In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘মালিক’ (পূর্ণ আধিপত্যের অধিকারী ও পুরো নিয়ন্ত্রক)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৯ই মার্চ, ২০০৭ইং

“সূরাতুল ফাতিহায় বর্ণিত ঐশী গুণাবলী ভিত্তিক খুতবার ধারাবাহিকতায় আল্লাহ্‌ তা’আলার ‘মালিক’ বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, অভিধান এবং তফসীরকারকদের তফসীর ছাড়াও হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর তত্বপূর্ণ ব্যাখ্যার আলোকে আলোচনা।”

“আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্তুষ্টি এবং তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতি প্রণিধান এবং নিজেকে সে মোতাবেক পরিবর্তন করা একান্ত আবশ্যক।”

“গত খুতবায় যে শহীদের কথা বলেছিলাম তাঁর নাম মুহাম্মদ আশরাফ, তিনি মন্ডি বাহাউদ্দিনের ফালিয়া তহশিলের বাসিন্দা ছিলেন।”

“জামাতের প্রবীণ সেবক ও মুরব্বী এবং জামেয়া আহ্‌মদীয়া রাবোয়ার শিক্ষক মোকাররম চৌধুরী মুনির আহমদ আরেফ সাহেব এর ইন্তেকাল এবং তাঁর বিভিন্ন খিদমতের বিবরণ।”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

আল্লাহ্‌ তা’আলার বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘মালিক’, সূরা ফাতিহায় যার উল্ল্যেখ রয়েছে। গত কিছু দিন থেকে আল্লাহ্‌ তা’আলার গুণবাচক নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আর সূরাতুল ফাতিহায় আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর গুণবাচক নামসমূহের যে ধারা বিন্যাস রেখেছেন, সে মোতাবেকই আমি আলোচনা শুরু করেছিলাম তাই একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজ আল্লাহ্‌ তা’আলার ‘মালিকিয়্যাত’ বৈশিষ্ট্যের আলোচনা হবে। আমরা অবহিত আছি যে, ধারা বিন্যাসের দৃষ্টিকোন থেকে আল্লাহ্‌ তা’আলা একে চতুর্থ নাম্বারে বর্ণনা করেছেন।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“খোদাতা’লার চতুর্থ ইহসান বা কৃপা যা চতুর্থ প্রকারের গুণ, যাকে বিশেষতম কল্যাণ নামে আখ্যায়িত করা যায় তা হচ্ছে, মালিকিয়্যাতে ইয়াওমিদ্দিন। সূরা ফাতিহায় এটি মালিকি ইয়াওমিদ্দিন বাক্যে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে এবং রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, রহীমিয়্যতে দোয়া এবং ইবাদতের মাধ্যমে সাফল্যের যোগ্যতা অর্জিত হয় আর মালিকিয়্যাতে ইয়াওমিদ্দিন বৈশিষ্ট্যের অধীনে সে ফল প্রদান করা হয়।” (আইয়ামুস সুলেহ্‌, লন্ডন থেকে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন, পৃষ্ঠাঃ ২৫০)

অর্থাৎ রহীমিয়্যাতের কল্যাণে দোয়া এবং ইবাদতের প্রতি মনযোগ নিবদ্ধ হয়, মানুষ দোয়া এবং ইবাদত করে, তাঁর কাছে যাচনা করে আর মালিকিয়্যাত থেকে এর ফল লাভ হয়। আল্লাহ্‌ তা’আলার এ ধারা বিন্যাস পরম প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং প্রত্যেককে তাঁর শক্তিমত্তার ঝলক প্রদর্শন করে, প্রত্যেক সে ব্যক্তিকে প্রদর্শন করে যে তাঁর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তাঁর খাঁটি বান্দা হবার ব্যাপারে সচেষ্ট। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এ সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু তা উপস্থাপনের পূর্বে আমার রীতি অনুসারে, অভিধান এবং অন্যান্য তফসীরকারকগণ যে তফসীর করেছেন তা বর্ণনা করছি।

মুফরাদাত ইমাম রাগেবে লিখিত আছে যে, ‘আল্‌ মালিক’ তাঁকে বলা হয় যিনি সর্ব সাধারণের মাঝে নিজের আদেশ-নিষেধ সম্বলিত নির্দেশাবলী ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করেন। এ বিষয়টি কেবল মানুষের তত্ত্বাবধান অর্থাৎ তাদের বিষয়াদী পরিচালনা ও তাদের উপর রাজত্ব করার জন্য নির্ধারিত। এ কারণে ‘মালিকুন নাস্‌’ বলা হয় কিন্তু ‘মালিকুল আশিয়া’ বলা হয় না। আবার বলেন, খোদার উক্তি مَالك يَوْم الدِّين এর অর্থ তিনি শান্তি ও পুরস্কার দিবসে সর্বাধিপতি হবেন। আলেমদের দৃষ্টিতে একে দু’ভাবে পড়া যায়। مَلك يَوْم الدِّين ও পাঠ করে আবার مَالك يَوْم الدِّين ও, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে مَالك يَوْم الدِّين পাঠ করা হয়। এ অর্থ আয়াত لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ আলোকে করা হইয়েছে, অর্থাৎ আজ রাজত্ব বা কর্তৃত্ব কার? আল্লাহ্‌রই যিনি এক অদ্বিতীয় এবং মহা প্রতাপশালী।

এছাড়া লিসানুল আরবে লিখা আছে, الملک (আল্‌ মালিকু) আল্লাহ্‌, অধিপতি। مالک الملوک (মালিকুল্‌ মুলুক) রাজাধিরাজ, এরপরে لہ الملک (লাহুল্‌ মুলকু), রাজত্ব তাঁরই এবং ھومالک یوم الدین (হুয়া মালিকু ইয়াওমিদ্দীন) তিনি শাস্তি এবং পুরস্কার দিবসের মালিক, ھوملیک الخلق و (ওয়া হুয়া মালিকুল্‌ খালক্‌) এর অর্থ লিখেছেন, ربھم و مالکھم (রব্বুহুম ওয়া মালিকুহুম) তিনি সৃষ্টির প্রভু-প্রতিপালক এবং অধিপতি।

হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) মালিক এর পাশাপাশি ইয়াওম এবং দ্বীন শব্দের অর্থ নির্ণয় করে লিসানুল আরবের দৃষ্টিকোন থেকে مَالك يَوْم الدِّين এর বিস্তারিত অর্থ লিখেছেন। তিনি (রাঃ) লিখেন, এর অর্থ দাঁড়াবে শান্তি ও পুরষ্কার প্রদানকালের অধিপতি, শরীয়তের বিধান প্রবর্তণকালের মালিক, এবং সিদ্ধান্ত প্রদান কালের মালিক, ধর্মের যুগের মালিক। এর অর্থ হচ্ছে, যখন ধর্ম ও শরীয়তের ভিত্তি স্থাপন করা হয় তখন আল্লাহ্‌ তা’আলা মালিকিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। দুর্বলতা সত্বেও নিজ প্রিয়দের মালিকিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের অধীনে বিজয় দান করেন। তারপরে ‘পাপ-পূণ্যকালের মালিক’ অর্থাৎ যখন পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে তখন যুগের মালিক সংস্কারক এবং নবী প্রেরণ করে স্বীয় মালিকিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের অধীনে সংস্কার করেন। হিসাব-নিকাশকালের মালিক। আনুগত্য কালের মালিক অর্থাৎআনুগত্যকারীদের জন্য প্রকৃতির বিশেষ নিয়ম প্রকাশ করেন আর নিদর্শনাবলীও প্রকাশিত হয়। ‘বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার মালিক’ অর্থাৎ তিনি তাঁর নির্দেশনানুযায়ী জীবন-যাপনকারীদে��� ���ুরস্কৃত করেন। যার���� শ���ষ মূহুর্ত পর্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে নিজেদের অবস্থাকে নির্দেশ মোতাবেক রাখে, তাঁর নির্দেশ সম্মত রাখে, তারা তার মাধ্যমে উপকৃত হয়।

অতীতের কতক তফসীরকারকের উদ্ধৃতি পেশ করবো কিন্তু তার আগে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) ‘মালিক’ এর যে ব্যাখ্যা করেছেন তা উপস্থাপন করছি যা তিনি (আঃ) ‘লিসানুল আরব’ এবং ‘তাজুল উরুস’ এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আরবী অভিধানে ‘মালিক’ তাকে বলা হয় যার স্বীয় সত্বের উপর পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে আর যেভাবে ইচ্ছা তা ব্যবহার করতে পারে, অর্থাৎ এর উপর তাঁর অধিকার অংশীদারিত্ব মুক্ত। সকল অর্থের নিরিখে এ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে, খোদা ছাড়া অপর কারো জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। কেননা পুরো নিয়ন্ত্রণ, পূর্ণ ক্ষমতা আর পুরো অধিকার খোদা ব্যতীত অন্য কারো জন্য স্বীকৃত নয় আর তাঁরই সবকিছুর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত, মালিক হিসেবে, রব্ব হবার কল্যাণে।

আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী বলেন, مَالك يَوْم الدِّين এর অর্থ হচ্ছে, পুনরুত্থান এবং শান্তি ও পুরষ্কার দিবসের মালিক। এর বিস্তারিত বিবরণ এভাবে দেয়া যায়; সৎকর্মশীল ও পাপী, বাধ্য ও অবাধ্য এবং পক্ষ ও বিপক্ষের মাঝে পার্থক্য হওয়া আবশ্যক আর এ পার্থক্য কেবল শাস্তি এবং পুরষ্কার দিবসেই প্রকাশিত হতে পারে। যেভাবে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, لِيَجْزِيَ الَّذِينَ أَسَاءُوا بِمَا عَمِلُوا وَيَجْزِيَ الَّذِينَ أَحْسَنُوا بِالْحُسْنَى (সূরা আন্‌ নাজ্‌মঃ৩২) যারা মন্দ কর্ম করে তাদেরকে তাদের কৃত-কর্ম অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান, এবং যারা উত্তম কর্ম করে তাদেরকে উত্তমভাবে পুরষ্কার দান করা হলো এর উদ্দেশ্য; পুনরায় আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ (সূরা সাদঃ ২৯) যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে আমরা কি তাদেরকে পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের সমান গণ্য করবো? অথবা মুত্তাকীদেরকে কি আমরা দুস্কৃতিকারীদের সমতুল্য সাব্যস্ত করবো।

আবার আল্লাহ্‌ বলেন, إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى (সূরা তাহাঃ ১৬) নিশ্চয় কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী আমি শীঘ্রই তা প্রকাশ করবো যেন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই চেষ্টানুযায়ী কর্মফল দেয়া যেতে পারে।

ইমাম রাযী (রহঃ) আরো বলেন, একথাও পরিষ্কার হওয়া উচিৎ, যে একজন অত্যাচারীকে; উৎপীড়িতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদান করে, যদি সে অত্যাচারীর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করে তাহলে হয়তো দূর্বল হবার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ করে না; দুর্বলতা রয়েছে তাই প্রতিশোধ নেয় না, বা শিক্ষাহীনতা ও অজ্ঞতার কারণে বা সে স্বয়ংও অত্যাচারীর অত্যাচারে সন্তুষ্ট তাই। তিনি বলেন, এ তিন’টির কোনটিই আল্লাহ্‌ তা’আলার সম্পর্কে প্রযোজ্য হতে পারেনা। তাই অত্যাচারীতের খাতিরে অত্যাচারীর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ তাঁর জন্য আবশ্যক। যেহেতু এ পর্থিব আবাসে অর্থাৎ এ পৃথিবীতে অত্যাচারীর নিকট থেকে পুরোপুরি প্রতিশোধ গ্রহণ সম্ভব হয় না তাই এ পার্থিব জীবনের পরে পরকালীন আবাস থাকা বাঞ্চনীয়। এ বিষয়ই مَالك يَوْم الدِّين এবং فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْراً يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرّاً يَرَهُ (সূরা যিলযালঃ ৮-৯) বর্ণিত হয়েছে।

আমি পূর্বেই বলেছিলাম যে, কতক আলেমের দৃষ্টিতে مَالك يَوْم الدِّين এর আরেকটি পাঠ বা সংস্করণ হচ্ছে مَلك يَوْم الدِّين । কিন্তু আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী বলেন, مَالك يَوْم الدِّين এর ক্বিরাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এজন্য তিনি লিখেন, مَلك শব্দের তুলনায় مَالك বান্দাকে স্বীয় প্রভুর অনুগ্রহরাজি সম্পর্কে অনেক বেশি আশার আলো দেখিয়ে থাকে। কেননা مَلك অর্থাৎ বাদশার কাছে সর্বোচ্চ যা আশা করা যেতে পারে তা হলো ন্যায় বিচার বা সুবিচার কিন্তু একই সাথে তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ারও মানুষ চেষ্টা করে। অপরদিকে مَالك তিনি যাঁর কাছে বান্দা নিজ পোষাক-পরিচ্ছদ, খাবার, দয়া, শিক্ষা ও প্রতিপালন তথা সবকিছুর প্রত্যাশী হয়ে থাকে। সুতরাং مَالك يَوْم الدِّين مَالك শব্দ ব্যবহার করে বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন যে, হে আমার বান্দা! আমি তোমাদের মালিক, তোমাদের পানাহার, পোষাক-পরিচ্ছদ, তোমাদের শাস্তি-পুরস্কার এবং জান্নাত সবই আমার নিয়ন্ত্রণে।

এরপরে দ্বিতীয় কথা তিনি বলেনঃ মালিক বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। অনেক সময় একজন মালিক বা রাজা আরেক মালিক বা বাদশার তুলনায় বেশি সম্পদশালী হয়ে থাকেন; সামান্য জিনিষের যে অধিকারী তাকেও সে বস্তুর মালিক বলা হয় কিন্তু রাজার কর্তৃত্বের গন্ডি অনেক ব্যাপক হয়ে থাকে। সে দৃষ্টিকোন থেকে তিনি বলেন যে, مَلك (কোন সামান্য বস্তুর মালিক) তোমার কাছে কিছু পাবার প্রত্যাশা রাখে, কিন্তু مالك তিনি যাঁর কাছে তুমি প্রত্যাশা কর। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের কাছে পূণ্যকর্ম ও আনুগত্যের দাবী রাখবেন না বরং তিনি চাইবেন আমরা যেন তাঁর কাছে প্রত্যাশা করি, তিনি কেবল নিজ করুণায় আমাদের সাথে ক্ষমা, মার্জনা এবং মাগফিরাতের আচরণ করেন আর আমাদেরকে তাঁর জান্নাত প্রদান করেন। এজন্য ইমাম কেসাঈ বলেন, আমি مَلك يَوْم الدِّين এর পরিবর্তে مَالك يَوْم الدِّين ই পাঠ করি কেননা এ পাঠ আল্লাহ্‌ তা’আলার অশেষ অনুগ্রহ ও ব্যাপক দয়ার সাক্ষ্য বহন করে।

তাঁর মতে مَلك এবং مَالك এর মধ্যে তৃতীয় পার্থক্য হচ্ছে, যখন রাজার সম্মুখে সৈনিক হাজির করা হয় তখন তিনি তাদের মধ্যে থেকে অসুস্থ ও দুর্বলদের বাদ দেয় আর কেবল সুঠামদেহী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে আর দুর্বল এবং অসুস্থ্যদের কিছুই দেয় না কিন্তু مَالك তিনি যার কোন চাকর রোগাক্রান্ত হলে তিনি তার চিকিৎসা করান, দাস দুর্বল হলে مَالك স্বয়ং তাকে সাহায্য করেন, যদি দাস কোন সমস্যায় নিপতিত হয় তাহলে তাকে উদ্ধার করেন। অতএব مَلك এর পরিবর্তে مَالك এর ক্বিরাত পাপী এবং অসহায়দের জন্য বেশি যুক্তিযুক্ত।

مَلك এবং مَالك এর মধ্যে চতুর্থ পার্থক্য হচ্ছেঃ যেখানে مَلك বা রাজার মধ্যে ত্রাস এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালনার কারণে দাপট পরিলক্ষিত হয় সেখানে مَالك এর মধ্যে দয়া ও করুণা পাওয়া যায় আর বান্দাদের জন্য ত্রাস ও দাপটের পরিবর্তে দয়া ও করুণা বেশি প্রয়োজন।

আবু আব্দুল্লাহ্‌ মুহাম্মদ বিন আহমদ আল্‌ কুরতবী এ প্রসঙ্গে লিখেন, যদি এ প্রশ্ন উঠে যে, مَالك يَوْم الدِّين এ আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বয়ং নিজেকে কিভাবে সে বস্তুর মালিক আখ্যা দিলেন যার এখনও অস্তিত্বই নেই এর উত্তর হলো, مَالك এর অর্থ, ক্ষমতার অধিকারী অর্থাৎ বিচার দিবসে তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন বা বিচার দিবস ও শাস্তি-পুরষ্কার দিবসের উপরে এবং একে ধ্বংস করার ব্যাপারে পুরো শক্তি তিনি রাখবেন কেননা, যে কোন জিনিষের মালিক তার সে বস্তুকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও থাকে। যেমন হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন, আল্লাহ্‌তালার পুরো শক্তি রয়েছে এবং নিজের সৃষ্টির সকল সত্ত্বের উপরও তাঁর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি সবকিছুর মালিক, পছন্দ অনুসারে নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়নকারী। তাঁর জন্য কোন কিছুই অসাধ্য ও অসম্ভব নয়। যদি এ প্রশ্ন উঠে, আল্লাহ্‌ তা’আলা বিচার দিবসসহ সব কিছুর মালিক, কিন্তু এখানে কেবল يَوْم ��لدِّ��ن এর কথা ক��ন ���িশেষভাব����� উল��লেখ করলেন। এর উত্তর হলো, এ পৃথিবীতে মানুষ ফিরআউন এবং নমরূদের মত রাজাদের বিরোধীতা করে, বড় বড় বাদশাহ্‌, শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর লোকদের বিরুদ্ধেও মুখ খোলে। আজও দেখুন শক্তিধরদের বিরুদ্ধে অনেক দরিদ্র মানুষও দাঁড়িয়ে যায়। তার শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু সেদিন অর্থাৎ শাস্তি ও পুরষ্কার দিবসে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্‌ তা’আলার সামনে তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে বিতর্ক করতে পারবে না। যেমন, তিনি বলেন, ‘লিমানিল মুলকুল্‌ ইয়াওমা’ আজকের দিনে রাজত্ব কার? তখন সকল সৃষ্টি উত্তর দিবে ‘লিল্লাহিল ওয়াহিদুল কাহ্‌হার’ এর ভিত্তিতেই مَالك يَوْم الدِّين বলা হয়েছে অর্থাৎ তিনি ব্যতীত সেদিন কোন মালিক ও হবেনা আর কোন সিদ্ধান্ত প্রদানকারীও হবেনা আর শাস্তি-পুরষ্কার প্রদানেরও কারো কোন অধিকার থাকবেনা। আল্লাহ্‌ পবিত্র, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।

পুনরায় বলেন, আল্লাহ্‌ তা’আলার বৈশিষ্ট্যাবলীর মধ্যে الملک এবং المالک ও রয়েছে।الملک আল্লাহ্‌ তা’আলার সত্ত্বার বৈশিষ্ট্য আর المالک তাঁর কর্মবাচক গুণ।

হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ)-ও এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমি পূর্বেই বলেছি, তিনি বিভিন্ন অভিধানের আলোকে (এশব্দ সম্পর্কে) যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তার ভিত্তিতে مَالك يَوْم الدِّين এর অর্থ কি হতে পারে তা স্পষ্ট করেছেন। এর আরো ব্যাখ্যা রয়েছে, যেমন مَالك يَوْم الدِّين এর অর্থ এ নয় যে, তিনি পরকালের মালিক ইহকালের নয়, বরং অর্থ হচ্ছে, ইহকালে আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রাকৃতিক নিয়ম এবং স্বীয় অন্যান্য গুণাবলীর আওতায় মানুষের জন্য কতক জিনিষ নির্ধারিত করে রেখেছেন, অবকাশ বা ছাড় দিয়ে রেখেছেন। এ কারণে ইহকালে তাৎক্ষণিক শাস্তি-পুরস্কারের বিধান নেই কিন্তু শাস্তি-পুরষ্কারের জন্য নির্ধারিত দিবসে পালাবার কোন স্থান থাকবেনা, বরং আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বয়ং সব শাস্তি-পুরষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, কেউ কারো কাজে আসবে না। কোন ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা তখন কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّين- ثُمَّ مَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ - َوْمَ لا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِنَفْسٍ شَيْئاً وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ (সুরাতুল ইনফিতারঃ ১৮-২০) তোমাকে কিসে জানাবে যে, সে-ই বিচার দিবস কি! পুনরায় বলি, তোমাকে কিসে অবহিত করবে যে, সেই বিচার দিবস কি! যেদিন কোন মানুষ আদৌ অন্য কারো উপকার করার ক্ষমতা রাখবে না আর একমাত্র আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তই প্রবর্তিত হবে। এটি ভয়ের কথা কিন্তু এর পাশাপাশি এতে মুসলমানদের জন্য, মু'মেনদের জন্য, যারা আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশাবলীর উপর অনুশীলনকারী, সৎকর্ম সম্পাদনকারী, এ শুভসংবাদও আছে যে, যদি নিষ্ঠার সাথে তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চল তাহলে ‘বিচার দিবসের মালিক’ বৈশিষ্ট্য তোমাদেরকে সেই জান্নাতের উত্তরাধিকারী করবে, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ (সূরা আল্‌ হাজ্জঃ ৫৭) সেদিন সমস্ত আধিপত্য হবে একমাত্র আল্লাহ্‌র। তিনি তাদের মাঝে মিমাংসা করবেন। সুতরাং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারা নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে থাকবে।

যেভাবে আমি বলেছিলাম, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) ‘মালিক’ এর অর্থ করেছেন, পূর্ণ আধিপত্যের অধিকারী ও পুরো নিয়ন্ত্রক। তাঁর সব কিছুর উপর পুরো আধিপত্য ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। শাস্তি-পুরষ্কার দিবস কিরূপ হবে এ আয়াতে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ পুর্ণ আধিপত্য সেদিন আল্লাহ্‌ তা’আলারই হবে অর্থাৎ তিনি কেবল মালিকই নন, তিনি বাদশাহ্‌ও হবেন। ‘মালিক’ যার বিভিন্ন অর্থ পূর্বে আমি বর্ণনা করে এসেছি। কেউ মনে করতে পারে, সকল মালিক কর্তৃত্ব রাখেন না, কিন্তু ইনি সে মালিক যার মালিক হওয়ার পাশাপাশি রাজত্বও রয়েছে। সুতরাং তিনি এটি স্পষ্ট করেছেন যে, সব কিছু পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এ পৃথিবীর রাজারা কোন না কোন ভাবে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে, তাদের সম্মুখে মানুষ ঘুরেও দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ্‌ তা’আলা এরূপ রাজা বা বাদশাহ্‌ যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; ইহকালেও নন আর পরকালেও নন। তাই তাঁর রাজত্ব পার্থিব রাজাদের রাজত্বের ন্যায় নয় বরং মালিক হবার সুবাদে তাঁর রাজত্ব পুরো আধিপত্যপূর্ণ যা পৃথিবীতেও প্রতিষ্ঠিত আর আকাশেও। ইহজীবনে তিনি তাঁর মালিকিয়্যাতের অধীনে ছাড় দিয়ে রেখেছেন যেমনটি কিনা আমি পূর্বেই বলেছি। ভালো এবং মন্দ কর্ম সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, এগুলো সৎকর্ম, একাজ করলে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান লাভ করবে। এটি মন্দ কর্ম, যদি একাজ করো তাহলে আমি শাস্তি দেয়ারও অধিকার রাখি, শাস্তি দিতে পারি, শাস্তি দিবো। শাস্তি এবং পুরষ্কার প্রদানের অধিকার পুরোপুরি আমার হাতে। এ ব্যাপারে কেউ কারো কাজে আসবে না, কোন শুপারিশ কাজে আসবে না। সে সময়ে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বয়ং সিদ্ধান্ত প্রদানকারী। সুতরাং বিশ্বাস স্থাপনকারী ও সৎকর্মশীলদেরকে আল্লাহ্‌ তা’আলা ‘জান্নাতুন্‌ নাঈম’ অর্থ্যাৎ নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের শুভসংবাদ দিচ্ছেন। একই সাথে আল্লাহ্‌ তা’আলা অস্বীকারকারীদেরকে সেভাবে সাবধান করেন যেভাবে বিভিন্ন স্থানে অপকর্মকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, আমি তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি প্রদান করবো।

এক যায়গায় তিনি বলেন, إِنَّ كِتَابَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ (সূরা আল্‌ মুতাফ্‌ফেফীনঃ ৮) অর্থাৎ নিশ্চয় দুষকৃতিপরায়ণদের শাস্তি প্রদানের নির্দেশ একটি স্থায়ী পুস্তকে রয়েছে। এ অস্বীকারকারী এবং পাপাচারীরা মনে করতো যে, শাস্তি ও পুরষ্কার দিবস আসার নয়, তারা আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রদত্ত ছাড় ও অবকাশকে তাঁর আধিপত্যহীনতা মনে করতো। শাস্তি-পুরষ্কার দিবসকে ইহকালে প্রত্যাখ্যান করে বেড়িয়েছে, আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রদত্ত সীমা এবং বিধিনিষেধ ভঙ্গ করেছে; তাই আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, তাদের সীমাতিক্রম আর শাস্তি-পুরষ্কার দিবসকে অস্বীকার করার কারণে وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ (সূরা আল্‌ মুতাফ্‌ফেফীনঃ ১১) সেদিন সত্যকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য দুর্ভোগ। সুতরাং আল্লাহ্‌ তা’আলা مَلك এবং مَالكও আর কাজের ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি স্বাধীন। সৎকর্মশীলদের পুরষ্কার প্রদান করেন আর অপকর্মশীলদের শাস্তি প্রদান করেন। مَالك হবার সুবাদে যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তাঁর ক্ষমা করে দেয়ার ক্ষমতাও আছে। যেমনটি না তিনি বলেছেন, أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (সূরা আল্‌ মায়েদাহ্‌ঃ ৪১) তুমি কি অবহিত নও, যে আকাশ-মন্ডল ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহ্‌রই? তিনি যাকে চান শাস্তি দেন আর যাকে চান ক্ষমা করেন, বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ যা চান সে সবকিছু করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।

এর অর্থ এ নয় যে, কোন নিয়ম-নীতি ছাড়াই বিনা কারণে আল্লাহ্‌ তা’আলা ধরে শাস্তি প্রদান করেন। যেভাবে আমি পূর্বে বলেছি, এর অর্থ হচ্ছে, শাস্তি-পুরষ্কার দিবসে, কোন আপিল কাজে আসবে না। সে সময় কোন হাহুতাশ কাজে আসবে না। এজন্য আল্লাহ্‌ তা’আলা কর্মের প্রতি মন���োগ আকর্ষণ করেন, যদি সৎকর্মশীল হও তাহলে আমার সন্তুষ্টি অর্জনকারী হবে। যখন তোমরা জানো যে, কোন আর্তনাদ এবং কোন আপিল সে সময় কাজে আসার নয় তাই নিজেদের ঈমানকেও দৃঢ় কর, ন��জেদে��� কর্মের সংশোধ�� করো, শ��স্তি দে���ার ক্ষে��্রে আল্লাহ্‌ তা’আলা একান্তই নমনীয়। একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর দয়া তাঁর ক্রোধের উপর জয়যুক্ত হয়। এতদসত্বেও মানুষ যদি সেই পরম দয়ালু খোদার ক্রোধের লক্ষ্যে পরিণত হয় তাহলে কতবড় দুর্ভাগ্য।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন, “মালিকিয়্যাতে ইয়াওমিদ্দিন আপন কৃপা ও কল্যাণরাজি প্রকাশার্থে বিনীত অনুনয় বিনয় ও আকুতি-মিনতির দাবী রাখে।” যদি তাঁর কল্যাণ লাভ করতে চাও তাহলে একান্ত বিনয় ও দোয়ার মাধ্যমে তাঁর কাছে নত হওয়া আবশ্যক। “এ বৈশিষ্ট্য কেবল সেসব মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখে যারা ভিখারীর ন্যায় এক-অদ্বিতীয় খোদার আস্তানায় ভূ-লুন্ঠিত হয় এবং কল্যাণ লাভের আশায় ভিক্ষার হস্ত তাঁর সামনে প্রসারিত করে।” ঐশী কৃপা সন্ধানী একান্ত বিনয়ী ও দরিদ্র ব্যক্তির ন্যায় নিজের ভিক্ষার আঁচল পেতে তাঁর সম্মুখে দন্ডায়মান হয়। “সত্যিসত্যিই নিজেদেরকে রিক্ত হস্ত পেয়ে সর্বাধিপতি হিসেবে খোদাতা’লার উপর ঈমান আনে” তারা প্রকৃতপক্ষ্যে এ বিষয়টি জানেন এর পুরো জ্ঞান ও বুৎপত্তি রাখেন আর এরূপ বিনয়ের সাথে আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্নিধানে উপস্থিত হন যে, আমরা একবারেই রিক্ত হস্ত, আমাদের কাছে কিছুই নেই আর তাঁর মালিকিয়্যাতের উপর আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। আবার বলেন, “এ চারটি ঐশী বৈশিষ্ট্যই পৃথিবীতে ক্রীয়াশীল। এর মধ্যে রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য দোয়ার প্রেরণা সৃষ্টি করে, এবং মালিকিয়্যাত বৈশিষ্ট্য ভয় ও ব্যাকুলতার অগ্নিতে দহন করে সত্যিকার বিনয় ও নম্রতা সৃষ্টি করে কেননা, এ বৈশিষ্ট্য থেকে এটিই প্রমাণিত হয় যে, খোদাতা’লা শাস্তি ও পুরষ্কার দেবার মালিক। দাবীর সাথে কিছু চাওয়ার মত কারো কোন অধিকার নেই আর ক্ষমা বা পরিত্রাণ কেবল তাঁর অনুগ্রহের উপরই নির্ভরশীল।” (আইয়ামুস সুলেহ্‌, রূহানী খাযায়েন, ১৪তম খন্ড-পৃষ্ঠাঃ ২৪৩)

সুতরাং ‘মালিকিয়্যাতে ইয়াওমিদ্দিন’ বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণ লাভের জন্য পূণ্য কর্ম সম্পাদন, আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন এবং তাঁর ইবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করা একান্ত আবশ্যক যাতে আল্লাহ্‌ তা’আলার অনুগ্রহরাজির উত্তরাধিকারী হতে পারেন আর ফলশ্রতিস্বরূপ ক্ষমা এবং পরিত্রান লাভ করতে পারেন।

এর আরেকটি দিকও আছে যা হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, এ ধারা বিন্যাস প্রজ্ঞা বহির্ভূত নয় এর মাঝেও গভীর হিকমত রয়েছে। তিনি ব্যাপকভাবে এর উপর আলোকপাত করেছেন। সংক্ষেপে আমি তা বর্ণনা করছি; ‘রবুবিয়্যাত’ যা আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রভু-প্রতিপালক হবার বৈশিষ্ট্য, সর্বপ্রথম এর অধীনে তিনি উন্নতি দেবার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেন। কোন জিনিষ সৃষ্টি করার পরে তার বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেন। সে উপকরণ সৃষ্টি করেন যদ্বারা উন্নতি হতে পারে। তারপর এ উপকরণ রহমান বৈশিষ্ট্যের অধীনে বান্দাদেরকে প্রদান করেন যা আত্মিক উন্নতির জন্য তার কাজে আসে। তিনি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোন থেকে বর্ণনা করেছেন কিন্তু জাগতিক দৃষ্টিকোন থেকেও বিষয় একই। যখন বান্দা এটিকে কাজে লাগায় তিনি এর উত্তম ফলাফল সৃষ্টি করেন আর এটিই রহিমিয়্যাত। তার দোয়া ও বিভিন্ন কর্মের ফল প্রদান করেন আর এ শুভ ফলাফল প্রদান অব্যহত রাখেন এবং এরপর মালিকিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের অধীনে পৃথিবীতে সফলতা দান করেন। বিজয়কে আল্লাহ্‌ তা’আলা ঐশী জামাতের নিয়তি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্‌ তা’আলার জন্য এ ধারা বিন্যাস হলো, প্রথমে রব্ব তারপর রহমান, রহীম এবং সবশেষে মালিকে ইয়াওমিদ্দিন।

মানুষের জন্য এর ধারা বিন্যাস কিরূপ হবে হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) তা তুলনামূলকদৃষ্টিকোন থেকে উল্ল্যেখ করেছেন। এক্ষেত্রেও এ বিন্যাসই হওয়া উচিৎ না-কি অন্য কোন? তিনি এ ব্যাপারে বলেন, বান্দাদের জন্য আল্লাহ্‌ তা’আলার এ বৈশিষ্ট্যাবলী থেকে লাভবান হবার জন্য অথবা এর বিকাশার্থে বিন্যাস পরিবর্তন হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ্‌ তা’আলাকে পাবার জন্য বান্দাকে উন্নতি করতে হবে, উৎকর্ষতায় পৌঁছতে হবে। সে প্রথমে মালিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশস্থল হবার চেষ্টা করে, যাতে করে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে যে শক্তি প্রদান করেছেন তদ্বারা বিশ্বে ন্যায় বিচার ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে; নিজ পরিবেশে তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং অনিষ্ট থেকে বাঁচার ও বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারে। প্রথমে মালিকিয়্যাত হবে, এ হিসেবে তাকে কতক ভুল-ভ্রান্তিকে উপেক্ষাও করতে হয় তা দয়ার চেতনায় হোক বা উপেক্ষার প্রেরণায় হোক না কেন। এরপরে বান্দার পক্ষ থেকে নিজ সাথী-কর্মীদের সাথে রহীমিয়্যাতের প্রকাশ ঘটে থাকে। নিজ পরিবেশের জন্য তার হৃদয়ে মূল্যায়নের প্রেরণা সৃষ্টি হয় তাদের উপকার করার চেষ্টা করে। তারপর মানুষ এ রহীমিয়্যাতের যুগ থেকে উন্নতি করে রহ্‌মানীয়্যাত বৈশিষ্ট্য অবলম্বন করে। খোদভীতি রাখে এমন একজন মু’মেন রহ্‌মানীয়্যাত বা দয়া প্রদর্শন করে থাকেন। কোন ভেদাভেদ ছাড়াই আপন-পর সবাই তাঁর এ পূণ্য আচরণ থেকে লাভবান হয়। সমাজে তিনি পূণ্য বিস্তার করেন। এটিই “ইতাইযিল কুরবা’র চিত্র তুলে ধরে যা ইহসান বা অনুগ্রহের পরবর্তী স্তর। এক্ষেত্রে যখন উন্নতি করে তখন ‘রব্বুল আলামীন’ বৈশিষ্টের বিকাশস্থল হিসেবে সমাজ সংস্কারের চেষ্টা করে। সে পরিবেশ গড়ার চেষ্টা করে যেথায় এসব গুণাবলী উন্নতি করতে পারে। এটি বর্ণনা করার পর হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রাঃ) বলেন, বর্ণিত ধারাবাহিকতায় এসব ঐশী গুণাবলীসমূহকে যারা অবলম্বন করে; খোদার পথে অগ্রসরমান এমন পূণ্যের পথযাত্রীদের জন্য তা আশীর্বাদ হয়ে থাকে।

সচরাচর দেখবেন, মানুষের বৈশিষ্ট্যাবলী, তার গুণাবলী তখন পরিস্কারভাবে দৃশ্যপটে আসে যখন তার হাতে ক্ষমতা থাকে, কর্তৃত্ব থাকে বা নিয়ন্ত্রণ থাকে। তখনই উন্নত চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় যখন শক্তি থাকে, যখন কোন বড় পদে মানুষ অধিষ্ঠিত থাকে। দুর্বল আর অসহায়, কারো প্রতি কিইবা রহীমিয়্যাত ও রহ্‌মানীয়্যাতের ব্যবহার করবে অথবা রবুবিয়্যাতই বা কি করে প্রকাশ করবে। স্ব-স্ব পরিবেশে যাই আছে, যতটুকুই কর্তৃত্ব রাখে, তাকে সেখানে এসব গুণাবলীর বহিঃপ্রকাশ করা উচিত কেননা, ক্ষমতার অলীক ধারণাই মানুষের হৃদয়ে অহংকার ও ঘৃণা সৃষ্টি করে।

সুতরাং আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্তুষ্টি এবং তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য এ গুণাবলীর উপর প্রণিধান এবং নিজেকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করা একান্ত আবশ্যক। আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদেরকে স্বীয় কল্যাণরাজি থেকে সর্বদা অংশ দিন এবং শাস্তি-পুরষ্কার দিবসেও যেন আমরা তাঁর দয়ার পাত্র হই।

গত খুতবায় যে শহীদের কথা বলেছিলাম তাঁর নাম মুহাম্মদ আশরাফ, যা উল্ল্যেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি মন্ডি বাহাউদ্দিনের ফালিয়া তহশিলের বাসিন্দা এবং একজন নতুন বয়াতকারী আহ্‌মদী ছিলেন।

দ্বিতীয়তঃ আজ আরেকটি দুঃখের সংবাদ আছে, জামাতের একজন প্রবীণ সেবক, মুরব্বী সিলসিলাহ্‌ এবং জামেয়া আহ্‌মদীয়ার শিক্ষক চৌধুরী মুনির আহমদ আরেফ সাহেব সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর, তিনি ১৯৪৬ সনে জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৫৬ সনে জামেয়া পাশ করেন এবং প্রায় ৫০বছর ধরে জামাতের খিদমত করেন। বার্মা এবং নাইজেরিয়াতে মুবাল্লেগ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, এরপর শিক্ষক হিসেবে জামেয়াতে খিদমত করছিলেন। প্রায় ২৭ বছর তিনি জামেয়াতে পড়িয়েছেন। দীর্ঘদিন হোষ্টেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন। যারা হোষ্টেলে থাকত���ন তারা জানবেন। অত্যন্ত কোমল স্বভাবের অধিকারী হাসি-খুশী মানুষ ছিলেন এবং গত ২১ বছর যাবত ‘দারুল কাযা’ বিভাগেও কাজ করেছেন। মৃত্যুর একদিন পূর্বেও একটি কেসের ব্যাপারে গাড়ী চেয়ে পাঠান এবং অফিসে আসেন�� হাঁটত��� পারছিল��ন না, একটি ল���ঠিতে ভর করে আসেন। হৃদরোগও ছিল আর দুর্বলতাও ছিল তা সত্বেও বিচারের পুরো বিবরণ শুনেন এবং রায় প্রদানের তারিখ পরবর্তী দিন ধার্য করেন। তাঁকে সেখানকার কাযা বিভাগের ব্যবস্থাপক বলেন, শরীর এত খারাপ আসার দরকার কি ছিল। উত্তরে তিনি বলেন, জামাতের যে দায়িত্ব আমার স্কন্ধে অর্পিত হয়েছে তা কোন ভাবেই উপেক্ষা করতে আমার মন মানে না। তাই আমার উপর যেসব কেসের দায়িত্ব আছে আমি তার সুরাহা করবো। যাই হোক, সে রাতেই বা পরের দিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁকে ক্ষমা করুন আর তাঁর সম্মান বৃদ্ধি করুন। তাঁর বিধবা সহধর্র্মীনির নাম হচ্ছে, রাজিয়াহ্‌ মুনীর সাহেবা এছাড়া তাঁর এক মেয়ে এবং তিন ছেলে রয়েছে। এখন নামায শেষে আমি তাঁর গায়েবী জানাযা পড়াবো।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে