ধে শত্রুকে পরাভূত করেন; সে শত্রু কলেমা পাঠ করলো কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও সাহাবী তাকে হত্যা করলেন। যখন এ সংবাদটি মহানবী (সা.)-এর নিকট পৌঁছালো, তিনি (সা.) তাকে কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তার বুক চিরে দেখেছিলে যে সে ভয়ে কলেমা পাঠ করেছে, নাকি আন্তরিকভাবে পড়েছে?’ সাহাবী বলেন, মহানবী (সা.) যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, তা দেখে ভাবছিলাম, হায়! আমি আজকের পূর্বে মুসলমান না হলেই ভাল হতো।

এতদ্সত্ত্বেও এরা নিজস্ব সংজ্ঞা মোতাবেক কলেমায় বিশ্বাসীদের হত্যা ও শহীদ করা অব্যাহত রেখেছে।

সম্প্রতী আবার অত্যন্ত পাশবিকভাবে এক যুগল যুবক-যুবতী স্বামী-স্ত্রীকে মুলতানে হত্যা করা হয়েছে, শহীদ করা হয়েছে। তাদের কেবল এটাই দোষ ছিল যে, তারা যুগ ইমামকে গ্রহণ করেছেন। উভয়েই ডাক্তার ছিলেন এবং সর্বজন প্রিয় ডাক্তার ছিলেন। তাদের একজন হলেন ডাক্তার সিরাজ, বয়স ছিল ৩৭ বৎসর। তাঁর স্ত্রী ডা. নওরীন সিরাজ, যার বয়স ছিল ২৮ বৎসর। আমার মনে হয়, মহিলা শহীদের মধ্যে তাঁর বয়স ছিল সবচেয়ে কম। নূন্যতম মানবতাবোধ যা এক মানবহৃদয়ে থেকে থাকে তাও এদের মধ্যে নেই। যারা মানুষের জন্য কল্যাণকর সত্তা, মানুষের সেবা করেন, মানবসেবা করেন এবং তোমাদের রোগীদের সেবা করছেন তাঁদেরও এমন পাশবিকভাবে হত্যা করলে? এ সকল বিরোধীদের স্মরণ থাকে যে, আহ্‌মদীরা মহান উদ্দেশ্যে শহীদ হচ্ছেন। মহানবী (সা.) এর নিষ্ঠাবান দাসের আগমনে যে সত্য প্রকাশ পেয়েছে তা অস্বীকারের কারণে দেশে যে বিশৃংখলা ছড়াচ্ছে এবং নিষ্পাপ মানুষকে বিনা কারণে হত্যা করা হচ্ছে, এটাও প্রকৃতির প্রতিশোধ। তোমাদের ধারণা মোতাবেক আমরা মুসলমান নই। কিন্তু এরা যা করেছে তার জের হিসেবে এক মুসলমান অপর মুসলমানকে হত্যা করছে, এর ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাদের সাথে যে কী ব্যবহার করবেন তা আল্লাহ্ই ভাল জানেন। আমি এ সম্পর্কিত আয়াতও উল্লেখ করেছি। এদের ভেতর খোদাভীতির লেশমাত্র নেই। আল্লাহ্ তা’লা তাদের প্রতি করুণা করুন। বিগত দিনে প্রথমে সরকার ও সেনাবাহিনীর সাথে তাদের যুদ্ধ চলছিল। সরকার এর পর তাদের সামনে নতি স্বীকার করে এবং সওয়াতে শরিয়ত আইন জারি করা হয়। শরিয়ত ভিত্তিক ব্যবস্থা ও আদালত গঠিত হয়। তারপর সেখানকার মোল্লাদের হোতা ঘোষণা করলেন যে, সরকারি জজ যেন এখানে আসার চেষ্টা না করে। অতএব সরকারের এটা স্বরণ রাখা উচিত, এই যে ধারা সূচিত হয়েছে, তা এখানেই শেষ হবার নয়। এটি সারাদেশকে আরো চরম অশান্তির দিকে ঠেলে দিবে। বিশ্বে পাকিস্তানের যা চিত্র তাহলো গোটা দেশকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি বিবৃতি দেন যে, সরকার যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তবে সামগ্রিকভাবে দেশটাকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আখ্যায়িত করা হবে।

সেই মোল্লা যে পাকিস্তানকে ‘পলিদিস্তান’ বলতো, স্বীয় ঘৃণ্য প্রচেষ্টায় সফল হতে দেখা যাচ্ছে। তাদের বর্তমান চেষ্টা এটাই। আল্লাহ্ তা’লা করুণা করুন, বাহ্যত এদের হাতে যদি দেশটা থাকে তবে পাকিস্তানের নামটাও এরা থাকতে দেবে কিনা সন্দেহ আছে। আহ্‌মদীয়া জামাতের খলীফারা সব সময়ই সরকারকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করে এসেছেন যে,

এ সকল মোল্লাদের ব��যাপারে সাবধান থেকো। একবার যদি এদের কাঁধে বসাও তাহলে এরা আর কাঁধ থেকে নামবে না।

কিন্তু তারা অনুধাবন করতে পারছে না। একদিকে এ সকল রাজনীতিবিদ নিজেরা দেশদরদী ও দক্ষ রাজনীতিবিদ হওয়ার দাবি করে আর অপরদিকে এ ভয়ানক বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করতে পারছে না যে মোল্লারা পাকিস্তানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ কারণে তাদের সাথে যে কোনো ধরনের জোট গঠনও দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। আমরা কেবল দোয়া করতে পারি যে, আল্লাহ্ তা’লা এ দেশকে রক্ষা করুন। মোল্লাদের প্রচেষ্টা ও দুরভিসন্ধি দেখে মনে হয় যে তারা এই শাহাদতসমূহ দ্বারা আহ্‌মদীয়াতের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারবে বলে ভাবছে। কিন্তু এটা তাদের অলীক ধারণা। যেমন কিনা আমি বলেছি আহ্‌মদীয়াত তো প্রত্যেক পদক্ষেপে প্রত্যেক বিরোধিতার পর অগ্রগতির ধারা বজায় রেখেছে। যে নৌকা খোদা তা’লা নিজেই তৈরি করেছেন তার নিরাপত্তা বিধানও তিনি নিজেই করবেন এবং এর অগ্রযাত্রা ও ইনশাআল্লাহ্ তা’লা অব্যাহত থাকবে। হ্যাঁ, দু’একটি শাহাদত বা ক্ষতির যতোটুকু সম্পর্ক আছে সে সম্পর্কে যেমন কিনা আমি বলেছি, পরীক্ষা তো এসেই থাকে। যারা শাহাদত বরণ করেন তারা নিজেরা আল্লাহ্ তা’লার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক চিরস্থায়ী জীবন লাভ করে আল্লাহ্ তা’লার ভালবাসা অর্জনকারী হচ্ছেন। যাহোক, আহ্‌মদীরাও বিশেষ করে পাকিস্তানী আহ্‌মদীরা দোয়ার প্রতি পূর্ণ মনোনিবেশ করুন। কেননা বর্তমানে এ দেশ যে অগ্নিকুণ্ডের কিনারায় দাড়িয়ে আছে সেখান থেকে আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আহ্‌মদীদের দোয়াই একে ধ্বংস হতে রক্ষা করতে পারে। এদেশ গঠনেও জামাতে আহ্‌মদীয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং এদেশ রক্ষায়ও ইনশাআল্লাহ্ তা’লা জামাতের দোয়ার ভূমিকা রাখবে। আল্লাহ্ তা’লা এর তৌফিক দান করুন। যে শহীদ ডাক্তারের আমি উল্লেখ করেছিলাম, এখন তার সম্পর্কে কিছু বিবরণী তুলে ধরছি। ঘটনাটি এরূপ যে, ১৪ মার্চ বেলা ৩.১৫ মিনিটে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি নিজ ঘরে ফিরেন। সেখানে হয়তো পূর্ব থেকেই কেউ আত্মগোপন করে বসেছিল, যে উভয়কে (স্বামী-স্ত্রী) অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। উভয়েই আল্লাহ্ তা’লার ফযলে মুসী ছিলেন। ডাক্তার সিরাজ বাজোয়া সাহেবের মৃতদেহ তাঁর শয়নকক্ষে ছিল, হাত পেছনে বাঁধা, চোখে পট্টি ও মুখে তুলো গুঁজে দেয়া ছিল এবং ঘাড়ে দড়ির দাগ ছিল, অর্থাৎ ফাঁসি বাধা ছিল এবং কয়েকটি দড়ি মাথার পাশে পড়ে ছিল। বিকেলে এসে তাঁর গৃহপরিচারিকা সর্বপ্রথম তাঁকে দেখতে পায়। সে বলে যে তাঁর লাশ ফ্যানের সাথে ঝুলছিল এবং একইভাবে তাঁর স্ত্রী ড্রয়িং রুমে বাঁধা ও কার্পেটে মোড়ানো অবস্থায় ছিলেন আর মুখে কাপড় গোঁজা ছিল। ডাক্তার সিরাজ সাহেব মুলতানের ওয়াপদা হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ছিলেন, এবং ডাক্তার নওরীন ছিলেন শিশু হাসপাতালে। উভয়েই আহ্‌মদী, অ-আহ্‌মদী সকলের প্রিয় ডাক্তার ছিলেন আর অত্যন্ত নম্র স্বভাব ও সহানুভূতিশীল হিসেবে তাদের বিশেষ পরিচিতি ছিল। কিছুকাল তিনি ফযলে ওমর হাসপাতালে কাজ করেন। আর এ কলোনির চারিদিক দেয়াল ঘেরা আর দেয়ালের উপর কাঁটাতার লাগানো ছিল আর গেটেও নিরাপত্তা প্রহরী ছিল। এতদ্সত্ত্বেও ভিতরে গিয়ে এ ঘটনা ঘটানোর অর্থ হচ্ছে নিশ্চয় কোনো ষড়যন্ত্র ছিল। কেননা নিরাপত্তা চেক করা ছাড়া কলোনির ভিতরে কেউ যেতেই পারে না। মনে হয় তাতে এরা সবাই জড়িত রয়েছে। বড় সুশিক্ষিত ও যোগ্য মানুষ ছিলেন। ১৯৯৮ সালে কোনো রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছেন। তাদের কোনো সন্তানাদী ছিল না। তারা বয়সে একবারেই নবীন ছিলেন। যেমন কিনা বলেছি, যথাক্রমে ৩৭ ও ২৮ বৎসর ছিল তাদের বয়স। কিছুকাল পূর্বেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। অতএব, এখন আমি নামাযের পর তাদের গায়েবানা জানাযা পড়াবো এবং এই গায়েবানা জানাযার সাথে আরো কয়েকটি জানাযা রয়েছে। একজন ডাক্তার আসলাম জাহাঙ্গীর সাহেব যিনি হারীপুর হাজারা জেলার আমীর ছিলেন। তিনি ১৫ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তিনি কিছুকাল নুসরত জাঁহার অধীনে সিয়েরালিয়নে কাজ করেন। তিনি দীর্ঘকাল আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কয়েকমাস পূর্বে তাঁর উপরও জীবনঘাতী আক্রমন হয়, আর ছুরিকাঘাত করা হয়। বলে, “তুমি কাদিয়ানী, তোমাকে হত্যার জন্য এসেছি”। যাহোক, লোকজন জড়ো হয়ে যাবার কারণে তিনি সে-যাত্রা প্রাণে রক্ষা পান; কিন্তু আহত হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। আঘাতের কারণেই দুর্বলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে বলে মনে হয়, আর অসুস্থও ছিলেন। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মুসী ছিলেন। মরহুমকে বেহেশতী মকবেরায় দাফন করা হয়। একইভাবে আরেকটি জানাযা হচ্ছে মিয়া শরীফ আহমদ সাহেবের স্ত্রী সৈয়দা নাসেরা বেগম সাহেবার। তিনি সৈয়দ আজিজুলল্লাহ্ শাহ সাহেবের মেয়ে ছিলেন এবং সৈয়দা মেহের আপা সাহেবার বোন ও খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.)-এর মামাতো বোন ছিলেন। খুবই মুখলেস নারী ছিলেন। এখন গায়েবানা জানাযায় তাঁকেও অন্তর্ভূক্ত করা হবে। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমদের পদমর্যাদা উন্নীত করুন। তাদেরকে স্বীয় নৈকট্যদান করুন এবং সন্তান সন্তুতিদেরকে তাঁদের নেক আদর্শ ধরে রাখার তৌফিক দিন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে