In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

খোদার পথে জীবন উৎসর্গকারীরা মৃত নয় বরং জীবিত

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১২ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ইং

ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেব এবং শেঠ মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেবের শাহাদত বরণে শহীদদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনার উদ্ধৃতিতে জামাআতের সদস্যদের নসিহত।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

অর্থ:-‘হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। এবং যারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয় তাদের সম্বন্ধে বলো না যে তারা মৃত; বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারছো না। এবং নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে ভয়-ভীতি ও ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, প্রাণসমূহ এবং ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করবো; এবং তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও। যারা, তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহ্‌রই, এবং নিশ্চয় আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। এরাই ঐসব লোক যাদের প্রতি তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আশিস এবং রহমতসমূহ বর্ষিত হয় আর এরাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’

(সূরা আল্‌ বাকারা: ১৫৪-১৫৮)

এ আয়াত সমুহের তেলাওয়াত শুনে আপনারা হয়তো অনুমান করতে পেরেছেন আজ আমি যে বিষয় বর্ণনা করব তা কিছুদিন পূর্বে আমাদের ভাই ও বুযুর্গদের শাহাদাতের সম্বন্ধে হবে। এ আয়াত সমূহে ধৈর্য, দোয়া আর শহীদদের মর্যাদা, পরীক্ষা নেওয়ার কারণ, আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট থাকার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ আর সে কারণে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তদের বর্ণনা রয়েছে। আর এ সকল বিষয়ই এক মু’মিনের প্রকৃত মু’মিন হওয়ার চিন্তা প্রদর্শন করে।

প্রথমে আমি যে আয়াত তেলাওয়াত করেছি, সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ঈমান আনয়নকারীদের চিহ্ন বই য, বিপদের সময় তারা ঘাবরে যায় না। বরং প্রত্যেক বিপদ তাদেরকে খোদা তাআলার দিকে তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করে আর খোদা তাআলার দিকেই এক মু’মিনের মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা উচিত। আর এক মু’মিনের ও কর্তব্য হচ্ছে কোন বিপদে তারা যেন সঙ্গে সঙ্গে।  سْتَعِينُو بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ  প্রদর্শন করে। অর্থাৎ ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করে। সুতরাং মু’মিনদেরকে আল্লাহ্ তাআলা সতর্ক করেছেন যে, তোমাদের ওপর বিপদ আসবে, কষ্ট আসবে, কিন্তু এমন অবস্থায় তোমাদের ঈমানের দৃঢ়তার অবস্থা এই যে, প্রথমত ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করতে হবে, কোন অস্থিরতা ও ভীত প্রকাশ করবে না। আল্লাহ্ তাআলার নিকট কোন ধরনের অভিযোগ করবে না। দ্বিতীয়ত এগুলোর জন্য মানুষের সামনে ঝুঁকবে না বরং কেবলমাত্র খোদা তাআলার সামনে ঝুঁকতে হবে। তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে হবে। নিজের ঈমানে দৃঢ়তা এবং দৃঢ়পদ থাকার জন্য আল্লাহ্ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে ধৈর্যের সাথে সে কাজ করে যেতে হবে যা খোদা তাআলা এক মু’মিনের ওপর ন্যাস্ত করেছেন আর সে কাজ হচ্ছে খোদা তাআলার তৌহিদ দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করা। সে কাজ হচ্ছে আঁ হযরত (সা.)-এর দুনিয়াতে বিস্তৃত করা। সে কাজ হচ্ছে দুনিয়াকে যুগ ইমামের জামাআতের অন্তর্ভুক্ত করে সত্যিকার ইসলামের সাথে পরিচিত করানো। সেজন্য হয়তো তোমাদের জন্যও মাল কুরবানী করার ক্ষেত্রেও কষ্ট করা লাগতে পারে। আধ্যাত্মিক কষ্ট কি? আমাদের কলেমা উচ্চারণ করতেও বিধিনিষেধ করা হয়। হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে মন্দ নামসমূহে ডাকা হয়। সুতরাং এ কাজের জন্য শারীরিক ও আর্থিক ভাবে কষ্ট এবং আধ্যাত্মিক ভাবেও কষ্ট সহ্য করে যেতে হবে। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা এদিকে মনযোগ আকর্ষণ আর মানসিক ভাবে মু’মিনকে এ সকল দুর্ভোগ এবং কষ্টের জন্য প্রস্তুত করার পর বলেছেন যে যদি তোমরা ধৈর্য, সাহস এবং দোয়ার মাধ্যমে এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রচেষ্টা কর, তাহলে আল্লাহ্ তাআলা সর্বদা তোমাদের সাথে থাকবেন। তোমাদেরকে কখনো পরিত্যাগ করবেন না। বরং তিনি এমন ধৈর্যশীলদেরই সাথে আছেন যার পরিশেষে বিজয় ধৈর্যশীলরাই লাভ করবে।

এরপর আল্লাহ্ তাআলা জীবন কুরবানকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ধর্মের জন্য নিজ জীবন উৎসর্গকারীদের খোদা তাআলার নিকট এক বড় মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন যে, শত্রুরা তো তোমাদেরকে এজন্য হত্যা করে থাকে যে প্রাণ সংহার করে তারা তোমাদেরকে গণনার দিক থেকেও কম আর দুর্বল করে দেয়। কিন্তু স্মরণ রাখো যে, যখন আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের সাথে আছেন, তখন এক ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তিরা নিহত হওয়ায় ধর্মের জন্য জামআতের মৃত্যু হয় না। বরং আল্লাহ্ তাআলা যিনি দুই জাহানের মালিক, যদি এক ব্যক্তি এখানে মারা যায়, পর জগতে যখন সে জীবিত হয়, তখন আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করে। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, এক হত্যাতে জামাআত মরে যায় না। বরং এক ব্যক্তির মৃত্যু আরো কজন মু’মিনের জীবন লাভের উপকরণ হয়ে যায়। এক শ��হাদত মু’মিনদের ভীত করে না বরং তাদের মধ্যে সেই ঈমানী উদ্দীপনা সৃষ্টি করে দেয় যে ঈমানী দিক থেকে কয়েকজন দুর্বলদের আলস্য থেকে বের করে বাইরে নিয়ে আসে। ঈমানে তার��� ���ীবনের উত্তাপ সৃষ্টি করে দেয় যে ভীত হওয়ার পরিবর্তে আরো কজন বুক পেতে শত্রুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায় আর ঘোষণা করে যে,

হে মূর্খের দল, তোমরা কি ভেবে নিয়েছো যে এক ব্যক্তিক নিহত করে তোমরা আমাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছো? তবে শোন, এই এক ব্যক্তির মৃত্যু আমাদের মাঝে সেই জীবন সঞ্চার করেছে, যিনি আমাদেরকে সেই জীবন দান করেছেন, আমাদের আত্মত্যাগ করার সেই জ্ঞান দান করেছেন, যদ্বারা আমরা এক নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে ধর্মের জন্য সর্ব প্রকার আত্মত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছি।

কিছু দিন পূর্বে যখন ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহবেকে শহীদ করা হয়, তখনও আমি এ দৃশ্য দেখেছি। মৌখিকভাবে ও লিখিত ভাবেও আমার সম্মুখে এটা প্রকাশ করা হয়েছে, যদি ওমুক স্থান যেখানে আমরা থাকি রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পরে অথবা কোন ভয়ানক স্থান যেখানে কোন আহ্‌মদীর জীবন কুরবানী করার প্রয়োজন হয়, তবে আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে সুযোগ দিন যেন আমরা রক্ত দিতে পারি।

সুতরাং এক তো খোদা তাআলার পথে জীবন দানকারী, তারপর পশ্চাতে রয়ে যাওয়াদের ঈমানে আরো সমৃদ্ধি লাভের কারণ হয়ে, তাদেরকে জীবিত করে। যা তাদের মর্যাদা আরো উন্নীত করে, আর চিরকালীন জীবনে তাদের মর্যাদা উচ্চতর হতে থাকে। একজন মু’মিনের জীবনের উদ্দেশ্য তো এটাই যে, এ জগতে সে এমন কাজ করে যাতে পরজগতে কল্যাণ লাভ করতে পারে। আল্লাহ্ তাআলার সুস্পষ্ট এই ঘোষণাও রয়েছে, আল্লাহ্‌র রস্তায় নিহতরা মৃত নয় বরং জীবিত। কেননা, তারা খুব দ্রুত সেই মর্যদা লাভ করে যদ্বারা তারা খুব দ্রুত খোদা তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই একদিন না একদিন মরতে হবে। কিন্তু সেই উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জীবন এক নিশ্বাসেই সবাই লাভ করতে পারবে না। প্রত্যেক মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে এক মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকতে হয় কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা শহীদদের সম্বন্ধে বলেছেন, সে খুব দ্রুত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জীবন লাভ করবে।

একটি হাদীসে এসেছে, আঁ হযরত (সা.) বলেছেন, আল্লাহ্ তাআলার নিকট শহীদদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে,

প্রথমঃ রক্তের প্রথম বিন্দু ঝড়ে পরার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

দ্বিতীয়তঃ সে জান্নাতে তার ঠিকানা দেখে নিবে।

তৃতীয়তঃ তাকে কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।

চতুর্থতঃ সে বড় জীবিত থেকে মুক্ত থাকবে।

পঞ্চমতঃ তার মাথায় এমন উজ্জ্বল মুকুট রাখা হবে যার একটি পদ্মরাগমনি দুনিয়া এর মধ্যকার সবকিছুর চাইতে উত্তম হবে।

ষষ্ঠতঃ তাকে সত্তর জন নিকটাত্মীয়ের সুপারিশ করার অধিকার দেওয়া হবে।

সুতরাং এই হচ্ছে শহীদদের মর্যাদা।  أَحْيَاءٌ  (আহাইয়াউন) যা (হাইউন) এর বহুবচন এর এক অর্থ এই যে জীবনের আমল বৃথা যায় না। সুতরাং শহীদগণ খুব জলদি এই উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জীবন লাভ করে যা হাদীস থেকেও সুস্পষ্ট। যা লাভের জন্য প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে এক নির্দিষ্ট অন্তবর্তীকালীন সময় অতিক্রম করতে হয় আর সেই সময় প্রত্যেকের আধ্যাত্মিক অবস্থানুযায়ী হয়। কেউ তা জলদি অর্জন করে আর কেউ দেরীতে অর্জন করে। أَحْيَاءٌ (আহইয়া) এর এক অর্থ হচ্ছে, যার বদলা নেয়া হয়। আল্লাহ্ তাআলা শত্রুদের বলেন, তোমরা এক জীবন পার করে এটা ভেবে নিয়েছো যে আমরা অনেক নেকী অর্জন করেছি আর আমরা জামাআতকে দুর্বল করে দিয়েছি। কিন্তু স্মরণ রাখ, মৃত্যুবরণকারী শাহাদতের মর্যাদা লাভ করে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য তো পেয়েই গেছে আর তাদের শাহাদতের পুরস্কারও তারা পাবে। মনযোগ দিয়ে শোন। হে দৃষ্টিহীনগণ! শহীদগণের রক্ত কবে বৃথা গেছে যে এখন যাবে। আজও খোদা তাআলা প্রত্যেক শহীদের এক একটি রক্ত বিন্দুর প্রতিশোধ নিবেন। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন,  وَبَشِّرِالصَّابِرِينَ  (অর্থ: ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ দাও।) দুনিয়াবাসীরা এ বিষয়টি বুঝতে পারে না। তোমাদের জ্ঞান বুদ্ধি এত লোপ পেয়েছে যে, আল্লাহ্ তাআলার কালাম পাঠ করা সত্ত্বেও, নিজেদের মুসলমান দাবী করা সত্ত্বেও, এসব আচরণ করে তোমরা আল্লাহ্ তাআলার অসন্তুষ্টি অর্জন করছ।

আল্লাহ্ তাআলা একস্থানে বর্ণনা করেছেন,

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

অর্থ: ‘এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু’মিনকে হত্যা করলে তার প্রতিফল হবে জাহান্নাম, যাতে সে বসবাস করতে থাকবে, আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রোধ বর্ষণ করবেন, তিনি তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহা আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সূরা আন্ নিসা: ৯৪)

আর যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে, জাহান্নাম, সে সেখানেই দীর্ঘকাল অবস্থান করবে আর আল্লাহ্ তাআলা তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন আর তাকে নিজের নিকট থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন আর তার জন্য মহা আযাব প্রস্তুত করবেন। আঁ হযরত (সা.) একস্থানে মু’মিনের প্রশংসা বর্ণনা করেছেন।

উসামা বিন যায়েদ (রা.) আর এক আনসারী একবার এক কাফেরের পিছু ধাওয়া করলেন, যখন তাকে ধৃত করে পরাপিজত করলেন, তখন সে কলেমা পাঠ করল। উসামা (রা.) বললেন যে, আমার আনসারী বন্ধু তাকে আর কিছু না বলে তার উপর হাত উঠানো থেকে বিরত হয়ে গেলেন। কিন্তু আমি তাকে হত্যা করলাম। ফেরৎ আসার পর যখন আঁ হযরত (সা.)-এর নিকট ঐ ঘটনাটি বর্ণনা করা হল, তখন তিনি বললেন, হে উসামা! কলেমা তৌহীদ পাঠ করার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠের পরও তুমি তাকে হত্যা করলে। আর বার বার তিনি এ কথগুলো পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন। তখন আমি নিবেদন করলাম হে আল্লাহ্‌র রসূল! সে তরবারির ভয়ে কলেমা পড়েছিল। তখন আঁ হযরত (সা.) বললেন, তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছিলে যে সে মন থেকে বলছে নাকি তরবারির ভয়ে বলেছে? তখন আমার আফসোস হল যে আজকের পূর্বে যদি আমি মুসলমান না হতাম। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)

এক বর্ণনায় আবু মালেক তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন,

আঁ হযরত (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, স্বীকারোক্তি প্রদান করবে যে আল্লাহ্ ব্যতিরেকে কোন উপাস্য নেই আর আল্লাহ্ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয় তাদের অস্বীকার করবে তার প্রাণ ও সম্পদ পবিত্র হয়ে যাবে। কার বাকী হিসাব আল্লাহ্‌র অধীনে। (মুসলিম কিতাবুল ঈমান)

এখন নামধারী যে সকল আলেমরা মুসলমানদের বিভ্রান্তিতে ফেলে প্রতারণা করছে আর বলে আহ্‌মদী বা “লা ইলাহা ইল্লল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌”-র কেবল এক অংশের উপর ঈমান রাখে। শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” বলে কিন্তু “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌”-র উপর ঈমান রাখে না। দ্বিতীয় অংশ অস্বীকার করে, এজন্য তারা “ওয়াজিবুল কতল” (হত্যা যোগ্য) গেছে। এ সকল লোক কি আমাদের ভেতর দেখেছে? বা বুক চিরে দেখেছে যে আমাদের মনে কি আছে?

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) খাতামান্নাবীঈন হযরত মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সা.) সম্বন্ধে আমাদেরকে যে উপলব্ধি ও জ্ঞান দান করেছেন, এ সকল মৌলবীদেরতো তার কোটি ভাগের এক ভাগও জ্ঞান নেই আর আমাদের সম্বন্ধে বলে যে আমরা খতমে নবুওয়ত অস্বীকারকারী আর সে জন্য হত্যা যোগ্য।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) আমাদেরকে খতমে নবওয়তের যে মর্যাদা অবগত করেছেন তা হচ্ছে,

“হযরত খাতামুল আম্বিয়া (সা.)-এর সম্মান ও মর্যাদা কত উঁচু আর এ সত্যের সূর্য্যরে কেমন উচ্চ পর্যায়ের গভীর প্রভাব রয়েছে যার আনুগত্য কাউকে পুনরায় মু’মিন বানায়, কাউকে খোদা প্রেমীর মর্যাদা দান করে, কাউকে আয়াতুল্লাহ্ আর হুজ্জতুল্লাহ্‌র মর্যাদা দান করে আর খোদা প্রশংসনীয় গুণাবলীর উত্তরাধিকারী বানান। (বারাহীনে আহ্‌মদীয়া, রূহানী খাযায়েন, ১ম খন্ড, পৃ���্ঠ�� ১৭০-২৭১)

অতঃপর তিনি বলেন,

“সেই মানব যিনি সবচাইতে কামেল আর পরিপূর্ণ মানব ছিলেন আর কামেল নবী ছিলেন আর পূর্ণ কল্যাণরাজী সহ এসেছেন যার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উত্থানের ফলে দুনিয়ার প্রথম কেয়ামত প্রকাশিত হয়েছে আর তার আগমনে জীবন লাভ করেছে। সেই বরকতময় নবী হযরত খাতামুল আম্বিয়া, ইমামুস্সুফিয়া, খাতামুল মুরসালিন, নবীদের গর্ব জনাব মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)। হে আমাদের খোদা! এই প্রিয় নবীর প্রতি সেই রহমত ও দরূদ প্রেরণ করা যা দুনিয়ার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত তুমি কারো কাছে প্রেরণ করোনি। (ইতোমামুল হুজ্জাহু, রূহানী খাযায়েন, ৮ম খন্ড, ৩০৮ পৃষ্ঠা)

অতঃপর তিনি আঁ হযরত (সা.) সম্বন্ধে বলেছেন,

“তার আনুগত্য এবং ভালবাসায় আমরা রুহুল কুদ্দুস (পবিত্রাত্মা) খোদার সাথে বাক্যালাপ এবং ঐশী নিদর্শনসমূহ পুরস্কাস্বরূপ পেয়ে থাকি। (তিরিয়াকুল ক্বুলুব, রূহানী খাযায়েন, ১৫ খন্ড, পৃষ্ঠা ১৪১)

সুতরাং এই হচ্ছে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর দৃষ্টিতে আঁ হযরত (সা.)-এর মর্যাদা, আর বর্তমানের এই ফিতনাবাজ এবং মন্দ স্বভাবের নামধারী জালেমগণ বলেন, আঁ হযরত (সা.)-কে আহ্‌মদীরা শেষ নবী মানে না। এজন্য তারা ইসলামের গন্ডী বহির্ভুত আর হত্যা যোগ্য আর মিডিয়াতে তা প্রচার করা হচ্ছে। তারা যেসব কাজ করছে বলছে, খোদা তাআলাও এ ধরণের কাজের অনুমতি দেন নি আর খোদার রসূলও অনুমতি দেননি আর দুঃখের বিষয় এদের নামেই নির্যাতন করা হচ্ছে।

সুতরাং এই রসূলের আনুগত্য আমাদেরকে নিদর্শনাবলীসহ পুরস্কৃত করেছে। এখনও সময় আছে তোমরা ফিতনাবাজী এবং আহ্‌মদীদের উপর নির্যাতন করা থেকে বিরত হও। নয় তো স্মরণ রাখ যে,

وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ

অর্থ: ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দিতেছি, নিশ্চয় আমার কৌশল সুদৃঢ়।’ (সূরা আল্ আ’রাফ: ১৮৪)

পূর্বে যেমন এর নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছিল, তা আজও প্রকাশিত হতে পারে আর হবে। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলার অবকাশকে নিজেদের বিজয় মনে করো না। হ্যাঁ, আমরা যেহেতু দৃঢ় ঈমান রখি, যুগের ইমামকে মেনেছি যাঁকে আঁ হযরত (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্য, তাঁর (সা.)-এর কাজ সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর দাসরূপে নবীর মর্যাদা দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। এজন্য খোদা তাআলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার পর্যন্ত ধৈর্য আর সাহসের সাথে তোমাদের অত্যাচর সহ্য করছি, এ যুগের ইমাম আমাদেরকে এ শিক্ষাই প্রদান করেছেন আর আমাদের কাছে এটাই প্রত্যাশা করেছেন। আর আল্লাহ্ তাআলাই আমাদের বলেছেন ভয় এবং ক্ষুধা আর প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি দ্বারা আমাদের পরীক্ষা নেয়া হবে আর যখন আমরা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তখন সৌভাগ্যবান রূপে আমরা وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ( অর্থ: ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও) এর দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। ঐ ধৈর্যশীলদের দলে অন্তর্ভুক্ত হবে যাদেরকে আল্লাহ্ তাআলা সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলার সুসংবাদ যেহেতু আমাদের সাথে আছে, তবে দুনিয়াবী ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণের ক্ষতি কি কষ্ট পৌঁছাতে পারে। এই কষ্ট যেভাবে আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির কারণ, সেখানে জামাতি উন্নতিরও কারণ। সুতরাং আমাদের আহ্‌মদীদেরও এই বিপদাপদ ও কষ্ট দেখে ঘাবরানো উচিত নয়। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, নিজেদের ঈমানের উপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক আর যখনই বিপদাপদ এবং কষ্ট আসবে, তখন আমাদের মুখ থেকে চূড়ান্ত ধৈর্য প্রদর্শন পূর্বক শুধুমাত্র যেন এই শব্দাবলী উচ্চারণ হয়,  إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ  (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহ্ তাআলারই আর অবশ্যই আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হব, আর যখন আমরা এটা বলব, তখন আল্লাহ্ তাআলার রহমত ও বরকত অর্জন করব। সর্বদা আমরা হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকব, ঈমানে র্দঢ়তা সৃষ্টি করতে থাকব আর শেষ বিজয়ের দৃশ্য অবলোকনকারী হব। ইনশাআল্লাহ্।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেছেন,

“খোদা তাআলার নেয়ামতরাজী তারাই লাভ করে যারা ধৈর্য প্রদর্শন করে।”

সুতরাং ধৈর্য এবং দৃঢ়তা-  فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا  (ফাতাহ্‌না লাকা ফাতহাম মুবীনা) (আমরা তোমাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করব)-এর সুসংবাদ নিয়ে আসবে। হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে মান্য করার কারণেই আমাদের বিরোধিতা হচ্ছে। আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়। আমাদের কষ্টও দেয়া হয় হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে মানার কারণে। আমাদের প্রিয়দের শহীদ করা হয় হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে মানার কারণে। সুতরাং আমরা যদি ধৈর্য ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করি, পরীক্ষা সমূহে সফলভাবে উত্তীর্ণ হব আর হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকারেরও হকদার বলেও বিবেচিত হব যা আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে (আ.) ইলহামসমূহে কয়েকবার বর্ণনা করেছেন,

إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا

(ইন্না ফাতাহ্‌না লাকা ফাতহাম মুবীনা)

অর্থাৎ নিশ্চয় আমি তোমাকে এক মহা বিজয় দান করব যা প্রকাশ্য বিজয় হবে।

সুতরাং দুঃখকষ্ট, পরীক্ষা জাতীয় জীবনে আল্লাহ্ তাআলার কুদরতসমূহ প্রদর্শনের জন্য এবং নিদর্শনাবলী প্রকাশের জন্য আসে। সুতরাং ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য কামনা করতে থাক।

শাহাদতের যে ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছে আর কিছু স্থানে জামাআত যে কষ্ট কাঠিন্যের ধম্য দিয়ে অতিক্রম করছে তার পিছনেও  فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينً  (আমি তোমাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করব) আওয়াজ আসছে। খোদা তাআলা শত্রুদের কখনো আনন্দিত হতে দেবেন না। তাদের আনন্দ নেকী আনন্দ আহ্‌মদীদের প্রত্যেকটি শাহাদতের ঘটনাই ফুল ও ফল প্রদান করে আর এখনো ইনশাআল্লাহ্ তাআলা ফুল ও ফল প্রদান করবে। শত্রুদের পাকড়াও করার দৃশ্য আমরা পূর্বেও দেখেছি আর আজও আল্লাহ্ তাআলার এই কালাম আমাদেরকে সান্তনা প্রদান করে যে,

فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ وَاقٍ

অর্থ: ‘কিন্তু আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে ধৃত করেছেন, এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তি হতে তাদেরকে রক্ষা করার মত কেউ ছিল না।’ (সূরা আল্ মো’মেন: ২২)

সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকেও তাদের পাপের দরুন ধৃত করলেন আর তাদেরকে আল্লাহ্ থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। অতীতে যে ভাবে আল্লাহ্ তাঅলা পাকড়াও করেছেন, সেভাবে আজও আমাদের সেই জীবিত খোদা তাদেরকে কষ্টদায়ক পরিণামের সম্মুখীন করবেন। সুতরাং আল্লাহ্ আমাদের প্রিয় খোদা যিনি অঙ্গীকার রক্ষাকারী। তিনি হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার অবশ্যই পূর্ণ করবেন যেভাবে আমরা পূর্ণ হতে দেখে আসছি।

আল্লাহ্ তাআলা মু’মিনদের সান্তনা প্রদান করে বলেন, আর তিনি বিভিন্ন সময় দৃশ্যাবলী প্রদর্শন করতে থাকেন। একই বিষয় কয়েকবার প্রদর্শন করেন আর ইনশাআল্লাহ্ ভবিষ্যতেও দেখতে থাকবেন। সুতরাং আমাদের কাজ হচ্ছে ঈমানের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা। নিজের ঐ সকল ভাইদের গুণাবলীও যেন আমরা মরতে না দেই যারা জামাআতের সাথে বিশ্বস্ততার উচ্চতর দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে নিজেদের জীবন খোদা তাআলার রাস্তায় কুরবান করে দিয়েছেন।

এখন আমি সংক্ষিপ্ত ভাবে এ সকল শহীদদের সম্বন্ধে বর্ণনা করব। প্রথম শহীদ আমাদের অতি প্রিয় ভাই ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী, তার শাহাদত ২৭শে মে’র পর প্রথম শাহাদত। অর্থাৎ এই মহান শহীদও নিজ জীবন খোদা তাআলার পথে দান করে এটা প্রমাণ করেছেন খিলাফতে আহ্‌মদীয়ার দ্বিতয় শতাব্দীতেও আমাদের ঈমানে সেই দৃঢ়তা রয়েছে। জামাআতের জন্য নিজেদের প্রাণের কুরবানী পেশ করতে আমরা ঐভাবেই প্রস্তুত আছি যেভাবে বিগত ১০০ বছর বা তার অধিক সময় ধরে জামাআত কুরবানী করে আসছে।

এই শহীদ যার বয়স কেবল ৫৬ বছর। যৌবনেই শাহাদত বরণ করে যুবকদের মধ্যেও একটি রূহ সঞ্চার করে গেছেন আর এই শিক্ষা যুবকদের জন্যও নিজের পেছনে ছেড়ে গেছেন যে দেখ প্রাণ যায় যাক কিন্তু হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সঙ্গে কৃত বয়আতের ওপর কোন পরিবর্তন হতে দিও না। খিলাফতে আহ্‌মদীয়ার জন্য সর্ব প্রকার কুরবানী করতে প্রস্তুত থাক। ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেব খুব সুন্দর স্বভাবের মানুষ ছিলেন। নিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততায় অনেক অগ্রগামী ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেক পূর্ব থেকেই তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। সিন্ধ প্রদেশে সফরে অতঃপর নাযের আলার দায়িত্বে থাকার সময়ও পুরনো সম্পর্ক ছিল। বরং এভাবে বলা উচিত, এই বংশের সাথেই আমাদের পুরনো সম্পর্ক ছিল। তার পিতাও যখন রাবওয়া আসত আমাদের পিতার কাছে অবশ্যই আসতেন। আর আমাদের ঘরে দীর্ঘ বৈঠক লেগে থাকত। বিশেষভাবে শুরার পর যেখানে জামাআতী বিষয়াদি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আলোচনা হতে থাকত। তার পিতার নাম মোক্তার আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ছিল। আমি যেমন বলছি, তাঁরও জামাআতের সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল। খিলাফতের সাথে গভীর বিশ্বস্ততার সম্পর্ক ছিল। ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের পিতা সম্বন্ধে কিছু বলছি।

তিনিও প্রায় ৪০ বছর মিরপুর খাস জেলার আমীর ও হায়দ্রাবাদের বিভাগীয় আমীর ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর হিজরত করে যখন আব্দুর রহমান সিদ্দিকী সাহেব পাকিস্তান আসেন তখন হযরত মসুলেহ্ মাওউদ (রা.)-এর সামনে হাজির হয়ে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদানের আবেদন জানান। যাতে হুযূর (রা.) বলেন, আপনি মিরপুর খাস সিন্ধ চলে যান আর সেখানেই সেটেল হয়ে যান। সেখানে আমাদের বিশেষ মর্যাদাও আছে। তাদের কাছ থেকে আপনি সাহায্য পাবেন আর আপনার দ্বারাও তারা উপকৃত হবে। সুতরাং তিনি কোন বিশ্লেষণ না করেই সেখানে চলে গেলেন, গিয়ে আবাদ হয়ে গেলেন। আর খুব নিষ্ঠার সাথে জামাআতের সেবা করতে থাকেন।

এই ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেব যিনি শহীদ হয়েছে তিনি ডাক্তার আব্দুর রহমান সিদ্দিকী সাহেবের একমাত্র সন্তান ছিলেন। বিয়ের এগার বছর পর জন্মেছিলেন তিনি। সিন্ধ মেডিক্যাল কলেজ থেকে তিনি এম, বি, বি, এস পাশ করেন। অতঃপর ১৯৮৮ সালে আমেরিকা চলে যান। সেখান থেকে আল্ট্রা সাউন্ডের ট্রেনিং নেন। অতঃপর ইন্টারনাল মেডিসিনে ফিলাডেলফিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন করেন আর আমেরিকান বোর্ড অফ ইন্টারনাল মেডিসিনের সার্টিফিকেট লাভ করেন। অতঃপর শিক্ষার্জনের পর ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকী সাহেব সেখানেই চাকুরী করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার পিতা যখন জানতে পারেন যে আমার ছেলে সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন তিনি তাকে লিখেন, আপনাকে এ এলাকার সেবার জন্য মেডিক্যাল পড়িয়েছি। হযরত মুসলেহ্ মাওউদ (রা.) যেখানে আমাকে বলেছিলেন বসে যাও আর লোকদের সেবা কর। এই গরীব লোকদের সেবা করার জন্য আমি তোমাকে মেডিক্যালে পড়িয়েছি আর আমেরিকা পাঠিয়েও পড়িয়েছি। আর তোমাকেও এখানে সেবা করতে হবে। আমার ইচ্ছা এটাই যাতে এই সিলসিলা জারি থাকে। তখন তিনি তার পিতার ইচ্ছা পূরণ করেন আর জলদি আমেরিকা ছেড়ে মিরপুর খাস চলে আসেন আর এখানে সেবা করা শুরু করেন।

ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের নানা ডাক্তার হাশমতউল্লাহ্ খান সাহেব হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সাহাবী ছিলেন। ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের মাতাও জীবিত আছেন। তার নাম সলিমা বেগম। তিনিও নেক, তাহাজ্জুদ গুজার, দোয়াকারী, মহানুভব, দয়াশীল, গরীবদের প্রতি লক্ষ্য রাখাকারী মহিলা ছিলেন। তিনিও ৩৭ বছর মিরপুর খাস এর লাজনার সদরের দায়িত্ব পালন করেন আর লাজনাদের তরবিয়তে তারও ভূমিকা ছিল। বৃদ্ধাবস্থাও অসুস্থতা সত্ত্বেও খুব সাহসের সাথে তিনি তার ছেলের শাহাদতের সংবাদ শুনেন আর তাকে শেষ বিদায় জানান। এটা সেই বৃদ্ধা মাতার জন্য খুব বড় কষ্ট। তাদের জন্যও দোয়া করুন যেন আল্লাহ্ তাআলা পরবর্তীতেও যেন তাদেরকে শোক সহ্য করার সান্তনা ধৈর্য দান করেন।

ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকী সাহেব বিভিন্ন বিভাগে জামাআতের সেবা করার সুযোগ পান। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৩ বছর মিরপুর খাস জামাআতের সেক্রেটারী উমুরে আমার দায়িত্ব পালন করেন। খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়ার আঞ্চলিক কায়েদ ছিলেন। সিন্ধ প্রদেশের খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়ার তত্ত্বাবধায়নকারী ছিলেন। আর ১৯৯৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়। তিনি তখন হাসপাতালও সামলান। ছোট ক্লিনিককে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল বানান। যাতে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। নগর পার্কার ও থর পার্কার এলাকায় যা হিন্দু ও গরীবদের এলাকা ছিল সেখানে ডাক্তার সাহেব প্রতি মাসে ব্যক্তিগতভাবে মেডিক্যাল ক্যাম্প বসাতেন আর অসুস্থ, অসহায় ও অভাবীদের চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের জন্য স্বয়ং যেতেন। আল্লাহ্‌র ফযলে হাজার হাজার রোগী তার হাতে আরোগ্য লাভ করে। তাঁর শাহাদতে গরীব ধনী সবাই কাঁদতে থাকে। দূর দুরান্ত থেকে তাকে দেখার জন্য লোকেরা এসেছিল। তখন আল্লাহ্ তাআলা হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর এই দাসকে দস্তে মসীহাঈ ও শাফা (আরোগ্য) প্রদান করেছিলেন, যদ্বারা তিনি দরিদ্রদের সেবা করতেন। আল্লাহ্ তাআলা সুপারিশের মাধ্যম বানিয়েছিলেন। মিরপুর খাস ব্যতীত পুরো সিন্ধ প্রদেশে তার সুনাম ও খ্যাতি ছিল। আল্লাহ্ তাআলার ফযলে যৌবনেই তিনি বড় সুনাম অর্জন করেন। আহ্‌মদী এবং অআহ্‌মদীদের মধ্যে সমান ভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। সকলের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। দাওয়াত ইলাল্লাহ্ এবং তবলীগের খুব আগ্রহ ছিল তার। তাই বিভিন্ন প্রতিনিধিদলকে তিনি কেন্দ্রেও নিয়ে আসতেন আর নিজ তত্তাবধানে প্রেরণও করতে থাকতেন। বিগত পাঁচ বছরে আমি দেখেছি প্রতিবার যখনই কোন দাওয়াত ইলাল্লাহ্‌র প্রোগ্রাম হত, যাওয়ার পূর্বে দোয়ার জন্য লিখতেন যে, সফলকাম যেন হতে পারি আর আল্লাহ্ তাআলা সফলতা দান করবেন। তার শত্রতার আরেকটি বড় কারণ ছিল দাওয়াত ইলাল্লাহ্। কেননা তিনি সিন্ধ প্রদেশের জমিদার. ধনী দরিদ্র সকলকে খুব তবলীগ করতেন। এজন্য সবস্থানে তবলীগের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতেন। তাই শত্রুরা তাকে শহীদ করে তবলীগের একটা মাধ্যম শেষ করতে চায়। কিন্তু নির্বোধরা এটা জানেনা যে, ডাক্তার আব্দুল মান্নান আল্লাহ্‌র পথে কুরবান হয়ে নিজের ন্যায় আরো ক’জন মান্নান সৃষ্টি করে যাবেন, ইনশাআল্লাহ্। ডাক্তার সাহেবের বিয়ে মামাতো বোন আমাতুস্ শাফী সাহেবার সাথে হয়েছিল যিনি আমেরিকান ন্যাশনাল ছিলেন। তার দুটি বাচ্চা আছে। বড় মেয়ে ১৮ বছরের। তিনি এফ এস সি করেছিলেন। ১৩ বছরের আরেকটি ছেলে আছে। তার স্ত্রীও মিরপুর খাস এর সদর ছিলেন। ওয়াকফে জাদীদের যে হাসপাতাল নগর পার্কার এ মিঠি এলাকায় আছে, সেখানেও তিনি অনেক খেদমত করেন আর ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প বসাতে থাকেন। মানুষের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত আন্ নূর সোসাইটিরও তিনি সদর ছিলেন। সদর আঞ্জুমানের চুক্তিবদ্ধ কমিটির সদস্য এবং মজলিস তাহরীকে জাদীদ এর সদস্য ছিলেন।

আমি পূর্বেই বলেছি তার সাথে আমার পুরনো সম্পর্ক ছিল আর তার পিতার সাথেও আমার পিতার সম্পর্ক ছিল আর তার নানা হযরত ডাক্তার হাশমতউল্লাহ্ সাহেব যিনি হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানীর (রা.) চিকিৎসক ছিলেন। তার সাথেও আমাদের সম্পর্ক ছিল। হযরত ডাক্তার সাহেব হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানীর কাসরে খিলাফতে থাকতেন। তার নিকট আসা যাওয়া ছিল। সুতরাং এই সমস্ত বংশের সাথে আমাদের এক বংশগত সম্বন্ধ ছিল।

ডাক্তার মান্নান সাহেব এমন লোক ছিলেন যার চেহারায় কখনো দুশ্চিন্তার প্রভাব পরত না, যেমন খুশি পরিস্থিতি হোক। মিরপুর খাস জেলা বিগত কয়েক বছর ধরে মৌলবীদের টার্গেট ছিল বরং পুরো সিন্ধই টার্গেট ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঐ এলাকার জামাআত��ুলোকে তিনি খুব ভালভাবে সামাল দেন। বরং সাথের জেলাগুলোতেও নিজ সম্পর্কাদি ব্যবহার করে সাহায্য করতেন। কিন্তু কখনো নিজ সম্পর্কাদি নিজের জন্য ব্যবহার করেন নি। ব্যবহার যা করতেন তা জামাআতের কল্যাণের জন্যই। অতঃপর দিন হোক বা রাত যখনই কেউ সাহায্যের জন্য আহ্বান করত, তিনি হাসি মুখে তার সাহায্য করেছেন। তার সব সময় আমার খুব ভাল লাগত যে তার চেহারায় সব সময় হাসি লেগেই থাকত। এ খাত শুধু আমিই বলি নি বরং প্রত্যেক গরীব এবং ধনী তা প্রকাশ করেছেন। তিনি খুবই বিনয়ী ছিলেন। এ ব্যাপারে কোন গর্বই ছিল না। সাধারণত আমীরগণ দাওয়াত ইলাল্লাহ্ ও মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে স্বয়ং যেতেন না। কিন্তু মরহুম ডাক্তার সাহেব, যেমন আমি বলেছি, জামাআতি ব্যস্ততা না থাকলে স্বয়ং যেতেন। কেউ আমার নিকট তার সম্বন্ধে খুব ভাল ভাল ধারণা দিল সে সিন্ধ থেকে আগত এক আহ্‌মদী ছিল, সে সিন্ধ এ দাঈআনে ইলাল্লাহ্‌র আমীর ছিল। তিনি দরিদ্রদের প্রতি এত বেশী সাহায্য করতেন যে, তাদের শুধু ফ্রি চিকিৎসাই প্রদান করতেন না, বরং নিজের পক্ষ থেকেও কিছু দিয়ে দিতেন। তার মৃত্যুতে যখন আমীর ও জমিদারগণ আফসোস করার জন্য আসেন, সেখানে দরিদ্র মহিলা পুরুষরাও খুবই আবেগাপ্লুত অবস্থায় ডাক্তার সাহেবের কথা স্মরণ করতে থাকেন। খিলাফতের সাথে তার অত্যন্ত বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সম্পর্ক ছিল। আমি মনে করি যে তিনি আপাদমস্তক খিলাফতের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী এবং বিশ্বস্ত ছিলেন আর উত্তম বন্ধু ছিলেন। তার ওপর আমার এতটা ভরসা ছিল যে আমি কখনো ভাবতেও পারতাম না যে তাকে কোন কাজের কথা বলি, কোন রিপোর্টের জন্য পাঠাই আর তাতে কোন ধরনের অবিচার হবে আর তাক্ওয়ার পরিপন্থী কোন কথা বলা হবে। তিনি অত্যন্ত মুত্তাকী মানুষ ছিলেন। এতদ্ব্যতীত তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ তিরস্কারের সম্মুখিন হচ্ছিলেন, কোন ভয়ভীতি ছাড়াই নিজের কাজে মগ্ন থাকেন। তাকে কিছু দিন পূর্বে কোন নিকট আত্মীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল যে সাবধান হও। তখন তিনি তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, দেখা যাক যা হবার হবে। তিনি জামাআতের এক উত্তম সদস্য ছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা তার মর্যাদা উচ্চ থেকে উচ্চতর করতে থাকুন। শহীদ হয়ে সে মর্যাদা তা তো তিনি পেয়ে গেছেন, এখন তার মর্যাদা আল্লাহ্ তাআলা বাড়াতে থাকবেন। তার স্ত্রীকেও ধৈর্য এবং সান্তনা প্রদান করবেন। তিনিও খুব সাহসের সাথে নিজের স্বামীর শাহাদতের সংবাদ শুনেন আর ধৈর্যের উত্তম নমুনা প্রদর্শন করেন। নিজের শ্বাশুরী যিনি তার ফুফুও ছিলেন তাকেও সামলান আর নিজের বাচ্চাদেরও সামাল দেন। আমেরিকাতে লালিত পালিত হওয়া সত্ত্বেও তার স্বামীর সাথে পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে সঙ্গ দেন আর জামাআতী কাজে কখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন নি, বরং সেবা করে গেছেন। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে দীর্ঘ জীবনের সাথে সাথে বাচ্চাদের আনন্দও যেন দেখান।

ডাক্তার সাহেবের মৃত্যুতে বিভিন্ন জামাআতের লোকেরাও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। তার কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি,

প্রথমে এম কিউ এম এর নেতা আলতাফ হোসেন সাহেবের এক বর্ণনা যিনি এখানেই (লন্ডন) থাকেন। তিনি বলেছেন পবিত্র চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের মৃত্যু মিরপুর খাস এর শহরবাসীর জন্য এক বড় ক্ষতি ছিল। তিনি বলেন, আততায়ী হত্যাকারী বর্ণ, বংশ, ভাষা, ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে কোনরূপ পার্থক্য না করে সহস্র সহস্র রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা প্রদানকারী ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবকে হত্যা করে প্রমাণ করেছেন এই মৌলবাদী মুসলমান তো নিকৃষ্ট মানুষ বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যও নয়। সে ডাক্তার আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী সাহেবকে নির্মম ভাবে হত্যার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, হত্যার কারণ সিন্ধ এ ধর্মীয় উগ্রতা ও তালেবানাইযেশন ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ফল। যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্ম বিশ্বাস ও ফিকাহ্‌র মতবিরোধের ভিত্তিতে নিষ্পাপ শহরবাসীদের হত্যা করছে সে মনুষ্যত্বের প্রকাশ্য শত্রু।

অতঃপর পাকিস্তান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন মিরপুর খাস এর প্রধান বক্তব্য প্রদান করেন যে, ডাক্তার মান্নান এর হত্যা মনুষ্যত্বের হত্যা।

কিন্তু আজকালকার নামধারী আলেমরা, যারা নিজেদেরকে কুরআন করীমের আলেম মনে করে, তারা বুঝতে পারবে না যে খোদা তাআলা কুরআন করীমে বলেছেন, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা যে নিজে কখনো হত্যা করেনি আর দেশে বিশৃঙ্খলাও ছড়ায়নি, তার হত্যা পুরো মনুষ্যত্বের হত্যা। আর ডাক্তার সাহেবের ব্যক্তিত্ব এমনই ব্যক্তিত্ব ছিল, যিনি প্রতি মুহূর্তে মানুষের সেবা করার জন্য প্রস্তুত থাকতেন আর অন্যেরাও তা প্রকাশ করছে।

অনেক ডাক্তার সাহেবদের একটি টিম আর বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী ডাক্তাররা প্রতিক্রিয়া প্রদান করেন যে, ডাক্তার সাহেব আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ প্রিয়জন এবং সহমর্মী ছিলেন। তিনি এক মহান মানুষ ছিলেন। এ ঘটনায় জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন ফেরেশ্তা সদৃশ লোক শতাব্দীতে একজনও জন্ম নেন না।

অতঃপর বড় বড় জমিদার শ্রেণীর লোকেরা আসেন। তারা ঐ সময় নামতো নিতে পারে না। তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল এটি শুধু আপনাদের জামাআতের ক্ষতিই নয়, বরং আমরা সকলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি।

অতঃপর কজন সামাজিক ব্যক্তিত্ব প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন যে, তিনি গরীবদের সহমর্মী, অসহায়দের আশ্রয় ছিলেন। তার হাসি লোকদের হৃদয় জয় করত। তার চরিত্র বর্ণনাতীত সুন্দর ছিল।

অতঃপর ঐ এলাকার প্রতিনিধিবৃন্দ বিবৃতি প্রদান করেন, মিরপুর খাস এক উত্তম ডাক্তার এবং সৎলোক থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এটা খুব বড় জুলুম হয়েছে। এক নওমোবাইন (নবদিক্ষীত) বলেন, তিনি গরীবদের সহমর্মী ছিলেন। তিনি আমাদের সকলকে এতীম করে চলে গেছেন। তার হাসপাতালের কর্মচারীরা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ডাক্তার সাহেব গরীবদের সাথী ছিলেন। দরিদ্রদের সাথে খুব হৃদ্যতার সাথে আচরণ করতেন। তিনি আমাদেরকে বাচ্চাদের ন্যায় লক্ষ্য রাখতেন।

এছাড়া সরকারী কর্মকর্তাগণ, ডি, এস,পি, ডি.পি.ও. ডি আইজি প্রমুখ যারা এসেছিলেন, তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল, শহীদের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি খুব মহান ব্যক্তি ছিলেন। একজন সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেন, এটি ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকীর হত্যা নয় বরং পুরো মিরপুর খাস এর হত্যা।

আমাদের দ্বিতীয় শহীদ শেঠ মুহাম্মদ ইউসুফ সাহেব। ইনিও নওয়াব শাহ্ জেলার জামাআতের আমীর ছিলেন। যদিও তিনি বেশী শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে জামাআতের সেবা করার অনুপ্রেরণা তার মাঝে ছিল। ১৯৫৬ সালে নওয়াব শাহ্’তে এসে তিনি বসতি স্থাপন করেন। ১৯৬২ তে নওয়াব শাহ্ জামাআতের সদর নির্বাচিত হন। তার সদরের দায়িত্ব পালন কালে সেখান এক বড় হল “মাহমুদ হল” বানানো হয়। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহ.) তার নাম “মাহমুদ হল” রাখেন। তিনি দু’ বছর জেলার কায়েদও ছিলেন। অতঃপর একধারে তিনি ১৪ বছর সখরডিভিশন এলাকার কায়েদ ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি নওয়াব শাহ্’র আমীর নিযুক্ত হন আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে দায়িত্বেই ছিলেন। তিনি অনেক মিশুক, মেহমান নেওয়ায, সৃষ্টির সেবাকারী, দরিদ্রদের বিশেষ সেবাদানকারী, অন্যের প্রতি সহমর্মী আর সেখানে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি সব সময় প্রত্যেককে প্রথমে সালাম করতেন আর খুব সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন। চেষ্টা করতেন যেন কারো মন না ভাঙ্গে। ওয়াকেফীনে জিন্দেগীদের বিশেষ সম্মান করতেন আর তাদের সকল প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা তার বিশেষ বিষয় ছিল। ��ল্লাহ্ তাআলার ফযলে শেঠ সাহেব মুসী ছিলেন। কিছুদিন থেকে তিনি নিজ ভবনে আরেকটি বড় মসজিদ এবং হল “আইওয়ানে তাহের” নামে নওয়াব শাহ্’তে নির্মাণ করেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিন�� খুব পরিশ্রম করতেন। বরং কেউ আমাকে লিখেছেন যে, তার ঘর দোতলায় ছিল। নীচে দোকান প্রভৃতি ছিল। ডাক্তার তাকে সিড়ি দিয়ে উঠানামা করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তিনি তখন ঘরে বসে থাকতে পারেন নি। জামাআতের কাজ কিভাবে করতেন? তার ঘরের নিকটেই মসজিদ ছিল আর সেখানেই আমীরের দপ্তর ছিল। পাকিস্তানে লিফ্টের ব্যবস্থাও ছিল না, এখানে যেভাবে দুস্থদের জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়, স্বয়ংক্রিয় চেয়ার বা ইলেকট্রনিক চেয়ার ছিল যা সিড়ির সাথে লেগে যায়। তিনি এর উপায় বের করেন, একটি চেয়ারের ন্যায় ছোট পিড়ি নিয়ে তার সাথে দড়ি বেঁধে দেন আর নিজের ঘরের চাকরদের বলে প্রতিদিন নীচে নেমে যেতেন আর সন্ধ্যার সময় তাতে বসেই টেনে উপরে চলে যেতেন। এভাবে সারাদিন জামাআতের কাজ করতেন। খুব অক্লান্ত এবং জামাআতের সেবাকারী ছিলেন। সুতরাং এই হচ্ছে জামাআতের সেবাকারীর অবস্থা।

প্রত্যেক শহীদ যাওয়ার সময় এই বাণী প্রদান করে যায় যে, “আমি মারা যাই নি বরং জীবিত”। এখন তোমরাও স্মরণ রাখ যে জামাআত এবং হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এর সাথে আর খোদা তাআলার সাথে বিশ্বস্ততার এই সম্পর্ক তোমাদেরকেও জীবন প্রদান করবে। তার স্ত্রীর বয়স ৬০ বছর আর শেঠ সাহেবের বয়স প্রায় ৭০ বছর ছিল। তার ৪ সন্তান আছে। একজন ডাক্তার, একজন ব্যবসায়ী, একজন উকিল আর এক ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে। তার মেয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে আছে। আল্লাহ্ তাআলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকুন, তার সাথে ক্ষমার আচরণ করুন।

এছাড়া ঐ দুজন আহতদের জন্যও দোয়ার এলান করতে চাই। একজন শেখ সাঈদ আহমদ সাহেব যাকে প্রথম রমযানের দিন বা একদিন পূর্বে চাঁদ রাতে করাচীতে তার দোকানে বসা অবস্থায় গুলি করে গুরুতর আহত করা হয়। আর দ্বিতীয়ত ডাক্তার মান্নান সিদ্দিকী সাহেবের সাথে গার্ড আরিফ সাহেব আহত হয়েছিলেন ইনিও গুরুতর আহত হন আর এ অসুস্থ দুজন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছেন। আল্লাহ্ তাআলা তার নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সুস্বাস্থ্য দান করুন। রমযানে এই নামধারী মুসলমানদের দল পুণ্য অর্জনে আরো অগ্রগামী হয়ে যান আর তারা জানেন না যে আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকদের জন্য কি পরিণাম রেখেছেন। আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে ও আর জাতিকেও এই মানুষের শত্রুদের থেকে নিরাপদ রাখুন। এ দিনগুলোতে অনেক দোয়া করুন, আল্লাহ্ তাআলা সকলকে নিজ হিফাযতে রাখুন।

অনুবাদঃ মাওলানা জহির উদ্দিন আহমদ, মুরব্বী সিলসিলাহ্

প্রাপ্ত সুত্রঃ পাক্ষিক আহ্‌মদী - সংখ্যাঃ ৩১শে অক্টোবর ও ১৫ই নভেম্বর, ২০০৮ইং