In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘আল্‌ কুদ্দুস’

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২০শে এপ্রিল, ২০০৭ইং

“কুরআন শরীফের অর্থ করার সময় সর্বদা এ নিয়মের প্রতি দৃষ্টি রেখো এর কোন অর্থ যেন ঐশী গুণাবলীর পরিপন্থী না হয়।”

“যে অর্থই কর, দৃষ্টি রাখ কোথাও তা খোদার ‘কুদ্দুস’ বৈশিষ্ট্যের বিরোধী নয় তো!”

“খোদা কুদ্দুস কিন্তু মানুষ ‘কুদ্দুস’ আখ্যায়িত হতে পারে না কেননা, খোদাতা’লা আপন সত্ত্বায় নিষ্কলঙ্ক আর মানুষ সাধনা করে কালিমা মুক্ত হয়।”

“এটিই ছিল মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্রকরণ শক্তি যা মাটি থেকে তুলে নিয়ে সাহাবীদেরকে আকাশের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। নিজেদের কর্মপদ্ধতি দ্বারা প্রমাণ করুন যে, আপনারা কুদ্দুস খোদার বান্দা; পবিত্র গ্রন্থের মান্যকারী, পবিত্র রসূল (সাঃ)-এর অনুসারী ও তাঁর খলীফা এবং বিশেষভাবে এই মহান মুজাদ্দিদ অর্থাৎ হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর অনুসারীরা এমনই।”

“স্মরণ রেখো! খোদা কুদ্দুস, তাই কেবল পবিত্ররাই তাঁর নৈকট্য লাভ করবে।”

“আল্লাহ্‌তা’লার কুদ্দুস বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন অর্থ আছে; আর এ বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণমন্ডিত হবার প্রেক্ষাপটে জামাতের সদস্যদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা।”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্‌তা’লার এক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘কুদ্দুস’। বিভিন্ন অভিধানে এ শব্দের যে অর্থ লিখিত রয়েছে এবং অভিজ্ঞ মুফাস্‌সেরগণ যে তফসীর করেছেন তা থেকে কয়েকজন প্রসিদ্ধ তফসীরকারকের সংক্ষিপ্ত তফসীর ও অর্থ আমি উপস্থাপন করছি।

তাজুল উরূসে লিখিত আছে, ‘আল্‌ কুদ্দুস’ আল্লাহ্‌তা’লার অনুপম নামগুলোর একটি আর ‘আল কুদ্দুস’ এর অর্থ হচ্ছে ‘আত্‌ত্বাহের’ অর্থাৎ সকল দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত এক সত্ত্বা, ‘আল্‌ মুবারক’ অর্থাৎ কল্যাণময়, যার সত্ত্বায় সকল প্রকার কল্যাণ পুঞ্জীভূত এবং ‘আত্‌ তাক্বদিস’ এর মর্মার্থ হচ্ছে, ‘আত্‌তাত্বহির’ মহাসম্মানিত ও পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌কে পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক সাব্যস্ত করা।

মুফরাদাতে ইমাম রাগেব লিখেছেন, ‘আত্‌ তাক্বদিস’ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে প্রদত্ত সেই পবিত্রতা, সেই শুচি বা শুদ্ধতা যা খোদাতা’লার বাণী ‘ওয়া ইউত্বাহ্‌হিরুকুম তাত্বহীরা’-তে উল্লেখিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য বাহ্যিক নোংরামি দূর করা নয় বরং ভিন্ন আয়াত থেকে প্রমাণিত যে, মানবীয় প্রবৃত্তির পবিত্রতা সাধন হলো এর উদ্দেশ্য।

আকরাবুল মাওয়ারেদে লিখিত আছে, কুদ্দুস এমন সত্ত্বা যিনি পবিত্র এবং যাবতীয় কালিমা ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র; সম্পূর্ণরূপে পুত-পবিত্র অর্থাৎ সবদিক থেকেই যাকে পবিত্র করা হয়েছে। এরপর ‘আল কুদ্‌স’ এর অর্থ লিখেছেন, পবিত্রতা ও কল্যাণ। লিসানুল আরবে প্রায় এরূপ অর্থই করা হয়েছে। এ হলো কয়েকটি প্রসিদ্ধ আরবী অভিধানে কৃত অর্থ।

হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) এসব অভিধান থেকে যে অর্থ গ্রহণ করেছেন তা হলো, ‘আল কুদ্দুস’ যাবতীয় পবিত্রতার সমাহার অর্থাৎ কেবল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্তই নয় বরং সব ধরনের প্রশংসাসূচক গুণাবলীও নিজের মাঝে ধারণ করেন। অর্থাৎ আল্লাহ্‌তা’লা সেই পবিত্র সত্ত্বা যাঁর মাঝে সর্বপ্রকার পবিত্রতার সমাহার ঘটেছে। সব ধরনের কালিমা থেকে তিনি মুক্ত। আল্লাহ্‌তা’লার সত্ত্বায় কোন প্রকার দোষ-ত্রুটি থাকার প্রশ্নই উঠে না আর মানুষ কল্পনা করতে পারে এমন কোন গুণ নেই যা তাঁর মাঝে বিদ্যমান নেই। এক কথায় মানব চিন্তাশক্তি যে সকল গুণাবলীকে আয়ত্ব করতে পারে এবং সে সকল গুণাবলী যা মানবিক চিন্তাশক্তির বাহিরে সবই তাঁর মাঝে পুঞ্জিভূত রয়েছে; এটিই সেই পবিত্র সত্ত্বার শ্রেষ্ঠত্ব।

এখন এই বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে কয়েকজন তফসীরকারকের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছি। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, ফিরিশতারা আল্লাহ্‌তা’লাকে বলেন,  نُقَدِّسُ لَكَ (নুক্বাদ্দিসু লাকা)। তফসীর ‘মাজমাউল বায়ানে نُقَدِّسُ لَكَ ’ (নুক্বাদ্দিসু লাকা)-র অর্থ করা হয়েছে, হে আল্লাহ্‌! ত্রুটিযুক্ত সেই সব বৈশিষ্ট্য যা তোমার মর্যাদার পরিপন্থী আমরা তোমাকে এমন সব বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র ঘোষণা করছি আর ত্রুটিযুক্ত কোন বিষয়ই তোমার প্রতি আরোপ করি না। এ অর্থের আলোকে  نُقَدِّسُ لَكَ (নুক্বাদ্দিসু লাকা)-’য় বাড়তি ‘লাম’ বিষয়টির প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করতে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এই লামের অনুবাদও অন্তর্ভূক্ত করে কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, আমরা তোমার জন্য নামায পড়ি আবার কেউ অর্থ করেছেন, হে আল্লাহ্‌! আমরা আমাদের কামনা-বাসনাকে তোমার জন্য অর্থাৎ তোমারই সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করি।

অনুরূপভাবে এ প্রসঙ্গে আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী লিখেন,  وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ (ওয়া নাহনু নুসাব্বিহু বিহামদিকা ওয়া নুক্বাদ্দিসু লাকা) সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তি এ সন্দেহের অবতারণা করেছেন যে, ফিরিশতারা আদম সৃষ্টির সময় أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا  বলে আল্লাহ্‌তা’লার সমীপে আপত্তি উত্থাপন করেছিল। আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী এ সন্দেহের অপনোদন করে লিখেন, দু’টি কারণে এ সন্দেহ ভিত্তিহীন। প্রথমতঃ ফিরিশতারা ‘সৃষ্টির’ প্রতি খুন-খারাবী আর বিশৃঙ্খলা আরোপ করেছে, স্রষ্টার প্রতি নয়। দ্বিতীয়তঃ ফিরিশতারা তাদের এ কথার অব্যবহিত পরেই বলেছে, وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّ��ُ لَكَ (ওয়া নাহ্‌নু নুসাব্বিহু বিহামদিকা ওয়া নুক্বাদ্দিসু লাকা) আর ‘তসবীহ্‌’র অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্‌তা’লার সত্ত্বাকে সকল জড় বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত ঘোষণা করা, �����িত্র সাব্যস্����� ক��া আর ���াক্বদিস এর মর্মার্থ হলো আল্লাহ্‌তা’লার কর্মকান্ডকে নিন্দনীয় ও অজ্ঞতাজনিত বৈশিষ্ট্যের উর্দ্ধে রাখা।

অনুরূপভাবে আল্লামা রাযী কুদ্দুস বৈশিষ্ট্যের অর্থ করেন, ‘আল্‌কুদ্দুস’ ও ‘আল্‌কাদ্দুস’ (‘ক্বাফ’ বর্ণের উপর পেশ এবং যবর উভয়টি ব্যবহৃত হয়েছে) শব্দ আল্লাহ্‌তা’লার সত্ত্বা এবং বৈশিষ্ট্য, কাজ ও নির্দেশাবলী এবং নামসমূহের পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা বর্ণনায় বড়ই ভাবসমৃদ্ধ। এতে যথেষ্ট বাগ্মীতা রয়েছে আর এটি ব্যাপক অর্থবহ শব্দ। আল্লাহ্‌তা’লার সত্ত্বা অতীব নিষ্কলুষ যা অভিধান থেকেও প্রতিভাত। তাঁর বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলী যদি পরখ করতে চাও তাহলে ‘কুদ্দুস’ গুণের কথা স্মরণ রাখা উচিত।

হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ) এক স্থানে বলেছেন, পবিত্র কুরআনের সঠিক অর্থ যদি করতে হয় তাহলে আল্লাহ্‌তা’লার বৈশিষ্ট্যকে অবশ্যই দৃষ্টিগোচর রেখো। এক্ষেত্রে নিগুঢ়তত্ত্ব হলো; আল্লাহ্‌তা’লার ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্যের উপর যেন কোন আঁচ না লাগে। পবিত্র কুরআনের যে কোন ব্যাখ্যাই কর না কেন সর্বদা ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্যকে দৃষ্টিতে রেখো। অর্থাৎ সব দৃষ্টিকোনেই খোদাতা’লার সত্ত্বা নিষ্কলঙ্ক। এমন কোন ব্যাখ্যা বা তফসীর যেন না করা হয় যদ্দারা আল্লাহ্‌তা’লা যে ত্রুটিমুক্ত সে সত্যের উপর কোন আঁচ আসতে পারে। তাঁর প্রতিটি কর্ম ও নির্দেশ এ বৈশিষ্ট্যেরই নিরিখে কলঙ্কমুক্ত ও পবিত্র।

তফসীর রুহুল বায়ানে وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ‘এর ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে বিভিন্ন প্রকার নিয়ামতের একটি হলো, তোমার ইবাদতের তৌফিক লাভ করা। তাই আমরা তোমার প্রশংসা করে সেসব বিষয় যা তোমার মর্যাদার পরিপন্থী তা থেকে তোমাকে পবিত্র ঘোষণা করি। এই দিক দিয়ে তসবীহ্‌ ‘জালাল’ মহিমা ও প্রতাপ বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক আর হাম্‌দ ‘ইন’আম’ বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত। وَنُقَدِّسُ لَكَ ’র অর্থ লিখেন, মাহাত্ম্য ও সম্মানের যে অর্থই তোমার মর্যাদা সম্মত, তা আমরা তোমার মহিমাস্বরূপ বর্ণনা করছি আর যা তোমার মর্যাদার পরিপন্থী তা থেকে তোমাকে পবিত্র ঘোষণা করছি।

তফসীর ইবনে কাসীরে وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ’র আলোচনা প্রসঙ্গে কাতাদহ্‌ বলেন, এখানে তসবীহ্‌’র অর্থ হলো প্রচলিত তসবীহ্‌ আর তাক্বদীস এর অর্থ সালাত বা নামায। অনুরূপভাবে হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ (রাঃ) সহ অন্যান্য সাহাবীরাও এর অর্থ করেছেন, ‘নুসাল্লি লাকা’ অর্থাৎ হে খোদা! আমরা তোমার জন্য নামায পড়ি।

মুজাহিদ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ’র অর্থ করেছেন, ‘নুয়াজ্জিমুকা ওয়া নুকাব্বিরুকা’ অর্থাৎ, আমরা তোমার মহিমাকীর্তণ করি আর তোমার গরিমা বর্ণনা করি।

একইভাবে মুহাম্মদ বিন ইসহাকও অর্থ করেছেন, হে আল্লাহ্‌! আমরা না তোমার অবাধ্যতা করি আর না এমন কোন কাজে লিপ্ত হই যা তোমার অপছন্দনীয়। এরপর ‘তক্বদীস’ এর অর্থ ‘আত্‌তাযীম’ ওয়াত্তাত্‌হীর’ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা ঘোষণা করা, মাহত্ব এবং সব প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়ার স্বীকারোক্তিমূলক ঘোষণা দেয়া, এত্থেকেই ‘সবুহ্‌’ এবং ‘কুদ্দুস’ উদ্ভুত। ‘সবুহ্‌’র অর্থ আল্লাহ্‌তা’লাকে সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত জ্ঞান করা আর ‘কুদ্দুস’ এর অর্থ এ ঘোষণা করা যে, সকল প্রকার পবিত্রতা এবং সম্মান তাঁকেই শোভা পায়। এরপর তিনি আরও লিখেন, এ সকল আলোচনার আলোকে وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ ’র অর্থ দাঁড়াবে; হে আল্লাহ্‌! মুশরেকদের আরোপিত সকল প্রকার ভ্রান্ত অপবাদ থেকে আমরা তোমাকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করছি। এবং وَنُقَدِّسُ لَكَ -র অর্থ হে আল্লাহ্‌! অস্বীকারকারীদের বর্ণিত কদর্য অপবাদ ও আজে বাজে কথাবার্তা থেকে মুক্ত হওয়ার যে অনুপম বৈশিষ্ট্য তোমার মাঝে বিদ্যমান, আমরা তোমাকে সেসব বৈশিষ্ট্যের আধার হিসেবেই জানি।

আমি একটু আগে ‘কুদ্দুস’ শব্দ সম্বন্ধে একজন তফসীরকারকের ব্যাখ্যায় হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি পেশ করেছিলাম। পুরো উদ্ধৃতিটি এরূপ, তিনি (রাঃ) বলেন,

‘এটি সত্য কথা যে, আকাশ এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই খোদাতা’লার পবিত্রতার গান গায়। প্রতিটি অনু সাক্ষ্য প্রদান করে যে, তিনি স্রষ্টা এবং তাঁরই প্রতিপালন, জীবনদান এবং স্থায়ীত্ব প্রদানের উপর সব কিছুর অস্তিত্ব এবং স্থায়ীত্ব নির্ভর করে।’ অর্থাৎ, প্রত্যেকের জীবনকাল রয়েছে আর তা স্থিতিশীল। ‘তাঁরই প্রদত্ত সুরক্ষায় সবকিছু নিরাপদ। এরপর তিনি ‘আল্লাহুল মালিক’ও বটে অর্থাৎ তিনি সর্বাধিপতি। শাস্তি যদি দেন তাও রাজাধিরাজের মত, যদি ধৃতও করেন তবে অত্যাচারীর মত নয় বরং রাজাধিরাজরূপেই, যেন ধৃত ব্যক্তির সংশোধন হয়।’ অর্থাৎ, যাকে ধৃত করা হয় তাকে সংশোধনের জন্যই তিনি ধৃত করেন। ‘তিনি কেমন? তিনি ‘আল্‌কুদ্দুস’। তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীতে এমন কিছু নেই যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। বরং তিনি পরিপূর্ণ গুণাবলীর অধিকারী আর সর্ব প্রকার দোষত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে মুক্ত অর্থাৎ ‘আল্‌কুদ্দুস’। হয় পবিত্র কুরআনের প্রতি মনযোগ না দেবার কারণে অথবা আল্লাহ্‌তা’লার নামের তাৎপর্য না বুঝার কারণেই মূলতঃ এক ভ্রান্তি দেখা দিয়েছে যে, কখনও কখনও আল্লাহ্‌তা’লার কোন সুন্নত বা গুণবাচক নামের এরূপ অর্থ করা হয়ে থাকে যা তাঁর অপর বৈশিষ্ট্যের সাথে সংঘাতপূর্ণ হয়। এজন্য আমি তোমাদেরকে এক উপায় বাতলিয়ে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের অর্থ করার ক্ষেত্রে সর্বদা এ বিষয়ে দৃষ্টি রেখো যে, কখনও এমন কোন অর্থ যেন করা না হয় যা ঐশী গুণাবলীর পরিপন্থী। আল্লাহ্‌তা’লার পবিত্র নামসমূহ্‌ দৃষ্টিপটে রাখো আর এমন যে কোন অর্থ করার ক্ষেত্রে দেখো যে, ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ এ কোন আঁচড় লাগছে না-তো? অভিধান অনুযায়ী একটি শব্দের বহু অর্থ হতে পারে। আর নোংরা চিন্তাধারার এক ব্যক্তি ঐশী বাণীর কদর্য অর্থও প্রস্তাব করতে পারে আর ঐশী পুস্তকের বিরুদ্ধে আপত্তিও করে বসে। তোমরা সর্বদা একথা স্মরণ রেখো, অর্থ যা-ই করো তাতে পরখ করে নাও যে খোদার ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী হয়নি তো? আল্লাহ্‌তা’লার সমস্ত বাণী, সত্য ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকে যদ্দারা তাঁর এবং তাঁর রসূল ও সাধারণ মু’মিনদের সম্মান ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।’ (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত-হাকায়েকুল ফুরকান, ৪র্থ খন্ড-৮৩-৮৪ পৃষ্ঠা)

এ প্রসঙ্গে হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ) জামাতকে যে উপদেশ দিয়েছেন এখানে আমি তাও উল্ল্যেখ করছি। ‘অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ এ নসীহত যা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ধনী বা দরিদ্র অথবা পুরুষ বা নারী প্রত্যেক আহ্‌মদীর হৃদয়ে গেঁথে নেয়া উচিৎ কেননা আত্ম সংশোধনের জন্য তা অত্যন্ত আবশ্যক আর এর ফলে ইবাদতের প্রতিও ঝোঁক সৃষ্টি হবে এবং সৃষ্টির অধিকার প্রদানের প্রতিও দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে। তিনি (রাঃ) বলেন,

যারা অক্ষর জ্ঞানহীন নিদেনপক্ষে তাদের এমন হওয়া উচিত যে, তারা যেন নিজেদের আচার-আচরণ দ্বারা খোদাতা’লার নিষ্কলুষ হওয়ার স্বাক্ষর রাখে অর্থাৎ, নিজেদের কর্মকান্ড দ্বারা প্রমাণ করে দেয় যে, কুদ্দুস খোদার বান্দা, পবিত্র গ্রন্থের মান্যকারী, পবিত্র রসূলের (সাঃ) অনুসারী ও তাঁর খলীফাগণ এবং বিশেষভাবে এই মহান মুজাদ্দিদ [অর্থাৎ হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)] এর অনুসারী এমনই পবিত্র হয়ে থাকে। (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত-হা���ায়েকুল ফুরকান, ৪র্থ খন্ড-৩৭২-৩৭৩ পৃষ্ঠা)

সুতরাং হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর অনুসারীরা যেন এমনই হয়, তাই নিজেদের মাঝে এরূপ পবিত্র পরিবর্তনই সৃষ্টি করুন। খো��াতা’লাকে সকল দোষ-ত্রুটি, নোংরা�����ি থেকে পবিত্র জ্ঞান করা তখনই বস্তুনিষ্ঠ হবে যদি আমরা আমাদের প্রতিটি কথা ও কর্মে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে চলি। তিনি (আঃ) বলেন, এরজন্য অনেক বেশি ডিগ্রীধারী শিক্ষার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌তা’লার নির্দেশাবলী কি; তা একজন অশিক্ষিত নিরক্ষর আহ্‌মদীও জানে, বিভিন্ন খুতবা, বক্তৃতা এবং দরসে তারা শুনে থাকেন, কি-কি করার নির্দেশ রয়েছে আর কী করতে বারণ করা হয়েছে। মহানবী (সাঃ) আমাদের জন্য কী আদর্শ স্থাপন করে দেখিয়েছেন। একজন আহ্‌মদী কর্তৃক খোদাতা’লার ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ পাবে তখনই যখন সে নিজের মধ্যে পূত পরিবর্তন আনবে এবং পবিত্র হবে, আর তা’হলেই এ যুগের ইমামকে মান্য করা সার্থক হবে। তিনি (রাঃ) অন্যত্র বলেছেন,

‘স্মরণ রেখো! খোদা কুদ্দুস তাই পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ খোদার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না।’

সুতরাং আল্লাহ্‌তা’লার নৈকট্য লাভের জন্য পবিত্র হওয়া আবশ্যক আর নৈকট্য লাভের জন্য দোয়া গৃহীত হওয়ারও প্রয়োজন। তাঁর সমীপে সমর্পনের আবশ্যকতা রয়েছে কিন্তু এর পূর্বে স্বয়ং নিজেকে পবিত্র করারও চেষ্টা করে যেতে হবে।

এ বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) বলেন,

‘মানুষকে পুণ্য অর্জন করতে হয়’ অর্থাৎ, সৎ কর্ম করলে এর প্রতিদান লাভ হয় অথবা তার মধ্যে সে গুণ সৃষ্টি হয়। আর খোদার পুণ্য বা খোদাতা’লার সদগুণাবলী তাঁর আপন সত্ত্বার অংশ; তাই খোদাকে কুদ্দুস বলা হয়। মানুষকে কুদ্দুস বলা যেতে পারে না; কেননা তিনি অর্থাৎ খোদাতা’লার নিজ সত্ত্বা নিস্কলুষ ‘আর মানুষ -চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে পরিশুদ্ধ হয়। নিস্কলুষ হওয়ার এ বৈশিষ্ট্য তখন লাভ করবে যখন সাধনা করে ত্রুটিমুক্ত হবে। খোদাতা’লার সত্ত্বায় এমন কোন যুগ কাটেনি যখন তিনি অপূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত ছিলেন আর পরিপূর্ণ হবার চেষ্টা করেছেন! কিন্তু অপরদিকে মানুষ প্রথমে অপূর্ণ ও ত্রুটিযুক্তই থাকে তারপর ধীরে ধীরে উৎকর্ষতা লাভ করে। প্রথমে সে শিশু থাকে এরপর জ্ঞান বুদ্ধি হলে নামায পড়া আরম্ভ করে। এরপর একদিনের নামায তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায়, দ্বিতীয় দিনের নামায তাকে আরো কিছুটা অগ্রগামী করে তৃতীয় দিনের নামায তাকে আরো আগে বাড়িয়ে দেয়।’ এভাবে সে এগিয়ে যেতে থাকে। ‘কিন্তু খোদাতা’লা আজ থেকে কোটি কোটি বছর পূর্বে যেরূপ ছিলেন আজও তদ্রূপই আছেন। তাঁর ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ (পবিত্রতা) পূর্বেও কম ছিল না আর আজও বেড়ে যায়নি।’ (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত তফসীরে কবির, ৫ম খন্ড-২০৭ পৃষ্ঠা)

তাঁর ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ এবং সকল বৈশিষ্ট্যই অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ্‌তা’লার ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্য থেকে মু’মিন তখনই সত্যিকার অর্থে লাভবান হতে পারে যখন সেই ‘কুদ্দুস’ খোদা প্রদত্ত শিক্ষানুযায়ী একজন মু’মিন স্বীয় ইবাদত ও নেকীতে উন্নতি করে।

এরপর হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) বলেন, খোদাতা’লা’কে উদ্দেশ্য করে ফিরিশ্‌তাদের এ কথা বলা وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ  অর্থাৎ, আমরা তোমার প্রশংসাসহ মহিমা কীর্তণকারী এবং তোমার মাঝে সকল প্রকার গরিমা রয়েছে বলে স্বীকার করি, তাসত্বেও আদম সৃষ্টির প্রয়োজন কী ছিল? এর ব্যাখ্যায় তিনি (রাঃ) বলেন, ‘ফিরিশ্‌তাদের একথায় আল্লাহ্‌তা’লা বললেন, আমি যা জানি তোমরা তা জান না।’ অর্থাৎ তোমরা যেভাবে বলছ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে আমিও জানি তা ঠিক কিন্তু একটি বিষয় তোমাদের অজানা যে, এখন মানবীয় কাজ কর্ম শরিয়তের মাপকাঠিতে যাচাই হবে আর যারা শরিয়তের শিক্ষাধীন থাকবে এবং সেই মোতাবেক কাজ করবে এবং ‘কুদ্দুসিয়্যাত’ এর বৈশিষ্ট্য থেকে অংশ লাভের জন্য পুণ্য কর্মে অগ্রগামী হবে, তারা পরিশেষে ফিরিশ্‌তাদেরও ছাড়িয়ে যাবে। এ বিষয়টি ফিরিশতাদের জানা ছিল না।

এ বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) লিখেছেন,

‘এখানে সূক্ষ্ম একটি বিষয় স্মরণ যোগ্য আর তা হলো, আদমকে খলীফা নিযুক্ত করার সময় খোদাতা’লা যা কিছু বলেছিলেন তা সঠিক আর ফিরিশতারা যা বলেছিলেন তাও সঠিক ছিল যেভাবে পূর্বেই বলেছি। ‘এ কেবল দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল। যে সব পুণ্যাত্মারা আদমের বংশধরে জন্ম নিতে যাচ্ছিলেন আল্লাহতা’লার দৃষ্টি ছিল তাদের প্রতি এবং সেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় সৌন্দর্যের উপর যা আদম এবং তাঁর সাথীদের মাধ্যমে জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল; কিন্তু ফিরিশ্‌তাদের দৃষ্টি সেসব দুস্কৃতকারীদের প্রতি নিবদ্ধ ছিল যারা মানবীয় বুদ্ধি পূর্ণতালাভের পরও খোদাতা’লার অসন্তুষ্টির শিকারে পরিণত হচ্ছে। খোদাতা’লা আদম সৃষ্টির মাঝে মুহাম্মদীয় বৈশিষ্ট্যের ঝলক দেখছিলেন এবং ফিরিশ্‌তারা আবু জাহ্‌লীয় বৈশিষ্ট্যাবলীর কথা ভেবে কম্পমান ও হতবিহ্বল ছিল। ফিরিশ্‌তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আর যা কিছু ভেবেছিল যদিও তা যৌক্তিকই ছিল, তবে তাদের ঐ আশঙ্কা একটা ভ্রান্তি ছিল যে, এরূপ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের জন্য কোথায়ও অভিসম্পাতের না কারণ হয়ে যায়। কেননা কোন ব্যবস্থাপনার সৌন্দর্য, দুর্বলতা প্রদর্শনকারীদের মাধ্যমে নয় বরং তার উত্তম ফলাফল থেকে অনুমান করা যায়। মধ্যবর্তী কোন আশংকার কারণে যদি ভালো কাজ পরিত্যাগ করা হয় তাহলে কোন উন্নতি হতেই পারে না। প্রতিটি বড় কাজে কিছু ঝুঁকি থাকে।’ তিনি (রাঃ) দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলেন, ‘জ্ঞান অন্নেষণকারী জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রাণ দিয়ে দেয় তবুও জ্ঞানার্জন পরিত্যাগ করে না। একইভাবে দেশে দেশে সৈন্যরা প্রাণ হারায় কিন্তু নাগরিকেরা সেনাবাহীনিতে যোগ দেয়া বন্ধ করে না, বা বন্ধ হয়ে যায় না বা স্বদেশের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হয় না। সুতরাং খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফলে যেখানে মানুষের এক অংশ শাস্তিযোগ্য, নৈরাজ্যবাদী ও খুনী সাব্যস্ত হবার ছিল সেখানে অপর এক অংশ খোদাতা’লার প্রিয়ভাজন হবারও ছিল এমনকি ফিরিশ্‌তাদের চেয়েও বেশী উন্নতি করার ছিল। সেই সফলকাম অংশই মানবকূল সৃষ্টি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য আর সেই অংশের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে কেউ বলতে পারবে না যে, মানব সৃষ্টির এ ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়েছে বরং সত্য কথা হলো, এ উন্নত অংশের একেকজন এত মহান ছিলেন যে, কেবল একজনের খাতিরেই এই ব্যবস্থাপনা প্রবর্তণ করা যুক্তিযুক্ত মনে হয়। এই প্রজ্ঞা দৃষ্টিতে রেখে আল্লাহ্‌তা’লা তাঁর কোন কোন পুণ্যবান বান্দাকে বলেছেন ‘লাও লাকা লামা খালাকতুদ্‌ দুনইয়া’ (ইবনে আসাকির) অর্থাৎ যদি তুমি জন্ম না নিতে তাহলে আমরা বিশজগতের এ ব্যবস্থাপনা সৃষ্টিই করতাম না। এটি হাদীসে কুদ্‌সী এবং মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য আরো সিদ্ধ মহাপুরুষদেরকেও এ ধরনের ইলহাম করা হয়েছে। সুতরাং এই মহাপুরুষগণ এ কথার সাক্ষী যে, খোদাতা’লার পরিকল্পনাই প্রজ্ঞাপূর্ণ।’ (তফসীরে কবির, ১ম খন্ড- পৃষ্ঠা২৮৩-২৮৪ )

এরূপ খোদাপ্রেমিক, যারা ফিরিশ্‌তাদের চেয়ে আল্লাহ্‌তা’লার পবিত্রতা অধিক বর্ণনা করেন এরপর জগতে তা ছড়িয়ে দেন তারা নিশ্চয় মর্যাদায় তাদের চেয়ে বড় যারা সেই পবিত্রতার ঘোষণা কেবল নিজেদের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখেন। মানুষের মধ্যে পবিত্রতা ঘোষণাকারীর পরিপূর্ণ নমুনা ও আদর্শ হলেন মহানবী (সাঃ), যাঁর কথা এখনই বর্ণিত হলো, তিনি গোটা বিশ্ব জগতের ধ্যান-ধারণাকে পবিত্র করেছেন ও তাদের কর্মকান্ডকেও পরিশুদ্ধ করেছেন আর আমরা আজ পর্যন্ত সেই ‘কুদ্দুস’ খোদার প্রকৃত প্রতিফলনের কল্যাণ দর্শন করছি এবং যতদিন এ পৃথিবী থাকবে ততদি�� বিশ্ব তা প্রত্যক্ষ করতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

সূরাতুল্‌ জুমুআ’তে বর্ণিত ‘কুদ্দুস’ শব্দের ব্যাখ্যায় হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ খলীফাতুল মসীহ্‌ সানী (রাঃ) বলেন,

‘দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য যা বর্ণন��� কর�� হয়েছে তা’হলো ‘আল্‌কুদ্দুস’, এ সম্পর্কে বলা হয়েছে,  يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ তিনি এটিও চান যে, তাঁর সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী প্রতিটি জিনিষ যেন পবিত্র হয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর রসূলকে আয়াত সহকারে প্রেরণ করেছেন, যাতে সে আয়াত মানুষজনকে শুনায় আর তাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্‌তা’লার আয়াত শিখিয়ে প্রথমত মানুষের মন ও মননকে পবিত্র করে এবং এরপর  يُزَكِّيهِمْ এর অধীনে তাদের কর্মকে পবিত্র করে।’ (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত (১) ফাযায়েলুল কুরআন (২) আনওয়ারুল উলুম ১১তম খন্ড ১৩০পৃষ্ঠা)

তিনি (রাঃ) এ প্রসঙ্গে আরো বলেন,

‘আল কুদ্দুস’এর মোকাবিলায় রসূলের কাজ উল্ল্যেখ করা হয়েছে - وَيُزَكِّيهِمْ অর্থাৎ মানুষকে পবিত্র করেন। জ্ঞানীর পরিচয় কি! এটিই যে, সে অন্যদের শিক্ষা দেয় এবং অন্যরা তার মাধ্যমে জ্ঞানী হয়। আল্লাহ্‌তালা ‘কুদ্দুস’, এর প্রমাণ হচ্ছে তাঁর পক্ষ থেকে আগমনকারী; পৃথিবীবাসীকে পবিত্র করেন। মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) অপবিত্র লোকদের নিজ হাতে তুলে নেন আর তাঁর অধীনে এসে তারা পবিত্র হয়ে যায়। (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত আহ্‌মদীয়াত কে উসুল, আনওয়ারুল উলুম ১৩তম খন্ড ৩৫৩ পৃষ্ঠা)

অতএব ইনি হলেন পবিত্র ও কুদ্দুস খোদার কামেল নবী যাঁর অধীনস্ত হলে সাধারণ মানুষও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং যদি পবিত্র হতে হয় আর যদি সত্যিকার মু’মিন হতে হয় তাহলে প্রত্যেককে তাঁর অনুগত হবার চেষ্টা করা উচিৎ। আমি যেমনটি বলেছি, পবিত্র কুরআনের যে বিধি-নিষেধ রয়েছে, যা করার আদেশ এবং যা না করার নির্দেশ রয়েছে এর উপর আমল করতে হবে। আমল না করলে আমরা আল্লাহ্‌তা’লার দিকে ধাবমান বলে দাবি করতে পারিনা। মুহাম্মদ রসূলূল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর পানে ধাবমান হবার দাবী করতে পারবো না, ফলে ‘কুদ্দুসিয়্যত’ বৈশিষ্ট্য থেকেও কল্যাণপ্রাপ্ত হতে পারবো না।

আরবের চিত্র অঙ্কন করার পর মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্রকরণ শক্তি যা কুদ্দুস খোদা তাঁকে দান করেছেন সে সম্পর্কে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

‘সে সময়কার আরবের অবস্থা দেখ! চরম নোংরামিতে নিমজ্জিত ছিল, সব ধরনের ভ্রষ্টতা এবং কদাচার ছিল তাদের পরিচয়। এই জাতি কখনও পবিত্র হতে পারে বা তাদের কখনও সুমতি হবে তা কখনও কেউ ভাবতেও পারতো না, বা খোদা প্রেমিক মানুষ হওয়া তো দূরের কথা কেউ একথাও ভাবতে পারতো না যে এরা নূন্যতম চারিত্রিক গুণের অধিকারী হবে। কিন্তু আল্লাহ্‌তা’লার প্রতিশ্রুতি যেমনটি ছিল, যে ব্যক্তি আমার এই প্রিয়ের সাথে সম্পর্ক গড়বে সে পবিত্র হবে বরং রুহুল কুদ্দুসের সাহায্য লাভ করবে। বিশ্ববাসী দেখেছে, এরপর জাতির মাঝে কিরূপ বিপ্লব এসেছে!’

এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

‘যে ব্যক্তি এ বিষয়টি গভীর দৃষ্টি নিয়ে দেখবে যে, তাঁরা নিজেদের প্রথম বিচরণ স্থল অর্থাৎ তাদের আগ্রহ, আচার-আচরণ, কথাবার্তা, কাজকর্ম যা তাদের নিকট খুব আকর্ষণীয় মনে হতো তা কিভাবে তারা পরিত্যাগ করলো, আর কিভাবে তারা কামনা-বাসনার অরণ্য পাড়ি দিয়ে নিজেদের প্রভুর সাথে মিলিত হলো; তাহলে সে ব্যক্তি নিশ্চিত হতে পারবে, সে সবই ছিল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পবিত্রকরণ শক্তির প্রভাব।’ যেসব পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে তা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পবিত্রকরণ শক্তিরই গভীর প্রভাব ছিল। ‘সেই রসূল যাঁকে খোদাতা’লা মনোনীত করেছেন এবং চিরস্থায়ী দানে সমৃদ্ধ করেছেন সেই মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্রকরণ শক্তির প্রভাব দেখ! সাহাবীদের মাটি থেকে তুলে নিয়ে আকাশের উচ্চতায় পৌঁছিয়ে দিয়েছেন আর ধাপে ধাপে মনোনীত লোকদের পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মূহুর্ত ও ক্ষণে তাঁদের সম্মান ও পবিত্রতার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিটি মূহুর্তে ও ক্ষণে উন্নত থেকে উন্নততরই হয়েছে। আর মহানবী (সাঃ) তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর মত পেয়েছেন, যারা তৌহিদ এবং পরহেজগারী বলতে কিছুই জানতো না’ অর্থাৎ, পশুর মত ছিল। ‘আল্লাহ্‌তা’লার তৌহিদ সম্পর্কে তারা যেমন জানতো না তেমনি সংযমশীলতা ও ধার্মিকতা সম্পর্কেও তারা কিছুই অবহিত ছিল না, নোংরামিতে লিপ্ত ছিল এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে জানতো না। নবী করীম (সাঃ) তাদের মানবিক শিষ্টাচার শিখিয়েছেন এবং সামাজিক জীবন বিধান সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছেন।’ (লন্ডন থেকে প্রকাশিত, নাজমুল হুদা-রূহানী খাযায়েন ১৪তম খন্ড, ৩১-৩২পৃষ্ঠা)

তিনি (আঃ) পুনরায় বলেন,

‘আল্লাহ্‌ জাল্লা শানহু তাঁর বিশেষ কৃপায় কুরআন শরীফের মধ্যে মা’রেফতে এলাহীর যে তৃতীয় দরজা উম্মুক্ত রেখেছেন তা হচ্ছে, আধ্যাত্মিক কল্যাণরাজি, যাকে বলা যেতে পারে এজাযে তাসিরি বা প্রভাব বিস্তারের নিদর্শন। এটি কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছেই গোপন নয় যে, মহানবী (সাঃ)-এর জন্মভূমি একটি উপদ্বীপ, যাকে আরব বলা হয় এবং যা সব সময় অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একান্তে পড়ে ছিল; আঁ হযরত (সাঃ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে (একেবারেই) বন্য পশুর ন্যায় জীবন-যাপন করা, এবং ধর্ম, ঈমান, আল্লাহ্‌র অধিকার ও মানুষের প্রাপ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে উদাসীন হওয়া, শত-শত বছর যাবৎ মূর্তিপূজা ও বিভিন্ন প্রকার নোংরা চিন্তাধারায় নিমজ্জিত থাকা, ভোগ-বিলাস, নেশা, মদ্য পান, জুয়া ইত্যাদি অপকর্মে চরম পর্যায়ে উপনীত হওয়াসহ সকল প্রকার পাপের ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল। এ সমস্ত পাপাচারই তাদের মাঝে ছিল। অধিকন্তু চুরি,ডাকাতি, রাহাজানি, শিশু-কন্যা হত্যা এবং এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা’ অর্থাৎ, ডাকাতি, হত্যা, মেয়েদের মেরে ফেলা, এতীমদের ধন-সম্পদ ভক্ষণ এবং অন্যের সম্পদ হরণ করাকে কোন অপরাধই মনে করতো না। ‘বস্তুতঃ সর্ব প্রকার খারাপ অবস্থা, সব ধরনের অনিয়ম, অজ্ঞতার অন্ধকার ও উদাসীনতা সামগ্রিকভাবে সমগ্র আরবের হৃদয় গ্রাস করে রাখা এমন সর্বজনবিদিত এক ঘটনা যে, সামান্য জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন গোড়া কোন বিরুদ্ধবাদীও তা অস্বীকার করতে পারে না।’ অর্থাৎ এটি এতই প্রকাশ্য বিষয় বিদ্বেষপরায়ণ কোন ব্যক্তিও অস্বীকার করতে পারবে না। ‘এছাড়া ন্যায়পরায়ণ প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে এটি সুস্পষ্ট যে, ঐ সকল অজ্ঞ, বন্য, বাচাল এবং অপবিত্র প্রকৃতির মানুষ, যাদের কিছুই জানা ছিলনা; ইসলাম গ্রহণ ও কুরআনকে বরণ করার পর কেমন পরিবর্তিত হয়ে গেল! কিভাবে ঐশী গ্রন্থের প্রভাব এবং নিষ্পাপ নবী (সাঃ)-এর সাহচর্য অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের হৃদয়গুলোকে এমনভাবে পরিবর্তন করে দিল যে, তারা অজ্ঞতার পরিবর্তে ধর্মীয় গুঢ়তত্ত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠলো আর পার্থিবতার মোহগ্রস্থতার স্থলে ঐশী প্রেমে এমনভাবে বিভোর হলো যে, আপন মাতৃভূমি, ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, মান-মর্যাদা এবং নিজেদের আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ সবকিছুই আল্লাহ্‌ জাল্লা শানহুর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিসর্জন দিল। বস্তুতঃ এই উভয় অবস্থা অর্থাৎ তাদের জীবনের পূর্বাবস্থা এবং সেই নুতন জীবন যা ইসলাম গ্রহণের পর তারা লাভ করেছিল, তা পবিত্র কুরআনে এত সুস্পষ্টভাবে উল্ল্যেখ রয়েছে যে, তা পাঠ করার সময় একজন সৎ ও পুণ্যবান মানুষের চোখ অজান্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। সুতরাং কি ছিল সেটি যা তাদেরকে এত দ্রুত এক জগত থেকে অন্য জগতে টেনে নিয়ে গেছে। তা কেবল দুটো বিষয়; প্রথমতঃ সেই নিষ্পাপ নবী (সাঃ) এর নিজস্ব পবিত্রকরণ শক্তিতে অত্যন্ত গভীর প্রভাব ছিল। এমনই গভীর প্রভাব বিস্তারকারী ছিলেন মহানবী (সাঃ) যা না ইতোপূর্বে কখনও কেউ হয়েছে না ভবিষ্যতে কেউ হবে। দ্বিতীয়তঃ সর্বশক্তিমান, অবিনশ্বর ও চিরন্তন খোদাতা’লার পবিত্র বাণী অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের অ���্��ন্ত শক্তিশালী ও বিষ্ময়���র প্রভাব ছিল যা ��ক বিশাল জনগোষ্ঠীকে গভীর অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোতে নিয়ে এসেছে। মোটকথা এটিই হলো কুরআনের অলৌকিক প্রভাব। এগুলো বড়ই অসাধারণ বিষয় কেননা, পৃথিবীতে কোনকালে এমন প্রভাব অন্য কোন গ্রন্থ বিস্তার করেছে বলে কোন দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে সক্ষম হবে না। অন্য কোন গ্রন্থ কুরআন শরীফের ন্যায় এরূপ আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হয়েছে বলে কেউ প্রমাণ দিতে পারবে কি?’ (লন্ডন থেকে প্রকাশিত- সুরমা চশমা আরিয়া, রূহানী খাযায়েন এর ২য় খন্ড-২৮-৩০ পৃষ্ঠার পাদটীকা)

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) আমাদের অন্যত্র উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘তাঁর (সাঃ) পবিত্র প্রভাব বিস্তারের কল্যাণ ধারা বন্ধ হয় নি বরং এখনও তা অব্যাহত আছে। সেই প্রভাব ও সেই কল্যাণ পবিত্র কুরআনে এখনও বিদ্যমান আর খোদাতা’লা এখনও সেই কুদ্দুসই আছেন, তাই যে তাঁর দিকে এগোনোর চেষ্টা করে সে কুদ্দুস বৈশিষ্ট্যের কল্যাণ লাভ করে। এবং তাঁর রসূলের আধ্যাত্মিক প্রভাবও বিদ্যমান, তদুপরি তাঁর গ্রন্থের কার্যকারিতাও তেমনই আছে।’ এ যুগে তিনি তাঁর মসীহ্‌ ও মাহদীর পবিত্রকরণ শক্তির দৃষ্টান্তও আমাদের দেখিয়েছেন এবং দেখাচ্ছেন। এসব কিছুই সেই কুদ্দুস খোদার বৈশিষ্ট্য, যা থেকে আমাদের লাভবান হওয়া উচিৎ। আল্লাহ্‌তা’লা আমাদেরকে এর তৌফিক দিন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে