In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘আল্‌-ওয়াহাব’ (মহান দাতা) - দ্বিতীয় অংশ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২১শে নভেম্বর, ২০০৮ইং

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ এই দোয়াটি পাঠ করা প্রত্যেক আহ্‌মদীর দৈনন্দিন রীতি হওয়া উচিত। এই দোয়া করার সময় সর্বদা একান্ত সচেতনতার সাথে পথের হোঁচট থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর জামাতভূক্ত হয়েছি বলে আমাদের ভ্রুক্ষেপহীন হওয়া উচিত নয় বরং পূর্বের তুলনায় অধিকহারে খোদার রহমত সন্ধান করা উচিত।

কাদিয়ানের বার্ষিক জলসায় যোগদান এবং ভারতের বিভিন্ন জামাত পরিদর্শন করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবার পূর্বে জামাতের সদস্যদের দোয়ার আহ্বান।

মোকার্‌রম বশির আহমদ সাহেব মুহার (দরবেশ কাদিয়ান)-এর ইন্তেকাল এবং মোকার্‌রম মোহাম্মদ গযন্‌ফর চাট্‌ঠা সাহেবের শাহাদতের বিবরণ ও গায়েবানা জানাযার নামায।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

অর্থ: হে আমাদের প্রভু! হেদায়াত দেয়ার পর তুমি আমাদের হৃদয়কে বক্র হতে দিও না এবং তোমার সন্নিধান হতে আমাদেরকে রহমত দান করো, নিশ্চয় তুমি মহান দাতা। (সূরা আল্ ইমরান: ৯)

যে আয়াতটি আমি এখন তেলাওয়াত করেছি আপনারা এর অনুবাদও শুনেছেন। এতে খোদার ওয়াহাব সিফত বা বৈশিষ্ট্যের দোহাই দিয়ে নিজ ঈমানের দৃঢ়তা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা হয়েছে। প্রধানত: তুমি আমাদেরকে যুগ ইমামকে মানার যে সুযোগ দিয়েছে, মহানবী (সা:)-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্যায়নের যে সৌভাগ্য তুমি আমাদেরকে দিয়েছ। হে খোদা! তুমি তোমার প্রিয়দের দোয়াকে গ্রহণযোগ্যতার মর্যাদা দিয়ে মহানবী (সা:)-এর উম্মতের ভেতর শেষ যুগে তাঁর (সা:) যে নিষ্ঠাবান দাসকে প্রেরণ করেছ তুমি কৃপা করত: আপন একান্ত করুণায় আমাদেরকে তার জামাতর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছ। এরপর হে খোদা! তোমার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা মহানবী (সা:)-এর ভবিষ্যদ্বাণী যা নিঃসন্দেহে তিনি (সা:) তোমার পক্ষ থেকে অবহিত হয়ে করেছিলেন; সে ভবিষ্যদ্বাণী হলো মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পর খিলাফতের চিরস্থায়ী ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলে সেই কল্যাণরাজী লাভ হবে যা এই মসীহ্ মওউদ ও মাহ্‌দীর জামাতের জন্য নির্ধারিত। হে খোদা! তুমি আমাদের উপর করুণা করত: আমাদেরকে এই ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট করেছ। আমাদের কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্বলতা ও ভুল-ভ্রান্তির কারণে তোমার দেয়া নিয়ামতরাজি থেকে আমাদের কখনও বঞ্চিত কর না।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভুলভ্রান্তি হয়েই থাকে। আমরা বিনতভাবে তোমার নিকট আকুতি করছি, কখনও এ কারণে বা কোন অহংকার, দাম্ভিকতা বা আত্মশ্লাঘার কারণে বা অন্য কোনভাবে আমাদের অপকর্মের ফলশ্রুতিতে সেদিন যেন আমাদের জীবনে না আসে যা আমাদের হৃদয়কে বক্র করে দিতে পারে বা আমাদের ভেতর যেন এমন বক্রতা সৃষ্টি না হয় যার অশুভ ছায়ায় আমরা তোমার দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় কোন কর্ম করে বসব যা তোমার রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারে। সুতরাং আমাদেরকে এমন অশুভ ও অলক্ষুণে সময় থেকে রক্ষা করো।

এরপর কুরআনের এই উৎকর্ষ দোয়ায় কেবল খোদার কৃপা থেকে বঞ্চিত না থাকার দোয়াই শিখানো হয়নি বরং একজন মু’মিনকে এ দোয়াও শিখানো হয়েছে যে, হেদায়াতের উপর কেবল প্রতিষ্ঠিতই থাকবে না বরং এ দোয়া কর যে,

‘হে খোদা! তোমার নিজ সন্নিধান থেকে রহমত দান কর আর তোমার রহমতের সেই চাদরে আবৃত কর যা সকল অনিষ্ট থেকে আমাদের হিফাযত করবে এবং আমাদের ঈমানকে ক্রমশ: দৃঢ় করবে। অব্যাহতভাবে আমরা যেন ঈমানে উন্নতি করতে পারি, বিশ্বাসেও যেন উন্নতি করে যেতে পারি। আমরা যেন ত্বাক্ওয়া এবং খোদাভীতির ক্ষেত্রে উন্নতি করে যেতে পারি আর আমাদের প্রত্যেক আগত দিন ঈমান এবং ত্বাক্ওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় আমাদেরকে অগ্রগামী রাখে’।

অতএব এই আকর্ষণীয় দোয়া প্রত্যেক আহ্‌মদীর দৈনন্দিন জীবনের রীতি হওয়া উচিত। যদি সত্যিকার অর্থে এটি আমাদের রীতি হয়ে থাকে তাহলে আমরা সচেতনভাবে স্বীয় দুর্বলতার উপর দৃষ্টি রাখতে পারবো আর ইবাদতের প্রতিও আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে একইসাথে আমাদের ইবাদত ও নামাযের রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত হবে। এর ফলশ্রুতিস্বরূপ নামাযও আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করবে। আর আমরা এমন কর্মে সচেষ্ট হবো যা খোদার দৃষ্টিতে পছন্দনীয় কেননা এমন কর্মই ইমানের উন্নতির কারণ হয় আর হেদায়াতের উপর মানুষকে প্রতিষ্ঠিত রাখে। যেমন, খোদা তা’লা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ

অর্থ: ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং পুণ্য কর্ম করেছে, তাদের প্রভূ তাদের ঈমানের কারণে তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।’ (সূরা ইউনুস: ১০)

অতএব যেখানে খোদার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, ঈমানের সাথে সৎকর্ম সঠিক পথ প্রদর্শনের কারণ হয় সেক্ষেত্রে একজন মু’মিন رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا দোয়ার পাশাপাশি এর দ্বারা কল্যাণমন্ডিত হওয়ার জন্য, নিজের ঈমানের উপর দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার এবং প্রত্যেক বক্রতা থেকে বাঁচার দোয়াও করবে এবং নিজ কর্মকেও তদনুযায়ী পরিবতর্নের চেষ্টা করবে যেভাবে আল্লাহ্ তা’ল��� নির্দেশ দিয়েছেন। যদি আমরা রীতিমত ইবাদত করি এবং সৎকর্ম করার চেষ্টা অব্যাহত রাখি, জামাতের নেযাম এবং ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় রাখার চেষ্টা করি, ছোট-খ����� জাগতিক কথাবার্তাকে ঈমানের উপর প্রাধান্য না দেই এবং জামাতের কোন কর্মীর সাথে ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের কারণে জামাতের নেযামকে যেন আমরা আক্রমনের লক্ষ্যে পরিণত না করি তাহলেই ঈমানের হিফাযত বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমরা যেসব দোয়া করি তা গৃহীত হবে।

অতএব যখন একব্যক্তি এই দোয়া করে তখন তাকে একান্ত সচেতনতার সাথে পথের হোঁচট থেকে বাঁচারও চেষ্টা করতে হবে। গভীর মনোযোগ সহকারে এই দোয়া করতে হবে। কারো দৃষ্টিতে, কোন সময় জামাতীভাবে যদি কারও বিরুদ্ধে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাহলে আপিল করার অধিকারের যতটুকু সম্পর্ক রয়েছে প্রপত্যকেই সে অধিকার চর্চা করতে পারে। সে অধিকার চর্চার পর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোন কুধারণা না করে বিষয়টা খোদার হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। জাগতিক ক্ষয়ক্ষতিকে আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করে তা মেনে নেয়ার চেষ্টা করা উচিত। নতুবা অভিযোগের বদঅভ্যাস হলে তা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে মানুষকে জামাত থেকে দূরে নিয়ে যায়। খিলাফতের প্রতিও মানুষের হৃদয়ে কুধারণা সৃষ্টি হতে আরম্ভ করে।

আল্লাহ্ তা’লা এই দোয়া শিখিয়েছেন যে, প্রধানত: কখনও আমাদের হৃদয়ে জামাতের ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে যেন কোন অভিযোগ দানা না বাধে এছাড়া আমাদের কর্ম খোদা তা’লার ইচ্ছা ও অভিপ্রায় সম্মত হওয়া বাঞ্ছনীয়। জামাতের ব্যবস্থাপনা আমাদের বিরুদ্ধে কখনও যেন অভিযোগ করতে না পারে। কোন সময় মানবিক দুর্বলতার কারণে আমরা যেন পরীক্ষার সম্মুখীন না হই আর কখনও যেন এর এমন ফলাফল প্রকাশ না পায় যার ফলে আমাদের ঈমান নষ্ট হতে পারে বা জামাতের ব্যবস্থাপনা ও খিলাফত সম্পর্কে আমাদের হৃদয়ে কুধারণা জন্ম নিতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত খোদার কৃপা এবং করুণা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই সবকিছু ঘটা সম্ভব নয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর হাতে বয়’আত করার পর আমাদের ভ্রক্ষেপহীন বা উদাসীন হওয়া উচিত নয় বরং পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সচেতনতার সাথে খোদার রহমত বা করুণা সন্ধান করা উচিত। পবিত্র কুরআনে খোদা তা’লা যে বিভিন্ন বিগত নবী ও জাতি সমূহের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন তার পিছনে উদ্দেশ্য হলো এরাও মনে করতো যে, আমরা ঈমান এনেছি তাই ভবিষ্যতে আর কোন হেদায়াতের প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্ তা’লা এ প্রেক্ষাপটে ইহুদী এবং খৃষ্টানদের কথা উল্লেখ করেছেন কেননা পরবর্তীতে আল্লাহ্ তা’লা প্রদত্ত দিকনির্দেশনা গ্রহণ না করার কারণেই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। কুধারণা যদি হৃদয়ে দানা বাধে তাহলে নিজ সীমিত জ্ঞান ও ধারণার উপর নির্ভর করার কারণে মানুষের চিন্তাশক্তি সীমিত হয়ে যায়। আর এটিই ছিল তাদের বিকৃত হওয়ার কারণ। তাদের হৃদয় শুধু বক্রই হয়নি বরং খোদা তা’লা তাদেরকে مَغْضُوبِ (মাগযুবি) এবং পথভ্রষ্টদের দলর্ভুক্ত করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা প্রত্যেক নামাযের প্রতি রাকাতে আমাদেরকে সূরা ফাতিহা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পিছনে গভীর প্রজ্ঞা হলো, এদের অবস্থা দেখে শিক্ষা নাও আর সব সময় খোদার আশিস এবং কৃপা ভিক্ষা চাও। নিজেদের হৃদয়কে বক্র হওয়া থেকে রক্ষা কর। নতুবা যেভাবে তাদের ধর্মের চোখ অন্ধ হয়ে গেছে এবং খোদার সাথে সম্পর্ককে তারা ভুলে গেছে, তোমরা যেন তেমন না হয়ে যাও। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: নামাযে দৈনিক পাঁচ বেলা এই দোয়া করা সত্বেও মুসলমানদের অধিকাংশ সে পথই অনুসরণ করছে যা মানুষকে খোদা থেকে দূরে নিয়ে যায় আর এর মূল কারণ হলো, হৃদয়ে কুধারণা পোষণ এবং স্বয়ং নিজেকে জ্ঞানী মনে করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘সূরা ফাতিহায় আল্লাহ্ তা’লা মুসলমানদেরকে এই দোয়া শিখিয়েছেন যে, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ (৭-৮) সর্বসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় সহীহ্ হাদীস অনুসারে এটি প্রমাণিত যে, الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) বলতে পাপাচারী বা দুরাচারী ইহুদীদের বুঝানো হয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আ:)-কে কাফের আখ্যা দিয়েছে এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অপমান করেছে। তাদেরকে হযরত ঈসা (আ:) চরম অভিশাপ দিয়েছেন ও লা’নত করেছেন; একথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে। আর الضَّالِّين (যাল্লিন) বলতে খৃষ্টানদের সেই পথভ্রষ্ট শ্রেণীকে বুঝায় যারা হযরত ঈসা (আ:)-কে খোদা জ্ঞান করেছে এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী। এরা মসীহ্‌র ক্রুশীয় মৃত্যুকেই নিজেদের মুক্তির কারণ মনে করে, এবং তাঁকে মহান খোদার আরশে বসিয়েছে। অতএব এ দোয়ার অর্থ হচ্ছে, হে খোদা! এমন ফযল ও কৃপা করো যাতে আমরা সেসব ইহুদী ও খৃষ্টানদের মত না হই যারা মসীহ্‌কে কাফের আখ্যা দিয়ে তাঁকে হত্যা করার মত ঘৃণ্য অপপ্রয়াস চালিয়েছে এবং আমরা মসীহ্‌কে খোদা আখ্যা দিয়ে কোথাও ত্রিত্ববাদী না হয়ে যাই। যেহেতু খোদা তা’লা জানতেন যে, শেষ যুগে এই উম্মতের মধ্যে মসীহ্ মওউদ (আ:) আবির্ভূত হবেন আর ইহুদী প্রকৃতির কতক মুসলমান তাঁকে কাফের আখ্যা দিবে এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করবে, তাঁকে চরমভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবমাননা করবে এবং আল্লাহ্ তা’লা এটিও জানতেন যে, সে যুগে ত্রিত্ববাদের ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করবে এবং অনেক দুর্ভাগা খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করবে। সে কারণেই তিনি মুসলমানদেরকে এই দোয়া শিখিয়েছেন এবং দোয়ার مَغْضوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) বাক্যাংশ বলিষ্ঠ ভাবে ঘোষণা করছে যে, যারা মোহাম্মদী মসীহ্‌র বিরোধিতা করবে তারাও খোদা তা’লার পবিত্র দৃষ্টিতে সেভাবেই مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) যেভাবে ইসরাঈলী মসীহ্‌র বিরোধিরা مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) বা অভিশপ্ত ছিল।’ (নূযুলুল মসীহ্-রূহানী খাযায়েন,১৮তম খন্ড-পৃষ্ঠা:৪১৯)

অতএব আমরা আহ্‌মদীরা সেই সৌভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভূক্ত যারা মুহাম্মদী মসীহ্‌কে মেনে مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) এ পরিণত না হওয়ার দোয়া কবুল হতে দেখেছে আর الضَّالِّينَ (যাল্লিন) হওয়া থেকে রক্ষা পাবার দোয়াও খোদা তা’লা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করেছেন কেননা আমরা এক খোদার ইবাদতকারী। আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে চিরকাল এর উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। কিন্তু খোদা তা’লার এই যে নির্দেশ যে দোয়া কর যাতে হৃদয় কখনও বক্র না হয় এবং কখনও مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (মাগযুবি আলাইহিম) এবং الضَّالِّينَ (যাল্লিন) অর্থাৎ পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত না হই, এই দোয়া নিরবধি পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। তাই প্রত্যেক আহ্‌মদীর সর্বদা এই দোয়া স্মরণ রাখা উচিত। আল্লাহ্ তা’লা অন্যান্য মুসলমানদের এই দোয়া বুঝার তৌফিক দিন যাতে উম্মতে মুসলিমা মহানবী (সা:)-এর নিষ্টাবান দাসের জামাতে অন্তর্ভূক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ উম্মতের সত্যিকার চিত্র তুলে ধরে আর প্রত্যেক মুসলমান দাবীকারক মুহাম্মদী মসীহ্‌র বিরোধিতা পরিহার করে রসূল করীম (সা:)-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং আল্লাহ্‌র বাণীর সত্যায়ণকারী হয়। আর ছোট-খাট বিষয়ের পিছু লেগে থাকার পরিবর্তে এ দোয়ার প্রতিপাদ্য বিষয় যেন অনুধাবন করতে পারে। বিভিন্ন হাদীস থেকে এটি প্রমাণিত যে মহানবী (সা:) رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ এর দোয়া অনেক বেশি পাঠ করতেন। যা হযরত সাহার বিন হাউশেব কর্তৃক বর্ণিত যে,

আমি হযরত উম্মে সালমা (রা:)-কে জিজ্ঞেস করেছি, হে উম্মুল মু’মিনীন! মহানবী (সা:) যখন আপনার ঘরে থাকতেন তখন কোন দোয়া পাঠ করতেন? তিনি বলেন, মহানবী (সা:) এই দোয়া পাঠ করতেন যে, يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك (ইয়া মুকাল্লেবাল ক্বুলুবী সাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনেকা) অর্থ: ‘হে হৃদয়সমূহের নি���ন্তা! তুমি ���মার হৃদয়কে তোমার ধর্মের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করো।’ হযরত উম্মে সালমা (রা:) বলেন, আমি মহানবী (সা:)-কে যথারীতি এই দোয়া পাঠ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি (সা:) বলেন, হে উম্মে সালমা! মানুষের হৃদয় খোদার দু’আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে (অর্থাৎ খোদার নিয়ন্ত্রণে) যাকে তিনি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে চান রাখেন আর যাকে না চান তার হৃদয়কে বক্র হতে দেন।’ (সুনান তিরমিযী)

অতএব দেখুন! কত সাবধানতার প্রয়োজন। আর আমাদের নিজ হৃদয়কে বক্রতামুক্ত রাখার জন্য কত বেশী দোয়া করা দরকার; কেননা কুধারণা ও ছোট-খাট অভিযোগ অনেক সময় মানুষকে এত দূরে নিয়ে যায় যে, মানুষ ধর্মচ্যুত হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ্! আঁ হযরত (সা:)-এর হৃদয় কি বক্র হওয়া সম্ভব ছিলো? নিশ্চয় নয়, কখনও হতে পারে না। তাঁর হৃদয়ে সদা খোদার সত্ত্বাই বিরাজ করতো। তাঁর মাধ্যমে খোদা তা’লা এই ঘোষণা করিয়েছেন যে,

فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

অর্থ: ‘(যদি তোমরা আল্লাহ্‌র ভালবাসা চাও) তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ্ও তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তিনি তোমাদের সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সূরা আল্ ইমরান: ৩১)

অতএব তার হৃদয় বক্র হওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। তাঁর আনুগত্য পাপ থেকে মুক্তির কারণ হয়। তাঁর উঠা-বসা ও চলা-ফিরা এবং জীবন-মৃত্যু সবই খোদা তা’লার সন্তুষ্টির খাতিরে ছিল। তিনি (সা:) একবার বলেছেন যে,

‘নিদ্রাকালে আমার চোখ ঘুমালেও আমার হৃদয় খোদার স্মরণে ব্যাপৃত থাকে।’

অতএব মহানবী (সা:) আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে দোয়া করতেন। তিনি তাঁর উম্মতের জন্য দোয়া করেছিলেন যেন উম্মতের হৃদয় বক্র না হয় আর মসীহ্ ও মাহ্‌দী আবির্ভূত হলে তাঁকে গ্রহণ করে। হায়! মুসলমানরা যদি এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বুঝত! একবার সত্যকে বুঝার পর, যারা সত্য গ্রহণ করেছেন এবং এর খাতিরে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের বংশোদ্ভুত হওয়ার পরও যদি মানুষ এ পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়; আল্লাহ্‌র কৃপা লাভ করা এবং তাত্থেকে অংশ পাবার পরও খোদার ক্রোধভাজন হওয়ার তুলনায় বড় পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে? মুসলমানদের একটু ভাবা ও চিন্তা করা উচিত। বর্তমানে মুসলমানদের অবস্থা কি এ সমস্ত বিষয়ের পরিচায়ক নয় যে, তারা খোদার ক্রোধের শিকার হচ্ছে? খোদা তা’লা তাদের প্রতি করুণা করুন। আল্লাহ্‌র অপার অনুগ্রহে হযরত ইব্রাহীম (আ:) হযরত ইসমাঈল (আ:) এবং মহানবী (সা:)-এর দোয়া গৃহীত হওয়ার নিদর্শনস্বরূপ যে মসীহ্ মওউদ এসেছেন তাঁকে মুসলমানরা এ অজুহাতে অস্বীকার করছে যে, এখন আমাদের কোন হেদায়াতদাতার প্রয়োজন নেই। উম্মতে মুসলিমা মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে মানলে বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান যুগের নামসর্বস্ব আলেমদের স্বার্থহানী ঘটে কেননা, এতে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। অথচ অজুহাত হলো, রসূল করীম (সা:)-এর পর অন্য কোন নবী বা সংস্কারক আসতে পারে না কেননা এতে তার খত্‌মে নবুওয়তের উপর আঘাত আসে।

আবার বলে যে, আমাদের হাতে পবিত্র কুরআন রয়েছে তাই কোন মসীহ্-মাহ্‌দী বা সংস্কারকের প্রয়োজন নেই। আমি পূর্বেও এই বিষয়ের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছি। তারা খিলাফতের আবশ্যকতা অস্বীকার করে না কিন্তু অজ্ঞরা বুঝে না যে, মসীহ্ মওউদকে বাদ দিয়ে খিলাফতের কোন ধারণাই করা যায় না। উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মধ্য থেকে মসীহ্ মওউদের আগমনই মহানবী (সা:)-এর খাতামান্নাবীঈন হবার প্রমাণ। কিন্তু এরা কুরআন বোঝে বলে দাবী করলেও এই বিষয়গুলো বুঝে না আর এদের জন্য বুঝা সম্ভবও নয়। আমাদের কাছে কুরআন আছে তাই কোন হেদায়াতদাতার প্রয়োজন নেই, এই হলো তাদের জ্ঞানের বহর। পবিত্র কুরআন তাদের জন্যই বোধগম্য বা তাদের জন্য এর শিক্ষা সুস্পষ্ট হয় যারা খোদা তা’লা কর্তৃক মনোনীত। আর এই যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-ই খোদার সেই মনোনীত পুরুষ যিনি কুরআনের রহস্যাবলী আমাদের সামনে উম্মোচন করেছেন। আর সেই সমস্ত উপায় চিহ্নিত করেছেন যদ্বারা কুরআনের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘ধর্মীয় জ্ঞান এবং সত্যিকার মা’রেফত বুঝা এবং অর্জনের জন্য প্রথমে পবিত্র হওয়া ও অপবিত্র পথ পরিত্যাগ করা একান্ত আবশ্যক। সে কারণেই খোদা তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন, لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (সূরা আল্ ওয়াকে’আ: ৮০) অর্থাৎ খোদার পবিত্র কিতাবের রহস্যাবলী তারাই বুঝে যাদের হৃদয় পবিত্র এবং যাদের আমল পবিত্র। পার্থিব চাতুর্য বা শঠতার মাধ্যমে কখনও ঐশী জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।’ (সত বচন রূহানী খাযায়েন, ১০ম খন্ড-পৃঃ ১২৬)

তিনি আরো বলেন যে,

‘কুরআনের তত্বজ্ঞান কেবল তাদের সম্মুখেই উম্মুক্ত করা হয় যাদেরকে খোদা তা’লা স্বয়ং নিজ হাতে পূত-পবিত্র করেন।’ (বারাহীনে আহ্‌মদীয়া-রূহানী খাযায়েন, ১ম খন্ড-পৃ: ৬১২-টীকা-পাদটীকা: নাম্বার: ৩)

তিনি (আ:) অন্যত্র বলেন,

‘এরা বলে যে, মসীহ্ এবং মাহ্‌দীর কোন প্রয়োজন আমাদের নেই বরং কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং আমরা সরল-সুদৃঢ় পথে আছি। অথচ এরা জানে যে, কুরআন এমন এক গ্রন্থ যা পবিত্রচেতা মানুষ ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারে না, সেজন্য এমন একজন তফসীরকারকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে যাকে খোদা তা’লা পবিত্র করেছেন এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি প্রদান করেছেন।’ (সূরা আল্ ওয়াকে’আ: ৮০ নাম্বার আয়াতের আলোকে কৃত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর তফসীর, ৪র্থ খন্ড-পৃ: ৩০৮)

অতএব এই যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কেই খোদা তা’লা নিজ হাতে পূত-পবিত্র করেছেন এবং কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন। তাই এরা যত চেষ্টাই করুক না কেন মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কখনও কুরআনের রহস্য উদঘাটন করতে পারবে না। যতই দোয়া করুক না কেন যতক্ষণ পর্যন্ত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে মানার জন্য কার্যত: কোন উদ্যোগ না নেবে এদের হৃদয় বক্রই থাকবে।

সুতরাং যেখানে এদের অবস্থা দেখে আহ্‌মদী হবার কারণে, খোদা তা’লার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত সেখানে সকল প্রকার বক্রতা থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা দোয়াও করা উচিত। বিশ্ববাসী যেভাবে বস্তুবাদীতার দিকে ছুটছে এবং খোদা তা’লাকে ভুলে বসছে, এহেন পরিস্থিতিতে এই দোয়া পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী করা উচিত যে, এই নিয়ামতের কল্যাণ থেকে যেন আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে কখনও বঞ্চিত না করেন। তিনি আমাদের দৃঢ়চিত্ততা দান করুন আর নিজ অনুগ্রহে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি করুন। রহমত লাভের দোয়াও আল্লাহ্ তা’লাই আমাদেরকে শিখিয়েছেন। খোদার রহমত, দয়া এবং করুণা কেবল তারাই লাভ করে যারা খোদার ইবাদত করে এবং ঈমানের ক্ষেত্রে অগ্রসর হবার ক্ষেত্রে সচেষ্ট থাকে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) বলেন,

‘কুরআন করীমে এক স্থানে বলা হয়েছে যে, وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا (সূরা আল্ আহযাব: ৪৪) অর্থাৎ খোদার রহীমিয়্যত, দয়া কেবল বিশ্বাসীদের জন্যই নির্ধারিত। কাফির, বেঈমান এবং বিদ্রোহী এথেকে অংশ পেতে পারে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশেষ রহমত যা মু’মিনদের সাথে সম্পর্কযুক্ত তা পবিত্র কুরআনের সর্বত্র রহীমিয়্যতের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা বলেন, اِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (সূরা আল্ আ’রাফ: ৫৭) অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্‌র রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী। আবার অন্যত্র বলা হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (সূরা আল্ বাকারা: ২১৯) অর্থাৎ নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহ্‌র খাতিরে জন্মভূমি থেকে হিজরত বা কুপ্রবৃত্তির পূজা পরিত্যাগ করে এবং ���িহা�� করে, এরাই আল্���াহ্‌র রহমতের আশা রাখতে পারে। বস্তুত: আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। অর্থাৎ তাঁর রহীমিয়্যতের এই কল্যাণধারা থেকে কেবল তারাই অংশ লাভ করে যারা যোগ্য। এমন কেউ নেই যে খোদাকে সন্ধান করেছে অথচ পায় নি।’ (বারাহীনে আহ্‌মদীয়া-রূহানী খাযায়েন, ১ম খন্ড-পৃ: ৪৫১-৪৫২-এর টীকা-পাদটীকা: নাম্বার: ১১)

সুতরাং এখানে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রহমত খোদার পক্ষ থেকে আসে আর কেবল তারাই লাভ করে যারা সৎকর্মশীলতা এবং ঈমানের ক্ষেত্রে উন্নতির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। মুহসেনীন কারা? তারাই মুহসেনীন যারা সৎকর্ম করেন। অতএব খোদার দয়া লাভের জন্য দোয়ার পাশাপাশি সকল প্রকার বক্রতা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা অত্যাবশ্যক। শুধু বক্রতা থেকে বাঁচার চেষ্টাই নয় বরং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যারা সৎকর্ম করার চেষ্টা করে কেবল তারাই মুহসেন বা মুহসেনীন। তারা শুধু সাধারণ সৎকমই করে না বরং নেক কর্মের ক্ষেত্রে উন্নত মানে অধিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। মহানবী (সা:)-এর একটি উক্তি মোতাবেক তারা এই চিন্তা ও চেতনা নিয়ে প্রতিটি কাজ করে যে, আমাদের উপর সদা খোদার দৃষ্টি রয়েছে আর মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর উক্তি অনুসারে তারা কুপ্রবৃত্তির পূজাকে এড়িয়ে চলে, এত্থেকে নিজেকে দূরে রাখে আর সৎকর্ম দ্বারা খোদার সন্তুষ্টি সন্ধান করে।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তৌফিক দিন আমরা যেন নিজ ইবাদত এবং কর্মের হিফাযতের মাধ্যমে, খোদার সামনে সদা বিনত থেকে এবং সর্বদা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বিরত থেকে, খোদার সাহায্যে সকল প্রকার বক্রতা থেকে যেন মুক্ত থাকি যাতে খোদা তা’লা নিজ অনুগ্রহে আমাদের প্রতি যেসব নিয়ামত বর্ষণ করেছেন তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারি এবং আর আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতি নিয়ামতের ধারা যেন ক্রমশ: প্রবল রূপ ধারণ করে।

দ্বিতীয়ত: সফরের প্রেক্ষাপটে আমি একটি দোয়ার অনুরোধ করতে চাই, ইনশাআল্লাহ্ তা’লা আমার সফর আরম্ভ হতে যাচ্ছে। মানুষ জানে যে, আল্লাহ্ তা’লার ফযলে আমি কাদিয়ানের উদ্দেশ্যে সফরে বের হচ্ছি। কাদিয়ানের জলসা হবে, সেই জলসার জন্য দোয়া করুন যেন তা সকল অর্থে সফল ও বরকতময় হয়। আল্লাহ্ তা’লা সকল অনিষ্ট এবং দুষ্কৃতি থেকে প্রত্যেক আহ্‌মদীকে নিরাপদ রাখুন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ সেখানে যাচ্ছেন। আভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে ব্যাপকহারে ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কিছু সমস্যা আছে তাই ভিসা লাভের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। যাই হোক, অনেকেই পেয়েছেন এবং অনেকে যাবার চেষ্টা করছেন। ভারত সরকার যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা জলসায় অংশগ্রহণকারী সকলের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করুন। যারা একান্ত সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা সত্ত্বেও এসব বাঁধা-বিপত্তির কারণে যেতে পারছেন না খোদা তা’লা তাদের নেক নিয়্যতের প্রতিদান দিন। যারা যাচ্ছেন এবং যারা যেতে পারছেন না সবাই অনবরত দোয়ায় রত থাকুন যেন খোদা তা’লা হিংসুক ও দুষ্কৃতিকারীদের সকল অপকর্ম থেকে নিরাপদ রাখেন কেননা, এদের কুদৃষ্টি সব সময় জামাতের উপর লেগেই আছে। আর কাদিয়ানবাসীদেরও আল্লাহ্ তা’লা সর্বপ্রকার দুষ্কৃতি থেকে নিরাপদ রাখুন।

কাদিয়ান ছাড়াও ভারতের দুর-দূরান্তের বিভিন্ন জামাত যারা কাদিয়ান আসতে পারেন না তাদের আকাঙ্খা ছিল আমি যেন সেখানে যাই। ভারত একটি বিশাল দেশ, গরীব মানুষ তাই অনেকের কাদিয়ান আসার সামর্থ নেই। এই দৃষ্টিকোন থেকে ইনশাআল্লাহ্ কাদিয়ানের বাইরে অন্যান্য শহরে যাবারও পরিকল্পনা রয়েছে। আল্লাহ্ তা’লা সেসব জায়গার অনুষ্ঠানাদীও সকল অর্থে সফল করুন। আর আমার এই সফর সার্বিক দৃষ্টিকোন থেকে অগণিত কল্যাণের ধারক ও বাহক হোক। আর শত্রুর সকল ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধি ব্যর্থ ও নিস্ফল হোক আর আমরা যেন সবসময় জামাতের উন্নতি দেখতে থাকি। আল্লাহ্ তা’লা সর্বদা আমাদের দুর্বলতা ঢেকে রাখুন আর আমরা কখনই যেন তার ফযল এবং অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত না হই।

জুমুআর নামাযের পর আমি দু’টো গায়েবানা জানাযার নামায পড়াবো। প্রথম জানাযা হলো, আমাদের দরবেশ ভাই মোকার্‌রম বশীর আহমদ সাহেবের যিনি কাদিয়ানে দরবেশের জীবন কাটিয়েছেন। গত ১৩ই নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। তিনি কাদিয়ানের প্রাথমিক যুগের দরবেশদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। খোদার সন্তুষ্টির সন্ধানে সারাটা জীবন দরবেশীর মাঝে অতিবাহিত করেছেন। যদিও দু’তিন বার তার সুযোগ এসেছে, সেখান থেকে তিনি পাকিস্তান যেতে পারতেন। সেখানে তার আত্মীয়-স্বজন ও সহায়-সম্পত্তি ছিল। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, না আমি কাদিয়ানেই থাকবো। আমার জীবন মৃত্যু আর আমার কবর সবকিছু এখানেই হবে। অত্যন্ত পুণ্যবান, সহজ-সরল, তাহাজ্জুদ গুজার, দোয়াগো এবং নীরব প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। খিলাফতের সাথে গভীর ভালবাসাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রতিটি তাহরীকে উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে সাড়া দিতেন। মরহুম পাঁচ মেয়ে এবং এক ছেলে রেখে গেছেন এবং মুসী ছিলেন। সেখানেই দরবেশদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ স্থানে সমাহিত হয়েছেন। খোদা তাঁর পদমর্যাদা উন্নীত করুন এবং সদা তার উপর স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিপাত করুন।

দ্বিতীয় জানাযা মোকার্‌রম গযন্‌ফার চাট্‌ঠা সাহেবের। তিনি নাজারাত বায়তুল মালের পক্ষ থেকে বুরেওয়াল-এ ইন্সপেক্টর বাইতুল মাল ছিলেন। ১৮ই নভেম্বর তিনি ভেহাড়ী জেলায় সফর করেছিলেন। আমীর সাহেবের বাসস্থানের কাছেই দু’জন অজ্ঞাত পরিচয় মোটর সাইকেল আরোহী তাঁর ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। হাতাহাতির এক পর্যায়ে তারা তার উপর গুলি করলে তিনি শাহাদত বরণ করেন। إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৫৬ বছর। তার সম্পর্কও ভেহাড়ীর সাথেই ছিল। এ দৃষ্টিকোন থেকে আমি এটিকে জামাতী শাহাদত মনে করি। আমার মনে হয় তার ব্যাগে জামাতি কাগজপত্র ছিল আর হয়তো কিছু টাকাও ছিল। এদিক থেকে তার শাহাদত জামাতী শাহাদত গণ্য হতে পারে। এটি নিছক ডাকাতির ঘটনা নয়। আল্লাহ্ তা’লা তার রুহের মাগফিরাত করুন এবং তার পদমর্যাদা উন্নীত করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে