In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহ্ তা’লার গুণবাচক নাম কাফী (আল্লাহ্ই যথেষ্ট) - তৃতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৩০শে জানুয়ারি, ২০০৯ইং

আল্লাহ্ তা’লা স্বীয় প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাঁর প্রিয় মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জন্য সর্বত্র যথেষ্ট হয়েছেন।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) স্বীয় মনিব ও নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পদাঙ্ক অনুসরণে যে মর্যাদা বা সম্মান লাভ করেছিলেন তা প্রত্যেক আহ্‌মদীর কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট। গত খুতবায় আমি আল্লাহ্ তা’লার ‘কাফী’ (খোদা যথেষ্ট) বৈশিষ্ট্যের বরাতে উল্লেখ করেছিলাম যে, মহানবী (সা:)-এর সাথে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসার উন্নত মানে অধিষ্ঠিত হবার কারণে তিনি আল্লাহ্ তা’লার অতি প্রিয়ভাজন হয়েছেন। তাঁর অগণিত ইলহাম একদর সাক্ষ্য বহণ করে; যার মধ্যে আরবী, উর্দূ এবং ফারসী ইলহাম অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। গত খুতবায়ও আমি উল্লেখ করেছি, আল্লাহ্ তা’লা কুরআনের কতক আয়াতাংশ তাঁর প্রতি ইলহাম করেছেন। জামাতে আহ্‌মদীয়ার জীবনে আগত প্রতিটি দিন এর সাক্ষ্য প্রদান করে যে, নিশ্চয় তাঁর ইলহাম সত্য ও নিশ্চিত আর তাঁর দাবীও সত্য ছিল। আল্লাহ্ তা’লার প্রতি মিথ্যা আরোপকারী বিশেষত: নবুয়তের মত মিথ্যা দাবীদার কখনও রেহাই পেতে পারে না। আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে এই অমোঘ নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। যেভাবে পবিত্র কুরআনের সূরা আল্ হাক্কা’র আয়াতে বলেন,

وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْاَقَاوِيْلِۙ‏

لَاَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِيْنِۙ‏

ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِيْنَ

فَمَا مِنْكُمْ مِّنْ اَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِيْنَ‏

অর্থ:‘এবং সে যদি কোন কথা মিথ্যা রচনা করে আমাদের প্রতি আরোপ করতো, তাহলে নিশ্চয় আমরা তাকে ডান হাতে ধৃত করতাম, অত:পর আমরা তার জীবন-শিরা কেটে দিতাম, তখন তোমাদের কেউই তাঁর (আযাব) হতে তাঁকে ঠেকিয়ে রাখতে পারতো না।’ (সূরা আল্ হাক্কা: ৪৫-৪৮)

সুতরাং আল্লাহ্ তা’লার প্রতি যে মিথ্যা আরোপ করে তার জন্য তিনি এটি একটি নীতিগত মাপকাঠি বর্ণনা করেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-ও একে আপন সত্যতার মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি (আ:) বলেন,

‘খোদা তা’লা সত্যবাদীর আরো একটি পরিচিতি নির্ধারণ করেছেন আর তাহলো, মহনাবী (সা:)-কে বলেছেন, যদি তুমি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করো তাহলে আমি তোমাকে ডান হাতে ধৃত করবো। আল্লাহ্ তা’লার নাম নিয়ে মিথ্যাদাবীকারী, প্রতারক কখনও সফল হতে পারে না বরং ধ্বংস হয়ে যায়। আমি খোদা তা’লার ওহী প্রকাশ করে আসছি প্রায় পঁচিশ বছরকাল অতিবাহিত হয়েছে। যদি প্রতারণা হতো তাহলে এই জালিয়াতির শাস্তিস্বরূপ নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যবস্থা নেয়া কি খোদার জন্য আবশ্যক ছিল না? উপরন্তু আমাকে শাস্তি দেবার পরিবর্তে আমার সমর্থনে শত শত নিদর্শন প্রকাশ করেছেন আর আমাকে সাহায্যের পর সাহায্য করেছেন। প্রবঞ্চকদের সাথে এরূপ করা হয় কি? আর দাজ্জালরা এমন সাহায্যপুষ্ট হয় কি? কিছুটা অন্তত চিন্তা করো, এমন কোন দৃষ্টান্ত দেখাও। আমি দাবীর সাথে বলতে পারি যে, কখনও এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবে না। (আল্ হাকাম ৭ম খন্ড, নাম্বার:৭, তারিখ ২১শে ফেব্রুয়ারী,১৯০৩-পৃ: ৮)

অন্যত্র তিনি (আ:) বলেন,

‘মহানবী (সা:)-এর জন্য বিধান হচ্ছে, যদি তুমি আমার প্রতি একটি মিথ্যা আরোপ করতে তাহলে আমি তোমার জীবন-শিরা কেটে দিতাম যেভাবে * وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ * لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ আয়াতের আলোকে কথা স্পষ্ট হয়। আর এখানে বিগত চব্বিশ বছর ধরে প্রত্যহ খোদার সাথে প্রতারণা চলছে আর খোদা স্বীয় চিরন্তন সুন্নত বা রীতি কার্যকর করছেন না! মন্দকর্ম এবং মিথ্যার উপর কখনও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা যায়না। একপর্যায়ে মানুষ মিথ্যা পরিত্যাগ করেই থাকে। আমার স্বভাব কি এমনই যে, আমি বিগত চব্বিশ বছর ধরে এই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত আর অনবরত বলেই চলছি আর এর মোকাবিলায় খোদা তা’লা নিশ্চুপ বসে আছেন পরন্তু সর্বদা সমর্থনের পর সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যদ্বাণী করা বা অদৃশ্যের জ্ঞান থেকে অংশ লাভ করা কোন সাধারণ ওলীর জন্যও সম্ভব নয়। এই নিয়ামত তিনিই শুধু লাভ করেন যিনি মহাসম্মানিত খোদার দরবারে বিশেষ সম্মানের আসনে আসীন থাকেন।’ (আল্ হাকাম ৮ম খন্ড, নাম্বার:১৯, তারিখ ১০ থেকে ১৭ই জুন,১৯০৪-পৃ:৬)

পুনরায় বলেন,

‘যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা বলে তাহলে তাকে ধ্বংস করা হবে। এটি বোধগম্য নয় যে, কেন আঁ-হযরত (সা:)-কে এক্ষেত্রে বিশেষত্ব প্রদান করা হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা:) যদি আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা বলেন তাঁকে ধৃত করা হবে কিন্তু অন্য কেউ যদি বলে তাহলে তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হবে না, এর কারণ কি? নাউযুবিল্লাহ্! এভাবে যে শান্তি উঠে যাবে। সত্যবাদী এবং প্রতারকের ভেতর কোন পার্থক্যই আর থাকে না।’ (আল্ হাকাম ১২তম খন্ড, নাম্বার: ১৮, তারিখ ১০ মার্চ, ১৯০৮-পৃ: ৫)

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরুদ্ধে আপত্তিকারীরাও একথাই বলে যে, এই আয়াতগুলো কেবল মহানবী (সা:)-এর জন্যই নির্ধারিত ছিল, অন্য কারো জন্য নয়। এরই ব্যাখা তিনি করেছেন যে, আল্লাহ্ তা’লা কেবল মহানবী (সা:)-কেই ধৃত করতেন! আর অন্যরা আল্লাহ্ তা’লার প্রতি যাচ্ছেতাই মিথ্যা আরোপ করুক ন��� কেন তারা ধরা পড়বেনা! হযরত মসীহ্ ম‏ওউদ (আ:)-একে খোদার পক্ষ থেকে মনোনীত হবার মানদন্ড নিরূপণ করেছেন যা স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা কর্তৃক নির্ধারিত। সুতরাং এই মাপকাঠিতে প্রত্যেক সত্যবাদীকে যাচাই করা উচিত। ‘আসওয়াদ আল্ আনসী’ বা ‘মুসায়লামা কায্যাব’ এর পরিণতি ইসলামের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। এরপরও কি মুসলমানরা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে বদ্ধপরিকর। অতএব যারা পবিত্র কুরআনের উপর ঈমান এনেছে কমপক্ষে তারা যেন আল্লাহ্ তা’লার কালাম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা থেকে বিরত থাকে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একথা গুলো যারা মুসলমান হবার দাবী করা সত্বেও স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লার এই কালাম বুঝার চেষ্টা করে না এবং সাধারণ মানুষকেও বুঝতে দিতে চায় না তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন। এরা কেবল বুঝারই দাবী করে না বরং এই কালামের বুৎপত্তি অর্জন এবং এর সূক্ষ্ণ রহস্যাবলী অনুধাবনেরও দাবী করে কিন্তু প্রকৃত কথা হলো এরা না স্বয়ং বুঝতে চায় আর না-ই সাধারণ জনতাকে বুঝতে দিতে চায়। এমন লোকদের উদ্দেশ্যে একবার হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) ‘মিথা নবী যে ধ্বংস হয়’ তা বাইবেলের আলোকে প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন,

‘এদ্বারা প্রমাণ হয় যে, খোদা তা’লার সকল পবিত্র গ্রন্থ এ বিষয়ে একমত যে, মিথ্যা নবীকে ধ্বংস করা হয়। এখন এর বিপরীতে একথা বলা যে, সম্রাট আকবর নবুওতের দাবী করেছেন অথবা রওশন দ্বীন জলন্ধরী দাবী করেছে বা অন্য কোন ব্যক্তি দাবী করেছে অথচ তারা ধ্বংস হয়নি; এটি আরেকটি নির্বুদ্ধিতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাদের নবুয়তের দাবী সম্পর্কিত একথা যদি সত্য হয় আর তেইশ বছরের ভেতর তারা ধ্বংস না হয় তাহলে এদের বিশেষ লেখনীর ভিত্তিতে দাবী প্রমাণ করা আবশ্যক এবং সেই ইলহাম উপস্থাপন করা দরকার যা তারা খোদার নামে মানুষকে শুনিয়ে থাকবে এবং বলে থাকবে যে, আমার প্রতি এবাক্যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে যে, ‘আমি খোদার রসূল’। তাদের ওহীর মূল শব্দগুচ্ছ পুরো প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে হবে কেননা, আমাদের সকল বিতর্ক নবুওতের ওহী নিয়ে, যা সম্পর্কে আবশ্যকীয় বিষয় হলো কতক বাক্য বা কালাম উপস্থাপন করতঃ দাবী করা প্রয়োজন যে, এগুলো ঐশীবাণী যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে।’

তিনি (আ:) বলেন,

‘বস্তুত প্রথমে প্রমাণ উপস্থাপন করা আবশ্যক, অর্থাৎ যে ব্যক্তি নবুওতের দাবী করেছে সে এমন কোন ঐশীবাণী উপস্থাপন করেছে। এরপর এই প্রমাণ দেয়াও আবশ্যক যে, তেইশ বছর ধরে তার প্রতি যে ঐশীবাণী অবতীর্ণ হয়েছে তা কি? অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে সেসব কালাম বা বাণী যা ঐশীবাণী হিসেবে লোকদেরকে শুনানো হয়েছে, তা উপস্থাপন করা প্রয়োজন যদ্বারা বোধগম্য হতে পারে যে, তেইশ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময় সেই বাণী খোদার বাণী হিসেবে বা একটি সংকলিত গ্রন্থ রূপে এই দাবীর সপক্ষে পবিত্র কুরআনের ন্যায় প্রকাশ করে থাকবে আর দাবী করবে যে, এগুলো খোদার বাণী যা আমার প্রতি নাযিল হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এমন প্রমাণ না দিবে ততক্ষণ পর্যন্ত বেঈমানদের মত পবিত্র কুরআনের উপর আক্রমন করা এবং لَوْ تَقَوَّلَ আয়াত নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা ঐসব দুষ্ট লোকদের কাজ যাদের খোদা তা’লার প্রতি ঈমান নেই আর কেবল মৌখিকভাবে কলেমা পাঠ করে অথচ অভ্যন্তরে ইসলামকেও অস্বীকার করে।’ (যমীমাহ্ আরবাঈন-নাম্বার ৩-৪, পৃ: ১১-১২)

সুতরাং মুসলমানদের চিন্তা করা উচিত ও ভাবা উচিত। এ হচ্ছে একজন সতবাদী ও মিথ্যাবাদীকে যাচাই করার মাপকাঠি। একস্থানে অত্যন্ত জোরালোভাবে ঐশী সাহায্য ও সমর্থণ এবং শত্রুদের আক্রমনের বিরুদ্ধে তাঁর জন্য আল্লাহ্ তা’লা যথেষ্ট হবার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি (আ:) বলেন, [প্রথমে মহানবী (সাঃ) এর কথা বলে পরে নিজের কথা বলেন]

‘স্মর্তব্য যে, পাঁচ বার আঁ-হযরত (সা:)-এর জীবনে অত্যন্ত নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, জীবন নাশের সমূহ আশংকা দেখা দিয়েছিল। মহানবী (সা:) যদি আল্লাহ্‌র সত্য রসূল না হতেন তাহলে নিশ্চয় তাঁকে হত্যা করা হতো। প্রথম ঘটনা হচ্ছে: যখন মক্কার কুরায়শরা আঁ-হযরত (সা:)-এর ঘর ঘেরাও করে ফেলে এবং কসম খায় যে, আজ আমরা অবশ্যই তাঁকে হত্যা করবো। (২) দ্বিতীয় ঘটনা হচ্ছে, যখন কাফিরদের বিরাট একটি দল পাহাড়ের সেই গুহার মুখে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, যে গুহার ভেতর হযরত আবু বকর (রা:)-সহ মহানবী (সা:) আত্মগোপন করেছিলেন। (৩) তৃতীয় বারের নাজুক অবস্থা হচ্ছে, যখন মহানবী (সা:) ওহোদ-এর যুদ্ধের ময়দানে নি:সঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং কাফিররা তাঁকে ঘেরাও করে ফেলেছিল আর তরবারি দিয়ে তাঁর উপর বহুবার সমবেত আক্রমন করেছে কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থকাম হয়েছে, এটিও একটি নিদর্শন ছিল। (৪) চতুর্থ হচ্ছে সেই ঘটনা যখন এক ইহুদী নারী মাংশে বিষ মিশিয়ে মহানবী (সা:)-কে তা খেতে দিয়েছিল। আর সেই বিষ ছিল যেমন তীব্র তেমনিই মারাক্তক এবং পরিমাণেও ছিল অত্যাধিক। (৫) পঞ্চম বারের ঘটনাও ছিল অত্যন্ত বিপদজ্জনক। যখন পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ আঁ-হযরত (সা:)-কে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করেছিল এবং তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেছিল। এসব চরম বিপদজ্জনক অবস্থা থেকে আঁ-হযরত (সা:)-এর প্রাণে বেঁচে যাওয়া এবং পরিশেষে সেই সমস্ত শত্রুর উপর বিজয় লাভ করা একথার এক শক্তিশালী প্রমাণ যে, তিনি (সা:) সত্য ছিলেন এবং খোদা তাঁর সাথে ছিল।’ (চশমায়ে মা’রেফত, রুহানী খাযায়েন, ২৩তম খন্ড-পৃ: ২৬৩-২৬৪)

এর ব্যাখ্যায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) তাঁর প্রতি আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য ও সমর্থণ কেমন ছিল তা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন যে,

‘এটি বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, আমার জীবনেও এমন পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে যাতে সম্মান ও প্রাণ চরমভাবে হুমকির সম্মুখিন হয়। (১) প্রথম সেই সময় যখন আমার বিরুদ্ধে ডা: মার্টিন ক্লার্ক হত্যা মামলা দায়ের করেছিল। (২) দ্বিতীয় সেই সময় যখন পুলিশ আমার বিরুদ্ধে গুরুদাসপুরের অতিরিক্ত কমিশনার জনাব ডুই সাহেবের আদালতে একটি ফৌজদারী মামলা দায়ের করেছিল। (৩) তৃতীয় সেই ফৌজদারী মোকদ্দমা যা জেহ্লমের করম দ্বীন নামী এক ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে দায়ের করেছিল। (৪) চতুর্থ সেই ফৌজদারী মামলা যা একই করম দ্বীন আমার বিরুদ্ধে গুরুদাসপুরে দায়ের করেছিল। (৫) পঞ্চম, লেখরামের মৃত্যুর পর আমার গৃহ তল্লাশী করা হয়েছিল এবং শত্রুরা আমাকে হন্তারক সাব্যস্ত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিল কিন্তু এদের সকল ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধি ভেস্তে গেছে।’ (চশমায়ে মা’রেফত, রুহানী খাযায়েন, ২৩তম খন্ড-পৃ: ২৬৩)

দেখুন! তিনি বলেন, আমার নেতা ও মনিবের দাসত্বে মসীহ্, নবী বা মাহদী হবার আমার যে দাবী রয়েছে, বিভিন্নভাবে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর সত্যায়ন করছেন এবং সাদৃশ্যের মাধ্যমেও আল্লাহ্ তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও মনিবের মহিমা অতিব উঁচু। কিন্তু নিষ্ঠাবান দাসের জন্য দাসত্বের কল্যাণে আল্লাহ্ তা’লা যথেষ্ট হবার সাক্ষর রেখেছেন। এছাড়া আরো অনেক ঘটনা আছে, আমি গত খুতবায় বলেছিলাম সময় নেই; তাই উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। এখন আল্লাহ্ তা’লার সাহায্যের বিবরণ সংক্ষেপে আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরছি।

এই যে ডা: মার্টিন ক্লার্ক সম্পর্কিত মোকদ্দমার উল্লেখ করা হয়েছে তা জামাতের ইতিহাসে খুবই প্রসিদ্ধ কেননা, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলায় হিন্দু, খৃষ্টান ও মুসলমান সবাই সম্মিলিতভাবে আঁতাত করেছিল। এ কাহিনী অতি দীর্ঘ, আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা পরিহাসকারীদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করেন বা যারা হাসি-বিদ্রুপের মন-মানসিকতা রাখে তাদের সাথে কেমন আচরণ করেন তার একটি দৃষ্টান্ত এই মোকদ্দমার আলোকে তুলে ধরছি। আল্লাহ্ তা’লা সেই শত্রুর সাথে কি ব্যবহার করেছেন তা হযরত মসীহ��� মওউদ (আ:)-এর নিজের ভাষায় শুনুন। তিনি (আ:) বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে সেই খোদা মহা শক্তিশালী প্রবল পরাক্রমের অধিকারী, যাঁর প্রতি ভালবাসা ও বিশ্বস্ততার সাথে অবনত ব্যক্তি কখনও বিনষ্ট হয় না। শত্রু বলে যে, আমি আমার ষড়যন্ত্রের জোরে তাকে ধ্বংস করবো এবং ফন্দিবাজ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলে যে, আমি তাকে পিষ্ট করবো। কিন্তু খোদা বলেন, হে নির্বোধ! তুই কি আমার সাথে যুদ্ধ করবি? আমার প্রিয়কে লাঞ্ছিত করবি? আসলে যতক্ষণ আকাশে কোন সিদ্ধান্ত না হয় পৃথিবীতে কিছুই হতে পারে না। আকাশে কাউকে যতটা শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত হয় পৃথিবীতে তার তুলনায় বেশী শক্তিশালী হতো পারেনা’ যারা তাঁকে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছে কিভাবে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর এমন বিরুদ্ধবাদীদের লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছেন এই মোকদ্দমার পরবর্তী বিবরণীতে তা মসীহ মওউদ (আঃ) এর ভাষায় শুনুন:

‘আমি এই মামলা উপলক্ষ্যে ডেপুটি কমিশনার সাহেবের আদালতে যখন তার সামনে উপস্থিত হই দেখি যে, সেখানে পূর্বেই আমার জন্য চেয়ার রাখা হয়েছে। জেলা জজ আমাকে অত্যন্ত নমনীয় ও সদয়ভাবে চেয়ারে বসার জন্য ইঙ্গিত করেন। তখন মোহাম্মদ হোসেন বাটালভী এবং আরো কয়েক’শ মানুষ যারা আমার গ্রেফতারী এবং লাঞ্ছনা দেখার বাসনায় এসেছিল তারা বিস্মিত হয় যে, আজতো এই ব্যক্তির জন্য অসম্মান এবং লাঞ্ছনার দিন হবার কথা। কিন্তু একে যে একান্ত স্নেহ এবং ভালবাসার সাথে চেয়ারে বসানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি তখন ভাবছিলাম যে, আমার বিরুদ্ধবাদীদের জন্য এটি কোন সামান্য কষ্ট নয় কেননা, তারা তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে আদালতে আমার সম্মান দেখছে। কিন্তু তাদেরকে এরচেয়েও বেশি লাঞ্ছিত করাই ছিল খোদার অভিপ্রায়। সুতরাং ঘটনা যা ঘটে তা হলো, বিরুদ্ধবাদীদের নেতা মৌলভী মোহাম্মদ হোসেন বাটালভী যে আজ পর্যন্ত আমার প্রাণ এবং সম্মানের উপর আক্রমন করে আসছে সে আদালতকে নিশ্চিয়তা দেয়ার মানসে ডা: ক্লার্ক এর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসে যে, এই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে এমনই, তার পক্ষে ডা: ক্লার্ককে হত্যার জন্য আব্দুল হামীদকে প্রেরণ করা অসম্ভব নয়। সাক্ষ্য দেবার জন্য আদালতে আসার পূর্বেই ডা: ক্লার্ক তার পক্ষে জেলা জজের কাছে জোরদার সুপারিশ করে যে, ইনি আহ্‌লে হাদীসের একজন নামকরা মৌলভী তাই তাঁকে চেয়ার প্রদান করা প্রয়োজন। কিন্তু ডেপুটি কমিশনার বাহাদুর আবেদন মঞ্জুর করেন নি। সম্ভবত: মোহাম্মদ হোসেন এ ব্যাপারটি জানতো না যে, তার চেয়ারের কথা পূর্বেই উত্থাপিত হয়েছে এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এজন্য যখন সাক্ষ্য দেয়ার উদ্দেশ্যে তাকে ভেতরে ডেকে পাঠানো হয়’ কাঠ মোল্লারা যেমন সম্মানের জন্য লালায়িত ও আত্মম্ভরী হয়ে থাকে ‘সে ভেতরে আসামাত্রই অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে ডেপুটি কমিশনার বাহাদুর এর কাছে চেয়ারের আবেদন করে। কমিশনার সাহেব বলেন, তুই আদলতে চেয়ার পেতে পারিস না তাই আমি তোকে চেয়ার দিতে পারি না। পুনরায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে লালসাবশে চেয়ারের আবেদন করে বলে, আমি চেয়ার পেয়ে থাকি এবং আমার পিতা রহিম বখ্‌শও চেয়ার পেতেন। কমিশনার বাহাদুর বলেন, তুই মিথ্যাবাদী! না তুউ চেয়ার পাস আর না-ই তোর বাপ রহিম বখ্‌শ পেত। আমাদের কাছে তোকে চেয়ার দেয়ার জন্য কোন নির্দেশ নেই। তখন মোহাম্মদ হোসেন বলে যে, আমার কাছে প্রমাণ আছে যে, লাট বাহাদুর আমাকে চেয়ার দিতেন। এই মিথ্যা কথা শুনে বিচারক মহোদয় অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেন, বকবক করিস না, পিছনে গিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাক। তখন মোহাম্মদ হোসেনের প্রতি আমারও করুণা হলো, কেননা তখন তার অবস্থা মৃতবৎ ছিল। যদি শরীর কাটা হতো তাহলে হয়তো একবিন্দু রক্তও পাওয়া যেতো কিনা সন্দেহ হয় আর সে এমনভাবে লাঞ্ছিত হয় যার নজীর সারা জীবনে দেখেছি বলে আমার মনে পড়েনা। এরপর হতভাগা নিরুপায়, নির্বাক ভীত-ত্রস্ত পিছুহটে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে সে টেবিলের দিকে ঝুঁকে ছিল তৎক্ষণাৎ খোদা তা’লার এই ইলহাম আমার মনে পড়ল যে, ‘ইন্নি মুহিনুন মান আরাদা ইহানাতাকা’ অর্থাৎ যে তোমাকে লাঞ্ছিত করতে চাইবে আমি তাকে লাঞ্ছিত করবো। এটি খোদার মুখ নি:সৃত বাণী। সেই ব্যক্তি মহাসৌভাগ্যশালী যে এর প্রতি মনোনিবেশ করে।’

এর সাথে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আরেকটি ইলহাম হচ্ছে, اِنَّا كَفَيْنٰكَ الْمُسْتَهْزِءِيْنَۙ‏ (সূরা আল্ হিজর: ৯৬) এরও সুস্পষ্ট পরিপূর্ণতা এখানে দেখা যায়। যারা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর লাঞ্ছনা দেখার অলীক স্বপ্ন দেখতো, যারা এই মোকদ্দমার রায়ের পর তাঁর অসম্মান দেখতে চেয়েছে, এবং উপহাসের সুযোগ সন্ধান করেছে তারা স্বয়ং এর লক্ষ্যে পরিণত হয়। এ হচ্ছে আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য ও সমর্থন।

এরপর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জীবনে আরেকটি ঘটনা রয়েছে, ‘বারহীনে আহ্‌মদীয়া’ প্রকাশের পর তিনি সাহায্য-সহযোগিতার জন্য বিভিন্নজনকে চিঠি লিখেন। ভূপালের নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন সাহেবকেও পত্র লিখেন, যিনি একজন বড় আলেম ছিলেন। তিনি ইয়েমেন এবং ভারতের আলেমদের কাছ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেন। তারপর ভূপাল রাজ্যে চাকুরী নেন আর উন্নতি করতে করতে মন্ত্রী এবং নবাবের আসনে অধিষ্ঠিত হন। এরপর রাজ্যের হবুকর্ণধার যুবরাজ্ঞী শাহজাহান বেগমের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ফলে পুরো রাজ্যের ক্ষমতার বাগডোর তার হাতে এসে যায়। সে যুগে বৃটিশ সরকার তাকে ‘মহামান্য নবাব’, ‘আমিরুল মুলক’ এবং ‘মু’তামিদুল মুহাম’ উপাধীতে ভূষিত করেছিল। তিনি আহ্‌লে হাদীস সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলেন। বিভিন্ন উপাধীর অধিকারী হওয়া এবং রাজকীয় জাঁকজমক থাকা সত্বেও লেখনী দ্বারা ইসলামের সেবা করতেন। মোটকথা ধর্মের প্রতি কিছুটা আকর্ষণ ছিল আর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-ও তাকে অত্যন্ত নেক ও মুত্তাকী মনে করতেন। বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’র যখন প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বিভিন্নজনকে সহায়তা তথা পুস্তক ক্রয়ের জন্য পত্র লেখেন যেন এটি পুনঃপ্রকাশ করা সম্ভব হয়। তাকেও লিখেছিলেন, প্রথমে তিনি ভদ্রতার খাতিরে লিখেন যে, ঠিক আছে কিছু পুস্তক ক্রয় করবো কিন্তু চুপ মেরে যান। পুনরায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) তাকে স্মরণ করালে উত্তরে বলেন, ধর্মীয় বিতর্কের বই ক্রয় করা বা এক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা ইংরেজ সরকারের ইচ্ছাবহির্ভূত। তাই এই রাজ্যের কাছে পুস্তক ক্রয়ের আশা রাখবেন না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর প্রতি একটি অপবাদ আরোপ করা হয় যে, তিনি ইংরেজদের স্বরোপিত বৃক্ষ। অথচ স্বয়ং এদের উলামা, প্রখ্যাত আলেম, ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য যে বই ইসলামের প্রতিরক্ষাকল্পে লেখা হয়েছে তা ক্রয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন। যাইহোক, হাফিজ্ব হামেদ আলী সাহেব বলেন,

যখন তাকে বই এর প্যাকেট পাঠানো হয় তিনি যে কেবল ক্রয় করেনি তাই নয় বরং সেই প্যাকেট ফেরতও পাঠান। ফেরত এভাবে পাঠান: যখন বই এর প্যাকেট তার কাছে পৌঁছে তিনি প্যাকেট এবং বই ছিঁড়ে ফেরত পাঠান। বই এর এই দশা দেখে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এর চেহারা বদলে যায় আর রাগে লাল হয়ে যায়। তখন তাঁর মুখ থেকে এই কথা নিসৃত হয় যে, ‘ঠিক আছে! তুমি তোমার সরকারকে সন্তুষ্ট রাখ; সাথে এই দোয়া করেন যে, আল্লাহ্ তা’লা তার সম্মান ধুলিস্যাৎ করুন। এরপর তিনি (আ:) বলেন, আমরাও নবাব সাহেবকে আশাস্থল মনে করি না বরং আমাদের ভরসাস্থল হচ্ছেন মহাসম্মানিত আল্লাহ্ তা’লা, আর তিনিই যথেষ্ট। খোদা ইংরেজ সরকারকে নবাব সাহেবের উপর সন্তুষ্ট রাখুন।’

মীর আব্বাস আলী সাহেবের নামে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) সেযুগে একটি পত্র লিখেছিলেন তাতেও তিনি লিখেন যে,

‘প্রথমদিকে যখন ‘বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’ পুস্তক ছাপা আরম্ভ হয় তখন ইসলামী রাজ্যগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করে সাহায্যের জন্য লেখা হয়েছিল বরং বইও সাথে পাঠানো হয়েছিল। এদের মধ্যে ��েকে কেবল মালির কোটলার নবাব ইব্রাহীম আলী খাঁন সাহেব, ছাতারী’র রঈস মাহমুদ খাঁন সাহেব এবং জোনাগড়ের প্রধান মন্ত্রী কিছু সাহায্য করেছিলেন। অন্যরা প্রথমত: মনোযোগই দেয়নি আর কেউ ওয়াদা করলেও আদায় করেনি। আর নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন সাহেব ভূপাল থেকে একটি চরম বিরোধিতাপূর্ণ চিঠি লিখেন। বলেন যে ‘আপনি এসব রাজ্যের কাছে কিছু আশা করবেন না এবং এ কাজে সহায়তার জন্য আল্লাহ্‌কেই যথেষ্ট মনে করুন। أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَه (সূরা আয্ যুমার: ৩৭)।’ (রাবওয়া থেকে প্রকাশিত মকতুবাতে আহমদ, ১ম খন্ড, পৃ: ৫৩৮)

আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ ( আ:)-এর দোয়া কিভাবে গ্রহন করেছেন দেখুন, নবাব সাহেব যিনি ইংরেজদের সন্তুষ্টি লাভ করতে চেয়েছিলেন কিছু দিনের মধ্যেই তার সম্মান এভাবে পদদলিত হয় যে, একই সরকার নবাব সাহেবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশন রায় দেয় যে, নবাব সাহেব ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে মদদ যুগিয়েছেন, এছাড়া অন্যান্য অভিযোগও আনা হয় একইসাথে তাকে যেসব উপাধী দেয়া হয়েছিল তা কেড়ে নেয়া হয়। এমনকি যে সকল, মুসলমান তাকে অনেক বড় আলেম মনে করতো এবং যথেষ্ট সম্মান দেখাতো তারাও ইংরেজ সরকারকে বলে যে, এর সাথে এমন ব্যবহারই হওয়া উচিত। এমনই বেহাল দশা হয়েছিল তার। পরিশেষে একান্ত নিরূপায় অবস্থায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খিদমতে সুপারিশ করা হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) দোয়া করলে ইলহাম হয় যে,

‘ভূলুন্ঠিত হওয়া থেকে তার সম্মান রক্ষা করা হলো’। লেখরামও বিদ্রুপকরে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে লিখেছিল যে, আপনি দাবী করেন যে, খোদা আপনার দোয়া শুনেন এবং তিনি আপনার সাথে আছেন; নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন একজন মুসলমান আর আজকাল তার অবস্থা খুবই শোচনীয় এবং বড় অসম্মান হচ্ছে। যদি আপনার দোয়া এতই গৃহিত হয়ে থাকে তাহলে তার রক্ষার জন্য আল্লাহ্ কাছে কেন দোয়া করছেন না । যাইহোক, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেছিলেন তার বিষয়টি ভিন্ন; এতদসত্বেও তিনি দোয়া করেন এবং আল্লাহ্ তা’লা তাঁর মাধ্যমেই এর সম্মান পুনঃবহাল করেন।’

মুনশী এলাহী বখ্‌শ নামে একজন হিসাবরক্ষক ছিল। সূচনাতে সে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর গভীর অনুরাগীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এমনকি তার পা টিপে দেয়াকে নিজের জন্য সম্মানের কারণ মনে করতো। কিন্তু পরবর্তীতে সে বিরোধী হয়ে উঠে এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরুদ্ধে চরম অশোভনীয় কথা বলা আরম্ভ করে। একপর্যায়ে একথাও বলতে আরম্ভ করে যে, মির্যা সাহেবের ইলহামসমূহ মিথ্যা এবং মুনশী সাহেব স্বয়ং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) সম্পর্কে নিজের বিভিন্ন ইলহাম এ অজুহাতে প্রকাশ করতনা যে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) কোথাও তার বিরুদ্ধে মামলা না করে বসেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) তখন তাকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে,

‘আপনি ভয় পাবেন না, আমার বিরুদ্ধে যে ইলহাম ইচ্ছা ছাপাতে পারেন, যা ইচ্ছে বলুন; নিশ্চিত থাকুন, আমি আপনার বিরুদ্ধে কোন মামলা করবো না। আরো বলেন, যেহেতু আমি ঐশী মিমাংসা কামনা করি অর্থাৎ উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন এমন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যার সত্ত্বা সত্যিকার অর্থেই তাদের জন্য কল্যাণকর আর মানুষ যেন প্রকৃত খোদা কর্তৃক মনোনীত ইমামকে যেন শনাক্ত করতে পারে। আর এখন পর্যন্ত কে জানে যে, তিনি কে? কেবল খোদাই জানেন বা তারা জানেন যাদেরকে খোদা তা’লার পক্ষ থেকে অন্তর্দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। তাই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে অর্থাৎ বাবু সাহেব তার সাকুল্য ইলহাম যা আমায় মিথ্যা সাব্যস্ত করে প্রকাশ করুন। অতএব সত্যিকার অর্থেই মুনশী সাহেবের ইলহামসমূহ্ যদি খোদার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে আমার সম্বন্ধে তার প্রতি যে ইলহাম হয়েছে তা স্বীয় সত্যতার কৃষ্মা অবশ্যই দেখাবে। অর্থাৎ এরপর অবশ্যই আমার উপর কোন বিপদ বা ধ্বংস নেমে আসবে। এভাবে সৃষ্টি! যে করুণার পাত্র, মিথ্যাবাদীর হাত থেকে নিস্কৃতি পাবে। বাবু সাহেব যেহেতু আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেন অর্থাৎ আমি মসীহ্ মওউদ হবার মিথ্যা দাবী করে যদি খোদার সম্পর্কে প্রতারণার আশ্রয় নেই, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবো। অপরদিকে যদি খোদার দৃষ্টিতে এমন কোন বিষয় থাকে যা এই কুধারণার বিপরীত তাহলে তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ সত্যিকার অর্থে খোদার দৃষ্টিতে আমি যদি মসী‏হ্ মওউদ হই তাহলে খোদা আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন। এবং আমি ওয়াদা করছি যে, নাউযুবিল্লাহ্ আমার পক্ষ থেকে আপনার বিরুদ্ধে কোন নালিশ করা হবে না আর আপনার মহিমা ও সম্মানের উপর আমার পক্ষ থেকে কোন অযথা আঘাত হানা হবে না। কেবল খোদা তা’লার কাছে সমস্যার সমাধান চাইব অর্থাৎ যদি আমি প্রতারক না হই আর এটি যদি আমার উপর মিথ্যা এবং অন্যায় অপবাদ হয় তাহলে আমাকে নির্দোষ এবং বাবু সাহেবকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য খোদা যেন নিজ সন্নিধান থেকে কোন নিদর্শন প্রকাশ করেন, এটুকুই আমার চাওয়া। কেননা অপবাদ মুক্ত হবার আকাংখা করা নবীদের সুন্নত যেভাবে হযরত ইউসুফ আকাংখা করেছিলেন। এরপর একাউনটেন্ট মুনশী এলাহী বখ্‌শ সাহেব চারশ’ পৃষ্ঠার একটি পুস্তক রচনা করে আর তাতে স্বীয় ইলহামসমূহ লিপিবদ্ধ করে। এর কতক নিম্নরূপ, সে বলে আমার প্রতি ইলহাম হয়েছে যে,

‘তোমার জন্য সালাম, তুমি সফলকাম হবে আর তার উপর [অর্থাৎ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)] অভিশাপ বর্ষিত হবে এবং সে অবশ্যই ধ্বংস হবে।’ যেভাবে সহস্র সহস্র বিরুদ্ধবাদী চায় সেভাবেই মির্যা সাহেবকে ধ্বংস করা হবে।’

এরপর লিখেছে,

‘প্লেগ আসবে এবং সে তার জামাতসহ প্লেগাক্রান্ত হবে এসকল যালিমদের উপর খোদার পক্ষ থেকে ধ্বংস নেমে আসবে।’

এরপর লিখেছে,

‘আমার উপর যে সেবাভার বা দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা যতক্ষণ পর্যন্ত পালন না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনক্রমেই মরবো না।’

এগুলো হচ্ছে তার ইলহাম। যাইহোক, ‘আসায়ে মূসা’ নামে যে গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন তা একটি চ্যালেঞ্জ ছিল এবং স্বীয় ইলহাম সমূহ এতে লিপিবদ্ধ করে তিনি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর কাছে প্রেরণ করেন কিন্তু এর ফলাফল কি দাঁড়িয়েছে? যে মাপকাঠি তিনি নির্ধারণ করেছেন সে অনুসারে কোন ইলহাম পুরো হয়নি। উপরন্তু সে স্বয়ং প্লেগে মৃত্যুবরণকারী তার এক বন্ধুর জানাযাতে যোগ দিতে গিয়ে সেখানেই প্লেগাক্রান্ত হয় এবং ১৯০৭ সনে ইন্তেকাল করে। পরবর্তীতে পত্র-পত্রিকায় লেখা হয়েছে যে,

‘হায় পরিতাপ! আসায়ে মূসা’র রচয়িতাও প্লেগে শহীদ হয়ে গেলেন।’

এগার বছর ধরে উপর্যুপুরী প্লেগের আক্রমণ চলতে থাকে কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:), তাঁর জামাত এবং পরিবারের সদস্যরা আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় নিরাপদ ছিলেন। আজ আমরা দেখছি যে, আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জামাত আল্লাহ্ তা’লার সমর্থনপুষ্ট হয়ে গোটা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে এবং কোটি-কোটি সংখ্যায় বিস্তৃত রয়েছে। অথচ তাদের নাম নেয়ারও কেউ নেই।

এরপর হযরত মির্যা সাহেবের আত্মীয় অর্থাৎ চাচাতো ভাই মির্যা ইমাম দ্বীন এবং মির্যা নিজাম দ্বীনরাও তাঁর ও ইসলামের শত্রুতায় হিন্দুদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। এরা মহানবী (সা:)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন নোংরা আক্রমন করতো। বরং লেখরামকেও ডেকে এনে কাদিয়ানে আশ্রয় দেয় এবং সে এখানে দু’মাস অবস্থান করে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে কষ্ট দেয়ার কোন সুযোগ এরা হাত ছাড়া করতনা। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য জামাতের যে সকল বন্ধুরা আসতেন তাদের আসা বন্ধ করার জন্য তারা দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এতে মসজিদে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়, যাতায়াতকারীদের কষ্ট হতো। কোনভাবেই যখন নিস্পত্তিতে সম্মত হয়নি তখন হযরত মসীহ্ ��ওউদ (আ:) এই একটিমাত্র মামলা কোন বিরুদ্ধবাদীর বিরুদ্ধে দায়ের করেন। তাও এজন্য করেছিলেন যাতে জামাতের সদস্যদের কোন কষ্ট না হয়। আর এজন্য তিনি অনেক দোয়াও করেন। আল্লাহ্ তা’লা আরবীতে ইলহাম করেন যার অনুবাদ হলো,

‘যাঁতা ঘুরবে এবং খোদার তকদীর বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাবে। এটি খোদার ফযল, যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং একে রদ করার ধৃষ্টতা কারো নেই। আমি আমার খোদার কসম খাচ্ছি! এ কথাই সত্য, এতে কোন ব্যত্যয় হবেনা এবং একাজ গোপনও থাকবে না। আরও একটি বিষয় সৃষ্টি হবে যা তোমাকে বিষ্মিত করবে, এটি সেই খোদার ওহী যিনি সুউচ্চ আকাশসমূহের খোদা। নিজ মনোনীত বান্দাদের সাথে যে ব্যবহার করে থাকেন আমার প্রভু সেই সোজাপথকে পরিত্যাগ করবেন না, এবং তিনি তাঁর সেসব বান্দাদের ভুলেন না যারা সাহায্য পাবার যোগ্য, সুতরাং এ মামলায় তুমি প্রকাশ্য সফলতা লাভ করবে। কিন্তু খোদার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে বিলম্ব ঘটবে।’

যদিও প্রথমদিকে উকীলরা কেসে জয়ী হবার আশা ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু পরিশেষে রেকর্ড থেকে এমন একটি কাগজ বেরিয়ে আসে যারফলে এই মামলার রায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পক্ষে যায় এবং দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হয়। বরং জজ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে অনুমতি দেন যে, যদি আপনি চান এদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন এবং ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারেন আর ব্যয়ের সাকুল্য অর্থ আদায় করতে পারেন। হযরত মসীহ্ (আ:) তা করেন নি কিন্তু তাঁর উকিল তাঁর অজান্তেই মামলা ঠুকে দেয়। যেদিন আদালতের নোটিশ আসে সেদিন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) কাদিয়ানের বাইরে ছিলেন। যখন নোটিশ পৌঁছে, মির্যা ইমাম দ্বীন পূর্বেই ইহধাম ত্যাগ করেছিল তাই নোটিশ পৌঁছে মির্যা নিজাম দ্বীনের কাছে। যেভাবে ইলহামে বলা হয়েছে, তখন তার অবস্থা ছিল বড় শোচনীয়, সব কিছু হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছিল। ১৪৩ রূপী বা এর কাছাকাছি অর্থ আদায় করার নোটিশ এসেছিল তা আদায় করার মত সামর্থও তার ছিল না। ফলে সে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খিদমতে নিবেদন করে যে, “আমাদের প্রতি কিছুটা সদয় হোন কেননা আমরাতো আপনারই আত্মীয়”। তিনি বলেন, “আমিতো মামলা করিনি আর উকিলকে বলেছিলাম কোন প্রয়োজন নেই” এবং লিখে দেন যে, যদিও এরা আমাকে অপদস্ত করছে বলে আত্মপ্রসাদ নিচ্ছে কিন্তু যেহেতু এখন মামলার রায় হয়ে গেছে, আমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে-আমাদের রাস্তা আমরা পেয়ে গেছি তাই এদের বিরুদ্ধে এখন আর কোন প্রকার প্রতিশোধ নেয়া হবেনা। এদের মোকাবিলায় এই ছিল তাঁর আদর্শ।

যাইহোক, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘পরিতাপ, এরূপ ক্রমাগত ব্যর্থতা সত্বেও আমার বিরুদ্ধবাদী মৌলভীরা আমার সম্পর্কে এতটুকুও বুঝতে পারলনা যে, এই ব্যক্তির সমর্থনে সত্যিকার অর্থে পর্দার অন্তরালে একটি হাত আছে, যা তাঁকে এদের প্রতিটি আক্রমন হতে রক্ষা করেন। যদি তারা হতভাগা না হতো তাহলে বুঝতো, এটি একটি মো’জেযা (অলৌকিক ঘটনা) যে, তাদের প্রতিটি আক্রমনের সময় খোদা আমাকে তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন কেবল রক্ষাই করেন নি বরং পূর্বেই রক্ষা করবেন বলে অবহিত করেছেন।’ (হাকীকাতুল ওহী - রূহানী খাযায়েন, ২২তম খন্ড-পৃ: ১২৫)

পুনরায় তিনি (আ:) বলেন,

‘এটি অদ্ভুত ব্যাপার, এই রহস্য কেউ অনুধাবন করতে পারে কি যে, এই সব লোকদের দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদী, প্রতারক এবং দাজ্জাল আখ্যায়িত হলাম আমি; কিন্তু মোবাহালার সময় মারা পড়ে এরা। নাউযুবিল্লাহ্, খোদাও কি ভুল করে থাকেন? এমন নেক লোকদের উপর কেন ঐশী ক্রোধানল বর্ষিত হয়? মারাও পড়ে আবার অপমান এবং লাঞ্ছনাও দেখে!’ (হাকীকাতুল ওহী - রূহানী খাযায়েন, ২২তম খন্ড-পৃ: ২৩৮)

তিনি (আ:) বলেন,

নিঃসন্দেহে মৌলবীদের পক্ষ হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেন মানুষ আমার প্রতি মনোযোগী না হয়। এমনকি তারা মক্কা হতেও ফতওয়া আনিয়েছে। প্রায় দু’শত মৌলবী আমার বিরুদ্ধে কুফরীর ফতওয়া প্রদান করে বরং ওয়াজেবুল কতল (হত্যা যোগ্য) বলেও ফতওয়া ছাপিয়ে দেয় কিন্তু তারা নিজেদের সকল প্রচেষ্টায় ব্যর্থ ও বিফল হয়।..................যদি এ কাজ মানুষের হতো তবে তোমাদের বিরুদ্ধাচারণ করার এবং আমাকে বিনাশ করার জন্য এত কষ্ট করার কোনই প্রয়োজন ছিল না বরং আমাকে মারার জন্য খোদাই যথেষ্ট ছিলেন।’ (হাকীকাতুল ওহী-রূহানী খাযায়েন, ২২তম খন্ড-পৃ: ২৬২-২৬৩)

আল্লাহ্ তা’লার সত্ত্বায় তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল যা নবীদের থেকেই থাকে। এ পর্যায়ের বিশ্বাস নবীদেরই থাকতে পারে। তাঁর কখনও কোন প্রকার সন্দেহ বা ধারণাই জাগেনি যে, অমুক বিষয়ে আল্লাহ্ তা’লা আমায় সাহায্য করবেন না। তবে দোয়া করা আবশ্যক এবং দোয়ার প্রতি তিনি মনোযোগী ছিলেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) একস্থানে বলেন,

‘একজন আরববাসীর পক্ষ থেকে তাঁর বরাবরে একটি পত্র আসে, তাতে লেখা হয় যে, যদি আপনি এক হাজার রূপী পাঠিয়ে আমাকে এখানে আপনার কৌসুলী নিযুক্ত করেন তবে আমি আপনার জামাতের প্রচার করবো।’ হযরত আকদাস বলেন, ‘তাকে লিখে দাও আমাদের কোন প্রতিনিধির প্রয়োজন নেই আমাদের কৌসুলী একজনই যিনি দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে প্রচার কাজ চালাচ্ছেন, তিনি থাকতে অন্য কারো প্রয়োজনই বা-কি আর তিনি বলেও রেখেছেন, أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَه(মলফুযাত ৩য় খন্ড-পৃ: ৪৬, রাবোয়া থেকে প্রকাশিত নবসংস্করণ)

পুনরায় তিনি বলেন,

‘আমাদের কতক সম্মানিত বন্ধু যারা ধর্মকে অন্তরঙ্গ বন্ধুবৎ ভালবাসেন; কিন্তু মানবীয় দুর্বলতাহেতু আমার উপর তারা এই আপত্তি করেছেন যে, যেখানে মানুষের অবস্থা এমন সেখানে এত বড় গ্রন্থ সংকলন করা অযথা কাজ যা ছাপাতে সহস্র সহস্র রূপী ব্যয় হতে পারে তা। এদের খিদমতে নিবেদন হলো, যদি আমরা সেসব শত শত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্তুনিষ্ঠ কথা না লিখতাম যা মূল পুস্তকের কলেবর বৃদ্ধির কারণ, তাহলে পুস্তক প্রনয়ণের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতো, বাকী থাকলো এত বড় অংক কোথা থেকে আসবে? অতএব হে বন্ধুগণ, এ ব্যাপারে আমাদের ভয় দেখাবেন না। নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন যে, আমরা আমাদের সর্বশক্তিমান ও মহাসম্মানিত খোদার উপর তারচেয়ে বেশি ভরসা রাখি যতটা সংকীর্ণমনা কৃপণ লোকেরা নিজ ধন-সম্পদের সিন্দুকের উপর ভরসা রাখে যার চাবী সর্বদা তাদের পকেটে থাকে। সুতরাং সেই মহা শক্তিশালী খোদা, নিজ ধর্ম এবং তাঁর তৌহীদ এবং আপন বান্দার কাজে স্বয়ং সাহায্য করবেন। أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (সূরা আল্ বাকারা: ১০৭)(বারাহীনে আহ্‌মদীয়া-রূহানী খাযায়েন, ১ম খন্ড-পৃ: ৭০)

তাঁর জীবন চরিত থেকে আমি কয়েকটি ঘটনা উপস্থাপন করলাম, কিন্তু অগণিত ঘটনা রয়েছে যা তাঁর জীবনি এবং জামাতের ইতিহাস থেকে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর পরও যখনই তাঁর জামাতের বিরুদ্ধে কোন ফিৎনা মাথাচাড়া দিয়েছে আল্লাহ্ তা’লা জামাতকে সাহায্য করেছেন, এর কুফল থেকে জামাতকে নিরাপদ রেখেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) যে জামাত প্রতিষ্ঠা করেছেন তা বিশ্বের প্রতিটি দেশে অনবরত উন্নতি করছে। বিভিন্ন দেশে বিরোধিতা ও সরকারী বিধিনিষেধ থাকা সত্বেও আল্লাহ্ তা’লার ফযলে তাঁর জামাত বিস্তৃতি লাভ করছে। আমাদের সঙ্গতির অভাব পরিদৃষ্টে বর্তমান যুগে একজন বস্তুবাদী মানুষ ভাবতেও পারে না যে, এমন সীমিত সঙ্গতিতে এদের চলে কি করে। কেননা তার দৃষ্টিতে সর্বপ্রথম এসব কাজের জন্য অগাধ সম্পদের প্রয়োজন। যদি জামাতের বাজেট দেখেন তাহলে আমাদের বিশ্ব জামাতের সম্মিলিত বাজেট পৃথিবীর কোন কোন সম্পদশালী মানুষের বার্ষিক আয়ের তুলনায়ও হয়ত: কম হবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা জামাতকে যতটা আর্থিক সঙ্গতি দিয়েছেন তাতে এত বরকত দিয়েছেন, এত বৃদ্ধি করেছেন যে, বিশ্ববাস��� একে অনেক বড় সম্পদ মনে করে থাকে। যখনই বস্তুবাদী কোন মানুষের সাথে কথা বলবেন তার এটিই ধারণা হয় যে, সম্ভবত আর্থিক দিক দিয়ে জামাতের অবস্থান যথেষ্ট দৃঢ়, এদের কাছে বিপুল পরিমান ধনসম্পদ ও অর্থ রয়েছে। এটি আল্লাহ্ তা’লার ফযল, আমরা যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী কেননা, সঠিক অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা হয়। আমার স্মরণ আছে গত সফরে যখন বেনিনের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করি, তিনিও সম্ভবত: পার্থিব চিন্তা নিয়েই সাক্ষাত করেছিলেন, তিনি আমাকে প্রথম প্রশ্নই এটি করেন যে, জামাত এখানে কত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে? সেখানে আজকাল বিনিয়োগের প্রতি তাদের বড় গভীর আগ্রহ জন্মেছে, তারা চান তাদের দেশে বিনিয়োগ করা হোক? মোটকথা এধরনের ধারণা তারা আমাদের সম্পর্কে রাখে। সত্যকথা হলো আল্লাহ্ তা’লার হাত আমাদের সাথে আছে, প্রতিটি কাজ ও উদ্যোগে তিনিই আমাদেরকে জন্য যথেষ্ট। এটি সেই জীবিত খোদা এবং ইসলামের জীবন্ত খোদার নিদর্শন যা সদা প্রকাশ পায় এবং জামাতে আহ্‌মদীয়ার প্রতিটি সদস্য তা অনুভব করেন, বরং বিশ্ববাসীও তা অনুভব করে। তিনিই আকাশ ও পৃথিবীর অধিপতি খোদা। যখন তিনি নিজ বান্দাকে পৃথিবীতে আপন ধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন তখন তাদের সব ধরনের নিশ্চয়তা প্রদান করেন। সকল বিষয়ে ঘোষণা করেন যে, أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَه। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে আমি তোমাদের সমস্যা দূরীভূত করবো। আমিই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। সেসব শত্রু যারা আল্লাহ্ তা’লার প্রিয়ভাজনদের হাসি ঠাট্টার লক্ষ্যে পরিণত করতে চায় অথবা পরিহাসের লক্ষ্যবস্তু বানাতে চায় তাদের মোকাবেলায় নিজ প্রিয়দের إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِئِينَ বলে আশ্বাসবাণী প্রদান করেন। এরপর আল্লাহ্ তা’লা এটিও ঘোষণা করেন যে,

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِأَعْدَائِكُمْ وَكَفَى بِاللَّهِ وَلِيًّا وَكَفَى بِاللَّهِ نَصِيرًا

অর্থ: ‘এবং আল্লাহ্ তোমাদের শত্রুদেরকে অধিক জানেন, এবং বন্ধু হিসেবে আল্লাহ্ই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসেবেও আল্লাহ্ যথেষ্ট।’ (সূরা আন্ নিসা: ৪৬)

সুতরাং এ হচ্ছে আল্লাহ্ তা’লার তথা জীবন্ত খোদার কুদরত, সাহায্য, সমর্থন আর নিদর্শন যা প্রতিটি মূহুর্ত এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা দেখতে পাই। আল্লাহ্ তা’লা করুন যেন আমরা সত্যিকার অর্থেই তাঁর অধিকার প্রদানকারী হই যেন সর্বদা আমরা তার সাহায্য ও সমর্থন দেখতে পাই।

এখানে আমি আরো একটি কথা স্পষ্ট করতে চাই। গত খুতবায় আমি বাহাউল্লাহ্‌র কথা বলতে গিয়ে বলেছিলাম যে, নবুয়তের এক দাবীদার দন্ডায়মান হয়েছে। সত্যিকার অর্থে বলা উচিত ছিল যে, একজন দাবীকারক দন্ডায়মান হয়েছে। যদি এটি ধরেও নেয়া হয় যে, সে নবুয়তের দাবী করেছে তবুও আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য-সমর্র্থন তার সাথে ছিলনা। একথার যতটুকু সম্পর্ক আছে যে, বাহায়ীদের ভেতর এবং বাহায়ী বই-পুস্তক ও লিটারেচারে তার নবুয়তের দাবী দেখা যায়না; এসম্পর্কে স্মরণ রাখা উচিত যে, এ ধারণা ভুল, কেননা তার সন্তানদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ এমনও আছে যারা বলে যে, তিনি নবী, কুতুব বা ওলীউল্লাহ্ ছিলেন, খোদা হবার দাবী করেন নি। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে বাহাউল্লাহ্‌র নিজের শরিয়ত যা ছাপা হয়নি বা অপ্রকাশিত তাতে তার খোদা হওয়ার দাবীই দেখা যায়। তার নবুয়তের দাবী ছিলনা কিন্তু আসল কথা হচ্ছিল, তর্কের খাতিরে যদি তার নবুয়তের দাবী মেনেও নেয়া হয় তাহলেও আল্লাহ্ তা’লার সমর্থন সেখানে প্রদর্শিত হয়নি। এ কথাগুলো বলার কারণ হলো, আজকাল কোন কোন স্থানে আহ্‌মদীদের বাহায়ীদের সাথে তুলনা করা হয় আর বলা হয় যে, এরা উভয়ই মিথ্যা। এক্ষত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, একদিকে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে খোদার সমর্থন রয়েছে অপরদিকে বাহাইদের বেলায় সে সমর্থন দেখা যায়না আর যদি এরা প্রতারণার আশ্রয় না নেয় তাহলে দেখবেন যে, তার আসল বই যা ‘আকদাস’ নামে তার রচিত শরিয়ত গ্রন্থ তাতে সে নিজেকে মা’বুদ বা খোদা হওয়ার দাবীকারক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাই বিষয় নবুয়তের নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও যারা বলে যে, তিনি নবী ছিলেন, যেমন তার কতক মান্যকারীও বলে থাকে, এ বেলায়ও আমরা তার পক্ষে খোদার কোন সমর্থন দেখিনা। কিন্তু আমি এ সম্পর্কে বিষয় কিছুটা স্পষ্ট করতে চাই কেননা কতক অজ্ঞ মানুষ তাদের কথায় প্রভাবিত হয়, আফ্রিকায়ও কিছু মানুষ এমন আছে আর পাকিস্তানেও, কোন কোন আহ্‌মদীও তাদের কথায় প্রভাবিত হয়। তাই সদা স্মরণ রাখবেন! বাহাউল্লাহ্‌র দাবী যতটা তার প্রকাশিত রচনা থেকে জানা যায় তা খোদা হবার ছিল নবুয়তের নয়। আর অন্য ছেলেরা তাকে খোদা না বললেও তার প্রিয় পুত্র যাকে সে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছে সেও তাকে খোদা হবার দাবীদার বলেই জ্ঞান করত। যাইহোক, এদের একটি রীতি হলো; এমন মানুষ যারা অজ্ঞ বা যারা অতিবেশী শান্তিপ্রিয়! তাদেরকে ধীরে ধীরে নিজেদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে, কোনক্রমেই প্রথমে খোদা হবার দাবীর কথা বলে না কিন্তু যখন তারা তাদের বিশ্বাসের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তাদের উপর সে শরিয়ত চাপানোর চেষ্টা করে যা বাহাউল্লাহ্ স্বয়ং খোদা হওয়ার দৃষ্টিকোন থেকে নিজের উপর নাযিল করেছে অথাৎ মানুষও তিনি খোদাও তিনি। শরিয়ত নাযেলকারীও আবার শরিয়ত গ্রহীতাও তিনিই। মৌলানা আবুল আতা সাহেব যিনি ফিলিস্তিনে ছিলেন তিনি বলেছেন যে, তাদের মাঝে এমন মানুষও আছে বরং বাহাউল্লাহ্‌র এক ছেলে, সেখানে পাঁচ বেলার নামায পড়তে আসতো অথচ বাহাউল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে বাজামাত নামায পড়া আবশ্যক নয় বরং পাঁচবার নামায পড়াও আবশ্যক নয় বরং দু তিনবেলা নামায পড়াই যথেষ্ট। আবার খৃষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে তারা বলে যে, যেমন হযরত ঈসা খোদা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, খোদার পুত্র ছিলেন একইভাবে বাহাউল্লাহ্ও খোদার কুদরতের বহি:র্প্রকাশ বরং খোদা তাঁর চেহারায় মূর্ত হয়েছেন। আবার তার আর একটি শিক্ষা স্বয়ং তার ভাষায়ই শুনুন। তার খোদা হওয়ার স্বরূপ দেখুন! একদিকে খোদা হওয়ার দাবী করে আবার স্বয়ং বলে যে,

‘আমি কারাগারে বন্দী (দীর্ঘকাল জেলে ছিলেন) আমি বিভিন্ন গুণের (আসমা) অধিপতি, আমি ছাড়া অন্য কোন খোদা নেই।’

খোদা কারাগারে বন্দী আবার সকল ক্ষমতারও মালিক। আবার লেখেন,

‘আমি ছাড়া কোন খোদা নেই যে নি:সঙ্গ বন্দী।’

আবার লেখেন, ‘মৃত্যুর পরও আমিই সাহায্য করবো।’ সে খোদা যে কারাবদ্ধ, যার কোন শক্তি নেই, মরেও যাবে অথচ সে সাহায্যও করতে থাকবে! এই বেচারা কি সাহায্য করবে? এমন খোদা! যে নিজেকেও কারামুক্ত করতে পারেনি আর নিজেকে মৃত্যুর পাঞ্জা থেকে মুক্ত করতে পারেনি সে কি করে অন্যের মুক্তির বিধান করবে? সে অন্যদের জন্য কিভাবে যথেষ্ট হতে পারে আর কিইবা সাহায্য করবে?

তারপর আব্দুল বাহা যে তার বিশেষ খলীফা ছিল; বাহায়ীদের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বড় অস্পষ্ট উত্তর দিয়ে বলে,

যে, তুমি খৃষ্টান বাহায়ীও হতে পার বা ইহুদী বাহায়ী হতে পার বা ফ্রিমেসেন বাহায়ী অথবা মুসলমান বাহায়ীও হতে পার।

অর্থাৎ সব ধর্মের অনুসারী হয়েও বাহায়ী হওয়া যায়, অর্থাৎ তাদের ভেতর এভাবে অনুপ্রবেশ কর, প্রথমে তাদের স্ব-স্ব শিক্ষার অনুসরণে সবধর্মের শিক্ষাকে সাথে রেখে তাদের শিকার কর এরপর যখন তারা বাহায়ী শিক্ষার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাহাউল্লাহ্‌র মা’বুদ বা খোদা হওয়ার দাবী উপস্থাপন কর। এটিও দেখুন যে, এক অদ্ভুত খোদা! খোদা যখন নবীদের প্রেরণ করেন তাদেরকে বলেন যে, এটি আমার বাণী! পৃথিবীতে এর প্রসার কর বা যে জাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে সে জাতির কাছে পৌঁছে দাও। মহানবী (সা:)-কে পাঠিয়ে বলেন যে, সমগ্র বিশ্বে এ বাণী পৌঁছে দাও। তাঁর নায়েব এবং নিষ্ঠাবান প্রেমিক হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে আবির্ভূত করে বলেন যে, সারা পৃথিবীর প্রা��্তে-প্রান্তে আমার বাণী পৌঁছিয়ে দাও কিন্তু এরা বলে যে, এ বাণী পৌঁছানো উচিত নয়। বাহায়ীরা স্বয়ং এটি লিখেছে। আবার বলে যে, বাহাউল্লাহ্ এসব দেশে তবলীগ করা হারাম আখ্যা দিয়েছেন। কিছুকাল পুরোপুরি নিরবতা পালন কর কেউ যদি প্রশ্ন করে পুরো অজ্ঞতা প্রকাশ কর। ফিলিস্তিন প্রভৃতি দেশে এরা খুবই সংগোপনে প্রচার করে। তারপর প্রতিটি মানুষের আকর্ষণ ও ঝোঁক অনুসারে এরা তবলীগ করে। আমি যেভাবে বলেছি, তারা বলে যে, খৃষ্টানও বাহায়ী ইহুদীও বাহায়ী বা মুসলামানও। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) যখন এখানে এসেছিলেন তিনি লেখেন যে,

বাহায়ী ধর্মে দীক্ষিতা এক ইংরেজ মহিলা তার ইরানী বান্ধবীসহ সাক্ষাত করতে আসে। আমি তাকে বললাম যে, কুরআন পরিপূর্ণ ও কামেল শরিয়ত নিয়ে এসেছে। বাহাউল্লাহ্ তোমাকে নুতন এমন কোন কথা শিখিয়েছে? সে আমাকে বললো যে, ইসলামী শরিয়ত কামেল নয় কেননা পুরুষের চারটি বিয়ে করা প্রকৃতি বিরোধী একটি কাজ। পাশ্চাত্যে চারটি বিয়ে করা নিয়ে অনেক আপত্তি করা হয়। বাহাউল্লাহ্ বলেছেন, একটি বিয়ে কর।

খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) বলেন যে,

আমি বললাম; বাহাউল্লাহ্ নিজেইতো দু’টি বিয়ে করেছে আবার অনেকে বলে যে, তিনটি করেছে। সে বলল যে, এটি তার দাবীর পূর্বে হয়েছে। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) বলেন যে, বড় অদ্ভূত খোদা! যিনি এটিও জানেন না যে, তিনি দাবীর পর কি শরিয়ত নাযিল করবেন আর এর পূর্বেই বিয়ে করে বসলেন। ঠিক আছে তিনি না হয় করেছেন ছেলেকে কেন দুই বিয়ে করালেন? সে তার ইরানী বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করল যে, বিষয় কি আসলেই তাই সে বলল হ্যা এমনিই। আমি তাকে বললাম যে, এখন উত্তর দাও। ইরানী বললো যে, না দ্বিতীয়জনকে তিনি বোন বানিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) বলেন যে, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম! যদি বোন বানিয়ে থাকেন তাহলে তার গর্ভে সন্তান হলো কেন, বোনের গর্ভে কি ভাইয়ের ছেলে হওয়া বৈধ? তখন উপস্থিত লোকদের সামনে সে বড় লজ্জিত হলো।

এসব হলো তাদের দাবী। তাই সর্বদা তাদের এ রীতির কথা স্মরণ রাখবেন এবং সাবধান থাকবেন কেননা, তারা খুবই গুপ্ত হামলা করে। নিজেদের শরিয়ত ছাপে নি লুকিয়ে রেখেছে বরং নির্দেশ দিয়েছে যে, এটি প্রকাশ করবেনা।

আল্লাহ্ তা’লা নবীদের সম্পর্কে বলেন যে, যদি তারা মিথ্যা দাবী করে আমার নামে বলে যে, আমি তাদের প্রেরণ করেছি বা তাদের উপর আমার বাণী নাযিল হয়েছে আমি তাদের ধৃত করি এবং জীবন-শিরা কেটে দেই কিন্তু যারা খোদা হওয়ার দাবীদার তাদের সম্পর্কে বলেন নি যে, আমি তাদের ধৃত করবো এবং এ পৃথিবীতে ধ্বংস করবো বরং বলেন যে,

وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهٌ مِنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ

অর্থ: ‘এবং তাদের মধ্য হতে যে কেউ একথা বলবে, নিশ্চয় ‘তিনি ব্যতীত আমি মা’বুদ,’ তাহলে আমরা এরূপ ব্যক্তিকে প্রতিফলে জাহান্নাম দান করবো। বস্তুত: যালিমদেরকে আমরা এরূপ প্রতিফলই দিয়ে থাকি।’ (সূরা আল্ আম্বিয়া: ৩০)

খোদা হবার দাবীকারকদের জন্য আল্লাহ্ তা’লা মৃত্যুর পর শাস্তি রেখেছেন। অতএব আল্লাহ্ তা’লা যেখানে সত্য নবীদের সমর্থন ও সাহায্য জুগিয়ে থাকেন, তাদের জন্য নিদর্শন প্রকাশ করে থাকেন পক্ষান্তরে মিথ্যা নবুয়তের দাবীকারকদের ধৃত করেন, মিথ্যা দাবীকারকদেরকে এ পৃথিবীতে লাঞ্ছিত করেন। খোদা হবার দাবীকারকদের জন্য মৃত্যুর পর জাহান্নামে অগ্নি নির্ধারিত করে রেখেছেন। খোদা আমাদের সত্যিকার একত্ববাদী এবং তাঁর প্রেরিত রসূলের কামেল আনুগত্যের তৌফীক দান করুন; খোদা তা’লা যেন আমাদেরকে স্বীয় রহমত ও ফযলের চাদরে সদা আবৃত রাখেন এবং আমাদেরকে ক্রমাগত ভাবে নিজ নৈকট্য দান করুন, আমীন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে