In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

পবিত্র রমযান এবং আমাদের করণীয়

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

১৪ই সেপ্টেম্বর ২০০৭ইং

যারা নিজেরা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে চেষ্টা করে, তাদেরকেই আল্লাহ্ তাআলা তাক্ওয়ার পথে চলার তৌফিক দান করেন। আল্লাহ্ তাআলা রমযানের রোযাকে তাক্ওয়া অর্জনের একটি বড় মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছেন।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

অর্থাৎ, হে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের জন্য রোযাকে সেভাবেই ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববতীগণের জন্য ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাক্ওয়া অবলম্বণ কর। (সূরা বাকারা: ১৮৪)

এটা হচ্ছে রোযার ফযিলত সম্বন্ধে আল্লাহ্ তাআলার হেদায়াত ও হুকুম। আল্লাহ্ তাআলা তাঁর ফজলে এ বছর পুনরায় আমাদেরকে সুযোগ দিয়েছন যে, তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য যে সব উত্তম ব্যবস্থা দান করেছেন, আমরা সেগুলোর শামিল হচ্ছি। গনণার এ কয়েকটি দিন, যা কাল হতে শুরু হয়েছে, সেগুলো অতিবাহিত করছি। কাজেই, আল্লাহ্ তাআলার আদেশ অনুযায়ী, আমরা যদি তাক্ওয়ার পথে উন্নতি করতে চাই, আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য পেতে চাই, নিজেদের দোয়া সমূহকে কবুলিয়্যতের মর্যাদায় পৌঁছাতে চাই এবং নিজেদের ধর্মীয়, চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতি করতে চাই, তবে প্রত্যেক আহ্‌মদীর এ দিনগুলো হতে লাভবান হওয়ার জন্য সর্বাধিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ্ তাআলা বলেন, এই যে রোযা, যা তোমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে, এটা রূহানী (আধ্যাত্মিক) উন্নতি ও তাক্ওয়ার পথে অগ্রগামী হওয়ার জন্য অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। পূর্বেও নবীগণের মান্যকারীদের রূহানী (আধ্যত্মিক) উন্নতির জন্য, তাদের হৃদয়ের পবিত্রতার জন্য ও তাদেরকে খোদা তাআলার নৈকট্য দান করার জন্য, পৃথিবীতে একে ফরজ করা হয়েছিল। সুতরাং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ। এর উপর প্রতিষ্ঠিত (পা-বন্দি) থাকা-ই আমাদের তাক্ওয়ার মানকে উন্নতি দানকারী বানাবে। পূর্ববর্তী নবীগনের মান্যকারীদের মধ্যে থেকে যারা কোন ওজর-আপত্তি না দেখিয়ে খোদা তাআলার আদেশ সমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত (পাবন্দি) ছিলেন, তারাও আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য লাভ করেছিলেন এবং তাঁর কল্যাণরাজির ওয়ারিশ হয়েছিলেন। খোদা তাআলা যখনই তাঁর হুকুম-আহকাম কোন নবীর নিকট প্রেরণ করেছেন, যখনই দুনিয়ার সংশোধনের জন্য খোদা তাআলা তাঁর রসূল প্রেরণ করেছেন, তখন ঐ সকল লোকেরাই আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য অর্জনকারী ও তাঁর হুকুম-আহকামের অংশীদার হয়েছেন, যারা সেই রসূলের পরিপূর্ণ অনুগত ও তাবেদার হয়ে; ঐ শিক্ষার উপর আমল করেছেন এবং ঐ হুকুম-আহকামের উপর চলেছেন, যা আল্লাহ্ তাদের উপর অবতীর্ণ করেছিলেন আর তারা তাদের তাক্ওয়ার মানকে উন্নীত করেছেন। যখন অস্বীকারকারী হয়েছে তখন, যেখানে আধ্যাত্মিক অবস্থার পতন ঘটেছে, যেখানে দুনিয়াবীভাবেও শান-শওকত (জৌলুস) হারিয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা কুরআন করীমে এর উল্ল্যেখও করেছেন। কাজেই আল্লাহ্ তাআলা যখন নবীগণের মান্যকারীদের তাক্ওয়ার পথে চলার তাকিদ করেন, তখন এটাও বলেন, তোমরা তাক্ওয়ার সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে, দুনিয়া ও আখেরাতের নেয়ামত সমূহের অংশীদার হও, তাঁর জান্নাতে ওয়ারিশ হও, যেভাবে তিনি বলেন,

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি-ই প্রভু-প্রতিপালকের শান বা মর্যাদাকে ভয় পায় তার জন্য দু’টি জান্নাত রয়েছে। (আর রহমান: ৪৭)

আল্লাহ্ ত্আলার তাক্ওয়া অবলম্বন করা অবস্থায়, তাঁর মর্যাদাকে উপলব্ধি কর, যে তিনি-ই সকল ক্ষমতার মালিক। তোমাদের হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি তাঁর-ই ভয় থাকা উচিত। অতঃপর এ দুনিয়াতেও তাঁর জান্নাতের অংশীদার হবে এবং পরকালের জীবনেও তাঁর নেয়ামতসমূহ ও জান্নাতের ওয়ারিশ বলে বিবেচিত হবে।

কাজেই প্রত্যেক আহ্‌মদী মুসলমানকে তাক্ওয়ার পথে অগ্রগামী হওয়ার জন্য এবং আল্লাহ্ তাআলার জান্নাতের ওয়ারিশ হওয়ার জন্য, আল্লাহ্ তাআলার মর্যাদা উপলব্ধি করা খুব জরুরী। এ উপলব্ধি তখনই হবে, যখন আল্লাহ্ তাআলার জন্য একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর হুকুম-আহকামের উপর আমল করবে। সেই হুকুম-আহকামগুলোর মধ্যে থেকে আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে রমযান মাসে রোযা রখার একটি হুকুম দিয়েছেন। আমরা সৌভাগ্যবান, কেননা আমরা এমন একটি কিতাবের মান্যকারী, যা সর্বদিক থেকে পরিপূর্ণ কিতাব, আমরা ঐ কিতাবের মান্যকারী, যার মাঝে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর নেয়ামতসমূহের পূর্ণতা দানের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা এইজন্য সৌভাগ্যবান যে, আমরা সেই শরিয়তের মান্যকারী, আল্লাহ্ তাআলা যাকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। আমরা এইজন্য সৌভাগ্যবান যে, আমরা সেই আখেরী শরিয়তবাহী নবী (সা.)-এর মান্যকারী, যাঁকে আল্লাহ্ তাআলা খাতামুল আম্বিয়া বলে সকল নবী ও রসূলগণের হতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। বা পূর্বের রসূলগণ তো নিজ নিজ জাতিকে তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত করতে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে ঐ জাতিসমূহের সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী আল্লাহ্ তাআলার হুকুম-আহকাম নিয়ে আসতেন কিন্তু কুরআন করীম সারা দুনিয়ার সকল জাতির ও সকল যুগের সংশোধনের হুকুম আহকাম নিয়ে আঁ হযরত (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি (সা.) তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য এমন হুকুম-আহকাম নিয়ে এসেছেন, যা আজও, সকল জাতি ও এ যুগের জন্য জীবন্ত এবং পরবর্তীতেও জীবন্ত থাকবে। সুতরাং আমাদের ভাবা উচিত যে, এ বিষয় সমূহ অর্থাৎ অবতীর্ণ এ হুকুম-আহকামসমুহ আমাদের কাছে কি চায় এবং আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরক��� যে নেয়ামত দ�����ন করেছেন ও যে অনুগ্রহ (এহসান) করেছেন, তা আমাদের কাছে কি চায়? এগুলো তাগিদ দিচ্ছে যে, আল্লাহ্ তাআলা এই আখেরী শরীয়তবাহী কিতাবে যেসকল নেয়ামতের পূর্ণতার উল্ল্যেখ করেছেন, আমরা যেন সেগুলো অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করি। এগুলো আমাদেরকে তাকিদ দিচ্ছে, আমরা যেন আল্লাহ্ ও এই রসূল (সা.)-এর হুকুম-আহকামের উপর আমল করার জন্য আমাদের সমস্ত ক্ষমতাকে কাজে লাগাই, আমরা যেন সেই চেষ্টা-প্রচেষ্টা করি, যেটা করার জন্য আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রসূল (সা.) আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন, আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন,

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থাৎ, এবং যারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে, অবশ্যই আমরা তাদেরকে আমাদের পথে আসার তৌফিক দান করবো। (আল্‌ আনকাবুত: ৭০)

কাজেই আল্লাহ্ তাআলার সাথে সাক্ষাতের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা জরুরী। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে-ই তাঁর পথে আসার জন্য দিক-নির্দেশনা দান করেন, যারা একনিষ্ঠভাবে তার দিকে আসার জন্য চেষ্টা করে। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে-ই তাকওয়ার পথে চলার তৌফিক দান করেন, যারা নিজেরাও তাকওয়ার পথে চলার চেষ্টা করে। আল্লাহ্ তাআলা তাদের দিকেই দৌড়ে আসেন, তার দিকে কমপক্ষে হেঁটে আসার চেষ্টা করেন। তাক্ওয়া অর্জনের জন্য এবং আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যেসব চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রমযানের রোযা রাখবে আল্লাহ্ তাআলা একটি বড় ধরনের চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলার কল্যাণসমূহ ও তাঁর নেয়ামতসমূহ লাভের জন্য, যে ব্যক্তি প্রকৃত চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে তাকে গুনা থেকে পবিত্র করা হয়, সে নেকী করার তৌফিক পায় এবং সে আল্লাহ্ তাআলার কল্যাণসমূহ লাভ করে থাকে।

এক রেওয়ায়েতে এসেছে, হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে বান্দা আল্লাহ্ তাআলার পথে তাঁর কল্যাণপ্রার্থী হয়ে রোযা রাখে আল্লাহ্ তাআলা তার মুখমন্ডলও আগুনের মাঝে সত্তর খারীফ দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (বুখারী কিতাবুল জিহাদ ও সেয়র)

অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল হতে শীতকালের মাঝে যতটা ব্যবধান এর চেয়ে সত্তরগুণ বেশি ব্যবধান সৃষ্টি করে দেয়। এটা একটা উপমা যে, তার থেকে আগুন এত দূর সরিয়ে দেয়।

সুতরাং আল্লাহ্ তাআলার পথে তাঁর যখন প্রার্থী হয়ে রোযা রাখা জরুরী, যেভাবে তিনি আদেশ দিয়েছেন। কোন ধরনের দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে (এ রোযা) না হয় বরং শুধু মাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হয়, আর যদি এমন হয় তা তবে আল্লাহ্ তাআলা (মুযাহেদাকারী) চেষ্টা-প্রচেষ্টাকারীকে শুধু আগুন হতেই বাঁচান না বরং তাঁর সন্তুষ্টির জান্নাতে প্রবেশ করান। সে ধর্মও পায়, দুনিয়াও পায়।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেছেন,

প্রচেষ্টাকারী কখনো সফল হয় না, তাঁর সত্য অঙ্গীকার

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থাৎ, খোদা তাআলার পথের খোজে যে সচেষ্ট হয়, সে শেষ পর্যন্ত উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে। (আল্‌ আনকাবুত: ৭০)

দুনিয়াবী স্কুল কলেজের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিগ্রহণকারীগণ এবং রাতগুলোকে দিন বানানো শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম ও আবস্থা দেখে যদি, আমাদের হৃদয়ে দয়া হয়, তবে কি সেই আল্লাহ্ তাআলা, যাঁর দয়া এবং কৃপা অসীম ও অফুরন্ত, তাঁর দিকে আগমনকারীদেরকে ব্যর্থ করে দিবেন? কখনো না, কখনো না। আল্লাহ্ তাআলা কারো পরিশ্রমকে বৃথা সাব্যস্ত করেন না। অবমূল্যায়ণ করেন না। (রিপোর্ট জলসা সালানা ১৮৯৭ পৃষ্ঠা: ১৬১-১৬২)

কাজেই আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে এ মাসে সুযোগ দিয়েছেন, আল্লাহ্ তাআলা তাঁর নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে এ মাসে প্রবেশ করিয়েছেন, যাতে রোযাদারদের জন্য অর্থাৎ যারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য রোযা রাখে সেই রোযাদারদের জন্য এমন প্রতিদান রয়েছে, যে সম্পর্কে আঁ হযরত (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহ্ তাআলা স্বয়ং রোযার প্রতিদান দিবেন।

আর এক হাদীসে এসেছে, রোযা ঢাল হয়ে যায়। বান্দা ও আগুনের মাঝে রোযা ঢাল হয়ে যায়। রোযা আল্লাহ্ তাআলার বান্দার ও আগুনের মাঝে মজবুত কিল্লা ও দুর্গ হয়ে যায়, যার দেয়াল পার হয়ে আগুন কখনো আল্লাহ্ তাআলার বান্দাকে জ্বালাতে পারে না। এটা একটা হাদীসে কুদসী, অর্থাৎ আঁ হযরত (সা.) আল্লাহ্ তাআলার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন, এ হাদীসের বিস্তারিত বর্ণনা আর এক স্থানে বুখারী শরীফে এভাবে এসেছে,

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ্ তাআলা বলেন, আদম সন্তান (মানুষ) রোযা ব্যতীত অন্য সকল আমল-ই নিজের জন্য করে। কাজেই, আমার জন্যেই রোযা রাখা হয় এবং আমি-ই এর প্রতিদান দেব আর রোযা ঢাল স্বরূপ। যখন তোমাদের মধ্যে কেউ রোযা থাকে, তবে সে যেন কামালাপ ও মুখ খারাপ করা হতে বিরত থাকে আর কেউ যদি তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করে তখন প্রতুত্তরে সে যেন বলে, আমি তো রোযাদার। কসম সেই সত্তার যার হাতে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণ, রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্ তাআলার নিকট কস্তুরীর চাইতেও পবিত্র । রোযাদারের জন্য দুটি খুশী, যা তাকে আনন্দিত করে। এক তো যখন সে ইফতার করে তখন আনন্দিত হয় এবং দ্বিতীয়তঃ যখন সে তার প্রভু-প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাত করবে তখন সে তার রোযার জন্য আনন্দিত হবে। (বুখারী কিতাবুস সওম)

আর এক বর্ণনায় এসেছে, আঁ হযরত (সা.) বলছেন, রোযা এমন একটি আমল যা মহামান্বিত আল্লাহ্ তাআলার জন্য রাখা হয় আর রোযাদারের প্রতিদান সম্পর্কে শুধুমাত্র মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ তাআলা-ই জ্ঞাত আছেন। আল্লাহ্ তাআলা নেকী সম্পর্কে বলেন, যারা নেক আমলকারী ও যারা আমলে সালেহ করেন, আমি তাদেরকে সাতশত গুন পর্যন্ত প্রতিদান দিয়ে থাকি বরং এর থেকেও বেশি দিয়ে থাকি কিন্তু রোযার প্রতিদান, বর্ণিত এ সীমার উর্ধ্বে, কতটা উর্ধ্বে সেটা শুধু আল্লাহ্ তাআলাই জানেন। যেভাবে আল্লাহ্ তাআলার সত্তাও তাঁর গুণাবলী অসীম, ঠিক সেভাবেই আল্লাহ্ তাআলার প্রতিদানও সীমাহীন। সুতরাং এটা মানবিয় চিন্তার উর্ধ্বে যে, প্রতিদান কতটা হবে। আঁ হযরত (সা.) বলেছেন, এটা শুধু আল্লাহ্ তাআলা জানেন। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা রোযার সাথে কতগুলো শর্ত আরোপ করে দিয়েছেন যে, এই সীমাহীন প্রতিদান পাওয়ার জন্য তোমাদেরকে তোমাদের সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে, সকল হুকুম-আহকামসমূহ পালন করতে হবে। শুধু ক্ষুধার কষ্ট করো না যেভাবে হাদীসে এসেছে বরং কিছুটা মুজাহেদা (প্রচেষ্টা) করতে হবে এবং মন্দ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে হবে। সব ধরনের প্রবৃত্তির প্ররোচনা ও জৈবিক আবেদনকে না বলতে হবে হবে বরং যেভাবে অন্য আর এক স্থানে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, কিছু জায়েয বিষয়ও আল্লাহ্ তাআলার জন্য ছাড়তে হবে। যখন এ অবস্থার সৃষ্টি হবে তখন সে রোযা, খোদা তাআলার জন্য বলে বিবেচিত হবে। ঐ মন্দ কাজগুলো ছাড়তেই হবে, যা তাকে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য দান করবে।

কিন্তু ক্ষণস্থায়ী পরিত্যাগ নয়, এ মন্দ কাজগুলো ক্ষণিকের জন্য ছাড়লে চলবে না বরং স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। যখন এ অবস্থার সৃষ্টি হবে, তখন এরকম রোযা আল্লাহ্ তাআলার জন্য বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ্ তাআলা সেই সত্তা, যিনি মানুষের অভ্যান্তরের খবর রাখেন এবং তিনি হৃদয়ের অবস্থা সম্পর্কেও জ্ঞাত। তিনি জানেন যে, কোন কাজের পিছনে বান্দার কি নিয়্যত রয়েছে। তিনি সেই সত্তা, যিনি প্রকাশ্য ও অদৃশ্য উভয় বিষয়েরই জ্ঞান রাখেন, প্রত্যেক রোযাদার যদি তাঁর গুণাবলীগুলো সম্মুখে রেখে। রোযা রাখে এবং প্রচেষ্টা চালু রাখ���, তবে সেই রোযা ত��র ���ন্য পুরস্কারের কারণ হবে। যে রোযা এ নিয়্যতে রাখা হবে যে, আমি আজ, এসব প্রবৃত্তি সম্বোন্ধীয় ও জৈবিক বিষয়গুলো হতে দূরে সরে যাচ্ছি, এগুলোকে পরিত্যাগ করছি, শুধু রমযান মাসের জন্য নয় বরং সর্বাদার জন্য তখনই সে রোযা আল্লাহ্ তাআলার জন্য বলে বিবেচিত হবে, খোদার জন্য (রোযা) রেখেছি, এ কথা বলা যাবে। কোন গালির উত্তরে যখন সে বলে আমি রোযাদার, তাই তোমার ফালতু কথার উত্তর দিতে পারছি না, তখন এর অর্থ এটা নয় যে, ইফতার করার পর এর জবাব দিব, তখন তোমাকে দেখিয়ে দিবো যে, আমি কত জলের মাছ, এরপর আমি তোমাকে দেখাবো যে, তুমি বেশি শক্তিশালী না আমি, তাই এ অবস্থায় ঝগড়া করতে পারছি না, কারণ আমি রোযাদার। না বরং রোযা একটি ট্রেনিং ক্যাম্প (Training Camp) স্বরূপ, যেখানে ঐ মন্দ কাজগুলো পরিত্যাগের ট্রেনিং দেয়া হয় আর এটা এক ধরনের প্রচেষ্টা, যা একজন রোযাদারকে করতে হয়। খোদা তাআলার পথে উঠানো সত্যিকার পদক্ষেপ তখনই উঠতে পারে, যখন এক ব্যক্তি নিজ প্রকৃতিতে স্থায়ীভাবে এসব মন্দ কাজ ছাড়ার কাজ চালু রাখবে আর এ অবস্থাতেই তার জন্য সেই শেষ কথা বলা হয়েছে যে, যখন সে তার প্রভু-প্রতিপালক-এর সাথে সাক্ষাত করবে, তখন সে তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে। শুধুমাত্র এ ৩০ (ত্রিশ) দিনের নেকীর কারণে কি আল্লাহ্ তাআলা তাকে সেই মর্যদাবান স্থান দান করবেন, যা তাঁর সন্তুষ্টির স্থান আর যে স্থানে বান্দা আনন্দিত হবে? না, বরং এজন্য আনন্দিত হবে যে, এক রমযানের রোযা, আমার মন্দ অভ্যাসগুলো দূর করে দিয়েছে। আমার প্রবৃত্তি ও জৈবিক অবস্থার পবিবর্তনে চেষ্টা করার জন্য, আমার ইস্তেগফারের জন্য এবং আমি আল্লাহ্ তাআলার খাতিরে মন্দ কাজ পরিত্যাগকারী হব, আমার এ ধরনের প্রচেষ্টার জন্য, আল্লাহ্ তাআলার আমার থেকে আমার মন্দ অভ্যাসগুলো দূর করে দিয়েছেন। যখন কারো জীবনের প্রত্যেক রমযান, যা এমন প্রচেষ্টার নিয়্যতে আসবে এবং বছরের প্রত্যেকটি মাস, যা এই রমযানে অর্জিত নেকীগুলোকে বহন করে অতিবাহিত হবে, বছরের প্রতিটি দিন এই ত্রিশ দিনের ট্রেনিং-এর প্রেক্ষিতে, মন্দ কাজ হতে দূরত্ব সৃষ্টি করতে থেকে অতিবাহিত হবে, তবে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টিভাজন বলে বিবেচিত হবে এবং তার জন্য সেই (মাকাম) স্থান হবে, যেখানে বান্দা এই ভেবে আনন্দিত হবে যে, এই রমযানের কল্যাণে, আল্লাহ্ তাআলা আমার থেকে আমার মন্দ অভ্যাসগুলো দূর করে দিয়েছেন এবং আমাকে আমার নেকী ও তাক্ওয়ায় উন্নতি করার সুযোগ দিয়েছেন। আমি তাঁর জন্য নিষ্ঠার সাথে রোযা রেখেছি এবং এ রোযাগুলোর মুজাহেদার মাধ্যমে নিজের আমলসমূহের সংশোধনের চেষ্টা করেছি, নিজের ইবাদতের অবস্থার উন্নতি করেছি আর তাই আজ আমি আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টিভাজন বলে বিবেচিত হচ্ছি।

সুতরাং যেহেতু রমযান মাস এসেছে, সেহেতু নিজেদের ইবাদতের মান উন্নয়নও জরুরী এবং নিজেদের আমলসমূহের দিকে দৃষ্টি রেখে, সেগুলোকে আল্লাহ্ তাআলার হুকুম-আহকামের ছাঁচে ঢালাও জরুরী। একজন ছাত্র পরীক্ষার সময় এমনভাবে পরিশ্রম করে যে, রাতগুলোকে যেন দিন বানিয়ে ফেলে। যেভাবে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেছেন,

এ দিনগুলোতে আমরাও যখন আমাদের রাতগুলোকে আল্লাহ্ তাআলার খাতিরে অতিবাহিত করব তখনই, সেই রহীম (বার বার কৃপাকারী) ও করীম (দাতা) খোদা, সেই আহ্বানে সাড়াদাতা খোদা, তাঁর অঙ্গীকার অনুযায়ী আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে নিয়ে দাঁড় করবেন। আমাদেরকে সেই পথের দিকে নিয়ে আসবেন, যেটি তাঁর সন্তুষ্টির পথ। আমাদেরকে তিনি ঐ সকল পুরস্কারে ভূষিত করবেন, যে পুরস্কারে তিনি তাঁর বিশেষ বান্দাদের ভূষিত করেছেন। তিনি আমাদের তাক্ওয়ার মানকে সেখান পর্যন্ত পৌঁছে দিবেন যেখানে তাঁর নৈকট্য লাভ হয়।

সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা যদি রোযাকে ঢাল বানিয়ে থাকেন তবে সে ঢালের ব্যবহারও হতে হবে। ঢাল নিজের সামনে যদি সঠিকভাবে রাখা না হয়, একে যদি শক্ত করে না ধরা হয়, তবে আক্রমণকারীর এক আঘাতেই সেটি পড়ে যাবে, তখন সেই ঢাল আর ঢালের কাজ করতে পারবে না। কাজেই, শয়তান যেহেতু সকল আক্রমণকারীর চাইতে ভয়ঙ্কর আক্রমণকারী, সেহেতু তার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতের মান উন্নয়ন করে, নিজেদের রাতগুলোকে জীবিত করে এবং আল্লাহ্ তাআলার হুকম-আহকামকে মজবুতভাবে ধরার মাধ্যমেই একজন মু’মিন, রোযার ঐ ঢাল হতে সঠিকভাবে লাভবান হতে পারে। এ ট্রেনিং-এর দিনগুলো আল্লাহ্ আমাদের জন্য সহজলভ্য করে দিয়েছেন। রোযা তখনই জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচানোর জন্য কিল্লার কাজ করবে, যখন কিল্লার প্রত্যেক দরজায় নিজের ইবাদত ও আমল সমূহের পাহাড়া বসানো হবে, অতঃপর, এই পাহাড়া ও মজবুত কিল্লার দেয়াল, যা আল্লাহ্ তাআলা নিজ ফযলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, তা প্রত্যেক মু’মিন বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে এ দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও বাঁচাবে। আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ ও তাক্ওয়ার পথে চলাই এক মু’মিন বান্দার জীবনে বিপ্লব ঘটিয়ে, পার্থিব নেয়ামতের দ্বারাও তাকে সৌভাগ্যশালী করবে এবং আখেরাতেও। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলার দান করা ব্যবস্থা হতে আমাদের লাভবান হওয়া উচিত। যার আদেশ মোতাবেক এ দিনগুলো অতিবাহিত করে আপনারা তাক্ওয়ার অবস্থার উন্নতি করুন।

আঁ হযরত (সা.)-এর পূর্বে যে সকল নবীগণ এসেছেন, তাঁরা তো ক্ষণস্থায়ী শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, পরে হরিয়ে গেছে। সে শিক্ষাতো সাময়িক তাকওয়া দান করত, এ শিক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এর সজিবতা ও তাক্ওয়া আর থাকে না। কিন্তু আমি যেভাবে বলেছি যে, ইসলামের শিক্ষা তো সর্বদাই সজিব ও প্রঞ্জল। কুরআন করীমের হুকুম-আহকাম তো সর্বদা প্রতিষ্ঠিত। অন্যান্য ধর্মের রোযায় তো প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আমাদের তো শিক্ষাও জীবন্ত এবং হুকুম-আহকামও প্রকৃতরূপে প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং আমাদেরকে আমাদের তাক্ওয়ার মানকে অক্ষুন্ন রাখতে সর্বদা চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকা জরুরী। আমাদেরকে তাক্ওয়ার সিঁড়িতে পা রেখে, আল্লাহ্ তাআরার সন্তুষ্টি লাভের জন্য, আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহ্ তাআলার উচ্চ থেকে উচ্চতর স্থান অর্জনের জন্য, তিনি যে পথ দেখিয়েছেন, সেগুলাকে অর্জন করার জন্য আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে সেই সিঁড়িও দান করেছেন, যাতে আমাদের চড়তে হবে আর যার উচ্চতার কোন সীমা নেই। কাজেই, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী সেই উচ্চতাকে অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। একের পর এক ধাপ ফেলে উপরের দিকে যাওয়া উচিত এবং এর জন্য চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে সর্বোত্তম উম্মত বানিয়ে ইবাদতের সুউচ্চ পথও দেখিয়েছেন এবং আমলে সালেহ-এর সুউচ্চ পথও দেখিয়েছেন। কাজেই, আমরা তখনই নিজেদের সর্বোত্তম উম্মত বলতে পারব, যখন এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব। একের পর এক মানদন্ডের বিচারে উতরে যাওয়ার চেষ্টা-প্রচেষ্ট করতে থাকব। অতএব, আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করা আমলকেই তাক্ওয়া বলে, যা লাভের জন্য রমযানের রোযা ফরয করা হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে এই রমযানে তাক্ওয়া লাভের জন্য মুজাহেদা সাধ্য মত চেষ্টা করার তৌফিক দান করুন।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেন,

লোকের রোযার বাস্তবতা সম্পর্কেও অজ্ঞ। ... মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে এটার নামই রোযা নয় বরং এর তাৎপর্য ও প্রভাব রয়েছে, যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে হয়। মানবীয় প্রকৃতিতে রয়েছে, যত কম খায় ততবেশী আত্মশুদ্ধি লাভ হয় এবং কাশফি (দিব্য-দর্শনের) শক্তি বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে খোদা তাআলার চাওয়া হচ্ছে, এক ধরনের আ���ার ত্যাগ কর এবং অন্য ধরনের আহার বাড়াও। সর্বদা রোযাদারকে এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখা উচিত যে, এতে ক্ষুধার্ত থাকাই উদ্দেশ্য নয় বরং তার উচিত সে যেন আল্লাহ্ তাআলার য��করে ব্যস্ত থাকে, ���ার মাধ্যমে (আল্লাহ্ তাআলার জন্য) নির্জনতা ও ছিন্নতা অর্জিত হয়। সুতরাং রোযার এটাই উদ্দেশ্য যে, মানুষ যেন দেহের প্রতিপালনকারী এক রুটি ত্যাগ করে আর রূহ (আত্মার) জন্য প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি দানকারী আরেক রুটি অর্জন করে। যে সব লোক শুধু খোদার জন্য রোযা রাখে ও শুধু প্রাণহীন প্রজার বশবর্তী হয়ে রাখে না, তাদের উচিত, তারা যেন আল্লাহ্ তাআলার হামদ (প্রশংসা), তাসবীহ (পবিত্রতা) ও তাহলীল (একত্ব ঘোষণা) করায় লেগে থাকে, যার মাধ্যমে তারা অন্য আহার প্রাপ্ত হয়। (আল হাকাম, ১১তম খন্ড, নম্বর-২ তারিখ ১৭ জানুয়ারী ১৯০৭ ইং ৯ পৃষ্ঠা)

সুতরাং এটা হচ্ছে রোযাদারের উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য ও তাক্ওয়া লাভ হয়। এমন বান্দাদেরকে আল্লাহ্ তাআলা আবড়ে নিজ কোলে তুলে নেন, তাকে তাঁর মারেফত (তত্ত্বজ্ঞান) দান করেন এবং নিজ পুরস্কারে ভূষিত করেন।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেন,

এটা খোদা তাআলার সত্য ওয়াদা যে, যারা সত্যনিষ্ঠ হৃদয়ে নেক নিয়্যত নিয়ে তাঁর পথ অন্বেষণ করে, তিনি তাদের নিকট হেদায়াত ও মারেফত (তত্ত্বজ্ঞান)-এর পথসমূহ খুলে দেন, যেভাবে তিনি স্বয়ং বলেছেন,

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থাৎ, যেসব লোক একমাত্র আমাদের হয়ে চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে, আমরা তাদের জন্য আমাদের রাস্তা খুলে দেই। (আল্‌ আনকাবুত: ৭০)

বলেন, আমাদের হওয়ার অর্থ, তারা শুধু মাত্র একনিষ্ঠ ও নেক নিয়তের ভিত্তিতে খোদাপ্রাপ্তিকে-ই নিজের উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয়। (আল হাকাম, ৮ম খন্ড, ১৮ নম্বর, ৩১ মে ১৯০৪ইং পৃষ্ঠা-২)

অর্থাৎ খোদাকে অন্বেষণ করাই তাদের উদ্দেশ্য, তারাই ঐ সকল লোক যারা সত্যিকার অর্থে প্রচেষ্টাকারী।

আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন, আমরা যাতে খোদা তাআলার সন্তুষ্টিকে নিজেদের একমাত্র লক্ষ্য স্থির করে এ রমযান একমাত্র অতিবাহিত করি এবং আমাদের রোযাগুলো যেন শুধুমাত্র আল্লাহ্ তাআলার জন্য হয় আর আমরা যেন তাক্ওয়ায় অগ্রগামী হই। আমরা যেন খোদার তত্ত্বজ্ঞানও লাভ করি, স্থায়ীভাবে যা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে যায় এবং সর্বদা আমাদেরকে তাক্ওয়ায় অগ্রগামী বানায়।

হুযূর আনোয়ার খুৎবা-এ সানিয়ার মাঝে বলেন, এখন আমি গত কয়েকদিনে মৃত্যুবরণকারীগণের উল্ল্যেখ করব, যদিও তাদের জানাযা হয়ে গেছে কিন্তু তাঁদের জন্য ও তাঁদের সন্তানদের জন্যেও তাঁদের উল্ল্যেখ করতে চাচ্ছি, বুযুর্গদের সাথে এঁদের সম্পর্ক রয়েছে। একজন মোহতরমা সাঈদা বেগম সাহেবা। ইনি মরহুম মাওলানা জালাল উদ্দিন শাম্স সাহেবের গৃহিনী। ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ইং তারিখে আমেরিকায় তাঁর মৃত্যু হয়। ইনি হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সাহাবী খাজা উবাইদিল্লাহ্ সাহেবের মেয়ে ছিলেন এবং খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-ই হযরত শাম্স সাহেবের সাথে তাঁর বিয়ে দেন। ১৯৩২ইং সালে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। কুরবানীর উদাহরণ দিতে গিয়ে হযরত মুসলেহ মাওউদ (রা.) ১৯৫৬ইং সালের লাজনার ইজতেমায় বলেছিলেন, আমাদের একজন মুবাল্লেগ মৌলভী জালাল উদ্দীন শাম্স সাহেব। তিনি বিয়ের কিছু দিন পর ইউরোপ যান, ইউরোপে তবলীগের জন্য চলে গিয়েছিলেন। তাঁর ঘটনা শুনলেও কান্না পায়। একদিন তাঁর ছেলে বাড়ি এসে তার মাকে বলছিল, আম্মা! আব্বা কাকে বলে? স্কুলে সব ছেলেরা আব্বা আব্বা বলে, আমি জানি-ই না আমার আব্বা কোথায় গেছেন। কেননা এ বাচ্চার তিন চার বছর বয়সে শাম্স সাহেব তবলীগের জন্য লন্ডন চলে যান। এখানে, লন্ডনে তবলীগের থেকে যান আর যখন ফিরে আসেন, তখন ছেলের বয়স ১৭-১৮ বছর। ঐ সময় তিনি খুব বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে ছেলেকে প্রতিপালন করেন এবং কোন প্রকার অভিযোগ না করে একা একা বাস করেন। ঐ সময় এমন অবস্থা ছিল যে, মুবাল্লেগদের সাথে পরিবার থাকত না। সে যুগের মুবাল্লেগগণ ও তাঁদের স্ত্রীগণ অনেক কুরবানী করতেন। মরহুমা মুসী ছিলেন। খুব নেক মহিলা ছিলেন। মুনীর উদ্দিন শামস সাহেবের মা ছিলেন, যিনি আমাদের উকিলুত তাসনীফ এবং তিনি ছাড়া আরো চার ছেলে রয়েছে।

দ্বিতীয় জন হচ্ছেন, মোহতরমা মাওলানা আবুল আতা জলন্ধরী সাহেবের স্ত্রী সাঈদা বেগম সাহেবা। তিনিও প্রায় ৯৫ বছর বয়সের ছিলেন। তিনি ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭ইং তারিখে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর জানাযা হয়ে গেছে। ইনিও হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর সাহাবী হযরত মৌলভী মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ সাহেব বাটালবী (রা.)-এর মেয়ে। হযরত আম্মাজান (রা.)-এর কথার মত হযরত মুসলেহ মাওউদ (রা.) ইনার বিয়েও মাওলানা আবুল আতা সাহেবের সাথে দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজে এ বিয়ের এলান করেন। ইনিও অনেক নেক ও ইবাদতগুজার মহিলা ছিলেন। তিনি আমাদের মসজিদের ইমাম মাওলানা আতাউল মুজিব রাশেদ সাহেবের মা। খিলাফতের সাথে এ দুই বুজুর্গের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইনি এখানে লন্ডন থাকতেন এবং আমর সাথে সাক্ষাতও করতেন। তাঁর চোখে এক আশ্চর্য ভালবাসা, বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতার ঝলক ছিল। তিনি আটের এক অংশ ওসীয়্যত করেছিলেন।

তৃতীয় জন হচ্ছেন সৈয়দ মোহাম্মদ সাহেবের স্ত্রী নাসেরা বেগম সাহেবা। তিনি ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইনিও এক সাহাবীর মেয়ে ছিলেন, যিনি গুরুদাসপুর জেলার একটি গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর নাম ছিল চৌধুরী ফকীর মুহাম্মদ সাহেব। তাঁর পিতা ১৯৪৭-এর দেশ বিভক্তির সময় শহীদ হয়েছিলেন। যখন লাওয়ায়ে আহ্‌মদীয়াতের জন্য কাপড় বানানো হচ্ছিল তখন তাঁর পিতা নিজ হাতে কাপড় বানিয়ে ছিলেন আর তিনি বড় নির্ভীক দা-ইলাল্লাহ্ ছিলেন। ইনি নিজেও বড় নির্ভীক দা-ইলাল্লাহ্ ছিলেন এবং নিজে মহিলাদেরকে সাথে নিয়ে তবলীগ করতেন। ইনার চার ছেলে, এদের মধ্যে একজন তো আমাদের আমেরিকার মুবাল্লেগ দাউদ হানিফ সাহেব। তাঁর আরেক ছেলে এখানকার জামাআতের সেক্রেটারী উমরে আমাহ্ মনোয়ার সাহেব।

এ মহিলাগণ বড় নেক, খিলাফতের সাথে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক রক্ষাকারী ও দোয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা এদের সকলের মর্যাদা উচ্চ করুন এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাঁদের নেকী বহমান ও প্রতিষ্ঠিত রাখার তৌফিক দান করুন।

অনুবাদঃ মুহাম্মদ আক্রামুল ইসলাম, মুরব্বী সিলসিলাহ্

প্রাপ্ত সুত্রঃ পাক্ষিক আহ্‌মদী - ৩১শে আগস্ট, ২০০৮ইং