In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) - তৃতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৭শে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং

‘বিশ্বের সকল প্রান্তে পূর্বের ন্যায় আজও আল্লাহ্ তা’লা সদাত্মাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন প্রদর্শনের মাধ্যমে হেদায়াত প্রদান করছেন’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

يَهۡدِى بِهِ ٱللَّهُ مَنِ ٱتَّبَعَ رِضۡوَٲنَهُ ۥ سُبُلَ ٱلسَّلَـٰمِ وَيُخۡرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَـٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِهِۦ وَيَهۡدِيهِمۡ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে: ‘আল্লাহ্ তা দ্বারা সেসব লোককে যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে. শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং তিনি নিজ আদেশে তাদেরকে (সকল প্রকার) অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদেরকে সরল, সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করেন।’ (সূরা আল্ মায়েদা: ১৭)

ইনি হলেন ইসলামের খোদা! যিনি চৌদ্দ’শ বছর পূর্বে মহানবী (সা.) কে চরম অন্ধকার যুগে আবির্ভূত করেছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমে এই ঘোষণাও করান, পুনরায় যখন অন্ধকার যুগ আসবে তখন আখারীনদের মধ্য থেকেও তোমার এক সত্যিকার দাসকে দন্ডায়মান করবো যিনি পুনরায় পবিত্র কুরআনের সত্যিকার শিক্ষা বিশ্ববাসীর দরবারে তুলে ধরবে। ফলে তাঁর মাধ্যমে বিশ্ববাসী ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা অবগত হবে। ইসলামের খোদা জীবন্ত খোদা। তিনি বিশ্ববাসীর শান্তি এবং হেদায়াতের জন্য প্রত্যেক যুগে তাঁর মনোনীত বান্দাদের প্রেরণ করেন যাতে বিশ্ববাসীকে সরল, সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করেন এবং তাদেরকে হেদায়াত প্রদান করেন। কিন্তু পাশাপাশি আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ, তিনি সেযুগে সদাত্মাদের হেদায়াত দেন; যারা তাঁর দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করেন তাদেরকে হেদায়াত দেন। যারা হেদায়াতের সন্ধান করে তাদেরকে হেদায়াত প্রদান করেন। যাইহোক এখন আমি মহানবী (সা.)-এর সময়কার এবং এই যুগ, অর্থাৎ তাঁর নিষ্ঠাবান দাস হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের বিভিন্ন ঘটনা উপস্থাপন করবো যদ্বারা অবহিত হওয়া যায়, যারা হেদায়াত লাভের চেষ্টা করেন আল্লাহ্ তা’লা কীভাবে তাদেরকে হেদায়াত প্রদান করেন। অথবা তাদের কোন্ পুণ্যের কল্যাণে তাদেরকে হেদায়াতের পানে পরিচালিত করেন।

মহানবী (সা.)-এর যুগে একজন সম্মানিত মানুষ ছিলেন তোফায়েল বিন আমর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিজ্ঞ কবি। তিনি যখন একবার কবিতার আসর করার জন্য মক্কা আসেন তখন কুরায়শদের অনেকেই তাকে বলেন,

‘হে তোফায়েল! (তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যেও আসতেন, যাইহোক মক্কা এসেছিলেন) আপনি আমাদের শহরে এসেছেন তবে স্মরণ রাখবেন; এই ব্যক্তি, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর নাম নিয়ে বলেছে, একটি অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং সে আমাদের ঐক্যে ফাঁটল সৃষ্টি করেছে। ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, পিতার সাথে পুত্রের বিরোধ সৃষ্টি করেছে এবং সন্তানকে মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তারা আরও বলেছিল, সে বড় যাদুকর। এ কারণে মানুষ তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়। যেহেতু আপনি একটি গোত্রের নেতা তাই এর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন, কোন কথা শুনবেন না।’

বর্তমান যুগের মৌলভীদের অবস্থাও অনুরূপ। তারা বলে, আহ্‌মদীদের কোন কথা শুনবে না। তাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখো, এদের সাথে কোন প্রকার ধর্মীয় আলোচনা করবে না তাহলে তাদের যাদুতে তারা তোমাদেরকে মোহগ্রস্ত করবে। একারণেই আজ পর্যন্ত ৭৪সনে সংসদে যে আলোচনা হয়েছিল তা এরা গোপন করে রেখেছে। এই আলোচনা প্রকাশিত হলে পাকিস্তানি জনগণের কাছে সত্য কি তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। যাইহোক,

‘তোফায়েল বলে, তারা এতটা জোর করে তাই আমি তাঁর, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর ধারে কাছেও না যাবার দৃঢ় সংকল্প করি। অসাবধানে তাঁর কোন কথা যেন আমার কানে না আসতে পারে তাই আমি আমার কানে তুলো গুঁজে দেই। আমি খানা কা’বাতে পৌঁছে মহানবী (সা.)-কে নামাযরত দেখতে পাই। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক না কেন আমি তাঁর নিকটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি এবং কানে তুলো দেয়া সত্বেও তাঁর তেলাওয়াতের কয়েকটি পঙক্তি আমার কানে আসে এবং এই কালাম আমার কাছে খুবই ভাল লাগে। আমি মনে মনে বলি আমার মন্দ হলে হোক, আমি একজন জ্ঞানী-গুনী কবি, ভাল-মন্দ কাকে বলে তাও জানি। এই ব্যক্তির কথা শুনতে আপত্তি কি? যদি ভাল কথা বলে তাহলে আমি কবুল করবো আর যদি মন্দ কিছু বলে তাহলে পরিহার করবো, কেননা আল্লাহ্ তা’লা আমাকে বিচার-বুদ্ধি দিয়েছেন।’

এভাবেই আল্লাহ্ তা’লা পুণ্য স্বভাবের মানুষকে নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন,

‘যাইহোক আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। মহানবী (সা.) নামায শেষ করে নিজ গৃহের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেন আর আমি তাঁর পিছু পিছু যেতে থাকি। মহানবী (সা.) যখন নিজ গৃহে প্রবেশ করছিলেন তখন আমি বললাম, হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনার সম্পর্কে আপনার জাতি এসব বলেছে, সে বড় যাদুকর, পারষ্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করছে, জাতির মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। আমাকে এতটা ভয় দেখিয়েছে ফলে আমি নিজ কানে তুলো দিয়ে রেখেছি যাতে, আপনার কোন কথা আমার কানে না আসে। কিন্তু এতকিছুর পরও আল্লাহ্ তা’লা আমাকে আপনার কালাম শুনিয়েছেন। আর আমি যা শুনেছি তা খুবই উত্তম কালাম। আমাকে আরো কিছু বলুন!’ তোফায়েল (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন এবং পবিত্র কুরআন পাঠ করে শুনান। তিনি বলেন, ‘খোদার কসম! আমি এত্থেকে উত্তম কোন কালাম এবং এর চেয়ে সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল কথা কোথাও শুনিনি’। একথা শোনার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করি এবং কলেমা পাঠ করি। এরপর আমি মহানবী (সা.)-এর খিদমতে নিবেদন করি, আমি একটি গোত্রের সর্দার বা নেতা। গোত্রের মানুষ আমার কথা মানবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি ফিরে গিয়ে আমার জাতির কাছে ইসলামের তবলীগ করবো। আপনি আমার জন্য দোয়া করুন আর এর মোকাবিলায় কোন সমর্থনরূপী নিদর্শন আমাকে দেখান। মহানবী (সা:) একটি দোয়া করেন। এরপর আমি আমার গোত্রের কাছে ফিরে আসি।’

রেওয়ায়েতে আছে,

‘আমি যখন যাচ্ছিলাম তখন পথিমধ্যে একটি উপত্যকা পড়ে, যেখান থেকে বসতি আরম্ভ হয়। সেখানে পৌঁছলে আমি দেখতে পাই, আমার কপালের উপর চোখের মাঝখানে কোন জিনিষ চমকাচ্ছে, আলোর ঝলকানি দেখে আমি কিছু একটা অনুধাবন করলাম। আমি দোয়া করলাম, ‘হে আল্লাহ্! এই নিদর্শন আমার চেহারা বাদে অন্য কোথাও দেখাও। কেননা এর ফলে আমার জাতি বলবে, তোমার চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সেই আলোর নিদর্শন আমার লাঠি বা চাবুকের উপর প্রতিফলিত হয়। আর আমি যখন বাহন হতে অবতরণ করছিলাম তখন মানুষ এই চিহ্ন বা নিদর্শন দেখতে পায়।’

মোটকথা তিনি আপন গোত্রের কাছে পৌঁছেন। তিনি বলেন,

পরের দিন আমার পিতা যখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন আমি বলি, আজ থেকে আপনার ও আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মহানবী (সা:)-এর হাতে বয়’আত করেছি। পিতা বললেন, আমাকে খুলে বলো। আমি তাকে বললাম, প্রথমে গোসল করে আসুন। তিনি যখন গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এলেন তখন আমি তাকে ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত করি এবং তিনিও ইসলাম কবুল করলেন। এরপর আমার স্ত্রী আমার কাছে আসে, তাকেও আমি বলি, তোমার সাথে আজ থেকে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে কেননা আমি ইসলাম কবুল করেছি। সেও জিজ্ঞেস করে, আর আমি তাকেও বলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে আস তাহলে আমি তোমাকে ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে অবগত করবো। সেও অনুরূপভাবে আসে আর ইসলাম কবুল করে। কিছুদিন পর তিনি তার গোত্রের মাঝে তবলীগ আরম্ভ করেন; কিন্তু চরম বিরোধিতা হয়। তিনি ছিলেন দাওস গোত্রের। মহানবী (সা.)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তিনি নিবেদন করেন, গোত্র আমার চরম বিরোধিতা করছে। আপনি আমার গোত্রের বিরুদ্ধে বদ্দোয়া করুন। মহানবী (সা.) হাত তুলে এই দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ্! দাওস গোত্রকে হেদায়াত দাও’। এরপর তাকে বলেন, ফিরে যান এবং অত্যন্ত কোমলভাবে ভালবাসার সাথে আপন গোত্রকে তবলীগ করুন।

যাইহোক, তিনি বলেন,

আমি তবলীগ করতে থাকি। এ সময় মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন এবং সেখানেও মক্কার কাফিররা ইসলামের বিরুদ্ধে চরম আক্রমণ করতে থাকে। আহযাবের যুদ্ধ যখন সংঘটিত হয় এরপর আমার গোত্রের অনেকেই ইসলাম কবুল করেন আর বিশাল সংখ্যায় ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি তোফায়েল বিন আমর দোসীও নামেও পরিচিত। এরপর সত্তুরটি পরিবার নিয়ে তিনি মদিনাতে হিজরত করেন আর হযরত আবু হুরায়রাহ্ (রা.)-ও এই গোত্রের সাথেই সম্পর্ক রাখতেন।

সুতরাং মহানবী (সা.) হেদায়াতের যে দোয়া করেছিলেন তা পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ্ একটি সময় নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। বেশ কয়েক বছর পর আল্লাহ্ তা’লা তা কবুল করেন এবং সেই গোত্র মুসলমান হয়ে যায়। মহানবী (সা.) কখনই তাড়াহুড়ো করেন নি। তিনি তায়েফ সফরে গিয়েছিলেন সেখানে ফিরিশ্তারা যখন পাহাড় চাপা দেয়ার কথা বলেন তখনও মহানবী (সা.) তাদের হেদায়াতের জন্যই দোয়াই করেছিলেন, এই জাতি হেদায়াত পাবে। এই ছিল তাঁর রীতি। তাই তিনি আমাদেরকে এই দোয়াও শিখিয়েছেন, اللهم اهد قومى فانهم لا يعلمون [আল্লাহুম্মাহ্দী ক্বওমী ফাইন্নাহুম লা ইয়া’লামুন, অর্থ: হে আমার আল্লাহ্! আমার জাতিকে হেদায়াত দাও কেননা তারা আমাকে চিনে না-অনুবাদক]

এই দোয়া এ যুগের জন্যও প্রযোজ্য তাই বারবার পাঠ করা উচিত। এ যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) যখন খোদার পক্ষ থেকে প্রেরিত হবার দাবী করেন। তাঁরও প্রচন্ড বিরোধিতা হয় এবং ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সমর্থনে প্লেগের নিদর্শন প্রদর্শন করেন। কিন্তু যখন এই নিদর্শন প্রকাশিত হয় তখন এই নিদর্শন তাঁর সত্যায়নে প্রদর্শিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি চরমভাবে ব্যাকুল ও উৎকন্ঠিত ছিলেন। মানুষের প্রতি সহানুভূতির চেতনায় অনেক সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। জাতির জন্য কীভাবে তিনি একান্ত বেদনার সাথে দোয়া করতেন এর চিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রা.) মৌলভী আব্দুল করীম সাহেব (রা.)-র বরাতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

‘সেসময় আমি বাইতুদ্ দোয়ার উপর তলায় একটি হুজরাতে অবস্থান করতাম এবং এই স্থানকে আমি মূলত বাইতুদ্ দোয়া হিসেবেই ব্যবহার করতাম। এখান থেকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর দোয়ার সময়কৃত আহাজারি শুনতে পেতাম। তাঁর দোয়াতে এতটা বেদনা ও জ্বালা ছিল যা শুনে শ্রবণকারীর পিত্ত গলে যেত। সেভাবে তিনি খোদার দরবারে গিরিয়াজারী বা বিলাপ করতেন যেভাবে কোন মহিলা প্রসব বেদনায় কাতর হন। তিনি বলেন, আমি যখন মনোযোগ নিবদ্ধ করি তখন শুনতে পাই, তিনি (আ.) প্লেগের আযাব থেকে খোদার সৃষ্টির মুক্তির জন্য দোয়া করছেন, হে আমার খোদা! যদি প্লেগের আযাবে এরা ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কে তোমার ইবাদত করবে?’ (হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রা.) রচিত সীরাত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-পৃ: ৪২৮-৪২৯)

এই হলো হযরত মৌলভী আব্দুল করীম সাহেবের বর্ণনার সারাংশ।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করার কারণেই প্লেগের আযাব এসেছিল। এসত্ত্বেও তিনি সৃষ্টির প্রতি একান্ত সহমর্মিতায় এতবেশি তাদের হেদায়াত প্রত্যাশী ছিলেন, বিশ্ববাসী যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন তখন গভীর অন্ধকার নির্জন রাতে এই আযাব উঠিয়ে নেয়ার জন্য তিনি কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন। খোদার সৃষ্টির প্রতি তাঁর দয়া ও সহানুভূতি ছিল অতুলনীয়।

যাইহোক, প্লেগের নিদর্শনও বহু মানুষের জন্য হেদায়াতের কারণ হয়েছে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর এক রচনায় আপন ব্যাকুলতার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,

‘অধিকাংশ হৃদয়ে জাগতিক ভালবাসার ধুলো জমে আছে, খোদা! এই ধুলো সরিয়ে দাও। খোদা! এই অন্ধকারের অমানিশা দূরীভূত করো। পৃথিবী বড়ই অবিশ্বস্ত এবং মানুষের কোনই ভিত্তি নেই কিন্তু উদাসীনতার চরম অন্ধকার অধিকাংশ মানুষকে সত্য বুঝা থেকে বিরত রাখছে। .......খোদার কাছে একান্ত কামনা এটিই, নিজ অধম বান্দার পুরোপুরি সহযোগিতা করো এবং বিগত যুগে বিভিন্নভাবে যারা ক্ষত বা আহত হয়েছে তাদেরকে যেভাবে সান্ত্বনা প্রদান করেছ সেভাবে। আর তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করো যারা জ্যোতিকে অন্ধকার আর অন্ধকারকে জ্যোতি মনে করেছে, যাদের ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অনুরূপভাবে তাদেরকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত করো যারা নির্ধারিত সময়ে অদ্বিতীয় খোদার দৃষ্টি আকর্ষণ করাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। বরং অজ্ঞদের ন্যায় সন্দেহে নিপতিত। সুতরাং এই অধমের আকুতি-মিনতি যদি খোদার আরশে পৌঁছে তাহলে সেযুগ বেশি দূরে নয় যখন মুহাম্মদী নূর এই যুগের অন্ধকারের উপর বিকশিত হবে এবং ঐশী শক্তি নিজ বিষ্ময়কর নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করবে।’ (হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রা.) রচিত সীরাত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-পৃ: ৫৫১)

যাইহোক, আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিবেদন ও আকুতি কবুল করেছেন এবং তাঁর পক্ষে বিভিন্ন নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন। এর উত্তম ফলাফলও দৃশ্যমান হচ্ছে। কীভাবে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণের দৃশ্য দেখাচ্ছেন, কীভাবে মানুষের হৃদয়ে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছেন। এ সম্পর্কীত ��িভিন্ন ঘটনা রয়েছে। লাহোর নিবাসী মৌলভী রহীমুল্লাহ্ সাহেব (রা.)-র অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে মালেক সালাহ্ উদ্দিন সাহেব এম.এ লিখেন,

মৌলভী রহীমুল্লাহ্ সাহেব (রা.) উন্নত পর্যায়ের আল্লাহ্‌প্রেমী ও একত্ববাদী ছিলেন। অধিকাংশ সময়ই তাঁর ফকীর এবং পীরযাদাদের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেককেই কোন না কোনভাবে শিরক এ লিপ্ত দেখেছেন এবং কারো হাতে বয়’আত করতেই তাঁর হৃদয় সায় দেয়নি। এ পর্যন্ত যে, সোয়াতের আখুয়ান্দ সাহেবের সুখ্যাতি শুনে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তিনি সেখানে উপস্থিত হন এবং বয়’আত করার আবেদন করেন। আখুয়ান্দ সাহেব মৌলভী সাহেবকে নিজ আকৃতির চিত্র হৃদয়ে ধারণ করার উপদেশ দেন। এতে তার চোখ খুলে যায় এবং তিনি বলেন, পরিতাপ! আমার এতদূর পথ পাড়ি দেয়া বিফলে গেল কেননা, আখুয়ান্দ সাহেবও শিরকের শিক্ষাই প্রদান করেন। ফলে তিনি বয়’আত না করেই ফিরে আসেন।

মৌলভী সাহেব সাধক প্রকৃতির সাদাসিধে স্বভাবের অধিকারী, অত্যন্ত বিনয়ী, নির্জনতা প্রিয়, কুরআন ও হাদীস প্রেমী, খোদায় বিশ্বাসী বুযূর্গ ছিলেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সাথে তাঁর একান্ত ভালবাসার সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে যখন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর হাতে বয়’আত করেন তখন তাঁর অবস্থা এমন ছিল যে বর্ণনাকারী বলেন, অসংখ্যবার নামায পড়ানোর সময় একান্ত জাগ্রত অবস্থায় তাঁর উপর কাশফী অবস্থা সৃষ্টি হয়। এবং বেশ কয়েকবার রুইয়া (সত্যস্বপ্ন) এবং কাশফে (দিব্যদর্শন) রসূলে করীম (সা.) এবং আরো কতক নবীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে এবং সুস্পষ্ট ইলহাম, রুইয়া এবং কাশফের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। অতএব তিনি বলেছেন, আমি হযরত (আ.)-এর দাবী সম্পর্কে ইস্তেখারা করি। উত্তরে আকাশ থেকে একটি পাল্কি অবতরণ করতে দেখি এবং আমার হৃদয়ে ইলকা হয়, হযরত মসীহ্ (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করেছেন। পাল্কির পর্দা সরিয়ে দেখি এর মধ্যে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বসে আছেন। তখন আমি বয়’আত গ্রহণ করি। (আসহাবে আহমদ-১ম খন্ড-পৃ: ৬৫-৬৬)

এরপর দ্বিতীয় খিলাফতের যুগে ফিজির একটি ঘটনা। বশীর খান সাহেব লিখেন,

ফিজি দ্বীপপুঞ্জে আহ্মদীয়াতের চর্চা এবং আহ্‌মদীয়া মিশন প্রতিষ্ঠার পূর্বে খ্রীষ্টানদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য ছিল। এবং খ্রীষ্টানরাও মুসলমানদের মতই ঈসা (আ.)-এর আকাশ থেকে অবতরণের অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছিল। এজন্য আমার মনেও বিশ্বাস জন্মাতে থাকে, খ্রীষ্ট ধর্ম সত্য তাই খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণে কোন ক্ষতি বা বাঁধা নেই। তখন আল্লাহ্ তা’লা ফযল করেন। আমি তখনও খ্রীষ্টান হইনি বরং ভাবছিলাম মাত্র। সেসময় স্বপ্নে একজন বুযুর্গের সাথে সাক্ষাত হয়। তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আমাকে বলেন, ‘মোহাম্মদ বশীর বিবেক খাটাও। তুমি যার সন্ধান করছো তিনি ঈসা অথবা মসীহ্ নাসেরী নন বরং তিনি অন্য কেউ এবং পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন।’ সে সময় ফিজি দ্বীপপুঞ্জের প্রথম মোবাল্লেগ জনাব শেখ আব্দুল ওয়াহেদ সাহেব ফিজি পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা মৌলভী মোহাম্মদ কাসেম সাহেবও বয়’আত করে জামাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন কিন্তু এর প্রতি আমার কোন আগ্রহ ছিল না। এই স্বপ্ন দেখার পর জামাতের প্রতি আমার অনুরাগ জন্মে ফলে আমি আমার পিতার মত নিশ্চিত হয়ে বয়’আত করি। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-র হাতে বয়’আত করার পর ইসলামের প্রতি আমার এমন ভালবাসা ও অনুরাগ সৃষ্টি হয় এবং এমন জ্ঞান ও দূরদর্শিতা দ্বারা আল্লাহ্ তা’লা আমায় সম্মানিত করেন যে, আমি খ্রীষ্টানদের সম্মুখে অত্যন্ত বীরত্ব ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ইসলামের সত্যতা এবং খ্রীষ্টানদের বর্তমান বিশ্বাসকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করতে দাঁড়িয়ে যেতাম।

আরেকটি ঘটনা। এটিও দ্বিতীয় খিলাফতের যুগের। সিয়েরালিওনের প্রাথমিক যুগের আহ্‌মদী বন্ধু ‘পাহ্ সানফাতুলা’ তাকেও আল্লাহ্ তা’লা স্বপ্নের মাধ্যমে বিষ্ময়করভাবে আহ্‌মদীয়াতের সত্যতা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি বলেন,

১৯৩৯ সনে যখন আমি লুনিয়াঁ রাজ্যের বাওমাহুন নামক একটি গ্রামে বাস করছিলাম, আমি স্বপ্নে দেখি, সেখানকার একটি মালেকী সম্প্রদায়ের মসজিদের চতুর্পাশ্বের ঘাস পরিস্কার করছি।

আফ্রিকাতে বেশিরভাগ মালাকী সম্প্রদায়ের মুসলমান বাস করে যারা হাত ছেড়ে দিয়ে নামায আদায় করে। তিনি বলেন,

‘কিছুক্ষণ কাজ করার পর ক্লান্তিবোধ করলে মসজিদের নিকটেই একটি পাম গাছের নিচে আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে দাঁড়াই।’ স্বপ্নের বিবরণই চলছে। ‘এসময় দেখি! সম্মুখ দিক হতে একজন সাদা রঙের বিদেশী মানুষ হাতে কুরআন এবং বাইবেল নিয়ে আমার দিকে আসছে। আমার কাছে এসে তিনি আস্‌সালামু আলাইকুম বলেন। এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এই মসজিদের ইমাম কে? আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে চাই। আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডাকতে চলে যাই, তাঁর নাম ছিল আলফা। আমরা ফিরে এসে এটি দেখতে পেয়ে বিস্মিত হই যে, মসজিদের ভেতর একটি ছায়াঘেরা জানালার মত তৈরী হয়েছে এবং সেই বিদেশী মানুষটি আমাদের মসজিদে স্বয়ং ইমামের স্থানে মেহরাবের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদেরকে দেখামাত্রই তিনি আমাদের উভয়কে নির্দেশ দেন, এ ছায়াময় স্থানে বসে তোমরা আমাকে কুরআন শুনাও। মাত্র কয়েক মিনিট অতিবাহিত হবার পরই সেই বিদেশী লোকটি মসজিদ থেকে বেড়িয়ে আমাদের কাছে আসেন এবং আমাদের ইমামকে সম্বোধনপূর্বক বলেন, আমি আপনাকে নামাযের সঠিক রীতি-পদ্ধতি শিখানোর জন্য এসেছি’।

এরপর আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সকাল হতেই আমি আমার সব মুসলমান বন্ধুকে এই স্বপ্ন শুনাই।

স্বপ্ন দেখার প্রায় এক সপ্তাহ পর সকাল বেলা আমি আমার কোদাল নিয়ে সেই মালেকী মসজিদ প্রাঙ্গনের ঘাস পরিষ্কার করতে আরম্ভ করি। প্রায় আধা ঘন্টা কাজ করার পর আমি কিছুটা ক্লান্তিবোধ করি এবং নিকটস্থ একটি পাম গাছের নিচে বিশ্রাম করতে দাঁড়াই। এর মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় দেখি, আমার সামনে দিয়ে একজন আসছেন আর তিনি হলেন আহ্‌মদী মোবাল্লেগ আলহাজ্ব মওলানা নাযির আহমদ আলী সাহেব (রা.)। তিনি কাছে এসে আমাকে আস্‌সালামু আলাইকুম বলেন এবং থাকার জায়গা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমার জন্য এটি আশ্চর্যজনক ছিল কেননা কয়েকদিন পূর্বে আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম আজ তা হুবহু পূর্ণ হচ্ছে। আলহাজ্ব মৌলভী নাযির আলী সাহেবই সেই বুযুর্গ যাঁকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আর স্বপ্নে তিনি যে পোষাক পরিহিত ছিলেন আজও প্রায় তদ্রুপই পড়েছিলেন। অতএব আমার জন্য এমন অতিথির সেবা করা সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। তাই আমি তাঁকে অন্য কোথাও রাখার পরিবর্তে নিজের ঘরে নিয়ে যাই এবং ঘর খালি করে তাঁকে সেখানে থাকতে দেই। এরপর আমি আমার মুসলমান বন্ধুদেরকে ডেকে বলি, আমি তোমাদেরকে যে স্বপ্নের কথা বলেছিলাম তা আজ পূর্ণ হয়েছে এবং সেই বুযুর্গ এসে গেছেন আর আমার ঘরেই অবস্থান করছেন।

এরপর তিনি বলেন,

কিছুদিন পর আমি আহ্‌মদী হই এবং আল্লাহ্ তা’লা ফযল করেন বলে আমার তবলীগেই গ্রামের অধিকাংশ মুসলমান আহ্‌মদী হয়ে যান।

এ যুগেও আল্লাহ্ তা’লা হৃদয়সমূহকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিশুদ্ধ করেন এবং হেদায়াত প্রদান করেন। আমি ৪০, ৫০ অথবা ৬০ বছর পূর্বেকার কথা বলেছি। এখন গত ৩/৪বছরের ঘটনাবলীও তুলে ধরছি। কীভাবে আল্লাহ্ তা’লা মানুষের হেদায়াতের ব্যবস্থা করেছেন। কীভাবে সাহায্য ও সমর্থন করেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পক্ষে এখনও সমর্থনপূষ্ট নিদর্শনের কোন কমতি নেই। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, মানুষ যেন পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয় এবং নেক নিয়্যতের সাথে হেদায়াত সন্ধানী হয়।

আলজেরিয়ার মোকাররম হাদ্দাদ আব্দুল কাদের সাহেব বলেন,

২০০৪ সনের পবিত্র রমযানে স্বপ্নে দেখি: ‘এক ব্যক্তি আমাকে বলে, আস আমি তোমাকে রসূলুল্লাহ্ (সা:)-কে দেখানোর জন্য নিয়ে যাই। আমি দেখি, প্রায় এক মিটার উঁচু দেয়ালের পিছনে হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে দেখে হাসেন। এরপর দেখি হুযূর (সা:) এবং দেয়ালের ঠিক মধ্যস্থলে বাদামী রঙের একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার ঘন কালো দাড়ি রয়েছে। মহানবী (সা.) এই ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘হাযা রসূলুল্লাহ্’ অর্থাৎ ইনি আল্লাহ্‌র রসূল। এরপর তিনি পূর্বদিকে একটি নূরের দিকে গমন করেন অপরদিকে এই ব্যক্তি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন’।

তিনি বলেন, চার বছর পর হঠাৎ করেই ২০০৮ সনে আপনাদের চ্যানেল দেখি, এবং এতে আমি সেই ব্যক্তির ছবি দেখতে পাই যাকে আমি মহানবী (সা.)-এর সাথে স্বপ্নে দেখেছিলাম। এটি ছিল হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ছবি।

অতএব তিনি সেসময়ই বয়’আত করেন।

অনুরূপভাবে একজন মিসরী নারী হালাহ্ মুহাম্মদ আল্ জওয়াহেরী সাহেবা বলেন,

আমি স্বপ্নে দেখি হযরত ইমাম মাহদী (আ.) এবং তাঁর জামাত পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন। আমি নিবেদন করি, আমাকেও সঙ্গী হবার সুযোগ দিন। তিনি বলেন, ‘ফিরে যাবার সময় আমরা আপনাকে সাথে নিয়ে যাবো।’ অর্থাৎ সাথে যাবার আবেদন করলে ফেরার পথে নিয়ে যাবার কথা বলেন। এই স্বপ্ন দেখার পর আমি সূফী মতবাদের ভেতর সত্যের সন্ধান করি কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি নি। আমি বুঝে গেলাম, আমার স্বপ্ন সূফী মতবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যদিও তারা বারবার বলছিল, আমি তাদেরকেই স্বপ্নে দেখেছি। তিনি বলেন, যাইহোক ঘরে এসে আমি টেলিভিশনে বিভিন্ন চ্যানেল দেখতে থাকি এবং ঘটনাক্রমে এম.টি.এ আল্-আরাবিয়া দেখতে পাই। আমি আশ্চর্য না হয়ে পারিনি কেননা, এই চ্যানেলে আমি সেই ব্যক্তিকেই দেখতে পেয়েছি, যাঁকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, যিনি ইমাম মাহদী এবং পানির উপর দিয়ে হাঁটছিলেন।

এরপর ইরাকের আব্দুর রহীম ফিঞ্জান সাহেব বলেন:

আমি কিছুদিন পূর্বে স্বপ্নে দেখি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাকে বলছেন, ‘তুমি আমাদের লোক তাই তোমার বয়’আত করা উচিত’। অতএব এখন আমি বয়’আত করছি।

গত ২/৩ বছরের ঘটনাসমূহ আমি বর্ণনা করছি। অনুরূপভাবে আরো অন্যান্য অঞ্চলের ঘটনা রয়েছে যেমন, মরিশাস একটি দূরদূরান্তের দ্বীপ। সেখান থেকে আমাদের মোবাল্লেগ লিখেছেন, মরিশাসের পার্শ্ববর্তি ছোট্ট একটি দ্বীপ হচ্ছে রুডরিগ্‌স, সেখানে প্রায় ছত্রিশ হাজার মানুষের জনবসতি রয়েছে আর পুরো দ্বীপবাসীই ক্যাথলিক খ্রীষ্টান। তিনি বলেন,

রুডরিগ্‌স সফরকালে একদিন প্রত্যুষে যখন আমি তবলীগের উদ্দেশ্যে বের হই, তখন একটি খ্রীষ্টান জেরে তবলীগ ছেলেকে সঙ্গী হিসেবে নেই আর কোন সংবাদ না দিয়েই দ্বীপের অন্যপ্রান্তে সেই ছেলের মা এবং নানীর কাছে উপস্থিত হই। ঘরে প্রবেশ করে আমরা সেখানে আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করি আর তবলীগি আলোচনা আরম্ভ করি। সেই ছেলেটির নানী বলতে আরম্ভ করে, ‘আপনি যে বাণী নিয়ে এসেছেন তা পুরোপুরি সত্য এবং আমি তা কবুল করছি, এ ব্যাপারে ঘরে উপস্থিত সবাই সাক্ষী। আপনি আসার পূর্বেই আমি তাদেরকে আমার একটি স্বপ্ন শুনিয়েছি। আপনারা ভিনদেশী কয়েকজন এসেছেন আর আমি তাদের হাত ধরে বলছি, এই আত্মীয়তা আমি কবুল করছি।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা যখন আমার ঘরের দিকে আসছিলেন তখন আমি আমার কক্ষ থেকে আপনাকে দেখতে পেয়ে বলেছি, এরাতো হুবহু সেই লোক যাদেরকে আমি স্বপ্নে দেখেছি।’

দু’দিন পর যখন আমরা পুনরায় যাই এবং পবিত্র কুরআন, জামাতের পত্র-পত্রিকা এবং বিভিন্ন ছবি উপহার দেই এরপর তৃতীয়বার বয়’আত ফরম নিয়ে সেই গৃহে যাই আর বয়’আতের শর্তাবলী পাঠ করে শুনাই। তখন সেই মহিলার চোখ পানিতে ভরে যায় আর বলতে আরম্ভ করে, ‘এই ফরম পূরণ করতে আমার সামান্য কোন দ্বিধা নেই কেননা গতরাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি আমার সম্মুখে দু’টি কাগজ আনা হয়েছে এবং হুবহু তাই যা এখন আপনার হাতে লম্বা করে ভাঁজ করা রয়েছে এবং আপনারা যারা আমার সম্মুখে বসে আছেন এমন দৃশ্যই আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার গৃহবাসীরা সেই স্বপ্নের সাক্ষী যা আমি গতকাল তাদের শুনিয়েছি’। এরপর তিনি বয়’আত করেন।

এটি ছোট্ট একটি দ্বীপ, আমিও সেখানে গিয়েছি এবং আল্লাহ্ তা’লার ফযলে সেখানে জামাতের দু’টি মসজিদ রয়েছে এবং ধীরে ধীরে মানুষ খ্রীষ্টধর্ম পরিত্যাগ করে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করছে।

আমাদের মোবাল্লেগ আমেরিকা থেকে একটি ঘটনা লিখেছেন:

পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি মেক্সিকান বংশোদ্ভুত পরিবার আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করেছে। এই পরিবারের গৃহকর্তীর নাম জরিডুই মারিলোভ, তাকে মৌরী নামে ডাকা হয়। তিনি তার স্বপ্নটি এভাবে বর্ণনা করেন, যদিও তার পুরো পরিবার ক্যাথলিক ছিল, কিন্তু তারা কখনই খ্রীষ্টধর্মের চর্চা করে নি। যখন তার বয়স সাতাইশ বছর তখন কোন অসুবিধে দেখা দেয়ায় বা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি হাসপাতালে ভর্তী হন এবং তিনি বলেন, ‘আমি দোয়া করা আরম্ভ করি আর আমি সর্বদা এক খোদার কাছেই দোয়া করতাম। একদিন আমি স্বপ্নে একটি কাঁচের উপর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ছবি দেখি এবং স্বয়ং নিজ হাতে তা স্পর্শ করি এরপর আমি পূর্ণ আরোগ্য লাভ করি। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। সেই ছবিটি ছিল একটি কাঁচ সদৃশ আর আজ পর্যন্ত আমি তা ভুলিনি’।

তিনি বলেন, ‘এরপর এক মেস্কিকান বংশোদ্ভুত আহ্‌মদী নারীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে পড়ার জন্য বই-পুস্তক প্রদান করেন এবং আহ্‌মদীয়াতের পরিচিতি তুলে ধরেন। সেসব বইয়ে আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ছবি দেখি এবং ছবি দেখামাত্র আমার উপর একটি বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি হয় আর আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। আমি ছবি দেখে কাঁদতে থাকি কেননা আল্লাহ্ তা’লা আমাকে সত্য চেনার তৌফিক দিয়েছেন’। এরপর তিনি স্বামী-সন্তানদের নিয়ে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করেন। তিনি একজন শিক্ষিতা মহিলা।

অনুরূপভাবে আমাদের বুলগেরিয়ার মোবাল্লেগ লিখেন: দেখুন! পৃথিবীর সর্বত্র আল্লাহ্ তা’লা কীভাবে ফযল করছেন এবং হেদায়াত লাভের ব্যবস্থা করছেন। তিনি বলেন,

ওলেক সাহেব নামী একজন খ্রীষ্টান বন্ধু দীর্ঘদিন যাবৎ জেরে তবলীগ ছিলেন। তার স্ত্রী পূর্বেই আহ্‌মদী হয়েছেন কিন্তু ইনি হচ্ছিলেন না। কারণ তার পরিবারের সদস্যরা খ্রীষ্টান এবং চার্চের দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত। ২০০৫ সনে তাকে জলসায় যোগদানের জন্য নিমন্ত্রণ করা হয় আর তিনি সস্ত্রীক জার্মানীর জলসায় যোগদান করেন, আর আমার সাথেও সেসময় সাক্ষাৎ করেন। ফিরে যাবার সময় জলসার যথেষ্ট প্রভাব তার উপর পড়েছিল কিন্তু তিনি বয়’আত করেন নি। হঠাৎ করে একদিন আমাদের কেন্দ্রে এসে বলেন, ‘আমি বয়’আত করবো, আমি আহ্‌মদী হতে চাই’। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত তড়িঘড়ি কীসের’? তিনি বলেন, ‘আজ দু’রাত ধরে অনবরত খলীফাতুল মসীহ্‌কে (আমার ব্যাপারে) স্বপ্নে দেখছি, এবং তিনি বলছেন, ‘ওলেক! যদি তুমি আমার কাছে না আসো তাহলে আমি স্বয়ং তোমার কাছে আসছি’ বলে আমার ঘরে আসেন, ফলে আমি লজ্জিত হই তখন আমি সংকল্প করি, আজ আমি আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করবোই।’

এভাবে আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াত প্রদান করেন।

কুয়েতের আব্দুল আযীয সালাহ্ সাহেব বলেন,

ঈদের দিন রাতে স্বপ্নে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে দেখি। দৃশ্যটি ছিল এমন: ‘অধম পরীক্ষা দিচ্ছিলাম তখন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এসে আমার কাছ থেকে পরীক্ষার খাতা নিয়ে নেন যদিও সেখানে অন্য অনেক পরীক্ষার্থী ছিল। হুযূর (আ.) আমার খাতার উপর টিক চিহ্ন দেন। আর দেখি একটি মসজিদে আমার আঁকা হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস এর সাথে আমি আছি আর তিনি আমাকে দেখছেন এবং মসজিদ মানুষে প���িপূর্ণ। সবাই মেঝেতে বসে আছেন এবং বয়’আত করছেন। আমিও নিকটে গিয়ে হুযূরের কোমরের উপর হাত রেখে বয়’আত করি।’

মস্কো থেকে আমাদের মোবাল্লেগ লিখেছেন:

২৭শে মে ইজ্জতউল্লাহ্ সাহেব আমাদের মিশন হাউসে আসেন, এবং বয়’আত করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আজ অবশ্যই আমার বয়’আত নিন কেননা রাতে স্বপ্নে আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে দেখেছি। এরপর আমি আর বিলম্ব করতে চাই না’। তিনি নিজ স্বপ্ন বর্ণনা করতে গিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বলেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখি একটি সমতল রাস্তায় বাসে করে যাচ্ছি এবং আমি বাসের পিছনের অংশে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ করে বাসের গতি বেড়ে যায় এবং বাসটি ছিটকে পড়ে আর পিছনের অংশ গভীর খাদের নিচের দিকে ঝুলে থাকে। আমি উপরে ওঠার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না। হঠাৎ দেখি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এসেছেন এবং তিনি তাঁর ডান হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, তুমি দৃঢ়ভাবে আমার হাত ধরো তাহলে মারা যাবে না। আমি বলি, আমি কীভাবে ধরবো আমার মধ্যে এতটা শক্তি নেই। তখন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) স্বয়ং নিজ হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরে উপরে টেনে তুলেন। এরপর তিনি বলেন, আমি আবার সমতল পথে চলতে আরম্ভ করি।’

এভাবেই বুর্কিনাফাঁসো থেকে সানু ইসহাক সাহেব বলেন,

‘আমাদের মহল্লার মসজিদে গয়ের আহ্‌মদী ইমাম আহ্‌মদীয়াতের বিরুদ্ধে খুতবা প্রদান করে এবং আহ্‌মদীয়া রেডিও শুনতে কঠোরভাবে বারণ করে।’

মৌলভীদের কাছে দলীলতো দূরের কথা অন্য কোন অস্ত্র নেই তাই তারা বলে, আহ্‌মদীদের কথা শুনবে না। যেভাবে আমি পূর্বেই বলেছি, মক্কাবাসীদের অবস্থাও এমনই ছিল। তিনি বলেন,

‘যদি আমরা এই রেডিও না শুনি তাহলে সত্য কীভাবে জানবো?’ ইমাম সাহেব বলতে আরম্ভ করে, কোনভাবেই শুনবে না, এটি সত্য জানার কোন রীতি নয়। যাইহোক তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে এক কাজ করি আশা করি তুমিও এতে একমত হবে। ভোবো জেলাতে যত মুসলমান সম্প্রদায় আছে তাদের নাম পৃথক কাগজের টুকরোতে লিখে কোন ছোট্ট শিশুকে দিয়ে লটারী করে দেখি। শিশুটি যে কাগজ ওঠাবে আর তাতে যে জামাতের নাম লেখা থাকবে আমরা ধরে নিবো, সেই জামাতই সত্য।’ তিনি বলেন, ‘যতগুলো ফির্কা ছিল আমরা সবগুলোর নাম লিখে কোন শিশুকে ডেকে তাকে দিয়ে কাগজ ওঠাই এবং তাতে লেখা ছিল জামাতে আহ্‌মদীয়া। ইমাম সাহেব এতে নিশ্চিত হতে পারেন নি তাই তিনি বলেন, আরেকবার করো। দ্বিতীয়বারও জামাতে আহ্‌মদীয়ার নাম উঠে। এবারও নিশ্চিত না হলে তৃতীয়বার উঠানো হয়। অবশেষে ইমাম সাহেব অনেকটা দ্বিধান্বিত হন আর এটিই তার হেদায়াতের কারণ হয়।’

নরওয়ের একটি ঘটনা:

আমার ৭ই মে, ২০০৪ সনের খুতবা যখন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হচ্ছিল তখন এক অ-আহ্‌মদী ভদ্রলোক আমীর সাহেবকে ফোন করেন এবং সাক্ষাৎ করতে চান। সাক্ষাতের সময় বলেন, জুমুআর খুতবা শুনে তার ভেতর একটি পবিত্র পরিবর্তন সৃষ্টি হয়েছে তাই তিনি বয়’আত করতে চান।

এভাবেও আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াত লাভের উপকরণ সৃষ্টি করেন।

বসনিয়াতে জেরে তবলীগ এক যুবক স্বপ্নের মাধ্যমে বয়’আত করেছেন। সেই যুবক স্বয়ং নিজের স্বপ্ন এভাবে বর্ণনা করেছেন;

‘আমি দেখলাম, একটি বড় শহরে আমি ঘুরছি যেখানে হুলস্থুল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে আমি বহু ইহুদী, খ্রীষ্টান এবং মুসলমান দেখতে পাই, যারা অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সাথে নোংরা ও আবর্জনাপূর্ণ অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন তারা হারিয়ে গেছে। হঠাৎ আমার দৃষ্টি ডান দিকে নিবদ্ধ হয় আর সেখানে আমি খুব সুন্দর একটি গাছ দেখতে পাই এবং এর নিচে মানুষের ছোট্ট একটি দল বসে আছে। সাদা কাপড় পরিহিত এবং তাদের মাথায় পাগড়ী বাঁধা। চারিদিকে এত হুলস্থুল সত্ত্বেও এরা নিশ্চিন্ত মনে সেখানে দলবদ্ধভাবে বসে আছে। এবং এদের চেহারায় হাসি রয়েছে। আমি স্বপ্নেই ধারণা করলাম, এরা অবশ্যই আহ্‌মদী হবে। আমি এদের কাছে যাই এবং এদের দলে যোগ দেই।’

এরপর সেই যুবক বয়’আত করেন।

বিভিন্ন দেশে এধরনের অগণিত ঘটনা রয়েছে। আমাদের ফিজির মোবাল্লেগ লিখেন,

১৬ বছর বয়স্ক এক হিন্দু যুবক মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করে। কিন্তু সে স্বয়ং হিন্দুই ছিল। একদিন তার সাথে আমরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার স্ত্রী রোযা রেখে ঘুমিয়েছিল। সেদিন আমি স্বপ্নে দেখি, দুজন মানুষ আমার কাছে এসে বলে, আমাদের সাথে যোগ দাও। তাদের পোষাক ও টুপি হুবহু তাই ছিল যা আজ আপনারা পরিধান করে আছেন’। এরপর তিনি বয়’আত করেন।

এরপর জার্মানীতে বসবাসরত একজন কুর্দী মুসলমান হচ্ছেন কাসেম দাল সাহেব।

তিনি তার জার্মান স্ত্রী, এবং তিন কন্যাসহ জামাতের তবলীগি ষ্টলে আসেন, এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ছবি নিয়ে কথা আরম্ভ হয় এবং অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘হযরত রসূলে করীম (সা.)-এর পর কে আসতে পারে’? পনের মিনিট বিতর্কের পর আমাদের সেক্রেটারী তবলীগ তার ফোন নাম্বার নিয়ে নেন এবং তারা চলে যান। পরের দিন তাকে খাবারের নিমন্ত্রণ জানান এবং সেখানে তবলীগি আলোচনা হয় এবং তাকে বই-পুস্তকও প্রদান করা হয়। দু’দিন পর তিনি ফোন করে জানান, ‘আমি বই-পুস্তক পড়িনি বরং তা পুড়ে ফেলেছি। কেননা আমাকে মৌলভীরা বলেছে, এদের কোন কিছুই পড়বে না’। যাইহোক তাকে বলা হল, ঠিক আছে আপনি বৃহস্পতিবার আসেন, মানেন বা না মানেন বন্ধুত্বতো থাকতে পারে। তিনি সেদিন আসেন এবং রোযা রেখে আসেন যাতে আহ্‌মদীদের ঘরে খাবার খেতে না হয়। যাইহোক, কথা আরম্ভ হয় এবং দীর্ঘ আলোচনা চলতে থাকে এবং ইফতারীর সময় হলে বাধ্য হয়ে রোযা সেখানেই খুলতে হয় আর খাবারও খেতে হয়। আমাদের সেক্রেটারী তবলীগ তাকে বলেন, ‘আপনি মৌলভীদের কথা বাদ দিয়ে পক্ষপাতিত্ব মুক্ত হয়ে চল্লিশ দিন পরিষ্কার ও পবিত্র হৃদয় নিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লার সমীপে একান্ত বেদনার সাথে দোয়া করুন।’ সেক্রেটারী সাহেব বলেন, ‘তৃতীয় দিন তিনি তার কর্মস্থল থেকে ফোন করে বলেন, তোমার কাছে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস এর কোন ছবি আছে কি’? আমি বললাম, আছে। তিনি বলেন, ‘এখনই কাজ ছেড়ে আসছি’। তাকে কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, ‘অদৃশ্য আওয়াজ আমাকে বলেছে, কী প্রমাণ চাও? প্রমাণতো আমরা তোমাকে দেখিয়েছি এবং সাথে সাথে তাকে সেই স্বপ্ন স্মরণ করানো হয় যাতে তিনি দেখেছিলেন যে, আমি কোন সেনাবাহীনীর নেতৃত্ব দিচ্ছি আর সঙ্গে ফিরিশ্তাও আছে’। যাইহোক এরপর তিনি বয়’আত গ্রহণ করেন।

এ হলো কয়েকটি ঘটনা যা আমি আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরলাম। এরূপ অগণিত ঘটনা রয়েছে। জলসার সময় কতক বর্ণনা করা হয়, কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে সব ঘটনা তুলে ধরা সম্ভব হয় না। কাদিয়ান জলসায় আমার ইচ্ছে ছিল কতক ঘটনা বর্ণনা করার, কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। ঘটনাক্রমে এ বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে বলে আমি তুলে ধরলাম। আল্লাহ্ তা’লা এভাবে হেদায়াত প্রদানের উপকরণ সৃষ্টি করেন, এবং আজ পর্যন্ত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সমর্থন করছেন। আল্লাহ্ তা’লার কাছে আমাদের এটিই দোয়া, বিশ্ববাসীকে আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াতের পানে পরিচালিত করুন এবং আমাদেরকে সর্বদা হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। মহানবী (সা.) আমাদেরকে হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্যও অনেক দোয়া শিখিয়েছেন।

হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা.) আমাকে বলেছেন,

‘তুমি বলো হে আল্লাহ্! আমাকে হেদায়াত দাও এবং আমাকে সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করো। হেদায়াতের পাশাপাশি সরল-সুদৃঢ় পথকেও স্মরণ রাখো। আর সোজা রাখার অর্থ তীরের মত সোজা থাকা।’ (মুসলিম)

হেদায়াত বা সরল-সুদৃঢ় পথ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আমি হযরত মসী���্ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতির আলোকে বলেছি, তিনটি বিষয় সর্বদা মনে রাখা আবশ্যক। (হুকুকুল্লাহ্) আল্লাহ্‌র অধিকার প্রদান, (হুকুকুল ইবাদ) বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদান এবং নিজ আত্মার প্রাপ্য প্রদান করা। কিন্তু এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লার একত্ববাদ এবং খোদার প্রতি ধাবিত হওয়া। সর্বদা আল্লাহ্ তা’লাকে স্মরণ রাখা আবশ্যক। অনুরূপভাবে একটি হাদীসে আবু ইসহাক বর্ণনা করেন, আমি আবু আহওয়াসকে আব্দুল্লাহ্ হতে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। নবী করীম (সা.) দোয়া করতেন:

‘হে আমার আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে হেদায়াত, ত্বাকওয়া, পবিত্রতা বা শুচি-শুদ্ধতা এবং প্রাচুর্য কামনা করছি।’ (তিরমিযী)

এরপর আরেকটি দোয়া শিখানো হয়েছে। আবু মালেক তার পিতা কর্তৃক বর্ণনা করেন, যখন কেউ ইসলাম গ্রহণ করতো তখন রসূলুল্লাহ্ (সা.) এই শব্দাবলী দিয়ে দোয়া শিখাতেন:

اللهم اغفرلي، وارحمني، واهدني، وارزقني

[আল্লাহুম্মাগ ফিরলী ওয়ারহামনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী]

অর্থ: হে আমার আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার প্রতি দয়া কর, আমাকে হেদায়াত দাও এবং আমাকে রিয্ক দান কর।’

যেভাবে আমি পূর্বে বলেছি, আল্লাহ্ যাকে হেদায়াত প্রদান করেন তাকে সমৃদ্ধও করেন। কিন্তু এটি কোন স্থবির বিষয় নয় বরং হেদায়াত পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের মোকাম বা পদমর্যাদা উন্নত থেকে উন্নততর হয়। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে পবিত্র কুরআনে এই দোয়া শিখিয়েছেন এবং ইতোপূর্বেও আমি কয়েকবার জামাতকে তাহরীক করেছি। এই দোয়াটি জুবিলীর দোয়াতেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেকে প্রশ্ন করেন, এখন যেহেতু জুবিলীর বছর শেষ হয়ে গেছে তাই জুবিলীর দোয়াসমূহ্ পাঠ করা বন্ধ করে দিবো কি? মানুষকে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি দোয়া করা উচিত। কেবল অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য এই দোয়াগুলো পাঠ করতে বলা হয়েছিল। যাতে আগত শতাব্দীতে আরো বেশি দোয়া করার তৌফিক হয়। তাই বন্ধ করারতো প্রশ্নই উঠে না বরং প্রত্যেক আহ্‌মদীকে পূর্বের চেয়ে বেশি দোয়া করা উচিত। পবিত্র কুরআনের দোয়াটি হলো:

رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوبَنَا بَعۡدَ إِذۡ هَدَيۡتَنَا وَهَبۡ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحۡمَةً‌ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡوَهَّابُ

অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে হেদায়াত দেবার পর আমাদের হৃদয়কে বক্র হতে দিও না, আমাদেরকে পদস্খলন থেকে রক্ষা কর এবং তোমার সন্নিধান হতে আমাদেরকে রহমত দান কর; নিশ্চয় তুমি মহান দাতা।’ (সূরা আলে ইমরান: ৯)

এই দোয়াসহ অন্যান্য দোয়াও করা উচিত। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘হে পরম করুণাময় খোদা! সকল জাতির যোগ্য হৃদয়সমূহকে হেদায়াত প্রদান কর যাতে তোমার প্রিয় রসূল এবং শ্রেষ্ঠ রসূল মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) আর তোমার কামেল ও পবিত্র কালাম কুরআন শরীফের প্রতি তারা ঈমান আনে এবং এর নির্দেশাবলীর পূর্ণ অনুসরণ করে। যাতে সেসব আশিস ও সৌভাগ্য এবং সত্যিকার আনন্দলাভে ধন্য হয় যা সত্যিকার মুসলমানরা উভয় জগতে লাভ করে থাকে। এই অনন্ত জীবন ও পরিত্রাণের পরম স্বাদ উপভোগ করে যা কেবল পরকালেই লাভ হয়না বরং প্রকৃত সত্যাশ্রয়ী এই পার্থিব জীবনেই লাভ করে।’ (মজমুয়া ইশতেহারাত, ১ম খন্ড-পৃ: ১২৫. হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রা.) রচিত সীরাত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-পৃ: ৫৭৩)

মহানবী (সা.)-এর দোয়ার মধ্য হতে একটি দোয়া বিশেষভাবে বলতে চাই যার উল্লেখ আমি খুতবার শুরুতে করেছি তা হচ্ছে, اللهم اهد قومى فانهم لا يعلمون [আল্লাহুম্মাহ্দী ক্বওমী ফাইন্নাহুম লা ইয়া’লামুন, - অনুবাদক] । ওহোদের যুদ্ধে যখন মহানবী (সা.)-এর পবিত্র দু’টি দাঁত শহীদ হয় এবং তাঁর পবিত্র চেহারা ক্ষত-বিক্ষত হয় সাহাবাদের (রা.) জন্য তা ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তারা নিবেদন করেন,

আপনি (সা.) তাদের বিরুদ্ধে বদ্দোয়া করুন। তিনি (সা.) বলেন, আমাকে অভিসম্পাত বর্ষণকারী হিসেবে আবির্ভূত করা হয়নি বরং আমি খোদার প্রতি আহবানকারী এবং মূর্তিমান রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। এরপর তিনি দোয়া করেন,

اللهم اهد قومى فانهم لا يعلمون

[আল্লাহুম্মাহ্দী ক্বওমী ফাইন্নাহুম লা ইয়া’লামুন, - অনুবাদক]

অর্থ: হে আমার আল্লাহ্! আমার জাতিকে হেদায়াত দাও কেননা তারা আমাকে চিনে না।

অতএব, হযরত মসী‏হ্ মওউদ (আ.)-কেও এই দোয়াই শিখানো হয়েছে। তাই তাঁর জামাতকেও বিশেষভাবে এই দোয়া করা উচিত। বর্তমানে পাকিস্তানের যে অবস্থা এতে পাকিস্তানীদের বিশেষভাবে এই দোয়া করা উচিত। তাদের বিরোধিতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। এ কারণেই তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ভুলে গেছে এবং ভুলাটাই স্বাভাবিক। যারফলে বিভিন্ন সমস্যায় নিপতিত এবং বুঝতেও পারছে না যে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। তাদের সাথে কি ঘটছে আর ভবিষ্যতে কি ঘটতে যাচ্ছে এবং যতদিন তারা হেদায়াতের পানে অগ্রসর না হবে এ অবস্থা চলতেই থাকবে। এজন্য আল্লাহ্ তা’লা এই দেশ ও জাতির উপর দয়া করুন। তাদের জন্য অত্যন্ত বিগলিত চিত্তে দোয়া করুন। প্রতিনিয়ত আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে পূর্বাপেক্ষা কোন না কোন ঘৃণ্য কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যদিও বর্তমানে সেই দেশে জীবনের কোন মূল্যই নেই। প্রত্যেকেরই জীবন বিপন্ন। কিন্তু আহ্‌মদীরা যেহেতু এ যুগের ইমামকে মেনেছে তাই কেবল এ কারণে তাদের প্রাণনাশ করা হয়, হত্যা এবং শহীদ করা হয়। প্রতিদিন কোন না কোন শাহাদত বা কাউকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেয়ার সংবাদ এসে থাকে। দু’দিন পূর্বেই আমাদের একজন মুরব্বী সাহেব মুসলেহ্ মওউদ (রা.) দিবসের জলসা শেষে কোন স্থান হতে ফিরছিলেন। বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ করে কোথা হতে দু’জন মোটর সাইকেল আরোহী এসে তার উপর এলোপাথারি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক-ওদিক দৌড়ে পালায়। দুর্বৃত্তরাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু নিশানা লক্ষভেদ করেছে বলে সন্দেহ দেখা দেয়ায় পুনরায় ফিরে এসে মুরব্বী সাহেবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। যাইহোক আল্লাহ্ তা’লা ফযল করছেন বিধায় গুলি পায়ে লেগেছে। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসারত আছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে পূর্ণ আরোগ্য দান করুন এবং এ জাতিকেও বিবেক-বুদ্ধি দিন। এরা এবং এদের নেতারা দেশকে কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে তা স্বয়ং তারা বুঝতে পারছে না। কারণ এমনিতেই তাদের মধ্যে অসততা বিদ্যমান আবার মোল্লাদের খপ্পরে পড়ে অন্যায়-অসততা আরো অধিক বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশকে তারা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লা রহম করুন।

নামাযান্তে আমি কয়েকটি গায়েবানা জানাযার নামায পড়াবো। প্রয়াত ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে সংক্ষেপে বলছি।

একজন হচ্ছেন করাচীর মোকারম মাহমুদ আহমদ সাহেবের ছেলে মোবাশ্বের আহমদ সাহেব। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪২ বছর। গত ২২শে ফেব্রুয়ারী কতক অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারী তাঁকে গুলি করে ফলে তিনি শহীদ হন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । সম্প্রতি তাকে হত্যার হুমকী দেয়া হচ্ছিল এবং এলাকার পুলিশ ইন্সপেক্টর বলেন, ঐখানে একটি মাদ্রাসা ছিল। সেখান থেকে দু’জন লোক (যারা সে মাদ্রাসায় কাজ করত) বেরিয়ে এসে তাকে গুলি করে। যাইহোক রাত গভীর হওয়া সত্ত্বেও যখন তিনি ঘরে ফিরে আসেন নি তখন পরিবারের লোকজন খোঁজ-খবর নেয় এবং জানা যায় যে, কোন অজ্ঞাত পরিচয় তাকে শহীদ করেছে। অত্যন্ত মুখলেস, নামাযী এবং উদ্যমী দায়ীইলাল্লাহ্ ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তার পদমর্যাদা উন্নীত করুন। মরহুম মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক কন্যা ও দু পুত্র রেখে গেছেন। তার স্ত্রী বয়’আত করে স্বয়ং আহ্‌মদী হয়েছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা তাদেরও হিফাযত করুন আর স্বয়ং তাদের অভিভাবক হোন।

দ্বিতীয় জানাযা হচ্ছে আমাদের অত্যন্ত বুযুর্গ আফ্রো আমেরিকান আহ্‌মদী ভাই মুনির হামিদ সাহেবের। তিনি গত ২১শে ফেব্রুয়ারী ৭০বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । ১৯৫৭ সনে তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্বয়ং বয়’আত করে জামাতভূক্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত মুখলেস, নিষ্ঠাবান, বিশ্বস্ত ও আত্মোৎসর্গী আহ্‌মদী ছিলেন। সর্বদা জামাতী কাজে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি মজলিস খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়া আমেরিকার প্রথম ন্যাশনাল কায়েদ হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। ত্রিশ বছরের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ফিলাডেলফিয়া জামাতের প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সন থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকা জামাতের নায়েব আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পিতামাতা কেউই মুসলমান ছিলেন না। ধর্মের প্রতি পিতার কোন আকর্ষণ না থাকলেও তার মাতা কেবল চার্চেই যেতেন না বরং তাকে চার্চের মিশনারী হিসেবে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণীত করতেন। দশ ভাইবোনের মধ্যে কেবল তিনিই ধর্মের প্রতি আকর্ষণ রাখতেন ফলে তিনি ইসলাম কবুল করার তৌফিক লাভ করেন। এ কারণে অন্যান্য ভাইবোনরা তার বিরোধিতাও করত। একবার যখন তার মাতা অসুস্থ হন তখন এই অসুস্থতাকালীন সময় তার ভাইবোনেরা মুনির হামিদ সাহেব মুসলমান বলে তার নাম ভাইবোনের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল। যদি ভাইবোনের তালিকায় মুসলমান কারো নাম এসে যায় তাহলে তাদেরকে মানুষের সামনে লজ্জিত হতে হবে বলে। যাইহোক অল্প বয়সেই আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করেন বরং তিনি যখন আহ্‌মদী হতে চাচ্ছিলেন তখন জামাতের নিয়ম ছিল, বয়’আত ফরমে পিতামাতা অথবা তাদের কোন একজনের স্বাক্ষর যেন থাকে, স্বেচ্ছায় আমি অন্য ধর্ম গ্রহণ করছি। যখন তিনি বয়’আত ফরম পূরণ করে পিতামাতার কাছে সত্যায়ন করাতে যান তারা তা করতে অস্বীকার করেন এবং তাকে বুঝান, তুমি কোথায় যাচ্ছ? কিন্তু সর্বদা তার মায়ের বিশ্বাস ছিল সব ছেলেমেয়ের মধ্যে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুমিই অগ্রগামী। মরহুম বলেছেন, আমি ইসলামী নীতি দর্শন পুস্তক পড়ে আহ্‌মদী হয়েছিলাম। সত্যতা তার কাছে সুপ্রকাশিত হয়। তিনি হযরত খলীফাতুল সানী (রা.)-র কাছে একটি পত্র লিখেছিলেন। পত্রের উত্তর যখন আসে তিনি বলেন, এই চিঠি আমার কায়া পাল্টে দিয়েছে। আমার ঈমানের উন্নতির কারণ হয়েছে। অত্যন্ত সহজ-সরল, অকৃত্রিম, সাদাসিধে, বিনয় ও পুণ্যবান মানুষ ছিলেন। আমার সাথেও কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছেন। হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতেন। জামাতের জলসা ইত্যাদিতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বক্তৃতা দিতেন। রসূলে করীম (সা.)-কে ভালবাসতেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। মহানবী (সা.)-এর নাম শোনামাত্রই তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে যেতো। খলীফাদের প্রতি এবং খিলাফতের সাথেও ভালবাসা ও বিশ্বস্ততার গভীর সম্পর্ক ছিল। সম্ভবত দুই অথবা তিন বছর পূর্বে বাংলাদেশ জলসায় যাওয়ার সময় লন্ডনে আমার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ করেন। জলসা থেকে ফিরে পুনরায় যখন সাক্ষাৎ করতে আসেন বলেন, বাংলাদেশ জলসা এবং আপনার সাথে সাক্ষাতের পর আমি পুনরায় উদ্বুদ্ধ হয়েছি। যখনই আমার সাথে সাক্ষাৎ করতেন অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। গত বছর যখন আমেরিকার জলসায় গিয়েছিলাম তখন অসুস্থতার কারণে তিনি জলসায় আসতে পারেন নি। খবর শুনে আমি মনে করেছিলাম সামান্য অসুখ হবে। কিন্তু রোগের ভয়াবহতা জানা ছিল না। আমার মনে হয় তার পরিবারের লোকজনও তার চরম অসুস্থতার কথা জানতো না। যদি জানতে পারতাম তাহলে কোন না কোনভাবে সময় বের করে আমি তার ঘরে গিয়ে সাক্ষাৎ করে আসতাম। যাইহোক, আল্লাহ্ তা’লা মরহুমের পদমর্যাদা উন্নীত করুন। তিনিও মৃত্যুকালে বিধবা স্ত্রী, এক ছেলে ও দু কন্যা রেখে গেছেন। আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকেও মুনির হামিদ সাহেবের নেককর্মসমূহ জারী রাখার তৌফিক দান করুন। তিনিও সেসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াতের পানে পরিচালিত করেন। কেননা দশ সন্তানের মধ্যে কেবল সত্য গ্রহণ করার তৌফিক একজনই পেয়েছেন।

তৃতীয় জানাযা হচ্ছে, কাদিয়ান নিবাসী মোকাররম মাহমুদ আহমদ সাহেব দরবেশের। তিনি গত ২৫শে ফেব্রুয়ারী ৮৪বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । তিনিও অত্যন্ত নেক, মুত্তাকী, নামাযী, ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী মানুষ ছিলেন। অধিকাংশ দরবেশই ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। যৌবনে শেখুপুরা থেকে কাদিয়ান হিজরত করে আসেন এবং জীবন উৎসর্গ করে মাদ্রাসা আহ্‌মদীয়ায় ভর্তি হন। এরপর হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-র নির্দেশে সেনাবাহীনিতে যোগদান করেন আবার তাঁর নির্দেশেই সেনাবাহীনি থেকে পদত্যাগ করে জামাতের কাজ আরম্ভ করেন। তিনি নাযের বাইতুল মাল আমদ ও খরচ এবং পরবর্তীতে নায়েব নাযের ওয়াকফে জাদীদ বেরুন হিসেবে খিদমত করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর তিন ছেলে এবং তিন কন্যা রয়েছেন। তাঁর এক ছেলে নাসির আহমদ আরেফ সাহেব কাদিয়ানের নাযারাতে উমুরে আমা দপ্তরে খিদমত করার সুযোগ পাচ্ছেন।

পরবর্তী জানাযা হচ্ছে মোহরতরম কামাল ইউসুফ সাহেবের পত্নী সৈয়দা মুনিরা ইউসুফ সাহেবার। তিনি ক্যান্সারের রোগী ছিলেন। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর তিনি গত ২৫শে ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । মরহুমা হযরত সৈয়দ সরওয়ার শাহ্ সাহেবের পৌত্রী ছিলেন। কামাল ইউসুফ সাহেব স্ক্যান্ডিন্যাভিয়ান দেশসমূহে দীর্ঘদিন মোবাল্লেগ হিসেবে কাজ করেছেন মরহুমাও স্বামীর সাথে সেখানেই বাস করেছেন। মরহুমা অতিথি পরায়না ছিলেন। মিশন হাউসের প্রতি যত্নবান ছিলেন। জামাতের প্রতি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং খলীফাদের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতেন এবং তাঁদের জন্য আত্মাভিমান রাখতেন। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমার পদমর্যাদা উন্নীত করুন। তিনিও এক কন্যা ও দু ছেলে রেখে গেছেন। এছাড়া মরহুমার স্বামী মোকাররম কামাল ইউসুফ সাহেবও আল্লাহ্‌র ফযলে জীবিত আছেন।

এরপর রাবওয়া নিবাসী বশীর আহমদ সিয়ালকোটি সাহেবের পত্নী আমাতুল হাই সাহেবা। অনুরূপভাবে বশীর আহমদ সিয়ালকোটি সাহেব স্বয়ং স্ত্রী মারা যাবার কয়েক দিনের মাথায় ইন্তেকাল করেন। তারা উভয়ে আমাদের মুরব্বী এবং বর্তমানে প্রাইভেট সেক্রেটারীর অফিসে কর্মরত জহুর সাহেবের পিতা-মাতা। তার মাতা মৃত্যুবরণ করেন ২৭শে জানুয়ারী এবং পিতা ২৫শে ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেন। উভয়েই অত্যন্ত নেক ও দোয়াগো বুযুর্গ ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে প্রাথমিক যুগের লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা রাবওয়া এসে বসবাস আরম্ভ করেন এবং এখানেই ব্যাবসা-বাণিজ্য করেন। তারা এক কন্যা এবং পাঁচ ছেলে রেখে গেছেন। আল্লাহ্ তা’লা উভয়ের পদমর্যাদা উন্নীত করুন এবং তাদের সাথে ক্ষমার আচরণ করুন। নামাযের পর মরহুমদের গায়েবানা জানাযার নামায পড়ানো হবে।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে