In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

অত্যাধিক বস্তুবাদিতা, নাস্তিকতা ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং ঐশী শাস্তি

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

নূনস্পীট, হল্যান্ড

২৪ আগস্ট ২০০৭ইং

জড়জগতের মোহ ও বস্তুবাদিতায় এরা এত বেশী মত্ত, যার কারণে এরা কেবল যে ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তা-ই নয় বরং এরা ধর্মের প্রতি কটাক্ষকারীতে পরিণত হচ্ছে , এরা পবিত্র নবী-রসূলের প্রতি বিদ্রুপকারীতে পরিণত হচ্ছে। আবার এমন এক শ্রেণীও আছে, যারা আল্লাহ্‌ তা’আলার মহান অস্তিত্ব্বকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত নয় বরং তাঁকে নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপে লিপ্ত।

ইদানিং যে সব ঝড়ঝঞ্ঝা ও ভূমিকম্প পৃথিবীতে দেখা দিচ্ছে এগুলো হলো সতর্ক-সংকেত। অর্থাৎ, সীমালঙ্ঘনকারীরা এগুলোতে আক্রান্ত ও জর্জরিত হতে পারে। প্রাথমিক ও নিম্ন পর্যায়ের এসব দুর্যোগ চরম আকারও ধারণ করতে পারে।

প্রত্যেক আহ্‌মদীর দায়িত্ব, একদিকে সে নিজের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধন করবে অপরদিকে জগতবাসীকেও জানাবে, এসব বিপদ ও দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবার একটাই পথ। আর তা হলো, তোমরা এক-অদ্বিতীয় খোদাকে সনাক্ত কর এবং তাঁর প্রিয়দের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো না।

হল্যান্ডের এক রাজনৈতিক নেতার পক্ষ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং কুরআন মজীদ-এর বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের যথোপযুক্ত উত্তর। এক্ষেত্রে ইসলামের মনোরম শিক্ষা সুশীল ও ন্যায়পরায়ন লোকদের কাছে পৌঁছাতে আহ্‌মদীদেরকে তাগীদপূর্ণ নির্দেশনা।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

أَفَأَمِنَ الَّذِينَ مَكَرُواْ السَّيِّئَاتِ أَن يَخْسِفَ اللّهُ بِهِمُ الأَرْضَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَشْعُرُونَ

{আফা আমেনাল্লাযীনা মাকারুস্ সাইয়্যেআতে আইঁয়াখসেফাল্লাহু বিহিমুল্ আরযা আও ইয়া’তিয়াহুমুল্ আযাবু মিন হায়সু লা ইয়াশ্উ’রূন}

যাহারা (তোমার) অনিষ্ট সাধনের ষড়যন্ত্র করিয়া আসিতেছে তাহারা কি এই বিষয় হইতে নিরাপদ হইয়া গিয়াছে যে, আল্লাহ্‌ তাহাদিগকে ভূ-পৃষ্ঠে প্রোথিত করিয়া দিতে পারেন অথবা তাহাদের উপর শাস্তি এমন পথে আসিতে পারে যাহা তাহারা ধারণাও করিতে পারিবে না? (সূরা আন্ নাহ্লঃ ৪৬)

বস্তুবাদিতা ও জড়জগতের মোহের কারণে মানুষ আজ বেশ কয়েকটি চারিত্রিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। সে ধর্ম ও খোদা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। যে সব জিনিষ ও উপকরণ দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে সেসব যে মহান আল্লাহ্‌র সৃষ্টি, আর এগুলোকে তিনি যে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের অধীনস্থ করে রেখেছেন, আবার সৃষ্টির সেরা হিসেবে তিনি মানুষকে যে উত্তম মন মস্তিষ্ক প্রদান করেছেন তা কাজে লাগিয়ে সে যে নিত্য নতুন আবিস্কার ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজ সাচ্ছ্যন্দ ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করে চলেছে- অতি অল্প সংখ্যক মানুষই একথা উপলদ্ধি করে। এটা এমন একটি বিষয় যা মানুষকে খোদার প্রতি আরও কৃতজ্ঞ বানানোর কথা, নিজ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সাধনে আরও সচেতন করার কথা। অর্থাৎ সেই এক-অদ্বিতীয় খোদার উপাসনার ক্ষেত্রে কার আরও তৎপর হবার কথা যিনি এসব নেয়ামত তাকে দান করেছেন আর এসব ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করে মানব সেবায় নিয়োজিত করেছেন। কিন্তু আমি একটু আগেই বলেছি, খুব কম সংখ্যক মানুষই এই সত্যটি উপলব্ধি করেন। যারা এ সত্যটি অনুধাবন করেন না এদের সংখ্যা বরং দিন দিন বাড়ছে। কেবল এরা যে অনুধাবনই করেন না তাই নয় বরং এরা এই মহা পরিকল্পনার বিরুদ্ধাচরণ করছেন। জড়জগতের মোহ ও বস্তুবাদিতায় এরা এত বেশী মত্ত, যার কারণে এরা কেবল যে ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তা-ই নয় বরং এরা ধর্মের প্রতি কটাক্ষকারীতে পরিণত হচ্ছে, এরা পবিত্র নবী-রসূলের প্রতি বিদ্রুপকারীতে পরিণত হচ্ছে। আবার এমন এক শ্রেণীও আছে, যারা আল্লাহ তা’লার মহান অস্তিত্ব্বকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত নয় বরং তাঁকে নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপে লিপ্ত। খোদার মহান অস্তিত্ব অস্বীকার করে বই-পুস্তক লেখা হয় আর এসব পুস্তক Best Sellers হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে আর জনপ্রিয় বই-পুস্তক হিসেবে এগুলো খ্যাতি লাভ করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় খোদা-বিমুখ, এধরণের বাজে সাহিত্য রচনাকারী ও এগুলোকে উপভোগকারী উভয় ধরণের লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এসব লোকেরা একদিক থেকে অপারগও বটে। কেননা, এদের ধর্মবিশ্বাস এদেরকে হৃদয়ের প্রশান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সমস্ত শক্তির উৎস আর সকল সৃষ্টির একক স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে এরা যখন দিশেহারা হয়ে একাধিক খোদার বিশ্বাস লালন করে ফেলেছে, দোয়ার দর্শন বা দোয়ার অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে এরা যেক্ষেত্রে অনবহিত আর জীবন্তু খোদার সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ, তখন স্বভাবতই এরা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আমরা দাবী করছি ধর্মচর্চার কিন্তু কিছুই অর্জন করতে পারছি না- এদের চিন্তাশীল মস্তিষ্কগুলো এ কথা ভেবে ধর্ম ও খোদার প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতায় ভুগে। এর কারণ হলো, এরা এক-অদ্বিতীয় খোদাকে ভুলে বসেছে। এই বিষয়টিই এদেরকে ধর্ম-বিমুখ করে তুলেছে। আমি একটু আগেই বলেছি, এরা খোদার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছে। কেবল অস্বীকার করাই নয় বরং এরা আল্লাহ্‌র মহান অস্তিত্বের প্রতি কটাক্ষ সূচক ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যও রেখে চলেছে।

আরেক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষনের ক্ষেত্রে এত অগ্রসর যার কারণে এরা পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও এর পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে নব নবরূপে আক্রমন করতে সচেষ্ট। কুরআন শরীফ ও মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি এরা এমন সব কথা বা শিক্ষা আরোপ করে থাকে যার সাথে কুরআনী শিক্ষার বা মহানবী (সাঃ)-এর আচরণের দূরতম সম্পর্ক নেই। যাই হোক, এই ধ��ণের মানুষ আর পূ��্ব�� উ��্লেখিত শ্রেণীর মানুষ, উভয় প্রকার মানুষই খোদা-বিমুখ আর খোদার অস্তিত্ব অস্বীকারকারী। এরা সমালোচনার লক্ষ্যস্থল হিসেবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ও মুসলমানদের উদাহরণ দিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, এরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে, ধর্ম বা খোদাতা’লার পবিত্র অস্তিত্ব সম্বন্ধে সঠিক শিক্ষা যদি কোন ধর্মে থেকে থাকে তবে তা একমাত্র ইসলাম ধর্মেই রয়েছে, পবিত্র কুরআনে রয়েছে। এক শ্রেণীর পক্ষ থেকে এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ এত বেশী মাত্রায় প্রকাশিত হতে দেখে ভাবতেও অবাক লাগে, এ যুগে, বাহ্যত সুশিক্ষিত জাতিসমূহে, যারা নিজেদেরকে উন্নত আর ব্যক্তি-স্বাধীনতার ধারক-বাহক বলে দাবী করে, আর অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে বিশ্বাসী এমন সব পশ্চিমা দেশে কীভাবে এসব মানুষ শালীনতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং ইসলাম-বিদ্বেষ এদেরকে কীভাবে অন্ধ করে দিয়েছে!

কিছুদিন আগে এদেশের (অর্থাৎ Holland-এর) একজন রাজনৈতিক নেতা যার নাম Geert Wilders (উচ্চারণ সম্ভবত: খিরাত উইলডার্য) একটি বিবৃতি প্রদান করেছেন। এই বক্তব্যে তিনি তার অন্তরের সুপ্ত ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করে ফেলেছেন। এই ব্যক্তির প্রলাপ এখানে উপস্থিত অনেকেই শুনে থাকবেন। বিশ্ববাসীও জানুক তিনি কী বলেছেন। তিনি লিখেছেন, আমি চাই, মানুষ নিজেরা যাচাই করে দেখুক। (হুযুর বলেন) এধরণের লোকের এটা এক প্রকার ধোকাবাজী। এরপর Geert Wilders বলছেন, বিষয়টির সূচনা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) থেকে হয়েছে। বেশীরভাগ মুসলমান তাঁকে যেমন প্রেমময় ও ভালবাসাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন প্রকৃতপক্ষে তিনি এমনটি ছিলেন না। তিনি যতদিন মক্কায় ছিলেন এবং সেখানে অবস্থানকালে কুরআনের অল্প অংশই অবতীর্ণ হয়েছিল, ততদিন তার মাঝে কিছুটা ভালবাসা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে আর বিশেষ করে মদীনায় বসবাসকালে তার মাঝে ক্রমান্বয়ে কঠোরতা ও উগ্রতা সৃষ্টি হতে থাকে। (নাউযুবিল্লাহ)।

এরপর তিনি লিখেছেন, নয় (৯) নম্বর সূরার পাঁচ (৫) নম্বর আয়াতে আপনারা লক্ষ্য করবেন কীভাবে খৃষ্টান, ইহুদী ও মুরতাদ্‌দের বিরুদ্ধে কঠোর হবার জন্য উস্কানী প্রদান করা হয়েছে। বেশীরভাগ আয়াত স্ববিরোধীতায় পূর্ণ। এরপর তিনি বাইবলের প্রশংসা করেছেন। যাই হোক, এটি একটি পৃথক বিষয়। আমি এখনকার মত সেদিকে যাচ্ছি না। এরপর তিনি লিখেছেন, কুরআনে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে পৃথক রাখার কোন নীতি নেই। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম) যে একজন উগ্র মানুষ ছিলেন (নাউযুবিল্লাহ) একথা অস্বীকার করার জো নেই বরং কুরআন নিজেও উগ্র শিক্ষা-সম্বলিত এক গ্রন্থ।

আবার আরেক পত্রিকায় এ ব্যক্তি লিখেছেন, আমি খোদার উপাসনা করার কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছি। পত্রিকায় বিবৃতিতে Geert Wilders কেবল কুরআনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করারই দাবী করেন নি বরং তিনি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসী মুসলমানদেরকে এদেশে আশ্রয় দিচ্ছেন বলে কঠোর সমালোচনা করেন। অর্থাৎ এই অজ্ঞ ব্যক্তি সবাইকে এক পাল্লায় মাপছেন।

তিনি আরও বলেছেন, আমি ইসলামের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছি। এখন মুসলমানদের কেউ যেন দেশত্যাগ করে এখানে না আসে। আমি হল্যান্ডে আল্লাহ্‌র উপাসনা করার কথা শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে গেছি। আমি হল্যান্ডে কুরআনের উল্ল্যেখ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে পড়েছি। (নাউযবিল্লাহ) এই ফ্যাসিষ্ট গ্রন্থের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করা উচিত। অথচ ফ্যাসিজমের বহিঃপ্রকাশ এই ব্যাক্তি নিজেই করছেন।

লক্ষ্য করুন, মহানবী (সাঃ) -এর বিরুদ্ধে তার প্রথম অভিযোগ হলো তাঁর (সাঃ) বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর মাঝে উগ্রতা সৃষ্টি হতে থাকে। এ কথা বলা বাহুল্য, বিদ্বেষ ও ঘৃণা এই ব্যক্তিকে এমন অন্ধ করে দিয়েছে যার কারণে তিনি কুরআন পড়ে দেখার কষ্টটাও করেন নি। অবশ্য, এ ধরণের মানুষ কুরআন এমনিতেও পড়ে না বরং শোনা কথা বলে বেড়ায়। তবে কুরআন শরীফ পড়ার সৌভাগ্য না হলেও ইনি ইতিহাসকে কিন্তু ঠিকই বিকৃত করছেন। এর চেয়ে অনেক বেশী জ্ঞানী যে সব খৃষ্টান পন্ডিত ছিলেন তারা আজ পর্যন্ত যে সব অপবাদ দিতে পারেন নি ইনি সেই অপবাদও করে বসেছেন। জানি না, কোথা থেকে এসব অভিযোগ এরা খুজে বের করেছেন। সূরা মায়েদা যে কেবল মদীনায় অবতীর্ণ সূরা তাই নয় বরং সংশ্লিষ্ট সব বর্ণনা একথা সাব্যস্ত করে, এই সূরাটি রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবনের শেষ বছরে অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরায় পারস্পরিক শক্রতা ও সংঘাত নিরসনের আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার কী চমৎকার শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে! এই ব্যক্তি বলেছেন, মদীনায় এসে উগ্র শিক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। মহানবী (সাঃ)-এর জীবনে অবতীর্ণ শেষ সূরার শিক্ষা কি? আল্লাহ্ তা’লা বলেন,

وَالَّذِينَ كَفَرُواْ وَكَذَّبُواْ بِآيَاتِنَا أُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ

(উচ্চারণঃ ওয়ালা ইয়াজরিমান্নাকুম শানা’নু কাওমিন আ’লা আল্লা তা’দেলূ ই’দেলূ হুওয়া আক্বরাবু লিত্ তাক্বওয়া)

অর্থাৎ কোন জাতির শক্রতা যেন তোমাদেরকে অন্যায়-অবিচারে প্ররোচিত না করে। বরং তোমরা ন্যায় বিচার করবে, এটি তাকওয়ার নিকটতর আচরণ। (সূরা মায়েদাঃ ৯)

এবার এ ব্যক্তি দেখাক, এমন সুন্দর শিক্ষা তার নিজের বা অন্য কোন ধর্মে আছে কি? কিন্তু বিদ্বেষ ও ঘৃণা যাদেরকে অন্ধ করে দিয়েছে, তারা চোখের সামনে রাখা জিনিষও দেখতে পায়না। আল্লাহ্ তা’লা প্রথমেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, যারা অন্ধ তাদেরকে তোমরা কীভাবে পথ দেখাবে? তাদেরকে আলোর দিশা তোমরা কীভাবে দিবে? তোমরা চেষ্টা করে দেখ, কিন্তু তাদেরকে পথ দেখাতে পারবে না।

এরপর এই ব্যক্তি বলেছেন, সূরা তওবার পাঁচ নম্বর আয়াতে খৃষ্টান, ইহুদী ও মুরতাদদের বিরুদ্ধে উগ্রতা প্রদর্শনের উস্কানী প্রদান করা হয়েছে। এরা যদি নিজেদের দৃষ্টির সামনে থেকে বিদ্বেষের আবরন সরিয়ে দেখে, কুরআন শরীফকে এরা যদি স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে পড়ে দেখে তাহলে এরা নিজেরাই দেখতে পাবে, এই আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা কেবল সেসব মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছেন যারা কোনক্রমেই ক্ষান্ত হয় না, কোন ধরণের শান্তি-চুক্তি করে না আর দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বেড়ায়। যেহেতু এখন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তাই আদেশ দেয়া হয়েছে (রাষ্ট্রদ্রোহী) এমন মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কেননা, তারা তোমাদের বিরুদ্ধে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা আর যুদ্ধের আগুন ছড়াচ্ছে। আর তারা বিভিন্ন গোত্রকে তোমাদের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। এই ব্যক্তির অপবাদ অনুযায়ী সবাইকে হত্যা করার শিক্ষা দেয়া হয়নি। বরং এদেরকে গ্রেফতার করার আদেশও আছে। বলা হয়েছে, এদেরকে বন্দী কর, এদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখো যেন এরা দেশে অশান্তি ও বিশৃংখলার আগুন না ছড়ায়। Geert Wilders সাহেবের মতে যদি এমতাবস্থায়ও (দেশদ্রোহীদের) পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া সমিচীন হয়ে থাকে, যদি তার মতে দেশে বিশৃঙ্খলা ঘটানোর অনুমতি সবার থেকে থাকে তাহলে তিনি নিজ দেশের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সমস্ত অপরাধীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার লক্ষে, যাচ্ছেতাই করে বেড়ানোর অধিকার দিয়ে আইন প্রনয়ণ করুন। সেক্ষেত্রে এই অপরাধীরা কিন্তু কোন একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বী হবেন না। প্রত্যেক জাতি ও ধর্মানুসারীদের মাঝেই অপরাধী রয়েছে। তা না হলে বল এখন তোমরা এমন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কেন উঠে পড়ে লেগেছ যারা দেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থ��ন করছেন, যারা দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল?

পরিশেষে, তিনি তার বিদ্বেষ এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যার কারণে প্রতীয়মান হয় এই ব্যক্তির অবস্থান খোদা তা’লার বিপক্ষে, ��সলাম পরিবে������ত জ��বন্ত ও এক-অদ্বিতীয় খোদার বিরুদ্ধে। কেননা, তিনি দেখতে পাচ্ছেন, এটাই একমাত্র ধর্ম যা যুক্তি ও দলিল বলে সবাইকে নির্বাক করে দেয়। তাই এক্ষেত্রে যুক্তি প্রমান দিয়ে কাজ হবে না- এগুলো এমনিতেই এদের কাছে নেই। তাই দেশে আইন প্রনয়ন করে বল-প্রয়োগ কর, তবেই কাজ হবে। এটাই পরাভূত পক্ষের লক্ষণ হয়ে থাকে। নিজেদের আচরণের মাধ্যমে হেরে গেছেন বলে এরা নিজেরাই স্বীকার করে নিচ্ছেন।

হল্যান্ডে কিছুদিন পর পর ইসলামের বিরুদ্ধে নানা ইস্যূ সৃষ্টি হয়ে থাকে, বিষোদগার করা হয়ে থাকে। মহিলাদের হিজাব বা পর্দার বিরুদ্ধেও এখানে ইস্যু সৃষ্টি করা হয়েছিল আবার অন্য বিষয়েও ইস্যু সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু গোটা ডাচ (Dutch) জাতিই যে এরকম তা কিন্তু নয়। এদের মাঝে ভদ্র ও সুশীল মানুষ আছেন, নেতা-নেত্রীদের মাঝেও ভাল মানুষ আছেন, বিভিন্ন সামাজিক স্তরে ভাল ভাল মানুষ আছেন। কুরআন শরীফ ও মহানবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে এ ব্যক্তি যে কটুক্তি করেছে, এরা এর বিপক্ষে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন। একজন পার্লামেন্ট সদস্যের নাম Helbe Zeilstra (উচ্চারণ সম্ভবতঃ হালবে যায়েল সাতরা)। এই সংসদ সদস্য তাকে (অর্থাৎ Geert Wilders-কে) সম্ভোধন করে বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করার কোন অধিকার আপনার নেই। আবার Jeroen Dijselbloem (উচ্চারণ সম্ভবতঃ ইয়ারাউন দাইসেল ব্লোম) বলেন, Wilders তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। হল্যান্ডে আপনি যে কোন ধর্ম-বিশ্বাসই পোষন করতে পারেন। আরেকটি রাজনৈতিক দলের নেতা (যিনি নিজেও সংসদ সদস্য) বলেছেন, সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। Wilders-কে ‘রেসিষ্ট’ বা বর্ণবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা উচিত। আবার আরেকজন আইনজীবি যিনি পূর্বে কনসেলরেরও দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাদী হয়ে Wilders-এর বিরুদ্ধে পুলিশে মামলা দায়ের করেছেন। একজন নারী নেত্রীও তার এই কুটুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আরেকজন বলেছেন, বই-পত্র ও প্রকাশনার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ প্রকৃতপক্ষে স্বৈরাচারী একনায়কত্বের সূচনা। এখানকার কেবিনেট (অর্থাৎ মন্ত্রী পরিষদ)-ও Wilders-এর বিবৃতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তারা বলেন, এধরণের বিবৃতি প্রদানের মাধ্যমে হল্য্যন্ডে বসবাসরত মুসলমানদের একটি বৃহদাংশের অবমাননা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রীও বলেছেন, হল্যান্ডে কুরআনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করার কোন পরিকল্পনা নেই। যাই হোক, এখানে এরকম সম্ভ্রান্ত সুশীল লোকেরাও আছেন আবার ঐ ধরণের মানুষও আছে।

প্রত্যেক আহ্‌মদীর আবশ্যক দায়িত্ব হলো, একদিকে আপনারা যেন অভিযোগকারীদের আপত্তি খন্ডন করেন, তাদের উত্থাপিত প্রশ্নের যেন যথাযথ উত্তর দেন, অন্যদিকে আপনারা যেন এসব ভদ্র ও সুশীল মানুষদেরকে ধন্যবাদও জানান যারা এখনও শিষ্টাচার ও ভদ্রতার মূল্যবোধ রাখেন। এদের কাছে ইসলাম ধর্মের হৃদয়গ্রাহী শিক্ষাগুলোকে তুলে ধরুন। এদের মাঝে যে বা যারা পূণ্যবান স্বভাববিশিষ্ট ও ন্যায়-নীতির অনুসারী তাঁদেরকে আল্লাহ্‌ তা’লার মহান বাণী পৌঁছে দিন। আজ বিশ্বে চতুর্দিকে যে অস্থিরতা বিরাজমান এর প্রকৃত কারণ এদের কাছে ব্যক্ত করুন। তাদেরকে বলুন, এর প্রকৃত কারণ হলো, তোমরা খোদা তা’লাকে পরিত্যাগ করেছো। তোমরা তোমাদের একক স্রষ্টা খোদাকে চেনার চেষ্টা কর। এদের কাছে এক-অদ্বিতীয় খোদার বাণী পৌঁছে দিন। এদেরকে বলুন, মনের তৃপ্তি ও আত্মিক প্রশান্তি এসব জাগতিক ঐশ্বর্য্য ও আমোদ-প্রমোদের মাঝে নিহিত নয়; নেশা ও Drug-এর মাঝে নিহিত নয়। (মনের প্রশান্তি অর্জনের লক্ষ্যে এখানকার মানুষ খুব বেশী মাদক ও নেশা জাতীয় জিনিষ সেবন করে। এরা সব ধরণের বাজে নেশা করে থাকে)। এদেরকে বলুন, প্রকৃত প্রশান্তি খোদা তা’লার দিকে ধাবিত হবার মাঝে নিহিত। তাই তোমরা সেই এক-অদ্বিতীয় খোদাকে চেনার চেষ্টা কর যিনি সমস্ত শক্তির অধিকারী। যারা সীমালঙ্ঘনকারী, ধর্ম-বিমুখ, ধর্মের প্রতি, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্রুপকারী তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আল্লাহ্‌ তা’লা সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে এক পর্যায়ে গিয়ে ধরে ফেলেন। WILDERS-এর মত মানুষদেরও বলুন, আল্লাহ্‌র আযাবকে আমন্ত্রন জানিও না। তাঁর আত্মাভিমানে আঘাত করো না।

ইদানিং যে সব ঝড়ঝঞ্ঝা ও ভূমিকম্প পৃথিবীতে দেখা দিচ্ছে এগুলো হলো সতর্ক-সংকেত। অর্থাৎ, সীমালঙ্ঘনকারীরা এগুলোতে আক্রান্ত ও জর্জরিত হতে পারে। বিশ্বের কোন দেশ নিরাপদ নয়, জগতের কোন মানুষ এ থেকে নিরাপদ নয়। এমনিতেই হল্যান্ড এমন একটা দেশ যার বেশীরভাগ অংশ বাঁধ দিয়ে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঝড়ঝঞ্ঝা আঘাত হানলে তা পৃথিবীর পাহাড় ও উচ্চ ভূমিকেও নিস্তার দেয় না সেক্ষেত্রে এটা যে এক সমতলভূমি মাত্র বরং এর অনেক স্থান সমুদ্র স্তরেরও নীচে। ১৯৫৩ সালে এখানে ঝড় হয়েছিল। সেটি বড় ধরণের ক্ষতিসাধন করেছিল। এরপর এখানকার অধিবাসীরা ও সরকার মিলে বড় ধরণের একটা প্রকল্প হাতে নেয়। তদনুযায়ী নদীর মোহনায় সমুদ্র উপকূলে অনেকগুলো বাঁধ বেধে দেয়া হয়, ড্যাম নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন স্থানে এ প্রকল্প কার্যকর করা হয়েছে। একে Delta Works বলা হয়। আমি নিজেও এই প্রকল্প দেখে এসেছি। নিঃসন্দেহে এটি একটি উত্তম মানবীয় প্রচেষ্টা। কিন্তু বিশ্বে বর্তমানে যে সব ঝড় হচ্ছে- কোন দেশই এ থেকে নিরাপদ নয়। আমাদেরকে সেখানে যে গাইড ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল সে একপর্যায়ে আমাকে বললো, এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতের জন্য হল্যান্ডকে সুরক্ষিত করে ফেলেছি। আমি তাকে বললাম, একথা বল, সুরক্ষিত করবার যতটুকু চেষ্টা করা যায় আমরা তা করেছি। তা না হলে একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন তোমরা কতদিনের জন্য একে সুরক্ষিত করেছো আর কতদিন এই নিরাপত্তা কার্যকর থাকবে। সে বললো, একবারে সঠিক কথা। এরপর যতক্ষণ সে আমাকে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিল বার বার একথাই বলছিল, এটা একটা মানবীয় প্রচেষ্টা মাত্র। কেননা এ ধরণের প্রলয়ঙ্করী ঝড় সাধারণতঃ দু’শ বছরের ব্যবধানে হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন, সেই ঝড় প্রকৃতপক্ষে কখন আসবে আর এ প্রকল্প কতটুকু নিরাপদ থাকবে। যাইহোক, এ সময় সে যখনই আমাকে ব্যাখ্যা দিচ্ছিল কমপক্ষে চার পাঁচবার সে খোদার ইশ্বরত্ব স্বীকার করে বলেছিল হ্যাঁ! একমাত্র আল্লাহ্ সুরক্ষা করলেই আমরা নিরাপদ থাকতে পারি। অতএব, এদেশে এমন মানুষ আছে যাদেরকে বুঝিয়ে বললে এক-অদ্বিতীয় খোদার বিষয়টি এদের হৃদয়পটে তাৎক্ষনিক জাগ্রত হয়। আল্লাহ্‌ তা’লা বলেছেন, মানুষ বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়লে আমাকেই স্মরণ করে, তখন অন্য কোন খোদার নাম মনে পড়ে না। সে আমাকে পরিদর্শন বইয়ে নিজের অনুভূতি লিখে দিয়ে স্বাক্ষর দিতে বলে। আমি একথাই লিখেছি: এটা একটা উত্তম মানবীয় প্রচেষ্টা আর প্রচেষ্টা হিসেবে এটা একটা বিষ্ময়কর প্রকল্প যা দেশকে সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রকৌশলীরা নির্মান করেছেন। কিন্তু সর্বক্ষন স্মরণ রাখা উচিত, প্রকৃত পরিকল্পনার মালিক হলেন আল্লাহ্‌ তা’লা। সত্যিকারের সুরক্ষা লাভের জন্য সারাক্ষণ আল্লাহ্‌কে স্মরণ রাখা উচিত।

যাইহোক, আজকাল বিশ্ববাসী যে বস্তুবাদিতায় মত্ত হয়ে আছে, এর কোন নির্দিষ্ট গন্ডি নেই। পাশ্চাত্যও একইভাবে নিমগ্ন যেভাবে প্রাচ্যবাসীরা নিমগ্ন। সবাই খোদাকে ভুলে বসেছে। আবার এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে আর এভাবে তারা আল্লাহ্‌র ক্রোধকে উস্কে দিচ্ছে। এরা খোদাকে যে ভুলে বসেছে তাই নয় বরং আল্লাহ্ তা’লা সম্বন্ধে এরা বাজে কথাও বলে বেড়ায়। এসব অপরাধ আল্লাহ্‌ তা’লার ক্রোধ ও ঐশী শাস্তিকে আহ্বান জানানোর নামান্তর!!

অতএব প্রত্যেক আহ্‌মদীর কর্তব্য, প্রত্যেক দেশে আপনারা আপ���াদের স্কন্ধে অর��পিত �����াণী প��ঁছানোর দায়িত্ব যথাযথভাবে পূর্ণ করুন। ইসলাম ধর্মের সঠিক পরিচয় জগতের সামনে উপস্থাপন করুন। খৃষ্টানদেরকেও দেখান, ইহুদীদেরকে এবং ধর্মহীনদেরকেও দেখান। আর মুসলমানদেরকেও পথ দেখান যারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আঃ)-কে অস্বীকার করছে।

হযরত মসীহ্ মাওউদ (আঃ) বলেছেন,

আমার আগমন না ঘটলে এসব বিপদের আগমনে কিছুটা বিলম্ব ঘটতো। কিন্তু আমার আবির্ভাবের মাধ্যমে খোদা তা’লার ক্রোধ প্রকাশের সেই সুপ্ত পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে যা দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত ছিল। (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২শ খন্ড, পৃঃ ২৬৮)।

গত ১০০ বছরের ঘটনাবলী যাচাই করে দেখুন। এ শতাব্দীতে যতগুলো ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা গেছে সেটা অতীতের বহু শতাব্দীর সমন্বিত সংখ্যার চেয়ে বেশী। বিগত এগার বার’শ বছরে এত দুর্যোগ দেখা যায় নি যত দুর্যোগ গত ১০০ বছরে দেখা দিয়েছে। চলতি বছরেও কয়েকটি ভূমিকম্প ও ঝড়ঝঞ্ঝা হয়েছে আর তা হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। এটা মানুষের জন্য একটা সতর্ক-সংকেতঃ তোমরা খোদাকে সনাক্ত কর!! প্রত্যেক আহ্‌মদীর দায়িত্ব, একদিকে সে নিজের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধন করবে অপরদিকে জগতবাসীকেও জানাবে, এসব বিপদ ও দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবার একটাই পথ। আর তা হলো, তোমরা এক-অদ্বিতীয় খোদাকে সনাক্ত কর এবং তাঁর প্রিয়দের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো না।

সারা বিশ্বে চলতি বছরের কয়েক মাসে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে এর একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান আপনাদের কাছে উপস্থাপন করছি। মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে কোন না কোন দুর্যোগের প্রাদূর্ভাব কখনও হয়নি। কিন্তু এবছর আপনারা লক্ষ্য করবেন প্রত্যেক অঞ্চলে এভাবে বিপদ দেখা দিয়েছে। এদেরকে বলুন, এখনও সময় আছে মানুষ যেন তার খোদাকে সনাক্ত করে। প্রাথমিক ও নিম্ন পর্যায়ের এসব দুর্যোগ চরম আকারও ধারণ করতে পারে।

অতএব, প্রত্যেক আহ্‌মদী যেন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী খোদার বাণী প্রচারে মগ্ন হয়। আমি যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছি এগুলো সম্পূর্ণ খতিয়ান কি না বলতে পারবো না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবছর ফেব্রুয়ারীতে ইন্দোনেশিয়ায় বন্যা দেখা দেয়, তিন লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়ে। আবার দু’বার ভূমিকম্প দেখা দেয় রিক্টার স্কেলে যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৬.৪ এবং ৬.৩। আবার সুমাত্রা দ্বীপে কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কয়েকবার ভূমিকম্প হয়েছে। এরপর প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ Solomon Island-এ ভূমিকম্প হয়েছে। এটি এক প্রচন্ড ভূমিকম্প ছিল যা প্রচূর ধ্বংসলীলা সাধন করে, এতে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। রিক্টার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮.১। এরপর পাকিস্তানে হঠাৎ বন্যা হয়। প্রবল বৃষ্টিপাতের দরুন করাচীতে বন্যা দেখা দেয়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা হয়, অনেকে মৃত্যুবরণ করে। বলা হয়, এতে বেলুচিস্তান প্রদেশের ২৫ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮০ হাজার ঘর-বাড়ী ধ্বংস হয়েছে আর ছয় (৬) হাজার গ্রাম বিনষ্ট হয়েছে। পুনরায় জুন মাসে পাকিস্তানে সাইক্লোন (Cyclone)-এর আশঙ্কা দেখা দেয়। সেটা সরাসরি আঘাত না হেনে বেলুচিস্তানে আঘাত হানে এবং সেখানে ধ্বংসলীলা সাধন করে। আবার জুন মাসে বাংলাদেশে বড় ধরণের একটা ঝড় হয় যাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এরপর ভারতে জুলাই মাসে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। আবার জুলাইয়ে ইউকে-তে বন্যা দেখা দেয়। আর অর্ধেক ইউকে পানিতে তলিয়ে যায়। এর আগে যে বন্যা হয়েছিল তাতে জার্মানী ও অন্যান্য অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। এরপর পাকিস্তানে বজ্রপাতের দরুন অনেক বড় ক্ষতি সাধিত হয়। আবার জাপানে ভূমিকম্প হয় যার তীব্রতা রিক্টর স্কেলে ৬.৮ ছিল। এরপর আগষ্টে আমেরিকায় সামুদ্রিক ঝড় আঘাত হানে, অনেক বাড়ী-ঘর ধ্বংস হয়, ব্যাপক ক্ষতি হয়। চীনে ঝড়ের কারণে একটি ব্রীজ ভেঙ্গে পড়ে আর অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। উত্তর কোরিয়ায় অতিবৃষ্টি ও প্লাবনের দরুন অনেক ধ্বংসলীলা সাধিত হয়। কয়েকদিন আগে পেরুতে (দক্ষিন আমেরিকা) বড় ধরণের ভূমিকম্প হয়। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরপর পাকিস্তানে পুনরায় বন্যা দেখা দেয়। অতএব, এসব ঘটনাপ্রবাহ যেগুলো আমি সংক্ষেপে বললাম এগুলো আমাদেরকে সাবধান করছে। আবার অষ্ট্রেলিয়ায় এমন বড় ঝড় হয় যার ফলশ্রুতিতে মহাসড়কগুলো ডুবে যায় বরং ভেসে যায়। এমন ঘটনা তাদের ধারনার বাইরে ছিল। এরপর বরকিনা ফাসো (পশ্চিম আফ্রিকা) দেশে কিছুদিন পূর্বে অতিবৃষ্টির দরুন মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, দু’লাখ মানুষ সেখানে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আবার হাওয়াই (Hawai) দ্বীপপুঞ্জে ঘূর্ণিঝড় হয়েছে আর একই সাথে ভূমিকম্পও দেখা দিয়েছে। অথচ হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এ ধরনের ঝড় ও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা খুব কম বলে বলা হয়ে থাকে। আবার আরব সাগরে সামুদ্রিক ঝড় দেখা দেয়। বলা হয়, অন্যান্য সমুদ্রে এ ধরনের ঝড় হলেও আরব সাগরে কখনও হয় না। এই ঝড় স্থলভাগেও Tropical Cyclone আকারে আঘাত হানতে পারতো। Alabama State-এ ঝড় হয়েছে। আগাম সর্তক করে দেয়ার পর এরা অনেক প্রস্তুতি নিয়েছিল, তবুও এটা অনেক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। বলা হয়েছে, এখানে একটি স্কুল ভবনে মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। ঝড়ের কবলে পড়ে সেই ভবনটি ভেঙ্গে যায়। এরা বেড়িয়ে আরেকটি ভবনে আশ্রয় নেয়, কিন্তু সেটাও ধ্বংস হয়ে যায়। একই ভাবে অন্য অনেক বাড়ী-ঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মানুষ যেখানেই আশ্রয় নেয়, এই ঘূর্ণিঝড় (Tornado) সেখানেও আঘাত হেনে বাড়ী-ঘর উড়িয়ে নিয়ে গেছে। একইভাবে দক্ষিন আফ্রিকাতেও বড় ধরণের ঝড় হয়েছে। এসব ঘটনাপ্রবাহ ও দুর্যোগ আমাদেরকে সতর্ক করছে, আল্লাহ্‌ তা’লার তকদীর কার্যকর, আর এসব হলো মানুষের জন্য সতর্ক-সংকেতঃ তোমরা তোমাদের এক-অদ্বিতীয় খোদাকে অনুসন্ধান কর আর সীমালঙ্ঘন করো না, নবী-রসূল ও স্বয়ং খোদার বিরুদ্ধে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো না।

আমি খুতবার প্রারম্ভে আজকে যে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করেছি এতেও আল্লাহ্ একথাই বলছেন। এ আয়াতের অনুবাদ হলো, যারা কুচক্র করেছে আল্লাহ্ যে তাদেরকে ভূমিধ্বসের মাধ্যমে বিলীন করে দেবেন না অথবা তাদের কাছে যে তাদের ধারণাতীত কোন পথ দিয়ে আযাব আসবে না- এ বিষয়ে এরা কি নিশ্চিন্ত? অতএব আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন, কুচক্রে রত মানুষ আল্লাহ্‌র সামনে টিকতে পারবে না। যখন এরা সীমালঙ্ঘন করে ফেলে তখন আল্লাহ্‌ তা’লার শাস্তির যাঁতাকল ঘুরতে আরম্ভ করে। তাই বাহ্যতঃ স্বল্প মাত্রার ঘূর্ণিঝড় আর ভূমিকম্প যা এ বছর একাধারে বিশ্বে দেখা দিয়েছে এগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। পাশ্চাত্যের অধিবাসী, প্রাচ্যে বসবাসকারী এবং সব ধর্মের অনুসারীদেরও এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। মুসলমানদেরও আর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের। উপলব্ধি করা উচিত। ভালভাবে চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ্‌র ক্রোধ আজ কেন সক্রিয়? একজন ‘আহবানকারীর’ ঐশী ‘আহবানের’ প্রতি মনোযোগ দিন, তিনি বলেছেন, আমি আগমন না করলে এসব বিপদের প্রাদূর্ভাবে বিলম্ব ঘটতো। তাই এসব দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে ‘আগমনকারীর’ আহবানে মুসলমানদেরও মনোনিবেশ করতে হবে, খৃষ্টানদেরও করতে হবে আর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের। মনোযোগ দিতে হবে আর ধর্মহীনদেরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে হবে। তা না হলে এই ‘আহ্বানকারী’ এ ঘোষণাও দিয়ে গেছেন,

“হে ইউরোপ! তুমিও নিরাপদ নও। হে এশিয়া! তুমিও সুরক্ষিত নও। হে দ্বীপবাসীগণ! কোন কল্পিত খোদা তোমাদেরকে সাহায্য করবে না। আমি শহরগুলোকে ধ্বংস হতে দেখ��ি আর জনপদগুলোকে জনমানবশূণ্য প্রত্যক্ষ করছি। সেই এক-অদ্বিতীয় খোদা দীর্ঘকাল নীরব থেকেছেন। তাঁর চোখের সামনে ঘৃণ্য কাজকর্ম অনুষ্ঠিত হয়েছে আর তিনি নীরবে সব স��্য ক��েছেন। কিন্তু এখন তি��ি রূদ্������ূর্তিতে নিজ স্বরূপ প্রকাশ করবেন। যার শোনার মত কান আছে সে শ্রবণ করুক, সে সময় দূরে নয়। আমি সবাইকে খোদার আশ্রয়ের ছায়াতলে একত্র করতে চেষ্টা করেছি...।”

এরপর তিনি বলেছেন,

“...খোদা শাস্তি প্রদানে ধীর। অনুতাপ কর, যেন তোমাদের প্রতি করুণা বর্ষিত হয়। যে খোদাকে পরিত্যাগ করে সে মানুষ নয়- কীট। যে তাঁকে ভয় করে না সে জীবিত নয়- মৃত।” (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, ২২খন্ড পৃঃ ২৬৯)।

এই সেই বাণী যা প্রত্যেক আহ্‌মদী জগতের স্থিতির জন্য, পৃথিবীকে রক্ষার উদ্দেশ্যে জগতময় প্রদান করবে। আল্লাহ্‌ তা’লা আমাদেরকেও খোদা তা’লাকে সত্যিকারভাবে চেনার সৌভাগ্য দিন। আমরা যেন সেই এক-অদ্বিতীয় খোদার ক্রোধের পরিবর্তে তাঁর অনুকম্পা লাভকারী হতে পারি, আমীন।

অনুবাদ-আব্দুল আউয়াল খান চৌধুরী, ওয়াকেফে জিন্দেগী