In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) - প্রথম অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৬ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং

‘আল্লাহ্ তা’লার ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন, হাদীস এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর লেখনীর আলোকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা।’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তা’লার নাম সমূহের একটি হচ্ছে ‘আল্ হাদী’। আরবী অভিধান গ্রন্থ ‘লিসানুল আরব’-এ এর অর্থ করা হয়েছে, সেই সত্ত্বা যিনি স্বীয় বান্দাদের আপন মা’রেফত দান করেন এবং তাঁকে চেনার পথ বাতলে থাকেন; যার ফলে সে তাঁর প্রতিপালনে বিশ্বাস স্থাপন করে। এই পথ কীভাবে আল্লাহ্ তা’লা প্রদর্শন করেন, যখন পথ দেখান তার পূর্বে কী পরিস্থিতি বিরাজ করে? এটি তখনই দেখান যখন বান্দা খোদা তা’লার প্রতিপালন বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে। অস্বীকারের বিভিন্ন ধরন ও বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। মানুষ কখনও বান্দাকে খোদা বানিয়ে বসে, যেভাবে খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-কে বানিয়েছে। কখনও মানুষ শক্তির অহমিকায় স্বয়ং খোদা এবং প্রতিপালক বনে বসে, যেভাবে বিগত নবীদের যুগে হয়েছে, ফেরআউনও এমনটি করেছে। অথবা এ যুগেও কেউ স্বয়ং নিজে খোদা হওয়ার দাবী করে অর্থাৎ এই পার্থিব জগতে খোদার মূর্ত বিকাশ বলে দাবী করে। কবর পূজা করার নির্দেশ দেয়। অথবা পার্থিব বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদেরকে অবিনশ্বর শক্তির অধিকারী মনে করে আর এ অর্থে প্রভু সেজে বসে আছে। মোটকথা তখন পৃথিবীতে এমন এক নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করে যার কোনো সীমা নেই। তখন খোদা তা’লা আপন শক্তি প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন যে, তিনিই রব্বুল আলামীন। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘খোদা তা’লা ‘রব্বুল আলামীন’ বাক্যাংশে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, তিনি সব কিছুর স্রষ্টা আর আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পক্ষ থেকে। এ পৃথিবীতে যত হেদায়াতপ্রাপ্ত জামাত অথবা পথভ্রষ্ট ও পাপাচারীর দল রয়েছে তারা সবই আলামীন (বিশ্বজগত) শব্দের অন্তর্ভূক্ত। কখনও ভ্রষ্টতা, কুফর, অবাধ্যতা এবং মধ্যপন্থা পরিহারের ঘটনা পৃথিবীতে বেড়ে যায়, এমন কি পৃথিবী যুলুম-অত্যাচারে ছেয়ে যায় এবং মানুষ মহা পরাক্রমশালী খোদার পথ পরিত্যাগ করে, না দাসত্বের তাৎপর্য বুঝে আর না-ই প্রতিপালকের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে।’

অর্থাৎ এটিও বুঝে না যে বান্দার অবস্থান কী আর এটিও জানে না যে, তাদের প্রভু-প্রতিপালকের মোকাম বা মর্যাদা কী?

পুনরায় বলেন,

‘যুগে অমানিশা ছেয়ে যায় আর ধর্ম এই বিপদের আবর্তে পিষ্ট হয়।’

তিনি বলেন যে,

‘তখন শয়তানী সৈন্যের মোকাবিলার জন্য অযাচিত-অসীম দাতা খোদার পক্ষ হতে একজন ইমাম নাযিল হন আর শয়তান ও রহমান (খোদা) উভয়ের সৈন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আর তাদের কেবল সেই দেখতে পায় যাকে দৃষ্টি শক্তি দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে মিথ্যা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় এবং মিথ্যার পক্ষে প্রদত্ত আলেয়া তুল্য দলিল-প্রমাণ কর্পূরের মতো উবে যায়। সুতরাং সেই ইমাম সর্বদা শত্রুর উপর জয়যুক্ত থাকেন এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত শ্রেণীর সাহায্যকারী হয়ে থাকেন।’

অতএব ইনি হলেন, হাদী খোদা, যিনি হেদায়াতের পথে আনার জন্য তাঁর রবুবিয়্যত বৈশিষ্ট্যকে কার্যকর করেন। কিন্তু যেভাবে তিনি (আ.) বলেছেন যে, আল্লাহ্ তা’লা শত্রুদের বিরুদ্ধে হেদায়াতপ্রাপ্ত দলের সাহায্যের আদলে বিজয়ের লক্ষণাবলী প্রকাশ করেন আর বিশৃঙ্খলা-পরায়ণদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে প্রতিহত করেন বরং সেসব শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগেই দেখুন, খ্রীষ্টানদের আগ্রাসন এমন ছিল যে, খ্রীষ্ট ধর্ম বিশ্বের সর্বত্র সফলতার পর সফলতার পথ পাড়ি দিচ্ছিল। ভারতের মুসলমানরাও তাদের খপ্পরে পড়ে অহরহ খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করছিল। খ্রীষ্টান মিশনারীরা ভারতে খ্রীষ্টধর্মের বিজয়ের অলীক স্বপ্নে বিভোর ছিল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কেবল ভারতেই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেননি বরং পিছু হটতে বাধ্য করেছেন। উপরন্তু আফ্রিকা যা তখন খ্রীষ্টান মিশনারীদের হাতের মুঠোয় ছিল সে সম্পর্কেও তারা বলতে বাধ্য হয়েছে যে,

আহ্‌মদীয়াত আফ্রিকায় কেবল আমাদের উন্নতির গতিই রুদ্ধ করেনি বরং আমাদের মূলোৎপাটন করেছে।

এভাবে আল্লাহ্ তা’লা হেদায়াতের পথে পরিচালিত করার জন্য আপন রবুবিয়্যত (প্রতিপালন) বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটান এবং স্বীয় ইমাম প্রেরণ করেন। কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কথা অনুসারে, তাদেরকে কেবল তারাই দেখতে পায় যাদেরকে দু’টি চোখ প্রদান করা হয়েছে। তারাই ইমামকে গ্রহণ করে যাদের দৃষ্টি কেবল পার্থিব জগত পর্যন্তই সীমিত নয়, যারা শুধু পার্থিব বিষয়ের দিকেই ছুটে না বরং ধর্মের জন্য হৃদয়ে দরদ রাখে এবং তার ধর্মের চোখ থাকা আবশ্যক। বড় বড় মুসলমান উলামা, যারা ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী হবার দাবী করে, তারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিরোধিতায় অন্ধের মত তাদের অর্জিত জ্ঞান ভুল পথে পরিচালিত করে পাশাপাশি এই জ্ঞানের ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহ্‌কেও পথভ্রষ্ট করে। অথচ পক্ষান্তরে সে যুগের উলামারা এটিও মানে, যা বিস্তারিতভাবে আমি আমার সাম্প্রতিক খুতবাগুলোতে বর্ণনা করেছি যে, মুসলমান এবং ইসলাম ধর্মের ভেতর চরম বিকৃতি ঘটেছে। মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম কেবল নামমাত্র অবশিষ্ট আছে। খিলাফতের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ ���রে ঠিকই কিন্তু খিলাফতের প্রথম ধাপ অর্থাৎ মসীহ্ এবং মাহ্‌দীর আগমন সম্পর্কে এরা এখন ভাবাই ছেড়ে দিয়েছে। তাঁর আগমনের মাধ্যমেই কেবল খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনও এই দৃষ্টিভঙ্গির উপরই অনড় যে, হযরত ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত বসে আছেন এবং তিনি পুনরায় আসবেন তারপর মাহ্‌দীর সাথে সম্মিলিতভাবে ধর্মের প্রচার করবেন। হাদীসগুলোকে ভুল বুঝে তারা এই ফলাফলে উপনীত। যাই হোক না কেন যতক্ষণ পর্যন্ত নবুয়তকে মানবে না ততোক্ষণ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ফলে সেই অবস্থাই বিরাজ করবে যা নিয়ে তারা হা-হুতাশ করে আর বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায়ও আসতে থাকে, কলাম লেখকরাও লেখে, উলামারাও নিজেদের বক্তৃতায় এমন বিষয় বলে বেড়ায়। আল্লাহ্ তা’লা যে এই উম্মতের মধ্য থেকেই মসীহ্ এবং মাহ্‌দী প্রেরণ করবেন এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে দোয়া শিখিয়েছেন। এরপরও যদি না মানে আর দোয়া করতে থাকে তাহলে আর কী করা যেতে পারে। আল্লাহ্ তা’লা একটি রীতি শিখিয়েছেন যে, এই দোয়া করো এবং নিষ্ঠার সাথে করো তাহলে আমি তোমাদের দোয়া কবুল করবো। এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন,

‘মুহাম্মদী নবুয়ত স্বীয় আশীস বণ্টনে অসমর্থ নয় বরং সকল নবুয়ত অপেক্ষা এতে অধিক ফয়েয বা আশীস রয়েছে। এই নবুয়তের অনুসরণ অতি সহজে খোদা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় এবং এর অনুবর্তিতায় খোদাপ্রেম ও তাঁর সাথে বাক্যালাপের পুরস্কার পূর্বাপেক্ষা অধিকহারে লাভ করা যায়। .... যখন সেই বাক্যালাপ মান, গুণ এবং সংখ্যার দিক দিয়ে পরম পর্যায়ে উপনীত হয়, আর তাতে কোনোরূপ দুষণ ও ত্রুটি অবশিষ্ট না থাকে’

অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লার সাথে বাক্যালাপ, বান্দার সাথে আল্লাহ্ তা’লার কথোপকথনের মান যখন এতোটা উন্নত হয় যে, এর মধ্যে কোনোরূপ পঙ্কিলতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি, বক্রতা অবশিষ্ট থাকে না,

‘এবং স্পষ্টত তা অদৃশ্য বিষয় সম্বলিত হয়’

প্রকাশ্যে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাকে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন,

‘অন্য কথায় এটিই নবুয়ত নামে অভিহিত হয়।’

অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লার সাথে বান্দার কথোপকথন এবং বাক্যালাপ, আল্লাহ্ তা’লা কর্তৃক বান্দাকে সম্বোধন করা, অদৃশ্য বিষয় জ্ঞাত করার বিষয়টি যখন চরমোৎকর্ষে পৌঁছে এরই নাম নবুয়ত। যা সম্পর্কে

‘সকল নবীর মতৈক্য রয়েছে। সুতরাং যে উম্মত সম্বন্ধে বলা হয়েছে,

أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ كُنْتُمْ خَيْرَ

[যাদেরকে বলা হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য উত্থিত করা হয়েছে’ (সূরা আল্ ইমরান: ১১১)] এবং যাদেরকে এই দোয়া শিক্ষা দেয়া হয়েছিল যে:

صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ

[‘তুমি আমাদেরকে সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত কর তাঁদের পথে, যাঁদেরকে তুমি পুরস্কৃত করিয়াছ’ (সুরা ফাতেহা: ৬-৭)]

এটি কখনও হতে পারে না যে, তারা সকলেই এই উচ্চমর্যাদা লাভে বঞ্চিত থাকবে এবং কোনো একজনও এই মর্যাদা লাভ করবে না। এমতাবস্থায় উম্মতে মুহাম্মদীয়ার অপূর্ণ ও অপরিণত থাকার ত্রুটিই শুধু থেকে যেতো না অর্থাৎ তারা সবাই অন্ধের ন্যায় হতো বরং আঁ-হযরত (সা.)-এর কল্যাণপ্রসারী শক্তি (কুওয়্যতে ফয়যান) কলঙ্কিত হতো, তাঁর পবিত্রকরণ শক্তি অসম্পূর্ণ প্রতিপন্ন হতো এবং তার সঙ্গে সেই দোয়া যা পাঁচবেলা নামাযে পাঠ করার জন্য শিক্ষা দেয়া হয়েছিল, তা শিখানো বৃথা সাব্যস্ত হতো।’ (আল্ ওসীয়্যত-পৃ: ১২-১৩)

একদিকে আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, তোমরা সর্বশ্রেষ্ট উম্মত যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য উদ্ভুত করা হয়েছে একই সাথে দোয়া ও শিখিয়েছেন যে, ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ এর দোয়া করো যাতে আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করেন; তাঁদের পথে যাঁদেরকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। আর পুরস্কারগুলো কী? নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং সালেহ্ হওয়া। তিনি বলেন যে, একদিকে এই দোয়া শিখানো হয়েছে আর বলা হয়েছে যে, তোমরা সর্বোত্তম জাতি তা সত্বেও মহানবী (সা.)-এর উম্মতের ভেতর এমন এক ব্যক্তিও কি নেই যিনি নবুয়তের এই পদমর্যাদা লাভ করতে পারেন। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে অদৃশ্যের সংবাদ দিবেন তাঁর সাথে বাক্যালাপ করবেন। এর অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো: ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيم দোয়া যা আমরা পাঁচবেলার নামাযে বেশ কয়েকবার পাঠ করে থাকি এবং বিশ্বের সকল প্রান্তে যেখানেই মুসলমানরা বাস করে এবং নামায পড়ে এই দোয়া করে। কিন্তু এসব সত্বেও খোদা তা’লা তা কবুল করছেন না।

হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেন,

‘আমি অনেককে এই দোয়া ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيم পড়তে বলেছি কেননা এই দোয়া পাঠ করতে কোনো সমস্যা নেই; যাতে আল্লাহ্ তা’লা সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেন। এর ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।’

সুতরাং আমিত্বের খোলস থেকে মুক্ত হয়ে, স্বীয় ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে এবং নিজের উপর যে আবরণ চড়িয়ে রেখেছে তাত্থেকে মুক্ত হয়ে, স্বীয় মস্তিষ্ককে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিরোধিতা থেকে মুক্ত করে যদি দোয়া করা হয় তাহলে আল্লাহ্ তা’লা সঠিক পথের দিশা দিবেন। এটি খোদার উপর অপবাদ আরোপের সমতূল্য যে, একদিকে তিনি বলেন যে, আমার কাছে দোয়া করো আমি কবুল করবো। যেমন, আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

অর্থ ‘এবং তোমাদের প্রতিপালক বলছেন, ‘আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো।’ (সূরা আল্ মোমেন: ৬১)

আমাদের পার্থিব বিষয়ের দোয়া সম্পর্কে আমরা প্রতিনিয়ত বলি, আল্লাহ্ কবুল করেছেন, আমরা এটা পেয়েছি, ওটা পেয়েছি। কিন্তু মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কৃত দোয়া যা স্বয়ং আল্লাহ্ শিখিয়েছেন তা শুনবেন না এটি কী করে হতে পারে। একদিকে নির্দেশ হলো, হেদায়াত লাভের জন্য আমার কাছে দোয়া করো, এহেন অবস্থায় যখন ধর্মের জন্য এক হাদীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তখন দোয়া করার সময় মানুষের উপর একটি বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি হয়। যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর উদ্ধৃতিতে বলেছেন, আল্লাহ্ তা’লাকে স্বীয় প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দোয়া করো যে, হে খোদা! তুমি এমন পরিস্থিতিতে হাদী প্রেরণ করে থাকো। উপরন্তু আল্লাহ্ই নাকি বলবেন, তোমার অন্যান্য দোয়া কবুল হবে বৈকি কিন্তু এই দোয়া গৃহীত হবে না। এটি আল্লাহ্ তা’লার উপর আপত্তি, আল্লাহ্ তা’লার সত্ত্বার উপর অপবাদ বৈ আর কিছু নয়। উম্মতে মুসলেমার শোচনীয় অবস্থা ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’লা বলবেন, ঠিক আছে, তোমরা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত; আর অবস্থাও মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করছে, করুক; যতো ইচ্ছে এ নিয়ে হা-হুতাশ হোক, ধর্ম উঠে গেছে তাও সত্য আর ঈমানও হারিয়ে গেছে। কিন্তু ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদানের নিমিত্তে তোমাদের জন্য হাদী প্রেরণের দোয়া আমি কবুল করবো না। এটি হতে পারে না যে, আল্লাহ্ বলবেন, তোমরা যতোই ক্রন্দন বা আহাজারি করো না কেন আমি তোমাদের হেদায়াতের কোনো ব্যবস্থা করবো না। যা করার ছিল তা আমি করেছি এখন হেদায়াতের সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। তবে একটি কথা অবশ্যম্ভাবী যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বারবার ঘোষণা করেছেন; তিনি বলেন,

‘আমি ছাড়া অন্য কোনো হাদী বা প্রথপ্রদর্শকের জন্য দোয়া ও নাক ঘষতে ঘষতে তোমাদের জীবন যদি নিঃশেষও হয়ে যায় তোমাদের সন্তানদের জীবন নিঃশেষ হয়ে যায় আর তোমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মও যদি অতীত হয়ে যায় তথাপি আর কোনো মসীহ্ মওউদ আসবে না, কোনো মাহ্‌দী আবির্ভূত হবে না। কারণ, যার আগমনের কথা ছিল তিনি এসে গেছেন। এখন তাঁকে মানা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।���

সুতরাং মুসলমানদের নিজেদের অবস্থার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেয়া উচিত। আহ্‌মদীদের উপর অত্যাচারের পরিবর্তে নেক নিয়্যতের সাথে খোদা তা’লার কাছে হেদায়াত লাভের জন্য দোয়া করা উচিত। বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত আহ্‌মদীদের উপর নিত্য নতুন যুলুম হচ্ছে। এরা অত্যাচারের নিত্য নতুন পথ খুঁজে, বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দিয়ে মনে করে যে, সম্ভবত এর ফলে কিছু মানুষ আহ্‌মদীয়াত পরিত্যাগ করবে। আহ্‌মদীয়াত যে শেষ হবার নয় এটা তারাও ভালভাবে জানে। ১৪ থেকে ১৬ বছরের আহ্‌মদী স্কুলগামী ছাত্র ও কিশোরদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্য সম্প্রতি এরা নতুন একটি কৌশল বের করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো,

‘নাউযুবিল্লাহ্ এরা নাকি শৌচাগারে বা অন্য কোনো নোংরা স্থানে মোহাম্মদ নাম লিখে মহানবী (সা.) এর সম্মানহানি করেছে।’

এরা স্বয়ং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত আর অপবাদ আরোপ করে আহ্‌মদীদের উপর। এমন অপকর্ম তারা করতে পারে যাদের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি নেই। যারা মহানবী (সা.)-এর মোকাম বা মর্যাদা সম্বন্ধে অনবহিত। এরাতো ১৪/১৫ বছরের কিশোর কিন্তু আহ্‌মদী ছোট্ট শিশু পর্যন্ত এমন অপকর্ম করতে পারে না। আগমনকারী মসীহ্ এবং মাহ্‌দীতো আমাদেরকে রসূলপ্রেমের সেই পথ দেখিয়েছেন, সেই অনুপম শিক্ষা প্রদান করেছেন যা তারা চিন্তাও করতে পারে না। যাই হোক, মুসলমানরা পৃথিবীর যে দেশেই বসবাস করুক না কেন আল্লাহ্ তা’লা তাদের বিবেক দিন যাতে এরা আহ্‌মদীদেরকে নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু বানানো থেকে বিরত থাকে। এবং হেদায়াতের পথ সন্ধান করার মানসে বিনয়ের সাথে খোদা তা’লার প্রতি সমর্পিত হয়।

এখানে আমি আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করছি, সম্প্রতি লাজনাদের রিফ্রেসার কোর্স হয়েছে। সেখানে কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল যে, নন-আহ্‌মদীরা বলে যে,

তোমরা মির্যা সাহেবকে যদি নবী বলা পরিত্যাগ কর তাহলে আমরা মানতে পারি।

প্রথম কথা হচ্ছে, এটিও ঐসব অতিসরল আহ্‌মদীদের ভুল ধারণা যারা এদের কথায় গলে যায় আর মনে করে যে, এরা মানবে। বিরোধিতা হয়তো কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যারা মানার নয় তাদের ভেতর কখনও মানার মতো সৎ সাহস হবে না। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজ উদ্ধৃতিতে নবীর যে সংজ্ঞা উপস্থাপন করেছেন, সেই দৃষ্টিকোন থেকে তিনি নবী এবং তিনি স্বয়ং বিভিন্ন স্থানে নবী হিসেবে দাবী করেছেন। যখন আল্লাহ্ তা’লা কোনো বান্দার সাথে অত্যধিক মাত্রায় বাক্যালাপ করেন, তাঁকে সম্বোধন করেন, তাঁকে অদৃশ্য বিষয়াবলী অবহিত করেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, এরই নাম নবুয়ত। আর বিগত সকল নবী একথাই বলে গেছেন। যদি এ দাবীকে অগ্রাহ্য করা আরম্ভ করেন তাহলে পরের ধাপে বলবে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর প্রতি যে ইলহাম হয় তাও বলো না। তখন তাদের এ আবদারও রক্ষা হবে। তারপর অন্য কোনো বিষয় পরিত্যাগ করার দাবী উঠবে। কেননা, যদি একবার মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত হয়ে দুর্বলতা দেখাতে থাকেন তাহলে নিজ ঈমানকেও দুর্বলতর করতে থাকবেন। প্রশ্ন হলো আমরা কি সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর দাবী এবং আল্লাহ্ ও রসূল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের বিপরীতে নতুন কোনো মসীহ্ এবং মাহ্‌দী উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো? এই দাবী এখানে এবং পাকিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে করা হচ্ছে। এদের দাবী অনুযায়ী নবুয়তের দাবী ছেড়ে দেবার পর, তাঁর মসীহ্ এবং মাহ্‌দী হবার দাবীও ধোপে টিকবে না। কেননা, মহানবী (সা.)-এর একটি হাদীস যাতে তিনি বলেছেন,

‘সাবধান! ঈসা ইবনে মরিয়ম [অর্থাৎ মসীহ্ মওউদ (আ.)] এবং আমার মধ্যে কোনো নবী নেই।’

সুতরাং আমরা যখন বলি যে, হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তিনি পুনরায় এ পৃথিবীতে আসতে পারেন না আর মহানবী (সা.)-এর উম্মতের মধ্য থেকেই মসীলে মসীহ্ জন্ম নিবেন; বুঝা গেল এই হাদীস অনুসারে তিনি আল্লাহ্‌র নবীই হবেন। অন্যথায় একথা মানতে হবে যে, তিনি নবী নন আর হযরত ঈসা (আ.) জীবিত আকাশে বসে আছেন, তিনি পরে আসবেন। যদি একবার নবুয়ত অস্বীকার করেন তাহলে কার্যত কথা যা দাঁড়াবে তাহলো ঈসা (আ.) তাঁর জন্য নির্ধারিত সময়ে আসবেন এবং তিনি নবী হবেন। তার অর্থ হলো এদের কথা মেনে, আপনি তাদের একথাও স্বীকার করলেন যে, হযরত ঈসা (আ.)ও জীবিত। যেভাবে আমি বলেছি, একথার জের স্বরূপ আপনাকে ধাপে ধাপে অনেক কিছু পরিত্যাগ করতে হবে। মহানবী (সা.) আগমনকারী ঈসা ইবনে মরিয়ম বা মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে নবী বলেছেন। মোটকথা যেসব আহ্‌মদী পুরো বিষয় অবহিত নয় তাদের কাছে এটি সুস্পষ্ট হওয়া চাই যে, যদি একটি বিষয় অস্বীকার করেন তাহলে অন্য দাবীকেও অস্বীকার করতে হবে। যেভাবে আমি বলেছি, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কেও মসীহ্ মওউদ মানা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারপর অ-আহ্‌মদীদের মতো এই বিশ্বাসের উপরও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যে, হযরত ঈসা (আ.) জীবিত আকাশে বসে আছেন এবং তিনি পৃথিবীতে আসবেন, অথচ হাদীসের আলোকে যে সময় নির্ধারিত ছিল তাও এখন অতিবাহিত হয়ে গেছে। সুতরাং নির্ভীকভাবে কোনোরূপ হীনমন্যতার আশ্রয় না নিয়ে তা-ই বলুন যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এর দাবী এবং মহানবী (সা.) যার ঘোষণা করেছেন। কেননা আহ্‌মদীদের জন্য এই শুভ সংবাদ রয়েছে যে, তারা সত্যের জ্যোতির মাধ্যমে অন্যের মুখ বন্ধ করে দেবে। সুতরাং এতে চিন্তিত হবার কী আছে?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সুরা ফাতিহার আয়াতের তফসীর করতে গিয়ে এক স্থানে বলেন,

‘এই সূরার ষষ্ঠ আয়াত হলো ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيم এটি যেন এ কথার ইঙ্গিত বহন করে যে, ষষ্ঠ সহস্রের অমানিশা স্বর্গীয় হেদায়াত প্রত্যাশা করবে আর মানুষের সুস্থ্য প্রকৃতি খোদার সন্নিধান থেকে একজন হেদায়াতদাতা অর্থাৎ মসীহ্ মওউদকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে।’ (তোহফা গোলড়বিয়া-পৃ: ১১২-টিকা)

ষষ্ঠ সহস্রাব্দ মসীহ্ মওউদ এর যুগ। ‘হাদী’র জন্যও আকুতি করছে; পুরো মহিমার সাথে আকাশ ও পৃথিবী যাঁর সমর্থন করেছে অথচ এরা তাঁকে গ্রহণ করতে চায় না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই উদ্ধৃতির আলোকে সুস্থ্য প্রকৃতির মানুষ খোদার কাছে একজন হেদায়াতদাতার জন্য আকুতি করবে; এ থেকে বুঝা যায় যে, তাদের অনেকের প্রকৃতি বা স্বভাব সুস্থ্য নয়। যেখানে এরা সুস্থ্যপ্রকৃতি সম্পন্ন নয় আর মানতে চায় না; প্রশ্ন হলো আমরা, যাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা মানার সৌভাগ্য দিয়েছেন, আমরা কি এদের সন্তুষ্ট করার জন্য হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর দাবীকে অস্বীকার করবো?

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) খুতবা ইলহামিয়ায় এক স্থানে বলেন:

‘খোদার কসম! কুরআন শরীফ যা সকল মতভেদের মিমাংসাকারী; এর কোথায়ও উল্লেখ নেই যে, মুহাম্মদী ধারার খাতামুল খোলাফা মূসায়ী ধারা থেকে আসবেন। তোমাদের কাছে যে বিষয়ের কোনো প্রমাণ নেই তার অনুসরণ করবে না। তোমাদেরকে এর বিপরীত কথা শিখানো হয়েছে। সুতরাং তোমরা বহুমুখী কথা বলবে না কেননা সেগুলো এমন যা অন্ধকারে ছোড়া তীর সদৃশ আর যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সত্য, তাই তোমরা প্রতারিত হবে না। সূরা ফাতিহায় দ্বিতীয়বার এ প্রতিশ্রুতির দিকে ইশারা করা হয়েছে। তোমরা সূরা ফাতিহার এই আয়াত অর্থাৎ صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ নিজেদের নামাযে পড়ে থাক তা সত্ত্বেও বিভিন্ন টালবাহানা করো আর খোদার প্রতিষ্ঠিত প্রমাণকে প্রত্যাখ্যানের পরামর্শ করো। তোমাদের কী হয়েছে যে, খোদার কথাকে পদতলে পিষ্ট করছো? তোমরা কি একদিন মরবে না? তোমরা কি জিজ্ঞাসিত হবে না? (খুতবা ইলহামিয়াহ্-পৃ: ৬৩-৬৪)

এ হলো অ-আহ্‌মদীদের জন্য আমাদের বক্তব্য।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর কিশতিয়ে নূহ্ গ্রন্থে صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ এর একটি সুন্দর তফসীর উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন যে, এই আয়াতে মুহাম্মদী ধারা হতে মসীহ মওউদ এর আগমনের কথা প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন:

‘মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে? সে-ই যে বিশ্বাস করে- খোদা সত্য এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর এবং তাঁর সৃষ্ট সকল জীবের মধ্যে যোজক স্থানীয় এবং আকাশের নিম্নে তাঁর সম-মর্যাদাবিশিষ্ট আর কোনো রসূল নেই এবং কুরআনের সমতুল্য আর কোনো গ্রন্থ নেই। অন্য কোনো মানবকেই খোদা তা’লা চিরকাল জীবিত রাখতে ইচ্ছে করেন নি কিন্তু তাঁর এই মনোনীত নবীকে তিনি চিরকাল জীবিত রেখেছেন। এবং তাঁকে চিরকাল জীবিত রাখার মানসে খোদা তা’লা তাঁর শরিয়ত এবং আধ্যাত্মিক শক্তিকে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণবর্ষী করেছেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’লা এই যুগে তাঁরই আধ্যাত্মিকতার প্রসাদে এই প্রতিশ্রুত মসীহ্‌কে জগতে প্রেরণ করেছেন, যার আগমন ইসলামের প্রাসাদটিকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য একান্ত আবশ্যক ছিলো। কারণ, ইহজগতের সময়সীমা অবসান হবার পূর্বে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মে একজন আধ্যাত্মিক মসীহ্‌র আবির্ভাব হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেমন ইতিপূর্বে মূসা (আ.)-এর ধর্মে এসেছিলেন। এই তত্বের প্রতিই কুরআন শরীফের صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ এই আয়াত ইঙ্গিত করছে।’ (কিশতিয়ে নূহ পৃ: ১৩)

সুতরাং এ হলো, ইসলাম এবং মহানবী (সা.)-এর সব ধর্ম ও সকল নবীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ; অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত এখন মহানবীর শরিয়ত এবং তাঁর আধ্যাত্মিকতার কল্যাণধারা প্রবহমান থাকবে আর মসীহ্ মওউদ এবং মাহ্‌দী (আ.) এই উম্মত থেকেই আসার কথা এবং এসেছেন, তাঁরা পৃথক কোনো সত্ত্বা নন। এক হাদীস অনুসারে উভয় উপাধি একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তাই তাঁকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন যে, এই দোয়ায় আগত ইমামকে মানার নির্দেশ রয়েছে। তিনি তাঁর রচিত জরুরতুল ইমাম পুস্তিকায় বলেন,

‘কুরআন শরীফে পার্থিব সমাজ-ব্যবস্থার বিষয়ে বাদশার অধিনস্ত হয়ে জীবন-যাপনের উপর যেরূপ গুরত্বারোপ করেছে, তদ্রুপ তাগিদ আধ্যাত্মিক ব্যবস্থার ব্যাপারেও রয়েছে। এর প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ তা’লা এ দোয়া শিখিয়েছেন: صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ (সূরা আল্ ফাতিহা: ৬-৭)

যেভাবে একটি পার্থিব সমাজব্যবস্থা এক নেতা, একজন বাদশাহ ও এক সরকারের মুখাপেক্ষী, আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনাও অনুরূপ, তারও একটি রীতি আছে, তিনি বিশ্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ * ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি (আ.) বলেন,

‘অতএব চিন্তা করা উচিত যে, এমনিতো কোনো বিশ্বাসী বরং কোনো সাধারণ মানব বা জীব খোদা তা’লার নেয়ামত হতে বঞ্চিত নয়, কিন্তু কেউ এটি বলতে পারবে না যে, সেগুলোর অনুসরণের জন্যও খোদা তা’লা আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, যাদের উপর পরম ও চরম আধ্যাত্মিক পুরস্কার বর্ষিত হয়েছে, আমাদেরকে তাঁদের পথে চলার এবং তাদের অনুগমন করার শক্তি দাও।’

এই দোয়া পশু বা অন্য কোনো সৃষ্টির জন্য নয়।

‘অত্রএব এই আয়াতে এর প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তোমরা যুগ ইমামের অনুগামী হও। স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, ‘যুগ ইমাম’ শব্দটিতে নবী, রসূল, মুহাদ্দাস ও মুজাদ্দিদ সকলেই অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু যারা আল্লাহ্‌র সৃষ্টির সংশোধন ও পথ প্রদর্শনের জন্য আদিষ্ট হন না’

অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লা যাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য এবং সৃষ্টির হেদায়াতের জন্য স্বয়ং প্রত্যাদিষ্ট করেন না,

‘এবং তদুপযোগী কামালত বা উৎকর্ষও প্রদত্ত হননি, তারা ওলী বা আবদাল হলেও ‘যুগ ইমাম’ হতে পারেন না।’

যুগ ইমাম তিনিই যাকে আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং যুগ ইমাম উপাধি প্রদান করেন।

(জরুরতুল ইমাম-পৃ: ২৩-২৪)

এ উদ্ধৃতিতে তিনি (আ.) এটি স্পষ্ট করেছেন যে, ওলী হওয়া বা আবদালদের অন্তর্ভূক্ত হওয়া মানুষকে নিজ থেকেই ইমামের পদমর্যাদা দেয় না। পুণ্যের ক্ষেত্রে পরম পর্যায়ে পৌঁছলেও বা খোদার অতি নৈকট্য লাভ করলেও ইমামের পদমর্যাদা লাভ হয় না যতক্ষণ না খোদা তা’লা দান করেন। তিনিই যুগ ইমাম যাঁকে খোদা তা’লা এই মর্যাদা দান করেন। এ যুগের ইমামও তিনিই যাঁকে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মাহ্‌দী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আবার কেবল মৌখিক দাবীই যথেষ্ট নয়, এর সাথে আসমানী ও পার্থিব নিদর্শনও আবশ্যক। সুতরাং صِرَٲطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ ’এর দোয়া শুধু মুসলমানদের জন্য হেদায়াত নয় বরং কোনো ব্যক্তি সে যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, সে খ্রীষ্টান, ইহুদী বা হিন্দু হোক না কেন যদি সে পবিত্র মনমানসিকতা নিয়ে দোয়া করে, যেভাবে আমি বলেছি, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) লিখেছেন যে,

‘আমি অনেক অমুসলমানকে এ দোয়া সম্পর্কে ভাবতে বলেছি। এ দোয়া নিয়ে ভাবতে কোনো অসুবিধা নেই, কেননা, এটি এমন কোনো দোয়া নয় যা শুধু মুসলমানই করতে পারে। এটি এমন একটি দোয়া, কোনো ব্যক্তি সে যে ধর্মেরই অনুসারীই হোক না কেন এ দোয়া করে পরিতৃপ্ত হতে পারে।’

মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেন,

‘আমার বলার পর বেশ কয়েকজন অমুসলিম দোয়া করেছেন এবং খোদা তাদেরকে পথ দেখিয়েছেন, তারা স্বপ্ন দেখে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণ করেছেন।’

সুতরাং এ দোয়ার মাধ্যমে খোদা যদি অমুসলমানদের পথ দেখাতে পারেন তাহলে মুসলমানদের কেন পারবেন না। সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এদের নিয়্যত ভাল নয়। বড় বড় শিক্ষিত আলেম; বাহ্যত নামায পড়ে কিন্তু হেদায়াত শুন্য। তাই বোঝা গেল যে, খোদার পক্ষ থেকে হেদায়াত লাভের জন্য স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়া আবশ্যক। যেভাবে খোদা তা’লা বলেন,

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থ: ‘নিশ্চয় যারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সাধনা করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের পানে আসার পথসমূহ্ প্রদর্শন করবো।’ (সূরা আন্‌কাবূত: ৭০)

হুযূর বলেন, সম্প্রতি এমটিএ’তে ইমাম সাহেব, মোমেন সাহেব ও আসেফ বাসেত সাহেবরা পার্সিকিউশন (আহ্‌মদীদের উপর বিরোধিতা সংক্রান্ত) এর উপর একটি অনুষ্ঠান পরিবেশন করছিলেন। একজন অ-আহ্‌মদী আলেম যিনি আমেরিকায় বসবাস করলেও সেসময় এখানে ছিলেন তিনি এমটিএ’তে ফোন করেন এবং বলেন যে, এ অনুষ্ঠান আমি দেখেছি। আপনারা কয়েকটি হাদীস ভুল পড়েছেন এবং অন্য কিছু কথা ভুল বলেছেন। আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই। আমাদের একজন কর্মী এখান থেকে গিয়ে তার সাকুল্য বক্তব্য রেকর্ড করে নিয়ে আসে। যাই হোক, আহ্‌মদীয়াতের শত্রুতায় তিনি অনেক কিছু বলেছেন যা তার কথায় ফুটে উঠেছে। এর বিস্তারিত উত্তর তার প্রশ্ন অনুসারে সেই অনুষ্ঠানে পুনরায় উপস্থাপিত হবে। কিন্তু একটি কথা যা তিনি বলেছেন তা সাধারণ কথা যা নন-আহ্‌মদীরা হরহামেশা বলেই থাকে অর্থাৎ ‘রা’ফা’র অর্থ হযরত ঈসার আধ্যাত্মিক ‘রা’ফা’ নয় যা আহ্‌মদীরা করে থাকে বরং এর অর্থ হলো স্বশরীরে আকাশে যাওয়া। এগুলো সাধারণ কথা, নন-আহ্‌মদীরা একথাই বলে থাকে। যাই হোক, একটি কথা আমার জন্য নুতন ছিল। তিনি বলেন যে,

‘আপনারা হযরত ঈসা’কে এজন্য মারতে চান কেননা, আহ্‌মদীয়াতের জীবন এতেই নিহিত।’

বক্তব্যে তিনি নিজের যথেষ্ট জ্ঞান প্রকাশ করেছেন, জামাতের বই পুস্তকও কিছুটা পড়েছেন আর তিনি পড়ার দাবীও করেছেন। হয়তোবা কিছুটা পড়েও থাকবেন। কিন্তু যদি তিনি মনোযোগ সহকারে চিন্তা করেন তাহলে বুঝবেন যে, আহ্‌মদী���াতের জীবন নয় বরং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন,

‘ঈসার মৃত্যুতে ইসলামের জীবন নিহিত।’

তিনি (আ.) বলেন,

‘ঈসাকে মরতে দাও এতেই ইসলাম জীবিত হয়’।

দুর্বল মুসলমাদের সামনে খৃষ্টানরা হযরত ঈসার জীবিত থাকার অলীক যুক্তিকেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। যদিও এখন অনেক মুসলমান আলেমও এ বিষয়টি আর উঠায় না কিন্তু এখনও অনেক এমন আলেম আছেন, পাশ্চাত্যে বসবাসকারী শিক্ষিত আলেমও রয়েছে যারা হযরত ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিত থাকা এবং শেষে যুগে কোনো সময় অবতরণের বিশ্বাস পোষণ করে। অতএব আমরা যুক্তির মাধ্যমে হযরত ঈসার মৃত্যু প্রমাণ করে ইসলামকে জীবিত ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছি। আর মুহাম্মদী মসীহ্‌কে মূসায়ী মসীহ্‌র প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করি। উদ্দেশ্য হলো, ইসলামকে জীবন্ত ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করা। কেননা আমাদের দাবীই এটি যে, আমরা যা কিছু করি ইসলামের জন্য করি এবং আহ্‌মদীয়াত কী? তা হচ্ছে সত্যিকার ইসলাম। যে খ্রীষ্টান আহ্‌মদীয়াতের তবলীগের কারণে ইসলাম গ্রহণ করে সে এ কারণেই ইসলাম গ্রহণ করে। যখন তাদের সামনে হযরত ইসা (আ.)-এর মৃত্যু সাব্যস্ত হয়ে যায়, তখন এটা না মেনে তাদের উপায় থাকে না আর ইসলাম যে জীবন্ত ধর্ম তা তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় আর তাদের নিজ ধর্মের অসারতা তাদের নিকট প্রকাশ পায়। যাই হোক, যেমন কিনা আমি বলেছি, এ ভদ্রলোকও যদি পবিত্র অন্তঃকরণে আল্লাহ্ তা’লার সমীপে দোয়া করেন, আল্লাহ্ তা’লার দরবারে ক্রন্দন করেন এবং ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٲطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ এর পথে চলার একটি বেদনা অন্তরে সৃষ্টি করেন, যদি তার অন্তর পবিত্র ও কলুষমুক্ত হয় তবে এটা অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তা’লা তার উপর করুণা করবেন। কেননা যদি ইসলাম প্রেমিকরা ইসলামের বিজয়ে কোনো আগ্রহ রাখে তবে স্মরণ রাখুন যে, মসীহ্ ও মাহ্‌দী যাঁর আবির্ভাব ঘটেছে তাঁর সাথেই এই উন্নতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতদ্ব্যতীত এখন আর অন্য কোনো চেষ্টা সফলকাম হতে পারে না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) খোদা তা’লার নামে এ কথা ঘোষণা করেছেন। আর আল্লাহ্ তা’লার ফযলে বিগত ১২০ বছর যাবত আমরা এর সত্যতা অবলোকন করছি। তিনি বলেন,

‘প্রায় ২০ বছর অতিবাহিত হলো যে, আমার উপর কুরআনের এ আয়াত ইলহাম হয়েছে। তা হলো:- هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ (সূরা আস্ সাফ্‌ফ: ১০) তিনিই সেই মহান খোদা যিনি স্বীয় ধর্মকে সকল ধর্মের উপর জয়যুক্ত করার জন্য নিজ রসূলকে হেদায়াত এবং সত্যধর্ম সহকারে পাঠিয়েছেন। আমাকে এই ইলহামের এ অর্থ বুঝানো হয়েছে যে, ইসলামকে সকল ধর্মের উপর আমার মাধ্যমে জয়যুক্ত করার উদ্দেশ্যে আমি খোদা তা’লার পক্ষ হতে প্রেরিত হয়েছি। আর এ ক্ষেত্রে স্মরণ থাকে যে, এটি হচ্ছে পবিত্র কুরআনের এক মহান ভবিষ্যদ্বাণী। এ সম্পর্কে উলামা ও চিন্তাবিদগণ একমত যে, এটি মসীহ্ মওউদ এর হাতে পূর্ণতা লাভ করবে। অতএব আমার পূর্বে যে সকল আউলিয়া ও আবদাল অতীত হয়েছেন এবং তাদের কেউ নিজেদেরকে এ ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূরণস্থল সাব্যস্ত করেন নি এ দাবীও করেননি যে, উল্লেখিত আয়াত আমার সম্পর্কে আমার প্রতি ইলহাম করা হয়েছে। যখন আমার সময় আসলো তখন আমার উপর এই ইলহাম হলো এবং আমাকে বলা হয়েছে যে, এ আয়াতের সম্বোধক তুমি এবং তোমারই হাতে আর তোমারই যুগে ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব অপরাপর ধর্মের উপর প্রমাণিত হবে।’ (তিরইয়াকুল কুলুব-পৃ: ৪৮)

পুনরায় তিনি (আ.) বলেন,

‘সেই খোদা যিনি নিজ প্রত্যাদিষ্টকে প্রেরণ করলেন, তাঁকে দু’টি বিষয়সহ প্রেরণ করেছেন। প্রথমত এই যে, তাঁকে হেদায়াতরূপী পুরস্কারে ভূষিত করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নিজ পথ সনাক্ত করার জন্য তাঁকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন।’

সেই হেদায়াতকে অর্জন করার জন্য আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে আধ্যাত্মিক চক্ষু দান করেছেন যার পরম লক্ষ্য হলো হেদায়াত প্রদান করা।

‘আর ইলমে লুদুন্নী দ্বারা তাঁকে স্বাতন্ত্রতা দান করলেন।’

অর্থাৎ এমন জ্ঞান দান করেছেন যা বিনা চেষ্টায় অর্জিত হয় যা আল্লাহ্ তা’লা নিজ সন্নিধান হতে অযাচিতভাবে দান করেছেন।

‘আর দিব্যদর্শন ও জ্ঞানের আলোকে তাঁর অন্তর আলোকিত করেছেন এবং এভাবে ঐশী তত্ত্বজ্ঞান, প্রেম-প্রীতি ও ইবাদতের যে দায়িত্ব তার উপর ছিল তা পালনের জন্য তিনি তাকে সাহায্য করেছেন আর এ জন্যই তাঁর নাম মাহ্‌দী রেখেছেন।’

এ সবকিছু যা পিছনে বর্ণিত হয়েছে এর পাশাপাশি তিনি তাঁর নাম মাহ্‌দী রেখেছেন।

‘দ্বিতীয় বিষয় যার দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছেন তাহলো সত্য ধর্মের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকভাবে রুগ্নদের আরোগ্য দান করা অর্থাৎ শরিয়তের শতশত সমস্যা ও জটিল বিষয়াদির সমাধান করে হৃদয়সমূহ থেকে সন্দেহ নিরসন করা। এ দৃষ্টিকোন থেকে তার নাম ঈসা রেখেছেন অর্থাৎ রুগ্নদের নিরাময়দাতা। বস্তুত এ আয়াতের দু’টো বাক্যাংশ অর্থাৎ بِالْهُدَى এবং دِينِ الْحَقِّ এর প্রথমটি থেকে প্রতিভাত হয় যে, সে-ই প্রেরিত মাহ্‌দী খোদার হাতে পরিশুদ্ধ হবেন আর খোদাই তাঁর শিক্ষক হবেন। আর দ্বিতীয় বাক্যাংশ دِينِ الْحَق থেকে প্রতিভাত হয় যে, তিনিই হলেন প্রেরিত ঈসা, যাঁকে পীড়িতদের আরোগ্য দান এবং রুগ্নদেরকে তাদের ব্যাধি সম্পর্কে সাবধান করার জন্য জ্ঞান দান করা হয়েছে আর সত্য ধর্ম দেয়া হয়েছে যেন তিনি সকল ধর্মের অনুসারীদের নত করতে পারেন, পরিশুদ্ধ করতে এবং ইসলামী আরোগ্য নিকেতনের প্রতি আকর্ষণ করতে পারেন। কেননা ইসলামের গুণাবলী ও শ্রেষ্ঠত্ব সার্বিকভাবে সকল ধর্মের উপর প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত তাই তার অপরাপর ধর্মের গুণ ও দোষ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।’

অর্থাৎ এমন জ্ঞান দেয়া হবে যদ্বারা অন্য ধর্মের গুণ ও দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে পারবে, বুৎপত্তি লাভ হবে।

‘আর অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ প্রতিষ্ঠা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে তাঁর অলৌকিক যোগ্যতা লাভ হওয়া আবশ্যক।’

অর্থাৎ ‘ইকামাতে হুজাজ’ এমনসব দলিল-প্রমাণ ও নিদর্শন যা সর্বদা স্থায়ী থাকবে তা তাঁকে দেয়া হবে এবং ‘ইফহামে খসম’ অর্থাৎ দলিল-প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে বিরুদ্ধবাদীদের প্রশ্ন এবং বিতর্কের উত্তর দেয়ার ক্ষমতা আগমনকারীকে দেয়া হবে। বিশেষভাবে একটি নিদর্শনরূপে তাঁকে এটি প্রদান করা হবে।

‘যেন সকল ধর্মের অনুসারীদের তাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে সাবধান করতে পারেন।’

অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীকে যেন তাদের মন্দকর্ম সম্বন্ধে সতর্ক করেন।

‘আর সকল অর্থে যেন ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেন, সকলভাবে আধ্যাত্মিক রোগীদের যেন চিকিৎসা করতে পারেন। বস্তুত আগত সংস্কারককে দু’টো যোগ্যতা দেয়া হয়েছে যিনি খাতামুল মুসলেহীন (সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক)। একটি ইলমুল হুদা যা মাহ্‌দী নামের দিকে ইশারা করে, যা মুহাম্মদী বৈশিষ্ট্যের বিকাশ অর্থাৎ নিরক্ষরতা সত্ত্বেও জ্ঞানপ্রাপ্ত হওয়া।’

অর্থাৎ জ্ঞানহীন হওয়া সত্বেও খোদা স্বয়ং শিখান আর এটিই মাহ্‌দী হবার চিহ্ন।

‘দ্বিতীয়ত, সত্যধর্মের শিক্ষা দেয়া যা নিরাময়ী নিঃশ্বাষের ইঙ্গিত বহণ করে।’

যা আধ্যাত্মিক আরোগ্যের প্রতি ইশারা করে।

‘অর্থাৎ সার্বিক দৃষ্টিকোন থেকে আধ্যাত্মিক ব্যাধি দূর করা ও পুরো যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের শক্তি প্রাপ্ত হওয়া। হেদায়াতরূপী জ্ঞান ঐশী কৃপার উপর নির্ভর করে যা মানুষের মাধ্যম ছাড়াই খোদা তা’লার পক্ষ থেকে লাভ হয়। এব��� ‘দ্বীনুল হক’ বৈশিষ্ট্য মানুষের কল্যাণ, হৃদয়ের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার দলীল বহণ করে।’

অর্থাৎ প্রথমে তাঁকে জ্ঞান দান করেছেন, তিনি নিজে শিখে পরে তা প্রসার করেছেন যাতে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।

(আরবাঈন, নাম্বার-২-পৃ: ৯-১০)

অতএব এ হলো খোদা প্রেরিত মসীহ্ ও মাহ্‌দীর পদমর্যাদা যাকে খোদা তা’লা এযুগে পৃথিবীবাসীর হেদায়াত ও ইসলামের নব জীবনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যাতে ইসলামের সমুজ্জল শিক্ষা মানুষের সামনে সুস্পষ্ট ও প্রতিভাত হয়। আল্লাহ্ তা’লা পৃথিবীবাসীকে এই মসীহ্ ও মাহ্‌দীকে গ্রহণের তৌফীক দান করুন আর আমাদের তৌফীক দিন আমরা যেন হাদী খোদার প্রেরিত মাহ্‌দীর শিক্ষা অনুসারে যে পথে বিচরণ করছি তার উপর অবিচলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি আর কখনও যেন হোঁচট না খাই এবং সে গন্তব্যের দিকে ধাবমান থাকি যা আমাদেরকে খোদার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে।

নামাযান্তে আমি কয়েকটি গায়েবানা জানাযার নামায পড়াবো। একটি হচ্ছে মোহতরামা খাতামুন্নেসা দরদ সাহেবার। তিনি প্রয়াত মোকাররম মওলানা শফী আশরাফ সাহেবের সহধর্মিণী ছিলেন। ৭৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । তিনি লাজনা ইমাইল্লাহ্‌র অনেক কাজ করেছেন। মরহুমার স্বামী যিনি জামাতের মোবাল্লেগ ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি স্বামীর সাথে তাঁর কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সাদাসিধে স্বল্পেতুষ্ট জীবন কাটিয়েছেন। স্বল্পভাষীনি, মিশুক এবং খুবই দোয়াগো ছিলেন। তার দু’ছেলে আর দু’জনই ওয়াকফে যিন্দেগী। মোহাম্মদ আহমদ আশরাফ সাহেব হচ্ছেন ফযলে উমর হাসপাতালের একজন ডাক্তার। মাহমুদ আহমদ আশরাফ সাহেব, জামেয়া আহ্‌মদীয়া রাবওয়ার শিক্ষক। এছাড়া দু’কন্যা রয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমার পদমর্যাদা উন্নীত করুন।

আরেকটি জানাযা হচ্ছে, মরহুম ডা. আব্দুর রহমান সিদ্দিকী সাহেবের পত্নী মোহতরামা সেলিনা বেগম সাহেবার। তারও মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। গত কয়েকমাস পূর্বে তার যুবক ছেলে মোকাররম ডা. আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবকে শহীদ করা হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই শোক সহ্য করেছেন। গত ২রা ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । তিনি ডা. হাশমত উল্লাহ্ খাঁন সাহেবের কন্যা যিনি হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-র চিকিৎসক ছিলেন এবং তার অন্তিম শয্যায় চব্বিশ ঘন্টা তাঁর সাথেই ছিলেন। ভাল ধর্মীয় জ্ঞান রাখতেন, বালক-বালিকাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করতেন আর মিরপুর খাসে দীর্ঘ সময় লাজনার সদর ছিলেন। মরহুমার স্বামীকে যখন হযরত হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) মিরপুরে গিয়ে বসবাস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন পুরো আনুগত্যের সাথে তিনি সেখানে স্বামীর সাথে বসবাস করেন। সেখানে জামাতকে সংগঠিত করেন। তার একমাত্র সন্তান ছিলেন ডা. মান্নান সিদ্দিকী সাহেব, যিনি শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমার পদমর্যাদা উন্নীত করুন।

তৃতীয় জানাযা হচ্ছে, ইন্দোনেশীয়ার রঈসুত্ তবলীগ মোকাররম সইয়্যুতি আযিয আহমদ সাহেবের স্ত্রী আফীফা সাহেবার। তিনি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ । মরহুমা মওলানা আব্দুল ওয়াহেদ সুমাত্রী সাহেবের কন্যা ছিলেন। খোদার ফযলে মূসী ছিলেন, গোটা জীবন সেখানেই কাটিয়েছেন। অত্যন্ত দোয়াগো এবং দরিদ্রের লালনকারীনি ছিলেন। মরহুমা জামাতে আহ্‌মদীয়া ইন্দোনেশীয়ার আমীর এবং মোবাল্লেগ ইনচার্জ আব্দুল বাসেত সাহেবের ভগ্নী ছিলেন। তিনি দু’পুত্র এবং দু’কন্যা রেখে গেছেন। আল্লাহ্ তা’লা সবাইকে নেকীর উপর প্রতিষ্ঠিত করুন এবং মরহুমার পদমর্যাদা উন্নীত করুন।

চতুর্থ জানাযা নারওয়ালের একটি গ্রামের বাসিন্দা মির্যা মোহাম্মদ আসলাম সাহেবের পুত্র মির্যা মোহাম্মদ আকরাম সাহেবের। তিনি প্রায় যুবক বয়সে মৃত্যুর বরং আনসারুল্লাহ্তে পদার্পণ করেছিলেন মাত্র, কদিন পূর্বে তার দোকান ডাকাতি হয় এবং ডাকাতদের ফায়ারকৃত ২৩টি বুলেট তার শরীরে বিদ্ধ হয় ফলে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ দৃষ্টিকোন থেকে তিনিও শহীদ। জামাতী কাজে বড় অগ্রগামী এবং নির্ভীক দায়ী-ইলাল্লাহ্ ছিলেন। অনন্য গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। আর্থিক কুরবানীর বেলায়ও যথেষ্ট অগ্রগামী ছিলেন। তিনি বিভিন্নভাবে জামাতের খিদমত করার তৌফিক পেয়েছেন। শাহাদত বরণের সময়ও স্থানীয় সেক্রেটারী তাহরীকে জাদীদ, সেক্রেটারী রিশতানাতা এবং হালকার যয়ীম আনসারুল্লাহ্ ছিলেন। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমকে দীর্ঘদিন খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়ার কায়েদ হিসেবেও কাজ করার তৌফিক দিয়েছেন। তার সন্তানরা এখনও ছোট-ছোট ৭ থেকে ১৫ পর্যন্ত যাদের বয়স। আল্লাহ্ তা’লা এই শিশুদেরকে ধৈর্য ও সাহস দিন এবং তার পদমর্যাদা উন্নীত করুন। আমি পূর্বেই বলেছি নামাযের পর মরহুমদের গায়েবানা জানাযার নামায পড়াবো।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে