In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘আল-রায্‌যাক’ (রিয্‌ক দাতা)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৬ই জুন, ২০০৮ইং

রায্‌যাক আল্লাহ্ তাআলারই সত্তা। এরদিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলে তোমাদের আধ্যাত্মিক ও পারলৌকিক রিয্‌ক যেভাবে বৃদ্ধি পাবে, তেমনি এ জগতে তোমাদের জাগতিক রিয্‌ক সুব্যবস্থা হবে।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্ তাআলার সিফত (গুণবাচক নাম) রায্‌যাক (রিয্‌কদাতা)। বিভিন্ন অভিধানকারকগণ এ গুণবাচক নামের যে অর্থ বর্ণনা করেছেন আমি তা তুলে ধরছি।

আল্লামা জামালুদ্দিন মোহাম্মদ এর অভিধান লিসানুল আরব। তিনি আর্‌ রায্‌যাকু ওয়া রায্‌যাকু এর বিষয়ে লিখেন, এটা আল্লাহ্ তাআলার সিফত। কেননা তিনিই সমগ্র সৃষ্টিকুলকে রিয্‌ক (আবার) দিচ্ছেন। তিনিই ঐ সত্তা যিনি সমগ্র সৃষ্টিকেই জাহেরী (প্রকাশ্য) ও বাতেনী (গোপন) রিয্‌ক দান করেন।

আকরাবুল মাওয়ারেদ একটি অভিধান গ্রন্থ। এতেও আর্‌ রায্‌যাক সম্পর্কে লিখা হয়েছে, রায্‌যাক শব্দ কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলার জন্যই ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ্ ব্যতিত কারও জন্য ব্যবহৃত হয় না।

অনুরূপ মুফরেদাত ইমাম রাগেব-এ লিখা আছে-রায্‌যাক শুধুমাত্র আল্লাহ্ তাআলার জন্যই বলা হয়। ইমাম রাগেব সাধারণতঃ কুরআনের আয়াতের ওপর নিজের অভিধানের ভিত্তি রাখেন, এরই ভিত্তিতে অর্থ বর্ণনা করেন। মূলতঃ আমার এটা বর্ণনার উদ্দেশ্য হচ্ছে- এটা বুঝানো রায্‌যাক কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলারই সত্তা। আর এর কি অর্থ রয়েছে এবং বিভিন্ন অভিধানকারক এর কি অর্থ করেন সেটা তুলে ধরা। আমরা সাধারণভাবে এ শব্দ ব্যবহার করি। আমাদের ভাষায় ব্যবহৃত হয়। উর্দুতেও আর পাঞ্জাবীতেও। কিন্তু এটা খুবই সীমাবদ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়, যদিও এর অর্থে বিশাল ব্যাপকতা রয়েছে।

রিয্‌ক শব্দের ৩টি অর্থ ইমাম রাগেব বর্ণনা করেছেন। প্রথমত: নিয়মিত প্রাপ্ত পুরস্কারকে রিয্‌ক বলা হয়, এটা ইহলৌকিক বা পারলৌকিক যে পুরস্কারই হোক না কেন। দ্বিতীয়তঃ কখনও “হিস্যা” (অংশ) বুঝানোর জন্য “রিয্‌ক” ব্যবহৃত হয়, অংশের মধ্যে ভাল কিংবা মন্দ যে কোনটি হতে পারে। তৃতীয়তঃ রিয্‌ক দ্বারা কখনও খাদ্যদ্রব্যকে বুঝায়, যা খাওয়া হয় এবং যা খাবারের কাজ করে।

আবার লিসানুল আরব অনুসারে প্রত্যক এমন জিনিসকে রিয্‌ক বলা হয় যা থেকে উপকার পাওয়া যায়। এর অর্থ দানও হয়। বৃষ্টিকেও রিয্‌ক বলা হয়।

আকরাবুল মাওয়ারেদ অনুসারে প্রত্যেক এমন জিনিস যা থেকে উপকৃত হওয়া যায় তাকে রিয্‌ক বলে। বেতন ইত্যাদি রিয্‌ক এর আওতাভুক্ত।

আল্লাহ্ তাআলা কুরআন করীমের বিভিন্ন আয়াতে রিয্‌ক শব্দ ব্যবহার করেছন। এর কয়েকটি উপস্থাপন করছি। আল্লাহ্ তাআলা সূরা হুদে বলছেন,

وَمَا مِن دَآبَّةٍ فِي الأَرْضِ إِلاَّ عَلَى اللّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ

অর্থঃ ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন বিচরণকারী জীব নেই যার রিয্‌কের দায়িত্ব আল্লাহ্‌র উপর নেই। তিনি তাদের অস্থায়ী আবাসস্থল জানেন এবং স্থায়ী আবাসস্থলও। সব কিছু এক সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। (সূরা হুদ: ৭)

এই আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা অত্যন্ত জোরালোভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছেন, তিনি আল্লাহ্ তাআলারই যিনি এ জগতে বিদ্যমান সব প্রাণীকে রিয্‌ক দান করেন। প্রত্যেক পাখি, কীট পতংগ এমন কি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব যাদেরই খাবারের প্রয়োজন, আল্লাহ্ তাআলাই তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। ভূপৃষ্ঠে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির কীটপতংগ রয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা প্রত্যেকের জন্য ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তর থেকেই খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তাআলার অপার ক্ষমতা। তিনি সেসব অনুজীবদের রিয্‌কের ব্যবস্থা করেন, যাদের বিষয়টি কোন অনুসন্ধানের পরই বুঝা যায়। আর কিছু এমন রয়েছে যার বিষয়ে এখন মানুষের কোন জ্ঞান নেই যে কিভাবে আল্লাহ্ তাআলা রিয্‌কের ব্যবস্থা করছেন।

আবার মানুষ ফসল উৎপাদন করেন। আল্লাহ্ তাআলা নানা জাতের ফসল সৃষ্টি করেছেন। এর এক অংশ মানুষ নিজের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে আর অন্য অংশ অন্যান্য প্রাণীদের কাজে লাগে। মোট কথা খোদা তাআলা সবাইকে রিয্‌ক দেন। আর কেবল জাগতিক রিয্‌ক নয়, ঐ বস্তুজগতের জীবনের যেটা তা-ই। বরং অভিধানে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সেভাবে জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় রিয্‌কই দান করেন। পরকালের রিয্‌ক কেবল মাত্র মানুষ, যারা আশরাফুল মাখলুকাত তাদের জন্য রয়েছে। পরকালের রিয্‌কের ভিত্তি হবে আধ্যাত্মিকতা ও পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা। আর তারা পুণ্যকর্মের ফলশ্রুতিতেই পুণ্য প্রতিদান ইহজগত ও পরজগতে লাভ করবে। যার পরিসমাপ্তি পরকালে গিয়ে হবে। এজন্য, এই পরকালের রিয্‌কের জন্য এ জগতে আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে উপকরণ দিয়ে দিয়েছেন। ঐ রিয্‌কও আল্লাহ্ তাআলাই এখানে অমাদেরকে দিচ্ছেন যেটা আধ্যাত্মিক ক্রমোন্নতির কারণ হবে। এজন্য নবীগণ এসেছেন, আসছেন যেন ঐ আধ্যাত্মিক রিয্‌ক সৃষ্টির মাঝে প্রবাহমান রাখেন। পরিশেষে আঁ হযরত (সা.) এর মাধ্যমে আল্লহ্ তাআলা আমাদেরকে এমন উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মিক রিয্‌ক দান করলেন যা চির প্রবাহমান। এটা না নষ্ট হবার ভয় আছে, না শেষ হবার।

এ আয়াতে রিয্‌কের বিষয়ে বর্ণনার পূর্বে আল্লাহ্ তাআলা ইবাদত ও পুণ্যকর্মের দিকে দৃষ্টি আকষর্ণ করাচ্ছেন। আর স্মরণ করাচ্ছেন আল্লাহ্ তাআলা নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে। যে এ জগতে উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মিক রিয্‌ক লাভ করবে, সে পরকালে এর চেয়েও উৎকৃষ্টতর রিয্‌ক পাবে। এজন্য শর্ত কেবল পুণ্যকর্ম সম্পাদনের। জাগতিক রিয্‌ক আর সমগ্র প্রাণী জগতের উদাহরণ উপস্থাপনের উদ্দ���শ্য হচ্ছে-��াগতিক রিয্�����ক নিয়ে য��রা চিন্তা করবে তারা এ বিষয়ে মেনে নিতে বাধ্য হবে, আল্লাহ্ তাআলাই প্রকৃত রিয্‌কদাতা। যখন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি এতো দয়ালু তখন চিরস্থায়ী জীবনের জন্য কেন রিয্‌কের ব্যবস্থা করবেন না?

সুতরাং আল্লাহ্‌র ইবাদত ও পুণ্যকর্ম এমন রিয্‌ক যা চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রয়োজন। আর মানুষ যারা আশরাফুল মাখলুকাত তাদের সাথেই শুধু চিরস্থায়ী ও পরকালের জীবনের অঙ্গীকার রয়েছে। এজন্য তাদেরকে নিজেদের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত।

পবিত্র কুরআন এক মু’মিনের জন্য সুস্পষ্টভাবে রিয্‌ক উপার্জনের মাধ্যম বলে দিয়েছে । যেভাবে আমি বর্ণনা করেছি-আল্লাহ্ তাআলা আঁ হযরত (সা.) কে প্রেরণের মাধ্যমে এ রিয্‌ক আদর্শগত এবং পরিমাণগতভাবে আমাদেরকে দান করেছেন। মানুষকে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে- তোমাদের জন্য আধ্যাত্মিক রিয্‌ক অবতীর্ণ করা হয়েছে, এর মূল্যায়ণ কর; কেননা এ অবমূল্যায়ণ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন অনেক সময় এ পৃথিবীতে মানুষকে জাগতিক রিয্‌ক থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

এজন্য আল্লাহ্ তাআলা এ বিষয় বর্ণনা করে এক স্থানে বলছেন,

وَضَرَبَ اللّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَداً مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللّهِ فَأَذَاقَهَا اللّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُواْ يَصْنَعُونَ

অর্থঃ এবং আল্লাহ্ তাআলা এমন এক জনপদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যা সব দিক থেকে নিরাপদ ও সুখ শান্তিতে ছিল, তাদের নিকট সব দিক থেকে রিয্‌ক আসতো। তথাপি এর অধিবাসীরা আল্লাহ্‌র নিয়ামতসমূহের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষুধা ও ভয়ের পোষাকের স্বাদ গ্রহণ করালেন। (সূরা আন্‌ নাহ্‌ল: ১১৩)

এখন যে উদাহরণ দেয়া হয়েছে এটা মক্কার ঘটনা ছিল। যদিও রিয্‌ক এর ব্যবস্থার জন্য হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর দোয়া ছিল আর আল্লাহ্ তাআলার ওয়াদাও ছিল। তবুও আঁ হযরত (সা.)-কে অস্বীকার করার কারণে তারা ক্ষুধা ও কষ্টের মধ্যে নিপতিত হয়। এক সময় এমন এলো তারা ক্ষুধায় অস্থির হয়ে পড়লো। যতক্ষণ পর্যন্ত আঁ হযরত (সা.) তাদের মাঝে ছিলেন তাদের এ পরিণতি হয়নি। প্রত্যেক দিক থেকে রিয্‌ক মক্কায় আসতো। কিন্তু আঁ হযরত (সা.)-এর হিজরতের পর একবার মক্কায় এমন দুর্ভিক্ষ হলো যে সবার জীবনের আশা ফুড়িয়ে গেল। আবু সুফিয়ান যে ইসলাম ও আঁ হযরত (সা.)-এর প্রাণের শত্রু ছিল, সে মদিনায় রসূল (সা.)-এর নিকট আসলো এবং অত্যন্ত মিনতির সাথে নিবেদন করলো-দোয়া করুন আল্লাহ্ তাআলা যেন আমাদের ক্ষুধা, দারিদ্রতা, ভয় ও দুর্ভিক্ষের অবস্থা দূর করে দেন। বলতে লাগলো-আপনি কি আপনার ভাইদের জন্য সহানুভূতি রাখেন না, তাদেরকে এমনি ভয় ও ক্ষুধায় মরতে দিবেন! আঁ হযরত (সা.) তো মানবতার ধারক ও বাহক ছিলেন। তিনি ভালবাসা ও দয়ার মূর্তিমান প্রতীক ছিলেন। তিনি (সা.) এটা বলেন নি-তোমরা আমাদের শত্রু তোমরা মুসলমানদেরকে যে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করেছ এ শাস্তি তোমাদের প্রাপ্য, তোমাদের সাথে এ ব্যবহার-ই হওয়া উচিত। বরং তাঁর (সা.) কোমল হৃদয় তৎক্ষণাৎ মক্কাবাসীর জন্য দয়াদ্রচিত্ত হয়ে ওঠে। তিনি (সা.) তাদের দুর্ভিক্ষের পরিসমাপ্তির জন্য দোয়া করেন। আল্লাহ্ তাআলা করুণা করেন, এ অবস্থা দূর হয়ে যায়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, শত্রুরা এটা জানতো তিনি (সা.) সত্যবাদী। তাঁর (সা.) কাছে আসা ও দোয়ার আবেদন করাটা এরই প্রমাণ বহন করে। আর তারা এটাও জানতো তিনি আত্মিক রিয্‌ক যাঁর নিকট থেকে পাইয়ে দেবার দাবী করতেন, জাগতিক রিয্‌কও তাঁর নিকট থেকেই আসে, আর তিনিই তাঁকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তবুও বিরোধিতা থেকে তারা বিরত হয়নি, বরং উত্তর উত্তর বেড়েই চলেছে যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ তাআলা মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাদেরকে অধীনস্থ করে দিয়েছেন।

এ যুগেও রিয্‌কের অভাব রয়েছে। এখনও জগদ্বাসীকে চিন্তা করা উচিত। আজ কাল খাবারের অভাব ও উচ্চমূল্যের কথা হচ্ছে। এটা ভাবার বিষয়, অতীতে এ অবস্থা হতে পারলে এখন কি হতে পারবে না? এটা কি আধ্যাত্মিক রিয্‌কের প্রতি উদাসিনতা নয়, যার কারণে এ পরিণতি হচ্ছে? আমেরিকা যাকে বর্তমান বিশ্বে সবচে শক্তিশালী দেশ মনে করা হয়, যার অর্থনৈতিক অবস্থাও শক্তিশালী, সেখানেও খাদ্যের স্বল্পতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথা হচ্ছে। তারা এ অবস্থাকে ভাল করতে পারছে না। সেখানেও উচ্চ দ্রব্যমূল্য নিয়ে গোলমাল হচ্ছে। যদিও তারা এখন বিভিন্ন নব নব প্রজাতির ফসল উদ্ভাবন করেছে যা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বের ফসলের চেয়ে দশ থেকে বিশগুণ বেশি ফলন দিচ্ছে। তবুও আমেরিকাসহ আজ বিশ্বের সর্বত্র খাদ্যের স্বল্পতার কথা হচ্ছে। চাউলের ঘাটতির আর্তনাদ হচ্ছে। অন্যান্য জিনিসের মূল্য ক্রমবর্ধমান এ আর্তনাদ করে যাচ্ছে। এসব কেবলমাত্র এজন্য হচ্ছে যে খোদা তাআলার পক্ষ্য থেকে যদি পানি বর্ষিত না হয় তাহলে ফসল তো হতে পারে না। আর জগৎ যখন আল্লাহ্ হতে দূরে সরে যায়, বিদ্রোহের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখনই এ ধরনের বিপর্যয় আসে।

এক মুসলমানের জন্য আল্লাহ্ তাআলা সুস্পষ্ট ভাবে পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন-রায্‌যাক আল্লাহ্ তাআলার সত্তা। তাঁর দিকে একনিষ্ঠ হলে তোমাদের আত্মিক ও পারলৌকিক রিয্‌ক যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি এ জগতে তোমাদের জাগতিক রিয্‌কেরও সুব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাই মুসলমানদেরকে অন্যদের চেয়ে বেশি নিজেদের হিসেব নেয়া উচিত এবং চিন্তা করা উচিত।

এক জায়গায় আল্লাহ্ তাআলা নিজে রায্‌যাক হওয়া বিষয় বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

وَكَأَيِّن مِن دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

অর্থঃ এমন অনেক জীবজন্তু রয়েছে যারা নিজেদের রিয্‌ক বহন করে বেড়ায় না। আল্লাহ্ তাআলাই তাদেরকে ও তোমাদেরকে রিয্‌ক দেন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী। (সূরা আল্‌ আন্‌কাবুত: ৬১)

এখানে পুনরায় আল্লাহ্ তাআলা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন-পুণ্য ও দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে আল্লাহ্ নির্দেশিত আদেশাবলীর ওপর আমল করে যেতে হবে। এ ভয় করবে না যদি আমরা দুনিয়াদারদের কথা না শুনি, বড় কর্তা ও রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার না করি, তাহলে আমাদের রিয্‌কের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য মোমেনের কাজ হচ্ছে সর্বদা খোদাকে স্মরণ রাখা। মোমেনের কাজ এটা নয় কোন অবস্থায় দূর্বলতা প্রদর্শন করা। এই ভয় থাকা উচিত নয়, যাদের সাথে আমার রিয্‌ক সম্পৃক্ত তাদের সুরে যদি সুর না মিলাই তাহলে নিজের চাকুরী থেকে, নিজের রিয্‌ক থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হবে। অথবা জাতীয় পর্যায়ে কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে এ ভয় করা উচিত নয়, আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য অমুক দেশের ওপর নির্ভরশীল বা আমাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অমুক দেশের সাথে সম্পৃক্ত, এজন্য মুসলমান হয়ে মুসলমান রাষ্ট্রগুলোকে অন্যদের স্বার্থে ধোকা দিতে হবে। যা আজকাল হচ্ছে। আল্লাহ্ তাআলা খুবই সুস্পষ্টভাবে বলেছেন-দীনের ক্ষেত্রে আত্মাভিমান দেখানো উচিত, কোন অবস্থাতেই ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মোমেনদেরকে অন্যদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হওয়া উচিত নয়। এ ভয় করা উচিত নয়, আমাদের রিয্‌ক ঐ জায়গা বা ঐ দেশের সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, আল্লাহ্ তাআলা নিজের বান্দাদেরকে, ঈমানদারদেরকে, মোমেনদেরকে আত্মাভিমানীদেরকে রিয্‌ক দিয়ে থাকেন। যদি আল্লাহ্ তাআলা নিজের অন্যান্য সৃষ্টির জন্য রিয্‌কের ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে মোমেনদের জন��য কেন পারবেন না? সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা যিনি আকাশ ও পৃথিবীর মালিক, যিনি চন্দ্র ও সূর্যকে নিজের সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত করেছেন তাঁর একি এতটুকু শক্তি সামর্থ্য নে��� তি���ি নিজের নিষ��ঠাবান বান্দা���ের জন্য রিয��‌কের উপকরণের ব্যবস্থা করে দিবেন? সুতরাং সর্বদা এ কথা স্মরণ রাখবেন,

اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

অর্থঃ অর্থাৎ আল্লাহ্ই নিজ বান্দাদের মধ্য হতে যার জন্য চান রিয্‌ককে সম্প্রসারিত করে দেন এবং যার জন্য চান সংকুচিত করে দেন। (সূরা আল্‌ আন্‌কাবুত: ৬৩)

সুতরাং জাগতিক মাধ্যমসমূহকে নিজেদের রিয্‌কের একমাত্র মাধ্যম মনে করো না। রিয্‌ক দেয়া ও না দেয়া আল্লাহ্ তাআলার ওপর নির্ভরশীল। যারা জাগতিক উপকরণকে একমাত্র মাধ্যম মনে করে তাদের অবস্থা আজ জগৎ দেখছে। ধনী রাষ্ট্রগুলোতে বসবাসকারীদের মধ্যেও রিয্‌কের ঘাটতির দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। যদি কোন ক্ষমতাধর বা ধনী রাষ্ট্রই রায্‌যাক (রিয্‌কদাতা) হন তাহলে ধনী রাষ্ট্রগুলোতে রিয্‌কের জন্য কেন এত চিৎকার এতো আর্তনাদ! সুতরাং এক মোমেনের আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছা কি সর্বদা ঐদিকে দৃষ্টি রাখা উচিত। যদি কোন মানুষ আল্লাহ্ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করে তাঁর ইবাদত করতে থাকে এবং তাঁর আধ্যাত্মিক রিয্‌ক দ্বারা কল্যাণমন্ডিত হবার চেষ্টা প্রচেষ্টা করতে থাকে তাহলে তার কোন দুশ্চিন্তা নেই। আল্লাহ্ তাআলা মোমেনগণের জাগতিক প্রয়োজনও পূর্ণ করেন আর স্বল্পে তুষ্টিও তাদের দান করেন। সুতরাং যিনি প্রকৃত রায্‌যাক (রিয্‌কদাতা) তাঁর দিকেই এক মোমেন বান্দার দৃষ্টি সর্বদা নিবদ্ধ রাখা উচিত, কোন মানুষের প্রতি নয়।

এই বান্দাদেরকে যুগে বিশেভাবে খোদার গুণাবলী সমূহের সম্যক জ্ঞান লাভ করতে হবে। কেননা এ যুগ মসীহ্ মাওউদ-এর যুগ, এ যুগেই প্রকৃত প্রভু প্রতিপালকের আশ্রয়ে থাকার দোয়া শিখানো হয়েছে! কেননা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি, একে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা, স্বল্পতম সময়ে এক জায়গা অন্য জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, এবং নিজেদের সমস্ত প্রস্তুতি ও শক্তির বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণে গরীব জাতিসমূহ ও গরীব লোকেরা ধনী জাতিসমূহ ও ধনী লোকদেরকেই নিজেদের সব কিছু মনে করে। বা মনে করার আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে। আর মোমেনও এর মধ্যে জড়িয়ে যেতে পারে। এজন্য খোদা তাআলা বলেছেন, আমি প্রভু প্রতিপালক। জগতের কোন মানুষ নয় কোন দেশ তোমাদের প্রভু প্রতিপালক নয়। আমিই তোমাদের প্রতিপালন করি। আমি তোমাদের জাগতিক রিয্‌কের ব্যবস্থা করি। সুতরাং আমিই তোমাদের প্রকৃত উপাস্য, এ রিয্‌ক লাভের জন্য আমার আশ্রয়ে আস। আর এর (আল্লাহ্‌র গুণাবলীর) সঠিক জ্ঞান লাভের জন্য আমার প্রেরিত আধ্যাত্মিক পানি থেকে কল্যাণমন্ডিত রিয্‌ককেও অর্জনের চেষ্টা কর। এবং এটা উপার্জনকারী হও। এটাই তোমাদেরকে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণসমূহের উত্তরারধিকারী বানাবে।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এক জায়গায় বলেন,

“যখন মানুষ উপকরণের ওপর সীমাতিরিক্ত নির্ভর করে আর পুরো নির্ভরশীলতা উপকরণের উপর গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন এটা ঐ শির্‌ক হয় যা মানুষকে নিজের আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন ব্যক্তি এটা বলে, অমুক জিনিস না হলে আমি ভুখা মরে যেতাম। অথবা যদি অমুক সম্পত্তি বা অমুক কাজ না হতো তাহলে আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেত। অমুক বন্ধু না হলে কষ্ট হতো। সম্পত্তি বা অন্য উপকরণ ও ব্যক্তির ওপর এভাবে নির্ভর করা যার ফলে খোদা তাআলা সম্পূর্ণরূপে দূরে নিক্ষিপ্ত হন, এগুলো এমন বিষয় যা খোদা তাআলা কখনও পছন্দ করেন না। এটা ভয়ংকর শির্‌ক। এটা কুরআন শরীফের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিরোধী। যেমন আল্লাহ্ তাআলা বলছেন,

وَفِي السَّمَاء رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ

(সূরা আয্‌-যারিয়াত: ২৩)

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجاً

(সূরা আত্‌ তালাক্‌: ৩)

وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

(সূরা আত্‌ তালাক্‌: ৪)

وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ

(সূরা আল্‌ আ’রাফ: ১৯৭)

তিনি (আ.) বলেন,

“কুরআন শরীফ এমন আয়াতে ভরপুর যে তিনি মুত্তাকীদের (খোদাভীরুদের) অভিভাবক ও তথ্যাবধায়ক। তাই মানুষ যখন উপকরনের উপর নির্ভর ও ভরসা করে তখন বস্তুত খোদা তাআলার এই গুণাবলীর অস্বীকার করে এবং ঐ উপকরণগুলোকে এই গুণাবলীর সাথে অংশীদারিত্ব দাড় করায় আর নিজের জন্য এই উপকরণগুলোকেই আরেক খোদা হিসেবে বেছে নেয়। যেহেতু সে এক দিকে ঝুঁকে যায়, ফলে সে শিরকের প্রতি এক ধাপ এগিয়ে যায়। যে লোক প্রশাসকের প্রতি ঝুঁকে থাকে আর তার নিকট পুরস্কার বা সাদর সম্ভাষণ লাভ করে, তার (লোকের) হৃদয়ে তার (প্রশাসকের) মহিমা খোদার মহিমার স্থান দখল করে। সে তার পূজারী হয়ে যায়। আর এটাই এমন এক বিষয় যা তৌহিদকে মিটিয়ে দেয় এবং মানুষকে তার মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দূরে ছিটকে ফেলে দেয়। সুতরাং আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) এই শিক্ষাই দেন, উপকরণ ও তৌহীদের মাঝে বৈপরীত্য পাবে না, বরং প্রত্যেকে প্রত্যেকের স্ব স্ব জায়গায় থাকবে। -তারা মানুষকে এটা শিখাতে চান-সমস্ত মান সম্মান, আরাম আয়েশ ও প্রয়োজন পুরা করার জিম্মাদারী আল্লাহ্ তাআলারই ওপর সোপর্দ। সুতরাং যদি তাঁর বিপরীতে অন্য কাউকে দাড় করানো হয় তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট ও দুই বৈপরীত্যের সম্মুখীনতায় এক ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্য এক্ষেত্রে খোদা তাআলার তৌহিদকে সর্বাগ্রে স্থান দিতে হবে, উপরণকে উপেক্ষা করতে হবে। উপকরণকে খোদা বানানো যাবে না। এ রকম তৌহিদের ফলে খোদা তাআলার প্রতি এক প্রকার ভালবাসা সৃষ্টি হয়। যখন মানুষ বুঝে যায় লাভ ক্ষতি তাঁরই হাতে অর্থাৎ খোদা তাআলার হাতে। প্রকৃত দয়ালু তিনিই। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সব তাঁরই পক্ষ থেকে। অন্য কেউ মধ্যে নেই। যখন মানুষ এ পবিত্র অবস্থা অর্জন করে নিবে তখন তাকে একত্ববাদী বলা হবে। বস্তুত তৌহিদের এক অবস্থা এটা, মানুষ পাথর বা মানুষ বা অন্য কোন বস্তুকে খোদা বানাবে না বরং এগুলোকে খোদা বানানোকে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখবে। আর দ্বিতীয় অবস্থা হলো -উপকরণকে উপেক্ষা করে যাবে।”

(মলফুযাত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃঃ ৫৭, ৫৮, নতুন এডিশন, প্রকাশিত রাবওয়া)

অর্থাৎ বাহ্যিক উপকরণ হোক কিন্তু ভরসা আল্লাহ্‌র ওপর করতে হবে। এটাই মূল বিষয়।

আবার আল্লাহ্ তাআলা কুরআন করীমে বলছেন,

وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِن رِّزْقٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ آيَاتٌ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ

অর্থঃ রাত দিনের পরিবর্তনের মধ্যে এবং এই বিষয়ের মধ্যে যে আল্লাহ্ আকাশ থেকে রিয্‌ক অবতীর্ণ করেন। পুনরায় এর দ্বারা পৃথিবীকে এর মৃত্যুর পর জীবিত করেন আর বায়ূকে দিক পরিবর্তন করে চালানোর মধ্যে বুদ্ধিমান জাতির জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। (সূরা আল্‌ জাসিয়া: ৬)

এই আয়াতে মুসলমানদের জন্য বিশেষভাবে এ পয়গাম রয়েছে, কেননা মুসলমানরা কুরআনের ওপর ঈমান আনার দাবী করে। যেমন রাত ও দিনের আগমনকে আমরা দেখি। যে কাজ ও উন্নতি আমরা দেখি সেটা দিনের রশ্মিতে হয়, আর এটা রাতে হয় না। তদ্রুপ আধ্যাত্মিক জগতেও রাত ও দিনের অবস্থা আসে। আঁ হযরত (সা.) এর পূর্বে এক অন্ধকারের যুগকে রসূল (সা.) এসে আলোকিত করেছেন। আর আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে শেষ শরীয়ত পেয়ে এ ঘোষণা দিলেন-এখন এ জ্যোতির্ময় কিতাব ও পরিপূর্ণ শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্ত হৃদয়গুলোকে আলোকিত করবে। কিন্তু সাথে সাথে তিনি (সা.) এ-ও বললে��, এটাও এক ঐশী তকদীর, আমার পরে এক অন্ধকারের যুগ আসবে। কিন্তু ঐ অন্ধকারের যুগেও এই পরিপূর্ণ শরীয়তের আলো বিভিন্ন জায়গায় লেম্প ও প্রদীপের ন্যায় জ্বলতে থাকবে। এমন ��োকের ��বির্ভাব হবে যারা রশ্মি বিকির��� করতে থাকবে�� আর পরে ঐ অন্ধকারের যুগে রসূল (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মসীহ্ ও মাহদীর আগমনের মাধ্যমে সারা জগৎ আলোকিত হবার কথা ছিল।এরপর আবার ঐ রিয্‌ক নাযিল হবার কথা ছিল যা পুনরায় মৃত পৃথিবীকে জীবিত করবে। সুতরাং হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এর আগমনের মাধ্যমে আবার ঐ পানি অবতীর্ণ হয়েছে যা মৃত জগৎকে আবার জীবিত করেছে। আর তিনি (আ.) আঁ হযরত (সা.) এর গোলামীর মাধ্যমে ঐ নূর নিয়ে আসলেন যার মাধ্যমে এ দিন আবার আলোকিত হলো, সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল। এক পঙ্কতিতে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন,

“ম্যাঁয় ওহ্ পানি হুঁ যো
আয়া আসমাঁ সে ওয়াক্‌ত পার
ম্যায়ঁ ওহ্ হুঁ নূরে খোদা
জিস সে হুয়া দিনে আশকার”

অনুবাদ
আমি ঐ বারিধারা
যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে সঠিক ক্ষণে
আমি হলাম খোদার সেই নূর
যারই আলোয় উদ্ভাসিত হলো এ দিন।

অতএব এখন এ নূর ও পানি আঁ হযরত (সা.) এর সত্যিকার প্রেমিকের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন। এটা থেকে কল্যাণ নেয়া প্রত্যেক মুসলমানের যেমন ফরজ, তেমনি এর ওপর আমল করাও আমাদের ফরজ। আর তদ্রুপই ফরজ যেরূপ আঁ হযরত (সা.) এর ওপর ঈমান আনা ফরজ, কেননা তিনি (সা.) এ আগমনকারী মসীহ্ ও মাহদীকে সালাম পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণযোগ্য। যেভাবে আমি পূর্বে দেখিয়েছি অভিধানকারকগণ বৃষ্টিকেও রিয্‌ক বলেছেন। আর এর সমর্থনে সূরা জাসিয়ার যে আয়াত আমি তেলাওয়াত করেছি তাতে এটাই পেশা করা হয়েছে। মূলত: যেভাবে আমি বলেছি আল্লাহ্ তাআলা এ যুগে এ পানি অবতীর্ণ করেছেন এখন এরপর শুধু দীর্ঘ জীবন আর আলোর ছড়াছড়ি হবে। যা হবে রিয্‌কের মাধ্যম।

আঁ হযরত (সা.)-এর নূরকে পৃথিবীতে সুপ্রসারিত করার জন্য আল্লাহ্ তাআলা হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে প্রেরণ করেছেন। অতএব আল্লাহ্ তাআলা এখন জগতে মুসলমান ও অমুসলমানদের জন্য এ রিয্‌কই অবতীর্ণ করেছেন যার দ্বারা আধ্যাত্মিক ও জাগতিক ক্ষুধা নিবারিত হবে বা হতে পারে, আর হওয়া উচিত। এজন্য আমাদেরও ফরজ আমরা যেন এটাকে দুনিয়ার সর্বত্র ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করি ও পৌঁছে দেই।

এক জায়গায় আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন,

رِزْقاً لِّلْعِبَادِ وَأَحْيَيْنَا بِهِ بَلْدَةً مَّيْتاً كَذَلِكَ الْخُرُوجُ

অর্থঃ বান্দাদের জন্য রিয্‌ক স্বরূপ, এবং আমরা এর দ্বারা অর্থাৎ বৃষ্টির দ্বারা মৃত ভূমিকে জীবিত করি। অনুরূপভাবেই পুনরুত্থান হবে। (সূরা ক্বাফঃ ১২)

এখানে বৃষ্টির উপমা দেয়া হয়েছে। যেভাবে বৃষ্টি বর্ষণের ফলে মৃত ভূমি জীবিত হয়ে যায়। চারদিকে চিরসবুজ দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়। এমনকি অনেক সময় বাহ্যিকভাবে মরু ভূমির মত এলাকাও এমন সবুজ শ্যামল হয়ে যায় মনেই হয় না এটা ঐ অনাবাদী এলাকা। পাকিস্তানের সিন্ধ্-এ ‘থর’ এলাকা রয়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি উড়তে থাকে আর যদি তখন তাতে বৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে এ বালির টিলাগুলো ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ের ন্যায় দৃষ্টিগোচর হয়। আর এ পরিবর্তন আকস্মিক হয়। বিস্মিত হতে হয় এ দৃশ্য দেখে, এ সবুজ শ্যামল দৃশ্য এ মাটিতে কিভাবে সৃষ্টি হলো। ঐ এলাকা যাতে লোকদের পালাক্রমে ফসলহীন অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়, সেখানে বৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই ফসলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, রিয্‌কের প্রাচুর্য এসে যায়। এখন প্রত্যেক বুদ্ধিমান মানুষ যখন চিন্তা করে, সে কোন ধর্মের অনুসারী হোক বা না হোক তার মুখ থেকে নির্দ্বিধায় আল্লাহ্ তাআলার গীত সুবহানাল্লাহ্ উচ্চারিত হয়। যদিও হুবহু এ শব্দে নয়। তাদের তাঁর রায্‌যাক গুনের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে। যদি মোমেন হয় তাহলে আরও অনেক বেশি উপলব্ধি হয়। তাহলে কি ভূমি যা নিজে শুষ্ক হওয়া সত্ত্বেও এই গাছগাছড়ার বীজ কে নিজের ভিতর ধরে রাখে আর সময় হলেই চারা বের হয়ে আসে। এটা কোন বড় মানুষ বা রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে রেখেছিল? বৃষ্টি বর্ষণ করা কি কোন বড় রাষ্ট্রের কাজ? অতএব এসব বিষয় এক মোমেনের জন্য চিন্তাভাবনা করার বিষয়, সব রিয্‌কের ব্যবস্থা আল্লাহ্ তাআলাই করেন। তাৎক্ষণিক প্রত্যেকে ও প্রত্যেক ধর্মের লোকেরা যেভাবে আমি বলেছি স্বীকার করে খোদাতাআলা সব রিয্‌কের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু পরে ভুলে যায়। আল্লাহ্ তাআলা বান্দাদেরকে স্মরণ করাচ্ছেন যেভাবে আল্লাহ্ তাআলা মৃত ভূমি থেকে জীবনে উন্মেষ ঘটান এভাবে মানুষকে এ দুনিয়া থেকে যাবার পর পুনরায় জীবিত করবেন। তাই পরকাল যেখানে সমস্ত হিসাব নিকাশ হবে তার প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। সীমালঙ্ঘন, নবীদের অস্বীকার, তাঁদের জামাআতের ওপর নির্যাতনের কারণে জবাবদেহীর সম্মুখীন হতে হবে। অতএব যদি পরকালে উত্তম রিয্‌কের আশা রাখ, মুসলমান দাবী করে যদি এ ইচ্ছা পোষণ কর আমরা মুসলমান আমাদের পরকালে যেন উত্তম রিয্‌ক লাভ হয়, পরে যেন আমাদের সাথে কোমল ব্যবহার করা হয়। তাহলে শুন আল্লাহ্ তাআলা বলছেন এজন্য এ দুনিয়াতে তোমরা পুণ্যকর্ম কর। কেননা ঐ কর্ম, ঐ নেকি ও ঐ উপার্জিত রিয্‌কই পরকালে কাজে আসবে। আল্লাহ্ তাআলা তাঁর রহমতরে চাদরে আবৃত করে সর্বদা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির রাস্তায় চলার তৌফিক দিন। আর ঐ লোকদেরকেও জ্ঞান বুদ্ধ দিন যারা সত্যকে চিনতে পারে নি এবং আল্লাহ্ তাআলার ইঙ্গিতকে বুঝতে পারে নি। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আহমদীদের ওপর জুলুম নির্যাতন হচ্ছে।

আল্লাহ্ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির রাস্তা ও পুণ্য কর্মের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে বলছেন-

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقاً نَّحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى

অর্থঃ এবং তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের তাগিদ করতে থাক, এবং নিজেও এর ওপর সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাক। আমরা তোমার নিকট কোন রিয্‌ক চাই না, বরং আমরা ই তোমাকে রিয্‌ক দিচ্ছি। বস্তুত তাক্ওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য উত্তম পরিণাম। (সূরা ত্বাহাঃ ১৩৩)

অতএব এই আধ্যাত্মিক রিয্‌কের সবচে’ উত্তম অংশ যা আল্লাহ্ তাআলা আমাদের জন্য অবতীর্ণ করেছেন তা হচ্ছে ইবাদত আর বিশেষভাবে নামায। যার প্রতি আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে তাকিদ দিয়েছেন। আমাদের কাজ নিজেদের মনে এ ব্যাপারে এখন বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া। খোদা ও তাঁর রসূলের (সা.) রাজত্ব প্রতিষ্ঠা এবং খিলাফতের পুরস্কারসমূহ থেকে কল্যাণমন্ডিত হওয়ার জন্য নামাযের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। আর আল্লাহ্ তাআলা নামাযের সাথে যে রিয্‌কের উল্লেখ করেছেন তার গুরুত্বও এ যুগে অনেক বেশি। এ যুগই এমন যুগ যাতে রিয্‌কের জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি বের করা হচ্ছে যা অনেক ক্ষেত্রে হালাল ও বৈধ নয়। এগুলো এমন কাজ যা আল্লাহ্ তাআলার অঙ্গীকারের বিরোধী। অতএব নিজের নেক পরিণাম ও আল্লাহ্ তাআলার জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য নামাযের প্রয়োজন। আর রিয্‌ক হালাল হওয়া প্রয়োজন। এটা আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশ। বরং নামাযে প্রতিষ্ঠিতগণ অর্থাৎ একনিষ্ঠ ইবাদতকারীগণের হালাল রিয্‌কের ব্যাপারেও জিম্মাদারী রয়েছে। যেভাবে আল্লাহ্ তাআলা বলছেন-আমরা তোমাদের নিকট রিয্‌ক চাই না। এ প্রসঙ্গে হযরত মুসলেহ মাওউদ (রা.) প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন,

একদিকে তো আল্লাহ্ তাআলা চাঁদার জন্য বলছেন। আর্থিক কুরবানীর জন্য বলা হচ্ছে। তথাপি আল্লাহ্ তাআলা বলছেন তোমাদের নিকট কোন রিয্‌ক চাওয়া হয় না। তাহলে এর উত্তর কি?

এর উত্তর হলো,

ঐ চাঁদা যা নেয়া হচ্ছে এটাও তার নেকীর কারণে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে বহুগুণ বাড়িয়ে ফেরৎ দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়ে��ে। আল্লাহ্ তাআলা বলছেন- এতো বাড়িয়ে তিনি ফেরৎ দেন যে, বান্দা এর চিন্তাও করতে পারে না। অতএব খোদা তাআলা যা নেন এ জন্য নেন না যে এগুলোর তাঁর প্রয়োজন রয়েছে। বরং এ জন্�� যে, তোমাদের নেকির কা���ণে যেন এটাকে তোমাদের ��ন্য বহু���ুণে বাড়িয়ে ফেরৎ দেন। কেননা এসব কাজ তাকওয়াকে সামনে রেখে তাকওয়া অর্জনের উদ্দেশ্যেই সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এজন্য এর ফলাফল এ দুনিয়াতে নেকি ও পরকালে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়া।

আল্লাহ্ তাআলার তাক্ওয়ার ওপরে পরিচালিত করে, আমাদের প্রত্যেক কর্মকে এ জগতের ও পরজগতের উত্তম প্রতিদান লাভের মাধ্যম করুন। আর সর্বোত্তম রিয্‌কে আমাদেরকে কল্যাণ মন্ডিত করুন।

অনুবাদঃ মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ নূরুল আমীন, মুরব্বী সিলসিলাহ্

প্রাপ্ত সুত্রঃ পাক্ষিক-৩১শে জুলাই, ২০০৮ইং