In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

মরহুম হযরত সাহেবযাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব এর মধুময় স্মৃতিচারণ

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৪ঠা মে, ২০০৭ইং

এক সাধকের সার্থক মর্যাদা ধারণ করে দরবেশী জীবন যাপনকারী মরহুম হযরত সাহেবযাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব এর মধুময় স্মৃতিচারণ এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী, সেবা, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর প্রশংসনীয় গুনাবলী উল্লেখ করে জামাতকে মূল্যবান উপদেশ প্রদান।

নিষ্ঠাবান প্রত্যেক আহ্‌মদী, হোক সে কাদিয়ানবাসী বা ভারতের অন্য কোন জামা’তের অন্য কোন বাসিন্দা অথবা অন্য কোথাও বসবাসকারী হয়ে থাকুন, প্রত্যেক কর্মকর্তা ও হযরত মসীহ্‌ মাউদ (আ.)-এর খানদানের প্রতিটি সদস্যের অনুরূপ আদর্শই স্থাপন করা উচিৎ।

কাদিয়ানে বসবাসকারী প্রত্যেক আহ্‌মদী সেই মর্যাদাকে অনুধাবন করুন, যা মসীহ্‌ (আ.)-এর আবাসস্থলে বসবাসকারীদের থাকা উচিৎ। ধর্মপরায়ন পূর্বসুরীরা বিদায় নিলে নব প্রজন্মের দায়িত্ব বেড়ে যায় আর জীবন্ত জাতির নবীনেরা সেই দায়িত্ব সূচারূপে সম্পাদনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে।

বিশ্বের জামা’ত সমূহের উপরও কাদিয়ানের অধিকার রয়েছে যে, এ জনপদে বসবাসকারীদের জন্য প্রত্যেক আহ্‌মদী দোয়া করতে থাকবে, যাতে আল্লাহ্‌ তা’লা মসীহ্‌ (আ.)-এর জনপদের অধিকার সংরক্ষনকারী প্রজন্ম সর্বদা সৃষ্টি করতে থাকেন।

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

গত জুমুআয় আমি হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব মারাত্মক অসুস্থ থাকায় দোয়ার দোয়ার আবেদন করেছিলাম এতে নিষ্ঠাবান কয়েকজনের পত্র এসেছে। বড়ই মর্মবেদনা নিয়ে লোকজন দোয়া করেছে তবে আল্লাহ্‌ তা’লার নিয়তি জয়যুক্ত হয়েছে আর দু’দিন পর তিনি স্বীয় মহা প্রভুর সমীপে পৌঁছে গিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।

তাঁর সেবা, ত্যাগ এবং তাঁর গুণাবলী দৃষ্টিপটে রেখে কৃত দোয়া পরকালে অবশ্যই আল্লাহ্‌ তা’লার সমীপে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হবে, ইনশাআল্লাহ্। এরূপ নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগী এবং সংকটকালে সর্বদা সময়ানুগ উৎসর্গের প্রেরণায় কর্মসম্পাদনকারী, গরীবের সাহায্যকারী ও তাদের সহায়তাদানকারী, জামাতের মর্যাদা অক্ষুন্নরূপে রক্ষাকারী এবং খিলাফতের জন্য নিবেদিত প্রাণ এ ব্যক্তির সাথে সাথে আল্লাহ্‌ তা’লা সম্প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার করবেন বলে আমি আশা করি ইনশাআল্লাহ্। আল্লাহ্‌ তা’লা জান্নাতের সুউচ্চ স্থান প্রাপ্তদের মাঝে স্বীয় প্রিয়দের নৈকট্যে তাঁকে সমাসীন করুন। শোকবার্তা সম্বলিত অগণিত চিঠি-পত্র আসছে, শোক জ্ঞাপনের জন্য মানুষ আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন, আল্লাহ্‌ তা’লা সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। এ পৃথিবীতে যিনি আসেন এ ধরা তাকে ছেড়ে যেতেও হয়। এটি আল্লাহ্‌ তা’লার অমোঘ বিধান সর্বদা যা সচল আর এ বিশ্ব যদ্দিন থাকবে এভাবেই চলতে থাকবে। তবে সৌভাগ্যবান তারা যারা খোদার সন্তুষ্টি অন্বেষণে এবং তাঁর ধর্মের সেবায় জীবন যাপন করেন, আল্লাহ্‌ তা’লার সৃষ্টির প্রতি তারা সহানূভুতি রাখে আর এর ব্যবহারিক দৃষ্টান্তও স্থাপন করে। হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেবও নিঃসন্দেহে এমন মহানুভবদের মাঝে অন্যতম। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে জান্নাতের অনন্ত সৌভাগ্য দান করুন।

তাঁর মৃত্যূতে যেভাবে আমি বলেছি মানুষের নিকট থেকে শোকবার্তা সম্বলিত চিঠি-পত্র এখনো আসছে আর তাতে এটিও প্রকাশ পাচ্ছে যে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বংশের একটি নিদর্শনমূলক একটি চিহ্ন যা কাদিয়ানের দারুল মসীহ্’তে অবস্থান করছিল তা এখন আর রইল না। এটি সঠিক যে, হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব কাদিয়ানের আহ্‌মদীদের সাথে বিশেষ সম্পর্ক আর আহ্‌মদীয়া জামাত ভারতের সদস্যদের সাথে স্বভাবসূলভ এমন সম্পর্ক গড়েছিলেন যার কারনে লোকেরা নিরাপদ বোধ করতো এবং তাঁর কথাবার্তার মূল্যায়ণ করা হত এবং মর্যাদা দেয়া হত।

দীর্ঘ একটি সময় এমনও কেটেছে যখন পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে (বৈরী) সম্পর্কের কারণে কেন্দ্র বা সেই স্থানের সাথে যেখানে যুগ খলীফা অবস্থান করছিলেন, সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। পূর্বে এমন সময়ও এসেছে যখন আজকের মত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না আর যাও ছিল তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত তবুও দরবেশগণ জামাত ও খিলাফতের প্রতি ভালবাসা ও বিশ্বস্থতার অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। এবং এতে তারা সান্তনা পেতেন যে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পৌত্র এবং হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর ছেলে তাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছেন আর সেই ছেলেও খিলাফতের প্রতি ভালবাসা, নেযামের আনুগত্য ও আমীরের আনুগত্যের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপণ করে জামাতের সদস্যদের সর্বদা এই চেতনাবোধ জাগিয়েছেন আর এই চেতনা ও অনুভূতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়েছেন যে, জামাত এবং খিলাফতই সবকিছু যার সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমরা আল্লাহ্‌ তা’লার সন্তুষ্টি লাভকারী হতে পারি।

প্রায় ত্রিশ বছর তিনি হযরত মৌলভী আব্দুর রহমান জাট সাহেবের আমারত কালে একান্ত বিনয় ও বিশ্বস্ততার সাথে এক সাধারণ কর্মীরূপে বিশ্বস্ততা রক্ষার স্বীয় অঙ্গীকার পূর্ণ করেগেছেন। তারপর খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে:) ১৯৭৭ সনে তাঁকে যখন নাযেরে আলা ও আমীর মোকামী নিযুক্ত করলেন তখন সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব খুবই সুন্দরভাবে সম্পাদন করেছেন। দরবেশ হিসেবে গিয়েছেন আর দরবেশের মতই জীবন-যাপন করেছেন। এ চিন্তা আসেনি যে আমি হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পৌত্র; বরং হযরত মুসলেহ��� মওউদ (রা:) একদা তাঁর মর্যাদার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে তাঁকে বলেছিলেন এ উপলক্ষটি হলো তখন যখন তিনি তাঁর বিয়ে উপলক্ষ্যে পাকিস্তান গিয়েছিলেন তখ��� বিয়ের মাত্র কিছুদিন হয়েছিল, স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যাবার জন্য তার কাগজ-পত্র তৈরী করছিলেন। সে সময়ে যেমনটি করা হতো ছোট-খাট ব্যাপারে দু’দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যেতো। (ইদানিং কিছু কাল ধরে তুলনামূলকভাবে সম্পর্ক ভালো নতুবা এই টানাপোড়েন তো সর্বদাই চলে এসেছে) এমনই একটি মুহুর্তে যখন তিনি সেখানেই ছিলেন, বিয়ের মাত্র কয়েক দিন অতিবাহিত হয়; হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) অনুভব করলেন যে অবস্থা মন্দের দিকে যাচ্ছে তখন তিনি (রা:) মিয়া সাহেবকে (নিজ ছেলে) বললেন,

স্ত্রীর কাগজ-পত্র হতে থাকবে, তুমি তাকে রেখে দ্রুত ফিরে যাও কেননা তুমি যদি এখানেই থেকে যাও তাহলে তোমার না যাওয়ার কারণে মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খান্দানের কোন সদস্য আর কাদিয়ানে আর থাকলনা। তাই দ্রুত প্লেনে টিকিট বুক করো (অবস্থার প্রেক্ষিতে সেইবার তিনি সড়ক পথে সীমানা পার হয়ে আসেন নি বরং অবস্থা এমন ছিল যে, প্লেনে আসতে হয়েছিল) আর তাড়াতাড়ি ফিরে যাও। আর যদি প্লেনের টিকিট না পাও আর প্লেন ভাড়া করেও যেতে হয় তো তা-ই করাও এবং দ্রুত ফিরে যাও। যেভাবেই হোক তাড়াতাড়ি যাওয়া আবশ্যক নতুবা মানুষের মাঝে এই ধারণার সৃষ্টি হবে যে, কাদিয়ান যেন খালি হয়ে গেলো কেননা মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খান্দান যদি এরূপ দৃষ্টান্ত স্থাপন না করে আর ত্যাগ স্বীকার না করে তাহলে মানুষ কী করে কোরবানী করবে!

২০০৫ সনে আমি যখন কাদিয়ান গিয়েছিলাম তখন প্রায় এ ধরণের বাক্যেই সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব আমাকে সেই পুরো ঘটনাটি শুনিয়েছিলেন।

সেই একুশ বছরের যুবককে মসীহ্ (আ.)-এর আবাসস্থলের রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য রাখা হয়েছিল, জাগতিক দৃষ্টিকোন থেকে যদি দেখা হয় তাহলে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর কল্যাণে, উত্তরাধিকারসূত্রে তিনিই ছিলেন কাদিয়ানের সমস্ত সম্পত্তির মালিক। যার পিতা যুগ খলীফা ছিলেন আর যিনি তাঁর ছেলেকে ভরসা দিয়েছিলেন যে,

তোমার কাদিয়ানে অবস্থানই কাদিয়ানের দরবেশদের সাহস যোগানের কারণ হবে এবং তোমার সেখানে থাকা আবশ্যক।

ওসব বৈশিষ্ঠের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মিয়া সাহেবের হৃদয়ে আমীরের আনুগত্য থেকে বিরত থাকার ধারণা স্থান করে নিতে পারেনি। বরং এই চেতনা আরও গভীরভাবে সৃষ্টি হয়েছে যে,

আমীরের আনুগত্যেরও উন্নত মান আমাকে প্রদর্শন করতে হবে, প্রত্যেক দরবেশদের আমাকে দেখে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি আমীরের আনুগত্যের দৃষ্টান্ত দেখায়।

নিশ্চয় সেই মহান পিতার হিতোপদেশের প্রভাবই ছিল এটা, যা তিনি তাঁর সন্তানদের দিয়েছিলেন এবং খোদার নিদর্শনাবলী (শায়ায়েরুল্লাহ) সংরক্ষণার্থে নিয়োজিত এই দরবেশ সন্তানকে বিশেষভাবে করেছিলেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নসীহত ছিল,

তুমি কখনও মনে এই ধারনাকে স্থান দেবেনা যে, তুমি নাযের। (যুবা বয়সেই তিনি নাযের হয়েছিলেন।) বরং সর্বদা তোমার হৃদয়ে যেন এই ধারণা থাকে যে, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পৌত্র তুমি এবং সে মোতাবেক স্বীয় জীবন তোমাকে গড়তে হবে এবং একেই নিজের প্রকৃত মর্যাদা মনে করতে হবে আর নিজেকে এই হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পৌত্র হবার কারণে মনোভাবের প্রকাশ ঘটবে কি রূপে ? নিশ্চয় তাই যে, ‘তোমার বিনয়াবনত পন্থা তাঁর পছন্দ হয়েছে।’ এবং নিশ্চয় যে উদ্দেশ্য সহকারে আল্লাহ্‌ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে আবির্ভূত করেছিলেন তা পুর্ণ করতে হবে। ছোট-খাট বিষয়ে নিজর সময় নষ্ট করবে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এবং জামাতের সম্মান অটুট ও অক্ষুন্ন রাখতে হবে।

সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব এসব কথা নিজের হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন এবং আমল করেছেন আর দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন এবং খুবই ভালোভাবে সম্পাদন করেছেন এবং কাদিয়ান বাসী, ভারতের জামাত সমূহে তা প্রচলন করার চেষ্টা করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক নিষ্ঠাবান আহ্‌মদীর উচিৎ, তা তিনি কাদিয়ানেই বাস করুন বা ভারতের অন্য কোন জামাতে বা যেখানেই থাকুন না কেন এবং প্রত্যেক কর্মকর্তা ও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খান্দানের প্রতিটি সদস্যের এরূপ আদর্শই স্থাপন করা উচিত।

তাঁর জন্ম সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে দিচ্ছি, তিনি জেদ্দা নিবাসী হযরত শেঠ আবু বকর ইউসুফ সাহেবের কন্যা হযরত আযিযাহ্ বেগম সাহেবার গর্ভে ১লা আগস্ট, ১৯২৭ সনে জন্ম গ্রহণ করেন। এখানে এটিও উল্লেখ করছি যে, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর এখানে বিবাহ্ করার ইচ্ছা প্রথম দিকে ছিল না বরং অন্য কোথাও কথা হচ্ছিল। কিন্ত হযরত আযিযাহ্ বেগম সাহেবার বিবাহ হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর সাথে হোক এটিই আল্লাহ্‌ তা’লার ইচ্ছা ছিল আর সেই সম্পর্কে হযরত উম্মুল মু’মেনীন (রা:), হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) এবং অন্যান্যরাও এজন্য এমনই কতক স্বপ্ন দেখেন এবং আল্লাহ্‌ তা’লার ফযলে বারংবার এমনটি প্রকাশিত হতে থাকে; যার ফলে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছে। হযরত মৌলভী সরওয়ার শাহ্ সাহেব যখন হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর নিকাহ্ পড়ান তখন তিনি একথা উল্লেখ করেন।

হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব এর জন্ম সম্পর্কে হযরত নবাব মোবারেকা বেগম সাহেবার একটি রুইয়াও রয়েছে, আমি তা বলে দিচ্ছি। এটি আমাকে আমার খালা সাহেবজাদী আমাতুন নাসীর বেগম সাহেবা একটি পত্রে লিখেছেন। তিনি কোন পুরনো চিঠি খুঁজে বের করেন যা নবাব মোবারেকা বেগম সাহেবা তাঁর মাতাকে লিখেছিলেন অর্থাৎ, তাঁর মাতা সৈয়দা সারা বেগম সাহেবা যিনি হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর পত্নী ছিলেন। সাহেবজাদী আমাতুন নাসীর বেগম সাহেবা লিখেন,

আমার মনে হয় মিয়া ওয়াসীম আহমদের ক্ষেত্রে এই রুইয়া পূর্ণ হয়েছে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর বড় মেয়ে নবাব মোবারেকা বেগম সাহেবা (রা:) তার ভাবী সৈয়দা সারা বেগম সাহেবাকে এই চিঠি লিখেছিলেন। লিখেন,

অবাক! এদিকে আপনার পত্র থেকে বধুর সন্তান সম্ভবা হবার সংবাদ পাই অপর দিকে আমি সে রাতেই স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি ভাই সাহেবকে অর্থাৎ হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:)-কে স্বপ্নে এই স্বপ্ন বর্ণনা করছি যে, (স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন বলছি) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) আমার হাত ধরে এই শুভসংবাদ দিচ্ছেন সম্ভবতঃ হাফিজ এবং তোমার ভাই এর ঘরে আযিযার ঔরশে ছেলে সন্তান হবে এবং এই সংবাদ শুনে ভাই সাহেব খুবই আনন্দিত হন। স্বপ্নেই হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী একান্ত আনন্দিত হন আর তিনি বলেন আমিও চেয়েছিলাম যেন আযিযার গর্ভেই হোক।

হযরত মুসলেহ্ মওউদ খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) এক সময় তার সম্পর্কে বলেন যে,

আমি আমার এক ছেলেকে একটি বিরান উপত্যকায় ছেড়ে দিয়েছি, আল্লাহ্‌ তা’রা তাকে কাজ করার তৌফিক দিন।

দৃশ্যত কাদিয়ানতো জনবসতিপূর্ণ এবং শস্য-শ্যামল ছিল কিন্তু কাদিয়ানের দরবেশদের জীবন-যাত্রা শুরুতে খুবই অসচ্ছল ও বিপদসঙ্কুল ছিল। যদিও মু’মেন বিপদে ভীত হয় না কিন্তু চতুরপার্শ্বের অমুসলমানরা যে অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছিল তা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। যারা সেখানে ছিল তারাও চিন্তিত ছিল, যে উদ্দেশ্যে আমাদেরকে এখানে রাখা হয়েছে তা পালন করতে পারবো কি না আর বিশ্ব জামাত এবং যুগ খলীফাও একই বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন। এ জন্য তিনি দোয়া করছেন যে কোন ভয় তাদেরকে সেই অঙ্গীকার থেকে যেন বিচ্যূত করতে না পারে যারা দৃঢ় সংকল্পের সাথে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন আর যাদেরকে মসীহ্‌র আবাস স্থলে ঐশী নিদর্শনাবলী সংরক্ষণ করতে প্রেরণ করা হয়েছে তারা যেন সে দায়িত্ব পালন করতে পারে। সে সময় অবস্থা এতটাই বিপদসঙ্কুল ছিল যে, কাদিয়ানে অবস্থানকারীদেরকে প্রশাসনও ���র্বদা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো আবার পাকিস্তান থেকে যে সব হিন্দু বা শিখ ভারতে এসেছিল তারাও পাকিস্তানে অত্যাচারিত হবার কারণে বা যে কারণই হোক না কেন এদের সাথ�� শত��রুতা পোষণ করতো । এর ফলে চরম বিরোধী দৃষ্টিতে তাদেরকে দেখাতে হতো আর সুযোগ পেলেই তাদের শেষ করে দেয়ার হীন চেষ্টা হতো। এহেন পরিস্থিতিতে বাহির থেকে খাদ্য সামগ্রির সরবরাহও যখন বন্ধ আর খাবারের যৎতসামান্য যে মজুদ ছিল, কেবল তারই উপর নির্ভর করতে হতো। অন্য কোন আয়ও ছিল না আর পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। কাদিয়ানের সে সকল দরবেশ যাদের সংখ্যা হবে কয়েক শত তাদের জন্য তখন বাস্তবেই এটি তৃণলাতাহীন বিরাণ উপত্যকার দৃশ্যই উপস্থাপন করছিল।

তারপর ধীরে ধীরে মরহুম মোকাররম সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব এবং অন্যান্য দরবেশদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও দোয়া আর যুগ খলীফার দোয়া এবং জামাতের দোয়ার প্রভাব পড়তে থাকে, পাশাপাশি সমাজের সাথে সম্পর্কও গড়ে উঠতে থাকে, তাদের হৃদয়ও নরম হতে থাকে। এই দরবেশরা ধীরে ধীরে স্বস্তির শ্বাস নিতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরেই চলা দারিদ্র এবং আর্থিক অস্বচ্ছলতা বিরাজ করতে থাকে। সে সময় জামাতের তহবিল থেকে দরবেশদের জন্য খুবই সামান্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এদ্দারা বড় কষ্টে পানাহার চলতো আর সে সময়ে হযরত মিয়া সাহেবের জন্য হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:)-এর নির্দেশ ছিল, ভাতা সম পরিমানই পাবে তাও আবার জামাতের ফান্ড থেকে নয় বরং হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:) তাকে নিজের ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে এটি দিতেন।

তারপর সময়ের প্রবাহে অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে তাদের আয়-রোজগারও আরম্ভ হয়। কৃষি জমি থেকে মিয়া সাহেবেরও আয় আসতে থাকে। মোটকথা, চরম কষ্ট এবং প্রতিটি মূহুর্ত ভয় ও শঙ্কাপূর্ণ ছিল যা সেই সকল দরবেশরা কাটিয়েছেন আর এটি তাদের অসাধারণ ত্যাগ ছিল।

আমি মনে করি, এতেও খোদাতা’লার গভীর প্রজ্ঞা নিশ্চিত ছিল । হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর সন্তানদের মধ্য থেকে আল্লাহ্‌ তা’লা এই ব্যক্তিকে দরবেশী জীবন যাপন আর মহান ত্যাগের সুযোগ দিয়েছেন যার নানার বংশ আরবদের অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং সেই অঞ্চলের কাছাকাছি বাস করতেন তারা যেখানে ইসমাঈলী কুরবাণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছিল। হযরত নবাব মোবারাকা বেগম সাহেবা (রা:)-এর যে স্বপ্ন আমি এখন বর্ণনা করেছি তার থেকেও এটিই জানা যায় যে, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর বাক্য যে, “আমি এটিই চেয়েছিলাম যেন আযিযার গর্ভে হয়”। আর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর স্বয়ং আগমন এবং শুভসংবাদ দেয়া, এসব কিছু বলছে যে, এই ছেলের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা’লা কোন অসাধারণ কাজ করাবেন আর তা ছিল ‘আত্মত্যাগ’। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর কুরবানী কবুল করুন।

হযরত মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেবের মধ্যে এই কুরবানীর স্পৃহা কত প্রবল ছিল তা তাঁর এই কথা থেকে অনুমেয়:

‘আমি দোয়া করেছি হে আল্লাহ্! আমাকে এখানেই থাকতে দাও। কেননা প্রথমে নিয়ম ছিল, হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা:)-এর সন্তান এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খান্দানের সদস্যরা একের পর এক পালা করে কাদিয়ান এসে কয়েক মাস অবস্থান করবেন। পরবর্তিতে অবস্থা এমন হয়েছে যে আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং সিদ্ধান্ত হয়েছে পাকিস্তানে যারা আছে তারা পাকিস্তানেই থাকবে, যারা কাদিয়ানে আছে তারা কাদিয়ানেই থাকবে আর কেউ যাবে-আসবে না।

নিজের আকাঙ্খার উল্লেখ করতে গিয়ে মিয়া ওয়াসীম আহমদ সাহেব একবার বলেছেন।

আমার হৃদয়ের একান্ত ইচ্ছা ও দোয়া ছিল আমি কাদিয়ানে থেকেই যেন খিদমত করতে পারি। তাই এজন্য একবার আমি আমার জায়নামায নেই এবং কাদিয়ানের কস্রে খিলাফত এর বড় কক্ষে চলে যাই এবং সেখানে গিয়ে নফল আদায় করা আরম্ভ করি এবং বলা হয় যে, যদি দোয়া কবুল হওয়ার থাকে তাহলে আল্লাহ্‌ তা’লা তার জন্য উপকরণ সৃষ্টি করেন। এত অনুনয়-বিনয় বা কাতরতার সাথে আমি দোয়া করার সুযোগ পাই যাতে মনে হচ্ছিল যে খোদা তা কবুল করবেন।

আমি দোয়া করি আর খোদাতা’লাকে বলি, আমি কাদিয়ান থেকে যাবো না তুমি কোন ব্যবস্থা কর। তারপরে বলেন, কাদিয়ানের অমুসলমানরা সরকারের কাছে অভিযোগ করেছে যে, এই দল এখানে যাওয়া আসা করেই যাচ্ছে। এখানে আসলে এখানকার হয়ে যায় আর পাকিস্তানে গেলে এরা পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রদর্শণ করে, এরা একাজই করে। তাই এই রীতি বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। সুতরাং তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করে যে, কেউ যাওয়া-আসা করতে পারবে না আর এভাবেই মিয়া সাহেব স্থায়ীভাবে কাদিয়ানের বাসিন্দা হয়ে যান আর আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দেন।

সেখানকার বিরাজমান পরিস্থিতিতে কিভাবে ছিলেন আর প্রয়োজনে আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে কিভাবে ধৈর্য্য এবং সাহসের সাথে কষ্ট সহ্য করার সামর্থ দিয়েছেন ত্যাগের সেসকল কথার কিছু এখন তুলে ধরছি। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৫২ সনে হযরত উম্মুল মু’মেনীন নুসরত জাহান বেগম সাহেবা (রা:) যখন পরলোক গমণ করেন। পরিস্থিতি অনুকূল না হবার কারণে তিনি পাকিস্তান যেতে পারেন নি আর ভারতে বসে তিনি একাই সেই শোক সয়েছেন। আমার জানা মতে সে সময় তিনি পড়াশোনার কারণে লক্ষ্ণৌ অবস্থান করছিলেন। কিছু সময়ের জন্য তফসীরের জ্ঞান লাভের জন্য হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) তাঁকে লক্ষ্ণৌ পাঠিয়েছিলেন আর সেখানে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রও অধ্যয়ন করেছিলেন।

হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এরও, নিজের এই সংগ্রামী দরবেশ ছেলের প্রতি তাঁর ত্যাগের কারণে গভীর মমতাপূর্ণ টান ছিল আর এই যে ঘটনা আমি বর্ণনা করলাম, যখন তিনি (রা.) বিবাহের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান এসেছিলেন কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে বলেছিলেন, এখনই ফিরে যাও। তিনি (রা.) যখন প্লেনের টিকিট পেয়ে গেলেন আর প্লেনে যাত্রার দু’দিন মাত্র বাকি ছিল, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) তা জানতে পেরে নিজেই লাহোর চলে আসলেন। এটি বলেন নি যে, দু’দিন বাকি আছে রাবোয়ায় এসে তারপর যাও বরং মিয়া সাহেবকে বলেছিলেন, ওখানেই থাকো আমি আসছি। তিনি স্বয়ং লাহোর আসেন বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং নসীহত প্রদান করেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে বিদায় জানান এবং দোয়া দেন আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে ভালোভাবে কাদিয়ান পৌঁছান আর তাঁকে মসীহ্‌র আবাস স্থলের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের তৌফিক দিন।

হযরত ডাক্তার হাশমত উল্লাহ্ সাহেব পরবর্তিতে মিয়া সাহেবকে বলেছিলেন, মিয়া সাহেব নিজেই বলেছেন, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) ওয়ালটন এয়ারপোর্টে (সেসময় লাহোর এয়ার পোর্টের নাম ছিল ওয়ালটন) আমাকে প্লেনে উঠিয়ে দেয়ার সময় যতক্ষন পর্যন্ত প্লেন দৃষ্টির আড়ালে না গিয়েছে ততক্ষন প্লেনের দিকে তাকিয়ে দোয়ায় রত থেকেছেন।

হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর এই সম্পর্কের ব্যাপারে হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেবের বেগম সাহেবা বলেন,

কাগজ-পত্র যখন তৈরী হয়ে গেল এবং বিবাহের এক বছর পর আমি কাদিয়ান যাচ্ছিলাম তখন হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:) বিশেষভাবে আমাকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, উম্মে নাসের এর ঘরে থাকবে যেখানে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর ব্যাপক যাতায়াত ছিল আর এর আঙ্গিনাতে হুযূর দরসও দিয়েছিলেন (সম্ভবত: হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-ই দরস দিয়েছিলেন,স্পষ্ট নয়)

সদর আঞ্জুমানে আহ্‌মদীয়ার সম্পত্তি উদ্ধারের ক্ষেত্রেও হযরত মিয়া ওয়াসীম আহমদ সাহেবের খিদমত উল্লেখযোগ্য। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর পরিবারের সদস্য এবং তাঁর পৌত্র হবার সুবাদে সরকার এটিও বিবেচনা করেছে এবং সদর আঞ্জুমানের সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন নতুবা অনেক অজুহাত দেখাতে পারতো। এ কাজের জন্য তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ বরং সে সময় ভারতের প্রধান মন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর সাথেও যোগাযোগ করেছেন এবং আল্লাহ্‌ তা’লা করুণা করেছেন, এর ইতিবাচক ফল প্রকাশ পেয়েছে।

১৯৬৩ সনে তাঁর মাতা মোহতরামা সৈয়দা আযিযাহ্ বেগম সাহেবা মৃত্যূ বরণ করেন এবং অনেক কষ্টে তিনি পাকিস্তানে আসার অনুম���ি পা��� এবং দাফনের সময় তিনি পৌঁছতে পেরেছিলেন।

এরপর ১৯৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধ চলাকালে যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভারত এবং কাদিয়ানের সাথে চিঠি-পত্র এবং টেলিফোন ইত্যাদির যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল । তিনি বলেন যে,

হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর অসুস্থতার সংবাদও আমরা পাকিস্তান রেডিওর সংবাদ থেকে জানতে পেরেছিলাম আর মৃত্যূর সংবাদও অবহিত হয়েছিলাম পাকিস্তান রেডিওর বদৌলতেই । তারা জামাতের সাথে যোগাযোগের পরে শ্রীলংকা থেকে নিশ্চিত হয়েছিলেন।

যাইহোক হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর মৃত্যূর সময়ও তিনি কাদিয়ানেই ছিলেন। এ সম্পর্কে কেউ লিখেছেন, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর ইন্তেকাল হলে তিনি (রা.) সকল দরবেশদের কাদিয়ানের মসজিদে মোবারকে সমবেত করেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। এবং পরম দুঃখের মূহুর্তে কাদিয়ানের দরবেশদেরকে ধৈর্য্য এবং দোয়া করার উপদেশ দেন, এরপর তিনি বলেন,

সর্বদা আমার এই দোয়া এবং আকাঙ্খা ছিল, হে খোদা! যখনই হযরত আব্বাজান অর্থাৎ হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর শেষ মূহুর্ত আসবে তখন আমি যেন তাঁর পাশে উপস্থিত থাকতে পারি।

কিন্তু এমন অবস্থায় হুযূরের মৃত্যূ হয়েছে যে, আমার যাওয়া অসম্ভব। এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা’লা আমাকে একথা বুঝিয়েছেন যে, কাদিয়ান এবং ভারতের সকল আহ্‌মদী সদস্য হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর সন্তানের মতই, সবাই বিচ্ছিন্নতার শোকে মূহ্যমান তুমিও তাদের সাথে সেভাবেই বিচ্ছিন্নতার বেদনা সহ্য কর যেভাবে তারা করছে। আর তোমার কাদিয়ানে অবস্থান তাদের জন্য নিরাপত্তা ও সান্তনার কারণ হবে।

এরপর ১৯৭১ সনে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি হয় এবং বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা কাদিয়ানের আহ্‌মদী অধিবাসীদের জোর করে কাদিয়ান থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করে আর নিম্ন পদস্থ কমকর্তারা নির্দেশ জারি করে যে এরা বেরিয়ে যাক কিন্তু এর জন্য অজুহাত যা দেখিয়েছিল তা হলো, আমরা আপনাদের নিরাপত্তা বিধান করতে চাই, কাদিয়ানে থাকলে নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব নয়। তাই আহ্‌মদী মহল্লা এবং দারুল মসীহ্’র সব কিছু খালি করে দিন যেন আমরা আপনাদেরকে একস্থানে একত্রিত করতে পারি এবং সেখানে আপনাদের নিরাপত্তা দিতে পারি। আসলে নিরাপত্তা দেয়া উদ্দেশ্য ছিল না। আমার মনে হয় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছিল। ধারণা নয় বরং অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, তাদেরকে অর্থাৎ কাদিয়ানবাসীদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হত। সে সময়ও হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেব কাদিয়ানের সকল আহ্‌মদী সদস্যকে মসজিদ মোবারকে সমবেত করেন এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন,

এটি আমাদের স্থায়ী কেন্দ্র আমরা কখনই এটা পরিত্যাগ করবো না। তাদের ধারণা ছিল; এভাবে আহ্‌মদীরা খালি করবে আর আমরা সে স্থান দখল করে নিব। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটি আমাদের স্থায়ী কেন্দ্র আমরা কোন ক্রমেই একে পরিত্যাগ করবো না আজকের রাতটি কেবল আমাদের হাতে আছে। আপনাদের দোয়া দ্বারা খোদার আরশকে প্রকম্পিত করুন। যদি আমাদের সম্পর্কে সরকারের এটিই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে স্মরণ রেখো! একটি শিশুও স্বেচ্ছায় কাদিয়ানের বাইরে যাবে না। আমরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিবো কিন্তু পবিত্র স্থানগুলো ছেড়ে কাদিয়ানের বাইরে যাবো না (তিনি আরো বলেন যে আপনারা স্মরণ রাখবেন আমি নিজেও এখান থেকে বাহিরে যাবোনা কিন্তু যদি সরকারী কর্মচারীরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায় তাহলে নিতে পারে কিন্তু নিজ পায়ে হেঁটে আমি যাবো না। আপনাদের মধ্যে প্রত্যেক দরবেশ এবং তাদের সন্তানদেরও অবস্থান এরূপ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। হতে পারে যে, আমাকে নিয়ে যাবে আর বলবে যে, আমরা তোমাদের মিয়া সাহেবকে নিয়ে গেছি এজন্য তোমরাও চলো। তারা আমাকে নিয়ে গেলে নিয়ে যাক। আপনারা যাবেন না এবং জামাতের প্রতিটি সদস্যের মুখ থেকে এই আওয়াজই বের হওয়া উচিৎ যে, আমরা কাদিয়ান ত্যাগ করবো না।

লেখক বলেন, সেইরাতে কাদিয়ানের শিশুদের অবস্থাও এমন হয়েছিল যে, যেভাবে কেউ কারো সাথে চিমটে লেগে থাকে, সেভাবে যেন খোদাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। মসজিদ মোবারকের প্রতিটি কোণা এবং মসজিদ আকসার প্রত্যেক প্রান্ত, বেহেশতি মকবেরার সর্বত্র দোয়া হচ্ছিল আর বলা হয়, প্রত্যেক গৃহের দেয়াল এর সাক্ষী যে, দরবেশদের হৃদয় থেকে নির্গত ওই আহাজারি ও ক্রন্দন খোদার দরবারে কড়াঘাত করছিল। তাদের সিজদার স্থান ভিজে গিয়েছিল, তাদের মাথা খোদার সমীপে সমর্পিত ছিল। শত শত হাত খোদার দরবারে পাতা ছিল আর এভাবেই তারা দিন-রাত অতিবাহিত করেছে, পরিশেষে আল্লাহ্‌ তা’লা তাদের দোয়াসমূহকে গ্রহণীয়তার মর্যাদা প্রদান করেন, পরবর্তী দিন কিছু প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করতে আসেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা স্বয়ং কাদিয়ান আসেন এবং পবিত্র স্থান সমূহ্ পরিদর্শন করেন আর জেলা প্রশাসক ও অন্যান্যদের সুপারিশের ফলে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।

তাঁর দোয়া সম্পর্কে সেখানে বসবাসরত আমাদের একজন মোবাল্লেগ আমাকে লিখেছেন, “কিছু দিন আমি দারুল মসীহ্‌তে থাকার সৌভাগ্য লাভ করি, অধিকাংশ সময় আমি দেখেছি যে, মিয়া ওয়াসীম আহমদ সাহেব রাতে বাইতুদ দোয়াতে বা অন্যান্য স্থান যেখানে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) দোয়া করতেন সেখানে দোয়াতে নিমগ্ন থাকতেন”।

যেভাবে আমি বলেছি, ১৯৭৭ সনে হযরত মৌলভী আব্দুর রহমান জাট সাহেবের মৃত্যূর পর হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে:) তাঁকে আমীর মোকামী এবং নাযের আলা মনোনীত করেন। এভাবে তিনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব লাভের মাধ্যমেও জামাতের খিদমত করেছেন।

১৯৮২ সনে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে:) ওফাত লাভ করেন। সে সময়ও তিনি রাবওয়া আসতে পারেন নি, তাঁর বড় দু মেয়ের বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। ছোট মেয়ে এবং ছেলে সম্ভবত তাঁর সাথে ছিল। তাঁর মেয়ে আমাতুর রউফ এর বিবৃতি হচ্ছে,

খিলাফতের প্রতি আব্বার একান্তই গভীর অনুরাগ ছিল এবং হুযূরের মৃত্যূর একদিন পূর্বে একটি চিঠি নিয়ে তিনি আম্মা এবং আমার কাছে আসেন আর বলেন, এটি পাঠ করো এবং এর উপর স্বাক্ষর করে দাও। অর্থাং স্ত্রী এবং মেয়ের কাছে নিয়ে যান তাদের স্বাক্ষরের জন্য। এতে নাম বিহীন খলীফাতুল মসীহ্ রাবে’র হাতে বয়াত গ্রহণ সম্পর্কে লেখা ছিল। খলীফাতুল মসীহ্ রাবে লিখে বয়াত করেছিলেন যে, এটি আমি এখনই পাঠাচ্ছি। এই মেয়ে বলেন, আমি বললাম; আব্বা এখনও তো খলীফার নির্বাচন হয়নি, আমরা জানি না কে খলীফা হবেন? তিনি (রা.) বলেন, আমি খলীফার চেহারা দেখে বয়াত করবো না বরং আমিতো হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর খলীফার বয়াত করবো। আল্লাহ্‌ তা’লা যাকেই খলীফা বানাবেন আমি তাঁর হাতেই বয়’আত করবো। তাই আমি এই পত্র লিখেছি আর তা পাঠাচ্ছি যেন খেলাফতের নির্বাচন যখন হবে তখন আমার বয়াতের চিঠিও সেখানে পৌঁছে যায়।

খিলাফতের প্রতি এই ছিল তাঁর ভালবাসা, প্রেম আর বুৎপত্তি। আল্লাহ্ করুন সবাই যেন তা লাভ করতে পারে।

বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। অনেক আপনজনও তাঁকে বিভিন্ন দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল কিন্তু অত্যন্ত সাহস ও ধৈর্য্যরে সাথে তিনি সব কিছু সহ্য করেছেন। বরং শুনেছি, সে সকল বিরুদ্ধবাদীদের মধ্য থেকে অনেকে তাঁর মৃত্যূতে শোক প্রকাশের জন্যও এসেছিল।

জামাতের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সময় তিনি সমগ্র ভারত সফর করেন এবং জামাতসমূহকে সংগঠিত করেছেন, তাদেরকে যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্ রাবে (রাহে:)-এর সফরের প্রাক্কালে তিনি ব্যবস্থাপনার সমুদয় দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পাদন করেন। এরপর ২০০৫ সনে যখন আমি সফরে যাই তখন তাঁর শরীর খুবই খারাপ ছিল, দূর্বলতাও বোধ করতেন ভয়াবহ ইনফেকশান হয়ে গিয়েছিল বলে জলসার প্রথম অধিবেশনে তাঁর সভাপতিত্ব করার কথা ছিল, অসুস্থ ছিলেন আর জ্বরও ছিল, তা সত্বেও আমার কাছ থেকে যেহেতু মঞ্জুরী নেয়া হয়েছিল, তিনিই তাতে সভাপতিত্ব করেন। ঘটনাক্রমে যখন ঘরে এসে আমি এমটিএ দেখলাম তখন সংবাদ পাঠালাম, “আপনি অসুস্থ তাই দায়িত্ব অন্য কাউকে দিয়ে ফিরে আসেন”। তিনি একথা বলেন নি, “আমার জ্বর, আমি অসুস্থ বসতেও পারি না; প্রচন্ড দূর্বলতাও ছিল, কিন্তু যেহেতু যুগ খলীফার পক্ষ থেকে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য আমার নাম মঞ্জুর হয়েছে তাই করতে হবে”। যাই হোক, সংবাদ পাওয়ার পর তিনি চলে আসেন। বসার মত অবস্থাই ছিল না। অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। আমি দেখেছি আমাদের আবাসনের ব্যবস্থা যেখানে করা হয়েছিল সেখানে ছোট-খাট কিছু কাজ করার প্রয়োজন রয়ে গিয়েছিল। মিস্ত্রীদের নিয়ে এসে স্বয়ং দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করিয়েছেন। যদিও শরীর তখনও যথেষ্ট দূর্বলই ছিল। খিলাফতের সাথে গভীর অনুরাগের কিছু কথা আমি এখন বললাম পরে আরো কিছু বলবো।

তিনি গভীর ভাবে খোদা নির্ভর ছিলেন। আল্লাহ্‌ তা’লার সাথে একান্ত ভালবাসার সম্পর্ক ছিল তাঁর। মহানবী (সা:) এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে প্রগাঢ় ভালবাসা রাখতেন। পরবর্তীতে খিলাফতের সাথেও সেই ভালবাসাই ছিল এবং খিলাফতের প্রতি একান্ত আনুগত্য এবং বিশ্বস্ততার সম্পর্ক ছিল। মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা পোষণ করতেন। খিদমতের প্রেরণা ছিল। মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাহাবীদেরকে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। দরবেশদের প্রতি তাঁর গভীর ভালবাসা ছিল বরং একবার কেউ দরবেশদের সম্পর্কে এমন কোন উক্তি করে বসে যা তিনি অপছন্দ করেন এবং এতে অসন্তোষ ব্যক্ত করেন যদিও তাঁর স্বভাব এমনই ছিল না যে যাতে মনে হয়, তিনি কখনও অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু দরবেশদের জন্য তাঁর আত্মাভিমান এরূপই ছিল যে, তিনি তা সহ্য করতে পারেন নি।

অতিথিসেবা তাঁর অনেক বড় এক বিশেষত্ত্ব ছিল। রাতের বেলা যদি কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে আসতো তাহলে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ ও আনন্দের সাথে সাক্ষাত করতেন। তাঁর বেগম সাহেবা বর্ণনা করেন যে,

দু’ঈদের সময় বিশেষভাবে বিধবাদের সাথে স্বাক্ষাত করতে এবং তাদেরকে উপহার দিতে আমাকে পাঠিয়ে দিতেন। পুরুষ বা মহিলা যে কেউ অসুস্থ হলে তাদের খোঁজ-খবর নিতেন আর কেউ বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অমৃতসর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। দরবেশদেরকে তিনি একেবারেই নিজ সন্তানদের ন্যায় প্রতিপালন করেছেন। অতিথি সেবার ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁর সহধর্মিনী বলেন, আমরা হয়তো অনত্র তিন মাস কাটিয়ে ঘরে ফিরেছি, তখনও কোন অতিথি এলে তিনি বলেন, অতিথি এসেছে নাস্তা-পানি পাঠাও। আমি বললাম সবে মাত্র আমরা এসেছি, জানি না ঘরে কিছু আছে কি নাই। কি পাঠাবো? উত্তরে মিয়া সাহেব বলেন, এধরনের উত্তর দেয়া উচিৎ নয়। খুঁজে দেখ। কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই, যাই হোক বিস্কুটের একটি প্যাকেট পাওয়া গেলে তাই পাঠানো হয়। এমনি প্রখর খুঁটি-নাটি বিষয়েরও প্রতি দৃষ্টি রাখতেন তিনি।

প্রথমে গয়ের আহ্‌মদীদের সাথে সম্পর্কের অবস্থা তেমনই ছিল (যা উল্লেখ করা হয়েছে)। তারপর এ সম্পর্কও এত মধুর ব্যাপকতা লাভ করে যে, সবাই তাঁকে ভালোবাসতো। ২০০৫ সনে যখন আমি সফরে যাই তখন আমরা হুশিয়ারপুরও গিয়েছিলাম। সেখানে বসবাসকারী গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাঁর কারণে আমাকেও তাদের গৃহে নিমন্ত্রণ করেন এবং একান্ত ভালবাসা প্রকাশ করেন। শিখ ও হিন্দুদের মধ্য থেকে যাদের সাথেই সাক্ষাত হতো সবাই তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করতো এবং তাঁর গুণের উল্লেখ করতো। এখন তাঁর মৃত্যূ সংবাদ পেয়ে অনেক শিক্ষিত শিখ, হিন্দু, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, উকিল, দরিদ্র মানুষজন এমনকি সংসদের একজন সাবেক স্পীকারও এসেছেন। সবার কথা-বার্তা আমি ভিডিও ক্যাসেটে শুনছিলাম। ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন এবং বলছিলেন যে, “এমন এক মানুষ ছিলেন তিনি, যিনি ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন আর আমাদেরকেও এটিই শিখিয়েছেন যে, মানবতার বন্ধনকে দৃঢ় করা প্রয়োজন। মানবিক সম্পর্ককে মজবুত করা উচিৎ”। সবাই প্রশংসা করছিলেন। অগণিত ছোট-ছোট ঘটনা আছে যা মানুষ আমাকে শোকবার্তায় লিখেছেন আমি যদি তা উল্লেখ করতে থাকি তবে বিবরণ অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।

হযরত মিয়া সাহেবের আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি খুবই মাপজোখ ও চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলতেন। কোথায়ও মুখ ফস্কে এমন কোন কথা যেন বেরিয়ে না যায়, যা জামাতের রীতি বহির্ভূত হতে পারে। কোথাও এমন কোন কথা না হয় যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এবং মহানবী (সা:)-এর মর্যাদার পরিপন্থি হতে পারে। কোথাও এমন কোন কথা যেন না হয় যাথেকে আত্মম্ভরিতা প্রকাশ পায় বা যা দরবেশসুলভ বিনয়ের পরিপন্থি যা আমাকে আল্লাহ্ তা’লার কৃপা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

একবার কানাডাতে কেউ তাঁর কাছে দরবেশদের কুরবাণী এবং কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁর অনেক প্রশংসা করে। তিনি (রা.) বলেন,

দেখ! বাস্তব ঘটনা হলো, আমরা দরবেশরা কাদিয়ানের নিরাপত্তা বিধান করিনি বরং কাদিয়ানের পবিত্র স্থানসমূহ এবং সেখানে কৃত দোয়াসমূহই কেবলমাত্র কাদিয়ানেরই নয় বরং সেখানে বসবাসকারীদেরও হেফাযত করেছে।

এ-ই হচ্ছে, একজন মু’মেনের চিন্তা ও ভাবনা, যা কিছুই হয় আল্লাহ্‌ তা’লার অনুগ্রহে হয় তাই আল্লাহ্‌ তা’লা আমাদেরকে দোয়া করার সুযোগ প্রদান করেছেন এবং তাঁর প্রিয় মসীহ্‌র প্রিয় জনপদকে সকল অনিষ্ট থেকে কেবল তাঁর কৃপায় রক্ষা করেছেন। আমাদের দোয়াসমূহকে কবুল করতঃ পবিত্র স্থান সমূহের পাশাপাশি আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। একজন শোকবার্তা লিখেছেন তাতে এ বাক্যটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে, “তিনি সংগ্রামী মহিমায় দরবেশসুলভ জীবন অতিবাহিত করেছেন”, বাস্তবেও এরূপই ছিল।

আর্থিক কুরবানীর ক্ষেত্রেও সাধ্যমত উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে অংশ গ্রহণ করতেন। যুগ খলীফার পক্ষ থেকে যে কোন তাহরীকই করা হত না কেন, প্রথমে নিজে অংশ নিতেন তারপর জামাতের মনোযোগ আকর্ষণ করতেন। মৃত্যূর কয়েক দিন পূর্বে আমাকে লিখেছেন, আমি খিলাফত জুবিলীর জন্য এক লক্ষ রুপী প্রদানের ওয়াদা করেছিলাম কিন্তু আদায় করতে ভুলে গিয়েছিলাম। অত্যন্ত কৈফিয়তমূলক পত্র লিখেছিলেন এবং লিখেছেন আলহামদুলিল্লাহ্ যে যথা সময়ে আমার মনে পড়েছে আর আজ আমি তা আদায় করে দিয়েছি এবং মৃত্যূর মাত্র কয়েক দিন পূর্বেই এই হিসাবও পরিশোধ করে গেছেন। ওসীয়্যতের আদায় যথারীতি করতেন। হিস্যায়ে জায়েদাদের ১/৯ ভাগও নিজ জীবদ্দশায়ই পরিশোধ করে গেছেন। দরবেশদের দেখাশোনার কথাতো আমি পূর্বেই বলেছি।

খিলাফতের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে আমি পূণরায় বলছি। যদি কোন নির্দেশ বা দিক নির্দেশনা যেতো তাহলে হুবহু যেভাবে বলা হতো সেভাবে দ্রুত তা পালন করতেন। অনেকের অভ্যাস থাকে যে, যদি কোন বাক্য সুস্পষ্ট না হয় তাহলে ব্যাখ্যা করা আরম্ভ করে। যে কথার দু’টি অর্থ হতে পারে তারমধ্য থেকে যে অর্থ নিজ ইচ্ছা মত হয় তা গ্রহন করে। তিনি দ্রুত বুঝতে পারতেন যে, যুগ খলীফার উদ্দেশ্য কি?

আমি পূর্বেও বলেছি, যুগ খলীফার কোন নির্দেশ এলে প্রয়োজনে অসুস্থতা সত্বেও স্বয়ং গিয়ে পালন করাতেন। সম্প্রতি দেড় বছর পূর্বে যে ভূমিকম্প হয়েছিল এর ফলে মসজিদে আকসারও খানিকটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মসজিদ মেরামতের কাজ চলছিল। এখান থেকে প্রকৌশলীরাও গিয়েছেন। সেখানকার মাটি সম্পর্কে আরো কি জরিপ চালানো যায় তা মাটি খনন করে দেখা দরকার ছিল। এই কাজ মিয়া সাহেব ছাড়াও হতে পারতো কিন্তু তিনি সে সময়ে ঘটনাস্থলে যান, নিজ দায়িত্বে এই কাজ সম্পন্ন করান। যে প্রকৌশ��ী এখান ���েকে গিয়েছিলেন হেসে তাঁকে বলেন, “হযরত সাহেবকে আমার সম্পর্কে বলবেন যে আমি এখানে উপস্থিত ছিলাম। একথা বলবেন যে, আমি হাটতে পারছিলাম না কিন্তু তা সত্বেও আমি এখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম”। কোন লৌকিকতা ছিল না যে, আমি অসুস্থ হওয়া সত্বেও এখানে এসেছি। অনুগ্রহ স্বরূপ নয় বরং যুগ খলীফার দোয়া পাবেন এজন্য এসেছিলেন। খিলাফতের সাথে এরূপ প্রসার ছিল তাঁর সম্পর্ক।

সম্প্রতি কয়েক মাস পূর্বে অসুস্থতা সত্বেও কাশ্মীরে ব্যাপক সফর করেন এবং সর্বত্র খিলাফতের সাথে নিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারে মানুষকে উপদেশ প্রদান করেন।

এ ছাড়া দোয়ার জন্য মানুষ তাঁকে যে চিঠি-পত্র লিখতো, তাঁকেই সম্বোধণ করে চিঠি লিখতো কিন্তু যদি তিনি মনে করতেন যে, এই চিঠি খলীফায়ে ওয়াক্তের কাছে যাওয়া উচিৎ তাহলে এখানে পাঠিয়ে দিতেন যেন তাদের জন্য দোয়া হয় আর এখান থেকেও যেন উত্তর যায়। তিনি আমাকে লিখেছেন, কিছুদিন আগে রোগ অনেক বেড়ে গিয়েছিল তিনি ভালোভাবে কাজ করতে পারছিলেন না তাই কিছু দিনের জন্য অন্য কাউকে নিযুক্ত করুন এবং তার উপর দায়িত্ত্ব ন্যস্ত করুন। প্রত্যুত্তরে আমি তাঁকে লিখেছিলাম কাউকে দায়িত্ব দেয়ার প্রয়োজন নেই। যার কাছ থেকে ইচ্ছে কাজ নিন, নাযের আলা আপনিই থাকবেন। এখন আমার মনে হয় যে তিনি নিজেকে কষ্টে নিপতিত করেও এই কাজ করতে থাকেন এবং তাঁর মৃত্যূর পর সম্প্রতি একটি বিষয়ের রিপোর্ট আমি পেয়েছি। এতে ২৫শে এপ্রিল তারিখে তিনি স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সেসময়ও যেদিন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আর ভয়াবহ Infection ছিল। জ্বরের তাপমাত্রা ছিল ১০৪-১০৫ ডিগ্রী। কিন্তু পুরো রিপোর্ট দেখে তারপর স্বাক্ষর করেছেন।

আল্লাহ্‌ তা’লা হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা:)-এর এই সন্তান এবং তাঁর (রা:)-এর নিদর্শনের পদমর্যাদা উন্নত করুন যিনি তাঁর দরবেশ হিসেবে নিজ অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন, খুব ভালোভাবে পুরো করেছেন। স্বভাবতই তাঁর মৃত্যুর পরে আমার চিন্তা হলো যে, একজন প্রবীণ কর্মী আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। তিনি কেবল আমার মামাই ছিলেন না বরং আমার একটি শক্তিশালী হাতও ছিলেন। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে আমার জন্য পরম সাহায্যকারী বানিয়েছিলেন। যাই হোক চিন্তিত ছিলাম তারপর আল্লাহ্‌ তা’লার ব্যবহার এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে কৃত খোদাতা’লার প্রতিশ্রুতি দেখে আশ্বস্ত হয়েছি। আল্লাহ্‌ তা’লা ইনশাআল্লাহ্ চির রীতি অনুসারে নিজ কৃপায় এই শূণ্যতা পূর্ণ করবেন এবং পূর্বের তুলনায় আরো বড় ত্যাগী সাহায্যকারী দান করবেন আর তিনি তা করেনও।

আল্লাহ্‌ তা’লা দরবেশদের সন্তানদের এবং কাদিয়ানে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে এরূপ ত্যাগী দরবেশদের নেক কর্মসমূহকে জীবন্ত রাখার তৌফিক দিন আর বর্তমানে তাদের মাঝে যে ক’জন দরবেশ আছেন তাদের সেবা করার তৌফিক দিন। কাদিয়ানে বসবাসকারী প্রত্যেক আহ্‌মদী সেই মর্যাদাকে অনুধাবন করুন যা ‘দিয়ারে মসীহ্’তে বসবাসকারীদের হওয়া উচিৎ। প্রবীণরা যখন চলে যান নব প্রজন্মের তখন দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায় আর জীবন্ত জাতির নব প্রজন্ম সেই দায়িত্বাবলী সুচারুভাবে সম্পাদনের চেষ্টা করে।

আমি আশা করি, কাদিয়ানে বসবাসকারী সকল ওয়াকফে যিন্দেগী এবং কর্মকর্তারা পূর্বের চেয়ে পরস্পরের প্রতি আরো বেশি প্রেম-প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করবেন আর এভাবে তারা ত্বাকওয়া ও পূণ্যে উন্নতি করবেন। কাদিয়ানে বসবাসকারী প্রত্যেক আহ্‌মদী হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর আধ্যাত্মিক সন্তান হবার সুবাদে সেই দায়িত্ব পালন করবেন আর যেভাবে আমাদের এই বুযূর্গ সে সকল স্থানে সেজদাবনত হয়েছেন যেখানে যুগ মসীহ্ সেজদা করেছেন আর সেই স্থানকে নিজ দোয়ায় ভরে দিয়েছেন, আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর সাথে সে সকল স্থানের উন্নতির প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তাই এরা (নব প্রজন্ম) যারা সেখানে বসবাস করছে সে সকল স্থানে যাবে আর পূর্বের তুলনায় আরো বেশি আল্লাহ্‌ তা’লার সমীপে সেজদাবনত হবে, দোয়া করবে, তাঁর কৃপা লাভের চেষ্টা করবে আর আমার এ দুঃশ্চিন্তা দূর করবে যে, কাদিয়ানে নেকী আর ত্বাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পাদনকারী লোকদের সংখ্যা কমছে-নয়, বরং এই আনন্দের সংবাদ পাবো যে, তাক্বওয়ায় অগ্রগামী মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলছে। আল্লাহ্‌ তা’লা তাদেরকে এর তৌফিক দিন।

বিশ্বের জামাতগুলোর কাছেও কাদিয়ানের প্রাপ্য আছে, এ জনপদে বসবাসকারীদের জন্য প্রত্যেক আহ্‌মদী দোয়া করুন আল্লাহ্‌ তা’লা যেন সর্বদা ‘মসীহ্‌র জন্মস্থান’-এর অধিকার প্রদানকারী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে থাকেন। হযরত মিয়া সাহেবের সহধর্মীনির জন্য দোয়া করুন। তিনিও অসুস্থ থাকেন, আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকেও সাহস ও মনোবল দিন এবং এই শোক সইবার তৌফিক দিন। তিনিও অত্যন্ত কল্যাণময় সত্ত্বা। তিনি জামাতের মহিলাদেরকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে, তাদের প্রতি সহানূভুতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং রাখছেন। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁকে সুস্বাস্থ্যময় ও শান্তিপূর্ণ জীবন দান করুন। তাঁর সন্তানদেরকেও শ্রদ্ধেয় বুযূর্গ পিতার পদাঙ্ক অনুসরণের তৌফিক দিন, যদিও তাদের কেউই কাদিয়ানে নেই। মেয়েরা বিয়ের পর পাকিস্তান চলে গেছে এবং এখন তারা পাকিস্তানের নাগরিক। তাঁর ছেলে আমেরিকাতে থাকে কিন্তু যেখানেই থাকুক না কেন মহান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণকারী যেন হয় আর সে সকল গুণাবলী অর্জনের চেষ্টা করে যা তাদের পিতার মাঝে ছিল।

হুযূর আনোয়ার (আই:) সানী খুতবার সময় বলেন, আমি যেভাবে বলেছিলাম যে, অনেক অ-আহ্‌মদী বরং ব্যাপক সংখ্যক অ-আহ্‌মদী এসেছেন এবং মিয়া সাহেবের মৃত্যূতে শোক প্রকাশ করেছেন। কাদিয়ানের ব্যবস্থাপকগণ আমার এই খুতবা শুনছেন, আমার পক্ষ থেকে তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আল্লাহ্‌ তা’লা তাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।

(জুমুআ নামাযের পর হুযূর আনোয়ার (আই:) হযরত সাহেবজাদা মির্যা ওয়াসীম আহমদ সাহেবের গায়েবী জানাযার নামায পড়ান)

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে