In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

মুসলেহ্ মওউদ (রা.) সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২০শে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং

মুসলেহ্ মওউদ (রা.) সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রেক্ষাপট, পূর্ণতা এবং আমাদের করণীয়

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) খোদা তা’লার সেই বীরপুরুষ যাঁকে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা ‘জারীউল্লাহ্’ বলে সম্বোধন করেছেন। খোদা তা’লা তাঁকে এ উপাধি এজন্য দান করেছেন, কারণ আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় শিশুকাল থেকেই মহানবী (স.) এবং ইসলামের প্রতি ভালবাসায় আল্লাহ্ তা’লা তাঁর হৃদয় ভরে দিয়েছিলেন। তিনি ইসলামের প্রতিরক্ষা করার কোন সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। সকল ধর্ম সম্পর্কে তাঁর (আ.) যথেষ্ট পড়াশোনা এবং গভীর জ্ঞান ছিলো। প্রত্যেক ধর্মের মোকাবিলায় ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য তিনি প্রতিমুহূর্ত ব্যস্ত থাকতেন। যখন ভারতে খ্রীষ্টান মিশনারীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গিয়েছিল এবং ইসলাম ও এর পবিত্র প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে তারা শত শত পুস্তক রচনা করা হয়েছিল। সে যুগে অসংখ্য লিফলেট এবং বিজ্ঞাপন বিতরণ করা হয়েছিল আর এগুলো মুসলমানদেরকে খ্রীষ্টান হতে বাধ্য করছিল। উপরন্তু এমন অসংখ্য মুসলমান ছিল যারা খ্রীষ্টান হয়নি ঠিকই কিন্তু তাদের মন-মস্তিষ্কে ইসলামী শিক্ষার বিরুদ্ধে সন্দেহ দানা বাঁধতে আরম্ভ করে। এরপর খ্রীষ্টানদের এরূপ আক্রমণের পাশাপাশি আর্য বা ব্রাক্ষ্ম সমাজ অত্যন্ত জোরে সোরে আন্দোলন আরম্ভ করে। তখন মুসলমানদের অবস্থা এমন ছিলো যে, অন্য ধর্মের মোকাবিলা করার পরিবর্তে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা এবং কুফরি ফতোয়া প্রদানে ব্যস্ত ছিলো। তখন ইসলামের চরম দুর্দশা দেখে যদি সত্যিকারেই কেউ চিন্তিত হয়ে থাকেন এবং ইসলামের প্রতিরক্ষা করতে চাইতেন তাহলে তিনি ছিলেন হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ.)। ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব আক্রমণ হচ্ছিল তা প্রতিহত করার জন্য তখন তিনি একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর নাম ‘বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’। এতে তিনি পবিত্র কুরআনকে ‘ঐশী কালাম’ এবং সবদিক থেকে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অনুরূপভাবে মহানবী (সা:)-এর নবুয়ত এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন এবং অখন্ডনীয় দলীল দ্বারা প্রমাণ করেছেন। ইসলাম বিরোধী সকল ধর্মকে এটা প্রকম্পিত করে তুলেছিল। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের সর্বপ্রকার হীন ও ঘৃণ্য আক্রমণ আরো জোরালো রূপ নেয়।

ইসলামের প্রতিরক্ষাকল্পে এবং ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য বর্ণনায় তিনি ‘বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’ গ্রন্থে যে নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা দেখে অনেক মুসলমান উলামা (তার বাচনভঙ্গী এবং লেখনীশক্তি) এর যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু যখন তিনি (আ.) বিজ্ঞাপনাদির মাধ্যমে ইসলামের বাণী আরো ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার করেন তখন মুসলমানদেরও একটি শ্রেণী তাঁর বিরোধী হয়ে যায় এবং অমুসলমানদের সাথে হাত মিলিয়ে তাঁর চরম বৈরিতা আরম্ভ করে। তিনি সেযুগে ইসলামের বাণী কতটা আবেগের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৌঁছিয়েছিলেন তা তাঁরই নিষ্ঠাবান সাহাবী হযরত মৌলভী আব্দুল্লাহ্ সানৌরী সাহেবের বরাতে হযরত মির্যা বশীর আহমদ সাহেব এভাবে বর্ণনা করেছেন:

সে সময় তিনি (আ.) বিশ হাজার সংখ্যায় বিজ্ঞাপন ছাপান এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সে যুগে যেখানেই ডাক যোগাযোগ ছিলো সেখানকার রাজা-বাদশা, সরকার, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, লেখক, আলেম-উলামা এবং নবাবদের কাছে এই বিজ্ঞাপন প্রেরণ করেন। এটি সে যুগের কথা যখন তিনি মসীহ্ হবার দাবী পর্যন্ত করেন নি বরং ধরে নিন যে মুজাদ্দিদ হিসেবেই এই পয়গাম প্রেরণ করেছিলেন। এই বিজ্ঞাপনে তিনি ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য তুলে ধরেছিলেন। যাইহোক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন এই পয়গাম পৌঁছে তখন বিশ্ববাসীর ভেতর এর ফলে তেমন কোন চাঞ্চল্য দেখা যায়নি। কিন্তু ভারতে যেসব ধর্মাবলম্বিরা ভেবেছিল যে, আমরা মুসলমানদেরকে পুরোপুরি করায়ত্ত করেছি, তাদের উপর একটি ভূমিকম্প নেমে আসে। তারা যখন দেখলো, ইসলামের প্রতিরক্ষায় একটি গ্রন্থও রচিত হয়েছে এবং এখন সরাসরি মোকাবিলা করার এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য বিজ্ঞাপনাদিও বিতরণ করা হচ্ছে। এটা সর্বজন বিদিত, অমুসলমানরা ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অস্ত্র প্রয়োগ করা সম্ভব ছিলো তা সবই করেছিল।

যেভাবে আমি বলেছি, কোন কোন মুসলমানও ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তাদের কথায় সায় দিতে আরম্ভ করে এবং তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠে। যাইহোক এরূপ পরিস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত বেদনার সাথে আল্লাহ্ তা’লার কাছে দোয়া করেন, হে খোদা! আমি তোমার সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ ধর্ম এবং তোমার একান্ত প্রিয়ভাজন হযরত খাতামুল আম্বিয়া (সা.)-এর প্রতিরক্ষার জন্য এসব করছি। তাই হে আল্লাহ্! তুমি আমায় সাহায্য কর এবং এ চেতনা নিয়ে তিনি চিল্লাকশী করার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ চল্লিশ দিন নির্জনে নিভৃতে আল্লাহ্ তা’লার কাছে বিশেষ দোয়া করেন, যাতে খোদা তা’লার কাছ থেকে ইসলাম এবং আঁ-হযরত (সা.)-এর সত্যতার সমর্থনে বিশেষ নিদর্শন কামনা করা যায়। চিল্লাকশী কোথায় করা হবে এজন্য প্রথমে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ইস্তেখারা করেন এবং জ্ঞাত হন, এই চিল্লাকশির স্থান হচ্ছে হুশিয়ারপুর। তিনি এই উদ্দেশ্যে হুশিয়ারপুর গমন করেন এবং তাঁর সাথে তিনজন সাহাবী ছিলেন। একজন হলেন, মৌলভী আব্দুল্লাহ্ সানৌরী সাহেব আরেকজন হলেন হাফিয হামেদ আলী সাহেব এবং তৃতীয়জন হলেন ফতেহ্ খান সাহেব।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) হুশিয়ারপুর নিবাসী তাঁর একজন বন্ধু শেখ মেহের আলী সাহেবকে পত্র লিখেন, আমি দু’মাসের জন্য এখানে আসছি। আমার জন্য নির্জন একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করুন, যাতে একান্ত নিভৃতে সঠিকভাবে খোদা তা’লার ইবাদত করা যায়। তিনি তাঁর সাথীদের এবং তাকে (বন্ধুকে) বলে দেন, এই সময় কেউ যেন আমার সাথে সাক্ষাত না করে। কোন মোলাকাত হবে না। যাহোক শেখ সাহেব তার একটি বাড়ী, যা শহরের বাইরে ছিল এতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তিনি (আ.) ১৮৮৬ সনের ২২শে জানুয়ারী চিল্লাকশীর উদ্দেশ্যে সেখানে পৌঁছেন এবং সেই বাড়ীর দোতলায় থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

যেভাবে আমি বলেছি, আপন সঙ্গীদেরও বলে দেন, যেন তাঁর সাথে কেউ সাক্ষাত না করে আর তাদের মধ্য থেকেও কেউ তাঁর সাথে কথা না বলে। কিন্তু যখন খাবার-দাবার নিয়ে আসবে তখন তাঁর কক্ষে রেখে দিলে, ক্ষুধা পেলে তিনি খেয়ে নিবেন। মোটকথা এই চিল্লার সময় আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে অনেক কাশ্‌ফ বা দিব্যদর্শন দেখান। সুতরাং ১৮৮৬ সনের ২০শে ফেব্রুয়ারী তিনি সেখান থেকেই একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন আর তা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন। এতে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো যা আল্লাহ্ তা’লা তাঁর জীবদ্দশায় অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ করেছেন এবং কোন কোনটি পরেও পূর্ণ করেছেন। যেহেতু জামাতের মধ্যে ২০শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে প্রতিবছর একটি জলসার আয়োজন করা হয়, তাই আমি এই অংশ নিয়ে এর গুরুত্ব এবং কী মহিমার সাথে এটা পূর্ণ হয়েছে তা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করবো। আজও কাকতালীয়ভাবে ২০শে ফেব্রুয়ারী। আর তিনি (আ.) এদিনেই মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী অর্থাৎ তাঁর এক পুত্র সন্তানের জন্ম এবং তার বিশেষত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

যেভাবে আমি প্রারম্ভে বলেছি, এই প্রতিশ্রুত পুত্রের জন্ম সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী সেই দোয়ার সময় আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে জ্ঞাত হয়ে তিনি করেছিলেন যখন তিনি ইসলামের শত্রুদের মুখ বন্ধ করার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ইসলাম এবং ইসলামের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা (সা.)-এর সত্যতার নিদর্শন কামনা করেছিলেন। সুতরাং এই ভবিষ্যদ্বাণী কোন সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং এই ভবিষ্যদ্বাণী এবং এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যায়নকারীও এ যুগে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করার এক জ্বলন্ত নিদর্শন এবং এটিও আল্লাহ্ তা’লার আশ্চর্য মহিমা! যে বছর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বয়’আত গ্রহণ করার অনুমতি লাভ করেন, অর্থাৎ ১৮৮৯ সনেই এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যায়নকারী প্রতিশ্রুত পুত্রও জন্ম লাভ করেন। যাইহোক হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ভাষায় এই ভবিষ্যদ্বাণীর বাক্যাবলী উপস্থাপন করছি। তিনি যে প্রচার লিপি প্রকাশ করেছিলেন এতে বলেন,

‘প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী যা স্বয়ং এই অধম সম্পর্কে, আজ ২০শে ফেব্রুয়ারী ১৮৮৬ মোতাবেক ১৫ই জমাদিউল আউয়াল, ইলহামী কালাম সংক্ষেপে নমুনাস্বরূপ লেখা হচ্ছে এবং এর বিস্তারিত পুস্তকে লিপিবদ্ধ করা হবে, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা।’

তিনি (আ.) বলেন,

প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী “(বিসমিল্লাহি তা’লা ওয়া ই’লামিহি আয্যা ওয়া জাল্লা) পরম করুণাময়, পরম দাতা, মহা মহিমান্বিত খোদা, যিনি সর্বশক্তিমান (জাল্লা শানুহু ওয়া আয্যা ইসমুহু) যাঁর মর্যাদা মহা গৌরবময় এবং নাম অতি মহান, নিজ ইলহাম দ্বারা সম্বোধনপূর্বক বলেনঃ আমি তোমাকে ‘করুণার এক নিদর্শন’ দিচ্ছি তুমি যেভাবে তা আমার কাছে চেয়েছো। আমি তোমার সকরুন নিবেদন শুনেছি এবং তোমার দোয়াসমুহকে করুণার সাথে কবুল করেছি এবং তোমার সফরকে (হুশিয়ারপুর ও লুধিয়ানার) তোমার জন্য কল্যাণময় করেছি। সুতরাং শক্তি, দয়া এবং নৈকট্যের নিদর্শন তোমাকে দেয়া হচ্ছে। ফযল এবং অনুগ্রহের নিদর্শন তোমায় দান করা হচ্ছে। আর বিজয় ও সফলতার চাবি তুমি প্রাপ্ত হয়েছো। হে মুযাফ্‌ফর (বিজয়ী)! তোমার প্রতি সালাম। খোদা বলেছেন, যারা জীবন প্রত্যাশী তারা যেন মৃত্যুর কবল হতে মুক্তি লাভ করে এবং যারা কবরে প্রোথিত তারা বের হয়ে আসে, যাতে ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব এবং আল্লাহ্ তা’লার কালামের মর্যাদা লোকের কাছে সুপ্রকাশিত হয় এবং সত্য এর যাবতীয় আশিসসহ উপস্থিত হয় এবং মিথ্যা এর যাবতীয় অকল্যাণসহ পলায়ন করে। আর মানুষ বুঝে যে আমি সর্ব শক্তিমান-যা ইচ্ছা করি, করে থাকি এবং যেন তাদেরও প্রতীতী হয়, আমি তোমার সঙ্গে আছি এবং যারা খোদার অস্তিত্বে অস্বীকার করে এবং খোদা ও খোদার ধর্ম, তাঁর গ্রন্থ এবং তাঁর পবিত্র রসূল মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-কে অস্বীকার করে এবং অসত্য মনে করে থাকে, তারা যেন একটি প্রকাশ্য নিদর্শন প্রাপ্ত হয় এবং অপরাধীদের শাস্তির পথ পরিষ্কার হয়। সুতরাং তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর, এক সুদর্শন এবং পবিত্র পুত্র সন্তান তোমাকে দেয়া হবে। এক মেধাবী পুত্র তুমি লাভ করবে। সেই পুত্র তোমারই ঔরসজাত তোমারই সন্তান হবে। সুশ্রী, পবিত্র পুত্র তোমার মেহমান আসছে। তার নাম আনমুয়ায়েল এবং সুসংবাদ দাতাও বটে। তাকে পবিত্রাত্মা দেয়া হয়েছে এবং তিনি নোংরামী থেকে মুক্ত। তিনি আল্লাহ্‌র নূর, তা আশিসপূর্ণ যা আকাশ থেকে আগমন করে। তার সাথে ‘ফযল’ (বিশেষ কৃপা) আছে, যা তার আগমনের সাথে উপস্থিত হবে। সে জাঁকজমক, ঐশ্বর্য ও গৌরবের অধিকারী হবে। সে পৃথিবীতে আসবে এবং তার ‘সঞ্জীবনী শক্তি’ এবং ‘পবিত্র আত্মার’ প্রসাদে বহু জনকে ব্যাধি মুক্ত করবে। সে কলেমাতুল্লাহ্-আল্লাহ্‌র বাণী। কারণ খোদার দয়া ও সূক্ষ্ম মর্যাদাবোধ তাকে সম্মানিত বাক্য দ্বারা প্রেরণ করেছেন। সে অত্যন্ত ধীমান, প্রজ্ঞাশীল, হৃদয়বান এবং গাম্ভীর্যশীল হবে। জাগতিক ও আধাত্মিক জ্ঞানে তাকে পরিপূর্ণ করা হবে। সে তিনকে চার করবে (এর অর্থ বুঝিনি)। সোমবার শুভ সোমবার। সম্মানিত প্রিয় পুত্র। মাযহারুল আওয়ালে ওয়াল আখেরে মাযহারুল হাক্কে ওয়াল উলা কা আন্নাল্লাহা নাযালা মিনাস্ সামায়ে (অর্থাৎ প্রথম এবং শেষ বিকাশ, সত্যের বিকাশস্থল ও সুউচ্চ যেন আল্লাহ্ আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে)। তার আগমন অশেষ কল্যাণময় হবে এবং ঐশী গৌরব ও প্রতাপ প্রকাশের কারণ হবে। জ্যোতি আসছে, জ্যোতি। খোদা তাকে তাঁর সন্তুষ্টির সৌরভ নির্যাস দ্বারা সিক্ত করেছেন। আমরা তার মধ্যে আপন রূহ ফুঁকে দিবো এবং খোদার ছায়া তার শিরে থাকবে। সে শীঘ্র শীঘ্র বাড়বে এবং বন্দীদের মুক্তির কারণ হবে। আর পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে প্রসিদ্ধি লাভ করবে। জাতিসমূহ তার কাছ থেকে আশিস লাভ করবে। তখন তার আত্মিক কেন্দ্র আকাশের দিকে উত্তোলিত হবে, ওয়া কানা আমরাম্মাক্বযিয়া (অর্থাৎ এটিই আল্লাহ্‌র অটল মীমাংসা)।

(ইশতেহার, ২০শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৮৬ ইং)

এই হলো ভবিষ্যদ্বাণীর পুরো বাক্যমালা। যদি ভাগ করা হয় তাহলে এতে প্রায় বায়ান্নটি পয়েন্ট রয়েছে। একস্থানে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) স্বয়ং বলেছেন, ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত অন্যান্য ইলহাম যোগ করলে পয়েন্ট দাঁড়ায় ঊনষাটে। এ হলো সেই মহান ভবিষ্যদ্বাণী যা পূর্ণ হবার জন্য তিনি (আ.) আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ঘোষণা করেন,

‘নয় বছরের মধ্যে এই পুত্র জন্ম লাভ করবে এবং আমি যা বর্ণনা করেছি সে মোতাবেক অসাধারণ গুণসম্পন্ন হবে।’

যদি এর বিস্তারিত বর্ণনা করতে যাই তাহলে অনেক সময় লেগে যাবে তাই সংক্ষেপে বলছি। এই ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে যখন তিনি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন এর কিছুদিন পর তাঁর ঘরে একটি কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করে। তার নাম ছিলো ইসমত। এতে বিরোধীরা অনেক হৈ চৈ আরম্ভ করে বলে, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। তিনি (আ.) বলেন,

‘আমিতো সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম একথা বলিনি যে অচিরেই জন্ম নিবে।’

যাইহোক, পুনরায় কিছুদিন পর আরেক ছেলে জন্ম নেয় আর তার নাম বশীর রাখা হয় এবং তাকে বশীর আউয়াল বলা হয়। কিন্তু কিছুকাল পর শিশুকালেই সেও মারা যায়। তখনও বিরুদ্ধবাদীরা প্রচন্ড হৈ চৈ আরম্ভ করে। বরং এই দু সন্তান জন্মের পূর্বেই যখন তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তখন পন্ডিত লেখরাম অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিটি বাক্যকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে খন্ডন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভবিষ্যদ্বাণীর একটি শদ্বকোষ হচ্ছে,

‘এক মেধাবী পুত্র তুমি লাভ করবে। সেই পুত্র তোমারই ঔরসজাত তোমারই সন্তান হবে।’

এর মোকাবিলায় লেখরাম লিখেছিল,

‘আমাকেও খোদা বলেছেন, তোমার বংশধারা অত্যল্প সময়ের মধ্যেই লুপ্ত হয়ে যাবে। সর্বোপরি তিন বছর পর্যন্ত প্রসিদ্ধি পাবে, যদি কোন পুত্র জন্মও নেয় তাহলে সে রহমত নয় বরং দুঃখ-বেদনার নিদর্শন হবে’।

নাউযুবিল্লাহ্। আরো অনেক বকবক সে করেছে। আজ মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়া ছাড়াও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে আল্লাহ্ তা’লা যে বলেছিলেন, তোমার মাধ্যমে বংশ বিস্তার হবে এর আলোকে আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বাহ্যিক উত্তরাধিকারীরাও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছেন। অপরদিকে লেখরামের বংশধর এর কথা জানা নেই যে তারা কোথাও আছে কি নেই। কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আধ্যাত্মিক সন্তানাদিতো বিশ্বের সর্বত্র বিরাজমান। প্রত্যেক দেশে এরা তারকার মত জ্বলজ্বল করছে। যাইহোক, বশীর আউয়ালের মৃত্যুর পর শত্রুরা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে এবং লেখরামের সাঙ্গপাঙ্গরা আরো উৎফুল্ল হয়ে উঠে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বারংবার বলেছেন, আমাকে আল্লাহ্ তা’লা যে সময় বলেছেন সে পর্যন্ত অপেক্ষা করো। যদি বলো, সময় অতি দীর্ঘ! তাহলে কে এমন আছে যে, এতদিন বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে? উপরন্তু পুত্র সন্তানের ভবিষ্যদ্বাণী করা তারপর পুত্র সন্তানের বেলায় কেউ এটিও বলতে পারে যে আন্দাযে বলে দিয়েছে। কেননা মানুষের পুত্রও হয় আবার কন্যাও হয়। কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

একথার কি নিশ্চয়তা যে, আমি সেসময় পর্যন্ত বেঁচে থাকবো?

এরপর একথাও বলা যেতে পারে যে কথাইতো বলতে হবে তবে সমস্যা কি? যেভাবে লেখরাম নিজের মত করে বলেছে সেভাবে ইনিও বলেছেন। কিন্তু তিনি (আ.) বলেছেন, পুত্র সন্তানের সাথে অনেক নিদর্শন রয়েছে যখন সেই নিদর্শনাবলী পূর্ণ হবে তখন বিশ্ববাসী এমনিতেই অবহিত হবে, ঘোষণাকারী অবশ্যই খোদার কাছ থেকে জ্ঞাত হয়ে ঘোষণা করেছেন এবং সত্য বলেছেন।

তিনি (আ.) বলেন,

‘যেসব অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে তার মেয়াদ যদি নয় বছরের দ্বিগুণও হতো তাহলে তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং মহিমায় কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি হতো না। বরং পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের হৃদয় সাক্ষ্য প্রদান করে যে, এমন এক অসাধারণ গুণসম্পন্ন মানুষ সম্পর্কে এত উন্নত মানের সংবাদ প্রদান করা মানব শক্তির ঊর্ধ্বে।’

অর্থাৎ কেবল পুত্রের সংবাদই দেন নি, বরং এমন এক পুত্রের সংবাদ দিয়েছেন যিনি এই সময়ের মধ্যে জন্ম নিবে, দীর্ঘজীবন লাভ করবে। ইসলামের সেবা করবে। মহানবী (সা.)-এর নাম পৃথিবীতে প্রসার করবে। এরপর বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে প্রসিদ্ধি লাভ করবে। যাইহোক ইসলামের শত্রদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আপত্তি উঠেছে, যেভাবে আমি বলেছি, নয় বছর মেয়াদকাল নিয়েও অনেক আপত্তি করা হয়েছে। আর প্রথম বশীরের মৃত্যুতে শত্রুরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছে। বশীর আউয়ালের মৃত্যুর উল্লেখ করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘বিরুদ্ধবাদীদের দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে, ৮ই এপ্রিল ১৮৮৬সনের প্রচার লিপিতে যে পুত্র সন্তান সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল সে জন্ম গ্রহণ করে এবং শিশুকালেই মারা যায়। এর বিস্তারিত উত্তর সেই বিজ্ঞাপনেই বর্ণিত রয়েছে। সংক্ষেপে এর উত্তর হচ্ছে, আজ পর্যন্ত আমরা কোন প্রচার লিপিতে একথা লিখিনি যে, এই ছেলেই দীর্ঘজীবন লাভ করবে আর একথাও বলিনি যে এই ছেলেই মুসলেহ্ মওউদ।’

অর্থাৎ প্রথম যে বশীর জন্ম নিয়েছিল সে-ই দীর্ঘায়ু লাভ করবে এবং মুসলেহ্ মওউদ এটা কোথাও বলা হয়নি। তিনি (আ.) বলেন,

‘বরং আমাদের ২০শে ফেব্রুয়ারী ১৮৮৬ সনের প্রচার লিপিতে আমাদের এমন কতক পুত্র সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে যারা অল্প বয়সেই মারা যাবে। সুতরাং চিন্তা করা আবশ্যক, এই ছেলের মৃত্যুর ফলে একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে না-কী মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। বরং আমরা মানুষের মাঝে যতবেশি ইলহাম প্রকাশ করেছি এর অধিকাংশ এই ছেলের মৃত্যুর প্রমাণ বহন করে। সুতরাং ২০শে ফেব্রুয়ারী ১৮৮৬ সনের প্রচার লিপির এই বাক্য এক সুশ্রী, পবিত্র পুত্র তোমার অতিথি আসছে।’

আমি খুতবার শুরুতে যে ভবিষ্যদ্বাণী পাঠ করেছি এর বাক্য এটি। তিনি (আ.) বলেন,

‘এই অতিথি শব্দটি মূলতঃ সেই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল এবং এটি তার অল্প বয়স এবং তাড়াতাড়ি মারা যাবার দলীল বহন করে। কেননা, অতিথি সে-ই, যে কয়েকদিন থেকে চলে যায় আর দেখতে দেখতেই বিদায় নিয়ে নেয়। আর যে স্থায়ী এবং অন্যকে বিদায় দেয় তার নাম অতিথি হতে পারে না। আর বর্ণিত প্রচার লিপির এই বাক্য যে, সে নিষ্পাপ হবে (অর্থাৎ গুনাহ্‌মুক্ত থাকবে) এটিও তার শিশুকালে মৃত্যুর প্রমাণ বহন করে। এতে ধোঁকা খাওয়া উচিত নয়, কেননা যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তা মুসলেহ্ মওউদ এর জন্য প্রযোজ্য। কেননা ইলহামের আলোকে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, এসব বাক্য মৃত পুত্রের জন্য প্রযোজ্য। আর মুসলেহ্ মওউদ এর জন্য যে ভবিষ্যদ্বাণী তা এই বাক্য দ্বারা আরম্ভ হয় যে তার সাথে ‘ফযল’ (বিশেষ কৃপা) আছে, যা তার আগমনের সাথে উপস্থিত হবে।’

অর্থাৎ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম তিন চার লাইন বা বাক্যাবলী প্রথম বশীর সম্পর্কে। তিনি (আ.) বলেন,

মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এই বাক্য থেকে আরম্ভ হয়, ‘তার সাথে ‘ফযল’ (বিশেষ কৃপা) আছে, যা তার আগমনের সাথে উপস্থিত হবে।’

সুতরাং মুসলেহ্ মওউদ এর নাম ইলহামী ভাষায় ‘ফযল’ রাখা হয়েছে এবং তার দ্বিতীয় নাম মাহমুদ আর বশীর সানী হচ্ছে তার তৃতীয় নাম। অন্য আরেকটি ইলহামে তার নাম ফযলে উমর বলে জানানো হয়েছে। আর এটি আবশ্যক ছিল। যতক্ষণ প্রথম বশীর মৃত্যুবরণ করে খোদার কাছে প্রত্যাবর্তন না করে ততক্ষণ তাঁর (মুসলেহ্ মওউদ) আগমন ভবিষ্যতের জন্য মুলতবি ছিলো। কেননা ঐশী প্রজ্ঞা এসব কর্ম তার জন্য নির্ধারিত রেখেছিল আর প্রথম বশীর যে মারা গেছে সে দ্বিতীয় বশীরের জন্য অগ্রদূত ছিল মাত্র। তাই একই ভবিষ্যদ্বাণীতে উভয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে।’

যাইহোক, ১২ই জানুয়ারী ১৮৮৯সনে ভবিষ্যদ্বাণীর তিন বছরের মাথায় এই পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ রাখা হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ১৮৯৪ সনে রচিত নিজ গ্রন্থ ‘সির্‌রুল খিলাফাহ্’তে লিখেন,

‘বশীর নামে আমার এক ছোট্ট শিশু পুত্র ছিল। (এখানে বশীর বলতে প্রথম বশীর এর কথা বুঝানো হয়েছে) দুধ খাওয়ার বয়সেই আল্লাহ্ তা’লা তাকে মৃত্যু দেন। তখন আল্লাহ্ তা’লা আমার প্রতি ওহী করলেন, আমরা তোমার প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ তাকে ফেরত পাঠাবো, একইভাবে তার মা-ও স্বপ্নে দেখেছেন, বশীর ফিরে এসেছে আর বলছে, আমি আপনার সাথে অত্যন্ত ভালবাসার সাথে সাক্ষাত করবো এবং হঠাৎ করে ছেড়ে চলে যাবো না। এই ইলহাম ও রুইয়ার পর আল্লাহ্ তা’লা আমাকে আরও একটি পুত্র সন্তান দান করেন। তখন আমি বুঝলাম, সর্বজ্ঞানী খোদা সত্য বলেছেন, সে-ই বশীর (প্রতিশ্রুত) এবং তার নামানুসারে আমি এর নাম বশীরই রাখলাম আর আমি এর মাঝে প্রথম বশীরের অবয়ব দেখতে পেলাম’। (সির্‌রুল খিলাফাহ্-রূহানী খাযায়েন-৮ম খন্ড,পৃ: ৩৮১)

সুতরাং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই মহান পুত্রের সত্ত্বায় যিনি দ্বিতীয় বশীর, অর্থাৎ মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ (রা.)-এর পক্ষে অত্যন্ত মহিমার সাথে মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে। গোটা বিশ্ব এর সাক্ষী। তিনি হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর তিরোধানের পর খলীফা মনোনীত হন। আর আল্লাহ্ তা’লার ফযলে বায়ান্ন বছরব্যাপী ছিল তাঁর খিলাফতকাল। তাঁর যুগে জামাত যেভাবে ভারতের বাইরে উন্নতি করেছে তাও এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। তাঁর যুগের ঘটনাসমূহ যদি আমরা সংকলন করতে চাই এবং এক খুতবায় বলতে চাই তাহলে তা কেবল কঠিনই নয় বরং অসম্ভব। কিন্তু এখন আমি ভবিষ্যদ্বাণীতে যেসব বিশেষ নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে তা পূর্ণ হওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করবো। হযরত মুসলেহ্ মাওউদ (রা.)-এর নিজ ভাষায় এবং অ-আহ্‌মদীরা যা বলেছেন তা তুলে ধরবো। এখানে একথাও বলে দিচ্ছি, হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.) যিনি মুসলেহ্ মওউদ ছিলেন, যতদিন আল্লাহ্ তাঁকে জ্ঞাত করেননি ততদিন তিনি নিজ সম্পর্কে এই ঘোষণা করেননি যে, আমি মুসলেহ্ মওউদ। আল্লাহ্ তা’লার কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ১৯৪৪ সনে তিনি ঘোষণা করেন,

আমিই মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যায়নস্থল এবং আমিই সেই প্রতিশ্রুত সংস্কারক যার মাধ্যমে ইসলাম বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছবে আর পৃথিবীতে তৌহীদ প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।

এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হবার ব্যাপারে কোন কোন অ-আহ্‌মদীর সাক্ষ্য প্রথমে তুলে ধরছি।

একজন সম্মানিত অ-আহ্‌মদী আলেম মৌলভী সামীউল্লাহ্ খান ফারুকী সাহেব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে ‘ইযহারে হক্ব’ শীর্ষক একটি কলামে লিখেন:

‘তিনি [অর্থাৎ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)] জ্ঞাত হন, ‘আমি তোমার জামাতের জন্য তোমার বংশধর হতে এক ব্যক্তিকে দন্ডায়মান করবো এবং তাঁকে আমার নৈকট্য এবং ওহীর মর্যাদায় ভুষিত করবো এবং তার মাধ্যমে সত্য উন্নতি লাভ করবে এবং বহু মানুষ সত্য গ্রহণ করবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী পাঠ কর এবং বারংবার পাঠ কর। এরপর ঈমানদারীর সাথে বলো যে, এই ভবিষ্যদ্বাণী কি পূর্ণ হয়নি? যে সময় এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল তখন বর্তমান খলীফা কেবলমাত্র শিশু ছিলেন এবং মির্যা সাহেবের পক্ষ হতে তাকে খলীফা নিযুক্ত করার কোন প্রকার ওসীয়্যতও করা হয়নি বরং খলীফা নির্বাচন করা সাধারণ মানুষের মতামতের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। অতএব যখন অধিকাংশ মানুষ হাকীম নূরউদ্দীন (রা.)-কে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করে নেয় তখন বিরোধীরা উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণিত বক্তব্য নিয়ে হাসি-ঠাট্টাও করেছে। কিন্তু হাকীম সাহেবের তিরোধানের পর মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ খলীফা নিযুক্ত হন এবং এটি বাস্তবতা যে, তাঁর যুগে আহ্‌মদীয়াত যতটা উন্নতি করেছে তা বিস্ময়কর। স্বয়ং মির্যা সাহেবের যুগেও আহ্‌মদীদের সংখ্যা খুবই অল্প ছিলো, খলীফা নূরউদ্দীন সাহেবের যুগেও তেমন কোন উন্নতি হয়নি কিন্তু বর্তমান খলীফার সময় মির্যাইয়্যাত বিশ্বের প্রায় সকল ভূখন্ডে পৌঁছে গেছে এবং অবস্থা বলছে, আগামী আদমশুমারীতে মির্যায়ীদের সংখ্যা ১৯৩১ এর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। উপরন্তু তার যুগে বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে মির্যাইয়্যাত (আহ্‌মদীয়াত)-কে নির্মূল করার জন্য যতটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা হয়েছে ইতোপূর্বে তা কখনো হয়নি।’

এটি একজন অ-আহ্‌মদীর বক্তব্য। তিনি কিছুটা হলেও সত্য লিখতে জানতেন, বর্তমান যুগের উলামাদের মত পুরোপুরি অন্ধ ছিলেন না।

‘মোটকথা ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তাঁর বংশধর থেকে এক ব্যক্তিকে জামাতের জন্য দন্ডায়মান করা হয় এবং তার মাধ্যমে জামাত বিষ্ময়করভাবে উন্নতি করে। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন হয় যে, মির্যা সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু পূর্ণ হয়েছে।’

এরপর একজন অমুসলমান সাংবাদিক হলেন অর্জুন সিং। তিনি অমৃতসর থেকে প্রকাশিত ‘রঙ্গীন’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি লিখেন,

‘১৯০১ সনে বর্তমান খলীফা মির্যা বশীর উদ্দীন মাহমুদ আহমদ যখন কেবল শিশু ছিল মাত্র তখন মির্যা সাহেব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, (তিনি যেহেতু দূররে সামীনের পঙক্তির আলোকে লিখেছেন তাই ১৯০১ বলেছেন) ‘বাশারত দী কেহ্ এক বেটা হ্যায় তেরা। জো হোগা একদিন মাহবুব মেরা। করুঙ্গা দুর উস মাহ্ সে আন্ধেরা। দেখাউঙ্গা কেহ্ এক আলম কো ফেরা।’ (তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে, সে একদিন আমার প্রিয়ভাজন হবে। বদন থেকে অন্ধকার দূর করবো তার, বিশ্বকে দেখাবো এক রূপান্তর-অনুবাদক) যদিও এই ভবিষ্যদ্বাণী বিস্ময় সৃষ্টিকারী! ১৯০১ সনে মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ কোন বড় আলেম বা ফাযেল ছিলেন না এবং তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও ছিল অপ্রকাশিত। তখন একথা বলা, তোমার এমন এমন গুণের অধিকারী একটি ছেলে হবে এটি অবশ্যই আধ্যাত্মিক শক্তির প্রমাণবাহী। একথা বলা যেতে পারে যে, মির্যা সাহেব যেহেতু দাবীর আলোকে একটি ব্যবস্থাপনার ভিত রচনা করেছিলেন তাই হয়তো তিনি এটি ধারণা করে থাকবেন, আমার পর আমার স্থলাভিষিক্তের মুকুট আমার ছেলের মাথায় থাকবে। কিন্তু এই ধারণা ভুল কেননা, মির্যা সাহেব খিলাফতের জন্য এই শর্ত আরোপ করেন নি যে অবশ্যই মির্যা সাহেবের খান্দান বা তাঁর সন্তানসন্ততি থেকে খলীফা নিযুক্ত হবে। সুতরাং প্রথম খলীফা এমন এক ব্যক্তি মনোনীত হন মির্যা সাহেবের পরিবারের সাথে তাঁর দূরতম কোন সম্পর্কও ছিলো না। এরপর প্রথম খলীফা হাকীম নূরউদ্দীন সাহেবের পর অন্য কারো খলীফা হওয়াও অসম্ভব ছিলো না। যেভাবে সেসময়ও লাহোরী জামাতের আমীর মৌলভী মোহাম্মদ আলী সাহেবও খলীফা হবার বাসনা পোষণ করতেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ মির্যা বশীর উদ্দীন মাহমুদ আহমদকে সমর্থন করেন ফলে তিনি খলীফা নিযুক্ত হন।’

অর্জুন সিং সাহেব স্বয়ং লিখছেন,

‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বড় মির্যা সাহেবের মাঝে কোন আধ্যাত্মিক শক্তি কাজ না করতো তাহলে তিনি এটি কীভাবে জানলেন যে, আমার অসাধারণ গুণের অধিকারী একটি ছেলে হবে। যখন মির্যা সাহেব উপরোক্ত ঘোষণা করেন তখন তাঁর তিন ছেলে ছিলো আর তিনি তিনজনের জন্যই দোয়া করতেন কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন কেবল একজনের ব্যাপারে। আর তা আমরা বাস্তবে এমনভাবে কার্যকর হতে দেখেছি যে তিনি বিশ্বের পট পরিবর্তন করে দিয়েছেন।’

এরপর প্রতিশ্রুত পুত্র সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীতে এটিও বলা হয়েছিলো,

‘যাতে ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব এবং আল্লাহ্ তা’লার কালামের মর্যাদা লোকের কাছে সুপ্রকাশিত হয়’

এ ব্যাপারেও অ-আহ্‌মদীদের সাক্ষ্য শুনুন যে তারা কি বলেছেন। ‘জমিদার’ পত্রিকায় মৌলভী জাফর আলী খাঁ সাহেব যিনি প্রসিদ্ধ মুসলিম নেতা এবং সুবক্তা ছিলেন তিনি লিখেছেন,

‘কান খুলে শোন! তোমরা এবং তোমাদের সাঙ্গপাঙ্গরা কিয়ামত পর্যন্ত মির্যা মাহমুদের মোকাবিলা করতে পারবে না। মির্যা মাহমুদের কাছে কুরআন এবং কুরআনের জ্ঞান আছে। তোমাদের কাছে এমন কি আছে?.......তোমরা কখনও স্বপ্নেও কুরআন পড়নি...........মির্যা মাহমুদের কাছে এমন জামাত আছে যারা তাঁর ইশারায় তন-মন-ধন তাঁর পদতলে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।.......মির্যা মাহমুদের কাছে মুবাল্লেগ আছে, বিভিন্ন জ্ঞানে অভিজ্ঞ মানুষ রয়েছে। বিশ্বের সকল দেশে তিনি পতাকা প্রোথিত করে রেখেছেন।’

‘দুঃসাহসী হবে এবং জাগতিক ও আধাত্মিক জ্ঞানে তাকে পরিপূর্ণ করা হবে’ এ সংক্রান্ত অ-আহ্‌মদীদের সাক্ষ্য রয়েছে। একজন প্রসিদ্ধ সাংবাদিক খাজা হাসান নিযামী দেহলভী তাঁর (রা.) সম্বন্ধে লিখেন, ‘অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকেন।’ হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) শিশুকাল থেকেই রোগাক্রান্ত। স্বয়ং তিনি লিখেছেন,

আমি শিশুকাল থেকেই খুব দুর্বল। চোখের পীড়া ছিলো, পড়তে পারতাম না, চোখ এতটা ফুলে যেতো যে কিছুই দেখা যেতো না। শিক্ষকবৃন্দ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন; বরং একদা হযরত মীর নাসের নওয়াব সাহেবও অভিযোগ করেন, এ অংক কষতে জানে না, পড়তে পারে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) হেসে সবার অভিযোগ উড়িয়ে দিতেন আর বলতেন আমরা একে দিয়ে কোন চাকুরী বা ব্যবসা করাবো না। আর হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করতেন, আপনার মত কী? তিনি বলতেন, একেবারে ঠিক আছে।

যাইহোক, কোনরূপ পার্থিব শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন নি বরং ধর্মীয় জ্ঞানের বেলায়ও তিনি খলীফা আউয়ালের সান্নিধ্যে বসে বক্তৃতাদি শুনতেন মাত্র। মূলত তাঁকে জাগতিক ও আধাত্মিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে খাজা হাসান নিযামী লিখেন,

‘অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকেন কিন্তু রোগ-ব্যাধি তার দৈনন্দিন কর্মকান্ডে কোনরূপ ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি প্রবল বিরোধিতার সময়ও ঠান্ডা মাথায় কাজ করে স্বীয় মোঘলী বিচক্ষণতা প্রমাণ করেছেন। আর এটিও জানা কথা যে মোঘলরা নেতৃত্ব প্রদানের বিশেষ ক্ষমতা রাখে, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় বুৎপত্তি রাখে এবং যুদ্ধ কৌশলও জানে। অর্থাৎ জ্ঞান ও কলমের যুদ্ধে অভিজ্ঞ।’

এরপর ভবিষ্যদ্বাণীতে আরেকটি শদ্বকোষ ছিলো, ‘বন্দীদের মুক্তির কারণ হবে’। এই ভবিষ্যদ্বাণীও কত মহিমার সাথে পূর্ণ হয়েছে তা দেখুন! আজ আমাদের সম্পর্কে বলা হয়, আমরা নাকি জিহাদ বিরোধী, কাশ্মীরিদের বিরোধী। কিন্তু হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) যে চেষ্টা বা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরছি। কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন তিনিই আরম্ভ করেছিলেন কেননা ‘অল ইন্ডিয়া কাশ্মীর’ নামে যে কমিটি বানানো হয়েছিল এর নেতৃত্ব প্রদানের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত ছিলো। আর অনেক বড় বড় মুসলমান নেতা এই কমিটির সদস্য ছিলেন। যেমন, স্যার জুলফিকার আলী খান, ড. ইকবাল, খাজা হাসান নিযামী, সৈয়দ হাবীব, বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক এবং রাজনীতিবিদ প্রভৃতি। এদের সবার পরামর্শক্রমে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-কে এই কমিটির সভাপতি মনোনীত করা হয়। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নূন্যতম মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত সেসব কাশ্মীরি মুসলমানদেরকে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। মুসলিম প্রেস হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-র এই সুমহান কর্মের স্বীকৃতি প্রদান এবং তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করতে গিয়ে একথাও লিখেছে,

‘যে যুগে কাশ্মীরের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীণ ছিলো এবং তখন যারা ধমীয় মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও মির্যা সাহেবকে সভাপতি মনোনীত করেছিলেন তারা কর্মের সফলতাকে দৃষ্টিপটে রেখে অতি উত্তম নির্বাচন করেছিলেন। সেসময় যদি ধর্মীয় মতানৈক্যের কারণে মির্যা সাহেবকে মনোনীত না করা হতো তাহলে আন্দোলন পুরোপুরি ব্যর্থ হতো এবং এই জাতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।’

আব্দুল মজীদ সালেক কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন এর বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেন:

‘শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ (শের-এ-কাশ্মীর) এবং কাশ্মীরের অন্যান্য কর্মীরা মির্যা মাহমুদ আহমদ সাহেব এবং তাঁর কতিপয় সহকর্মীর সাথে প্রকাশ্য যোগাযোগ রাখতেন এবং এই যোগাযেগের মূল কারণ ছিলো, মির্যা সাহেব যথেষ্ট অর্থ-সম্পদের মালিক হবার কারণে বিভিন্নভাবে কাশ্মীর স্বাধীনতা আন্দোলনের পিছনে সাহায্য করছিলেন।’

অর্থ-সম্পদতো এত বেশি ছিলো না কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার করা হতো।

‘এবং স্বভাবতই কাশ্মীরের নেতারা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলো।’

সৈয়দ হাবীব সাহেব একজন প্রসিদ্ধ সাংবাদিক এবং লাহোর থেকে প্রকাশিত ‘সিয়াসত’ পত্রিকার সম্পাদক আর ‘অল ইন্ডিয়া কাশ্মীর’ কমিটিরও সদস্য ছিলেন। যখন হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তখন তিনি তার পত্রিকার ১৮ই মে, ১৯৩৩ইং এর সংখ্যায় লিখেন:

‘আমার জ্ঞান মতে স্বীয় উন্নত যোগ্যতা সত্ত্বেও ড. ইকবাল এবং মালেক বরকত আলী সাহেব উভয়ে এই কাজ করতে সক্ষম হবে না। ফলে বিশ্ববাসীর সামনে এটি সুস্পষ্ট হয়ে যাবে, যে যুগে কাশ্মীরের অবস্থা শোচনীয় ছিলো সেযুগে যারা ধর্মীয় মতানৈক্য সত্ত্বেও মির্যা সাহেবকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিল তারা কর্মের সফলতার প্রতি দৃষ্টি রেখে সর্বোত্তম কাজ করেছিল। সেসময় ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে মির্যা সাহেবকে যদি নির্বাচিত না করা হতো তাহলে এই আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হতো এবং উম্মতে মুসলেমার চরম ক্ষতি হতো। আমার মতে, মির্যা সাহেবের পদত্যাগ কমিটির জন্য মৃত্যুতুল্য। সংক্ষেপে, আমাদের নির্বাচনের কারণ এখন বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

অর্থাৎ এখন বুঝা যাবে যে কাশ্মীর কমিটি কতটা কাজ করতে পারে আর এর বাস্তবতা বিশ্ব দেখেছে।

এই অবস্থা লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে হযরত মির্যা বশীর আহমদ সাহেব বলেন,

‘স্বল্প সময়ের যুদ্ধের পর সেখানে এমন এক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয় অথবা এই কমিটির নেতৃত্বে গণ আন্দোলন এতটা প্রবল রূপ ধারণ করে যে, বৃটিশ সরকার পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য হয়। কাশ্মীর শত শত বছরের গোলামীর শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে আরম্ভ করে। কাশ্মীরবাসীরা সংসদ লাভ করে, প্রচার মাধ্যম স্বাধীনতা ফিরে পায়, মুসলমানরা কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রাপ্ত হয়, মানুষ ফসল ঘরে উঠানোর ক্ষমতা ফিরে পায়, শিক্ষা ব্যবস্থা সহজতর হয়। যা পাওয়া যায়নি তা পাবার পথ প্রসারিত হয়। কাশ্মীরবাসীরা প্রকাশ্য জনসমাবেশে ‘ইমাম জামাতে আহ্‌মদীয়া-যিন্দাবাদ’ এবং ‘কাশ্মীর কমিটির সভাপতি-যিন্দাবাদ’ বলে ধ্বনি দেয়।’

যারা স্বাধীনতা লাভ করেছিল সেসব অ-আহ্‌মদীরা তখন এই ধ্বনি উচ্চকিত করেছে। কাশ্মীরবাসীর অবস্থা এমন ছিলো, তাদেরকে এমনভাবে গোলাম বানিয়ে রাখা হয়েছিল যাদেরকে বন্দীদশা থেকে মুক্তির কারণ হয়েছেন তিনি (রা.)। তিনি (রা.) স্বয়ং এর কাহিনী বলেছেন:

‘একবার আমরা কাশ্মীর গিয়েছিলাম। আমাদের কাছে যথেষ্ট মালপত্র ছিলো। তাই আমি একজন সরকারী অফিসারকে বললাম, আমাদের জন্য একজন কুলীর ব্যবস্থা করুন। রাস্তা দিয়ে একজন হেঁটে যাচ্ছিল তাকে ডেকে বলল, এদিকে আস এরপর তার মাথায় মালপত্র তুলে দেয়া হয়। কিছুদূর যাবার পর সেইলোক খুবই কাহিল হয়ে পড়ে। আমি বললাম, কাশ্মীরিরাতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়। আর তুমি যে মালপত্র বইতে পারছো না। সে বললো, আমিতো নিজ অঞ্চলের অনেক বড় এক জমিদার! আজ আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আর সে জোর করে আমার মাথায় মালপত্র চাপিয়ে দিয়েছে। যেহেতু এদের রাজত্ব তাই আমরা টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারি না। এই ছিলো কাশ্মীরবাসীর অবস্থা। ভালো অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষও একজন সাধারণ সরকারী অফিসারের সামনে কিছু বলার ক্ষমতা রাখতো না’।

এরপর পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের জ্ঞান সম্পর্কে অ-আহ্‌মদীদের মতামত কী? মাসিক ‘নিগার’ পত্রিকার সম্পাদক আল্লামা নিয়ায ফতেহ্‌পুরী সাহেব লিখেন,

‘তফসীরে কবীরের তৃতীয় খন্ড বর্তমানে আমার সামনে আছে। আর আমি অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তা অধ্যয়ন করছি। এতে কোন সন্দেহ নেই, কুরআন অধ্যয়নের একটি ধারা তিনি সূচনা করেছেন এবং এই তফসীর নিজ বর্ণনার দিক থেকে একেবারেই প্রথম একটি তফসীর যাতে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে জ্ঞান ও ইতিহাসের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। তাঁর জ্ঞানের প্রখরতা, তাঁর দূরর্দৃষ্টি, তাঁর অসাধারণ অর্ন্তদৃষ্টি এবং বিচক্ষণতা, তাঁর যুক্তি-প্রমাণের সৌন্দর্য এর প্রতিটি বাক্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন হয়। হায় পরিতাপ! আমি কেন এ পর্যন্ত অনবহিত ছিলাম। হায়! আমি যদি এর সবগুলো খন্ড দেখতে পেতাম। গতকাল সূরা হুদ এর তফসীরে হযরত লূত (আ.) সম্পর্কে তাঁর তফসীর পড়ে মন আনন্দে ভরে গেছে ফলে এই পত্র লিখতে বাধ্য হচ্ছি। তিনি هَؤُلَاءِ بَنَاتِي ’র তফসীর করতে গিয়ে সাধারণ মুফাস্‌সেরদের থেকে পৃথক যে অনন্য মতামতের অবতারণা করেছেন তা বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। খোদা আপনাকে দীর্ঘায়ু দিন।’

অন্যান্য মুফাস্‌সেররা এর অর্থ করতে গিয়ে হযরত লূত (আ.)-এর উপর অপবাদ আরোপ করে যে, নাউযুবিল্লাহ্ তিনি নাকি তাঁর লোকদেরকে বলেছিলেন, আমার মেয়েদেরকে নিয়ে যাও তবুও আমার অতিথিদের জ্বালাতন করো না। কিন্তু হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) একেবারেই এর ভিন্ন তফসীর করেছেন। যাইহোক, এটি একটি পৃথক বিষয়। এরপর পবিত্র কুরআনের জ্ঞান সম্পর্কে মওলানা আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী লিখেন:

‘কুরআন এবং কুরআনী জ্ঞানের বিশ্বময় প্রচার এবং তিনি তাঁর দীর্ঘজীবনে বীরত্ব এবং সাহসিকতার সাথে বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের জন্য যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে এর উত্তম পুরষ্কার দিন। জ্ঞানের আলোকে কুরআনের সত্যতা এবং তত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কিত যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও অনুবাদ তিনি করে গেছেন এরও একটি উন্নত ও স্বাত্রন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’

পার্থিব জ্ঞানে পরিপূর্ণ করা সম্পর্কে স্বয়ং হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) লিখেন:

‘ভবিষ্যদ্বাণীর মর্মার্থ হচ্ছে, তিনি পার্থিব জ্ঞান কারো কাছ থেকে আহরণ করবেন না বরং খোদার পক্ষ থেকে তাকে এই জ্ঞান শিখানো হবে।’

পুনরায় তিনি বলেন,

‘এখানে পার্থিব জ্ঞান বলতে অংকশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান ইত্যাদি হতে পারে না। কেননা এখানে ‘পরিপূর্ণ করা হবে’ এ বাক্য রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জ্ঞাত করে, খোদা তা’লার পক্ষ হতে তাঁকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হবে। আর খোদার পক্ষ হতে বিজ্ঞান, অংকশাস্ত্র এবং ভূগোল প্রভৃতির জ্ঞান শিখানো হয় না বরং ধর্ম এবং কুরআন শিখানো হয়। অতএব ভবিষ্যদ্বাণীর এই বাক্য ‘তাকে জাগতিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ করা হবে’ এর তাৎপর্য হচ্ছে, তাকে আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ হতে ধর্মীয় জ্ঞান এবং কুরআন শিখানো হবে এবং খোদা স্বয়ং তার শিক্ষক হবেন।’

তিনি (রা.) তাঁর একটি স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে বলেন, কীভাবে আল্লাহ্ তা’লা আমাকে শিখিয়েছেন তা দেখুন!

‘আমি একস্থানে নিজেকে দাঁড়ানো দেখতে পেলাম আর আমার মুখ পূর্বদিকে ফেরানো ছিলো। আকাশ থেকে এমন একটি শব্দ শুনতে পেলাম যেমন ঘন্টা বাজানোর শব্দ হয়ে থাকে অথবা পিতলের কোন টুকরোতে আঘাত করার ফলে তা থেকে মৃদু টুন টান শব্দ হয়। এরপর চোখের নিমিষে সেই শব্দ বিস্তৃত হতে থাকে এবং শব্দের মাত্রা বাড়তে থাকে আর পুরো দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আমি দেখলাম, সেই শব্দ পূঞ্জীভূত হয়ে ফ্রেমে বাঁধানো ছবির আকৃতি ধারণ করে। এরপর সেই ফ্রেমের মাঝে গতি সঞ্চার হতে আরম্ভ করে এবং এতে খুব সুন্দর ও অপরূপ এক ব্যক্তির ছবি ফুটে উঠে। অল্প সময় পড়ে সেই ছবি দুলতে আরম্ভ করে এবং অকস্মাৎ এর মাঝ থেকে লাফিয়ে এক ব্যক্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ায় আর বলতে আরম্ভ করে, আমি খোদার ফিরিশ্তা! আমাকে আল্লাহ্ তা’লা এজন্য তোমার কাছে পাঠিয়েছেন যেন আমি তোমাকে সূরা ফাতিহার তফসীর শিক্ষা দেই। আমি বললাম, শিখাও। সে ক্রমগত শিখাতে থাকে। ফিরিশ্তা إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ পর্যন্ত পৌঁছে বলে, আজ পর্যন্ত যত মুফাস্‌সের অতীত হয়েছেন, তারা সবাই এ পর্যন্ত তফসীর করেছেন। কিন্তু আমি তোমাকে এর পরেরটুকুও শিখাবো। আমি বললাম, শিখাও। অতএব সে আমাকে শিখাতে শিখাতে সূরা ফাতিহার পুরো তফসীর শিখিয়ে দেয়।’

পুনরায় তিনি (রা.) বলেন,

‘এই ভবিষ্যদ্বাণীতে দ্বিতীয় সংবাদ যা দেয়া হয়েছে তাহলো, ‘তাকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ করা হবে।’ আধ্যাত্মিক জ্ঞান দ্বারা সেই বিশেষ জ্ঞানকে বুঝায় যা আল্লাহ্ তা’লার বিশেষত্ব। যেমন: অদৃশ্যের জ্ঞান, যা তিনি তাঁর এমন বান্দার নিকট প্রকাশ করেন যার উপর তিনি এই পৃথিবীতে বিশেষ কোন দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। যদ্বারা খোদা তা’লার সাথে তাঁর সম্পর্ক প্রকাশ পায় এবং তার মাধ্যমে মানুষের ঈমান সতেজ করতে পারেন।’

আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে বিভিন্ন যে সংবাদ দিয়েছেন তাও অগণিত। এ প্রসঙ্গে তিনি (রা.) একটি স্বপ্নের উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন,

‘আমাকে সেই যুদ্ধ সম্বন্ধে অবহিত করা হয়েছে এবং তা আশ্চর্যজনকভাবে পূর্ণ হয়েছে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা)। একবার স্বপ্নে দেখলাম, আমি যুক্তরাজ্যে গিয়েছি এবং বৃটিশ সরকার আমাকে বলছে, আপনি আমাদের দেশের নিরাপত্তা বিধান করুন। আমি তাকে বললাম, প্রথমে আমাকে তোমাদের সমরাস্ত্র সম্পর্কে জরিপ করতে দাও। এরপর বলতে পারবো আমি তোমার দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো কী-না। এরপর সরকার আমাকে তাদের সমস্ত যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভাগ দেখায় এবং আমি সেগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। অবশেষে আমি বললাম, কেবল উড়োজাহাজের ঘাটতি রয়েছে। যদি উড়োজাহাজ পেয়ে যাই তবে আমি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবো। একথা বলামাত্রই দেখি যুক্তরাষ্ট্র হতে একটি তারবার্তা এসেছে যার বক্তব্য হচ্ছে:- The American Government has delivered 2800 Aeroplanes to the British Government অর্থাৎ ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার বৃটিশ সরকারকে ২৮০০ উড়োজাহাজ দিয়েছে।’ এরপর আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।’

তিনি (রা.) বলেন,

‘এ স্বপ্ন আমি চৌধুরী জাফরউল্লাহ্ খান সাহেবকেও শুনিয়েছিলাম। কিছুদিন পর আমি একদিন মসজিদে বসেছিলাম। শুনলাম আমার ফোন এসেছে। গিয়ে জানতে পারলাম, চৌধুরী জাফরউল্লাহ্ খান সাহেব ফোন করেছেন। তিনি বললেন, আপনি পত্রিকায় খবর পড়েছেন কি? আমি বললাম, না পড়িনি। তিনি বলেন, আপনার স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। এখনই একটি সার্কুলার এসেছে যা প্রথমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এসেছিল, এখন পত্র-পত্রিকায়ও এসে গেছে- যুক্তরাষ্ট্র সরকার বৃটিশ সরকারকে ২৮০০ যুদ্ধজাহাজ দিয়েছে।’

অনুরূপভাবে ১৯৪০ সনে বেলজিয়ামের বাদশাহ্ সম্পর্কে হাজারো লোকের সমাবেশে আমি আমার দিব্যদর্শন বর্ণনা করেছিলাম। এটা তিন দিনের মাথায় পূর্ণতা লাভ করে। এটিও ছিলো অদৃশ্যের সংবাদ। স্বপ্নটি ছিলো এমন,

‘আমি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন মাঠ দেখতে পেলাম। সেখানে গাঢ় সবুজ রঙের পোষাক পরিহিত একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার সম্পর্কে আমার মনে হলো, তিনি একজন ‘রাজা’। এরপর ইলহাম হলো ‘ABDICATED’। আমি ২৬শে মে তারিখে অনেক বড় একটি সমাবেশে আমার এ স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলাম, যেখানে মানুষ বৃটিশ সরকারের সফলতা কামনায় দোয়ার জন্য সমবেত হয়েছিল। আমি এর তা’বীর এটিই করেছিলাম, এ যুদ্ধে কোন ‘রাজা’কে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে অথবা কোন ক্ষমতাচ্যুত রাজার সহায়তায় অবস্থার পরিবর্তন সাধিত হবে। সুতরাং এ ইলহামের তিনদিন অতিবাহিত হতে না হতেই খোদা তা’লা বেলজিয়ামের ‘রাজা’ লিউ পোলড’কে অকস্মাৎ সিংহাসনচ্যুত করেন। ‘ABDICATED’ এর অর্থ হচ্ছে, by Denouncement or by Default এর অর্থ হচ্ছে, ‘কোন ঘোষণার মাধ্যমে বা এই গুরু দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ায় তাকে অবসর প্রদান করা।’ মোটকথা, হয় তিনি স্বয়ং বলবেন যে আমি ‘রাজা’র দায়িত্ব হতে অব্যাহতি চাইছি অথবা এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যার ফলে তিনি বাদশাহ্’র দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।’

তিনি (রা.) বলেন,

‘হুবহু এটিই ঘটলো এবং বেলজিয়াম সরকার এই শব্দ প্রয়োগ করে ঘোষণা করলো, আমাদের রাজা বর্তমানে জার্মান সরকারের কব্জায় রয়েছে তাই তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ। অতএব রাজা নয় বরং আমরাই এখন বেলজিয়ামের আইনগত সরকার।’

এ ধরনের অনেক ঘটনা রয়েছে। পুনরায় তিনি (রা.) নিজের সম্পর্কে বলেন,

‘সদা খোদার ছায়া তাঁর উপর থাকবে’। দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা কত মহিমার সাথে এই নিদর্শন পূর্ণ করেছেন; আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা আমার নিরাপত্তা বিধানকারী ও সাহায্যকারী হয়েছেন এবং শত্রুদের সকল আক্রমণ হতে সর্বদা আমায় নিরাপদে রেখেছেন।

তিনি (রা.) বলেন,

‘দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা কীভাবে এই ইলহামের সত্যায়নে অনবরত আমাকে হিফাযত এবং সাহায্য করছেন। এ যাবৎ আমার উপর এমন কোন ইলহাম অবতীর্ণ হয়নি যার ভিত্তিতে আমি বলতে পারি যে, কোন মানুষের হাতে আমি মৃত্যুবরণ করবো না। কিন্তু এটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যতদিন আমার কাজ অসম্পূর্ণ থাকবে ততদিন কেউ আমাকে হত্যা করতে পারবে না। অনবরত আমার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে, মানুষ আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা তাঁর অপার কৃপায় তাদের আক্রমণ হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন।’

তিনি (রা.) বলেন,

‘একবার আমি জলসায় বক্তৃতা দিচ্ছিলাম। অভ্যাসবশত বক্তৃতা দেয়ার সময় আমি দু এক ঢোক গরম চা পান করে থাকি যাতে গলা ঠিক থাকে। তখন জলসা গাহ্ হতে কোন এক ব্যক্তি এক কাপ মালাই দিয়ে বললো, এটি তাড়াতাড়ি হযরত সাহেবের কাছে পৌঁছে দিন, কেননা বক্তৃতা করতে করতে হুযুর দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অতএব এক দুই করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন হাত ঘুরে কাপটা বক্তৃতা মঞ্চে পৌঁছে যায়। হঠাৎ করে মঞ্চে উপবিষ্ট কোন একজন সতর্কতা হিসেবে একটু মালাই চেখে দেখে এবং এতে তার জিহ্বায় ক্ষত সৃষ্টি হয়। তখন জানা গেল যে এতে বিষ মিশানো ছিলো। যদি এ মালাই আমাকে দেয়া হতো এবং আল্লাহ্ না করুক আমি তা চেখে দেখতাম তাহলে এর কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হতো এবং আমার বক্তৃতা দেয়া বন্ধ হয়ে যেতো।’

তিনি (রা.) পুনরায় বলেন,

‘একদা এক পাঠান যুবক ছুরি নিয়ে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য আসে এবং আমি তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ঘর হতে বের হচ্ছিলাম মাত্র, তখন আব্দুল আহাদ খাঁন সাহেব ছেলেটির গতিবিধি লক্ষ্য করে বুঝতে পারলেন, তার কাছে অস্র রয়েছে। ফলে তিনি তাকে ধরে ফেলেন।’

এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা রয়েছে। আবার বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে তিনি (রা.) স্বয়ং বলেন,

‘কাশ্মীরের ঘটনাও এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার একটি জোড়ালো প্রমাণ এবং প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যে এ ঘটনাগুলোর প্রতি মনোযোগ সহকারে চিন্তা করে সে এটি স্বীকার করতে বাধ্য যে, আল্লাহ্ তা’লা আমার মাধ্যমেই কাশ্মীরবাসীর মুক্তির ব্যবস্থা করেন এবং তাদের শত্রুদের পরাজিত করেন।’

তিনি (রা.) বলেন,

‘কাশ্মীর জাতি এমন ভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলো যে সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল, এই জমি তাদের নয় বরং রাজা সাহেবের। এভাবে পুরো দেশবাসী যেন এক বর্গাচাষীর রূপ নিয়েছিলো এবং রাজা সাহেব ইচ্ছেমতো তাদেরকে জমি থেকে বের করে দিতো। তাদের না ছিল গাছ কাটার অনুমতি, আর না তারা জমি থেকে অন্য কোন সুবিধা ভোগ করতে পারতো।’

ভবিষ্যদ্বাণীতে আরেকটি বিষয় ছিলো, ‘পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে প্রসিদ্ধি লাভ করবে’। আল্লাহ্ তা’লার অপার কৃপায় এ ভবিষ্যদ্বাণীও হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-র যুগে অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ হয়েছে এবং পৃথিবীতে অনেকগুলো মিশনহাউস প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর যুগে সিলোন, মরিশাস, সূমাত্রা, জাভা, ষ্ট্রেটস সেটেলম্যান্টস, চীন, জাপান, বোখারা, রাশিয়া, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর, সুদান, আবিসিনীয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, আলবানিয়া, যুক্তরাষ্ট, যুগোস্লাভিয়া, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি প্রায় ৩৪/৩৫ টি দেশে মিশনহাউস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলাম প্রচার ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অবশ্য বেশ কিছু মিশনহাউস বন্ধও হয়ে যায়।

তিনি (রা.) পুনরায় বলেন,

‘এভাবে সহস্র সহস্র সদাত্মা আমার প্রচেষ্টায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আমার মাধ্যমে ইসলাম ও আহ্‌মদীয়াতের যে প্রচার ও প্রসার হয়েছে তা পুরো বিশ্বাবাসী অবহিত আছে।’

অতএব এ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়া সংক্রান্ত কয়েকটি কথা আমি উল্লেখ করেছি। এই ভবিষ্যদ্বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘চোখ খুলে দেখা উচিত, এটি শুধু একটি ভবিষ্যদ্বাণীই নয়, বরং এটি একটি মহান ঐশী নিদর্শন যাকে মহা প্রতাপশালী খোদা পরম মমতাশীল ও আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রকাশ করেছেন এবং সত্যিকার অর্থে এটা মৃতকে জীবন্ত করার চেয়েও শতগুণ উন্নত পরিপূর্ণ, শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম নির্দশন। কেননা মৃতকে জীবিত করার অর্থ হচ্ছে, খোদার দরবারে দোয়া করে এক সদাত্মা কামনা করা। অপার করুণা এবং অনুগ্রহ বশত হযরত খাতামুল আম্বিয়া (সা.)-এর অনন্ত আশিস ও কল্যাণে আল্লাহ্ তা’লা এই অধমের দোয়া কবুল করত এমন বরকতময় রূহ প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার পার্থিব ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ গোটা বিশ্বে প্রসার লাভ করবে। যদিও এই নিদর্শন মৃতকে জীবিত করার তুল্য মনে হয় কিন্তু অভিনিবেশ সহকারে দৃষ্টি দিলে জানা যাবে যে, এই নিদর্শন মৃতকে জীবন্ত করার চেয়ে শতগুণ শ্রেয়। মৃতের আত্মাও দোয়ার মাধ্যমেই প্রত্যাবর্তন করে আর এস্থলেও দোয়ার মাধ্যমে একটি রূহ কামনা করা হয়েছে। কিন্তু সেই রূহ্ আর এই রূহের মধ্যে লক্ষ ক্রোশ ব্যবধান রয়েছে। যারা মুসলমানদের মধ্যে লুক্কায়িত মুরতাদ তারা মহানবী (সা:)-এর মু’জেযাসমূহ বিকশিত হতে দেখে আনন্দিত হয় না বরং তারা এমন কেন হল বলে চরম দুঃখ পায়।’

অতএব ভবিষ্যদ্বাণীর প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব এবং তদ্‌সংক্রান্ত কিছু ঘটনা আমি সংক্ষেপে তুলে ধরেছি, এবং এ ভবিষ্যদ্বাণীর শান ও মর্যাদা কী তা আমরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই শেষ উদ্ধৃতিতে শুনেছি। তাই আমি আশা করবো, এখন সেসব আহ্‌মদী যারা অজ্ঞানতার কারণে বিভিন্ন স্থান হতে চিঠিপত্র লিখেন এবং কখনো কখনো এখানেও প্রশ্ন করে থাকেন। তারা প্রশ্ন করেন, আমরা মুসলেহ্ মওউদ দিবস কেন পালন করি এবং অনান্য খলীফার দিবস পালন করি না কেন? তাদের জন্য এখন সুস্পষ্ট হয়ে থাকবে যে, মুসলেহ্ মওউদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর দিনটি আমাদের ঈমানকে সতেজ করা এবং এই অঙ্গীকার স্মরণ করার জন্য উদযাপন করা হয়, আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামের সত্যতা এবং মহানবী (সা.)-এর সত্যতা বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করা। এটি তাঁর জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকীর দিন নয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর দোয়া কবুল করে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বংশ থেকে এক ব্যক্তির জন্মের নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী হিসেবে যাঁর উপর বিশ্ব মাঝে ইসলামের সত্যতা প্রতিপন্ন করার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিলো এবং তিনি তা করেছেনও। আর নেযামে জামাতের জন্য এমন ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করেছেন যার উপর পদচারণা করে পরবর্তীতে আগমনকারীরাও উন্নতির সোপান অতিক্রম করতে থাকবে। সুতরাং এদিনটি আমাদেরকে সর্বদা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করিয়ে ইসলামের উন্নতির জন্য স্বীয় সামর্থ ও যোগ্যতা প্রয়োগের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করে এবং করা উচিত। একটি নিদর্শন পূর্ণ হওয়া উপলক্ষ্যে জ্ঞানের স্বাদ উপভোগ করাই যথেষ্ট নয়। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে এর তৌফীক দিন। এখানে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, গতকালের ডাকে আমি কোন দেশের মজলিসে আনসারুল্লাহ্‌র অনুষ্ঠান সূচী দেখেছি, তারা লিখেছে মুসলেহ্ মওউদ দিবস উপলক্ষ্যে আমরা ব্যাপকভাবে খেলাখুলার আয়োজন করবো আর সামান্য ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। খেলাধুলার সাথে আনসারুল্লাহ্‌র কী সম্পর্ক? আনসারুল্লাহ্‌র উচিত ছিলো নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি রেখে সেই পথে পরিচালিত হবার চেষ্টা করা। যে পথের পানে পরিচালিত করার জন্য হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আনসারুল্লাহ্ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাতে আমরা মহানবী (সা.)-এর বাণী যতদ্রুত সম্ভব বিশ্বে প্রচার ও প্রসার করার চেষ্টা করি। আমি নাম নিচ্ছি না; যারাই এই প্রোগ্রাম বানিয়েছেন তারা এ বিষয়ে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতেও জামাতের লোকেরা এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবে বলে আমি আশা করি।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে