In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আগমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৩শে মার্চ, ২০০৭ইং

“২৩শে মার্চ জামাতে আহ্‌মদীয়ার ইতিহাসে অনেক গুরুত্ব রাখে কেননা আজ থেকে ১১৮ বছর পূর্বে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশে বয়াত গ্রহণ আরম্ভ করেছিলেন। এ দিনটি ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য মাইল ফলক স্বরূপ।”

“হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জামাতের জীবনে আগত প্রতিটি দিন উন্নতির নতুন পথ আমাদের জন্য উম্মোচন করে।”

“তিনিই সে মসীহ্‌ ও মাহদী যার এ যুগে পুরো বিশ্বকে এক ধর্মে (ইসলাম) সমবেত করার কথা।”

“আল্লাহ্‌ তা’আলা হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জামাতকে বিশেষভাবে আরববিশ্বের জন্য নতুন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আজ একটি নতুন চ্যানেল MTA-3 আল্‌ আরাবিয়াহ্‌ চালু করার তৌফিক দান করেছেন; যা ২৪ঘন্টা আরবী অনুষ্ঠান সমপ্রচার করবে, যেন হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) যে ধনভান্ডার বিতরণ করেছেন; আরব বিশ্বের পিপাসার্ত হৃদয়, নেক প্রকৃতির মানুষ ও পুণ্যাত্মারা সে ভান্ডার থেকে কল্যাণমন্ডিত হতে পারে।”

“হে আরব ভূখন্ডের অধিবাসীগণ! আজ আমি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে সমগ্র বিশ্বের প্রভু প্রতিপালক খোদার নামে তোমাদের কাছে আবেদন করছি, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর এ আধ্যাত্মিক সন্তানের আহবানে সাড়া দাও।”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আজ ২৩শে মার্চ। আমরা জানি, জামাতে আহ্‌মদীয়ার ইতিহাসে আজকের দিনটি অনেক গুরুত্ব বহন করে, কেননা আজ থেকে ১১৮ বছর পূর্বে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশে বয়াত গ্রহণ আরম্ভ করেছিলেন আর এভাবে জামাত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এ দিনটি ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য মাইল ফলক স্বরূপ। তাই সে যুগে ইসলামের যে অবস্থা ছিল তার সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।

সে সময় মুসলমানদের অবস্থাদৃষ্টে প্রত্যেক সে মুসলমান ব্যাকুল ছিল যার হৃদয়ে ইসলামের জন্য দরদ ছিল। উপমহাদেশে আর্য সমাজী এবং খৃষ্টান পাদরী ও তাদের প্রচারকরা ইসলামের উপর চরম আক্রমন আরম্ভ করে রেখেছিল। আক্রমন এত প্রচন্ড ছিল যে, মুসলমান উলামারাও ভীত-ত্রস্ত থাকতো আর তাদের কাছে এ আক্রমন প্রতিহত করার কোন উপায় ছিল না। অনেকেই উত্তর দিতে না পেরে ইসলামধর্ম পরিত্যাগ করে খৃষ্টানদের ঝুলিতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছিল আর কতক সম্পূর্ণরূপে ইসলামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছিল।

তখন খৃষ্টধর্ম ও অন্যান্য আগ্রাসী ধর্মের মোকাবিলার জন্য খোদার একজনই পাহ্‌লোয়ান শুধু ছিলেন, অর্থাৎ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আঃ)। তিনি পাক-ভারত উপমহাদেশের তদানিন্তন সকল ধর্ম অর্থাৎ, আর্য সমাজী, ব্রা‏‏হ্ম সমাজ অথবা খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী, যারা সে সময় ইসলাম এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে ভয়াবহ আক্রমন করছিল, তাদের সবাইকে চার খন্ডে রচিত স্বীয় যুগান্তকারী গ্রন্থ বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’য় এমন দাঁত ভাঙা জবাব দিয়েছেন যা তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড ১৮৮০ সনে, তৃতীয় খন্ড ১৮৮২-তে আর চতুর্থ খন্ড ১৮৮৪ সনে প্রকাশ করেন। এতে তিনি (আঃ) পবিত্র কুরআন যে ঐশী বাণী এবং অতুলনীয় গ্রন্থ আর মহানবী (সাঃ) নবুয়তের দাবীর ক্ষেত্রে যে সত্যবাদী ছিলেন তার অখন্ডনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং বলেছেন, আমার উপস্থাপিত প্রমাণাদি যে খন্ডন করবে তার জন্য চ্যালেঞ্জ, যদি সে এর এক তৃতীয়াংশ বা চতুর্থাংশ অথবা পঞ্চমাংশ প্রমাণও যদি দিতে পারে তাহলে দশ সহস্র রূপী পুরষ্কার প্রদান করবো, যা সে কালের দৃষ্টিকোন থেকে যথেষ্ট বড় অংক ছিল। এ পুস্তক মুসলমানদের সাহস বৃদ্ধি করেছে আর সেসব আক্রমনকারীদের ষড়যন্ত্রকে ধুলিস্যাৎ করেছে। ইসলামের জন্য তাঁর (আঃ) এরূপ প্রেরণা দেখে তাঁর প্রতি ভক্তি রাখতো এমন অনেক নিষ্ঠাবান তাঁর সমীপে নিবেদন করে যে, আপনি আমাদের বয়াত নিন। কিন্তু তিনি (আঃ) যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ্‌ তা’আলার পক্ষ থেকে এর নির্দেশ পেয়েছেন অপারগতা প্রকাশ করতে থাকেন।

নির্দেশ লাভের পর হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) ১৮৮৮ সনের ১লা ডিসেম্বর, তবলীগ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন যাতে তিনি লিখেন,

“আমি এখানে সাধারণভাবে আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে আর বিশেষকরে আমার মুসলমান ভাইদের আরো একটি পয়গাম পৌঁছাচ্ছি যে, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যারা সত্যান্বেষি তারা সত্যিকার ঈমান ও ঈমানের পবিত্রতা এবং খোদাপ্রেমের পথ চিনার জন্য আর নোংরা জীবনপদ্ধতি, ঔদাসীন্য ও বিদ্রোহপূর্ণ জীবন পরিত্যাগের লক্ষ্যে আমার হাতে বয়াত করুন। সুতরাং যারা নিজেদের মাঝে কিছুটা এ শক্তি রাখেন তাদের জন্য আমার কাছে আসা আবশ্যক কেননা আমি তাদের দুঃখ লাঘব করবো এবং তাদের বোঝা হালকা করার চেষ্টা করবো। তারা যদি জান-প্রাণ দিয়ে ঐশী শর্তাবলী অনুসারে পরিচালিত হবার চেষ্টা করেন তাহলে খোদাতা’লা আমার দোয়া ও দৃষ্টিতে তাদের জন্য কল্যাণ রেখে দেবেন। এটি ঐশী নির্দেশ যা আজ আমি পৌঁছে দিলাম। এ সম্পর্কে আরবী ইলহাম হচ্ছে, ‘ইযা আযামতা ফাতাওক্কাল আলাল্লাহি। ওয়াস্‌নাইল ফুলকা বিআইউনিনা ওয়া ওয়াহ্‌ইনা। আল্লাযীনা ইউবাইউনাকা ইন্নামা ইউবাইউনাল্লাহা। ইয়াদুল্লাহি ফাওকা আইদীহিম।’ (অর্থাৎ, যেহেতু তুমি এ কাজের সংকল্প করেছ তাই খোদাতা’লার উপর ভরসা করো এবং এ নৌকা আমাদের চোখের সামনে আর আমাদের ওহীর আলোকে তৈরী কর। যারা তোমার হাতে বয়াত করবে তারা তোমার হাতে নয় বরং খোদার হাতে বয়াত করবে, খোদার হাতই তাদের হাতের উপরে থাকবে।” (লন্ডন থেকে প্রকাশিত মজমুয়া ইশতিহারাত, ১ম খন্ড-১���৮পৃষ্ঠা)

এর��র�� তিনি ১৮৮৯ সনের ১২ই জানুয়ারী তকমীলে তবলীগ নামে আরেকটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন এবং তাতে ১৮৮৮সনের ১লা ডিসেম্বরের বরাত দিয়ে বয়াতের দশটি শর্ত লিপিবদ্ধ করেন। বয়াতের এ শর্তগুলো আমরা সবাই জানি তবুও সকল আহ্‌মদী যেন এথেকে উপকৃত হতে পারে, অনুস্মারক স্বরূপ তথা স্মৃতিকে ঝালিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এবং এমটিএ যেহেতু বিস্তীর্ণ এলাকায় অ-আহ্‌মদীরাও শুনে তাই তারাও যেন ধারণা করতে পারে যে, এ শর্তাবলী কি, শর্তগুলো আমি পাঠ করছি।

আজ খিলাফতের সাথে জামাতে আহ্‌মদীয়ার যে সম্পর্ক বিদ্যমান তাও এজন্য যে, বয়াতের এ অঙ্গীকার অনুসারে প্রত্যেক আহ্‌মদী বস্তুত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছে আর এ সিঁড়িতে পা রাখার কল্যাণে মহানবী (সাঃ) এবং খোদাতা’লার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। হায়! আজকের মুসলামনারাও যদি যুগ মসীহ্‌কে অস্বীকারের পরিবর্তে এই নিগূঢ় সত্যটি অনুধাবন করতো তাহলে যেসব সমস্যায় নিপতিত তাথেকে রক্ষা পেত।

যেভাবে আমি শুরুতে বলেছিলাম, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর মিশন ছিলো পৃথিবীতে মহানবী (সাঃ)-এর অনুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পবিত্র কুরআনের যথার্থতা প্রমাণ করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি (আঃ) আল্লাহ্‌ তা’আলার পক্ষ থেকে প্রত্যাদিষ্ট হবার পর একটি পবিত্র জামাত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং বয়আত গ্রহণ করেন। মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি তাঁর পরম ভালবাসা ছিল এবং তিনি (আঃ) আঁ-হযরত (সাঃ)-এর পদমর্যাদার স্বরূপ সম্পর্কে সত্যিকার অন্ত-দৃষ্টি রাখতেন; বরং এভাবে বলা উচিৎ, সত্যিকার অর্থে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-ই তাঁকে (সাঃ) চিনতেন।

মহানবী (সাঃ)-এর মাকাম ও পদমর্যাদা সম্পর্কে তিনি (আঃ) একস্থানে বলেন,

“আমি সর্বদা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, এই যে আরবী নবী যাঁর নাম মুহাম্মদ (তাঁর প্রতি হাজার হাজার দরুদ ও সালাম), তিনি কতই না উচ্চ মর্যাদার নবী। তাঁর উচ্চ অবস্থান ও মাকামের সীমা কল্পনাও করা যায় না এবং তাঁর পবিত্রকরণ শক্তির সঠিক অনুমান করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। পরিতাপ যে, তাঁর মর্যাদা যেভাবে সনাক্ত করা উচিৎ ছিল, সেভাবে সনাক্ত করা হয় নি। তিনিই একমাত্র বীরপুরুষ যিনি হারিয়ে যাওয়া তৌহীদকে পৃথিবীতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি খোদাতা’লাকে পরমভাবে ভালবেসেছেন আর মানবজাতির প্রতি একান্ত ভালবাসায় তাঁর প্রাণ বিগলিত হয়। এজন্যই খোদা, যিনি তাঁর (সাঃ) হৃদয়ের রহস্য জানতেন, তাঁকে সকল নবী এবং পূর্বাপরের সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন এবং তাঁর সকল বাসনা স্বীয় জীবদ্দশাতেই পূর্ণ করেছেন। তিনিই প্রত্যেক কল্যাণের উৎসস্থল। যে ব্যক্তি তাঁর মাধ্যমে কল্যাণমন্ডিত হবার কথা স্বীকার না করে কোন প্রকার শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করে সে মানুষ নয় বরং শয়তানের বংশধর। কেননা সকল শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠী তাঁকে প্রদান করা হয়েছে।” (‘হকীকাতুল ওহী’ লন্ডন থেকে প্রকাশিত, রূহানী খাযায়েন-২২তম খন্ড, পৃষ্ঠা ১১৮-১১৯)

পুনরায় তিনি (আঃ) বলেন,

“সে মানব যিনি নিজ সত্ত্বা, বৈশিষ্ট্যাবলী, কাজে-কর্মে এবং স্বীয় আধ্যাত্মিক ও পবিত্র গুণাবলী দ্বারা জ্ঞান, কর্ম, সাধুতা ও দৃঢ়তার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আর পরিপূর্ণ মানবরূপে অভিহিত হয়েছেন.....সে মানব যিনি সর্বাপেক্ষা কামেল আর পরিপূর্ণ মানব ও কামেল নবী ছিলেন এবং উৎকর্ষ কল্যাণরাজি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন; যাঁর হাতে আধ্যাত্মিক পুনরুত্থান ও আধ্যাত্মিক হাশর সংঘটিত হবার মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম কিয়ামতের আবির্ভাব হয় আর এক গোটা মৃত জগৎ তাঁর শুভাগমনে জীবন্ত হয়ে উঠে; সে কল্যাণমন্ডিত নবী হচ্ছেন হযরত খাতামুল আম্বিয়া, মনোনীতদের নেতা, শ্রেষ্ট রসূল, নবীকূল গর্ব জনাব মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)। হে প্রিয় খোদা! তুমি এ প্রিয় নবীর উপর এমন রহমত ও দরূদ বর্ষণ করো যা তুমি পৃথিবীর আদিকাল থেকে অন্য কারো উপরে বর্ষণ করো নি।” (ইতমামুল হুজ্জাহ্‌, লন্ডন থেকে প্রকাশিত, রূহানী খাযায়েন-৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩০৮)

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) তাঁর জামাতের কাছে এ প্রত্যাশাই রাখতেন এবং এ শিক্ষা প্রদান করতেন যে, কুরআন এবং মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি সত্যিকার প্রেম ও ভালবাসা সৃষ্টি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই বয়াতের শর্তাবলীতে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা শিরোধার্য করা এবং আঁ-হযরত (সাঃ)-এর উপর দরূদ প্রেরণের প্রতি তিনি বিশেষ মনযোগ আকর্ষণ করেছেন। একস্থানে তিনি (আঃ) বলেনঃ

“এবং তোমাদের প্রতি আরেক অত্যাবশ্যকীয় উপদেশ এই, কুরআন শরীফকে এক পরিত্যক্ত বস্তুর মত পরিত্যাগ করবে না কেননা এতেই তোমাদের জীবন নিহিত। যারা কুরআনকে সম্মান করবে, তারা আকাশে সম্মান লাভ করবে। যারা সকল হাদীস এবং প্রত্যেক কথার উপর কুরআনকে প্রাধান্য দেবে, তাদেরকে আকাশে প্�����াধান্য দেয়া হবে। মান��� ��াতির জন্য ধরাপৃষ্ঠে আজ কুরআন ব্যতিরেকে আর কোন ধর্মশাস্ত্র নেই এবং আদম সন্তানের জন্য বর্তমানে মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) ভিন্ন কোনই রসূল এবং শাফী (যোজক) নেই। অতএব, তোমরা সে মহাগৌরবসম্পন্ন নবীর সাথে প্রেমসূত্রে আবদ্ধ হতে চেষ্টা করো এবং অন্য কাউকেও তাঁর উপর কোন প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না, যেন আকাশে তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত বলে পরিগণিত হতে পারো। স্মরণ রেখো, প্রকৃত মুক্তি যে কেবল মৃত্যূর পরই প্রকাশিত হয় তা নয় বরং প্রকৃত মুক্তি ইহকালেই তার জ্যোতি প্রকাশ করে । প্রকৃত মুক্তিপ্রাপ্ত কে? সে-ই যে বিশ্বাস করে আল্লাহ্‌ সত্য এবং মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর এবং তাঁর সৃষ্ট জীবের মধ্যে যোজক স্থানীয় আর আকাশের নীচে তাঁর সম-মর্যাদাবিশিষ্ট অন্য কোন রসূল নেই এবং কুরআনের সমতূল্য আর কোন গ্রন্থ নাই। অন্য কোন মানবকেই খোদাতা’লা চিরকাল জীবিত রাখার ইচ্ছে করেন নি কিন্তু এ মনোনীত নবীকে চিরঞ্জীব করার ইচ্ছা করেছেন।” (কিশতিয়ে নূহ্‌, লন্ডন থেকে প্রকাশিত, রূহানী খাযায়েন-১৯তম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩-১৪)

মুসলমানদেরকে মহানবী (সাঃ)-এর মাকাম বা মর্যাদার সাথে পরিচয় করানো আর অন্যান্য ধর্মের আক্রমন থেকে রক্ষা করাই ছিল হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কাজ। আর কেবল রক্ষা করাই নয় বরং বিশ্বে ইসলামের অনুপম শিক্ষার বিস্তার করাও ছিল তাঁর দায়িত্ব। সে হেদায়াতের মাধ্যমে বিশ্বকে আলোকিত করাও ছিল তাঁর দায়িত্ব যা সর্বশেষ শরীয়তধারী নবী হিসেবে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর (সাঃ) উপর অবতীর্ণ করেছিলেন; যা সম্পর্কে রেওয়ায়েতে এসেছে, শেষ যুগে আবির্ভূত হয়ে মসীহ্‌ এবং মাহ্‌দীর কাজ হবে, আল্লাহ্‌ তা’আলার সাহায্যে সকল ধর্মের উপর ইসলামকে জয়যুক্ত করা। তিনি (আঃ) দাবী করেছেন, আমিই সে মসীহ্‌ ও মাহদী যার আসার কথা ছিল এবং নিজ দাবীর সত্যায়ন স্বরূপ তিনি (আঃ) অগণিত ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যা অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিকম্পের ভবিষ্যদ্বাণী, প্লেগ এবং অন্যান্য ভবিষ্যদ্বাণীও রয়েছে। সুতরাং এ সব নিদর্শনাবলী যা তাঁর সমর্থনে পূর্ণ হয়েছে, আকাশ ও ভূমি থেকে উদ্ভুত বিপদাবলীর ভবিষ্যদ্বাণী যা তাঁর সমর্থনে পূর্ণ হয়েছে তা তাঁর সত্যতার পক্ষে দলীল ছিল।

তারপর মহানবী (সাঃ)-এর এ মহান ভবিষ্যদ্বাণীও রয়েছে যে, আমাদের মাহ্‌দীর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি মহান নিদর্শন হচ্ছে, চন্দ্র এবং সূর্যের নির্ধারিত তারিখে গ্রহণ লাগা যা পূর্বে কখনও কারো নিদর্শন হিসেবে এভাবে প্রকাশিত হয়নি অর্থাৎ নিদর্শন প্রকাশ পাওয়া ও দাবী একই সময়ে বর্তমান থাকা (ইতোপূর্বে ঘটেনি)। এসব কিছুর বর্তমানে এক ব্যক্তির এ দাবী করা আগমনকারী মসীহ্‌ ও মাহদী আমিই; যদি নিজেদের নিরাপত্তা চাও তাহলে আমার নিরাপদ দুর্গে প্রবেশ করো, এটি কোন দৈব ব্যাপার ছিল না। বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীলদের জন্য এটি ভাবার বিষয়। আহ্‌মদীরা সৌভাগ্যবান যাদেরকে আল্লাহ্‌ তা’আলা এ প্রতিশ্রুত ব্যক্তির জামাতে প্রবিষ্ট হবার তৌফিক দিয়েছেন। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জামাতে অন্তর্ভূক্ত হবার পরে আমাদের এ বার্তা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে যা নিয়ে তিনি (আঃ) দন্ডায়মান হয়েছিলেন, যাতে করে খোদার একত্ববাদ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মহানবী (সাঃ)-এর পতাকা সমগ্র পৃথিবীতে উড্ডীন হয়। এটি আল্লাহ্‌ তা’আলার অভিপ্রায় যা অবশ্যম্ভাবী। এ কাজে সামান্য ভূমিকা রেখে আমরা কেবল পূণ্যই অর্জন করবো আর আমাদের নাম হবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র স্বভাবের লোকদেরকে তৌহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত করে আঁ-হযরত (সাঃ)-এর উম্মতে অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত করে রেখেছেন আর এজন্যই তিনি স্বীয় মসীহ্‌ ও মাহদীকে প্রেরণ করেছেন।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেনঃ

“খোদাতা’লা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী পুণ্যাত্মাবিশিষ্ট লোকদেরকে তৌহীদের প্রতি আকৃষ্ট করা ও অনুগত দাসদেরকে এক ধর্মে সমবেত করার সিদ্ধান্ত করেছেন; তারা ইউরোপেই বাস করুক বা এশিয়াতে। এটিই খোদাতা’লার অভিপ্রায় যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমি পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছি। সুতরাং তোমরা এ কাজে নিয়োজিত হও; বিনয়, নৈতিক উৎকর্ষ ও দোয়ার প্রতি মনোনিবেশের মাধ্যমে।” (আল্‌ ওসীয়্যত, লন্ডন থেকে প্রকাশিত, রূহানী খাযায়েন-২০তম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩০৬-৩০৭)

সুতরাং পৃথিবীতে স্বীয় এ পবিত্র নবী (সাঃ)-এর অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন খোদাতা’লার অভিপ্রায়। যদিও বর্তমানে পৃথিবীর অবস্থাদৃষ্টে এটি বাহ্যত অনেক দুরূহ মনে হয় কিন্তু ভাবার বিষয় যে, সে ব্যক্তি যিনি কাদিয়ানে (পাঞ্জাবের ছোট্ট একটি গ্রাম) নিঃসঙ্গ ছিলেন, তাঁর ( মসীহ্‌ ও মাহদীর) জীবদ্দশাতেই আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁকে লক্ষ লক্ষ মান্যকারী দান করেছেন; বরং ইউরোপ এবং আমেরিকা পর্যন্ত তাঁর নাম ও দাবী ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাঁর অনুসারী সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জামাতের জীবনে উদিত প্রতিটি দিন আমাদেরকে উন্নতির নতুন পথ প্রদর্শন করে। আজ ১৮৫টি দেশে তাঁর জামাতের প্রতিষ্ঠা এ কথার জলন্ত প্রমাণ যে, তিনিই সেই মসীহ্‌ ও মাহদী যার এযুগে গোটা বিশ্বকে এক ধর্মে (ইসলাম) সমবেত করার কথা। বিশ্বের সব মহাদেশের অধিকাংশ দেশে আল্লাহ্‌ তা’আলার ইচ্ছার ব্যবহারিক প্রতিফলন আমরা বয়াতের আকারে দেখতে পাই। আজও যদি কেউ ইসলামের সুরক্ষার প্রতিবিধান করে থাকে তাহলে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর শিক্ষায় কল্যাণমন্ডিত হয়ে তাঁর অনুসারীরাই করছে।

আজ আরব বিশ্বও এর সাক্ষী, বিগত কয়েক বছর যাবত আরব মুসলমানরা খৃষ্টানদের হাতে কিভাবে লাঞ্চিত হচ্ছিল, কত বিরক্ত ছিল তারা। আল্লাহ্‌ তা’আলার এ পাহলোয়ান কর্তৃক শিক্ষাপ্রাপ্তরাই আরব বিশ্বে খৃষ্টানদের মুখ বন্ধ করেছে। কেননা আজ আল্লাহ্‌ তা’আলার সাহায্য এবং সমর্থণে সে অকাট্য যুক্তি কেবলমাত্র হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কেই প্রদান করা হয়েছে যদ্বারা খোদার তৌহীদ প্রতিষ্ঠা এবং পৃথিবীর ভ্রান্ত বিশ্বাসের মুখ বন্ধ করা যেতে পারে। আজ এত সহজে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর যুক্তির আলোকে যে ভুল বিশ্বাস খন্ডন করা হচ্ছে, বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে, এটিও আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হচ্ছে যা তিনি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে তাঁর ইলহামে ‘আমি তোমার প্রচারকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছাবো’তে দিয়েছিলেন। আমরা যত সহজে এ বার্তা বিশ্বের কোনায় কোনায় পৌঁছাচ্ছি তাও এর (ইলহামের) পূর্ণতার প্রমাণ। একটি ক্ষুদ্র দরিদ্র জামাত যার কাছে না তেলসম্পদ আছে না বিশ্বের অন্য কোন আয়ের উৎস আছে তা বর্তমান পৃথিবীর আধুনিক প্রযুক্তি এবং মাধ্যমকে ব্যবহার করে তবলীগ করবে এটি ভাবতেও পারতোনা। যেভাবে আমি বলেছি, এটিও হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ। আজ আমরা তাঁর সাথে কৃত আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রতিশ্রুতিসমূহ নিত্য-নতুন ভাবে পূর্ণ হতে দেখছি। আজ আল্লাহ্‌ তা’আলার এ ইলহামকে এক ভিন্ন মহিমায় পূর্ণ হতে দেখছি।

আল্লাহ্‌ তা’আলা হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জামাতকে বিশেষভাবে আরববিশ্বের জন্য নতুন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আজ একটি নতুন চ্যানেল MTA-3 আল্‌ আরাবিয়াহ্‌ চালু করার তৌফিক দান করেছেন; যা ২৪ঘন্টা আরবী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে, যেন হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) যে ধনভান্ডার বিতরণ করেছেন, সে ভান্ডার থেকে আরব বিশ্বের পিপাসার্ত হৃদয়, নেক প্রকৃতির মানুষ ও পুণ্যাত্মারা কল্যাণমন্ডিত হতে পারে। এ চ্যানেল চালু করার কারণে বিরোধীতাও আরম্ভ হয়েছে। আরবেও জামাতের বিরুদ্ধবাদীরা রয়েছে। যে স্যাটেলাইট কম্পানীর সাথে চুক্তি হয়েছে তাদেরকেও হুমকি দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু যেভাবে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেছে���, খোদা এখন এই বাণী প��ঁ��াতে চান, তাই এখন এটি খোদ����র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রসার লাভ করবে এবং কেউ একে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ্‌। দোয়া করুন যারা এ বাণী পৌঁছানোর লক্ষ্যে সাহায্য করছে আল্লাহ্‌ তা’আলা যেন তাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রাখেন, আর তাদেরকে স্বীয় চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকারও তৌফিক দান করুন এবং পুণ্যাত্মাদেরকে এই আধ্যাত্মিক খাবার থেকে কল্যাণ লাভেরও তৌফিক দিন। এ বিষয়ে আমাদের তিল পরিমানও সন্দেহ নেই, মুসলমানদের অধিকাংশ এ বাণী গ্রহণ করবে। এটিও হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রতিশ্রুতি।

একটি ইলহাম আছে, ‘ইন্নি মায়াকা ইয়াবনা রাসূলিল্লাহি’ ধরাপৃষ্ঠে বসবাসকারী সকল মানুষকে একমাত্র ধর্মে একত্রিত কর, ‘আলা দ্বীনিন ওয়াহিদিন’ আরবী অংশের অনুবাদ হচ্ছে ‘হে আল্লাহ্‌র রসূলের পুত্র আমি তোমার সাথে আছি।’ (রাবোয়া থেকে ২০০৪ সনে প্রকাশিত, তাযকিরাহ্‌, ৪র্থ খন্ড ৪৯০ পৃষ্ঠা; ১৯৮৪ সনে লন্ডন থেকে প্রকাশিত, মলফুজাত ৮ম খন্ড, ২৬৬ পৃষ্ঠা)

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল মুসলমানদের একমাত্র ধর্মে ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়টি একটি বিশেষ বিষয়। তিনি বলেন, নির্দেশ এবং আদেশ দু’ধরণের হয়ে থাকে; একটি শরীয়তের আকারে যেমন, নামায পড়, যাকাত দাও, হত্যা করো না ইত্যাদী।........ এমন নির্দেশের মধ্যে এক ধরণের ভবিষ্যদ্বাণীও থাকে অর্থাৎ কতক এমনও হবে যারা এ নির্দেশকে লঙ্ঘন করবে। বস্তুত এটি শরীয়তের সাথে সম্পর্কযুক্ত নির্দেশ..........।

দ্বিতীয় নির্দেশ ‘কুনী’ (অর্থাৎ হও) আর এ আদেশাবলী ও নির্দেশ তকদীরের আকারে প্রকাশিত হয়, যেমন قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْداً وَسَلاما আর এটি পুরোপুরি প্রকাশিত হয়েছে। (যখন আগুন ঠান্ডা হবার নির্দেশ পেয়েছে তখন তা ঠান্ডা হয়ে গেছে) আমার ইলহামের যে নির্দেশ এটিও এ ধরণেরই মনে হয় অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তা’আলা চান যে, পৃথিবীর সকল মুসলমান আলা দ্বীনিন ওয়াহিদিন (ইসলাম ধর্মে) সমবেত হোক আর তা অবশ্যই হবে। এর অর্থ এ নয় যে, তাদের মাঝে কোন প্রকার মতৈক্য থাকবে না; মতভেদও থাকবে কিন্তু তা অনুল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বহীন হবে।” (আল হাকাম, ৯ম খন্ড, নাম্বার ২২, ৩০শে নভেম্বর, ১৯০৫-পৃষ্ঠা-২; লন্ডন থেকে প্রকাশিত, মলফুজাত ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৬৬-২৬৭, নাম্বার ১৯৮৪)

আল্লাহ্‌ তা’আলা মুসলমানদেরকে অতি সত্ত্বর এ আহবানে সাড়া দিয়ে একমাত্র ধর্মে (ইসলাম) সমবেত হবার তৌফিক দিন আর আমরা যেন আমাদের জীবদ্দশায় এ দৃশ্য দেখতে সক্ষম হই। যেভাবে আমি বলেছি আজ এমটিএ আল্‌ আরাবিয়াহ্‌-৩ এর গোড়াপত্তন হচ্ছে তাই এ দৃষ্টিকোন থেকে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)- আরবদের সম্বোধন পূর্বক যে বাণী প্রদান করেছেন, তাঁর ভাষায় এর কিছু অংশ পাঠ করছি। আমি কেবল এর অনুবাদই পাঠ করবো। আল্লাহ্‌ তা’আলা সত্ত্বর আরব বিশ্বের বক্ষ উম্মুক্ত করুন যেন তারা যুগ ইমামকে চিনতে সক্ষম হোক।

তিনি (আঃ) আরব বিশ্বকে উদ্দেশ্য করে স্বীয় বাণীতে বলেছেনঃ

“আসসলামু আলাইকুম ! হে আরবের খোদাভীরু ও মনোনীত মানুষ! আসসলামু আলাইকুম। হে নবীর পবিত্র ভূমির অধিবাসী ও খোদার মহান গৃহের পার্শ্বে বসবাসকারীগণ, তোমরা ইসলামের সকল জাতীর মধ্যে সর্বোত্তম জাতি এবং মহামহিম খোদার সবচেয়ে নির্বাচিত দল। কোন জাতি তোমাদের শ্রেষ্ঠত্বের কাছেও পৌঁছতে পারবে না। তোমরা সম্মান ও মহিমায় আর মাকাম ও মর্যাদায় সবার তুলনায় এগিয়ে রয়েছো। তোমাদের জন্য এ গৌরবই যথেষ্ট, আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বীয় ওহীর সূচনা হযরত আদম থেকে আরম্ভ করে সে নবীর উপর চুড়ান্ত করেছেন যিনি তোমাদের মধ্য থেকে ছিলেন আর তোমাদের ভূমিই তাঁর দেশ, আবাসস্থল ও জন্মভূমি ছিল। সে নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) মনোনীতদের নেতা, নবীদের গৌরব, খাতামুর্‌ রসূল ও বিশ্ব ইমামের সত্যিকার মর্যাদা সম্পর্কে তোমাদের কিসে অবহিত করবে? প্রত্যেক মানুষের উপর তাঁর অনুগ্রহ একটি প্রমাণিত সত্য এবং তাঁর ওহী অতীতের সকল সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক রহস্য এবং সকল উন্নত ও সুমহান কথামালা নিজের মাঝে ধারণ করেছে। সত্যিকার তত্বজ্ঞান ও হেদায়াতের পথ যা হারিয়ে গিয়েছিল সেসবকে তাঁর ধর্ম পুনরুজ্জীবিত করেছে। হে আল্লাহ্‌! তুমি পৃথিবীতে অবস্থিত পানির সকল বিন্দু ও অনু, সকল জীবিত ও মৃত আর যা কিছু আকাশসমূহে আছে এবং যা কিছু প্রকাশ্য ও গোপন তাঁর (সাঃ) উপর এসব কিছুর সমসংখ্যক রহমত, শান্তিএবং আশিস প্রেরণ করো। আমাদের পক্ষ থেকে তাঁর উপর এত বেশি সালাম পৌঁছাও যাতে আকাশ প্রান্ত পর্যন্ত ভরে যায়। কল্যাণমন্ডিত সে জাতি যারা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আনুগত্যের যোয়াল নিজেদের কাঁধে নিয়েছে এবং বরকতপূর্ণ সে হৃদয় যা তাঁর (সাঃ) দিকে ধাবিত হয়েছে আর তাঁর মাঝে হারিয়ে গেছে এবং তাঁর ভালোবাসায় বিলীন হয়েছে। হে সে দেশের বাসিন্দারা যাকে মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-চরণধূলা দিয়ে ধন্য করেছেন, আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর দয়া করুন এবং তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন আর তিনি তোমাদের সন্তুষ্ট করুন। হে খোদার বান্দারা! আমি তোমাদের সম্পর্কে অত্যন্ত ভাল ধারণা রাখি এবং আমার আত্মা তোমাদের সাক্ষাত লাভের জন্য উদগ্রীব। যে দেশে সৃষ্টির সেরা মানবের পদধূলি পড়েছে আমি তোমাদের সে দেশ দেখা এবং সেদেশের মানুষকর্তৃক কল্যাণমন্ডিত হওয়া, সে দেশের মাটিকে নিজ চোখের জন্য সুরমা বানানো, আর মক্কা ও মক্কার পুণ্যবান মানুষ ও পবিত্র স্থানসমূহ এবং সেথায় বসবাসকারী জ্ঞানীদের দেখার ব্যাপারে লোভাতুর দৃষ্টি রাখি, যাতে করে সেখানকার সম্মানিত আউলিয়া ও সুদর্শন দৃশ্যাবলী দেখে আমার নয়ন জুড়ায়। সুতরাং আমি খোদাতা’লার কাছে মিনতি করি যেন তিনি আমাকে অশেষ দয়ায় তোমাদের দেশকে দেখার সৌভাগ্য দান করেন আর তোমাদের দেখে যেন আমি আনন্দিত হতে পারি। হে আমার ভাইয়েরা! তোমাদের এবং তোমাদের দেশের প্রতি আমার একান্ত ভালবাসা রয়েছে। তোমাদের পথের ধূলা আর রাস্তার পাথরকেও আমি ভালবাসি আর আমি তোমাদেরকেই পৃথিবীর সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেই। হে আরবের প্রাণতুল্য মানুষ! আল্লাহ্‌ তা’আলা আপনাদেরকে অশেষ কল্যাণ, অগণিত গুণাবলী এবং সুমহান দানের জন্য বেছে নিয়েছেন। তোমাদের দেশে খোদার সে ঘর অবস্থিত যার মাধ্যমে ‘উম্মুল কোরা’ (মক্কা)-কে আশিসমন্ডিত করা হয়েছে আর তোমাদের মাঝে সে বরকতময় নবীর সমাধি রয়েছে, যিনি বিশ্বের সকল দেশে একত্ববাদের বিস্তার করেছেন আর আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রতাপ বিকশিত করেছেন। তোমাদের মধ্যে সেসব মানুষ ছিলেন যারা নিজেদের মন-প্রাণ এবং পুরো বুদ্ধি-বিবেচনা নিয়োজিত করে আল্লাহ্‌ তা’আলা এবং তাঁর রসূল (সাঃ)-এর সাহায্য করেছেন, খোদার ধর্ম এবং তাঁর পবিত্র গ্রন্থের প্রচারকল্পে স্বীয় ধন-প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ শ্রেষ্ঠত্ব আপনাদেরই বৈশিষ্ট্য এবং যে আপনাদের যথাযথ সম্মান করেনা সে নিশ্চয় যুলম ও অন্যায় করে। হে আমার ভাইয়েরা! আমি ক্ষত-বিক্ষত হৃদয় আর অশ্রু প্লাবিত নয়নে আপনাদের কাছে এ পত্র লিখছি। সুতরাং আমার কথা শুনুন, আল্লাহ্‌ তা’আলা আপনাদেরকে এর উত্তম প্রতিদান দিন।” (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, লন্ডন থেকে প্রকাশিত-রূহানী খাযায়েনএর ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৪১৯-৪২২)

পুনরায় তিনি (আঃ) বলেন,

“হে আরবের অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত জাতি, আমি মনে-প্রাণে আপনাদের সাথে আছি। আমার প্রভু আমাকে আরবদের সম্পর্কে শুভসংবাদ দিয়েছেন আর ইলহাম করেছেন, আমি যেন তাদেরকে সাহায্য করি এবং সঠিক পথ দেখাই এবং তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে সঠিক খাতে পরিচালিত করি। আপনারা এ কাজে আমাকে কৃতকার্য ও সফলকাম পাবেন, ইনশাআল্লাহ্‌ তা’আলা। হে প্রিয়গণ! কল্যাণের আধার খোদাতা’লা ইসলামের সাহায্য ও ��ংস্কারের লক্ষ্যে আমার উপর তাঁ��� বিশেষ বিকাশ ঘটিয়ে���েন আ�� আমার উপর স্বীয় কল্যাণবারী বর্ষণ করেছেন। আমাকে বিভিন্ন প্রকার নিয়ামতে ভূষিত করেছেন। আমাকে ইসলাম এবং নবী করীম (সাঃ)-এর উম্মতের দুরবস্থার সময়ে স্বীয় বিশেষ কৃপা, বিজয় এবং সাহায্য-সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। সুতরাং হে আরব জাতি! আমি তোমাদেরকেও এ নিয়ামতরাজিতে অন্তর্ভূক্ত করার ইচ্ছা করেছি। এ দিনের জন্য আমি অধীর আগ্রহে প্রতিক্ষারত ছিলাম। সুতরাং তোমরা সমগ্র বিশ্বপ্রতিপালক খোদার খাতিরে আমার সাথী হবার জন্য প্রস্তুত কি?” (হামামাতুল বুশরা, লন্ডন থেকে প্রকাশিত-রূহানী খাযায়েন এর ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ১৮২-১৮৩)

সুতরাং হে আরব ভুখন্ডের অধিবাসীরা! আজ আমি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বপ্রতিপালক খোদার নামে তোমাদের কাছে আবেদন করছি, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর এ আধ্যাত্মিক সন্তানের আহবানে সাড়া দাও যাঁর শিক্ষা এবং রসূল প্রেমের কিছু নমুনা বা কতিপয় দৃষ্টান্ত আমি উপস্থাপন করেছি। যদি এ মসীহ্‌ এবং মাহ্‌দীর উক্তি ও লেখনীতে অবগাহন করে দেখ তাহলে এক ও অদ্বিতীয় খোদার সাথে সম্পর্ক ও ভালবাসা আর হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) প্রতি প্রেম ও তাঁর জন্য আত্মাভিমানের প্রেরণা ছাড়া এর মাঝে আর কিছুই দেখা যাবে না। পরিষ্কার হৃদয় নিয়ে যদি দেখ তাহলে জামাতে আহ্‌মদীয়ার শতাধিক বছরকালের ইতিহাস এর সাক্ষ্য বহন করে, জামাতের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত খোদাতা’লার সাহায্য ও সমর্থনের অভিজ্ঞতা করে আসছে। আজ এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আপনাদের কাছে ব্যাপকভাবে এ পয়গাম পৌঁছাও সেই সাহায্য ও সমর্থনেরই একটি ধাপ।

আল্লাহ্‌ তা’আলা আজ এ ব্যবস্থা করেছেন যে, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর মান্যকারী একটি ছোট্ট দরিদ্র জামাত, এক এক পয়সা জমা করে কেবল আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্তুষ্টির খাতিরে এ যুগের ইমামের বার্তা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোমাদের কাছে পৌঁছানোর সৌভাগ্য লাভ করছে। সুতরাং কুধারণা যা খোদার দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় তা পরিহার করতঃ সুধারণা পোষণ কর এবং খোদাতা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহ্‌র এ পাহ্‌লোয়ানের সাহায্য ও সমর্থ‎নের জন্য সোচ্চার হও আর বিরোধীতার পরিবর্তে এ মসীহ্‌ ও মাহ্‌দীর আহবানের প্রতি কর্ণপাত কর, যাকে মহানবী (সাঃ)-এর সাথে কৃত স্বীয় প্রতিশ্রুতি মোতাবেক খোদাতা’লা ইসলামের পুনর্জাগরনের লক্ষ্যে আবির্ভূত করেছেন। তাই আস এবং সে মসীহ্‌ ও মাহদীর অস্বীকারকারীদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবার পরিবর্তে তাঁর সাহায্যকারী হয়ে যাও কেননা আজ উম্মতে মুসলেমা বরং সমগ্র বিশ্বের মুক্তি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (আঃ)-এর এ নিষ্ঠাবান প্রেমিককে সাহায্য করার সাথে সম্পৃক্ত।

হে আরববাসীগণ! হৃদয়ে খোদাভীতি সৃষ্টি করে খোদার জন্য এই বেদনা বিধুর আহবানে সাড়া দাও আর সে বেদনাকে অনুভব করো যার সাথে এ মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী তোমাদেরকে আহবান করছেন। আস এবং তাঁর পরম সাহায্যকারী হও। স্মরণ রেখো! তাঁর সাথে খোদাতা’লার এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তিনি তাঁকে বিশ্বে জয়যুক্ত করবেন। তোমরা নয়তো তোমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ আশিস থেকে কল্যাণ লাভ করবে তারপর তারা নিশ্চয় এ বিষয়ে আক্ষেপ ও পরিতাপ করবে যে হায়, আমাদের প্রবীণরাও যদি আঁ-হযরত (সাঃ)-এর নির্দেশকে অনুধাবন করতঃ আল্লাহ্‌র রসূলের এ প্রেমিক এবং মসীহ্‌ ও মাহ্‌দীর সাহায্যকারী হতো আর তাঁর জামাতে অন্তর্ভূক্ত হতো! আল্লাহ্‌ করুন যেন তোমরা আজ এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারো। আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের এই বিনীত দোয়াসমূহ্‌ গ্রহণ করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে