In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

জামা’তের প্রতি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর হেদায়েতপুর্ণ উপদেশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৬ই মার্চ, ২০০৯ইং

‘হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর লেখনীর আলোকে জামাত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নসীহত’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হযরত আকদাস মসীহ্ মওউদ (আ.) বিভিন্ন সময় জামাতকে যে নসীহত করেছেন এতে তিনি জামাত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন আর পাশাপাশি জামাতের সদস্যদের দায়িত্বের প্রতিও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এরপর এসব দায়িত্ব পালন এবং এই উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে কৃত চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে জামাতের উপর আল্লাহ্ তা’লা কি পরিমান ফযল বর্ষণ করবেন তার প্রতিশ্রুতিও আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে ও তাঁর জামাতকে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা এই জামাতকে কত উন্নতি দিবেন তাও তাঁকে জানিয়েছেন। এর সূত্রে এখন আমি আপনাদের সম্মুখে কিছু কথা তুলে ধরবো, যাতে আমাদের দায়িত্বের প্রতি আমরা সচেতন থাকি এবং এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমরা আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্য এবং সন্তুষ্টি অর্জনকারী হতে পারি। সেসব কল্যাণের উত্তরাধিকারী হতে পারি যা জামাতের সাথে যুক্ত থাকার ফলে আমরা লাভ করবো।

জামাত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

এই যুগও আধ্যাত্মিক যুদ্ধের যুগ, শয়তানের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে। শয়তান স্বীয় প্রতারণা এবং পুরো শক্তি দিয়ে ইসলামের দুর্গের উপর আক্রমণ করছে এবং সে ইসলামকে পরাস্ত করতে চাইছে। কিন্তু খোদা তা’লা এখন শয়তানের সর্বশেষ যুদ্ধে তাকে চিরকালের জন্য পরাস্ত করার নিমিত্তে এই জামাতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তিনি (আ.) বলেন,

সৌভাগ্যবান তিনি যিনি একে চিনতে পারেন বা সনাক্ত করেন।

আমরা আল্লাহ্ তা’লার প্রতি কৃতজ্ঞ, কেননা তিনি তাঁর অপার অনুগ্রহে আমাদেরকে এই জামাতে অন্তর্ভুক্ত হবার তৌফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্য হতে অনেককে তাদের পূর্বপুরুষের পুণ্যের কল্যাণে এই জামাতকে চেনার তৌফিক দিয়েছেন এবং আমরা আহ্‌মদী পরিবারে জন্ম নিয়েছি। আবার অনেককে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং বয়’আত করে এই জামাতে অন্তর্ভুক্ত হবার তৌফিক দিয়েছেন। এই জামাত আজ পর্যন্ত ক্রমবর্ধনশীল আর বাড়তেই থাকবে, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। আমরা যেন সেই বিশেষ দলভুক্ত হই যারা শয়তানের বিরুদ্ধে ইসলামের সর্বশেষ যুদ্ধে জয়ী হয়ে আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনকারী হয়েছে। একারণেই আজ আমাদের মধ্য হতে অনেককে বিভিন্ন দেশে কঠিন পরিস্থিতি ও বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়, কেননা আমরা এ যুগের ইমামকে মেনেছি। কিন্তু একটি মহান উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের এই সামান্য ত্যাগ কোনই মূল্য রাখে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদেরকে সর্বদা এসব পরীক্ষা ও বিপদাপদ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। যা তাঁর অগণিত রচনায় আজও আমাদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। বিপদাপদ আসবে, তোমাদের পরীক্ষা করা হবে এবং এর পরিণতি সম্পর্কে আমাদেরকে তিনি সুসংবাদও প্রদান করেছেন। তিনি (আ.) বলেন,

এ সময় আমাকে যারা মেনেছেন তাদেরকে বাহ্যত নিজ প্রবৃত্তির সাথে চরম যুদ্ধ করতে হচ্ছে। অনেক সময় তার ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সে ছিন্ন হতে দেখবে। তার পার্থিব ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে বাঁধা বা অন্তরায় সৃষ্টি করা হবে, তাকে গালি-গালাজ শুনতে হবে, তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করা হবে। কিন্তু তিনি এসব কিছুর বিনিময় বা প্রতিদান আল্লাহ্‌র কাছ থেকে পাবেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যে কথা বলে গেছেন বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশে তা আমরা হুবহু পূর্ণ হতে দেখছি। আর আজও যেসব আহ্‌মদী কুরবানী করছেন নিশ্চিতরূপে তারা আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে পুরস্কার বা উত্তম প্রতিদান পাবেন। বর্তমানে বিশেষভাবে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তানের পর ভারতেও অ-আহ্‌মদীরা নবাগত আহ্‌মদীদের উপর চরম যুলুম-নির্যাতন করছে। বিশেষভাবে ভারতে এমনটি হচ্ছে। পাকিস্তানেও নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর আহ্‌মদীদের সাথেকৃত সর্ব প্রকার যুলুম-নির্যাতনকে সেখানে সওয়াবের কারণ মনে করা হচ্ছে। মৌলভীদেরকে সরকার প্রকাশ্য স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছে, এদের ষড়যন্ত্র এবং নির্যাতনের নীলনকশা চরম ভয়াবহ। এমনিতেই বর্তমানে দেশে কোন আইন নেই, বেআইনি যুগ চলছে। নামমাত্র যে আইন আছে তাও আহ্‌মদীদের পক্ষে কোন প্রকার সাহায্যে আসে না। এটিও আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপা, যখনই এরা জামাতের বিরুদ্ধে চরম কোন ষড়যন্ত্র আঁটে তখন খোদা তা’লা তাদের ষড়যন্ত্র তাদের উপরই উল্টে দেন। অর্থাৎ এটি তাদের জন্য বুমেরাং হয়। গত কয়েক বছর যাবৎ আমরা এমনই ঘটতে দেখছি। বর্তমান দিনগুলোতেও বাহ্যত এটিই পরিদৃষ্ট হচ্ছিল, জামাতের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র আঁটতে যাচ্ছিল কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা দেশের মধ্যে এমন হুলস্থুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন যে তারা স্বয়ং এখন বিপদে পড়েছে। অতএব যেখানেই আহ্‌মদীরা নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন, আপনার স্মরণ রাখুন এটি শয়তানের সাথে চুড়ান্ত যুদ্ধ হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আপনারা সেই বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন যা এ যুগের ইমাম গঠন করেছেন। তাই নিজ ঈমানকে দৃঢ় করে আল্লাহ্ তা’লার কাছে দৃঢ় পদক্ষেপ এবং অবিচলতা কামনা করত সর্বদা এবং প্রতি মুহূর্তে ধৈর্য এবং বীরত্ব প্রদর্শন করুন। আল্লাহ্ তা’লার সমীপে অধিক বিনত হোন। চুড়ান্ত বিজয় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতই লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। যেভাবে তিনি (আ.) বলেছেন, এই শয়তানী এবং বিদ্রোহী শক্তিকে পরাভূত করার জন্য আল্লাহ্ তা’লা এই জামাত প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে আর তা হলো, বহি:শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য আভ্যন্তরীণ শত্রু এবং শয়তানকে দমন করতে হবে। কেননা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে যুক্ত থাকার ফলেই আমাদের বিজয় বা সফলতা আসবে, বাহ্যিক কোন উপকরণ দ্বারা নয়, বরং দোয়ার মাধ্যমে । আর দোয়া গৃহীত হবার জন্য স্বয়ং নিজেকে খোদা তা’লার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত করা প্রয়োজন। এ জন্য নফসের জিহাদ আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে নসীহত করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) আমাদেরকে বলেন,

প্রবৃত্তির তাড়না শির্‌কসম। এটা হৃদয়কে পর্দাবৃত করে। যদিও মানুষ বয়’আত করে, তারপরও এটি তার জন্য হোঁচটের কারণ হয়।

অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থ শির্‌ক আর এর ফলে হৃদয় আচ্ছাদনে ঢাকা পড়ে, যদিও সে বয়’আত করুক না কেন। মানুষ বুঝে-শুনে বয়’আত করে। অনেক পুরনো আহ্‌মদী আছেন কিন্তু এরপরও এমন কোন দূর্ঘটনা ঘটে যা হোঁচটের কারণ হয়। তিনি (আ:) বলেন,

আমাদের জামাতের শিক্ষা হচ্ছে, মানুষ যেন প্রবৃত্তির তাড়না পরিহার করে বিশুদ্ধচিত্তে খাঁটি তৌহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুতরাং একজন আহ্‌মদীর জন্য আবশ্যক, সর্বপ্রকার ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে আপন হৃদয়কে পবিত্র করে আল্লাহ্ তা’লার তৌহীদ প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যাপৃত হওয়া।

তিনি (আ.) বলেছেন,

বয়’আত করা সত্ত্বেও অনেকে হোঁচট খায় কেননা তারা বয়’আত করার সত্যিকার উদ্দেশ্যকে অনুধাবন করে না। বয়’আতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পরিপূর্ণরূপে স্বয়ং নিজেকে খোদার অধিনস্ত করা এবং আপন হৃদয়কে সর্বপ্রকার শির্‌ক থেকে মুক্ত করা।

তিনি (আ.) অন্যত্র বলেন,

আল্লাহ্ তা’লা বিশ্বকে খোদাভীরু এবং পবিত্র জীবনের দৃষ্টান্ত দেখাতে ইচ্ছে করেছেন আর এ উদ্দেশ্যেই তিনি এই জামাত প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি পবিত্রতা কামনা করেন এবং একটি পূত-পবিত্র জামাত গঠন করাই তাঁর অভিপ্রায়।

সুতরাং বর্তমান বিশ্বে নির্লজ্জতা চরম রূপ ধারণ করেছে। আল্লাহ্‌র অধিকার প্রদানের প্রতি কারো মনোযোগ নেই আর আল্লাহ্‌র বান্দার প্রাপ্য অধিকারের প্রতিও কারো কোন দৃষ্টি নেই। সর্বত্র নৈরাজ্য ও অশান্তি বিরাজমান। মুসলমানরা খোদার নাম নিয়ে অপর মুসলমানদের গলা কাটছে, ধর্মের নামে কাটছে। একদিকে এই ধ্বনি উচ্চকিত করছে, ইসলামের নামে যে দেশ আমরা অর্জন করেছি সেখানে খোদার অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। অপরদিকে ধর্মের নামে, ব্যক্তিস্বার্থে কলেমা পাঠকারীদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলা হচ্ছে। আজ সমগ্র বিশ্বে স্বেচ্ছাচারী ও বর্বর একটি দেশ হিসেবে পাকিস্তান পরিচিতি লাভ করছে। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের দেশের প্রতি দয়া করুন। এই দেশ গঠন করার পিছনে জামাত যে অনেক কুরবানী করেছে এটি প্রত্যেক পাকিস্তানী আহ্‌মদীর স্মরণ রাখা উচিত।

অতএব আজ এই দেশকে যদি কেউ রক্ষা করতে পারে তাহলে এই পাপাচারিতা, নৈরাজ্য ও অত্যাচারের সমুদ্রে কেবল একটি নৌকা আছে যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তৈরী করেছেন। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আজ আমরা এতে আরোহণ করেছি। সুতরাং একটি বিশেষ চেষ্টা-প্রচেষ্টার সাথে স্বয়ং আমাদেরকে এর যাত্রী হবার উপযুক্ত হতে হবে এবং আল্লাহ্ তা’লার কাছে বিনত হয়ে স্বজাতির জন্য বিশেষ দোয়া করা প্রয়োজন, যাতে তারা বিবেক-বুদ্ধি খাটায় এবং নামধারী নেতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজ জীবন এবং দেশের অস্তিত্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে না দেয়।

যাইহোক, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একজন আহ্‌মদীর উপর ন্যস্ত হয় আর বিশেষভাবে পাকিস্তানী আহ্‌মদীর উপর, কেননা সেখানকার পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ। এছাড়া বিশ্বের যেখানেই অবস্থা সঙ্গীন, যদিও সাধারণভাবে পরিস্থিতি সর্বত্রই খারাপ মনে হচ্ছে। আহ্‌মদীদেরকে বিশেষভাবে এর প্রতি মনোযোগ দেয়া উচিত। সেসব আহ্‌মদী, যাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেছেন তারা অনেক সময় আহ্‌মদী হবার উদ্দেশ্য ভুলে বসে এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত পার্থিব কর্মে জড়িয়ে পড়ে। অনেক অভিযোগ আসে, জামাতী রীতি-নীতি এবং ইসলামী শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখা হয় না। তৌহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ইবাদত করা এবং নামাযের হিফাযত করা, এর প্রতি যথার্থ মনোযোগ দেয়া হয় না। অতএব বড়ই ভয়ের ব্যাপার হবে, আমাদের মধ্য হতে কোন একজনের দুর্বলতাও যেন তাকে আল্লাহ্ তা’লার এই নির্দেশের সত্যয়নকারী না বানায়,

لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ ‘সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়’, إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ ‘নিশ্চয় সে অতি অসৎকর্মপরায়ণ।’ (সূরা হূদ: ৪৭)

আল্লাহ্ না করুন, আল্লাহ্ না করুন খোদা তা’লার দৃষ্টিতে কখনই কোন বয়’আত গ্রহণকারীর পদমর্যাদা যেন এমন না হয়। একথা শুনে ভয়ে আমাদের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাওয়া উচিত। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে সেই কর্ম করার তৌফীক দিন যা তাঁর দৃষ্টিতে সৎকর্ম। আমরা নিজেদের মতে, স্বয়ং নিজেকে মনগড়া পুণ্যের মাপকাঠিকে যেন যাচাই না করি বরং পুণ্যের সেই উচ্চ মানে অধিষ্ঠিত হবার চেষ্টা করি যা এ যুগের ইমাম তাঁর জামাতের কাছে প্রত্যাশা রেখেছেন।

তিনি (আ.) বলেন,

যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের জামাত ত্বাকওয়া অবলম্বন না করবে ততক্ষণ তারা মুক্তি পাবে না।

তিনি বলেন,

খোদা তা’লা তাদেরকে নিরাপত্তা দিবেন না।

এরপর তিনি (আ.) বলেন,

যদিও খোদা তা’লা জামাতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি জামাতকে এসব বিপদাবলী হতে (এখানে প্লেগের উল্লেখ করা হয়েছে) নিরাপদ রাখবেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও শর্ত নির্ধারণ করেছেন, لَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ অর্থাৎ যারা নিজেদের ঈমানকে অন্যায়ের সাথে মিশ্রিত করেনি তারা নিরাপত্তা লাভ করবে

বর্তমান যুগেও প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদেরকে বিভিন্ন বিপদের সম্মুখীন হতে হয় তা থেকে রক্ষা পাবার জন্যও এটিই শিক্ষা যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) দিয়েছেন। এরপর তিনি (আ.) বলেন,

এরপর الدار (গৃহের চতুঃসীমা) সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এক্ষেত্রেও শর্ত আরোপ করেছেন, ‘ইল্লাল্লাযীনা আলাও মিন ইসতিকবারিন’ এখানে ‘আলাও’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, বিনয়ের সাথে যে ধরনের আনুগত্য করা উচিত তা না করা। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ বিশুদ্ধ চিত্তে যাকে সত্যিকার সিজদা বা আনুগত্য বলে তা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই দ্বার বা গৃহের চতুঃসীমায় অন্তর্ভুক্ত নয় আর তার মু’মিন হবার দাবীও মূল্যহীন।

অতএব বলা হয়েছে, সত্যিকার আনুগত্য ও বিনয় যতক্ষণ পর্যন্ত প্রদর্শন করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মু’মিন, আমরা বয়’আত করেছি বলে যেসব দাবী করছি তা বুলিসর্বস্ব হবে। সুতরাং আমাদের কাছে এই মান’এ অধিষ্ঠিত হবার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাই একজন আহ্‌মদীকে ত্বাকওয়ার পথে পরিচালিত হবার আপ্রাণ চেষ্টা, আনুগত্য ও বিনয়ের উন্নত মান অর্জন করার চেষ্টা করা উচিত। আর এটিই একজন আহ্‌মদীকে সেই পথের পানে পরিচালিত করবে যা সেই গন্তব্যের প্রতি ধাবিত করে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যা চিহ্নিত বা নির্ধারণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

আমাদের জামাতের সদস্যরা যদি সত্যিকার অর্থেই জামাতবদ্ধ হতে চায় তাহলে তাদের একটি মত্যু অবলম্বন করা উচিত। প্রবৃত্তির আকাংখা এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহ্ তা’লাকে সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার প্রদান করে। কপটতা এবং অনর্থক কর্মের ফলে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।

লোক দেখানে কর্ম, বেহুদা কাজ মানুষকে ধ্বংস করে। সুতরাং আমাদের সর্বদা উচিত আত্মিক বিশ্লেষণ করা, এরপর নিজের যে চিত্র ফুটে উঠবে সেই মোতাবেক সংশোধনের চেষ্টা করা। প্রত্যেকের নফস যেন স্বয়ং তাকে সংশোধনের প্রতি ধাবিত করে। স্বয়ং আত্মবিশ্লেষণ করতে থাকা উচিত। সর্বদা মনে রাখা আবশ্যক, সংশোধনের উদ্যোগ তখনই সফল হবে যখন কোনরূপ জিদ বা হঠকারিতা অন্তরায় সৃষ্টি না করবে। যখন এই চেতনা সৃষ্টি হবে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতভূক্ত হয়েছি তাই আমার জীবনের একটি পরম উদ্দেশ্য আছে। আর তা হলো, অন্যদের জন্য নিজ জীবনের পবিত্র দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা। খোদা তা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর নির্দেশাবলীর উপর আমল বা অনুশীলন করা। এরূপ চিন্তা-চেতনাই নিজ নফসের সংশোধনের পাশাপাশি অন্যদের কাছে আহ্‌মদীয়াত তথা সত্যিকার ইসলামকে পরিচিত করানো এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত হবার কারণ হবে এবং হয়েও থাকে। এ প্রসঙ্গে নসীহত করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

প্রত্যেক অচেনা ব্যক্তি যার সাথে তোমার সাক্ষাত হয় সে তোমার মুখাবয়ব দেখে এবং তোমার আচার-ব্যবহার, অভ্যাস, ধৈর্য-দৃঢ়চিত্ততা এবং ঐশী নির্দেশাবলীর প্রতি অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করে, তা কিরূপ। যদি উত্তম না হয় তাহলে সে তোমার মাধ্যমে হোঁচট খাবে। সুতরাং এ বিষয়গুলোকে স্মরণ রাখো।

পুনরায় তিনি (আ.) একস্থানে বলেন,

খোদা তা’লা এখন সত্যবাদী বা বিশ্বাসীদের জামাত গঠন করছেন। সুতরাং আমাদেরকে সত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন।

সত্য কী? এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

যখন সাধারণভাবে মানুষ সত্যবাদিতা এবং সত্যাশ্রয়ীকে ভালবাসে এবং সত্যকে জীবন চলার পথে পাথেয় করে নেয় তখন এই সত্যবাদিতাই সেই মহান সত্যকে আকর্ষণ করে যা খোদা তা’লাকে দর্শন করায়।

অতএব মানুষ যখন খোদাকে দর্শন করে তখন খোদা তা’লার একত্ববাদের মা’রেফত বা তত্ত্বজ্ঞানও সে লাভ করে। আর আল্লাহ্ তা’লার মা’রেফত যখন লাভ হয় তখন এর পূর্ণ আনুগত্যের প্রতিও সর্বদা দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। আল্লাহ্ তা’লাকে ভালবাসার সত্যিকার জ্ঞান লাভ হয়। সব ধরনের শির্‌ক এর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ জন্মে। আল্লাহ্ তা’লার সত্যিকার বান্দা হবার সঠিক জ্ঞান লাভ হয়। আল্লাহ্ তা’লার খাতিরে ধৈর্য এবং বীরত্বের সাথে সব ধরনের বিপদাপদ এবং দুঃখকষ্ট সহ্য করার শক্তি সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ তা’লার উপর নির্ভরতা জন্মে। সর্বপ্রকার উন্নত আচার-আচরণ করার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হয়। মোটকথা আল্লাহ্‌র অধিকার এবং বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের লক্ষ্যে এবং সত্যের উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সর্বদা আল্লাহ্ তা’লার সাহায্যে তিনি প্রতিটি মুহূর্ত চেষ্টিত থাকেন।

অতএব সংক্ষেপে এ হলো জামাত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, যা সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

খোদা তা’লা সত্যবাদী বা বিশ্বাসীদের জামাত গঠন করছেন।

যদি আমরা এই মাপকাঠীতে নিজেদের যাচাই করি তাহলে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে আমাদেরকে খোদার প্রতি প্রত্যাবর্তন করে তাঁর সমীপে বিনত হবার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হয় আর এমনটিই হওয়া উচিত। কেননা তাঁর কৃপা ছাড়া এ পথে পরিচালিত হওয়া সম্ভব নয়। আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রতি খোদার কৃপাবারী বর্ষিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ্ করুন যাতে আমাদের মধ্য হতে প্রত্যেকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের সেই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে গণ্য হই যারা ত্বাকওয়ার পথে পরিচালিত এবং তাদের মধ্যে গণ্য হই যাদের সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

খোদা তা’লা এই পাপাচারিতার আগুন থেকে একটি জামাতকে রক্ষা করার এবং তাদেরকে মুত্তাকী ও নিষ্ঠাবানদের দলভুক্ত করার সংকল্প করেছেন।

এই মুত্তাকীদের দল কোনটি! সে প্রসঙ্গে তিনি (আ.) বলেন,

যারা বয়’আত অনুযায়ী ধর্মকে পার্থিবতার উপর প্রাধান্য দেয়।

বয়’আত করার অর্থ হচ্ছে, বয়’আতের শর্তাবলী পালন আর সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ার চেষ্টা করা। আল্লাহ্ করুন যাতে আমাদের মধ্য হতে প্রত্যেকে ধর্মকে পার্থিবতার উপর প্রাধান্য দিয়ে সেই মুত্তাকীদের দলভূক্ত হই এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আতের সত্যিকার তাৎপর্য যেন অনুধাবন করি, যা তিনি বর্ণনা করেছেন। কখনও ব্যক্তিগত আকাংখা পূরণকল্পে এবং আমিত্বের কারণে আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশাবলীকে যেন উপেক্ষা না করি। অন্যদের জন্য আদর্শ হোন। যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পথে পরিচালিত হয়ে আমাদের জন্য দোয়া করে, যারা আমাদের মাধ্যমে আহ্‌মদীয়াত তথা সত্যিকার ইসলাম কবুল করবেন তারাও যেন তাদের শুভাকাংখীদের জন্য দোয়া করেন, যারা তাদেরকে আহ্‌মদীয়াতের সাথে পরিচিত করিয়েছেন এবং এর ফলে তারা আহ্‌মদীয়াতে অন্তর্ভুক্ত হবার তৌফিক পেয়েছেন।

জামাত অবশ্যই প্রসার ও বিস্তার লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। আমরা বিগত শত বছরেরও অধিক সময় ধরে এটিই দেখছি, আল্লাহ্ তা’লা জামাতের উপর নিজ রহমতের হাত রেখেছেন ফলে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ সদাত্মা জামাতভুক্ত হচ্ছেন। আল্লাহ্ তা’লা নবাগতদের সত্যের উপর অবিচল রাখুন এবং অনুগ্রহশীল ও কৃতজ্ঞ বানান। যতবেশি জামাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জামাত দৃঢ়তা লাভ করছে হিংসার আগুনও ততবেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যাপারে পূর্বেও আমি বিভিন্ন স্থানে কয়েকবার বলেছি। বিরুদ্ধবাদীরা সর্বদা জামাত সম্পর্কে এই বিশ্বাসই পোষণ করে আসছে আর তাদের আকাংখা এমনই যাতে জামাত ধ্বংস হয়। আর তারা এই অপেক্ষায় থাকতো কবে জামাত ধ্বংস হবে!! কবে জামাত ধ্বংস হবে!! সর্বদা এই শোরগোলই করতো। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার ফযল পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা এখনও আমাদের দুর্বলতা ঢেকে রেখে নিজ ফযল বর্ষণ করেছেন এবং সর্বদা করছেন। আর শত্রুদের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ এবং নিষ্ফল হয়েছে। জামাতের যেসব সফলতা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা এখন শত্রুরাও দেখছে। এটি এজন্যই হচ্ছে, কেননা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে আল্লাহ্ তা’লার এরূপ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির কল্যাণে তিনি সর্বদা জামাতকে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। তিনি (আ.) একস্থানে বলেন,

আমাদের অনুসারীদের উপর এমন এক যুগ আসবে যখন উন্নতির পর উন্নতি হবে কিন্তু এটি জানি না তা আমার যুগেই হবে নাকি আমাদের পরে হবে। খোদা তা’লা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বাদশাহ্ তোমার কাপড় হতে আশিস অন্বেষণ করবে। সুতরাং এটি অবশ্যই পূর্ণ হবে।

তিনি বলেন,

এটি খোদা তা’লার সুন্নত বা রীতি, প্রথমে নিজের জন্য তিনি একটি দরিদ্র শ্রেণীকে নির্বাচন করেন এরপর তারা ধীরে ধীরে সফলতা এবং উন্নতি লাভ করে। আমাদের অনুসারীরা ধনী বা সম্পদশালী নয়। এটা দেখে আমরা মোটেও আশ্চর্য হচ্ছি না। এরা অবশ্যই সম্পদশালী হবে। কিন্তু পরিতাপ এজন্য, যদি এরা সম্পদশালী হয় তাহলে সেসব লোকদের মত ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পার্থিবতাকে আবার প্রাধান্য না দিয়ে বসে।

এ হলো হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কথিত মূল শব্দাবলী। জামাত উন্নতি করবেই, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা। কিন্তু এই উন্নত অবস্থায় পৌঁছে কোথাও পার্থিব জগতকে আবার প্রাধান্য না দিয়ে বসে আর আল্লাহ্ তা’লার ব্যাপারে উদাসীন না হয়। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক আহ্‌মদীকে নিজ দায়-দায়িত্ব পালনের তৌফীক দিন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজ জামাতের কাছে যে আশা-আকাংখা বা প্রত্যাশা রেখেছেন আমাদেরকে সেই মাপকাঠীতে যথার্থভাবে উত্তীর্ণ হবার তৌফীক দিন। প্রত্যেক সেই মন্দ কর্ম থেকে নিরাপদ রাখুন যে সম্পর্কে তিনি চিন্তিত ছিলেন। আল্লাহ্ করুন আমরা যেন সর্বদা তাঁর দোয়ার উত্তরাধিকারী হই।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে